(চতুর্থ অধ্যায়)
কোথাও একটা শিশু জন্ম নিচ্ছে। আমি তার চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। আমি তার মায়ের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি। আমি শুনতে পাচ্ছি, সেই শিশুটা ভুলে যাচ্ছে তার মায়ের চিৎকারের কথা।
তারপর শিশু বড় হল, জীবন চিনতে শিখল, জীবনকে ঘৃণা করতে শিখল। তারপর সে চিৎকার করতে থাকল, আর্তনাদ করতে থাকল। এবার তার মা ভুলে গেল তার চিৎকারের কথা। তার মা শিশু হতে হতে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলল, বোধশক্তি হারিয়ে ফেলল। তারপর শিশু জন্মের বিপরীতে এগিয়ে গেল। কেবল আমি শুনতে পেলাম, সমান গর্ভযন্ত্রণা সেই শিশুকেও গ্রাস করছে।
আচ্ছা, মা ছাড়া আর কেউ কি জন্ম দিতে পারে না? বন্ধুরা, বাবা, প্রেমিক-প্রেমিকা? আমাদের জন্ম দেওয়ার যন্ত্রণা এরাও কি পায় না মাঝে মাঝে? তারপরে এরাও একদিন শিশু হয়ে বধির হয়ে যায়, বোধশক্তি হারিয়ে ফ্যালে। আমি আমার চোখের সামনে আমার সব জননীকে জন্ম নিতে দেখেছি।
মাঝে মাঝে মনে হয় আমার এই ঘরটা মায়ের গর্ভ। অন্ধকার দিয়ে ঢেকে রাখে ঘরটা আমাকে। ঘরেরই কোথাও একটা গান চলছে।
Hello darkness- my old friend
I’ve come to talk with you again
Because a vision softly creeping
Left its seeds while I was cleeping
And the vision that was planted in my brain
Still remains
Within the sound of silence…
আমি ছোট্ট থেকে শুনি এই গানটা। যখন খুব দুঃখ হয়, আমার মুখের চামড়া যখন স্যাঁতসেঁতে হয়ে আসে, তখন খুব জোরে এই গানটা চালিয়ে দিই। মনে করি যে ‘অন্ধকার’ নামে একটা বন্ধু আছে আমার। অন্ধকার বলে নাকি আসলে কিছু হয় না। অন্ধকার মানে আলোর অনুপস্থিতি। এমন একটা কিছু আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করি, যা আসলে নেই। কোনও কিছুর অনুপস্থিতিকে আর হারানোর ভয় থাকে না। অনুপস্থিতি চিরন্তন। তাকে একবার ভালোবেসে ফেলতে পারলে উপস্থিতিকেই বড় ফাঁপা মনে হয়। ঠিক যেমন একবার মরে যেতে ইচ্ছা করলে বেঁচে থাকাটা ভীষণ মিথ্যে মনে হয়…
জ্ঞান হওয়ার পর প্রথম আট বছর আমি দাদুকে পেয়েছিলাম। দাদু আমাকে গল্প বলত। দেশ-বিদেশের অদ্ভুত সব গল্প। সাত সমুদ্রপারের রাজপুত্রের গল্প। তারপর আমি উলটে শুতাম বিছানায়। সাতটা পোষা ভূত ছিল দাদুর। অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা ছিল তাদের। সেসব গল্প বলতে বলতে দাদু আমার পিঠে হাত রেখে ঘুমিয়ে পড়ত।
দাদু মারা যাওয়ার পর একটা অনুপস্থিতি রয়ে গেছে মনে হয়, অন্ধকারের মতো। অন্য হাজারটা লোকের উপস্থিতির থেকে সেটা আমাকে ঢের বেশি স্বস্তি দেয়।
দাদু মারা যাওয়ার পর থেকে আমি একটা স্বপ্ন দেখি। আমার মনে হয়, এই পৃথিবীর কোন এক গভীর জঙ্গলের ভেতরে একটা ভীষণ নির্জন বাড়ি আছে। কাঠের বাড়ি। তার দোতলার বারান্দাটা বেশ বড়। সেই বারান্দার সামনে পাইন গাছের সার ঝুঁকে থাকে। গাছের ফাঁক দিয়ে প্রতিদিন রাতে চাঁদ দেখা যায়। কেবল দুই অন্ধ বুড়োবুড়ি থাকে সেই বাড়িতে। ওরা কেউ কাউকে দেখতে পায় না। কে জানে কবে শহরের জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে পালিয়ে এসেছে দুজনে। তারপর এই জঙ্গলে এসে দেখা হয়েছে।
রোজ ওরা ভাবে, একদিন বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে ওদের চোখের দৃষ্টি ফিরে আসবে। মরে যাওয়ার আগে অন্তত একবার দুজন দুজনকে দেখতে পাবে।
কোনও একদিন জঙ্গলে দেখা হবার পর হাঁটতে হাঁটতে দুজনে খুঁজে পেয়েছে এই বাড়িটা। হয়তো একটা জীবন একসঙ্গে কাটায়নি। ওদের জীবনের গল্পগুলো আলাদা, তবে রোজ সন্ধেবেলা যখন সমস্ত আলো নিবে আসে, তখন সেই বুড়োবুড়ি একটা হ্যারিকেন জেলে বারান্দায় চেয়ারে বসে। রোজ ভাবে আজকের দিনটাই অন্ধজীবনের শেষদিন। তাই রোজ নিজেদের জীবনের গল্প একে অপরকে শোনায় ওরা।
একটা জীবন ওরা নিজেদের মতো কাটায় প্রত্যেকদিন।
স্বপ্নটা যতবার দেখি, ভীষণ ইচ্ছে করে, ওই বুড়োবুড়ির গল্পের কোনও একটা চরিত্র হব একদিন আমি। আমার গোটা জীবন ধরে ওই বাড়িটাকে খুঁজে বেরিয়েছি।
আচ্ছা, আপনি কখনও বলি কিংবা কোরবানি দেখেছেন? যখন অনেকগুলো মানুষ মিলে একটা অসহায় পশুকে হাত-পা বেঁধে জোর করে গলার নলি কেটে দেয়? তার অসহায় চিৎকার শুনেছেন? যে লোকগুলো পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, তারা নিজেদের সান্ত্বনা দেয়, পশুটা ঈশ্বরের কাছে চলে গেল। তার জন্য অনন্ত সুখ অপেক্ষা করছে। কিন্তু তারা ভাবে না? ওই ভিড়ের মধ্যে এমন কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, যে সে বিশ্বাসই করে না মৃত্যুর পর আর কিছু আছে বলে? তার নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কিছু থাকে না। ওই রক্তাক্ত মাংসপিণ্ড হয়ে-যাওয়া পশুটার ছটফটানি তার কাছে যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
আসলে কী জানেন, মানুষের মধ্যে কিছু কিছু বোধ আছে, যা চরমে উঠলে সে অন্যের বিশ্বাস কিংবা অনুভূতির কথা ভুলে যায়। যেমন ধর্ম, প্রেম, ঘৃণা, খিদে, যৌনতা এবং প্রতিহিংসা… প্রতিহিংসা…
আমি একবার একটা মানুষকে ওভাবে রক্তাক্ত শরীরে ছটফট করতে দেখেছিলাম। লোকটার সমস্ত শরীরে একটা লাল রঙের কাপড় জড়ানো ছিল। আমার শরীরে কোনও কাপড় ছিল না। শুধু হাতে ছিল একটা… ছুরিই হবে… নাকি সাঁড়াশি? আমি ভুলে গিয়েছিলাম, ওই লোকটা কী বিশ্বাস করে। প্রেম, যৌনতা কিংবা ধর্ম নয়, আমার সেদিন খিদে পেয়েছিল ভীষণ। কোনও মানুষকে জ্যান্ত না রাখতে চাওয়ার ইচ্ছাটাও একটা খিদের মতো।
যাক সে কথা, কাটাকাটির কথায় মনে পড়ল, আমি প্রথমবার আমার হাতের শিরা কেটেছিলাম দশ বছর বয়সে। কেটেছিলাম, কারণ আমার বাবাকে ওইভাবে শিরা কাটতে দেখেছিলাম। উঁহু, নিজের নয়, মায়ের। জোর করে মায়ের হাতটা টেবিলের উপর চেপে ধরে। একটা স্টিলের ঘড়ি দিয়ে হাতটা চাবকে লাল করত অবশ্য আগে।
মা-কে চড় মারতে মারতে শিরা কেটে ফেলেছিল বাবা। তারপর ওই অবস্থাতেই চুমু খেয়েছিল মা-কে। হ্যাঁ, আমার সামনে। কী যেন একটা প্রমাণ করার ছিল বাবার…. ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল, “আজ রাতে এসে আবার খাব তোকে…” বাবা চলে যাওয়ার পর মা-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, অমন করে তোমার শিরাটা কাটল কেন? মা বলেছিল, “ওইভাবে শিরা কেটে বাবা দ্যাখে, আমি কতটা ভালোবাসি তোর বাবাকে….
আমার সেদিন খুব শখ হচ্ছিল দেখতে—আমার ভেতরে কতটা ভালোবাসা আছে নিজের জন্য। তারপর থেকে যখনই সন্দেহ হয়েছে, যখনই মনে হয়েছে, ভেতরে সব অনুভূতি শুকিয়ে গেছে, তখনই হাত কেটে দেখি।
বাবার কথা মনে পড়ল হঠাৎ। বাবা মাঝে মাঝে আমাকেও খুব মারত। অন্য কাজের মতো মারধরটাও বেশ গুছিয়ে করত বাবা। পাখার সঙ্গে আমার দুটো হাত বাঁধত, তারপর বুক থেকে কোমরের দিকে বেল্টের আঘাতে মেরে লাল করে দিত।
বাবা না থাকলে বাড়িতে একটা বাচ্চা ছেলে আসত। বছর কুড়ি বয়স হবে। দরজা বন্ধ করে বিকেল অবধি মায়ের ঘরে থাকত। আমার খুব কৌতূহল হত। সেক্সের ব্যাপারে তখন নতুন জানতে শিখেছি। একদিন অনেকক্ষণ পর্যন্ত কান পেতে ছিলাম মায়ের দরজায়। ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ আসছিল। হাউ হাউ করে কাঁদছিল মা।
তারপর একসময় মারের আওয়াজ আসত। না, সেই ছেলেটা নয়, মা-ই মারত ছেলেটাকে। কোনও কোনওদিন তার হাত-পা কেটে দিত। ফেরার সময় কিছু টাকা নিয়ে যেত ছেলেটা।
আমার দিকে কেমন করে যেন তাকাত মাঝে মাঝে। ছেলেটার বোধহয় পছন্দ ছিল আমাকে।
সেটা বুঝতে পেরেই ওর সঙ্গে কথা বলেছিলাম আমি। মা-বাবা আমার হাতে কোনও টাকা দিত না। একটা বিশেষ জিনিস জোগাড় করার ছিল আমার। ছেলেটাকে দুটো মিষ্টি কথা বলতেই সে এনে দিতে রাজি হয়ে গেল।
মোটামুটি দিন তিনেক নিজের কাছেই রেখেছিলাম সেটা। সাহস হচ্ছিল না ব্যবহার করার। তারপর একদিন বাবা আবার ঝুলিয়ে বাঁধল আমাকে। গালাগালি দিল। সেদিন বুকে-পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হয়েছিল। সেদিন আর সাহসের অভাব হয়নি। বাবার সকালের কফির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলাম জিনিসটা।
বাবা মরেনি। তবে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মা-ই নিয়ে গিয়েছিল। মায়ের কোনও একটা অনুভূতি প্রবল হয়েছিল বোধহয়। জ্যান্ত রাখার খিদে। আমার আর মায়ের মধ্যে দুটো বিপরীত খিদে কাজ করত। মা বিশ্বাস করত না আমার খিদে অতটা প্রবল হওয়ার কোনও কারণ আছে।
এখন মাঝে মাঝে শুয়ে ভাবি, আমরা সবাই ওই পাঁঠাবলির পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা অবিশ্বাসী নাস্তিক। আমাদের অনুভূতি, রাগ, যন্ত্রণা, বিদ্বেষ, ঘৃণা আসলে বাকি কসাইদের কাছে অর্থহীন। কারণ দিনের শেষে ওই পাঁঠার যন্ত্রণাটা পাবে একটা ভোট আর অসংখ্য ধর্মান্ধ উন্মাদের ভোটে রাস্তা লাল হবে। আমরা অনুভূতিকে রক্তাক্ত মাংসপিণ্ড হতে দেখি প্রতিদিন।
তারপর একসময় আর বাইরে বেরোই না। আর প্রতিবাদ করি না কোনও নৃশংসতার। ঘরের দরজা বন্ধ করে, শব্দ আটকে ভাবি, বাকি দুনিয়ার প্রতিটা লোক কসাই হয়ে গেছে।
তবে আমার এই ঘরে আমি ছাড়া আরও একজন থাকে। যখনই এসব চিন্তায় ডুবে যাই, তখনই সে এসে দাঁড়ায় আমার পাশে। ওই যে এখন ডাকছে আমাকে…
*
ডায়েরিটা বন্ধ করে ঘর থেকে বেরিয়ে প্যাসেজটা পেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল শতরূপ। রাত প্রায় আড়াইটে বেজেছে। সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল খোলা বাতাসে। বেশ কনকনে ঠান্ডা বাতাস এসে লাগছে গায়ে। দূরে অন্ধকারের মধ্যে কে যেন নিয়ন রং দিয়ে লাইন টেনে পাহাড় এঁকেছে। নীচ থেকে ঝিঁঝির একটানা ডাক ভেসে আছে। বাকি সব অদ্ভুতরকম নিস্তব্ধ।
সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে একটা বেতের চেয়ারে বসে পড়ে শতরূপ। ধোঁয়াটা উড়ে যায় লালচে আকাশের দিকে। আজ বড় চাঁদ উঠেছে। সামনের বাগানটা ভরে আছে জ্যোৎস্নায়। তার উপরে কয়েকটা বড় গাছপালা ভিড় করে আছে। তাদের মাঝখানে ছোট একটা বাঁধানো পুকুর আছে। শতরূপের ইচ্ছা করল ওই পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসতে।
একটা হাত মাথার পেছনে দিয়ে চোখ বোজে। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ খুলে যায়। একটা শব্দ এসেছে বাগানের দিক থেকে। কে যেন দৌড়ে গেল পুকুরের দিকে।
চমকে উঠে সেদিকে তাকাল শতরূপ। এত রাতে কে যাবে ওদিকটায়? বাড়ির কেউ? শতরূপ যেখানে বসে আছে, সেখান থেকে সদর দরজার দিকটা দেখা যায়। সেদিকে উঁকি মেরে দেখল দরজা বন্ধ। সেখান থেকে এই মুহূর্তে কারও বেরোনো সম্ভব নয়। তবে কি বাগানের ভেতরেই লোক ছিল? সেটা অবশ্য অদ্ভুত কিছু নয়, কিন্তু যে-ই থাক, সে দৌড়োতে যাবে কেন? চোর-টোর এল নাকি?
ভালো করে সেদিকে চেয়ে রইল শতরূপ। পুকুরের স্বচ্ছ জলটা অন্ধকারের মধ্যে জেগে রয়েছে। তার চারপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তবে কি কানে ভুল শুনল? একটু পিছিয়ে এসে আবার চেয়ারে বসে পড়তে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা জিনিস চোখে পড়তেই চমকে গেল সে।
একটা মানুষ। একটা ছেলে। সে ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে পুকুরের দিকে। যেন অন্ধকার ফুঁড়েই হঠাৎ বেরিয়ে এসেছে। এতদূর থেকেই ঘাসের উপরে তার পায়ের আওয়াজ আসছে। এই ছেলেটাকে তো এ বাড়িতে আগে দেখেনি। বিদ্যুৎ চমকের মতো উত্তর খেলে যায় তার মাথায়। দেখেছে, কিন্তু এ বাড়িতে নয়। আজ সকালে গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করার আগে এই ছেলেটাই এসে পড়েছিল গাড়ির সামনে! কিন্তু সে এখানে এল কী করে?
কী করবে, বুঝতে পারে না শতরূপ। তার পা-টা কেঁপে ওঠে একবার। অবাক হয়ে চেয়ে দ্যাখে, ধীরে ধীরে পুকুরের বাঁধানো পাড়ে বসে পড়ে ছেলেটা। অনেকক্ষণ চেয়ে থাকে পুকুরের জলের দিকে। যেন জল থেকে কারও উঠে আসার অপেক্ষা করছে। শতরূপের একবার ইচ্ছা করে, এখান থেকে জোরে একবার ডেকে ওঠে। সকালে অমন হঠাৎ করেই কেন যে গায়েব হয়ে গেল, সেটাই জিজ্ঞেস করে।
গলার কাছটা শুকিয়ে আসছে। কী যেন একটা আছে ছেলেটার মধ্যে। একটা অদ্ভুত উদাসীনতা। আর-একটু হলেই আঙুল থেকে খসে পড়ত সিগারেটটা। কোনওরকমে সামলে নেয়। চেয়ে দ্যাখে, এবার আগের মতোই উঠে দাঁড়িয়েছে ছেলেটা। পা বাড়িয়েছে জলের দিকে। পুকুরে ডুব দিতে চলেছে সে। ছোট্ট একটা ঝাঁপ দেয়…
ঝুপ করে আওয়াজ শতরূপের কান অবধি ভেসে আসে। ছেলেটা কি সাঁতার জানে না? ছটফট করতে শুরু করেছে সে। হাত দুটো বারবার উঠে আসছে জলের উপরে। আর-একটু হলেই হয়তো দম আটকে যাবে। শতরূপের গলা দিয়ে একটা চাপা চিৎকার বের হয়ে আসে। ছুটে নীচে নামতে যায় সে কিন্তু বারান্দা থেকে বেরোনোর আগেই একটা ছায়ামূর্তির সঙ্গে প্রায় ধাক্কা লেগে যায়। আতঙ্কে দু-পা পিছিয়ে আসে ও, ঐন্দ্রিলা দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায় ঢোকার মুখে। শতরূপের অন্ধকারে ঢাকা মুখের দিকে চেয়ে একটা অবিশ্বাসের ছায়া খেলে যায় তার মুখে–”আ… আপনি… এখানে…”
ও উত্তর দেয় না, উলটে দ্রুতকণ্ঠে বলে, “একটা ছেলে ডুবে যাচ্ছে। ওই পুকুরটায়… এক্ষুনি….”
“ছেলে! কই!” ঐন্দ্রিলা বারান্দায় বেরিয়ে এসে পুকুরের দিকে চোখ রাখে। তারপর আগের মতোই শান্ত গলায় বলে, “কিছু নেই তো পুকুরে!”
শতরূপ চকিতে ফিরে তাকায় সেদিকে। সত্যি স্থির হয়ে আছে পুকুরের জল। মানুষ তো দূরের কথা, জলের উপরে ঢেউয়ের আলোড়ন অবধি নেই। হতবাক হয়ে নিজের মুখের উপরে একবার হাত চালায় ও। কী যেন বিড়বিড় করতে করতে বারান্দার রেলিং ধরে চারপাশে দৃষ্টি বুলোতে থাকে।
মেয়েটা পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে বারান্দার কার্নিশ থেকে ঝুলন্ত ল্যাম্পগুলোর সলতেয় আগুন দিতে থাকে। হলদে আলোয় ভরে যায় বারান্দার ভেতরের দিকটা, “এরপর থেকে রাতে এখানে এলে এই আলোগুলো জ্বেলে দেবেন। আর ভুল দেখবেন না…”
শতরূপ এতক্ষণে কিছুটা শান্ত হয়েছে, মুখ ফিরিয়ে বলে, “বারান্দায় আলো জ্বললে পুকুরটা ভালো করে দেখতে পাব?”
“উঁহু, পুকুরটা দেখতেই পাবেন না। তাহলেই আর ভুল দেখবেন না… মেয়েটা নরম করে হাসে।
“ছেলেটাকে আমি আগেও দেখেছি, জানিস। আজ সকালেই।”
“কোথায়?”
কী যেন বলতে গিয়েও থেমে যায় শতরূপ। চেয়ারে এসে আবার বসে পড়ে। পুকুরের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলে, “এই বাড়িটায় কিছু গোলমাল আছে…”
“সে কী! কেমন গোলমাল?”
শতরূপ কী যেন ভাবে, তারপর বলে, “এই যেমন ধর, এতদিন যার মুখে ‘তুই’ শুনে এসেছি, তার থেকে আপনি শুনতে যেমন অস্বস্তি লাগে…. সেইরকম গোলমাল!”
ঐন্দ্রিলা অল্প হাসে— “ব্যাস! এইটুকু! আমার ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখুন তাহলে…
“কোন ব্যাপার?”
বড় করে শ্বাস নেয় সে– “মনে হয়, ঢাল-তরোয়াল ছাড়া খালি হাতেই যুদ্ধ করতে নেমে পড়েছি। কে বন্ধু, কে শত্রু জানি না। কী নিয়ে যুদ্ধ হচ্ছে, জানি না। টাকাপয়সার জন্য যুদ্ধ করছি নাকি আমার বাবা-মা-কে শত্রুপক্ষের লোক মেরে দিয়ে গেছে তাই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য করছি, কিচ্ছু জানি না।”
শতরূপের গলা নরম হয়ে আসে, “আমাদের গল্পগুলোও ফলো করে আমাদের। আমাদের অতীত, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, ফিরে পাওয়া মানুষ, নতুন মানুষ, সব কিছু… তোকে দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, পেছন ফিরে যদি একদিন দেখি, এইসব ফলোয়ার হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গেছে তাহলে কেমন লাগবে?”
“বেশ, সামনেই বারান্দা। ঝাঁপিয়ে পড়ে যান নীচে।” কৌতুকের গলায় বলে ঐন্দ্রিলা।
“উঁহু, তা কী করে হয়?”
“কেন হয় না?”
“তোর আর আমার ষোলোটা বছর কেটেছে একসঙ্গে। ষোলো বছরে অন্তত ষোলো লক্ষ গল্প জমা আছে। সে গল্পগুলো তুই আর আমি ছাড়া কেউ জানে না। তুই তো ভুলেই গেছিস, এবার আমিও ভুলে গেলে গল্পগুলো আর কোথাও থাকবে না…” আবার পুকুরের দিকে তাকায় শতরূপ— “আমার স্মৃতি অনেকটা ব্যাকআপ প্ল্যান বলতে পারিস।”
আর কোনও কথা বলে না কেউ। মৃদু হাওয়া ভেসে আসতে শুরু করেছে এতক্ষণে। একটু একটু করে দুলছে ঝুলন্ত ল্যাম্পগুলো। দপদপে আলোতে ফানুস মনে হয় তাদের। ফ্যাকাশে আকাশের বুক চিরে কয়েকটা চামচিকে কিচকিচ করতে করতে উড়ে গেল দূরে। ঝিঁঝির ডাকটা এখনও আগের মতোই শোনা যাচ্ছে।
বুকের উপরে জ্যাকেটটা আর-একটু বেশি করে টেনে নিল শতরূপ। জ্বলন্ত সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিল বাগানের দিকে। মাথার পেছনে বালিশের মতো রাখল হাতটা।
“একটা অ্যাডভান্টেজ আছে বুঝলি, এই সব কিছু ভুলে যাওয়ার….”
“কী?”
“কিছু বই আর সিনেমা আছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, সেগুলো ভুলে গেলে বেশ হত, আবার প্রথমবার দেখার অনুভূতিটা উপভোগ করতে পারতাম… যেমন ধর ‘পথের পাঁচালী’…”
“মনে আছে আমার…”
“হ্যারি পটার…”
“মনে আছে…
“অ্যালিস ইন দ্য ওয়ান্ডার…
“সেটা কী?”
শতরূপ হাসে। উত্তর দেয় না। ঐন্দ্রিলা আবার কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে, তারপর বলে, “সোমাদি বলছিল, আপনি নাকি গল্প-উপন্যাস লেখেন!”
উপরে-নীচে মাথা নাড়ায় শতরূপ, দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে বলে, “লিখি, তবে তোর ভালো লাগে না!”
“আমার বুকশেলফে প্রচুর বই আছে, কিন্তু আপনার লেখা বই নেই। সেটা দেখেই মনে হয়েছিল…”
“তবে আমি গল্প পড়ে শোনাতাম তোকে। গল্প শুনতে ছোট থেকে ভালোবাসতিস তুই।”
“মানে আমার আপনার লেখা ভালো লাগত না, কিন্তু পড়ে শোনালে ভালো লাগত!”
শতরূপ কাঁধ ঝাঁকায়, “তা-ও বলা যায় না। তবে আর কেউ পড়ে শোনানোর মতো ছিল না, অগত্যা…”
এবার একটা বড়সড়ো হাসি ফোটে ঐন্দ্রিলার মুখে, “আপনার সঙ্গে আমার অনেকগুলো স্মৃতি আছে, তা-ই না? ছোটবেলা থেকে বড়বেলা অবধি?”
শতরূপ উপরে-নীচে মাথা নাড়ায়।
“কালই শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম কেমন যেন শিকড় নেই আমার। ছোট থেকে একটা স্ট্রং কিছু, সব ক-টা গল্পে একটা কমন চরিত্র, আজ বেশ ভালো লাগছে, জানেন…”
“তুই রোজই এসে বসিস এখানে?” শতরূপ নিজেই বুঝতে পারে না কেন প্রসঙ্গটায় এতটা অস্বস্তি হচ্ছে ওর।
“রোজ। আমার ঘুম আসে না। ভোরের দিকে ঘুমোই।”
“এই বাড়িতে বোধহয় এটাই গণ্ডগোল। সহজে ঘুম আসে না।”
“ধুর, আমার মনে হয় অন্য কথা।”
“কী কথা?”
“মনে হয়, এই বাড়িতে আমি ছাড়া আরও কেউ একজন ছিল। আমি তার কথা ভুলে গেছি, কিন্তু কেউ মনে করাতে চাইছে না আমাকে। সে-ও চলে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই বুঝি মনে পড়বে তার কথা, অমনি আবার হারিয়ে যায় সব…”
“ছেলেবেলায় এক ইম্যাজিনারি ফ্রেন্ড ছিল তোর। পুনা। বাবা-মা বাড়িতে থাকত না তো, একেবারে ছোটবেলায় তেমন বন্ধুবান্ধব বলেও কেউ ছিল না। তাই কথা বলার মতো একজনকে বানিয়ে নিয়েছিলি। রেডিয়োতে কথা হত তার সঙ্গে…
“তারপর?”
“তারপর আর কী?” হাসে শতরূপ — “জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতিস তার সঙ্গে। আর রেডিয়োর কাছে মুখ এনে কথা বলতিস। পুনাই নাকি তোকে জঙ্গল চিনিয়েছিল…. তুই অনেক বড় বয়স অবধি বিশ্বাস করতিস, পুনা কথা বলে তোর সঙ্গে… মাঝে মাঝে নাকি তাকে সশরীরে দেখতেও পেতিস!”
“সে কী! তুই দেখতে পাসনি?”
হঠাৎ চেয়ারে বসেই ঐন্দ্রিলার দিকে ঘুরে তাকায় শতরূপ, একটা রহস্যময় হাসি হাসে-”দেখেছিলাম। একবার।”
“সত্যি! কী করে?”
আড়মোড়া ভাঙে শতরূপ— “আমার গল্প তোর ভালো না-লাগার একটা বড় কারণ কী ছিল বল তো? আমি একেবারে সব তাস খেলে দিতাম না। কিছু হাতে রেখে দিতাম। তোর সেটা একদম পছন্দ ছিল না…”
হঠাৎ শতরূপের মনে হয়, ঐন্দ্রিলা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ওর চোখ দুটো আগের থেকে বড় হয়ে উঠেছে। ল্যাম্পের মৃদু হলদে আলো ওর চোখে এসে পড়ে যেন আগুনের রং লাগিয়েছে চোখের মণিতে। গলার কাছটা শুকনো হয়ে আছে শতরূপের। নেশার মতো একটা ইচ্ছা চেপে ধরছে ওকে। ফিরে তাকাতে ইচ্ছা করছে ঐন্দ্রিলার দিকে। কোনওরকমে সেটা দমন করে সামনে তাকিয়ে থাকে সে।
“আচ্ছা শোন….” ঐন্দ্রিলার গলার স্বর খানিকটা বদলেছে, “তুই আমাকে শোনাবি গল্পগুলো?”
“কোন গল্প?”
“আমার গল্পগুলো। রোজ রাতে আমি এসে বসি এখানে। তুই একটা একটা করে সব শোনাবি আমাকে রোজ… আমার হঠাৎ করে নিজের শিকড় খুঁজতে ইচ্ছা করছে…
শতরূপ মন দিয়ে একবার বিচার করে দ্যাখে প্রস্তাবটা। তারপর বলে, “কিন্তু আমার গল্প তো ভালো লাগত না তোর…”
“তুই আপাতত একমাত্র অপশন আমার… অগত্যা…”
“আচ্ছা, ভেবে দেখব। তবে তোকে তোর ছেলেবেলার একটা পছন্দের জিনিসের সন্ধান দিতে পারি। আয় আমার সঙ্গে…”
ঐন্দ্রিলার কাঁধে টোকা দিয়ে চেয়ার ছেড়ে সে এগিয়ে যায় ভেতরের ঘরের দিকে। বারান্দা থেকে উঠে আসতে বুকটা যেন বেশ কিছুটা হালকা লাগে তার।
ঐন্দ্রিলার ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল। সেটা দিয়ে ভেতরে ঢুকে আসে। বুকশেলফটার দিকে সকালেই দৃষ্টি পড়েছিল একবার। তখনই নজর পড়েছিল বইটার উপরে।
এতক্ষণে বারান্দা থেকে উঠে এসে ঐন্দ্রিলাও ঢুকে এসেছে ঘরে। সে অবাক হয়ে চেয়ে দ্যাখে, ওর বুকশেল্ফ থেকে একটা বই টেনে বের করছে শতরূপ। পুরোনো রংচটা একটা বই। কেবল হলদে হয়ে-যাওয়া কভারের উপরে আঁকা একটা বাচ্চা মেয়ের মুখ চোখ টানে।
“এই… বইটা কী হবে?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ঐন্দ্রিলা।
“ওই যে… শিকড় খুঁজছিলিস!”
কথা না বাড়িয়ে বিছানার উপর গিয়ে বসে পড়ে ঐন্দ্রিলা। শতরূপ বইটা হাতে নিয়ে পাশেই একটা চেয়ারে বসে পড়ে। উত্তরের দিকে জানলাটা খোলা আছে। সেখান থেকে একটা ফিনফিনে হাওয়া এসে আছড়ে পড়ছে বইয়ের পাতায়। ছন্দে কেঁপে উঠছে যেন তারা বারবার। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। কখনও পাতার উপরে অজস্র পেনসিলের আঁকিবুকি।
বইটা ঐন্দ্রিলার দিকে এগিয়ে দেয় শতরূপ— “এটা ছোটবেলায় পড়তিস তুই। সব থেকে প্রিয় বই ছিল।”
“রূপকথার গল্প?”
“একটা মেয়ের গল্প, যে একদিন খরগোশকে তাড়া করতে গিয়ে একটা গর্তে পড়ে যায়। সেই গর্তের মধ্যে ছিল….”
“উঁহু… এভাবে বললে হবে না। পড়ে শোনা…”
সম্বোধনটা পালটে গেছে। শতরূপ খুশি হয়। মেয়েটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে ওকে। মুখ একটা ছদ্মকোপ এনে বলে, “এত বড় বই একদিনে কী করে শোনাব?”
“আজকেই শেষ করতে হবে বলেছি?”
একটু থতোমতো খায় শতরূপ। বইটা বাংলায় লেখা। সে প্রথম পাতায় এসে প্রথম লাইনের উপরে চোখ রাখে। গলাখাঁকারি দিয়ে পড়তে শুরু করে, “সকাল থেকে মনটা ভারী ব্যাজার হয়ে ছিল অ্যালিসের। আজ ওর করার মতো কিচ্ছু নেই। পাশে বসে একটা বই পড়ছে বোন। সেটার দিকে মাঝে মাঝে উকি মেরেছে বটে, কিন্তু সে বইতে রংচঙে ছবি বা কথাবার্তা কিছুই নেই। কেবল লম্বা লম্বা লেখার দেওয়াল… ছবি আর মজার মজার কথা না থাকলে সে আবার বই হল নাকি?”
মৃদু হাসি ফুটল ঐন্দ্রিলার মুখে। চোখ বুজে বিছানার একধারে মাথা এলিয়ে দিল সে। অন্ধকার নেমে এল চোখে।
“কী করবে, কী করবে ভাবছে, একটা ডেইজি ফুলের মালা বানাবে কি না তা-ও ভাবছে, এমন সময় কী যেন একটা দৌড়ে গেল ওর পায়ের কাছ দিয়ে; চমকে উঠে ফিরে তাকিয়ে অ্যালিস দেখল, ও হরি! একটা গোলাপি চোখের খরগোশ … “
কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে ঐন্দ্রিলা। বাইরের ভেসে আসা হাওয়াটা এখন বই ছেড়ে ওর মুখের উপর স্পর্শ বুলিয়ে যাচ্ছে। গলা থেকে ঝুলন্ত চেনটা এসে পড়েছে বিছানার উপর। ভারী নরম আর শান্ত দেখাচ্ছে ওর মুখটা।
উঠে দাঁড়িয়ে সুইচবোর্ডের কাছে আঙুল এনে আলোটা নিবিয়ে দেয় শতরূপ। কাছে গিয়ে একবার ঝুঁকে পড়ে ঐন্দ্রিলার মুখের উপরে। টিকোলো নাক, টানাটানা চোখের পাতা আর কম্পমান ঠোঁটের মধ্যে কোথায় যেন একটা শিশুর কোমলতা মিশে আছে মুখে। ওকে শান্তিতে ঘুমোতে দেখে অকারণেই মনটা শান্ত হয়ে যায় শতরূপের।
চাঁদের আলো জানলা দিয়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে ঘরের মেঝে। তার ছাট এসে পড়ছে ঐন্দ্রিলার শরীরে।
ইলোরার কথা মনে পড়ে যায়। শুধুমাত্র টাকার জন্য একটা মেয়ের… আজ গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু …
মাথাটা ভারী হয়ে যায় শতরূপের। বইটা হাতে নিয়েই দরজা ভেজিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে সে। এসে দাঁড়ায় বারান্দায়। একটু আগের মতোই আবার খালি হয়ে গেছে বারান্দাটা। কী যেন একটা চলে গেছে সেখান থেকে। শুধু দুটো মানুষ নয়।
সাড়ে তিনটে বাজতে চলেছে। বইটা চেয়ারের উপরে রেখে রেলিং-এর দিকে সরে আসতে যাচ্ছিল শতরূপ। এমন সময় বইয়ের ভেতর থেকে কী যেন একটা খসে পড়ে যায় নীচে। একটা খাম। বইয়ের ফাঁকে বহুদিন আগে রেখে দিয়েছিল কেউ।
নিচু হয়ে খামটা কুড়িয়ে নেয় শতরূপ। ভাঁজ খুলে দ্যাখে তার ভেতরে দুটো কাগজ আছে। একটায় পাতা জুড়ে বড় করে লেখা— “আজকের দিনটা কোনওদিন ভুলব না।” সঙ্গে একটা তারিখ।
অন্য কাগজটা হাতে নেয় শতরূপ। পেনসিলের ঝাপসা কালিতে কিছু লেখা আছে তাতে, একটা চিঠি। ল্যাম্পের হলদে নরম আলোতে সেই লেখাগুলোর দিকে চেয়ে অবাক বিস্ময়ে শতরূপের শরীর কেঁপে ওঠে একবার…
“চাবিটা জোগাড় করলি কোথা থেকে বল তো?” শতরূপ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।
“সোমাদির সঙ্গে হাঁটতে গিয়েছিলাম খাওয়ার পর। দরজা বন্ধ করার সময়। জাস্ট অ্যাক্টিং করলাম তালা দেওয়ার। চাবি আদৌ লাগানোই ছিল না দরজায়।”
“মানে সারারাত খোলা থাকবে দরজা!”
“তাতে অসুবিধাটা কোথায়?”
“যদি চুরি হয়ে যায়?”
“আমরা বাইরে থেকে পাহারা দেব তো…”
দুজনে মিলে এগিয়ে আসে পুকুরের দিকে। কাল শুতে যাবার আগেই ঐন্দ্রিলা বলেছিল, আজ রাতে আর বারান্দায় বসবে না। পুকুরের ধারে এসে বসবে মাঝরাতে। সেইমতো আজ রাত গভীর হতেই শতরূপের ঘরের দরজায় উপস্থিত হয় ঐন্দ্রিলা। তারপর ওকে টেনে এনেছে এই পুকুরের ধারে। ঠান্ডাটা জাঁকিয়ে পড়েছে। হিম পড়ে ঘাসগুলোও স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। পুকুরের ধারে সিমেন্ট-বাঁধানো ঘাটে বসে পড়ে ওরা। ঐন্দ্রিলা একটা পা ডুবিয়ে দেয় টলটলে জলে। কনকনে ঠান্ডায় কেঁপে ওঠে শরীর। দ্রুত ধরে ফ্যালে শতরূপের হাতটা, “কী ঠান্ডা জল রে!”
“সেটা পরের কথা, নীচে তো সাপখোপ থাকতে পারে….”
“আমি কি সাপে ভয় পাই?”
“না, কিন্তু আমি পাই।”
“তাহলে তুই ডোবাস না। এই ভালো কথা, আমি কীসে ভয় পাই রে?”
শতরূপ অনেকক্ষণ ধরে ভেবে বলে, “কই, তেমন কিছু মনে পড়ছে না। তুই ছোট থেকেই ভীষণ সাহসী…. কেবল…”
“হ্যাঁ এই তো, আছে কিছু একটা, বল বল…”
“মরে যাওয়াকে ভয় পেতিস…”
“তুই পেতিস না?”
শতরূপ ঘাড় নাড়ে, “মরে গেলে ভয়ের কী আছে? মরে গেলে তো আর জানতে পারব না যে মরে গেছি। তা ছাড়া জন্মাবার আগে এত কোটি বছর ছিলাম না পৃথিবীতে, কিছুই তো ফিল করতে পারিনি। শুধু আমি বেঁচে থাকতে থাকতে আমার কাছের মানুষগুলো মরে যাওয়ার ভয় পেতাম…”
“এখন পাস না?”
“এখন কাছের মানুষ বলে কেউ নেই….”
“কোনটা বেটার বল তো? কাছের মানুষ না-থাকার একাকিত্ব, নাকি কাছের মানুষের ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ভয় পাওয়া?”
প্রশ্নটার উত্তর দেয় না শতরূপ। হঠাৎ ওর গলার স্বর বদলে যায়, যেন অন্য একটা মানুষ এসে ভর করেছে, “আমার কাল থেকে তোকে নিয়ে ভয় করছে জানিস?”
“আমাকে নিয়ে! কীসের ভয়?”
দু-দিকে মাথা নাড়ায় শতরূপ, “জানি না, মাঝে মাঝে এক-একটা মানুষকে নিয়ে অকারণেই ভয় লাগে। তাদের কোনও রোগ নেই, মাথায় ছিট নেই, সেই মুহূর্তের জন্য কোথাও চলে যাওয়ারও সম্ভাবনা নেই, তা-ও ভয় করে। এক-একটা মানুষ হয় এরকম….”
পা-টা জল থেকে তুলে ঘাটের উপরে রাখে ঐন্দ্রিলা। শতরূপ সেদিকে তাকিয়ে বলে, “তুলে নিলি যে? কী হল?”
“হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল…”
“কোনটা? তুই সাপে ভয় পেতিস?”
“উঁহু…”
“তাহলে?”
ওর দিকে একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে চায় বিনি, চোখ দুটো চাঁদের রুপোলি আলোয় মায়াবী দেখায়— “অন্য একটা মানুষের মনে আমাদের নিয়ে সব থেকে সুন্দর অনুভূতিটা হল ভয়…. আজ অনেক বছর হয়ে গেল, কেউ ভয় পায়নি আমাকে নিয়ে…”
