জোনাকির রঙ – ২

(দ্বিতীয় অধ্যায়)

খোলা রাস্তার উপর দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে একটা মানুষ। নিকষ রাত নেমেছে কলকাতায়। আশপাশে কোথাও কেউ নেই। কেবল শুকনো পিচের রাস্তার উপর দিয়ে তার পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। হাপরের মতো নিশ্বাস বেরিয়ে আসছে। কীসের থেকে যেন উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়ে পালাচ্ছে সে। বারবার ফিরে তাকাচ্ছে পেছনদিকে।

বড়রাস্তা থেকে একটা চোরাগলির ভিতরে ঢুকে আসে লোকটা। একটা কুকুরের গায়ে হোঁচট খায়। পড়ে যেতে যেতে সামলে নেয়। গলির মুখটা অন্ধকার হয়ে আসে। পেছন ফিরে একঝলক ছায়াগুলোকে ও দেখে নেয়। তারা পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। দৌড়োচ্ছে না। যেন লোকটাকে ধরার কোনও তাড়া নেই ওদের। ওরা জানে, দিনের শেষে লোকটাকে ধরে ফেলবে। কোণঠাসা ইঁদুরের মতো পিষে মারবে।

মুখ থেকে মিহি হাসির মতো শব্দ বেরিয়ে আসে ওদের। যেন অনেকগুলো মানুষের একসঙ্গে হাসির শব্দ।

লোকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার দৌড়োতে থাকে। দু-পাশে বাড়িগুলোর দিকে চেয়ে কী যেন খোঁজে লোকটা। চোখ দ্রুত সরতে থাকে। নিশ্বাসের গতি বেড়ে ওঠে।

আজ রাতের আকাশে চাঁদ নেই। তার বদলে কে যেন একটা সিলিং ফ্যান ঝুলিয়ে দিয়েছে। ঘটঘট করে ঘুরে চলেছে সেটা। তার থেকে একটু দূরে টুংটুং করে দুলছে একটা দড়ির উইন্ডচাইম। ভোঁতা বিষণ্ণ আওয়াজ করে বাজছে। কোথাও একটা সেল ফোন রাখা আছে, যার স্ক্রিনটা আর কিছুতেই জ্বলে উঠবে না।

দৌড়োতে দৌড়োতে গলির ভিতরে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়ে লোকটা। একটা ভাঙাচোরা একতলা বাড়ি আছে সেখানে। ভালো করে কান পাতলে শোনা যায়, তার ভেতরে থেকে কান্নার শব্দ আসছে। কেউ নাক মুছছে, বিড়বিড় করে ভেজা গলায় কী যেন বলে চলেছে। লোকটা দরজায় সজোরে ধাক্কা দেয়।

“ইলোরা… ইলোরা… দরজা খোল প্লিজ, ওরা ধরে ফেলবে আমাকে….”

ছায়াগুলো এখনও ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। কোনও তাড়া নেই ওদের।

লোকটা ভয়ে আরও জোরে ধাক্কা দিতে থাকে। দরজাটা এমন কিছু শক্তপোক্ত নয়। কাঠের তক্তার দরজা। কিন্তু প্রতিবার ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও শক্ত হচ্ছে সেটা। কাঠের পরতের উপরে লোহার আস্তরণ গজিয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে, ঢেকে যাচ্ছে কান্নার শব্দ।

লোকটা এবার বিফল হয়ে ঘুরে দাঁড়ায় ছায়াগুলোর দিকে। ওরা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। ভালো করে চেয়ে দ্যাখে। ছায়াগুলো অন্ধকার বটে, তবে তেমন কিছু ভয়ংকর নয়। অনেকটা লোমশ ভালুকের মতো। নরম শরীর তাদের।

লোকটা এগিয়ে যায় ছায়াগুলোর দিকে। দুটো হাত বাড়িয়ে ডেকে নেয় তাদের। হাসির শব্দগুলো মিলিয়ে গিয়ে একটা অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য ঘিরে ধরে ওকে। আর সব কিছু মিলিয়ে যায়, ওই ফ্যান, উইন্ডচাইম। কেবল কোথায় যেন কাতর স্বরে একটা ফোন বাজতে থাকে…

ফোনের শব্দেই ঘুমটা ভেঙে যায় শতরূপের। গাড়ির জানলার কাচে হেলান দিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, নিজেই বুঝতে পারেনি। কাল সারারাত ট্রেনে ঘুম হয়নি। নীচের বার্থের একটা লোক খানিকটা হম্বিতম্বি দেখিয়েই মাথার কাছের জানলাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। তাদের সাত পুরুষে নাকি নিউমোনিয়ার ধাত আছে।

ট্রেনের গরমে উশখুশ করতে করতে জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল শতরূপ। মনে হচ্ছিল, ঘন অন্ধকারে ডুবে-থাকা কোনও আদিম অরণ্যের মধ্যে দিয়ে সময়রেখা ধরে ছুটে চলেছে ট্রেনটা। নির্জন নিঃসঙ্গ পৃথিবী থেকে উন্নত মানুষের পৃথিবীর দিকে। বাইরে তাকিয়ে থাকলে একসময় ডাইনোসর, ম্যামথ আর আকাশের দিকে চেয়ে-থাকা সর্বসুখী গুহাবাসী মানুষ চোখে পড়বে। সেসব দেখতে দেখতে একবার চোখ লেগে গিয়েছিল, ব্যাস ওইটুকুই।

এখন সকাল সাড়ে দশটা বাজে। দূরে ভুটান পাহাড়ের নীলচে রেখা আকাশে মিশেছে। দেখলে মনে হয়, পাহাড়ের ওপাশে যেন কোন হারিয়ে-যাওয়া রূপকথার জগৎ পসরা মেলে আছে।

ফোনটা রিসিভ করে শতরূপ, আশিস দত্তর ফোন, সেটা কানে চেপে ধরে, হ্যাঁ বলুন।

—গাড়িতে উঠে গেছ শুনলাম। ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?

শেষ কথাটা সম্ভবত ওর গলা শুনে আন্দাজ করেছে আশিস দত্ত। শতরূপ একটা হাত দিতে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বলে, “এই গাড়িটা আপনারই তো? মাঝেমধ্যে এদিক-ওদিক ঘুরতে যাওয়া যাবে দেখছি।”

—হ্যাঁ, তবে দুম করে কোথাও বেরিয়ে যেয়ো না। ওখানে গিয়ে আগে জংলুর খোঁজ করবে। স্থানীয় ছেলে। ভারী চৌকশ। ও-ই তোমাকে চারপাশটা দেখিয়ে, বুঝিয়ে দেবে। মনে রেখো, তুমি কলকাতায় থাকো। শখের লেখালিখি আর চাকরি করো। নিজের ফ্ল্যাটে থাকো কলকাতায়। ওই কটেজে ঘুরতে গেছ। আবার বলছি, ভাই, বি এক্সট্রিমলি কেয়ারফুল। তুমি ফেইল করলে বিনি আর আমাকে বিশ্বাস করবে না।

— আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো…

—কী?

—মানুষকে তার অতীত সম্পর্কে জোর করে মিথ্যে বলে খুশি রেখে লাভ কী হবে আপনার? দশ দিন পরে আমি বাড়ি চলে আসব। আবার কিছু খারাপ ঘটনা ঘটবে। অতীত দিয়ে কতদিন সামলাবেন?

— খারাপ ইনসিডেন্ট আমাদের সবার জীবনেই ঘটে। কিন্তু সে ঘটনায় আমরা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করব, সেটা ঠিক করে দেয় আমাদের পাস্ট। তুমি ওকে এমন একটা পাস্ট দেবে, যাতে শি ক্যান ফাইট, কিছু একটা ঘটলেই যেন না হার মেনে নেয়। ডায়েরিগুলো পড়েছ?

—হাতে তিন দিন সময় পেয়েছি মাত্র। প্রথমটা হাফ পড়েছি। আট বছর বয়সে লেখা।

—শেষ থেকে শুরু করলে ভালো করতে। আমারই ভুল, তোমাকে যখন কাজটা দিয়েছি, তারপর এত পড়ার সময় ছিল না আর। যা-ই হোক, আমি ওর ডায়েরিগুলো উলটে-পালটে দেখেছি। ওর যখন আট বছর বয়স, তখন থেকে একটি মেয়ের সঙ্গে ওর আলাপ হয়—পুনা, ওর ইম্যাজিনারি ফ্রেন্ড বা অলটার ইগো। আমার মনে হয়, ওখানটা ভালো করে পড়া দরকার তোমার। আসলে ওর পাস্টের ট্রমা থেকে ইম্যাজিনারি ফ্রেন্ডের ব্যাপারটা….. – ঘাবড়াবেন না স্যার, ইম্যাজিনারি ফ্রেন্ডে দুনিয়াসুদ্ধু লোক বিশ্বাস করে। শুধু কার ইমাজিন্যারি ফ্রেন্ড বেটার—এই নিয়ে দাঙ্গা-মারামারি করে না। যা-ই হোক, আমি ওই ডায়েরিটা দেখে নিচ্ছি তাহলে…

—বেশ, কোনও অসুবিধা হলে জানিয়ো আমাকে…

শতরূপ ফোনটা রেখে বাইরে তাকায়। দু-পাশে রাস্তা খাড়া ঢাল হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। সেখান গজানো লম্বা লম্বা গাছের সারির ফাঁক দিয়ে মাঝেমধ্যে হলদে সূর্যটাকে দেখা যাচ্ছে। এখন ফেব্রুয়ারি প্রায় শেষ হতে চলেছে। হালকা শীতের আমেজ পড়েছে এদিকটায়। রোদে তাপের উপদ্রব নেই।

ব্যাগ থেকে ডায়েরিগুলো বের করে আট বছরের খাতাটা খুলে সামনে ধরে শতরূপ। ডায়েরিগুলো পাতলা। সব পাতায় যে লেখা আছে তা-ও নয়। ইতস্তত উলটে-পালটে একটা জায়গা খুঁজে বের করে শতরূপ। মন দিয়ে পড়তে থাকে সেখানটা…

“ইলোরা কে বলুন তো?” একসময় ড্রাইভার ছেলেটা ওর দিকে না তাকিয়েই প্রশ্ন করে। তার মুখে নরম হাসি।

একটু চমকে ওঠে শতরূপ— “ও নামটা।…”

“আপনি স্বপ্ন দেখছিলেন। বারবার বলছিলেন নামটা…”

“কী বলছিলাম?”

ছেলেটা একটু ভেবে বলে, “ঠিক শুনতে পাইনি। তবে একবার মনে হল বললেন, ‘ইলোরা, ওরা আমাকে সব ভুলিয়ে দেবে…’ বলতে বলতে আপনি হাসছিলেন। বিনিদিও খুব স্বপ্ন দ্যাখে, জানেন…”

“তা-ই নাকি?”

“হ্যাঁ, আগে তো দরজা বন্ধ করে শুত, এখন আর দরজা বন্ধ করতে দেওয়া হয় না। ছিটকিনি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সোমাদি রাতে ওষুধ দিতে গিয়ে শুনেছে মাঝে মাঝে, কার সঙ্গে যেন কথা বলে স্বপ্নে…”

“কী বলে?”

“সোমাদি জানে। তবে আমার কী মনে হয় জানেন?”

শতরূপ বুঝতে পারে, ছেলেটা যতটা সরল, ততটাই বকমবাইশ। নিজে থেকেই ঢালাও তথ্য দিয়ে চলছে।

“বিনিদিদি স্বপ্নে কথা বলে না, সত্যি সত্যি বলে। আমি একবার দেখেছিলাম, পুকুরধারে দাঁড়িয়ে পুকুরের দিকে চেয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে, অনেকক্ষণ, প্রায় মিনিট দশেক ধরুন। কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে চুপ করে যাচ্ছে, হাসছে, মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে, আবার বলছে… আর মাঝে মাঝে রাতে ঘুম থেকে উঠে ছাদে চলে যায়। সেখানেও কার সঙ্গে যেন কথা বলে। আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন, দাদা?”

শতরূপ একটু হাসে, ফোনটা ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে রেখে আবার মুখ ফেরায় বাইরে- “না….”

“আপনাকে মহাকালদেবের মন্দিরে নিয়ে যাব একদিন রাতে। জঙ্গলের মধ্যে, একদম ভেঙে গেছে। কেউ আর যায় না ওদিকটায়। রাতে গেলে গা ছমছম করবে।”

“আশিসবাবু যে বললেন রাতে জঙ্গলের রাস্তায় যাওয়া মানা, বুনো হাতির দল আসে নাকি?”

মুখে অদ্ভুত একটা ভঙ্গি করে ছেলেটা। তারপর আবার গাড়ি চালানোয় মন দেয়।

“নাম কী তোমার?”

“আমার আসল নামটা হেবি খটোমটো দাদা। সে নামে এখানে কেউ চেনে না আমাকে। এখানে সবাই বিনয় বলে ডাকে। আপনিও ওটা বলেই ডাকবেন। স্যার বলছিলেন, আপনি নাকি গল্প লিখেন। কীসের গল্প লেখেন দাদা?”

“তোমার কী পড়তে ভালো লাগে?”

“আমি তো ভূতের গল্পের পোকা। অ্যাক্সিডেন্টের আগে বিনিদিদি আমাকে ভূতের বই দিয়েছিল। মাঝে মাঝে আমি পড়ে শোনাতাম গল্প। দিদি খুব খুশি হয় গল্প শুনলে…”

“তা-ই নাকি? আর কীসে খুশি হয়?”

উত্তরটা দিতে বিশেষ সময় নেয় না বিনয়, “আর তেমন কিছুতেই খুশি হয় না, স্যার। সব সময় কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকে। কী যেন ভাবে, বেশি কথা বলে না…”

“লাস্ট সুইসাইড অ্যাটেম্পট যখন করেছিল, তখন তুমি এখানে ছিলে?”

“হ্যাঁ দাদা, এ বাড়িতে আমিই বাজার করতে যাই। সেদিন জংলুর থেকে কী কী আনতে হবে জেনে ফর্দ মেলাচ্ছিলাম। তখন বেলা সাড়ে আটটা হবে। এমন সময় বাইরে থেকে হেবি জোরে কী একটা আওয়াজ এল। ভাবলাম বুঝি ঘরের ভেতরেই কিছু পড়ে গেছে। বাইরে বেরিয়ে দেখি, বাড়ির চাতাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে। দিদি পড়ে আছে মেঝেতে আর পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। বডিটার কথা ভাবলে এখনও গা শিউরে ওঠে…”

“ওটা যে আত্মহত্যার চেষ্টাই ছিল, সেটা কী করে বুঝলে? ছাদ থেকে পা পিছলে পড়ে যেতে পারে, কিংবা অন্য কোনওভাবে…”

“ছাদ তো পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, দাদা। তখন জানুয়ারির শুরু। বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই। খটখটে শুকনো ছাদ। তা ছাড়া…”

“তা ছাড়া কী?”

উত্তরটা দিতে গিয়ে হেসে ফ্যালে বিনয়— “আমি না দাদা, প্রচুর কথা বলি, জানেন তো। তার জন্যে ধাতানিও খাই মাঝে মাঝে… সব কথা গ্যালগ্যাল করে বলে ফেলতে বারণ করেছেন স্যার…

কথাটা বলে গম্ভীর হয়ে যায় বিনয়। শতরূপ বড় করে একটা নিশ্বাস নেয়, তারপর মাথাটা পেছনে এলিয়ে বলে, “ইলোরা আমার ইম্যাজিনারি ফ্রেন্ড। ছোটবেলায় তেমন বন্ধুবান্ধব ছিল না তো, তাই মনে মনেই বানিয়ে নিয়েছিলাম ওকে…. এখনও মাঝে মাঝে স্বপ্নে আসে বোধহয়…”

বিনয় বেশ কিছুক্ষণ স্টিয়ারিং-এ মনোযোগ রাখে। একটা গাড়িকে সবেগে পাশ কাটিয়ে যায়। তারপর গিয়ার চেঞ্জ করে বলে, “দিদিকে দেখতে একটা ওঝা এসেছিল, জানেন?

“ওঝা! এখানে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। কলকাতা থেকে আনা হয়েছিল। বাবুর যেমনি নামডাক, তেমনি হম্বিতম্বি। বিরাট হাতযশ, কী সব বশীকরণ-টশিকরণ করতে পারে…”

“তা করল বশীকরণ?”

“বশীকরণের মাথায় বাড়ি….” বিনয় খিকখিক করে হাসে-”দিদি সেদিন হেব্বি রেগে গিয়েছিল। এসব একদম পছন্দ করে না তো… একরকম জোর করে হাত-পা টেনে ধরেই ওঝা তার কাজকর্ম চালিয়েছিল।”

“কাজকর্ম বলতে?”

“আমরা কি আর দেখতে পেয়েছি সেসব? নীচের ঘরে নিয়ে গিয়ে সে ওঝা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। শুধু শব্দ শুনে বুঝেছি, ঘরে বিকট কিছু একটা হচ্ছিল। আমাকে দেখতে দেয়নি কিছু। দিদির শরীর অসুস্থ আর এদিকে ওঝার দামড়া ফিগার। তাতেও আঁচড়ে-কামড়ে একদম রক্তারক্তি করে দিয়েছিল লোকটাকে…. মিনিটখানেকের মামলা, তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, দিদির উপর নাকি শয়তানের ভর হয়েছে…”

“শয়তানের ভর!” শতরূপ আঁতকে ওঠে।

“হ্যাঁ দাদা, শুধু তা-ই নয়। বলেছিল দিদি সাক্ষাৎ মানুষের গর্ভে শয়তান। সেটা বুঝেই ওর বাবা-মা ওকে বিষ দিতে গিয়েছিল….”

“মানুষের গর্ভে শয়তান! হলিউডি সিনেমার প্লট!”

“হলিউড-বলিউড জানি না, স্যার। কিন্তু দিদির মধ্যে কিছু একটা আছে। ভগবান কি শয়তান যা-ই হোক।”

“শয়তানকে দূর করার কোনও উপায় বলে যায়নি?”

“বলেছিল। তবে সে কথা আমার জানার অনুমতি নেই। বুঝতেই পারছেন, তান্ত্রিক-ফান্ত্রিকের ব্যাপার। তার মধ্যে কতটা আইনি, কতটা বেআইনি তা কি আর খুলে বলা যায়…”

“মানুষের গর্ভে শয়তানের সন্তান।…” কথাটা বিড়বিড় করতে করতে ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো খাতা টেনে বের করে শতরূপ। খাতার ভিতরে কাঁচা হাতে পেনসিলে কিছু লেখা আছে। মাঝে মাঝেই বেশ কয়েকটা পাতা খালি। তারপর আবার লেখা ফুটে উঠেছে। কয়েক জায়গায় পেনসিলের কালি গভীর হয়েছে। কোথাও জট পাকিয়েছে। একটা বাচ্চা মেয়ের মনের গহিনে কিছু জট পাকাতে চেয়েছে বারবার। কয়েকটা জায়গায় চোখ আটকে যায় শতরূপের। ভুরু কুঁচকে যায়। গালের খসখসে চামড়ায় হাত বুলিয়ে নিজের নোটবুকে কিছু নোট নেয় সে।

“ওই ডায়েরিগুলো আপনার কাছে, দাদা?” বিনয় রিয়ার ভিউ মিররে চোখ রেখে আবার সরিয়ে নেয়— “দিদি কাউকে পড়তে তো দূরের কথা, হাত অবধি লাগাতে দিত না। এখন মনে হয়, মনেও নেই যে ওগুলো ছিল…”

শতরূপ হাসে— “আমার কিন্তু মেয়েটার কথা ভাবলে মায়াই লাগছে, জানো?”

“কেন?”

শতরূপ কাঁধ ঝাঁকায়— “বুঝিয়ে বলা মুশকিল। আমাদের সবার নিজেদের জীবনের উপর, জীবনের গল্পগুলোর উপর একটা অধিকার আছে। ভালো হোক, খারাপ হোক, সেগুলোই তো তৈরি করে আমাদের। শেষ অবধি তো গল্প ছাড়া কিছুই থাকে না। এখন সেগুলোই যদি ফেক হয় তাহলে জীবনটাই….”

শতরূপের কথা শেষ হয় না, তার আগেই মারাত্মক হর্নের শব্দে কানে তালা লেগে যায়। সামনে তাকাতেই বুক ঠান্ডা হয়ে যায়। একটা বছর দশেকের ছেলে আপন মনে রাস্তা পেরোতে যাচ্ছে, বাঁদিক থেকে ছুটে আসা গাড়িটা যেন খেয়ালই নেই তার। বিপজ্জনক গতিতে তার দিকে ধেয়ে আসছে গাড়িটা।

“এই সামলে… বাচ্চাটা….”

সজোরে স্টিয়ারিং ঘোরাল বিনয়। গাড়িটা কীসে যেন ধাক্কা খেয়ে একটা শব্দ করল। ছেলেটার গায়েই কি? রাস্তার আশপাশ থেকে প্রবল চিৎকারের শব্দ ভেসে এল। চোখ বন্ধ করে নিল শতরূপ। তার সমস্ত শরীরটা কীসের উপর যেন আছড়ে পড়েছে। মাথাটা ঠুকে গেল সজোরে।

পরক্ষণেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি ঘিরে ধরল শতরূপকে। মনে হল, চাইলেও সে আর চোখ খুলতে পারবে না। এদিকে চোখ খুলতে ভীষণ ইচ্ছা করছে। মনে হল, অজান্তেই কখন যেন চারপাশের পরিবেশটা পালটে গেছে। ঝিরঝির করে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আসছে কোথা থেকে। তার সঙ্গে একটা বাঁশির শব্দ? ওর গলায়, পিঠে কার আঙুলের ছোঁয়া লাগছে।

কিন্তু তা কী করে সম্ভব? একটু আগেই একটা জমজমাট রাস্তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছিল গাড়িটা। ধাক্কা খেয়ে এমন একটা জায়গায় এসে পড়বে কী করে?

দুটো হাত হাওয়ায় চালাল শতরূপ। হ্যাঁ, কেউ একটা বসে আছে ওর পাশে। মানুষটার হাতে একটা কাচের জার ধরা আছে। মাটির উপরে হাঁটু মুড়ে বসে ওর দিকে তাকিয়ে আছে একটানা। তাকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু শিরায় শিরায় অনুভব করল শতরূপ।

“ইলোরা…” অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল শব্দটা। উঠে বসার চেষ্টা করল সে, কিন্তু পারল না।

“বল, আমি শুনছি…” একটা রিনরিনে নারীকণ্ঠ বলল।

“তুই বলেছিলি, আর আসবি না আমার কাছে, তাহলে…”

“তা-ও এলাম, চিন্তা হচ্ছিল তোর জন্য…”

“চিন্তা! কীসের?”

“এই কাজটা নিয়ে ভালো করলি না। মেয়েটাকে আদৌ হেল্প করতে পারবি না তুই। ওর জীবনটা আপাতত তোর থেকে অনেক বেশি গোছানো।”

“তুই কী করে জানলি?”

“ও আত্মহত্যা করতে চায়, তার একটা কারণ আছে। খুঁজলেই বের করতে পারবি। তোর কারণটা তুই নিজে জানিস?”

দু-হাতে নিজের মাথাটা খামচে ধরে শতরূপ – “তুই… তুই এলেই আমার সব ওলটপালট হয়ে যায়। চলে যা এখান থেকে… আমার টাকাটা দরকার…”

“বেশ, কিন্তু আমাকে নিয়ে মিথ্যে বললি কেন?”

“কী মিথ্যে?”

“আমি তোর ইম্যাজিনারি ফ্রেন্ড? তা-ই বুঝি?” চাপা হাসির রেশ খেলে যায় ইলোরার গলায়।

শতরূপ উত্তর দেয় না। মাথাটা চেপে ধরে জোর করে কী যেন ভাবার চেষ্টা করে।

“মেয়েটার ক্ষতি ছাড়া আর কিছু করতে পারবি না তুই….” ইলোরার গলা যেন ফাঁকা ঘরের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়।

“আই ডোন্ট কেয়ার। টাকাটা আমার দরকার। তা ছাড়া…” শতরূপের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, “তোর থেকে জ্ঞান শুনতে চাই না আমি। তোর নিজের হাতে রক্ত লেগে নেই? মানুষ খুন করিসনি তুই?”

অদ্ভুত একটা হাসি ঘুরপাক খেতে থাকে শতরূপকে ঘিরে। সেই বাঁশির আওয়াজটা বুঝি কমে এসেছে এতক্ষণে। ফিনফিনে হাসির আওয়াজটা যেন সরীসৃপের মতো বারবার ঠান্ডা স্পর্শ বুলিয়ে যায় ওর শরীরে, ও মরিয়া হয়ে চিৎকার করে ওঠে, “তুই নরখাদক! হাসতে হাসতে মানুষ খুন করতে পারিস তুই…. এক মুহূর্ত আমার কাছে আসবি না… কিছুতেই না…”

“তাই? সেইজন্যেই আসব না? নাকি অন্য কোনও কারণে?” আবার সেই চাপা ব্যঙ্গাত্মক হাসিটা শোনা যায়।

দু-হাতে মুখের সামনে থেকে হাওয়া সরানোর চেষ্টা করে শতরূপ। দমকা হাওয়ার ঝাপটা ওর মাথাটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরতে থাকে। জোর বাড়াতে থাকে হাওয়াটা। অসহ্য যন্ত্রণা ছিঁড়ে ফেলতে চায় ঘিলুটাকে। থেঁতলে দিতে চায় বারবার। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ওর। শরীরের সমস্ত জোর একত্র করে বুক ফাটিয়ে নিশ্বাস নেয় ও। সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায় বন্ধ চোখের পাতা….

“দাদা… দাদা…” ওর মুখের উপরে ঝুঁকে পড়েছে বিনয়ের মুখটা। দু-চোখ জুড়ে একটা উৎকণ্ঠা খেলা করছে। মাথার একপাশে ঠান্ডা স্পর্শ লাগে ওর।

শতরূপ ধীরে ধীরে উঠে বসে। গাড়ির সিটেই বসে আছে এখনও। কেবল গাড়িটা দাঁড় করানো আছে রাস্তার ধারে। দু-পাশে পথচারীদের একটা ছোটখাটো দল জমা হয়েছে। একটু একটু করে পাতলা হচ্ছে দলটা।

এতক্ষণে বিনয়ের মুখটা ভালো করে দেখতে পায় সে। সৌম্য সুদর্শন চেহারা, টিকোলো নাক, ভারী মিষ্টি নরম একটা মুখ।

একটু ধাতস্থ হতে শতরূপ বুঝতে পারে, ওর মাথাটা ঠুকে গেছে গাড়ির কাচে। এখনও ব্যথা হয়ে রয়েছে মাথার বাঁদিকটা। সেদিকে একবার হাত বুলিয়ে দ্যাখে। না, রক্ত বের হয়নি।

“বেশি চোট লাগেনি, দাদা, পাশের দোকান থেকে বরফ এনে লাগিয়ে দিয়েছি,” বিনয় একটু আশ্বস্ত হয়ে বলে, “কেবল আপনি চোখ খুলছিলেন না বলে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”

“ওই ছেলেটার কী হল?”

“কোন ছেলেটা?”

“যাকে দেখে গাড়ি ঘুরিয়ে নিলে।”

“ছেলে!” বিনয় অবাক হয়ে যায়— “ছেলে কই, দাদা? একটা বোলেরো সামনে এসে পড়েছিল। আর-একটু হলেই ঠুকে দিয়েছিল। শালাদের এখনও তাল কাটেনি…..”

গাড়ির জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে রাস্তার উপরটা দ্যাখে শতরূপ। সত্যি সেটার অবস্থা দেখে মনে হয় না কোনও সিরিয়াস অ্যাক্সিডেন্ট জাতীয় কিছু ঘটেছে বলে। তাহলে ও ছেলেটাকে দেখল কেন?

গাড়িতে আবার স্টার্ট দিল বিনয়। বাকি রাস্তাটা আর কোনও কথা হল না। ব্যাপারটা একটু অবাকই লাগল শতরূপের। তবে কি জ্ঞান হারিয়ে থাকার সময় ও এমন কিছু বলেছে, যাতে ওকে একটু সমীহ করে চলেছে ছেলেটা?

ব্যাগের ভেতরে থেকে ডায়েরি বের করে পড়তে শুরু করে শতরূপ। দু-একটা জায়গার ছবি তুলে রাখে মোবাইলে। ডায়েরির মধ্যে শুধু লেখা নয়, কিছু কিছু জায়গায় বিশেষ কিছু ছবিও আঁকা আছে। সেগুলো মন দিয়ে দ্যাখে। এই জায়গার লেখা বেশির ভাগই পেনসিলে। একটা জায়গায় একটা ডুবন্ত সূর্যের ছবি। সূর্যের ঠিক সামনে একটা দরজা। কোনও দেওয়াল নেই, শুধু একটা কাঠের ফ্রেম। দরজার ভিতরে পেনসিল ঘষে কালো রং করা আছে। ভারী অদ্ভুত ছবিটা।

মাঝে মাঝে কিছু লেখা ঝাপসা হয়েছে। খাতার ভিতরে এক জায়গায় বেশ কয়েকটা পাতার লেখা ইরেজার দিয়ে তুলে দেওয়া হয়েছে। যদিও অল্প বয়সে মানুষ শক্ত হাতে লেখে বলে লেখাগুলোর দাগ রয়ে গেছে। পরে চড়া আলোর নীচে পড়ে দেখতে হবে।

খানিকক্ষণ সেই খাতার উপরে মুখ ডুবিয়ে রেখে সিটের পেছনে মাথা হেলিয়ে দেয় শতরূপ। ধীরে ধীরে চোখ বোজে। শেষ গল্প বলেছে আজ থেকে না হলেও বছরখানেক আগে। তারপর থেকে একেবারেই অভ্যেস নেই। মেয়েটার কথা শুনে যা মনে হচ্ছে, তাতে শতরূপ যে আদৌ ওর বন্ধু-টন্ধু গোছের কিছু নয়, সেটা বুঝে নিতে তার বেশিক্ষণ সময় লাগার কথা নয়। সেক্ষেত্রে পুরো পেমেন্ট দাবি করাটা অন্যায় হবে।

গাছপালার সার পেরিয়ে একটা বাজারজাতীয় এলাকা পড়ে। তারপর আবার কখন যেন জঙ্গল এসে দু-পাশের দৃশ্যের দখল নেয়। কিছুক্ষণ সেভাবেই কাটার পর একটা গাছের ফাঁকের সরু রাস্তা দিয়ে বাঁক নেয় গাড়িটা। এবং নিতেই শতরূপের মনটা জুড়িয়ে যায়।

পাকদণ্ডি পথ চলে গেছে বহু দূর। তার একদিকে খাড়া খাদ নেমে গেছে প্রায় দুশো মিটার। সেই খাদের ভেতরে থেকে উঠে এসেছে একটা আকাশছোঁয়া বাঁশ গাছের সার। এ জায়গায় গাছগুলো একটু বেশি উজ্জ্বল রঙে সেজেছে। নানা রঙের বুনো ফুল ধরে আছে থরে থরে। তার ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে হালকা কালো পিচের রাস্তাটা। রাস্তার শেষ প্রান্তে দেখা। যাচ্ছে ছোট্ট দোতলা কটেজ। সেটার দিকে এগিয়ে চলেছে গাড়িটা।

“বাঃ, লোকেশন তো চোখ জুড়িয়ে যাবার মতো…” শতরূপ মুগ্ধ হয়ে সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলে।

“কটেজটা তৈরি হয়েছিল ভাড়া দেওয়ার জন্য। আশিস স্যারের তো হাউজিং-এর কারবার। কয়েক বছর হল দিদিকে এখানে এনে রাখছেন তাই আর ভাড়া দেওয়া হয় না।”

“ও আগে যেখানে থাকত, সেখানে কে থাকে এখন?”

“তেমন কেউ না। আশিস স্যার এলে থাকেন। অ্যাক্সিডেন্টের আগে বিনিদিদি যেত মাঝে মাঝে… এখন তো ভুলেই গেছে বাড়িটার কথা।”

গাড়িটা বাড়ির সামনে আসতে একটা ছোটখাটো জটলা চোখে পড়ল। গেটের ঠিক মুখেই দুটো লোক আর একজন মাঝবয়সি মহিলাকে অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করতে দেখা গেল। চোখে-মুখে কী যেন এক আতঙ্কের ভাব। বিনয় গাড়িটা ড্রাইভওয়ে দিয়ে ছুটিয়ে স্বগতোক্তির মতো বলল, “এখন আবার কী হল?”

গাড়ি থেকে নেমে সেদিকে এগিয়ে গেল বিনয়। শতরূপও দরজাটা বন্ধ করে ব্রিফকেসটা পাশে রেখে কয়েক পা এগিয়ে গেল। এদের মধ্যে সব থেকে ছটফটে চেহারা যার, তার নামই সম্ভবত জংলু। লম্বায় ছ-ফুটের খানিক বেশিই হবে, বয়স মনে হয়, তিরিশের উপর উঠেছে সবে। এই মুহূর্তে গলা উঁচুতে তুলে দু-একজন লোককে কী যেন বোঝানোর চেষ্টা করছে।

বিনয় তার সঙ্গে কথা বলতেই তার চোখ ঘুরে গেল শতরূপের দিকে। মাঝবয়সি মহিলাকে নিয়ে দুজনেই হেঁটে এগিয়ে আসতে লাগল এদিকে। শতরূপের কৌতূহলটা এতক্ষণে বেড়ে উঠেছে। আসতে না আসতেই হলটা কী?

কাছে আসতেই ছটফটে ছেলেটার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল বিনয়, “ওর নাম জংলু, এ বাড়ি ও-ই দেখাশোনা করে। আর উনি সোমাদি…. বিনিদিকে ওষুধ দেওয়া, দেখাশোনা করা সমস্তটাই…”

দুজনের দিকে চেয়েই হাসে শতরূপ। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলে, “কিন্তু সকালবেলা কী হয়েছে বল তো?”

কথাটা বলতে গিয়ে একটু ইতস্তত করে বিনয়, বাকি দুজনের মুখের দিকে চেয়ে নিয়ে বলে, “ইয়ে, স্যারকে এখনও জানানো হয়নি, সন্ধের আগে যদি কিছু না হয় তাহলে জানাতেই হবে…”

“হয়েছেটা কী?” বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে শতরূপ।

এবার বিনয়ের মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয় জংলু, “বিনিদিদির পায়ে সাড় ছিল না। তার উপরে দোতলা থেকে নীচে নামতে তেরো-তেরো ছাব্বিশটা সিঁড়ি। তাই আমি ভেবেছিলাম…”

“কী ভেবেছিলে?”

সোমা বাকি কথাটা শেষ করে, “বিনি বারবার বলত দরজা খোলা রাখতে, আমরা রাখতাম না। আজ খোলা রেখেছিল জংলু। একটু আগে গিয়ে আমি দেখলাম ঘর ফাঁকা, বিনি ঘরে নেই….”

“কোন ফাঁকে নীচে নেমে গেছে, কেউ দেখতে পায়নি। গোটা বাড়িতে খুঁজে পাইনি….

“সে কী!” হালকা তিরস্কারের সুরেই বলে বিনয়, “একটা আক্কেল নেই তোমাদের!”

“যার পায়ে সাড় নেই, সে এতগুলো সিঁড়ি নামবে কী করে? এক যদি না…” নিজের মনেই বিড়বিড় করে শতরূপ, “সাড় হয়তো আগেই ফিরেছে। এই কাণ্ডটা করবে বলেই কাউকে জানায়নি…. কিন্তু নীচে নেমে গেল কোথায়?”

কথাটা মাথায় আসতেই পেছন ফিরে তাকায় শতরূপ। সেদিকে সার সার গাছের ঘন জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই নেই। সেই গাছের ফাঁক দিয়ে জঙ্গলের ভিতরের আলো-আঁধারির দিকে চেয়ে থাকে সে। চাপা গলায় বলে, “ঘোড়াপোড়ার গাছটা কোথায় জানেন কেউ?”

বিনয় একটু থতোমতো খায়। জংলু মুহূর্তে উত্তর দেয়, “জঙ্গলের মধ্যেই আছে। কিন্তু আপনি…”

“রাস্তা চেনো তুমি?”

“তা চিনি।”

“এসো আমার সঙ্গে…”

দুজনে মিলে ছুটে যায় জঙ্গলের দিকে। শতরূপের ব্রিফকেসটা পড়ে থাকে সেখানেই। অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সোমা আর বিনয়। ছুটন্ত দেহ দুটো জঙ্গলের ভেতরে ছোট হয়ে আসতে সোমা মৃদুস্বরে বলে, “লোকটা গাছটার কথা জানল কেমন করে বল তো?”

“দিদির খাতাটা পড়েছে…”

“ওঃ, তা-ই বল…”

বিনয়ের ভুরু দুটো কুঁচকে আছে, মুখ না ফিরিয়েই সে বলে, “সেটা পরের কথা, কিন্তু ঘুমের মধ্যে একটা নাম বলছিল লোকটা….”

“নাম! কী নাম!”

অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে এবার সোমার দিকে তাকায় বিনয়— “ইলোরা…”

সোমা চমকে ওঠে, “কিন্তু সে নাম তো…”

বিনয় মুখ না ফিরিয়েই বলে, “তাছাড়া মাথায় চোট পেয়ে সেন্স ছিল না যখন মনে হচ্ছিল কিছু একটা ধরার চেষ্টা করছে, খেয়াল করতে বুঝলাম একটা কাচের জার…”

“কী বলছিস বিনয়…” উত্তেজনার বশে খানিকটা জোরেই বলে ওঠে সোমা।

মুখে আঙুল রেখে শব্দ করে বিনয়, “চুপ, এ নিয়ে একদম কথা নয়…”

*

“তুই এত গুছিয়ে গল্প বলিস কী করে বল তো?”

“এই করেই পেট চলত তাই, না বলতে পারলে খেতাম কী?”

‘রেডিয়োর কাজটা ছেড়ে দিলি কেন?”

শতরূপ আলস্যে পিঠ এলিয়ে দেয় বেতের চেয়ারে— “তোর গল্পগুলো শুনতে চেয়েছিলি, আমার গল্প শুনে কী করবি?”

“কেউ কতটা খারাপ ছিল না জানলে আমি কতটা ভালো ছিলাম, বুঝব কী করে?”

“এই, তোকে কে বলল, আমি খারাপ ছিলাম?” শতরূপ হঠাৎ করেই ফুঁসে ওঠে, “তুই জানিস, আমি দিনে কতগুলো করে প্রোপোজাল পেতাম? কত ফ্যান মেইল আসত?”

“তারপরেও ছেড়ে দিলি সব!”

সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে শতরূপ— “ছোটবেলায় খুব লাজুক ছিলাম, জানিস? নাটক, গান, আবৃত্তি সব কিছু থেকে দূরে থাকতাম। গল্প লিখতাম, কারণ তাতে কারও সামনে গিয়ে কিছু করতে হয় না… অন্ধকারে লুকিয়ে থাকতে থাকতে করা যায়….”

“তারপর?”

“তারপর একদিন হঠাৎ করে একটা আলোর রেখা এসে পড়ল, আমি একটু থতোমতো খেলাম, তারপর আর-একটা রেখা, আবার একটা… আলোয় আলোয় ভরে যেতে লাগল চারপাশ, তখন শালা খেয়াল করলাম, সব কিছুর উপর আলো পড়লে তো চাপ আছে গুরু, সব কিছু লোককে দেখানো যাবে না। তারপর একটুখানি আড়াল করে লুকোতে শুরু করলাম কিছু কিছু জিনিস… সেগুলো ছাড়া বাকি সব আলোয় ভেসে গেল…

“হুম, তারপর?”

“তারপর একসময় মনে হল, সবাই চেয়ে আছে আমার দিকে। আমি যতটুকু দেখিয়েছি, সেটা যথেষ্ট নয়, ওই ঢেকে রাখা জায়গাটাও খুলে দেখাতে হবে তাদের। আমাকে তখন আলোর নেশায় পেয়েছে। আমি হাতের মুঠো খুলে সেগুলোও দেখাতে যাব এমন সময় দেখি…”

“কী?”

দেখি সেগুলো আর নেই… কবে যেন মুঠোর ভেতরে থাকতে থাকতেই বালির মতো খসে পড়ে গেছে। অথচ ওগুলো ছাড়া…”

বিনি আর কোনও প্রশ্ন করে না। একটা অদ্ভুত হাসি হাসে—“আমরা যা কিছু সব থেকে বেশি আগলে রাখতে চাই, সেগুলোই সবার আগে চলে যায়, না?

“তোর স্মৃতি ফিরে এলে তুইও বুঝতে পারবি সেটা।”

“তুই জানিস, এখন সব থেকে বেশি শক্ত করে কী আগলে রাখতে চাই আমি?”

“না।”

“এই রাতটা, তোর মুখ থেকে একটা একটা করে গল্প শুনে চিনব নিজেকে… অথচ দেখ, এটাই সবার আগে চলে যাবে…”

“আরও অসংখ্য রাত আসবে এই বারান্দায়। তার আগে তোর জীবনের গল্প শেষ হয়ে যাবে…”

“সেদিন আমাদের এই রাতগুলোও গল্প হয়ে যাবে, তা-ই না?”

“হ্যাঁ…”

“আচ্ছা ধর… নাঃ, বাদ দে…” হঠাৎ কী বলতে গিয়েও প্রসঙ্গ পালটে ফ্যালে বিনি, “দেখ, আজ আবার একটা আলো এসে পড়েছে তোর উপর…. তুই আবার একজনের জন্য গল্প বলছিস!”

শতরূপ হাসে— “ধুর, কে বলেছে? আমি আলোর মধ্যেই দাঁড়িয়েছিলাম, মনে হচ্ছে, এক টুকরো অন্ধকার এসে পড়েছে হঠাৎ করে। তাতে আমি লুকিয়ে পড়তে পারব। মাঝে মাঝে লুকিয়ে পড়ার লোভ হয় ভীষণ…”

“কেন?”

“ওই যে আমার হাতের মুঠোর অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে থাকতে হারিয়ে গিয়েছিল অনেক কিছু। একদিন আমিও এই অন্ধকারে লুকিয়ে থাকতে থাকতে হারিয়ে যাব…”

“হারিয়ে গিয়ে কী লাভ?”

অবাক, বিরক্ত চোখে চায় শতরূপ, “বলিস কী? পৃথিবী ব্যালেন্সে চলে, কিছু হারিয়ে ফেলে যদি কষ্ট হয় তাহলে নিজে হারিয়ে গিয়ে কী হয়?”

“সুখ…” বিনি ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *