জোনাকির রঙ – ৩

(তৃতীয় অধ্যায়)

রেডিয়োটাকে ঘাসের উপর থেকে তুলে নিয়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যায় বিনি। কী যেন একটা ডাকছে ওখান থেকে। এক্ষুনি অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কী যেন সরে গেল না?

মাদুরের উপর এখনও মা ঘুমিয়ে আছে। বাবা বাড়িতে না থাকলে না মাঝে মাঝেই দুপুরে ওদের এই কটেজে চলে আসে। কটেজের লাগোয়া বাগানটা ভারী সুন্দর। এর মধ্যে অনেকগুলো ফুলের গাছ বিনির নিজের হাতে লাগানো। বাগানে এসে মা-মেয়েতে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে থাকে সারাদুপুর। বিনির যতক্ষণ ভালো লাগে, বসে থাকে, রেডিয়ো শোনে, তারপর উঠে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে। গাছগুলোর মধ্যে ঘুরে, তাদের স্পর্শ করে কী যেন বোঝার চেষ্টা করে। ও ছোট থেকে বিশেষ ছটফটে নয়। একা একা, না হলে গাছেদের মধ্যে থাকতে ভালোবাসে।

একটু দূরে ওদের পোষা কুকুরটা ঘাসের উপরে ঝিমিয়ে রয়েছে। অরেঞ্জ জুস আর কাটা ফলমূলের বাটিটা পড়ে আছে তার পাশেই। শীতের নরম রোদের ওম মেখে ঘুমিয়ে গিয়েছিল বিনি। এমন সময় হঠাৎ করেই কীসের একটা ডাকে যেন চমকে উঠল।

ঘুম ভাঙতে প্রথমে মনে হয়েছিল, রেডিয়ো থেকেই এসেছে শব্দটা। কিন্তু চোখ খুলতেই মনে হল, জঙ্গলের দিক থেকে কে ডাকছিল ওকে, নাম ধরে। কে?

মাদুর থেকে উঠে ছোট ছোট পায়ে সেদিকে এগিয়ে যায় বিনি। এ জঙ্গলে যাওয়া মানা আছে ওর। অন্তত বড় কেউ সঙ্গে না থাকলে জঙ্গলে পা রাখা তো একেবারে অপরাধ। কিন্তু এখন কৌতূহলটা যেন নিষেধের ভয়ের থেকে বেশি চেপে ধরেছে।

জঙ্গলের প্রান্তরেখার কাছে এসে দাঁড়িয়ে দুটো দিক ভালো করে দ্যাখে বিনি। তারপর ঢুকে আসে গাছপালার সারের মধ্যে দিয়ে। একটা পুরোনো গান চলছে রেডিয়োতে, ভাষাটা বিনি জানে না। সম্ভবত ইটালিয়ান কিংবা স্প্যানিশ, ভারী নরম আর মজাদার সুর। ওর বাবা এসব গান শুনতে পছন্দ করে। বিনির সুরটা ভালো লাগে, তবে কথাগুলো বুঝতে পারে না। রেডিয়ো জিনিসটা ভারী প্রিয় ওর।

ওর অস্থির চোখ দুটো ঘুরে বেড়াতে থাকে জঙ্গলের আনাচকানাচে। কাকে যেন খুঁজতে থাকে। কে ডাকল ওকে? ডেকেই লুকিয়ে পড়েছে নাকি? লুকোচুরি খেলতে চায় ওর সঙ্গে?

কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত হয়ে এক জায়গায় বসে পড়ে। চারদিকে একবার গোল করে তাকিয়ে নেয়। কখন যেন অজান্তেই জঙ্গলের বেশ খানিকটা ভেতরে ঢুকে এসেছে। দিনের বেলা আগে কখনও আসেনি এখানে। অবশ্য রাস্তা চিনে বেরোনো এমন কিছু কঠিন নয়।

বড় করে নিশ্বাস নিতে থাকে বিনি। আর অমনি একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে চমকে ওঠে। ওর মনে হয়, জঙ্গলের ভেতরে যেন একটা বিরাট মাপের ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। কুচকুচে কালো একটা ঘোড়া। মাথায় শিং গোছের কী যেন গজিয়েছে! এত্ত বড় ঘোড়া! বিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়।

চোখ রগড়ে ভালো করে সেদিকে তাকিয়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অজান্তেই হেসে ফ্যালে সে। ঘোড়া নয়, একটা গাছ। তার ডাল আর সুতোগুলো এমনভাবেই এলোমেলো হয়ে পাকিয়েছে যে একটা দাঁড়িয়ে-থাকা ঘোড়ার মতো দেখাচ্ছে গাছটাকে। কাণ্ডের রং আবলুশ কাঠের মতো কালো। মজাদার গাছ তো! এমন গাছ জঙ্গলে আর একটাও নেই।

সেদিকে এগিয়ে যায় বিনি। টিভি-তে অনেকবার ঘোড়া দেখেছে সে। মায়ের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে চেপেওছে। কিন্তু সে ঘোড়া কেমন যেন খেলনা গোছের। তার সারা গা রংচঙে কাপড় দিয়ে ঢাকা। এই ঘোড়াটা একদম দৈত্যের মতো। এর সঙ্গে তাদের তুলনাই চলে না।

ওর মনে হয় গাছটা আদৌ গাছ নয়, একটা রূপকথার ঘোড়া। কোন এককালে এসে দাঁড়িয়েছিল এই জঙ্গলে। হঠাৎই তার মাথায় একটা বাজ পড়ে মরে গিয়ে গাছে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ঘোড়াটা তো এমনি এমনি এই জঙ্গলে আসেনি। নিশ্চয়ই ওটাকে চালিয়ে এনেছিল কেউ। এদিকে ঘোড়ার উপরে কেউ বসে নেই। তাহলে ঘোড়সওয়ার গেল কোথায়?

সঙ্গে সঙ্গে ভাবনাটা মাথায় আসে বিনির। ঘোড়াটা যার, সে হয়তো এখানে এসে ঘোড়াটাকে বেঁধে কিছু একটা কাজে গিয়েছিল। তার মধ্যেই বাজ পড়ে ঘোড়াটা গাছ হয়ে যাওয়ায় সে আর নিজের ঘরে ফিরতে পারেনি। এই জঙ্গলেই রয়ে গেছে।

বিনির বুকের কাছটা ছমছম করে ওঠে। লোকটা কি এখনও এখানে আছে? ওর দাদু ওকে বলেছিল হেডলেস হর্সম্যানের কথা। মুণ্ডুকাটা একটা ঘোড়সওয়ার নাকি গভীর রাতে ঘুরে বেড়ায় জঙ্গলে। মানুষজন দেখতে পেলে তার বুকে বর্ষা বিধিয়ে তাকেও তুলে নেয় ঘোড়ার উপরে। তবে কি সেই লোকটাই? চারপাশে তাকিয়ে কাণ্ডের আরেকটু কাছে এসে দাঁড়ায় সে।

বেলা অনেকটা গড়িয়ে গেছে। জঙ্গলের বাইরেটায় ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ, কিন্তু ভেতরটা এখনও ঢেকে আছে হালকা কুয়াশার চাদরে। কিছুটা দূর দিয়ে কেউ হেঁটে চলে গেলে তার মুখ ভালো করে দেখা যাবে না।

বিনির মনে হয়, সেই কুয়াশার ভেতর দিয়ে কেউ এগিয়ে আসছে ওর দিকে। ডালপালার উপর পায়ের শব্দ হয়।

“কে? কে আছে ওখানে?”

জোরে কথাটা ছুড়ে দিয়ে দু-পা পিছিয়ে আসতে যাচ্ছিল এমন সময় হঠাৎ করেই মনে হয়, পাশে পড়ে-থাকা রেডিয়োর ভেতর থেকে গানের বদলে একটা শব্দ আসছে। ঠিক শব্দ নয়, কেউ ডাকছে ওকে।

মাটিতে বসে পড়ে রেডিয়োটার কাছে কান নিয়ে যায় বিনি। শিরশিরে গলায় ডাক ভেসে আসে, “আমি ডাকছি। কিন্তু ওখানে নয়, এখানে…”

কথাটা ওকেই বলা হচ্ছে কি না, সেটা নিশ্চিত হতে পারে না বিনি। রেডিয়োর আরও কাছে কান নিয়ে গিয়ে আরও মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করে, ঘড়ঘড় শব্দ আসছে ভেতরে থেকে।

“বিনি…”

“কে? কে ডাকছে আমাকে?”

“আমি। কিন্তু আমার তো কোনও নাম নেই। কী বলব বলো দেখি?”

“ধুর, নাম ছাড়া আবার কিছু হয় নাকি?”

“হয় না? আচ্ছা ধরো, যে গাছটার পাশে তুমি দাঁড়িয়ে আছ, সেটার নাম জানো?”

বিনি বোঝে, মেয়েটা ওকে কথায় হারিয়ে দিতে চাইছে। জেদ করে সে মুখ ফিরিয়ে বলে, “জানি তো, ওটা ঘোড়াপোড়ার গাছ। কেন, তুমি জানো না?”

“তা-ই বুঝি? তাহলে আমার নাম ধরো পুনা…”

“কিন্তু কে তুমি? আর রেডিয়োর মধ্যে থেকে কী করে কথা বলছ?”

“সেসব কথা পরে হবে। আগে শোনো, তোমাকে একটা সিক্রেট বলি?”

“সিক্রেট! আচ্ছা বলো।”

পুনার গলাটা নিবে আসে, যেন আশপাশে কেউ আছে কি না, সেটা আর-একবার নিশ্চিত করে নেয় সে, “যে গাছটার পাশে তুমি দাঁড়িয়ে আছ, তার নীচে এক জায়গায় একটা জিনিস লুকোনো আছে।”

“লুকোনো আছে! কী জিনিস? আর কে লুকিয়েছে?”

প্রশ্নটা করেই উত্তরটা খেলে যায় বিনির মাথায় সেই লোকটা যে ঘোড়া থেকে নেমে কিছু একটা কাজে গিয়েছিল। তার মানে জঙ্গলের ভেতর কিছু একটা লুকিয়ে ফেলতে এসেছিল সে।

“ও মা! কী জিনিস, সেটা বলব কেন?” পুনা ছলনার স্বরে জবাব দেয়, “আমি শুধু সিক্রেটটা বললাম। এবার তুমি নিজেই বের করে দেখে নাও।”

“আমি কী করে বের করব? আমার গায়ে অত জোর আছে নাকি? তা ছাড়া তুমি এসব কথা আমাকে বলছ কেন?”

“কারণ আমার তোমাকে ভালো লেগেছে খুব।”

“তুমি চেনো আমাকে?”

“অনেকদিন থেকে চিনি। কেবল তুমি জানো না।”

রেডিয়োর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে গাছটার অপর পিঠে হেলান দিয়ে বসে পড়ে বিনি— “আমার বাবার কাছে একটা কোদাল আছে। সেটা চাইলে জোগাড়ও করতে পারি। কিন্তু আমি একা কী করে মাটি খুঁড়ব?”

“একা কেন? আমিও হাত লাগাব তোমার সঙ্গে। আমার গায়ে কিন্তু অনেক জোর…”

“কিন্তু তোমাকে তো দেখতেই পাচ্ছি না…”

“আগে তুমি কোদাল নিয়ে তো এসো। আমি ঠিক চলে আসব।”

“কিন্তু তুমি কী করে জানলে, এখানে রাখা আছে জিনিসটা?”

“কারণ যে লোকটা ওটা রেখেছিল, তাকে আমি চিনতাম।”

আবার বিনির চামড়ার উপরে একটা শিরশিরানি খেলে যায়। এই মেয়েটা চিনত তাকে? নাকি এ নিজেই সেই লোকটা? পুনাই তবে সেই হেডলেস হর্সম্যান? কিন্তু গলা শুনে তো তেমন ভয়ংকর কিছু মনে হয় না। যদিও বলল গায়ে নাকি অনেক জোর। তাহলে ও নিজেই এসে মাটি খুঁড়ে জিনিসটা তুলে নিচ্ছে না কেন?

“তুমি রেখেছিলে! কিন্তু কে তুমি?”

“এখনও বুঝলে না? আমি তোমার বন্ধু।”

“আমার বন্ধু! আমি তো তোমাকে দেখিনি! বন্ধু হব কী করে?”

“বন্ধু হতে গেলে কি দেখতে হয়?”

“তাহলে কী লাগে বন্ধু হতে গেলে?”

থমথমে গলায় বলে পুনা, “বন্ধু হতে গেলে লাগে সিক্রেট। দুজন দুজনকে যে-কোনও একটা গোপন কথা বলে দিলেই দুজন বন্ধু হয়ে যায়। তোমাকে একটা সিক্রেট বলেছি আমি, এবার তুমি বলো আমাকে?”

“আমার আবার কীসের সিক্রেট! ধুর, ওসব নেই আমার।”

এবার যেন একটু মিহি হাসি হাসে পুনা, তারপর বলে, “এই পৃথিবীতে সবার সিক্রেট আছে, বিনি। অন্য কিছু না থাক, একটা তো থাকবেই…”

“কোনটা?”

“দুঃখ। কোন জিনিসটা তোমাকে সব থেকে বেশি দুঃখ দেয়, বিনি?” হঠাৎ করেই চুপ করে যায় বিনি। ওর ঘর্মাক্ত মুখের উপর চুল এসে পড়েছিল। সেগুলো সরিয়ে নিয়ে বলে, “ওসব আমিও লুকিয়ে রেখেছি কোথাও একটা। তুমি পারলে খুঁড়ে বার করে নাও…”

“আচ্ছা নেব, তুমি সাহায্য করবে তো?”

অদৃশ্য মেয়েটার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় বিনির। ভারী মিষ্টি গলা পুনার। বিনি যতটা বলে, ততটাই শুনে যায় চুপ করে। খুব বেশি জানতে চায় না। মা-বাবা, ডাক্তার লোকটা আর অন্যরা সারাক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ওর থেকে সব কিছু জেনে নিতে চায়, বুঝে নিতে চায় ওর হৃদয়ের আনাচকানাচ। মিথ্যের ভিড় থেকে সত্যিটাকে কাঁটাচামচ দিয়ে তুলে আনতে চায়। কিন্তু পুনা চায় না। যেন ওর কাছে সত্যি-মিথ্যে বলে আলাদা কিছু নেই। কেবল আছে গল্প।

“আচ্ছা, কিন্তু একটা কথা।” রেডিয়োর চিন্তিত স্বর ভেসে আসে। “কী কথা?”

“আমি যে তোকে আমার সিক্রেটগুলো বলছি, তুই অন্য কাউকে বলবি না তো?”

“যদি তুই আমারগুলো না বলিস তাহলে আমিও বলব না।” রেডিয়োর দিকে ফিরেই উত্তরটা দেয় বিনি।

“ধুর, আমি তো আর কাউকে চিনিও না যে বলব। কিন্তু তোকে নিয়েই চিন্তা হয়…”

“কীসের চিন্তা?”

“তুই যদি আমার কথা ভুলে যাস? আবার বন্ধুত্ব করার মতো সিক্রেট আমি কোথায় পাব?”

“আচ্ছা বেশ। আমি তোর কথা লিখে রাখব।”

“কোথায় লিখে রাখবি?”

“আমার খাতায়, মা আমাকে যে খাতাটা দিয়েছে, ওটায় আমি সব লিখে রাখি।”

“ধুর, খাতা তো হারিয়ে যেতে পারে। তখন কী হবে?”

“তাহলে উপায়?”

কিছুক্ষণ ধরে একটা ঘড়ঘড়ে শব্দ আসে রেডিয়ো থেকে। তারপর হঠাৎই উচ্ছ্বসিত গলা শোনা যায়, “আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে রে বিনি, কিন্তু তার আগে বল, দুঃখ হলে তোর কী করতে ইচ্ছা করে?”

কিছুক্ষণ ভাবে বিনি, তারপর বলে, “শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করে। দুঃখ হলে আমি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ি। তারপর সোজা হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি।”

“তাকিয়ে তাকিয়ে কী ইচ্ছা করে?”

বিনি ঠোঁট কামড়ে কী যেন ভেবে বলে, “আমার ছাদে প্লাস্টিকের চাঁদ-তারা লাগিয়ে দিয়েছে মা। রাত্রিবেলা ওগুলো নীল হয়ে জ্বলে। ইচ্ছা হলে খুলে নেওয়া যায়। দুঃখ হলে ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার চাঁদ-তারা-সূর্য সব ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে…. কুটিকুটি করে ফেলতে ইচ্ছা করে।”

এবার পুনার গলার উচ্ছ্বাস আরও বেড়ে ওঠে, “বেশ, তাহলে ওর তলাতেই লিখে রাখবি।”

“কী লিখে রাখব?”

“আমার নাম, এই ঘোড়াপোড়া গাছের ঠিকানা, আর আমাদের কথা।”

“তাতে কী লাভ হবে?”

আবার সেই নরম হাসিটা হাসে পুনা— “আমাদের জীবনে ভবিষ্যতে আর কিছু থাক-না থাক, ওইটা থাকবেই, দুঃখ। আমার কথা যদি ভুলে যাস আর তারপর যদি তেমন তেমন দুঃখ হয় তাহলে আর থাকতে না পেরে অজান্তেই ছিঁড়ে ফেলবি চাঁদ-তারাগুলো। তাহলেই জানতে পারবি আমার কথা। দুঃখই তোকে নিয়ে আসবে আমার কাছে…”

“আমি ছুটে চলে আসব এই গাছটার সামনে। তুই থাকবি তো?”

“থাকব।”

খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে বিনি, আইডিয়াটা পছন্দ হয় তার, তার থেকে বেশি পছন্দ হয়েছে পুনাকে। হোক-না সে অদৃশ্য, হোক-না সে রেডিয়োর ভেতর থেকে কথা বলে, তা-ও পুনাই এখন ওর একমাত্র বন্ধু। সে খুশি-মাখানো গলায় বলে, “আমি আজই গিয়ে লিখে ফেলব।”

“বেশ, আর শোন। আজই রাত্রিবেলা কোদালটা নিয়ে আসিস এই গাছটার সামনে। বাড়ি থেকে বেরোতে পারবি তো?”

“বেরোনো বারণ আছে। ও আমি ঠিক চলে আসব, তুই চিন্তা করিস না।”

“আজ দুজনে মিলে মাটি খুঁড়ে ওইটা তুলে আনব।”

“ঠিক আছে। কিন্তু তুই যে আসবি তা কী করে জানব? তোকে তো দেখতেই পাচ্ছি না…”

“যেমন করে এখন এসেছি, তেমন করেই তখন আসব…”

কয়েক সেকেন্ড কোনও উত্তর দেয় না বিনি, তারপর ধরা গলায় বলে, “এখন এসেছিস! কোথায়?”

“তোর ঠিক পেছনে তাকা, এদিকে….”

*

মুহূর্তে পেছনের দিকে ফেরে মেয়েটা। একটা ঠান্ডা অনুভূতি ওর কানের পাশ দিয়ে বয়ে যায়। পেছন থেকে একটা হাত এসে পড়ে ঐন্দ্রিলার কাঁধে। কে যেন মজাদার ছন্দে মনে করে করে একটা ছড়া পড়ছে—

দুঃখের ডাক্তার ছিল এক মস্ত
রাত হলে বাতি জ্বেলে চেম্বারে বসত
দুঃখের কারবারে জ্ঞান তার অল্প…

“তারপর কী যেন….” লোকটা থুতনিতে হাত রেখে একটু ভাবে। ঐন্দ্রিলার মুখ থেকে অজান্তেই পরের লাইনটা বেরিয়ে আসে, “শুধু মন দিয়ে শুনত সে দুঃখের গল্প। এই কবিতাটা…”

“চেনা-চেনা লাগছে তো? সব ভুলে মেরে দিয়েছিস…”

“আপনাকে তো ঠিক আমি…”

“রূপ। আর এ কবিতাটা তোর নিজের লেখা।”

“কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?”

জংলু এগিয়ে এসে একগাল হেসে বলে, “তোমার ছোটবেলার বন্ধু। আজ সকালে বললাম না আসবে? তোমার কী আক্কেল বলো তো দিদি। এভাবে কেউ জঙ্গলের মধ্যে চলে আসে?”

ঐন্দ্রিলা কথাটার উত্তর দেয় না। দুজনের কারও দিকে না তাকিয়েই গাছের দিকে সরে আসে। আশপাশের মাটির মধ্যে কী যেন খুঁজতে থাকে। জংল অবাক হয়ে তাকায় ওর দিকে।

“যেটা খুঁজছিস, সেটা পাবি না ওখানে, ও জিনিস অনেক আগেই তুলে ফেলা হয়েছে। তারপর গর্তটাও বুজে গেছে এতদিনে।”

“আমি কী খুঁজছি, আপনি জানেন?”

“উঁহু, তবে ওখানে যে কিছু একটা লুকোনো ছিল, সেটা তুই আগে বলেছিস আমায়। একদিন রাতে পুনার সঙ্গে এখানে এসে…”

জংলুর দিকে ইশারা করে ইচ্ছা করেই বাকি কথাটা শেষ করে না শতরূপ। একবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “তার চেয়ে আপাতত চল এখান থেকে। আমার তোকে কিছু দেখানোর আছে।”

ঐন্দ্রিলা আর বাক্যব্যয় করে না। শতরূপ এতক্ষণে বুঝেছে, সে বেশি কথা বলতে পছন্দ করে না। নিজের জীবন সম্পর্কে প্রায় কোনও তথ্যই নেই তার কাছে। ফলে এখন সে কেবল সেইটুকুই উদ্ধার করতে চায়।

জংলুর পেছন পেছন ওরা দুজনে বেরিয়ে এল জঙ্গলের বাইরে। এতক্ষণে ঐন্দ্রিলাকে ভালো করে লক্ষ করার সুযোগ পায় শতরূপ। বয়সের তুলনায় একটু বেশি গম্ভীর চেহারা তার, এই মুহূর্তে গায়ে একটা সাদা রঙের শার্ট আর নীলচে ট্রাউজার। গায়ের রং ফরসার দিকে, চামড়ার উপর আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে। আদুরে নরম মুখ। তার মাঝখানে বড় উজ্জ্বল চোখ দুটো কেমন বেখাপ্পা দেখায়। যেন অন্য কোনও মুখের জন্য তৈরি করা হয়েছিল চোখ দুটো। ভুল করে এই মুখে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মণি দুটোর দিকে একঝলক দেখে নেয় শতরূপ। ঠিক কালো নয় রংটা, কিছুটা ছাইয়ের মতো রং। তবে ভীষণ রকমের স্থির। এদিক-ওদিক তাকালেও যেন প্রায় নড়াচড়া করে না তারা।

“কলকাতায় থাকতে খুব মনে পড়ত তোর কথা।” শতরূপ সামনে হাঁটতে হাঁটতে বলে। ঐন্দ্রিলা উত্তর দেয় না। কেবল মুখ টিপে হাসে।

“তুই হঠাৎ করে ছাদ ডিঙিয়ে পড়ে গেলি কেন বল তো? ওখানে করছিলিটা কী?”

“আমার কিছু মনে নেই।” আলতো গলায় বলে মেয়েটা।

“আমার মনে আছে, ছোটবেলায় তুই ওরকম করে বসতিস ছাদের পাঁচিলে। নীচ থেকে মামাবাবু বকা দিত। তুই কিছুতেই নামতে চাইতিস না। বলতিস…”

একটু থেমে শতরূপ বোঝার চেষ্টা করে নিজের গল্প জানতে মেয়েটার আগ্রহ কতটা। ঐন্দ্রিলা যেমনভাবে হাঁটছিল, তেমনই হাঁটতে থাকে। বিশেষ কিছু পার্থক্য বোঝা যায় না।

“তোমার ব্যাগপত্র সব ঘরে নিয়ে গেছে।” তিনজনে এতক্ষণে বেরিয়ে এসেছে জঙ্গল থেকে। জংলু শতরূপের দিকে চেয়ে বলে কথাটা। গাড়িটা এখন আর আগের জায়গায় নেই। দূরে সোমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। ওদের দেখতে পেয়ে সে এগিয়ে এল কিছুটা।

একটু অস্বস্তি হয় শতরূপের। এখানে এসে বাকি লোকজনের সঙ্গে খানিকটা আলাপ-পরিচয় সেরে নেওয়া উচিত ছিল। এখন ঐন্দ্রিলার সামনে এদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বেফাঁস কিছু বলে ফেললে মুশকিল হবে।

“আমাকে একটু স্নান করতে হবে, বুঝলে?” কথাটা বলে জংলুদের ছেড়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায় শতরূপ। বাড়ির সামনের অংশটার উপর ছেঁড়া-ছেঁড়া রোদ এসে পড়েছে। সেই রোদ মাঝে মাঝে খেলা করে যাচ্ছে ওর মুখের উপরে।

সোমার পাশে এসে একগাল হাসে শতরূপ— “আমার আগে আপনাদের সঙ্গে একটু পরিচয় হওয়া দরকার। ততক্ষণ ঐন্দ্রিলাকে অন্য কোথাও সরিয়ে রাখলে…”

“তাতে অসুবিধা নেই। ও এখন ঘরেই থাকবে। ছিটকিনি তুলে দেব না হয়।”

“উহু, ঘরে নয়, অন্য কোথাও রাখুন। আমার একটা জিনিস দেখার আছে ঘরে।”

“আচ্ছা বেশ। আপনি আমার সঙ্গে আসুন। ভেতরটা দেখিয়ে দিচ্ছি আপনাকে।”

একটু থেমে যায় শতরূপ, তারপর আবার হাঁটতে হাঁটতে বলে, “ওকে ছোটবেলা থেকে চিনত এরকম কেউ নেই? শুধু ডায়েরি পড়ে সুবিধা হবে বলে তো মনে হচ্ছে না।”

সোমা হতাশ হয়ে ঘাড় নাড়ে, “সেরকম কেউ নেই। ওর মা-বাবার খোঁজ জানি না আমরা। ওদের বাড়ির কাছে কয়েকজন ওকে চেনে কিন্তু তাদের সঙ্গে এখন যোগাযোগ করা মানা আছে… তবে ডাক্তার মুখার্জি ওদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান। তিনি ওকে ছোট থেকে দেখছেন। কদ্দূর কী জানেন, বলতে পারব না…”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে শতরূপ, “আপনাদের বিরক্ত লাগে না?”

“কীসের বিরক্তি?”

“এই ধরুন একটা পয়সাওয়ালা বাপের দামড়া মেয়ের ন্যানি হয়ে থাকতে?”

চাপা হাসি হাসে সোমা–”ন্যানি হওয়ার দক্ষিণাটা যে কম নয় তা তো আপনিও জানেন…”

“জানি বলেই একটা ব্যাপার মনে হচ্ছে।”

“কী?”

“আশিসবাবুর ভাইঝির প্রতি তেমন ভালোবাসা-টাসা আছে বলে তো মনে হয় না। শহর থেকে দূরে এককাঁড়ি পয়সা খরচ করে এতগুলো লোক দিয়ে কোনওরকমে টিকিয়ে রেখেছেন। কারণ কী বলুন তো?”

কাঁধ ঝাঁকায় সোমা, “তা বলতে পারব না। তবে হ্যাঁ, আমি যদ্দূর বুঝছি, ওই তেরো বছর বয়স থেকে স্যার দায়িত্ব নেওয়ার পরে বিনির খাতিরযত্নের অভাব হয়নি। তার আগে অবধি ওর বাপ-মা সুবিধের ছিল না। আগেও দেখাশোনার লোক ছিল। কী একটা ঘটনার পর স্যার সবাইকেই বিদেয় করে দেন। আমরা আছি ধরুন এই বছরখানেক হবে।”

“তার মধ্যে ওই চারবার আত্মহত্যার চেষ্টা?”

এবার একটু গলাখাঁকারি দেয় সোমা, তারপর হাতের আঙুল মটকাতে মটকাতে বলে, “আত্মহত্যার চেষ্টা লোকে বলে বটে কিন্তু আমার কিন্তু মনে হয় না।”

“তাহলে আপনার কী মনে হয়?”

“মানে ধরুন শেষ যেবার বিনি ছাদ থেকে ঝাঁপ দিল, সেদিন সকালে বেশ হাসিখুশি ছিল। বিকেলে জঙ্গলের দিক থেকে একবার ঘুরে আসবে বলছিল। গল্পের বই পড়ছিল। মানে বলতে চাইছি, তখনও ঠিক করেনি যে বিকেলে অমন কিছু চেষ্টা করবে। এমনকি সকালে আমি বেরোনোর সময় দেখি, বিনি ছাদে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে কী একটা গল্পের বই পড়ছে। তার মিনিটখানেক পরেই ঝাঁপ দেয়।”

“বই পড়তে পড়তে হয়তো খারাপ খবর এসেছিল কিছু।”

“খারাপ খবর কোথা থেকে আসবে? দিদির ফোন ছিল নীচে। আর তাতে ফোন আসে বলতে স্যারের, আর আমাদের মধ্যে কেউ বাইরে গেলে তার। হঠাৎ করে কথা নেই বার্তা নেই কেউ ঝাঁপ মারবে কেন বলুন তো?” একটু ভাবে শতরূপ, তারপর বলে, “আপনি শিয়োর, হাতে যেটা ছিল, সেটা বই? ডায়েরিগুলোর মধ্যে একটা নয়? নিজের জীবনের কথা পড়তে পড়তে ডিপ্রেস্ড হয়ে…”

“ডায়েরিগুলো ছ-মাস হল এখানে নেই। স্যারই সরিয়ে নিয়ে গেছেন….”

“সে কী! ঐন্দ্রিলা আপত্তি করেনি?”

সোমা দু-দিকে ঘাড় নাড়ে। হতাশ গলায় বলে, “এক বছর আগে থেকেই মনে হচ্ছিল, বিনি হাল ছেড়ে দিচ্ছে। তখন থেকে কিছুই আর নিজের কাছে রাখতে চাইত না। কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলতে চাইত না। ডায়েরিগুলো এত প্রিয় ছিল, কিন্তু নিয়ে যাওয়া হল যখন, ফিরেও তাকায়নি।”

বাড়ির সদর দরজার কাছে এসে পড়েছিল দুজনে। এমন সময় পেছন থেকে মিহি গলা শোনা গেল, “শুনছেন?”

পেছন ফিরে শতরূপ দ্যাখে, ঐন্দ্রিলা প্রায় মিটারখানেকের মধ্যে এসে পড়েছে তার, ওকেই ডাকছে।

“হ্যাঁ, বল…”

“আমি কী বলতাম?”

“মানে?”

“ছাদের পাঁচিলে বসে কী বলতাম আমি?”

শতরূপ এবার হেসে ফ্যালে, “এতক্ষণ পরে মনে পড়ল!”

“এতক্ষণ মনে করার চেষ্টা করছিলাম, মনে পড়ল না। কবিতাটা মনে পড়ল কিন্তু এটা ভুলে গেছি একদম। কী বলতাম?”

“নীচ থেকে বকলে তুই হেসে বলতিস, নীচে পড়ে গেলেও তোর কোনও ক্ষতি হবে না। কারণ তুই একটা মন্ত্র জানিস। মন্ত্রটা মনে আছে না বলে দেব?”

সোমা একটু গা-ঝাড়া দেয়। এখন শতরূপ ঐন্দ্রিলার সঙ্গে যত কম কথা বলে, ততই ভালো। একরকম জোর করেই তাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে আসে সোমা। জংলু ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে বাগানের গাছে জল দিতে যায়। সোমা ফিশফিশ করে বলে, “আপাতত বিনির ঘর মিনিট পনেরোর মতো খালি পাবেন। গাছ নিয়ে পড়লে আর ওর সময়ের হিসেব থাকে না। যা জানার তাড়াতাড়ি দেখে নেবেন, চলুন আমার সঙ্গে।”

সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসে দুজনে। একটা বড় প্যাসেজ পেরিয়ে তিনটে ঘরের দরজা। তার মধ্যে একেবারে শেষের ঘরটা ঐন্দ্রিলার। সেইটার সামনে এসেই ঘরের দরজার উপরে ঠেলা দেয় সোমা। ভেজানো দরজা দ্রুত খুলে যায়।

“যান, আমি বাইরে আছি… দেরি করবেন না।” ভেতরের দিকে ইশারা করে বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে সোমা।

ঘরের ভেতরে ঢুকে আসে শতরূপ। চারপাশটা দেখার সময় নেই। সটান উপরের দেওয়ালে তাকায় সে। মসৃণ দেওয়ালের উপর ফুটে রয়েছে ইঞ্চি পাঁচেক ব্যাসের একটা চাঁদ আর ছোট ছোট কিছু তারা। দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে আছে সব ক-টা। এখন ঘরের ভেতর দিনের আলো আছে বলে জ্বলছে না।

ছোট লাফে বিছানার উপরে উঠে উঁচুতে তাকায় শতরূপ। হাত রাখে চাঁদটার উপরে। মৃদু চাপ দিয়ে সেটা তুলে আনার চেষ্টা করে। খানিকটা শক্তি প্রয়োগ করতে খুলে আসে চাঁদটা। দেওয়ালের গায়ে সরু সরু কালি দিয়ে কিছু লেখা আছে। বোঝা যায়, টুল বা চেয়ারের উপরে উঠে লেখা বলে শব্দগুলো অস্পষ্ট। পড়তে সময় লাগবে। পকেট থেকে ফোন বের করে ছবি তুলে নেয় শতরূপ।

নেমেই আসতে যাচ্ছিল। এমন সময় কী মনে হতে বাকি তারাগুলোর দিকেও তাকায় সে। চোখে পড়ে, অন্য তারাগুলোর থেকে একটা তারা একটু বড়। তা ছাড়া সেটা লাগানো হয়েছে বাকি তারাগুলোর থেকে দূরে। কৌতূহলের বশেই তার উপরে হাত রাখে শতরূপ। আগের মতোই মৃদু চাপ দেয়। তবে সহজে খুলে আসে না এটা। বোঝা যায়, দীর্ঘদিন তোলা হয়নি তারাটা। দাঁতে দাঁত চেপে বেশ কিছুটা চাপ দেওয়ার পরে দেওয়াল থেকে উঠে আসে তারাটা। অজান্তে কখন সেটা শতরূপের হাত থেকে খসে পড়ে যায়, সে নিজেই বুঝতে পারে না।

“আমার কথা যদি ভুলে যাস আর তারপর যদি তেমন তেমন দুঃখ হয় তাহলে আর থাকতে না পেরে অজান্তেই ছিঁড়ে ফেলবি চাঁদ-তারাগুলো। তাহলেই জানতে পারবি আমার কথা। দুঃখই তোকে নিয়ে আসবে আমার কাছে…” –কথাগুলো বারবার বাজতে থাকে শতরূপের কানে। অবাক হয়ে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তারার নীচে কোনও লেখা নেই। আঁকা আছে একটা ছবি। কাঁপা-কাঁপা হাতে একটা মুখ এঁকেছে কেউ। অন্ধকার কালো বীভৎস একটা মুখ। যেন কালচে রেখা নরকের শয়তানকে আঁকতে চেয়েছে কেউ…

*

বইটা বন্ধ করে নামিয়ে রাখে শতরূপ। বিনি চোখ বুজে আছে কিন্তু ঘুমোয়নি। এতক্ষণ পড়তে পড়তে ওর গলার ভেতরটা শুকিয়ে গিয়েছিল। বোতল থেকে এক ঢোঁক জল খেয়ে বলল, “আমার কেমন মনে হয় অ্যালিসের সঙ্গে কোথায় যেন মিল আছে তোর।”

“আমার! কোথায়?”

“মানে ওই আর কী, দুজনেরই জীবনে তেমন কোনও ক্রাইসিস নেই। কান্নাকাটির কারণ নেই। অথচ কী একটা যেন নেই। কোথায় যেন সেটার খোঁজ করে চলেছিস সারাক্ষণ!”

“ওরকম একটা খরগোশের গর্ত কোথায় পাওয়া যায় বল তো?”

“কী হবে পেয়ে? এখানে তোর এত কিছু আছে, সব ছেড়ে যাবি কোথায়?”

“কলকাতাতেও তোর সব কিছু ছিল, তা-ও চলে এলি যে…”

শতরূপ কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই ঐন্দ্রিলা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে, “তুই সব থেকে বেশি মিস করিস কাকে?”

“নিজেকে, একটা পুরোনো আমিকে….

বিনি দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে, “আমার মনে করার মতো একটা পুরোনো আমি নেই। এমনকি মা-বাবার কথাও… মা-বাবা আমার সঙ্গে থাকে না কেন বল তো? এত বড় অ্যাক্সিডেন্ট হল, একবার দেখতেও এল না…”

“বিদেশ থেকে এখানে আসা তো সোজা কথা নয়, তা ছাড়া তোর অ্যাক্সিডেন্টের কথা জানানো হয়নি ওদের।”

“কেন?”

“হয়তো বেশি দুশ্চিন্তা করবেন। বড়লোকের একমাত্র মেয়ে তো… আতুপুতু করে একটু বেশি আদরে মানুষ হয়েছিস….”

“ওরা আমাকে ছেড়ে যখন বিদেশ চলে যায়, তখন কান্নাকাটি করেনি আমার জন্য?”

শতরূপ কাঁধ ঝাঁকায়, “কী জানি, আমি সেদিন ছিলাম না এখানে। ইচ্ছা করেই ছিলাম না, বড়রা কান্নাকাটি করলে কেন জানি না একদম নিতে পারি না।”

“খুব কাঁদছিল ওরা, তা-ই না?”

“স্বাভাবিক, তুই এমনই একটা মানুষ, যাকে সহজে ছেড়ে যাওয়া যায় না।”

হঠাৎ নিজের চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বিনি— “সত্যি বলছিস তুই? ঠিক তো? আমাকে ছেড়ে যাওয়া যায় না?”

“সত্যি…”

“আর তুই?”

“আমি কী?”

“তোকে ছেড়ে চলে যাওয়া যায়?”

একটা পায়ের উপর আর-একটা পা তুলে বসে শতরূপ— “কী জানি, যারা ছেড়ে চলে গেছে, তারা বলতে পারবে, কতটা অসুবিধা হয়েছে…”

“আমাদের দুজনকে ছেড়ে যাওয়াই খুব কঠিন…” যেন কথাটা এইমাত্র কোনও খবরের বিজ্ঞাপনের পাতায় ছাপা দেখেছে বিনি। চেয়ারটা আর-একটু টেনে আনে ওর দিকে। ফিশফিশে গলায় বলে, “কত লোক এখন চোখে জল নিয়ে হন্যে হয়ে এই বারান্দাটার খোঁজ করছে, না রে?”

বাইরের অন্ধকারে জ্বলন্ত জোনাকিগুলোর দিকে চেয়ে থাকে শতরূপ- “হয়তো…”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *