(দ্বাদশ অধ্যায়)
“মা,
আমার আর ভালো লাগছে না, জানো? তুমি বলো, আমি কীরকম চুপচাপ ছেলে ছিলাম? ছোট থেকে কারও সঙ্গে কথা বলতাম না। এমনকি তোমার যখন শরীর খারাপ হত, তখনও আমি নিজের ঘরে গল্পের বই নিয়ে পড়ে থাকতাম। আমাদের স্কুলে প্রতিবছর নাটক হত; গান, আবৃত্তি—আমি কোনওদিনও সেসবে পার্টিসিপেট করতাম না। শুধু দোতলার বেঞ্চ থেকে চেয়ে নাটক দেখতাম। তুমি তো জানো, আমার কখনও লোকজন ভালো লাগেনি। আমি কেবল নিজেকে নিয়ে থাকতাম। আর কয়েকজন মানুষ ছিল, যাদেরকে নিয়ে আমার ছোট্ট পৃথিবী। জানো মা, আমি একটা ভুল রাস্তায় চলে এসেছি।
এখন আমার কাছের মানুষদের নিয়ে তৈরি ছোট্ট পৃথিবীটা অনেক বড় হয়ে গেছে, সেখানে এমন অনেক লোক ঢুকে পড়েছে, যাদের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই। আর যে মানুষগুলো আমার কাছে ছিল, যে মানুষগুলো আমার ছোটবেলা জুড়ে ছিল, তারা একজন একজন করে আমার ছোট্ট পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। তুমি তাদের মধ্যে একজন, বাবা তাদের মধ্যে একজন, নীহারিকাও তাদের মধ্যে একজন।
তোমার তরুণকে মনে আছে? আমার স্কুলজীবনের সব থেকে ভালো বন্ধু? সে-ও তাদের মধ্যে একজন। এখন আমি মাঝেমধ্যে তোমাদের ছোট্ট রূপটাকে দেখতে পাই, জানো? ইচ্ছা করে, ঠাস করে ওর দু-গালে দুটো চড় মেরে বলি, ‘তোর লেখার খাতা, তোর গলার আওয়াজ, সব কিছু নিয়ে লুকিয়ে পড় এক্ষুনি। যারা এসব করে, তাদেরকে কতকগুলো দুষ্টু লোক এসে ধরে নিয়ে চলে যায়। তারা কখনও আর মা-বাবার কাছে ফিরতে পারে না। ছোটবেলায় হারিয়ে-যাওয়া ক্যাম্বিস বল, হারিয়ে-যাওয়া খেলনা পিয়ানো, কোনও কিছুর কাছে ফিরতে পারে না…”
তোমার মনে আছে? তুমি যখন চান করে উঠে পুজো করতে, লক্ষ্মী ঠাকুরের সামনে বসে কৃষ্ণের নাম সুর করে পড়তে, আমি তখন পাশে বসে ভাঙা শ্বেতপাথরের টুকরো দিয়ে কাঠপিঁপড়ে মারতাম। মাঝে মাঝে মুখ তুলে দেখতাম, তুমি ঠাকুরকে কী যেন বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদছ। আমি তোমায় জিজ্ঞেস করতাম, ‘তুমি কেন কাঁদছ, মা?’ তুমি বলতে, ‘এখন বুঝতে পারবি না, বাবা, বড় হয়ে বুঝবি।’
আমি এখন বুঝতে পারি কারণটা, জানো? কিন্তু আমার কাছে কোনও ঠাকুর নেই। আমি জানি না কবে তোমার সেই নরম আদুরে কাঠপিঁপড়ে-মারা ছেলেটা এই লোভী আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরে পরিণত হল। আজ আমাকে দেখলে হয়তো চিনতে পারতে না তুমি, আমি চাইও না যে তুমি দ্যাখো। আমাকে যদি সত্যিই দেখতে, তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম এটা আমি নয়। আমি অনেক দূর চলে এসেছি। জানো, এখান থেকে আমি আর ফিরতে পারব না। যেমন তুমি যেখানে গেছ, সেখান থেকে আর ফিরতে পারবে না। আমার পাশে এখন অনেকগুলো মুখ আছে। অনেকগুলো ঠোঁট আছে, শরীর আছে, মন আছে, কিন্তু কারও চোখের জল নেই, কোনও আশ্রয় নেই, আমার খুব ভয় করে, মা, আমার ভয় করে…”
বাইরে রেডিয়ো স্টেশনের স্পিকারে একটা পাঞ্জাবি গান বাজছে। ছোট্ট ওয়াশরুমটার ভেতরে আয়নার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে শতরূপ। গানের সুরে গোটা ওয়াশরুমের ফ্লোরটা বারবার কেঁপে উঠছে।
ওপাশ থেকে রিং-এর শব্দ আসছে। গলাটা একবার পরিষ্কার করে নেয় শতরূপ। “হ্যালো” ভেসে আসতে অপেক্ষা না করে প্রথমেই সে বলে ওঠে, “ভাই, আমার একটু দরকার আছে তোর সঙ্গে… কয়েকটা কথা বলার আছে… “আরে ভাই! তুই এতদিন পরে! তোর তো বিশাল ব্যাপার… আমার বউয়ের আবার তোর গল্প না শুনে ঘুমই হয় না…”
“আই নিড সাম হেল্প, একটু প্রবলেমে আছি…”
“কীরকম প্রবলেম?”
“ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না, আমার লাইফটা খুব ঘেঁটে আছে। পার্সনাল লাইফ, প্রফেশনাল লাইফ…. তুই কিছু অ্যাডভাইস….” বাকি কথাটা বলতে যাচ্ছিল শতরূপ, এমন সময় ওপাশ থেকে একটা শিশুর চিৎকার শোনা যায়। ওপারের মানুষটা একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে বলে, “এই একটু দাঁড়া। ওর মা-কে বললাম ছেলেকে একটু দেখতে, তা নয়…” কয়েক সেকেন্ড ওপাশ থেকে কোনও আওয়াজ আসে না। তারপর আবার শোনা যায়, “হ্যাঁ বল এবার। প্রফেশনাল লাইফে কী ঝামেলা হয়েছে? আরে, আমারও তো আগের উইকে…”
আর কিছু না বলেই ফোনটা কেটে দেয় শতরূপ। পিছিয়ে এসে কিছুক্ষণ দেওয়ালে পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর অন্য একটা নাম্বার ডায়াল করে, “হ্যাঁ, আমি রূপ বলছি, তোর সঙ্গে দরকার ছিল, ভাই….”
“হ্যাঁ, সে-ই তো রে শালা, দরকার না থাকলে তো ফোনও করিস না… সেলেব হয়ে গেছিস, এখন ব্যাপারই আলাদা…”
“আমি একটু প্রবলেমে আছি, ভাই…”
“কীরকম প্রবলেম?”
“জানি না, আমার কোনও কিছু ভালো লাগছে না আজকাল। খুব সাফোকেটেড লাগছে। মনে হচ্ছে একটা শিকড় নেই আমার….”
“তুই শালা গাছ নাকি যে শিকড় থাকবে!” রসিকতাটা করেই নিজেকে সামলে নেয় লোকটা, “যা-ই হোক, আমার মনে হয় তোর কোথাও থেকে ঘুরে আসা দরকার। আমিও তো কাজের চাপে চাপে জাস্ট চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে যাচ্ছি। শোন-না, দুজনে মিলে বাইকে করে….”
“ঘুরে এসে? তারপর? আমাদের ঘুরে আবার ‘আসতে’ হয়, ভাই… হোয়াট দেন?”
“তারপর আবার ঘুরতে চলে যাব। দেখ ভাই, আমাদের লাইফে সুখ-দুঃখটা না মেয়েছেলের পিরিয়ডের মতো। মাসে পাঁচ দিন থাকে, তখন ফূর্তি মারো, তারপর আবার গোটা মাস ঠাপ খেতে হয়… তারপর আবার পাঁচ দিনের সুখ…”
শতরূপ কিছু বলে না। ঠোঁট কামড়াতে থাকে। ওপাশের গলা ততোধিক উৎসাহ নিয়ে বলে চলে, “আর না হলে একটাই সলিউশন। তুই ভাই এই সময় একটা বিয়ে করে নে। বিয়ে করলে জীবনের সমস্ত জ্বালা…”
আবার মুখের উপর ফোনটা কেটে দেয় শতরূপ। কল লিস্টে অনেকটা পেছনে চলে আসে। একটা পুরোনো নাম্বার ডায়াল করে। “নাম্বার ইউ আর ট্রায়িং টু রিচ ইজ নট রিচেবল।”
বাইরে পাঞ্জাবি গানের সুর এবার সপ্তমে পৌঁছেছে। শতরূপের হৃৎপিণ্ডটাকে ধরে যেন বারবার জোরে নাড়িয়ে দিচ্ছে সেটা। কী একটা হয়ে যায় শতরূপের। শক্ত করে ধরে ছিল মোবাইল ফোনটা। সেটা এবার সজোরে ছুড়ে মারে আয়নার উপর। ঝনঝন শব্দ করে বেসিনের উপর ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ে আয়নাটা। তাতেও ওর রাগ কমে না। সজোরে একটা লাথি মারে বেসিনের উপর, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা, মারতেই থাকে…. ছিটকে-আসা কাচ ওর জিনসের ফাঁকে ঢুকে পা কেটে দেয়। মাথাটা ঠুকে যায় পেছনের দেওয়ালে। শতরূপ ককিয়ে ওঠে যন্ত্রণায়। লাথি মারতে মারতে একসময় ক্লান্ত হয়ে কাচ ছড়িয়ে-থাকা মেঝের উপরে বসে পড়ে। চশমাটা ছিটকে পড়ে মেঝেতে। কিছু অদ্ভুত আওয়াজ বেরিয়ে আসে ওর মুখ থেকে। শরীরের বেশ কয়েক জায়গায় কেটে গেছে। গুঁজে-পরা শার্টটা আপাতত বেল্টের আগল ছাড়িয়ে থাইয়ের কাছে ঝুলছে। বুকের কাছের একটা বোতাম ছিঁড়ে গেছে।
দু-হাতে নিজের মাথার চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে— “আমার আর ভালো লাগছে না, মা… আমার সত্যি ভালো লাগছে না…”
কাচ ভাঙার শব্দে একজন সিকিউরিটি গার্ড ছুটে এসে ধাক্কা দিয়েছিল দরজায়। সে উঁচু গলায় চিৎকার করে, “স্যার, ভেতরে আওয়াজ হল। আপনি ঠিক আছেন তো?”
অ্যাড ব্রেক প্রায় শেষ হতে চলেছে। আবার মাইকের সামনে গিয়ে বসতে হবে। ওর শো শুরু হতে চলেছে।
কয়েক সেকেন্ড পরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে শতরূপ, তারপর শান্ত গলায় বলে, “আয়নাটা ভেঙে গেছে। আমি ঠিক আছি…”
গার্ড কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আপাদমস্তক দ্যাখে ওকে, তারপর জড়ানো গলায় বলে, “কিন্তু আপনার হাত থেকে তো রক্ত বেরোচ্ছে, স্যার… শতরূপ মিহি হাসে, “ভাগ্যিস!”
*
“স্টুডিয়োর ঘড়ি বলছে রাত একটা বেজে সাঁইত্রিশ মিনিট, আমি আরজে রূপ আছি আপনার সঙ্গে। আজ তেরোই সেপ্টেম্বর—ওয়ার্ল্ড সুইসাইড প্রিভেনশন ডে। আপনিও যদি এই মুহূর্তে কোনও মানসিক সমস্যায় ভোগেন, কিংবা জীবন একাকিত্বের ঘোলা জলে পাক খেতে থাকে, তবে একদম হেজিটেট করে না করে যোগাযোগ করুন আমাদের হেল্পলাইনে। আমরা জেগে আছি আপনার জন্য, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। তবে যতক্ষণ আপনারা হেজিটেট করছেন, ততক্ষণ চলুন আজ একটা অন্যরকম গল্প বলি। একটা ইতিহাসের গল্প।
“আচ্ছা, সব কিছুর দেবতা আছেন। লেখাপড়া, গানবাজনা থেকে শুরু করে ব্যাবসা, ঝড়বৃষ্টি, এমনকি মৃত্যুর দেবতা পর্যন্ত… কিন্তু এই আত্মহত্যার কি কোনও দেবতা আছে? সারা পৃথিবীতে যদি খোঁজখবর করি তাহলে দেখব যে, আজ থেকে বহু বছর আগে একজন আত্মহত্যার দেবতা থাকলেও থাকতে পারেন। তবে এখন তিনি কোথায় আছেন তা বলা মুশকিল….
“সে দেবতার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ খুবই ক্ষীণ। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মায়া সভ্যতায় এক বিশেষ দেবতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। জার্মানির ডেসড্রেনের রয়াল লাইব্রেরির এক ডিরেক্টর জন ক্রিচিয়ান গোতজে সতেরোশো চল্লিশ সালে ভিয়েনায় এক বিক্রেতার কাছ থেকে একটি প্রাচীন পুথি কেনেন। পুথিটি লেখা হয় আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে। বর্তমানে এর নাম ডেসড্রেন কোডেক্স। তো এই বইতেই মায়ান সভ্যতায় দেবতাদের ছবির মধ্যে এক বিচিত্র অচেনা দেবতাকে দেখা যায়। ইনি দেখতে আর পাঁচটা দেবতার মতোই। কেবল পার্থক্য হল, ইনি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছেন। এই দেবতার ইংরেজি নাম ইক্সট্যাব, স্প্যানিশে—লা দিওসা দে লা হোরকা।
“কথিত আছে, আত্মহত্যার পর মানুষের আত্মাকে পরবর্তী ধাপ অবধি। নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ইক্সট্যাবের। তবে মৃত্যুর দেবতা হলেও ইনি কিন্তু তেমন হিংস্র গোছের নন। বরঞ্চ বলা যায় খানিক রহস্যময়। ইক্সট্যাব মোহময়ী রূপ ধরে আত্মহননকারীর কাছে আসেন। এবং তার ঝুলন্ত কিংবা রক্তাক্ত দেহ থেকে আত্মাকে আলগা করে টেনে নিয়ে হারিয়ে যান কোন অচিন জগতে। যেখানে আত্মার কোনও দুঃখ থাকে না, তার আর কোনও না-পাওয়া থাকে না, কোনও একাকিত্ব থাকে না, যেখানে সে যা চায়, সব পেয়ে যায়, যেখানে তার ফেলে-আসা সব বন্ধুবান্ধব, মরে-যাওয়া মা-বাবা, সমস্ত হারিয়ে যাওয়া খেলনা সে খুঁজে পায়…
“তবে বলা বাহুল্য, মায়া সভ্যতার আরও দু-একখানা কোডেক্সে এর ছোটখাটো উল্লেখ ছাড়া এই ইক্সট্যাবের আর তেমন পাত্তা পাওয়া যায়নি। যেন ইচ্ছা করেই এর নাম-ঠিকানা বইয়ের পাতা থেকে মুছে দিয়েছে কেউ “ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন, মায়া সভ্যতা শেষ হয়ে আসার শেষদিকে এই দেবতার সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলা হয়। সভ্যতার শেষের দিকে অবক্ষয় চরমে ওঠে, সমস্ত পরিকাঠামো ভেঙে পড়ার ফলে মায়ানদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। ধর্মগুরুরা প্রমাদ গোনেন। অচিরেই তাদের কাছে ইক্সট্যাব শান্তিদায়ী যন্ত্রণানাশিনী থেকে হিংস্র সর্বনাশিনী হয়ে ওঠে। ফলে এই দেবতাকেই দেবতাদের খাতা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর সমস্ত মন্দির মুছে ফেলা হয়।
“মন্দির মুছে ফেলার ফলে দেবতার আর কোনও যাওয়ার জায়গা থাকে না। সে তখন এক বিচিত্র উপায় অবলম্বন করে। ইক্সট্যাব উপায়ান্তর না দেখে বিভিন্ন দেবতার মন্দিরে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে শুরু করে। মানুষের অজান্তেই সেই দেবতার মন্দিরের দখল নেয় সে।
“এমনকি এখনও বহু প্রচলিত দেবতার মন্দিরে নাকি লুকিয়ে আছে ইক্সট্যাব। মানুষের মনের ভেতরে লুকিয়ে-থাকা আত্মহত্যার প্রবণতার মতো টিকে আছে সে। যে দেবতার মন্দিরে তিনি লুকিয়ে থাকেন, সেই মন্দিরের একটা বিশেষ আকর্ষণ ক্ষমতা থাকে।
“যে সমস্ত মানুষ একাকিত্ব, বিষণ্ণতা কিংবা যে-কোনও কারণে জীবন থেকে পালাতে চাইছেন, তাঁদেরকে মন্দিরে টেনে আনে ইক্সট্যাব। তারপর একটু একটু করে তাঁদের মাথার দখল নিতে থাকে। তারপর একসময়…” স্টুডিয়োর দরজা খুলে বেরিয়ে আসে শতরূপ, ওদের ডিরেক্টর মোহন রুদ্র বসে ল্যাপটপে কী যেন করছিলেন। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে কফিতে চুমুক দিয়ে শতরূপ বলে, “এসব শুয়োরের গু-মার্কা রিসার্চ আপনারা জোগাড় করেন কোথা থেকে?”
“রাতবিরেতে লোকে এইসবই শুনতে চায় হে, না হলে স্বস্তিকা মুখার্জির নিপ-স্লিপের খবর আছে। করবে নাকি সেই নিয়ে গসিপ?”
“আপনার মাসিরও আপনার বাবার সামনে নিপ-স্লিপ হওয়া উচিত হয়নি, আপনি জন্মে গেছেন….
মোহন রুদ্র চেয়ারটা এগিয়ে আনেন ওর দিকে— “অন আ সিরিয়াস নোট… আমার কিন্তু মনে হয় তোমার নিজের লাইফ নিয়ে একটু ভাবনাচিন্তা করা দরকার….”
“কীরকম ভাবনা?”
“মাথার উপর মা-বাবা নেই –একা একা থাকছ, অফিস করছ, বাড়ি চলে যাচ্ছ। ডিপ্রেশন অ্যাটাক হওয়া স্বাভাবিক… আজ নগেন বলল ওয়াশরুমের কাচটা … “
“ওঃ, ওটা একটু রাগের মাথায়…. আর ‘কেউ নেই’ মানেটা কী? আমার কতগুলো গার্লফ্রেন্ড, আইডিয়া আছে আপনার?”
“শাট আপ! ওসবের কথা বলছি না, তুমি ছোট বাচ্চা নও। ইউ হ্যাভ টু সেল সামহোয়্যার। কিছুকে তো আঁকড়ে ধরতে হবে তোমাকে…”
বড় করে একটা শ্বাস নেয় শতরূপ, আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলে, “আসলে কী জানেন মোহনবাবু, একটা বয়স আর অভিজ্ঞতার পরে মানুষের জীবনে প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এগুলো অণ্ডকোশের মতো হয়ে যায়। যত আঁকড়ে ধরবেন, তত নাভিশ্বাস উঠবে…”
.
রাত দশটায় বিরাট ব্যালকনিটাকে ঘিরে থাকা উঁচু পাঁচিলের উপরে দাঁড়িয়ে ছিল শতরূপ। ওর পায়ের নীচে একটা বিরাট আলো ঝলমলে শহর শুয়ে আছে। শতরূপের পায়ে জুতো নেই। মদের বোতলটা একটু আগেই ছুড়ে ফেলেছে নীচে। বাইরে থেকে ভেসে আসা হাওয়ায় চুল উড়ছে।
পাঁচিলের উপরে সিমেন্টের টাইলস বসানো। ঝাঁ-চকচকে। ধাতুর মতো ঠান্ডা স্পর্শ। মসৃণ লাগছে উপরিতলটা। যেন বারবার আদর করতে চাইছে ওর পা-টাকে। শনশনে হাওয়া বয়ে আসছে শহরের উপর দিয়ে। ওকে ঠেলে ফেলতে চাইছে ভেতরে।
শতরূপ নীচে তাকাল। অন্ধকারে ভরে আছে গ্রাউন্ডটা। অন্ধকারটা ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ওর অবসন্ন শরীরটাকে মোহময়ী বিছানার মতো টেনে নিতে চাইছে বুকে। সেখানে নিজেকে ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে রূপের… “পোয়েটিক জাস্টিসটা ভাবছি শুধু… ওয়ার্ল্ড সুইসাইড প্রিভেনশন ডে-তে অফিসের বারান্দা থেকে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করলেন বিখ্যাত আরজে- আইরনিক্যাল ব্যাপারস্যাপার… লেকিন জনাব, আই হ্যাভ আ ব্যাড নিউজ ফর ইউ….”
চকিতে পেছনে ফিরে চেয়ে ইলোরাকে দেখতে পায় শতরূপ। হাতে একটা জার, তাতে উড়ে বেড়াচ্ছে জোনাকি। যেন একটা কাচের বাক্সে বন্দি অসংখ্য প্রাণবিন্দু বেরোনোর জন্য ছটফট করছে।
“তুই! তুই এখানে?”
জারটা মাঝখানে রেখে পাঁচিলের আরেকদিকে উঠে বসে ইলোরা। চাঁদের আলো এসে পড়ে ওর মুখে। ওর গায়ের স্বচ্ছ পোশাক ফিনফিনে হাওয়ায় উড়তে থাকে।
“দেখ, আমার বাল আর ভালো লাগছে না। তুই চলে যা এখন… আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না…
“সেইজন্যই আমি এসেছি। কথা বলতে ভালো লাগলে এখানে এসে নিশ্চয়ই বসতিস না…” হঠাৎই দঁদে সাংবাদিকের কায়দায় শতরূপের দিকে ঝুঁকে এগিয়ে আসে ইলোরা, তারপর বলে, “তা এত মেয়েদের হার্টথ্রুব… দ্য ইয়াং… ট্যালেন্টেড আরজে-রূপ হঠাৎ আত্মহত্যা করতে চাইছেন কেন? কী রহস্য এর?”
“আই হ্যাভ লস্ট দিস গেম ইলোরা…” শতরূপ ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাতের অন্ধকার শরীরে তাকায়।
“তুই তো হেরে গেছিস বুঝলাম, কিন্তু জিতেছেটা কে?”
সামনের দিকে ইশারা করে শতরূপ, “এই গোটা শহরটা। আমার চেনা-পরিচিত সব মানুষ … তুই….”
“আর ইউ শিয়োর, ডুড? এই শহরে এমন কোনও মানুষ নেই, যে তোর জীবনটাকে হিংসা করে? এমন কোনও মানুষ নেই, যে সারারাত জেগে থাকে তোর মুখ থেকে গল্প শুনবে বলে? এমন কোনও মানুষ নেই, যার জীবনে ওইটুকুই বেঁচে থাকার রসদ?”
“আমি আজকে কাজ ছেড়ে দিলে আমার থেকে বেটার কেউ চলে আসবে। কোনও কিছু কারও জন্য আটকে থাকে না।”
“তোর বাবাও ঠিক তা-ই ভেবেছিলেন। খুব একটা ভুলও ভাবেনি অবশ্য। তুই তো আর আটকে নেই…” ইলোরা নিজের মাথার চুলে হাত দেয়— “মানুষ এই যুক্তিটা খুব ব্যবহার করে জানিস, বোকার মতো ব্যবহার করে… বাই দ্য ওয়ে, আমি কবে তোর মৃত্যু চাইলাম?”
“তাহলে কী করতে পড়ে আছিস?”
“আমি জাস্ট ক্রিকেট খেলায় স্কোরবোর্ড। তুই জিরো রানে আউট হলে তো আর স্কোরবোর্ডে ব্যাট ছুড়ে মারিস না… আচ্ছা যাক সে কথা, ধরে নে আজকে রাতের মতো আমি তোর বন্ধু… তুই আমায় বল, তুই কী চাস? একটা ডাল-ভাত-খাওয়া জীবন? মা-বাবা, সকাল-বিকেলে চাকরি, লাল টুকটুকে বউ? এই তো?”
অনেকক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে শতরূপ। কপালের উপর এসে-পড়া চুলগুলো সরিয়ে দেয়। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “বেঁচে থাকতে চাওয়ার ইচ্ছা…”
“সেটা কীরকম জিনিস?”
কাঁধ ঝাঁকায় শতরূপ, “মাঝে মাঝে ভাবি, আমাদের সবার বেঁচে থাকার মধ্যে একটা ম্যাজিক আছে। সেই ম্যাজিকটা, যেটার জন্য আমাদের পাড়ার খোঁড়া কুকুরটা রোজ সকালে ভ্যাট উলটে তার ভেতর থেকে পচাগলা খাবার খুঁটে খায়… তুই দেখ, ওই রাস্তাটাকে দেখ। এতগুলো বাস চলছে, প্রাইভেট কার চলছে, লরির ভেতর কোনও হেল্পার ঘুমিয়ে পড়েছে, এরা সবাই বাঁচতে চাইছে… কোনও না কোনও কারণে। ভালোবাসা হোক, সেক্স কিংবা টাকাপয়সা হোক, কোনও না কোনও মায়ায় এরা সবাই বেঁচে থাকতে চায়… এদের উদ্যাপন আছে.. আমার কেন ভালো লাগে না? আমার কেন কাউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছা করে না? তুই বুঝতে পারছিস, ইলোরা? আমি ভালো নেই বলে আমার কষ্ট হয় না। আমার কষ্ট হয় আমার ভালো থাকতে ইচ্ছে করে না বলে…
“বুঝেছি…” জোনাকিভরা জারটাকে একদিকে সরিয়ে রেখে শতরূপের পাশে এসে বসে ইলোরা। গালের উপর একটা হাত রাখে। তারপর নরম, শান্ত গলায় বলে, “আজ একটু শান্ত হয়ে বোস। আমি আছি তো এখন… কথাটা বলেই কী যেন ভেবে বলে, “জানি আমি আর পাঁচটা মানুষের মতো নয়। আমার কথা তুই কাউকে বলতে পারিস না… কিন্তু তোর ছোট থেকে আজ অবধি আর কে ছিল বল আমি ছাড়া? আজও দেখ, আমিই তোর পাশে বসে আছি…”
“সবাই কেন চলে গেল বল তো?” শতরূপের গলা কাঁপতে থাকে, “এক-এক করে সবাই… যতজন মানুষ ছিল আমার… কেউ থাকল না। কেন থাকল না বল? আমি তো হতে চাইনি সেলেব্রিটি…. আমি এত টাকাপয়সা কিচ্ছু চাইনি, তুই বিশ্বাস কর। তা-ও সবাই চলে গেল কেন?”
ইলোরা অদ্ভুত সবুজ চোখ তুলে তাকায় ওর দিকে। তারপর তেমনি নরম গলায় বলে, “তুই তো ধরে রাখতে চাসনি কাউকে তা-ই না?”
“আমার ভুল হয়ে গেছে…” এবার ঝরঝরে মুক্তোর দানার মতো জল নামে শতরূপের চোখ থেকে— “আমার ভুল হয়ে গেছে… আমি আর কখনও এরকম করব না…”
ওর মুখটা তুলে ধরে ইলোরা, অন্ধকারের দিকে দেখিয়ে বলে, “ওরা সবাই ডাকছে তোকে…. সবাই… শুধু এইটুকু শুনতে চেয়েছিল তোর কাছে, সবাই শুধু দেখতে চেয়েছিল, ওরা তোকে যতটা ভালোবেসেছিল, তুইও ঠিক ততটা আগলে রাখতে চেয়েছিলি ওদের… ব্যাস, এইটুকু…”
ইলোরা হঠাৎ ওর মাথাটা টেনে নেয় নিজের কাঁধে। দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর কী যেন ভাবতে ভাবতে তন্ময় হয়ে বলে, “দেখ, ওই বাড়িঘরগুলোর ভেতর, ওই নোংরা বস্তিতে, চলন্ত গাড়িগুলোর ভেতর এমন অনেক মানুষ আছে, যারা ঠিক তোর মতোই এই কথাগুলো বলতে চায়… তারা বারবার নিজের প্রেমিকাকে, নিজের মা-কে, বাবাকে, বন্ধুকে, ভাইকে, বোনকে আঁকড়ে ধরে বলতে চায় না—আমি কখনও কোথাও যেতে দিতে চাই না তোমাকে… নির্লজ্জের মতো বলতে চায়… কিন্তু কেউ তোর মতোই বলতে পারে না… তুই ওদের মুখে ভাষা দিবি না?”
“না…” সজোরে মাথা নাড়ে শতরূপ, “আমার কোনও শুয়োরের বাচ্চার জন্য কিছু যায় আসে না। আমি কারও কথা ভাবি না।”
“আচ্ছা বেশ, ঠিক আছে। তোর যখন বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই, তখন তুই ঝাঁপ মেরে দে। কিন্তু তার আগে আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে…”
“কী রিকোয়েস্ট?”
“ছোট থেকে এতদিন ছিলাম তোর সঙ্গে, আমাকে একটা গল্প শোনা শেষবারের মতো? জীবনে তো আর কিছু পেলাম না তোর থেকে…”
“কীসের গল্প শুনবি বল?”
“তুই কবে থেকে কীভাবে আমায় চিনলি, সেই গল্পটা।”
“তোকে কবে থেকে চিনি আমি?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে শতরূপ। ইলোরা মৃদু হাসে। তারপর বলে, “আমি জানতাম, তুই ভুলে গেছিস। তুই বলতে পারবি না।”
“সত্যিই আমার কিছু মনে পড়ছে না রে.” থতোমতো খেয়ে কী যেন ভাবতে থাকে শতরূপ। এতদিন এই কথাটা ও ভেবে দেখেনি কেন? সত্যি তো…
বিড়বিড় করে শতরূপ, “মনে হয়, তোকে একদম ছোট থেকেই চিনি। কিন্তু কবে থেকে সেটা মনে পড়ছে না। কিছুতেই পড়ছে না…”
“তুই ছাড়া আরেকজন চেনে আমাকে… তার সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করে নিস…..”
“কে?”
“তোর থেকে অনেক দূরে থাকে সে। তোর থেকে তার জীবনে অনেক বেশি দুঃখ। কিন্তু তুই নিজের কাছে না থাকলেও তার কাছে আছিস, তার লেখায়, আঁকায়… সব কিছুতে…. অপেক্ষা করছে তোর জন্য… ভয় পাচ্ছে তোর সঙ্গে দেখা না-হওয়ার… অন্যের মনে আমাদের নিয়ে ভয়ের থেকে বড় পাওয়া আর কী থাকতে পারে বল আমাদের?”
“কিন্তু তুই এত কিছু কী করে জানলি?”
“জানব কী করে আবার?” ঠোঁট ওলটায় ইলোরা, “আমার মনে আছে তোর ছোটবেলার কথা…”
“কী ঘটেছিল আমার ছোটবেলায়?”
“এইজন্যেই মানুষ গল্প শোনে, জানিস? শেষে কী হবে আর প্রথমে কী হয়েছিল জানার জন্য। নইলে মাঝখানে ঘ্যানঘ্যানানি আর কার ভালো লাগে বল তো? সবাই তাই মাঝখান থেকে বেরিয়ে যেতে চায়… তুইও চাইছিস আজকে…”
শতরূপ মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু স্পষ্টভাবে কিছুই মনে পড়ে না তার। ইলোরা ছোট থেকে ওর কাছে ছিল নাকি কোনওদিন হঠাৎ করে আলাপ হয়েছিল?
অদ্ভুত অস্বস্তি ঘিরে ধরে ওকে। একটা ঝাপসা অবয়ব সরে যেতে থাকে ওর সামনে থেকে। কোনও মানুষের চেহারা ফুটবে ফুটবে করেও ফোটে না। তার বদলে একটা ঘুমের রেশ এসে আচ্ছন্ন করতে থাকে ওকে। কোথাও যেন টেনে নিয়ে যেতে চায়। ইলোরার শরীর আর জোনাকির জারটা একটু একটু করে মিলিয়ে আসে… লম্বা ধাতব পাঁচিলের উপর শুয়েই ও ঘুমিয়ে পড়ে….।
