জোনাকির রঙ – ৬

(ষষ্ঠ অধ্যায়)

For you – I’ve waited all these years
For you I’d wait ‘til kingdom come
Until my day- my day is done
And say you’ll come and set me free
Just say you’ll wait – you’ll wait for me

চারপাশে বনজঙ্গল ঘিরে রেখেছে ওদের। মাঝখানে গাছপালার ফাঁকে একটুখানি ফাঁকা জায়গা। সেই জায়গাটা একটু পরিষ্কার করে কাঠকুটো জড়ো করে ক্যাম্পফায়ার করা হয়েছে। তার উপর মাংস ঝলসানো হচ্ছে। ক্যাম্পফায়ারকে ঘিরে বিছিয়ে আছে কয়েকটা পাথর। সেই পাথরগুলোর উপরেই বসেছে ওরা।

এই শীতের রাতে আগুনের উত্তাপে বেশ আরাম হচ্ছে গায়ে। গিটারটা আজ সকালে বিনয়ই জোগাড় করে এনেছিল কোথাও থেকে। সেটা নিয়েই এতক্ষণ গান গাইছিল শতরূপ। এবার গান থামিয়ে গিটারটা পাশে নামিয়ে রেখে বিয়ারের বোতলটা হাতে তুলে নিল। গলাটা একেবারে শুকিয়ে গেছে। শতরূপ আর ঐন্দ্রিলার হাতেই কেবল বিয়ারের বোতল। বাকিরা অন্য কী একটা পান করছে। তাতে নেশাটা আরও চড়া হয়। জিনিসটার গন্ধ একেবারে পছন্দ হয়নি শতরূপের। মা

ঐন্দ্রিলা এতক্ষণ ওর পাশেই বসে ছিল। গান থামতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “কী সুন্দর রে গানটা!”

“হ্যাঁ, আমি যখন রেডিয়োতে কাজ করতাম, তখন মাঝেমধ্যে এই গানটার রিকোয়েস্ট আসত। তার আগে শুনিনি, ওখান থেকেই শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল…”

গোটা তিনেক বিয়ারের বোতল শেষ করে ফেলেছে ঐন্দ্রিলা। ক্যাম্প থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ওদের গাড়িটা। গাড়ির সামনেই বসে আছে কয়েকটা স্থানীয় উপজাতি মেয়ে। সামান্য কিছু টাকাপয়সা দিলে ছোটখাটো অনুষ্ঠানে নাচ দেখায় ওরা। আজ এখানে আসার আগে জংলুই নিয়ে এসেছে ওদের।

এতগুলো মানুষ এক জায়গায় হয়ে একটা ছোটখাটো গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কখনও নিজেদের মধ্যে গল্প করছে ওরা, কখনও আবার শুরু হচ্ছে গান। এতক্ষণে অনুরোধ আসে বিনির কাছে। ভায়োলিন বাজিয়ে শোনাতে হবে। বিনি একটু হেসে পাথর থেকে উঠে ভায়োলিনটা নিয়ে এগিয়ে যায় পাশের ন্যাড়া পাথরটার দিকে। ও হ্যালান দিয়ে বাজাতে পছন্দ করে না।

ক্যাম্পফায়ারের ঠিক পাশে বসে একটা পা ভাজ করে রাখে পাথরের চাতালটার উপর। তারপর ভায়োলিন কাঁধে তুলে নেয়।

বিনি উঠে যাওয়ায় বিনয় একা পড়ে গিয়েছিল। সে এসে শতরূপের পাশের পাথরটায় বসে পড়ে। হাতের গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে রূপের দিকে চেয়ে বলে, “আপনি এর আগে এদিকটায় আসেননি, তা-ই না?”

“না, নর্থ বেঙ্গলে আগে আসিনি।”

“বিনিদিও কলকাতায় যায়নি কখনও। অথচ মনে হয়, আপনাকে করে থেকে চেনে।”

“চেনে তো বটেই, রেডিয়োতে শুনত যখন….”

“না না, সেটা বলছি না। তারও আগে থেকে….”

“তার আগে থেকে বলতে?”

“মানে ছোটবেলা থেকে। স্যারের কাছে এসে থাকার আগে থেকে…”

“সেটা কী করে সম্ভব? আমি রেডিয়ো জয়েন করেছি না হলেও দু-হাজার ষোলোর দিকে। বিনি ওখানে থাকতে শুরু করেছে তার বছর চারেক আগে…”

বিনয়ের বদলে একবার জংলু উত্তর দেয়, “সম্ভব নয়, সেইজন্যই তো অবাক লাগে। আপনাকে প্রথমবার দেখে তো আমি চমকে গিয়েছিলাম। বিনিদি খাতায় প্রচুর ছবি আঁকত। তার অনেকগুলোর সঙ্গে আপনার মুখের প্রচুর মিল।”

কথাগুলোতে অকারণেই অস্বস্তি হয় শতরূপের। প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলে, “তুমি এখানে এতদিন ধরে আছ, বাড়ি যেতে ইচ্ছা করে না?”

“আমার বাড়ি এখানেই ছিল, স্যার। এখন আর কেউ থাকে না সেখানে। স্যারের দাদা, মানে বিনিদির বাবার কাছে আমার বাবা চাকরি করতেন। ওখানেই থাকতাম আমরা…”

“মানে ভদ্রলোককে তুমি চিনতে?”

জংলু একটু চাপা গলাতেই বলে, “চিনতাম, তবে ঠিক পছন্দ করতাম না।”

“কেন?”

“লোকটা হেবি রগচটা ছিল। কেন যেন সব সময় খুব রেগে থাকত। একটু এদিক-ওদিক হলেই সর্বনাশ! চড়থাপ্পড় মেরে দিত কখনও কখনও, গালিগালাজ করত…”

“তার মানে তুমি বিনিকে ছোট থেকে দেখেছ?”

“দেখেছি বললে ভুল হবে। আসলে আমি তো এই কটেজটাই দেখাশোনা করতাম। তখন এখানে তো বিনিদিদি থাকত না। ন-মাস, ছ-মাসে আসত। কখনও পাঁচ-ছ-দিন, আবার কখনও দু-তিন দিন থেকেই চলে যেত।”

“তোমার সঙ্গে তখন কথাবার্তা হত না?”

“আমিই বলতাম না। কেমন যেন ভয়-ভয় লাগত।”

“ভয়! কীসের?”

“সব সময় চোখের তলায় কালি, চুল উশকোখুশকো, অত বড়লোকের মেয়ে কিন্তু সব সময় কেমন মন খারাপ করে রয়েছে। নিজের মনে কী যেন ভেবে চলেছে সারাদিন…”

ভায়োলিনের উপর ছড় টানতে শুরু করেছে ঐন্দ্রিলা। করুণ সুর নয়, যেন নাচের তালে তালে হাওয়ার ভেসে এগিয়ে যাচ্ছে একঝাঁক কিশোরী মেয়ে। সেই সুরের তালে তালে ওরা হাততালি দিতে শুরু করেছে। একটু দূরেই ক্যাম্পফায়ারের আগুন থেকে চিড়বিড় করে কাঠ ফাটার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

ঐন্দ্রিলার চোখ দুটো বন্ধ। একটানা বাজিয়ে চলেছে। রূপ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কী আশ্চর্য একটা ম্যাজিক আছে যেন মেয়েটার ভায়োলিনের তারগুলোর মতোই ছড় দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে। কোনও এক মধ্যে! মনে হয়, সে হয়তো আশপাশের সব ক-টা মানুষকে ওই বিশেষ সুর তুলতে চাইছে বাদ্যযন্ত্রে। সেই সুর বিষাদের, নাকি আনন্দের, নাকি অন্য কোনও অনাবিষ্কৃত অনুভূতির, তা বোঝা যায় না।

একসময় ভায়োলিন থামিয়ে উঠে পড়ে ঐন্দ্রিলা। ওরা একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠেছে সবাই। পাশের গ্রাম থেকে আসা স্থানীয় মেয়েদের সবাইকে এবার ডেকে নেয় ঐন্দ্রিলা। ফাঁকা জায়গাটায় ওদের নাচ শুরু হয়। সবাই মিলে উঠে দাঁড়ায়।

পানীয়ের গন্ধে ভরে আছে জায়গাটা। সবারই নেশা জমে উঠেছে ধীরে ধীরে। রাত বাড়ছে। লোকসংগীতের সুরে দুলতে থাকে ওদের কোমর। কেউ কারও দিকে খেয়াল রাখে না আর।

শতরূপের এত সহজে নেশা হয় না। ও বিয়ারের বোতলটা হাতে ধরে জঙ্গলের একটা গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একমনে তাকিয়ে দেখছিল স্থানীয় মেয়েগুলোর নাচের দিকে। হঠাৎ করে পেছন থেকে টোকা। কে যেন ডেকে ওঠে ওকে। পেছন ফিরে ঐন্দ্রিলাকে দেখতে পায়। ওর হাতেও বিয়ারের বোতল। ঠোঁট ভিজে….

“এই, জঙ্গলে হাঁটতে যাবি?”

“এত রাতের জঙ্গলে হাঁটব! মানে কেন?”

‘কেন মানে আবার কী? রাত্রির জঙ্গল দেখতে ইচ্ছা করছে আমার। তোর করছে না?”

শতরূপ ব্যঙ্গের হাসি হাসে, “তোর নেশা হয়ে গেছে। ওরা একটু পরেই খেতে বসবে, খুঁজবে আমাদের…”

“খুঁজুক না হয়…” বিনির কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।

“আর জঙ্গলে হারিয়ে গেলে?”

“এত বড় ক্যাম্পফায়ার হচ্ছে, আগুনের আলো দেখে আর শব্দ শুনে ফিরে এলেই হল…” ওর হাত ধরে আবার টান দেয় ঐন্দ্রিলা— “এত ঘাবড়ানোর কী আছে? চলে আয়…”

ঐন্দ্রিলার পা টলে যাচ্ছে। শতরূপ হেসে বলে, “এইটুকু বিয়ারে নেশা হয়ে গেছে তোর?”

“আমার তো খাওয়ার অভ্যাস নেই….”

“নেশার ঘোরে রাস্তা চিনতে না পারলে কী হবে?”

“তোর নেশা হয়েছে?”

“না।”

“তাহলে তুই চিনিয়ে দিবি…..

অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঐন্দ্রিলার হাতের টানের কাছে নতিস্বীকার করে শতরূপ। দুজন মিলে ঢুকে আসে জঙ্গলের পথে। শুকনো পাতার উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই ঐন্দ্রিলার দিকে লক্ষ রাখে রূপ। মেয়েটা যেভাবে টলছে, তাতে যে-কোনও সময় পড়ে যেতে পারে।

“তুই সব কিছু ভুলে গেলি, তা-ও এত ভালো ভায়োলিন কী করে বাজাতে পারিস বল তো?” শতরূপই প্রশ্ন করে প্রথম।

বোতল মুখে ঠেকায় ঐন্দ্রিলা— “এগুলো মাল মেমোরির ব্যাপার। মনে থেকে যায়। ভালো কথা, আর কী কী পারি আমি?”

শতরূপ মনে করার চেষ্টা করে, “তুই ভালো ছবি আঁকতে পারতিস। তবে যেগুলো আঁকতিস, তার বেশির ভাগই কেমন পিকিউলিয়ার টাইপের। যেমন একটা ছবির কথা আমার মনে আছে।”

“কীরকম ছবি?”

“ধর একটা বিরাট বড় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সরু একফালি রাস্তা। সেই রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে সূর্য ডুবছে। তবে নর্মাল সূর্য নয়। সূর্যের ভেতরে একটা দরজা দেখা যাচ্ছে।”

“যাঃ শালা! সূর্যের মধ্যে দরজা!”

“ছবিটা খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু কেন এঁকেছিলি, বুঝতে পারিনি।”

“আমারও তো মনে পড়ছে না। যাক গে… আর কী এঁকেছিলাম?”

“একটা মনস্টার!”

“মনস্টার! কীরকম?”

“মানে মনস্টার যেরকম দেখতে হয় আর কী… কুচকুচে কালো… মুখটা বীভৎস …”

ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবে ঐন্দ্রিলা। তারপর বলে, “শালা কোনও কিছুর কথাই মনে পড়ে না। এই দাঁড়া দাঁড়া…” কথাটা বলে একটা হাত দিয়ে শতরূপকে থামিয়ে দেয় সে। তারপর ওর জামা টেনে বলে, “আমার না একটা গল্পের কথা মনে পড়ছে…”

“কীসের গল্প?”

“সেই যে একটা লোক গিটার বাজাত। তারপর তার বউকে খুঁজতে কোথায় একটা গিয়েছিল, পেছন ফিরে তাকানো বারণ ছিল… ধুর বাল, পুরোটা মনে পড়ছে না…” ওর জামাটা ছেড়ে দেয় ঐন্দ্রিলা।

বোতলে আর-একটা চুমুক দেয় শতরূপ— “গিটার নয়, হার্প বাজাত আর গান গাইত। অর্ফিয়াস আর ইউরিডাইসের গল্প, আমার মনে আছে…”

“বেশ, শোনা আমাকে…”

বিনির কাঁধে একটা হাত রাখে শতরূপ। ক্যাম্পফায়ার থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছে ওরা। গানের সুর আর শোনা যাচ্ছে না এখান থেকে।

“গ্রিস দেশের উপকথা। অর্ফিয়াস ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গায়ক। তার গান শুনে মোহিত হত না এমন মানুষ তো ছার, এমন কোনও দেবতাও ছিল না। তো এই অর্ফিয়াসের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সুন্দরী ইউরিডাইসের সঙ্গে। ইউরিডাইসকে ভীষণ ভালোবাসত ছেলেটা। কিন্তু বেচারার কপাল খারাপ। বিয়ের দিন ইউরিডাইসকে এসে কামড়াল একটা বিষধর সাপ। বিয়ে হওয়ার আগেই ইউরিডাইস অফিয়াসের কোলেই মারা গেল।

“গায়ক অর্ফিয়াস স্ত্রী-র মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। সে ঠিক করল, নরকের দেবতাদের কাছে দরবার করে ফিরিয়ে আনবে ইউরিডাইসকে। শুরু হল তার অভিযান। নরকের দরজা অবধি হেঁটে গেল সে। হাতে কেবল সেই হার্প। নরকের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক তিনমাথা হিংস্র কুকুর সার্বেরাস। সে আক্রমণ করবে কী? অর্ফিয়াসের মিষ্টি গান শুনে ব্যাটা ঘুমিয়েই পড়ল। মৃত আত্মাদের নরকের নদী ‘স্টিক্স’ পারাপার করায় যে ক্যারন, সে-ও গান শুনে অর্ফিয়াসকে আটকাল না। এমন করে গান গাইতে গাইতে শেষে সে উপস্থিত হল নরকের দেবতা হেদিসের কাছে। “হেদিস অর্ফিয়াসের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত ইউরিডাইসকে মুক্তি দিতে রাজি হল। কিন্তু একটা শর্তে… অর্ফিয়াস যখন নরক থেকে বেরোবে, তখন ইউরিডাইসের আত্মা ওকে অনুসরণ করে আবার জীবিত মানুষের জগতে ফিরে যাবে। কিন্তু এই যাবার পথটুকুতে কিছুতেই অর্ফিয়াস পেছন ফিরে তাকাতে পারবে না। তাকালেই ওর হবু বউয়ের আত্মা চিরকালের মতো ফিরে যাবে নরকে….

“শর্তে রাজি হয়ে আবার নিজের জগতের পথে হাঁটা দিল অর্ফিয়াস। কিন্তু যতই এগোয়, ততই সন্দেহ হতে থাকে ওর। সত্যি ওর পেছন পেছন আসছে তো ইউরিডাইস? পায়ের আওয়াজ নেই কেন? নিশ্বাসের আওয়াজ নেই কেন? ওকে ডাকছে না কেন? কিছুতেই নিজেকে আর সামলাতে পারল না অর্ফিয়াস। মাত্র একবারের জন্য, একটা পলকের জন্য পেছন ফিরে চাইল…. আর সঙ্গে সঙ্গে ওকে অনুসরণ-করা ইউরিডাইসের আত্মা ডুবে গেল নরকের অন্ধকারে। দুই প্রণয়ীর চিরবিচ্ছেদ ঘটল…..

“অর্ফিয়াস নিজের জগতে ফিরে এল, কিন্তু সে আর আগের মানুষটি রইল না। সে ঠিক করল, আর কোনওদিন কাউকে ভালোবাসবে না সে। একটা পাথরের উপর বসে সে কেবল পৃথিবীর সব ব্যর্থ প্রেমের গান গাইতে থাকল। তার গান শুনে পৃথিবীর মানুষ কেঁদে কেঁদে আকুল হয়ে গেল, কিন্তু ইউরিডাইস আর কিছুতেই ফিরল না ওর কাছে…

“তো এই সময়ে অর্ফিয়াসের উপরে নজর পড়ল একঝাঁক শয়তান ডাইনির। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল, কী এমন ছিল ইউরিডাইসের মধ্যে, যে অর্ফিয়াস আর কাউকে ভালোবাসবে না? তারা একে একে অর্ফিয়াসের মন জয় করার চেষ্টা করল কিন্তু ব্যর্থ হয়ে একসময় হিংস্র নখের আঁচড়ে অর্ফিয়াসকে মেরে ফেলল…”

গলা শুকিয়ে গিয়েছিল শতরূপের। মদের বোতলে বড় করে একটা চুমুক দিল সে।

“তারপর কী হল?”

“কী আবার হবে? যা হবার ছিল। মরার পর আবার ইউরিডাইসের সঙ্গে দেখা হল অর্ফিয়াসের। তবে পৃথিবীতে নয়, মৃত্যু-পরবর্তী জগতে। শোনা যায়, এখন নাকি সেই অবিনশ্বর জগতে দুজনে একসঙ্গে হাত ধরে হেঁটে বেড়ায়। মাঝে মাঝে অর্ফিয়াস ইউরিডাইসকে ফেলে একটু এগিয়ে যায়, তারপর একটু পেছন ঘুরে প্রাণ ভরে দ্যাখে ইউরিডাইসকে। আর কোনও ভয় নেই ওদের…”

গল্পের মধ্যে যেন হারিয়ে গিয়েছিল ঐন্দ্রিলা। হঠাৎই বেশ কয়েক পা পিছিয়ে যায় ও। শতরূপ অবাক হয়ে পেছন ফেরে— “তুই পিছিয়ে গেলি কেন?”

“আমি ইউরিডাইস! তুই পেছন ফিরে তাকালি, আমি চললুম…” বলেই জঙ্গলের ভেতরের দিকে দৌড় দেয় ঐন্দ্রিলা। শতরূপ হন্তদন্ত হয়ে ছুট দেয় তার পেছনে। মেয়েটা যেভাবে মাতাল অবস্থায় আছে, তাতে একবার রাস্তা হারিয়ে ফেললে একটা বিপদ ঘটে যেতে সময় লাগবে না।

একটা গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ঐন্দ্রিলা, শতরূপ কাছে যেতেই আবার সরে যায় অন্য একটা গাছের কাছে।

“অদ্ভুত তো, এই মাতালকে জঙ্গলে আনাই ভুল হয়েছে…” চিৎকার করে বলে রূপ।

এখন আর ঐন্দ্রিলাকে দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেছে সে। কোথা থেকে যেন প্রশ্ন ভেসে আসে, “তোর কী মনে হয়, কেন পেছন ফিরে তাকিয়েছিল অর্ফিয়াস?”

“বউকে দেখেনি অনেকদিন, মন খারাপ করছিল…”

আবার অন্য জায়গা থেকে উত্তর আসে, “উঁহু, দেখতে চাইছিল সত্যি বউ আছে না অন্য কেউ?”

“অন্য কেউ আসবে কেন?”

“নরক থেকে আসছে যখন, কোনও ভূতপ্রেত বউয়ের বেশ ধরে পিছু নিতে পারে, ক্ষতি কী?”

“ব্যাস, সন্দেহ করে লাভ কী হল? বউ, ভূত যা-ই হোক, গেল তো…”

“এখন ধর, অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ঐন্দ্রিলা বেরিয়ে এল, তুই বুঝবি কী করে সেটাই সত্যি ঐন্দ্রিলা? হতে পারে, এই জঙ্গলের ভেতরে এমন কেউ আছে যে রূপ ধরতে পারে….”

আওয়াজটা শুনে শুনে কোনওরকমে ফলো করছে শতরূপ। এতক্ষণ ওর মাথাটাও গুলিয়ে যেতে শুরু করেছে। সত্যি কি হারিয়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে?

“কী রে? বললি না তো, আমাকে খুঁজে পাবি কী করে? আমার মতো দেখতে আর-একটা মানুষ সামনে এসে দাঁড়ালে?”

ঐন্দ্রিলা হঠাৎ অনুভব করতে পারে, যে গাছটার আড়ালে ও লুকিয়ে আছে, ঠিক সেই গাছটার অন্যদিকে এসে দাঁড়িয়েছে একটা মানুষ। চেয়ে আছে ওর দিকে। ওর ঘাড়ের উপরে তার নিশ্বাস এসে পড়ছে, সেই সঙ্গে ভেসে আসে কয়েকটা শব্দ, “চোখ বন্ধ করে। যে মানুষটা সামনে এসে দাঁড়ালে সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়, যে সামনে থাকলে মায়ের গর্ভের মতো নিরাপত্তা আগলে রাখে, পৃথিবীর সব আলো নিবে গিয়ে চোখে এক অদ্ভুত আরাম দিয়ে যায় মনের ভেতর, তাকে কেবল চোখ বন্ধ করে চিনে নিতে হয়…”

ঐন্দ্রিলা পেছন ফিরতে যেতেই শতরূপের বুকে জড়িয়ে যায় ওর মাথাটা। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ওর। শতরূপ সরে আসতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই ঐন্দ্রিলা দুটো হাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরেছে। আলতো করে ওর বুকে আশ্রয় নিয়েছে বিনির মাথাটা। কী যেন খুঁজতে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর ওইভাবেই স্থির হয়ে যায় মেয়েটা।

ঢিমে তালে জঙ্গলের ভেতরে বাতাস বইতে থাকে। আবার কানে আসতে থাকে স্থানীয় গানের সুর। কিন্তু মানুষের কোলাহল কোথায় যেন ডুবে যায়। জঙ্গলের ঠিক এই জায়গাটায় হয়তো বহু বছর কারও পা পড়েনি। কেউ চোখ মেলে তাকায়নি এই আকাশছোঁয়া গাছগুলোর কাণ্ডের দিকে। তারা যেন এই মুহূর্তটার জন্যেই অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে ছিল এতগুলো বছর। এই ফাঁকটুকুকে অন্ধকারে ঢেকে দেয় তারা। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে যায় কোন মহাশূন্যে।

“যদি এভাবেই থেকে যাই সব সময়? নরক হোক, পৃাথবা হোক, কিংবা কোনও জঙ্গল হোক, থাকতে দিবি না?”

“আমি আসলে…” ইতস্তত করে শতরূপ।

“তুই আসলে হারিয়ে গেছিস এই জঙ্গলের ভেতর। তোকে আর কেউ খুঁজে পাবে না কোনওদিন, তা-ই না?”

“হ্যাঁ, কিন্তু বাইরে ওরা হয়তো খুঁজবে আমাদের।”

“কেউ খুঁজছে না আমাদের। কেবল আমি তোকে খুঁজে চলেছি বহুকাল ধরে…”

এই ঐন্দ্রিলাকে আগে কখনও দেখেনি শতরূপ। দূর থেকে একটা ডাক শোনা যায়। বিনির নাম ধরে ডাকছে কেউ। হঠাৎ ওদের খেয়াল হয়েছে অনেকক্ষণ ধরে দুজন ক্যাম্পফায়ারের আশপাশে নেই। ঐন্দ্রিলা শক্ত হাতে ধরে আছে ওকে। কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। মাথার উপরে আকাশটাও ঢাকা পড়ে গেছে অন্ধকারে। সমস্ত চরাচর ডুবে গেছে। শুধু ওই ছাড়তে না-চাওয়া হাতটা আগলে রেখেছে ওকে।

এভাবে কি সহজে ধরতে পারে কেউ? ও নিজে কি কখনও ধরেছে * কাউকে? নাকি ঐন্দ্রিলার আরও কোনও গল্প আছে, যা ও জানে না? সে গল্পটা জানলে ও নিজেও এভাবেই জাপটে ধরতে পারবে ওকে… হঠাৎ একটু আগে নিজের গাওয়া গানটা মনে পড়ে যায় ওর… কী যেন একটা মানে আছে গানটার…

For you I’d wait ‘til kingdom come
Until my days- my days are done
And say you’ll come and set me free
Just say you’ll wait – you’ll wait for me

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *