এনআইএ হেডকোয়ার্টার, দিল্লি।
দেওয়ালে ঠেস দিয়ে চোখ বুজে বসে আরশি ভাবছিল গত চব্বিশ ঘণ্টায় কীভাবে ওর জীবন আচমকা ঝোড়ো হাওয়ায় তছনছ হয়ে গেল!
পরশু রাতে সায়ন্তনকে কেউ অপহরণ করেছে এ খবর আরশি জানত না। সল্টলেক থেকে বেরিয়ে আরশি সোজা বাড়ি ফিরে গেছিল। রাত দেড়টা-দুটো পর্যন্ত কম্পিউটারে কাজ, তারপর ঘুম। গতকাল সকালে সেজন্য ঘুম থেকে উঠতে কিছুটা দেরি হয়েছে। দশটা নাগাদ মা প্রায় ঠেলে যখন ওকে ঘুম থেকে ওঠাল, তার মধ্যে সায়ন্তনের অপহরণের ঘটনা সব চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ হয়ে গেছে। সকালে টিভি দেখার অভ্যেস নেই আরশির, সুতরাং দুপুর একটা নাগাদ সে যখন অফিসে পৌঁছোল, তখনও সায়ন্তনের ব্যাপারে তার কাছে খবর ছিল না।
আরশি পরে চিন্তা করেছে অফিস থেকে এ ব্যাপারে একবারও ওকে কেন কেউ ফোন করল না। অনেক ভেবেচিন্তে আরশি বুঝেছে যেহেতু ততক্ষণে পুলিশের সব সন্দেহ ওর ওপর এসে পড়েছে, সেজন্য ওকে ফোন করে নিজে বিপদে পড়তে চায়নি কেউ।
গাড়ি চালাতে জানলেও কলকাতার রাস্তায় ড্রাইভ করতে আরশি ভয় পায়। সেজন্য ট্যাক্সিতে যাতায়াত করে। গতকাল অফিসের সামনে ট্যাক্সি থেকে নামার সঙ্গেসঙ্গে আরশি দেখতে পেল রিসেপশনের অনন্যা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে রাস্তার দিকে উদ্ বিগ্নভাবে তাকিয়ে আছে। ওকে দেখেই অনন্যা কিছুটা হাঁফ ছাড়ার মতো ভঙ্গিতে বলল, ‘আরশিদি, আমি আপনার জন্য ওয়েট করছিলাম। আপনি সোজা সান্যাল স্যারের রুমে চলে যান, ইউ হ্যাভ সাম ভিজিটার্স দেয়ার!’
‘কী ব্যাপার বলো তো?’ জিজ্ঞেস করল আরশি, ‘আমার ভিজিটার রিসেপশনে না বসে সোমকবাবুর ঘরে কেন? তারা কারা?’
অনন্যা থতোমতো খেয়ে বলল, ‘ভেরি আনইউজুয়াল গেস্ট তো, সেজন্য মালিক নিজের ঘরে বসিয়েছেন। উনি নিজেও এসেছেন, আপনার জন্য সবাই ওয়েট করছেন।’
মেয়েটার ন্যাকামি দেখে আরশি যারপরনাই বিরক্ত হল। কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়তো ঘটেছে সেজন্য কাগজের মালিক এত তাড়াতাড়ি অফিসে চলে এসেছেন। সাধারণত তিনি বিকেল চারটের আগে আসেন না। কিন্তু আরশির উপস্থিতি যখন এতই গুরুত্বপূর্ণ, সেক্ষেত্রে মেয়েটা ঢং করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে না থেকে ওকে একটা ফোন করতে পারত।
লিফটের দিকে এগোতে এগোতে আরশি বলল, ‘এত দরকারি ব্যাপার যখন, তখন আমাকে একবার ফোন করলে তো পারতে—’
‘না দিদি, মানে, একটু অসুবিধে, মানে, আপনি ওপরে গেলে ব্যাপারটা বুঝবেন—’, অনন্যা পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল।
‘ঠিক আছে, আমি দেখে নিচ্ছি,’ বলতে বলতে আই কার্ড সেন্সরে ঠেকিয়ে আরশি কাচের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে লিফটের বোতামে চাপ দিল। লিফট একতলায় দাঁড়িয়ে ছিল। আরশির সঙ্গে অনন্যাও লিফটে ঢুকল।
‘তুমি আমাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাবে নাকি?’ বিদ্রূপ করল আরশি, ‘আমি সোমকবাবুর ঘর চিনি।’
অনন্যা উত্তর দিল না। দোতলায় সোমকবাবুর ঘর, আরশির কথা শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গেসঙ্গে পিং করে একটা শব্দ করে লিফটের দরজা ফাঁক হয়ে গেল। আরশির পিছু পিছু বেরিয়ে এল অনন্যা। সোমকবাবুর ঘরের বাইরে দু-জন মহিলা পুলিশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরশি টের পেল যা-ই ঘটে থাকুক, ব্যাপার গুরুতর। এবং সম্ভবত অনন্যাকে বলে দেওয়া হয়েছে আরশিকে নীচে থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে।
সোমকবাবুর ঘরটা বেশ বড়ো। দেওয়ালে ওদের কাগজের বিভিন্ন এক্সক্লুসিভ নিউজ স্টোরির ব্লো-আপ ফ্রেমে বাঁধানো। বিশাল মাপের দামি কাঠের টেবিল, সঙ্গে মেরুন রঙের চামড়ায় মোড়া কাঠের বাহারি চেয়ার। ঘরে প্রচুর বই, সোমকবাবু ব্যবসায়ী হলেও উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি, বিদেশে পড়াশোনা এবং চাকরি দুটোই করেছেন। নিজের কাগজের জন্য একটাও শব্দ না লিখলেও, ওঁর ধারণা তাহলে সাধারণ পাঠকের ধারণা হবে উনি মালিক হিসেবে পদমর্যাদা ভাঙিয়ে আত্মপ্রচার করছেন, নিয়মিত পড়াশোনা করেন। এ ছাড়া, ঘরে কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট এবং শো-পিস রয়েছে।
খুব উদ্ বিগ্ন মুখে সোমকবাবু বসে আছেন। তাঁর সঙ্গে সত্যকামদা এবং নয়নিকাদি। চারজন পুলিশ অফিসার, তার মধ্যে দু-জনের উর্দিতে লেখা ধাতুর হরফ জানান দিচ্ছে তাঁরা আইপিএস অফিসার। এ ছাড়া আরেকজন রয়েছেন ঘরে, সম্ভবত পুলিশের কেউ, কিন্তু তিনি পরে আছেন সাধারণ পোশাক। আরশি ঘরে ঢুকতে সোমকবাবু সেই দু-জন পুলিশ অফিসারকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘দিস ইজ আরশি বসু, আমাদের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর। আপনারা ওঁর কাছে যা জানতে চান, জিজ্ঞেস করতে পারেন।’
‘কী হয়েছে, আমি কিছু বুঝতে পারছি না! এনিথিং সিরিয়াস?’ আরশি জানতে চাইল।
‘সায়েন্টিস্ট সায়ন্তন মুখার্জি ইজ কিডন্যাপড, আরশি,’ নয়নিকাদি বললেন, ‘কাল তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরেই—’
‘ইউ প্লিজ কিপ কোয়ায়েট,’ একজন আইপিএস কড়া গলায় নয়নিকাদিকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন, ‘যা জানার আমরা জিজ্ঞেস করব, আপনার কথা বলার দরকার নেই।’
নয়নিকাদি বিব্রতমুখে চুপ করে গেলেন। কিন্তু আরশির বুকের মধ্যে হঠাৎ কেমন একরাশ অজানা আতঙ্ক সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল। সে বলল, ‘সায়ন্তন কিডন্যাপড! কবে, মানে কীভাবে হল?’
‘আপনি জানেন না কিছু?’ একজন পুলিশ অফিসার জিজ্ঞেস করলেন।
‘একেবারেই না। কখন হয়েছে?’
‘আপনি কাল কখন সায়ন্তন মুখার্জির সল্টলেকের বাড়িতে গেছিলেন, মিস বসু?’ তদন্তকারী দলের সাদা পোশাকে থাকা সদস্য জানতে চাইলেন।
‘এই বিকেল পাঁচটা নাগাদ।’
‘ওখান থেকে বেরিয়েছেন কখন?’
‘সাতটার একটু পরে।’
‘সল্টলেক থেকে বেরিয়ে আপনি কোথায় গেছিলেন?’
‘আমি বাড়ি চলে এসেছিলাম। আমার অফিসে জানানো ছিল আগে থেকে। আই অ্যাম ওয়ার্কিং অন আ স্পেশাল স্টোরি, আমার রিসার্চের কাজ ছিল।’
‘আপনি বাড়ি ফিরে আর বেরিয়েছিলেন?’
‘না।’
‘ওই সময় আপনার সঙ্গে আর কেউ ছিল?’
‘আমার মা ছিলেন বাড়িতে। আর কেউ না।’ আরশি বলল।
‘অন্য কেউ বলতে পারবেন যে আপনি বাড়ি থেকে পরে আর বেরোননি?’
‘না, তবে আমার মোবাইল টাওয়ার লোকেশন দেখতে পারেন আপনারা।’
‘মোবাইল তো ঘরে রেখেও বেরোনো যায়, তাই না?’
‘আপনারা কি আমাকে কিডন্যাপার হিসেবে সন্দেহ করছেন?’ আরশি এবার পালটা প্রশ্ন করল, ‘সায়ন্তন মুখার্জি আমার কলেজের বন্ধু, আমি কি তার সঙ্গে দেখা করতে পারি না?’
‘নিশ্চয়ই পারেন, তবে আমাদের জানা দরকার গতকাল রাত সাড়ে আটটা নাগাদ আপনি কোথায় ছিলেন।’
‘বলেছি তো, আমি বাড়িতে ছিলাম।’
‘আপনি সায়ন্তন মুখার্জির সঙ্গে কী ব্যাপারে কথা বলার জন্য সল্টলেকে গেছিলেন?’
‘ব্যক্তিগত আলোচনা, তার বাইরে কিছু নয়।’
‘মিস বসু, কী এমন ব্যক্তিগত কথা ছিল যে, ডক্টর মুখার্জি কলকাতায় এসে শুধু আপনার সঙ্গেই দু-বার দেখা করলেন? এমনকী উনি আপনার বাড়িতেও গেছিলেন, আপনি স্বীকার করবেন তো?’
সেরেছে! অ্যাপ ক্যাব না নিয়ে মোবাইল হোটেলে রেখে এসেও সায়ন্তন ওর সিকিউরিটির নজর এড়াতে পারেনি। আরশি বলল, ‘হ্যাঁ, সায়ন্তন আমার বাড়িতে এসেছিল তো, স্বীকার করব না কেন!’
‘আপনাদের মধ্যে কি কোনো রিলেশনশিপ রয়েছে?’
‘একেবারেই না।’ আরশি দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
‘তাহলে উনি কলকাতায় এসে শুধুমাত্র আপনার সঙ্গেই দেখা করলেন কেন? তাও একবার নয়, দু-বার?’
‘আমি কী করে বলব। তবে আমি নিজে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। সম্ভবত অন্য কোনো বন্ধু খবর পায়নি বা পেলেও যোগাযোগ করেনি।’
‘বাহ্, ভেরি নাইস। আপনি তাহলে নিজে যোগাযোগ করেছিলেন সায়ন্তন মুখার্জির সঙ্গে। কীভাবে জানলেন উনি কলকাতায় এসেছেন?’
‘আমি একজনের মাধ্যমে খবর পেয়েছিলাম।’
‘সেই সোর্স কে সেটা দয়া করে বলবেন কি?’
‘আপনি একজন সাংবাদিককে সোর্স ডিসক্লোজ করার জন্য চাপ দিতে পারেন না।’ আরশি বলল।
‘ওয়েল, আমরা কী পারি আর কী পারি না, তা আপনি যথাসময়ে বুঝতে পারবেন।’ প্রায় হুমকির সুরে প্রশ্নকর্তা বললেন, ‘এখন বলুন তো, উনি কেন হিমাচল থেকে কলকাতায় এসেছিলেন, সেটা কি আপনার সো-কল্ড সোর্স আপনাকে বলেছিল?’
‘আমি কিছুটা শুনেছিলাম।’ আরশি জবাব দিল।
‘কী শুনেছিলেন?’
‘দুঃখিত, আমি বলতে পারব না।’
হঠাৎ সত্যকামদা বলে উঠলেন, ‘বলে দাও আরশি, ওঁদের বলে দাও। অফিস থেকে তোমাকে ভাইরাস আউটব্রেক নিয়ে একটা স্পেশাল স্টোরি করার জন্য অ্যাসাইন করা হয়েছিল, সেকথা ওঁরা জেনেছেন। আমরাই বলেছি।’
সত্যকামের দিকে তাকিয়ে একজন ভয় পাওয়া মানুষকে দেখতে পেল আরশি। সে কী, ওঁর মতো একজন নির্ভীক সাংবাদিক এভাবে বিচলিত হয়ে পড়লেন কেন? মানুষ চিনতে তবে কি তার ভুল হয়েছিল, নিজে বিপন্ন হতে পারে এমন আশঙ্কা থাকলে সত্যকামের মতো লোক বাক্ স্বাধীনতা কিংবা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এসব বড়ো বড়ো বুকনি ছেড়ে আত্মসমর্পণের রাস্তা ধরে?
রোখ চেপে গেল আরশির। সে বলল, ‘আমাদের এগজিকিউটিভ এডিটর যখন এ ব্যাপারে আপনাদের জানিয়েছেন, তখন আমি আর আলাদা করে কী বলব! আমার কিছু বলার নেই।’
‘আপনি কোঅপারেট করছেন না, মিস বসু,’ তদন্তকারী অফিসার বললেন, ‘ইউ উইল বি ইন বিগ ট্রাবল। আপনি ভাবতেও পারছেন না কত বড়ো বিপদে পড়তে চলেছেন।’
‘কলেজের এক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি বিশাল বিপদে পড়ব, কেন?’ আরশি পালটা প্রশ্ন করল।
‘আহ্, ডোন্ট রিপিট দ্য বুলশিট আগেইন অ্যান্ড আগেইন,’ প্রচণ্ড বিরক্ত চোখ-মুখ করে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন তদন্তকারী অফিসার, ‘আপনি তথ্য গোপন করছেন আমাদের কাছ থেকে। সায়ন্তন মুখার্জি শুধু আপনার বন্ধু নন, তিনি ভারত সরকারের একজন উচ্চপদস্থ বিজ্ঞানী। তিনি একটা টপ সিক্রেট মিশনে কাজ করছিলেন এবং সেই কাজে কলকাতায় এসে কিডন্যাপড হয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, আপনি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বন্ধু বা আত্মীয়র সঙ্গে ওঁর দেখা হয়নি। তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি না আপনি ডক্টর মুখার্জিকে ফাঁদে ফেলার জন্যই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন?’
আরশি চুপ করে রইল।
অন্য একজন অফিসার এবার প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে কেন গেছিলেন?’
‘ওই হোটেলে যাওয়া কি নিষিদ্ধ?’
‘না, তা নয়, তবে ওই হোটেলে ডক্টর মুখার্জি উঠেছিলেন, সেক্ষেত্রে আমরা কি ধরে নিতে পারি আপনি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন?’
‘হোটেলে আমার সঙ্গে সায়ন্তনের দেখা হয়নি।’
‘আমরা সেকথা জানি। সিসিটিভির ফুটেজ থেকে দেখা গেছে যে আপনি সায়ন্তন মুখার্জির রুমের করিডোরে হাঁটছেন। কিন্তু যে মুহূর্তে ডক্টর মুখার্জির পার্সোনাল সিকিউরিটি পাশের রুম থেকে বেরিয়ে এল, তখনই আপনি সেখান থেকে জোরে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। আপনি কি বলতে চান আপনার আচরণ সন্দেহজনক নয়?’
‘আপনারা সন্দেহ করলে আমার কিছু করার নেই।’ আরশি জবাব দিল।
‘একটা ফাইভ স্টার হোটেলে ঢুকে এভাবে সরাসরি চারতলায় উঠে যাওয়া যায় না। কে আপনাকে ঢুকতে সাহায্য করেছিল?’
‘সেটাও আপনারা সিসিটিভি ফুটেজ থেকে দেখে নিতে পারতেন।’
‘আপনি আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন, মিস বসু। ঠিক করছেন না কাজটা। সিসিটিভির ফুটেজ আমরা দেখেছি। কিন্তু ওই সময় রিসেপশন এরিয়ায় অনেক লোকের ভিড়। তার মধ্যে বেশ কিছু বিদেশি গেস্ট। সবাই একসঙ্গে কথা বলছে রিসেপশনের স্টাফদের সঙ্গে। সেজন্য বোঝা যাচ্ছে না আপনি তাদের মধ্যে কার সঙ্গে কথা বলে ভেতরে ঢুকে গেলেন।’
‘দুঃখিত, আমি এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না।’
‘সেক্ষেত্রে আমরা আপনাকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হব,’ থেমে থেমে কথাটা সম্পূর্ণ করলেন সাদা পোশাকে থাকা সেই অফিসার, ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট, মিস আরশি বসু। আপনাকে গ্রেফতার করা হল।’
ঘরে উপস্থিত সবার দিকে তাকাল আরশি। সোমক সান্যাল একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন, তাঁর দৃষ্টিতে একটা প্রচ্ছন্ন গর্বের অনুভূতি টের পাওয়া যাচ্ছে। নয়নিকাদির চোখ-মুখ বলছে ‘এ তুই কী করলি আরশি!’ সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্যকামের প্রতিক্রিয়া, তিনি যেন আরশিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে চাইছেন ‘প্রাইজ পেয়ে খুব মাতব্বর রিপোর্টার হয়ে গেছ, তাই না, বোঝো এবার!’
একজন পুলিশ অফিসার উঠে গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দু-জন মহিলা পুলিশকে ডেকে নিয়ে এল ঘরে। তাদের একজন আরশির হাত ধরে বলল, ‘ওঠো।’
‘ওঠো নয়, উঠুন।’ কড়া গলায় কথাটা বলে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল আরশি।
সোমক সান্যাল তাড়াতাড়ি বললেন, ‘আরশি, তুমি যদি অন্যায় না করে থাকো, তবে ভয় পেয়ো না, অফিস তোমার সঙ্গে আছে। ইউ উইল গেট দ্য বেস্ট লিগাল সাপোর্ট ফ্রম আস—’
সবাই একসঙ্গে লিফটে যেতে পারবে না, পুলিশের পাশাপাশি হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে নামার মুখে পেখমকে দেখতে পেল আরশি। মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে একদিকে। এতক্ষণে সবাই জেনে গেছে ঘটনাটা, পেখমও শুনেছে নিশ্চয়ই, সেজন্য বেরিয়ে এসেছে বাইরে।
‘মাকে একটু বুঝিয়ে বলিস ব্যাপারটা,’ অনুচ্চ স্বরে পেখমকে বলল আরশি। পেখম মাথা নাড়ল।
গাড়িতে উঠে লালবাজার যেতে হবে ভেবেছিল আরশি। কিন্তু গাড়ি সল্টলেকের রাস্তা ধরল দেখে বুঝল ওদের গন্তব্য সায়ন্তনের বাড়ি। কিন্তু না, সায়ন্তনের বাড়ি নয়, সেক্টর থ্রি-র ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির অফিসে এসে থামল গাড়ি। আরশিকে পুলিশ এসকর্ট করে নিয়ে গেল ওপরে। সেখানে ওর কাছ থেকে মোবাইল ফোন এবং ব্যাগ নিয়ে নেওয়া হল। সব জিনিসের একটা তালিকা তৈরি করে একজন তাকে দিয়ে সই করিয়ে নিল। আরও কিছু কাগজপত্রে সই করানো হল আরশিকে দিয়ে। এরপর এক মহিলা চিকিৎসক এসে আরশিকে পরীক্ষা করলেন।
এসব কাজকর্মে প্রায় বিকেল হয়ে এল। চারটে নাগাদ আরশিকে এনআইএ-র বিশেষ আদালতে তোলা হল। আদালতে দেখা হল অফিসের অনেকের সঙ্গে। সোমকবাবু নিজে আসেননি, তবে আরশির কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ করেছেন দুঁদে আইনজীবী শঙ্করপ্রসাদ চট্টরাজকে। আরশি কোথায় যেন পড়েছিল, শঙ্করপ্রসাদবাবু এক একটা শুনানির জন্য পাঁচ লাখ টাকা পারিশ্রমিক নেন।
বিচারকের সামনে আরশিকে নির্দোষ দাবি করে শঙ্করপ্রসাদ বললেন, তাঁর মক্কেল একজন নামি সাংবাদিক। অসামান্য সাংবাদিকতার জন্য তাঁকে রাষ্ট্রসংঘ থেকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তাঁকে সন্ত্রাসবাদী সন্দেহ করা ভুল হচ্ছে, কারণ তিনি নিজেই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খবর লিখেছেন। এ ছাড়া বাড়িতে তাঁর মা একা আছেন, সুতরাং তাঁকে জামিন দেওয়া হোক।
এনআইএ-র আইনজীবী জানালেন, পেশার সুবাদে অভিযুক্ত কিছুদিন আগে পাকিস্তানি মাদকচক্রের সংস্পর্শে এসেছেন সেকথা তিনি নিজেই রিপোর্টে লিখেছেন। সুতরাং এদের সঙ্গে অভিযুক্তর যোগাযোগ গড়ে ওঠার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ছাড়া, সায়ন্তন মুখার্জি অপহরণের ঘটনায় অভিযুক্তর ভূমিকা সন্দেহজনক। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে যে, অপহৃত বিজ্ঞানী কলকাতায় এসে একমাত্র অভিযুক্তর সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্তকে বিজ্ঞানীর হোটেলে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। দু-জনের মধ্যে কী কী কথাবার্তা হয়েছে তদন্তের স্বার্থে তা বিস্তারিত জানা দরকার। সেজন্য অভিযুক্ত সাংবাদিককে হেফাজতে নিয়ে জেরা করা দরকার। তদন্তের জন্য অভিযুক্তকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার আর্জি জানালেন এনআইএ-র আইনজীবী।
বিচারক আরশির কোনো বক্তব্য জানতে বা শুনতে আগ্রহ দেখালেন না। আরশির জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে গেল। তাকে দশ দিন এনআইএ-র হেফাজতে রাখার অনুমতি দিয়ে বিচারক উঠে গেলেন।
আদালত থেকে ফিরে আরশিকে রুটি আর চিকেন খেতে দেওয়া হল। আরশির খুব খিদে পেয়েছিল, সে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে খেয়ে নিল। রাত ন-টার বিমানে আরশিকে নিয়ে দিল্লিতে রওনা হলেন এনআইএ-র তদন্তকারীরা। বিমানে উঠে আরশি টের পেল এত টেনশনের মধ্যেও তার ঘুম পাচ্ছে। সারাদিন কম পরিশ্রম যায়নি। দিল্লিতে নেমে এরপর কী হবে সে-বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। সুতরাং বিমান টেক অফ করার পরেই আরশি সিটে হেলান দিয়ে ঘুমোতে চেষ্টা করল।
যত সহজে ঘুম আসবে মনে হয়েছিল, তা অবশ্য এল না। চোখ বুজে আরশি সায়ন্তনের অপহরণের ব্যাপারে যেটুকু খবর পেয়েছে সেগুলো মনে মনে সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
সেদিন রাত আটটা ছাব্বিশ মিনিটে সায়ন্তন একটা অ্যাপ ক্যাব বুক করে। আটটা একত্রিশ মিনিটে গাড়িটা ওর বুকিং বাতিল করে দেয়। আটটা পঁয়ত্রিশে ফের আরেকটা গাড়ি বুকিং কনফার্ম করে। ঠিক আট মিনিট পর, আটটা তেতাল্লিশ মিনিটে, গাড়িটা সায়ন্তনদের বাড়ির সামনে চলে আসে। এরপর ড্রাইভার ফোন করে জানায়, বাড়ির রাস্তায় একটা গার্ড রেল আছে, সেজন্য সে পৌঁছোতে পারছে না, রাস্তার মুখে অপেক্ষা করছে।
সায়ন্তন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ির কাছাকাছি আসার সঙ্গেসঙ্গে দু-জন আক্রমণ করে। একজন সায়ন্তনকে জোর করে গাড়ির পেছনের সিটে তোলে, অন্যজন ড্রাইভারকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর করে তার জায়গায় বসে গাড়ি চালিয়ে দেয়। ড্রাইভারের মোবাইল ফোন ছিটকে পড়ে গেছিল, ফোন খুঁজে পেয়ে সে পুলিশে ফোন করে। অ্যাপ ক্যাব সংস্থাকেও গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনা জানায়।
এদিকে ভার্গব চৌধুরি দশটা নাগাদ খেয়াল করে সায়ন্তনের লোকেশন হোটেলে দিকে না এসে অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। সে তখনই সায়ন্তনকে ফোন করে। দু-বার রিং হয়ে যাওয়ার পর ফোন সুইচড অফ হয়ে যায়। অপহরণকারীরা হয়তো আগে খেয়াল করেনি যে ফোনটা চালু আছে, এবার তারা সতর্ক হয়ে গিয়ে সায়ন্তনের মোবাইল এবং গাড়ির মোবাইল দুটোই বন্ধ করে দেয়। ভার্গব পুলিশকে অ্যালার্ট করে। শেষ লোকেশন দেখা গেছিল বাসন্তী হাইওয়ে, ভার্গবের কথার সূত্র ধরে সেখান থেকে পুলিশ খোঁজাখুঁজি শুরু করে। নির্জন রাস্তার এক জায়গায় ট্যাক্সিটাকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। গাড়ির ড্রাইভার এবং ভার্গবের কথা মিলিয়ে পুলিশ বুঝে যায় সায়ন্তনকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। দিল্লিতে তখনই খবর দেওয়া হয়, ভোর হওয়ার আগেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির হাতে তদন্তভার তুলে দেওয়া হয়।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল আরশি, বিমান অবতরণের প্রস্তুতি শুরু করার সঙ্গেসঙ্গে তাকে জাগিয়ে দিল পাশের সিটে থাকা মহিলা পুলিশ অফিসার। সওয়া এগারোটায় ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাটি ছুঁল আরশিদের বিমান। বাইরে অপেক্ষা করছিল দুটো গাড়ি। তার একটাতে আরশিকে তোলা হল। অন্যটা ওদের গাড়ির পিছু পিছু চলল।
রাতের দিল্লির রাস্তায় দিনের মারাত্মক যানজট নেই। মাত্র মিনিট কুড়ি চলার পর গাড়ি এসে যে বাড়িটার সামনে থামল তার ছবি আরশি ইন্টারনেটে দেখেছে। এটা লোদি রোডের ওপর ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির হেডকোয়ার্টার।
দিল্লিতে নামার পর থেকেই তদন্তকারী দলের সদস্যদের আচরণ রুক্ষ হতে শুরু করেছে, সেটা বেশ টের পাচ্ছিল আরশি। জল চাওয়ায় তাকে একটা কাগজের কাপে খুব বেশি হলে এক-শো মিলিলিটার জল দেওয়া হল। আরশি বলল, বাথরুমে যাবে। আরশিকে পথ দেখিয়ে বাথরুমে নিয়ে এল একজন মহিলা পুলিশ। বাথরুমে ছিটকিনি দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই, মহিলাও বাথরুমের ভেতরে ঢুকে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাধ্য হয়ে আরশিকে সেই মহিলার সামনেই কাজ সারতে হল।
টয়লেট থেকে ফেরার পর আরশিকে নিয়ে যাওয়া হল ইন্টারোগেশন রুমে। সিনেমায় দেখা আলো-আঁধারি ইন্টারোগেশন রুম নয়, জোরালো আলোয় ঝকঝক করা একটা ঘর। জানলাহীন ঘরে দুটো চেয়ার, দেওয়াল থেকে উঁকি মারছে সিসিটিভি। আচ্ছা, ইন্টারোগেশন রুমের সিসিটিভি কি মানবাধিকার সংস্থার কথা মাথায় রেখে লোক-দেখানো ব্যবস্থা? আরশির খুব জানতে ইচ্ছে করছিল।
সময় জানার উপায় নেই, তবু আরশির ধারণা রাত তিনটে নাগাদ ঘরে দু-জন পুলিশ অফিসার এলেন। তাঁদের একজন মহিলা, বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ, খাকি উর্দি, মাথার ওপর বান করে চুল বাঁধা, বুকের বাঁ-দিকে লেখা নাম শিবানী। ঘরে ঢুকেই মহিলা আচমকা আরশিকে প্রচণ্ড জোরে ঠাস করে এক বিশাল চড় মারলেন। আরশি এই আকস্মিক আক্রমণের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। আঘাতের চোটে ছিটকে পড়ল মাটিতে। আরশির ডান হাতটা জুতো দিয়ে চেপে ধরে মহিলা হিংস্র গলায় বললেন, ‘ডোন্ট ট্রাই টু অ্যাক্ট স্মার্ট, এলস, ইউ উইল বি ক্রিপলড ফর লাইফ!’
মহিলা পা সরিয়ে নিতে আরশি মাটিতে উঠে বসল। ইংরেজিতে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না, আপনারা আমাকে টর্চার করছেন কেন? সায়ন্তন মুখার্জির কিডন্যাপিংয়ের ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই। বরং ওর বন্ধু হিসেবে এ ব্যাপারে আমি অত্যন্ত উদ্ বিগ্ন।’
‘ইজ ইট সো?’ বিদ্রূপ করে বললেন মহিলা, ‘দেন, টেল মি হোয়াই ডিড ইউ ডিলিট অল হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট উইথ ডক্টর মুখার্জি?’
‘বিকজ হি আস্কড মি টু ডু সো।’ আরশি বলল।
‘হোয়েন অ্যান্ড হোয়াই?’ অন্য অফিসার জিজ্ঞেস করলেন।
‘যেদিন আমি ওর সল্টলেকের বাড়িতে গেছিলাম, সেদিন ওখান থেকে বেরিয়ে আসার পর সায়ন্তন আমাকে মেসেজ করে চ্যাট হিস্ট্রি ডিলিট করতে বলে। কেন বলেছিল, তা আমি জানি না। আমি তাই চ্যাট ডিলিট করে দিয়েছিলাম।’
‘বাহ্, ফ্যানটাস্টিক এক্সপ্ল্যানেশন! তুমি মনে হয় জানো না চ্যাট হিস্ট্রি রিট্রিভ করা যায়, এমনকী গুগল ড্রাইভ থেকে ইরেজ করে দিলেও আমরা সেটা বের করে নিতে পারি?’ মহিলা বললেন।
মাথা হেলিয়ে আরশি সায় দিল, ‘জানি। আপনারা চ্যাট হিস্ট্রি রিট্রিভ করে দেখুন, ওখানে কিছুই পাবেন না।’
‘তাহলে কোথায় পাব?’
‘কী পেতে চান আপনারা তা-ই তো আমি জানি না।’
‘ডোন্ট মেক মি কমপেল টু টিচ ইউ অ্যানাদার লেসন টুনাইট। ইফ ইউ ডোন্ট টক দেন আই উইল সিম্পলি থ্রো ইউ টু আওয়ার ড্রাঙ্কেন সুইপার্স। দেয়ার আর ফাইভ পার্সনস ইন অল। ওরা সবাই মিলে তোমাকে ছিঁড়ে খাবে!’
হাত দিয়ে একটা কুৎসিত ভঙ্গি করে মহিলা বুঝিয়ে দিলেন তিনি আদেশ দিলে আরশির সঙ্গে কী হতে পারে। মহিলার কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল আরশি। মহিলা প্রচণ্ড অ্যাগ্রেসিভ সে তো বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু আরেকজন পুরুষ সহকর্মীর সামনে যেভাবে আরশিকে ধর্ষণ করার ভয় দেখাচ্ছেন তা অভাবনীয়।
‘আমরা তোমার কম্পিউটার সিজ করেছি, এক ডজন পেন ড্রাইভ, দুটো এক্সটার্নাল হার্ড ডিস্ক তুলে এনেছি। সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। কিন্তু তুমি সব কথা শেয়ার করে আমাদের পরিশ্রম কমিয়ে দিতে পারো। তাহলে আমাদের দু-জনের পক্ষেই ভালো—’ পুরুষ অফিসারটি নরমভাবে বললেন।
‘আমি আপনাদের সঙ্গে কোঅপারেট করতে চাই। কিন্তু আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করছেন না।’
‘লুক ইয়ং লেডি, তুমি একজন নামকরা জার্নালিস্ট, তোমাকে ইউনাইটেড নেশনস পুরস্কৃত করেছে। কিন্তু তার মানে এমন নয় তুমি কোনো টেররিস্ট অর্গানাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত নও।’
‘আমি সত্যি কোনো টেররিস্ট অর্গানাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত নই।’
‘তাহলে ঠিক করে বলো, তুমি ক্যাপিটাল হোটেলে সায়ন্তন মুখার্জিকে শ্যাডো করতে গিয়েছিলে কেন? কে পাঠিয়েছিল তোমাকে?’
‘আমাকে আমার অফিস থেকে পাঠিয়েছিল। আমার অ্যাসাইমেন্ট ছিল সায়ন্তন মুখার্জির একটা ইন্টারভিউ ম্যানেজ করা। আমি সেজন্য জায়গাটা দেখতে গেছিলাম—’
‘সো দ্যাট ইউ ক্যান কাম ব্যাক অ্যানাদার টাইম টু প্ল্যান্ট অ্যান এক্সপ্লোসিভ, অ্যাম আই রাইট?’ মহিলা আবার আলোচনায় ঢুকে পড়লেন।
‘নো ম্যাম, ইউ আর নট। আই অ্যাম টেলিং ইউ দ্য ট্রুথ। অ্যাজ ফার অ্যাজ আই নো, ইউ হ্যাভ সাম বেটার মেকানিজম সাচ অ্যাজ পলিগ্রাফ টেস্ট অর নার্কো অ্যানালিসিস হুইচ আর মোর এফেক্টিভ টু ব্রিং আউট দ্য ট্রুথ। আই অ্যাম রেডি টু আন্ডারগো এনি সাচ টেস্ট উইলিংলি ইফ ইউ সো লাইক।’
দুই অফিসারে চোখ চাওয়াচাওয়ি হল। শিবানী অন্য অফিসারটিকে বললেন, ‘বিক্রম, হাউ ফাস্ট ক্যান উই অ্যারেঞ্জ আ নার্কো অ্যানালিসিস ফর হার, আই মিন, বিফোর শি চেঞ্জেস হার মাইন্ড?’
‘বাই টুমরো আফটারনুন, আই বিলিভ,’ বিক্রম জবাব দিল, ‘বাট উই ক্যান নট ডু ইট অফ আওয়ার ওন, উইদাউট দ্য কনসেন্ট অফ দ্য কোর্ট।’
‘ডোন্ট ওরি অ্যাবাউট দ্যাট,’ আরশি বলল, ‘গিভ মি সাম পেপারস, আই উইল রাইট ডাউন মাই কনসেন্ট।’
তৎপরতা শুরু হয়ে গেল। কাগজ, কলম চলে এল। আরশি লিখে সই করে দেওয়ার পর ধীরে ধীরে পুলিশের আচরণ বদলাতে শুরু করল। প্রায় ভোর হয়ে এসেছে তখন। আরশির জন্য কিছু খাবার আর জল এল। একটা সেল-এ নিয়ে গিয়ে তাকে বিশ্রাম নিতে বলা হল। কারণ শারীরিকভাবে সুস্থ না থাকলে নার্কো অ্যানালিসিস করা যাবে না।
দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আরশি ভাবছিল গত চব্বিশ ঘণ্টায় কত কী ঘটে গেল তার জীবনে। মা-র জন্য একটু চিন্তা হচ্ছে ওর। বাড়ি থেকে কম্পিউটার তুলে নিয়ে আসার সময় এরা মাকে কী বুঝিয়ে এসেছে আরশি জানে না। পেখম মাকে বুঝিয়ে কতটা শান্ত করতে পারবে সেটাও একটা ব্যাপার।
তবে আরশির মা আদৌ দুর্বল বা অসহায় মহিলা নন সেটাই যা ভরসা। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি যেভাবে একলা লড়াই করে মেয়েকে বড়ো করে তুলেছেন, সংসার ফের নতুন করে গুছিয়েছেন, তাতে তাঁকে দুর্বল বলা যায় না।
আরশি ছাড়বে না কাউকে। যাদের জন্য এই অবস্থা হল ওর, তাদের সবাইকে সময়মতো ঠিক বুঝে নেবে সে।
