জাহান্নমের সওদাগর – ১৮

লালবাহাদুর শাস্ত্রী ট্রমা কেয়ার সেন্টার, লখনউ।

বিছানার ওপর বালিশে হেলান দিয়ে বসে ছিল সায়ন্তন। সামান্য ক্লান্তিভাব ছাড়া এখন শরীরে আর তেমন অসুবিধেধা নেই। চিকিৎসকরা বলেছেন দু-এক দিনের মধ্যে ছুটি দিয়ে দেবেন।

রহিম নগরের একটা বাড়ি থেকে সায়ন্তনকে যখন কম্যান্ডো এবং উত্তরপ্রদেশ সশস্ত্র পুলিশবাহিনী উদ্ধার করে তখন তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। প্রচণ্ড জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, সারা শরীরে ধারালো অস্ত্রের ক্ষত এবং সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগ। তা ছাড়া স্টান গ্রেনেডের প্রচণ্ড শব্দে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার কানের পর্দা। দ্রুত সায়ন্তনকে হাসপাতালে নিয়ে এসে ভরতি করা হয়। ক-দিন ক্রিটিক্যাল কেয়ারে কাটিয়ে অবশেষে বিপন্মুক্ত হয়েছে সায়ন্তন। এখন তাকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে আলাদা কেবিনে।

যে বাড়িতে সায়ন্তনকে আটকে রাখা হয়েছিল সেটা সম্পূর্ণ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। পুলিশি অভিযানে নিরীহ মানুষের ক্ষতি হতে পারে, সেজন্য তলব পড়ে এনএসজি কম্যান্ডো বাহিনীর। কলকাতার এনএসজি হাব থেকে লখনউ উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এক দল কম্যান্ডোকে। উত্তরপ্রদেশ পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে দুপুর থেকেই। সন্ধে নামার আগেই আশেপাশের সব বাড়ির ছাদে স্নাইপার মোতায়েন করা হয়।

এলাকার মানুষ টের পাচ্ছিল কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা কী তারা অনুমান করতে পারেনি। সরকারের পক্ষ থেকে টিভি চ্যানেলকে খবর না দেখানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। বাসিত কিংবা নওশাদ খুব একটা বাড়ির বাইরে বেরোত না, তাই তারা বুঝতে পারেনি এলাকায় কিছু একটা ঘটতে চলেছে। একটু বেশি রাত হলে গাড়ি নিয়ে রক্সৌলের উদ্দেশে রওনা দেবে এরকম পরিকল্পনা নিয়ে তারা অপেক্ষা করছিল।

ভিক্টর বোগদানের সঙ্গে কথা শেষ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে রতন মিশ্র তাকে নিয়ে পটনার উদ্দেশে রওনা দেন। বিহার পুলিশকে বলা হয় পুরো রাস্তা গ্রিন করিডোর করার জন্য। গ্রিন করিডোরের সুবাদে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার পরিবর্তে মাত্র তিন ঘণ্টায় পটনা পৌঁছে যান তিনি। সেখান থেকে বিশেষ বিমানে লখনউ। ওদিকে দিল্লি থেকে এসে পৌঁছোন অমরনাথ পটেল। কলকাতা এনআইএ অফিস থেকে এক অফিসারের সঙ্গে লখনউ চলে আসে আরশিও। ঘটনাক্রমের জট খুলতে তার সাহায্য একান্ত প্রয়োজন, ফোনে একথা বুঝিয়ে বলে আরশিকে রাজি করান অমরনাথ। তবে আরশি বা ভিক্টর বোগদান, কাউকে অপারেশনের সময় কাছে আসতে দেওয়া হয়নি।

রাত ন-টা নাগাদ পরিকল্পনা অনুসারে এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হল। মোমবাতি খুঁজে বের করে জ্বালাতে যেটুকু সময় লাগে তার মধ্যে এনএসজি কম্যান্ডোরা উঠে পড়ল বাড়ির ছাদে, ছাদের দরজা ভেঙে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তারা নেমে এল দোতলায়। দরজা ভাঙার শব্দে সচকিত হতে বাসিত বেরিয়ে এসেছিল একে-৪৭ উঁচিয়ে। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় কম্যান্ডোরা। কিছু বিপদ ঘটেছে অনুমান করে পিস্তল থেকে গুলি চালায় নওশাদ। ঘরে তার বিবি ছাড়াও আরেকজন মহিলা এবং দু-জন পুরুষ ছিল। এদের একজন কারবাইন জাতীয় অস্ত্র থেকে গুলি চালাতে শুরু করে। এদের বিভ্রান্ত করার জন্য স্টান গ্রেনেড ছোড়ে কম্যান্ডো বাহিনী। প্রচণ্ড শব্দ এবং আলোর ঝলকানিতে হকচকিয়ে যায় নওশাদের দল। গুলির লড়াইয়ে মারা যায় এক জন, বাকিদের আহত অবস্থায় গ্রেফতার করে কম্যান্ডো বাহিনী। ঘরে যেসব কাগজপত্র পাওয়া গেছে তা থেকে পরিষ্কার দুষ্কৃতীরা সবাই পাকিস্তানি, চীনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতে মহামারি ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল এদের।

‘তুই যে মেমরি কার্ডটা ঠিক খুঁজে বের করবি আমি অনুমান করেছিলাম,’ ক্লান্ত হাসি হেসে সায়ন্তন আরশিকে বলল, ‘কলকাতায় গিয়েই বুঝেছিলাম পেছনে কেউ লেগেছে এবং সে লুকিয়ে আছে আমাদের মধ্যে। আমাকে হুমকি দেওয়া শুরু হয়েছিল একেবারে প্রথম দিন থেকেই। যারা হুমকি দিচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম তারা আমার কাজকর্মের খুঁটিনাটি বিষয়ে প্রতিটা ডেভেলপমেন্টের খবর রাখে, সেজন্য মনে হয়েছিল আমার কথা কোথাও একটা রেকর্ড করে রেখে তোকে জানিয়ে যাই। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছিলাম না সত্যি কিছু ঘটবে, নাকি, কেউ ভয় দেখিয়ে মজা করছে। তাই তোকে পরিষ্কার করে কিছু বলিনি।’

ঘরে আরশি ছাড়াও অনেক লোক। রতন মিশ্র এবং অমরনাথ পটেল আছেন, এ ছাড়া প্রতীক্ষা রায়নাও এসেছেন সায়ন্তনকে দেখতে। শিবানী পাণ্ডে এক কোণে মুখ চুন করে বসে আছে, আজ সব ফোকাস আরশির দিকে এটা বুঝে সে চুপচাপ হয়ে গেছে।

‘তুই রিস্ক না দিয়ে পুলিশে জানাতে পারতিস,’ আরশি বলল, ‘তাহলে এরা তোকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারত না, আমিও পুলিশের হাতে মার খাওয়ার অপমান থেকে রেহাই পেতাম।’

‘কী করে পুলিশের কাছে যেতাম?’ অসহায় গলায় সায়ন্তন বলল, ‘কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব, দু-জনেই তো আমার সহকর্মী, সবারই সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স রয়েছে। এর মধ্যে কে মোল হিসেবে কাজ করছে বুঝব কী করে!’

অমরনাথ খুব বিচলিতভাবে বললেন, ‘আমি এজেন্সির সবার হয়ে আরশি ম্যাডামের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমাদের এক অফিসারের হাতে উনি অ্যাসল্টেড হয়েছেন, এজন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আরশি ম্যাডাম আমাদের প্রচুর সাহায্য করেছেন, উনি সাহায্য না করলে আমাদের কাজে আরও সমস্যা হত।’

শিবানী পাণ্ডের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আরশি দেখল অপমানে তার মুখ লাল হয়ে গেছে।

প্রতীক্ষা রায়না বললেন, ‘সায়ন্তন কী রেকর্ড করে রেখেছিল সেটা কেউ একবার আমাকে শোনাবেন?’

‘আমার কাছে মেমরি কার্ডটা এখন আর নেই, আমি ওঁকে দিয়ে দিয়েছি।’ আরশি অমরনাথ পটেলকে দেখিয়ে দিল।

তড়িঘড়ি পকেট থেকে মেমরি কার্ডটাকে বের করে নিজের মোবাইলে ঢুকিয়ে অমরনাথ প্লে-ব্যাক অপশন অন করলেন। সারা ঘরে সায়ন্তনের কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়ল।

‘আরশি, এই রেকর্ডিং তোর হাতে পড়লে জানবি আমি খুব বিপদে পড়েছি। যদি নিরাপদে হিমাচলে ফিরে যাই তবে তোকে ফোন করে জানিয়ে দেব, তখন এটা খুঁজে বের করার দরকার পড়বে না।

‘এখানে এসে অবধি একের পর এক হুমকি ফোন পাচ্ছি। আমাদের লোকই ইনভলভড বুঝতে পারছি। সম্ভবত বেণুগোপাল। কারণ এই টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি ভার্গবের জানার কথা নয়।

‘কীরকম হুমকি পাচ্ছি সেটা খুলে বললে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে। ধর, একটা রেস্তরাঁ থেকে খাবারের স্যাম্পল নিলাম। কিছু সময়ের মধ্যে ফোন এল “অমুক রেস্তরাঁর ফুড স্যাম্পল ফেলে দিন।” আবার মনে কর, আমাকে ল্যাব থেকে একটা রিপোর্ট পাঠিয়েছে, অমনি ফোনে বলা হল “এক্ষুনি রিপোর্টটা ছিঁড়ে ফেলে না দিলে আপনার বিপদ হবে।”

‘এসব কথা ভার্গব জানবে না, কিন্তু বেণুগোপাল সবটাই জানে। আমার ধারণা সম্ভবত বেণুগোপাল কোনো শত্রু দেশের হয়ে কাজ করছে। হুমকি রোজ বাড়ছে, আজ একেবারে ঝালাপালা করে দিচ্ছে সকাল থেকে। কারণ বুঝতে অসুবিধে নেই। কাল ফিরে গিয়ে রিপোর্ট জমা দিলেই সরকার ব্যবস্থা নিতে কোমর বেঁধে নেমে পড়বে। তার আগেই আমাকে আটকে দিতে হবে।

‘এই ভাইরাস ছড়ানোর পরিকল্পনাটা আমার সামনে এখন খুব স্পষ্ট। প্ল্যান চীনের, ইমপ্লিমেন্ট করছে পাকিস্তান। সাধারণ ফ্লুয়ের জীবাণুকে শক্তিশালী করে তোলা হয়েছে জিন এডিট করে। কিছু মিল রয়েছে হেমারেজিক ফিভারের সঙ্গে, কিছু বৈশিষ্ট্য আবার মেনিঞ্জোএনসেফেলাইটিসের সঙ্গে মেলে। এরকম ভাইরাস প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না, ল্যাবে তৈরি হয়। চিকিৎসা করা খুব শক্ত, রোগটা আসলে কী বুঝে ওঠার আগেই এতদূর ছড়িয়ে যায় যে ডাক্তারের আর কিছু করার থাকে না।

‘ইনার মঙ্গোলিয়া অটোনমাস রিজিয়ন নামে যে অঞ্চল তিব্বতের মতো গায়ের জোরে চীন দখল করে রেখেছে, সেখানে নাকি এক বিশাল জীবাণু গবেষণাগার বানিয়েছে তারা। কে জানে, হয়তো এই ভাইরাস সেখানে তৈরি। জীবাণুর দু-তিনটে আলাদা স্ট্রেন তৈরি করেছে এরা। তবে ভ্যাকসিনও প্রায় প্রস্তুত, ভাইরাস ডিটেকশনের সহজ উপায়ও আমাদের হাতে মুঠোয়।

‘আরেকটা কথা বলি তোকে। শিলিগুড়িতে নিপা ভাইরাস ছড়িয়েছিল চীন। একাজে সাহায্য করেছিল সোভিয়েত বিজ্ঞানী রুস্তম কারিমভ। সিডিসিতে কাজ করার সময় আমি ওর ওপর আলাদা ফাইল দেখেছি। আমাদের সরকার ওকে হাতে পাওয়ার বহু চেষ্টা করেছে, কিন্তু ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিশ থাকা সত্ত্বেও লোকটা ইস্তানবুল থেকে উধাও হয়ে যায়। সম্প্রতি নাকি রুস্তম কারিমভ ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে, ভারতে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। সবটাই অফিসে শোনা, ঠিক কি না জানি না। এই ভাইরাস ছড়ানোর পেছনে ওর হাত থাকতে পারে।’

এখানেই শেষ হয়েছে সায়ন্তনের বক্তব্য। তার কথা থামার পর প্রথম মুখ খুললেন প্রতীক্ষা রায়না, ‘তুমি একদম রাইটলি গেস করেছিলে সায়ন্তন, বেণুগোপাল সব খবর পাচার করছিল। মারা যাওয়ার পর ওর ঘরে আমরা স্যাটেলাইট ফোন খুঁজে পেয়েছি। সেদিন কলকাতায় তোমার বাড়ির বাইরে থেকে স্যাটেলাইট ফোন থেকে বেণুগোপাল ওদের লোকজনকে তোমার মুভমেন্টের খবর জানাচ্ছিল।’

রতন মিশ্র আলোচনার শুরু থেকে চুপচাপ বসে ছিলেন। এবার তিনি বললেন, ‘রুস্তম কারিমভ কিন্তু ফের অদৃশ্য হয়ে গেছে। ইস্তানবুলে ওর বন্ধু ইব্রোক্সিম আবদুল্লায়েভকে বলেছে রাশিয়ার সামারা সিটিতে কার সঙ্গে ওর অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, সেখানেই গেছে ও। কিন্তু চীনের সিক্রেট সার্ভিস সামারায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওর সন্ধান পায়নি। আমরাও ইস্তানবুল থেকে উবে যাওয়ার পর ওর সন্ধান পাইনি। তবে কাঠমান্ডুতে ভিক্টর বোগদানের কাছে যে অ্যাটাচি এসেছে তার কনসাইনর কিন্তু রুস্তম স্বয়ং। লোকটার সাহস আছে বলতে হবে, নিজের নাম ব্যবহার করে অ্যাটাচিগুলো পাঠিয়েছে।’

‘অ্যাটাচিতে কী আছে জানা গেল?’ প্রতীক্ষা রায়না জানতে চাইলেন।

‘না, ম্যাম,’ রতন মিশ্র বললেন, ‘নেপাল সরকারকে বলা হয়েছে বাক্স না খুলতে। তবে মেহতা এন্টারপ্রাইসের মতো এগুলো ফাঁকা নয়, এক্স-রে করে দেখা গেছে ভেতরে খুব সূক্ষ্ম একটা মেকানিজম বসানো আছে। যতক্ষণ না আমরা বুঝতে পারছি, নেপাল অ্যাটাচি খুলবে না। চীন যে ওদের কী বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে সেটা ওরা এখন বুঝেছে।’

‘আমার একটা হাইপোথিসিস আছে, বলব?’ আরশি জানতে চাইল।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ডেফিনিটলি।’ সবাই একসঙ্গে বলে উঠল।

 ‘ “অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইন সামারা” কথাটার কিন্তু অন্য একটা মানে আছে,’ আরশি বলল, ‘এর মানে নিয়তির মুখোমুখি হওয়া। কথাটা এসেছে এক আমেরিকান লেখকের লেখা থেকে। গল্পটা মোটামুটি এরকম— বাগদাদ শহরের এক ধনী ব্যক্তির ভৃত্য বাজার থেকে ফিরে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মালিকের কাছে তাঁর ঘোড়াটি ধার চায়। মালিক জানতে চান ঘোড়া নিয়ে সে কী করবে। ভৃত্য বলে, বাজারে এক মহিলার সঙ্গে সে মুখোমুখি হয়েছিল। সেই মহিলা তাকে দেখে বিকট মুখভঙ্গি করে। সে চিনতে পারে ওই মহিলা হল স্বয়ং মৃত্যু। সেজন্য সে বাগদাদ থেকে পালিয়ে যেতে চায়, ঘোড়াটা পেলে সে সামারা শহরে পালিয়ে যাবে।

‘বিচলিত হয়ে ধনী ব্যক্তিটি তাঁর ঘোড়াটা ভৃত্যকে দিয়ে দিলেন। ভৃত্য সামারার উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল। এরপর সেই ধনী ব্যক্তি মৃত্যুকে খুঁজতে বাজারে বেরিয়ে পড়লেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে মৃত্যুর দেখাও হয়ে গেল। তিনি রেগে গিয়ে মৃত্যুকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি আমার ভৃত্যকে ভয় দেখিয়েছ কেন?’ মৃত্যু উত্তর দিল, ‘আমি মোটেই ওকে ভয় দেখাইনি, বরং ওকে এখানে, মানে এই বাগদাদ শহরে, দেখে আমি অবাক হয়ে গেছিলাম। কারণ আজ রাতে আমার ওর সঙ্গে সামারায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে!’

আরশি কাহিনি শেষ করল। সায়ন্তন বলল, ‘এই গল্পের সঙ্গে রুস্তম কারিমভের কী সম্পর্ক বুঝতে পারলাম না।’

‘আমি এখনও সবটা বলা শেষ করিনি,’ আরশি গম্ভীরভাবে জবাব দিল, ‘যেভাবে ভিক্টর বোগদানকে ধরা হয়েছে বলে শুনেছি সেটা খুব অস্বাভাবিক। যেটুকু বুঝি, কোনো সিক্রেট মিশনে আসা লোক এত কাঁচা হয় না। রুস্তম ওকে না বলে-কয়ে একগাদা অ্যাটাচি পাঠাল এবং ভিক্টর সেগুলো নিয়ে চুপচাপ হোটেলে বসে রইল। সকলের সন্দেহ জাগানোর জন্য এটাই তো যথেষ্ট! পাকা লোক এরকম করবে কেন? তা ছাড়া, ওকে একবার ফোন করামাত্র যেভাবে নিজে থেকে হেঁটে এসে পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে সেটা আমার খুব আশ্চর্য লেগেছে। শুনে মনে হয়েছে, ভিক্টর বোগদানকে ধরা হয়নি, সে নিজে ধরা দিয়েছে। তাই আমার সন্দেহ রুস্তম কারিমভ ভিক্টর বোগদান নামে ভারতে ঢুকে এখন আপনাদের হাতে বন্দি।’

‘অসম্ভব, হতে পারে না,’ পেছন থেকে শিবানী পাণ্ডে বলে উঠল, ‘পুরো অবাস্তব গল্প! রুস্তম কারিমভ এবং ভিক্টর বোগদান দু-জন সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তি, দু-জনের ব্যাকগ্রাউন্ড আলাদা। ভিক্টর আমেরিকায় পড়াশোনা করেছে, সেখানে জেল খেটেছে, কিন্তু রুস্তমের সেরকম কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। তাহলে দু-জনে একই ব্যক্তি হয় কী করে?’

‘হয়, অবশ্যই হয়।’ যথাসম্ভব ঠান্ডা গলায় শিবানীর কথার জবাব দিল আরশি, ‘আপনারা সিক্রেট সার্ভিসের লোক, ইন্টেলিজেন্স-কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স নিয়ে আপনাদের কারবার। আমি খবরের কাগজের সামান্য এক রিপোর্টার হয়ে আপনাদের জ্ঞান দিই কী করে! শুধু একটা কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি, আপনাদের পেশায় “লেজেন্ড” ক্রিয়েট করার একটা ব্যাপার আছে। নিখুঁত ভুয়ো পরিচয় গড়ে তোলাকে তো আপনারা “লেজেন্ড” তৈরি করাই বলেন, ঠিক কিনা? মোসাদের বিখ্যাত এজেন্ট এলি কোহেনের কথা ভুলে গেলেন? এমন জোরদার লেজেন্ড সঙ্গে নিয়ে সিরিয়া গেছিলেন, যার ফলে তিনি বহু বছর দামাস্কাসে একজন ধনী আরব ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে যান, কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেনি। ঠিক বলছি, শিবানী ম্যাডাম?’

‘মিস বসু, তাহলে আপনি বলছেন ভিক্টর বোগদান এবং রুস্তম কারিমভ একই ব্যক্তি?’ অমরনাথ পটেল অবাক হয়ে জানতে চাইলেন।

‘বলছি না, অনুমান করছি। রুস্তম কারিমভ ভারত সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়, সেজন্য নিজে থেকে ধরা দিয়েছে।’

‘ভেরি ফার ফেচেড কনক্লুশন, বাট উই স্টিল হ্যাভ মিনস টু ভেরিফাই ইট।’ রতন মিশ্র বললেন, ‘ভিক্টর হাই লেভেল ক্যাচ, ওকে এখানে সেফ হাউসে রাখা হয়েছে, পুলিশ কাস্টডিতে থাকলে মিডিয়ায় জানাজানি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আমরা এখনই ওখানে একবার যেতে পারি। আরশি ম্যাম, আপনি চলুন আমাদের সঙ্গে। নইলে ওই সামারার গল্পটা আমরা ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না।’

প্রতীক্ষা রায়নার দিকে তাকাল আরশি। প্রতীক্ষা বললেন, ‘ইউ আর লাইক মাই ডটার। আই নো ইউ আন্ডারওয়েন্ট ভেরি হার্শ ট্রিটমেন্ট ইন দ্য হ্যান্ডস অফ ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি। তবু আমি তোমাকে ওঁদের সঙ্গে যেতে রিকোয়েস্ট করছি। ব্যাপারটা আমাদের খোলসা করে বোঝা দরকার।’

‘শি ইজ লাইক মিস মার্পল, স্যার,’ শিবানী পাণ্ডে অমরনাথ পটেলের উদ্দেশে বলল, ‘বেসিক্যালি অ্যান আর্মচেয়ার ডিটেকটিভ। উনি একজন ইন্টারন্যাশনাল টেররিস্টকে সামলাতে পারবেন না, ওটা আমাকে দেখে নিতে দিন।’

ঠান্ডা কণ্ঠস্বরকে আরও ঠান্ডা করে আরশি শিবানীর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘ইউ আর ইনসাল্টিং মি আনপ্রোভোকেটেডলি আগেন অ্যান্ড আগেন। স্টপ দিস অর ইউ উইল রিগ্রেট ফর লাইফ, আই প্রমিস।’

‘এনাফ অফ ইউ, শিবানী! আই অ্যাম রিয়েলি টায়ার্ড অফ ইউ। জাস্ট গেট আউট অফ দিস রুম। আমি তোমাকে এনআইএ থেকে ট্রান্সফার করে এবার গ্রামে পাঠাব, সেখানে গিয়ে তুমি তোমার মেজাজ দেখিয়ো।’

অমরনাথ পটেল ভয়ংকর চটে গেছেন বোঝা গেল। তাঁর রুদ্রমূর্তি দেখে সুড়সুড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল শিবানী পাণ্ডে। অমরনাথ এবং রতন মিশ্র দু-জনেই উঠে পড়লেন। আরশিও উঠল তাঁদের দেখাদেখি। শুধু প্রতীক্ষা রায়না থেকে গেলেন সায়ন্তনের কাছে।

হাসপাতাল থেকে খুব একটা দূরে নয় সেফ হাউস যেখানে ভিক্টর বোগদানকে এখন রাখা হয়েছে। মিনিট কুড়ির মধ্যে জনবহুল রাস্তার ওপর একটা বৈশিষ্ট্যহীন বাড়ির সামনে আরশিরা এসে পৌঁছোল। গাড়ি থেকে নেমে রতন মিশ্র এবং অমরনাথ পটেলের সঙ্গে আরশি ঢুকল বাড়ির মধ্যে। সরু সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠে প্যাসেজের সামনে একটা ঘর, তার সামনে কারবাইন হাতে পাহারায় রয়েছে দু-জন কম্যান্ডো। ঘরের দরজায় ছিটকিনি নেই, বাইরে দেওয়ালের গায়ে একটা এলইডি স্ক্রিনে ভেতরের ছবি দেখা যাচ্ছে। আরশিরা দেখল একটা লোহার খাটে পাতলা চাদর পেতে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে রয়েছে ভিক্টর বোগদান।

আরশিরা সবাই ঘরে ঢোকার সঙ্গেসঙ্গে ঘুম ভেঙে চমকে বিছানার ওপর উঠে বসল ভিক্টর। হাত দিয়ে চোখ রগড়ে ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা করল।

‘গুড আফটারনুন, ডক্টর কারিমভ,’ আরশি ভিক্টর বোগদানকে বলল, ‘এই অবেলায় ঘুমিয়ে রয়েছেন কেন, শরীর ঠিক আছে তো আপনার?’

মুহূর্তের জন্য ভুরু কুঁচকে গিয়ে ফের স্বাভাবিক হয়ে গেল ভিক্টর বোগদানের। ঠান্ডা গলায় সে বলল, ‘আপনাদের বুঝতে এত দেরি হল!’

‘হ্যাঁ, ডক্টর কারিমভ, আমরা আপনার প্রকৃত পরিচয় জেনে গেছি,’ রতন মিশ্র বললেন, ‘কিন্তু কয়েকটা ব্যাপার এখনও বুঝতে পারিনি। আপনি যখন নিজে থেকে ধরা দিয়েছেন, তখন এই ব্যাপারগুলো বুঝতে আমাদের সাহায্য করবেন, আশা করছি।’

ঝকঝকে একটা হাসি ফুটল রুস্তম কারিমভের মুখে, ‘বলুন—’

‘আপনি নিজে থেকে এসে ধরা দিলেন কেন? এর পেছনে আপনার পরিকল্পনাটা কী?’

‘এককথায় বুঝিয়ে বলা যাবে না,’ রুস্তম ছড়িয়ে হাসল, ‘মঙ্গোলিয়া থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমি ঠিক করে ফেলেছিলাম পুরোনো জীবনে আর ফিরব না। বলতে পারেন, আমি খুব ক্লান্ত। এত বছর ধরে বিভিন্ন দেশে ঘুরে মৃত্যু ফেরি করে বেড়াতে আর ভালো লাগছে না, এবার বিশ্রাম চাই আমার।’

‘বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ভারতকে বেছে নিলেন আপনি?’ অমরনাথ পটেল প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন।

‘তা-ই নিলাম তো,’ ফের উজ্জ্বল হাসি হাসল রুস্তম কারিমভ, ‘এদেশে একটা পাপ করেছিলাম বিশ বছর আগে, প্রায়শ্চিত্ত অন্য দেশে করি কীভাবে?’

‘শিলিগুড়ির নিপা ভাইরাস আউটব্রেক আপনার তৈরি করা, তাই না ডক্টর কারিমভ?’ আরশি বলল।

‘আপনি জানেন! ভেরি গুড। ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স রিয়েলি খুব ভালো দেখছি।’

‘আমি ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির লোক নই, ডক্টর কারিমভ,’ আরশি শান্ত গলায় উত্তর দিল, ‘কিন্তু শিলিগুড়ির আউটব্রেকের সঙ্গে আমার একটা যোগাযোগ আছে। আপনার সৃষ্ট মহামারির সূচনা আমার বাবার নার্সিং হোমে। ওই ঘটনায় আমার বাবার মৃত্যু হয়।’

অবাক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আরশির মুখের দিকে চেয়ে রইল রুস্তম কারিমভ, তারপর বলল, ‘ইয়েস, আই রিমেমবার ইয়োর ফেস! আউটব্রেকের পর আমরা একই ট্রেনে ফিরেছিলাম শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা। তোমার অবশ্য আমাকে মনে থাকার কথা নয়।’

আরশি একটু থতোমতো খেয়ে গেল। বাবার মৃত্যুর পর মামা এসে ওদের কলকাতায় নিয়ে গেছিলেন। ট্রেনের কামরায় একজন সাহেব ছিল এটুকু মনে আছে। সেই সাহেব কি রুস্তম কারিমভ? আরশি মনে করতে পারল না।

‘ভিক্টর বোগদান কে, ডক্টর কারিমভ?’ অমরনাথ পটেল জানতে চাইলেন, ‘তাকে কোথায় পাওয়া যাবে?’

‘কোথাও না। ভিক্টর বোগদান নামে কেউ নেই, ছিলও না কোনোদিন। পুরোটাই বানানো গল্প।’

‘চীনের সিক্রেট সার্ভিস এত সহজে বোকা বনে গেল, ডক্টর কারিমভ? ভিক্টর বোগদানের হ্যান্ডলার মাইকেল কিছু বুঝতে পারল না?’

‘“মাইকেল” বলে কেউ থাকলে সে হয়তো বুঝতে পারত! কিন্তু মাইকেল নামে কেউ নেই।’

‘অবিশ্বাস্য,’ রতন মিশ্র উত্তেজিতভাবে একেবারে বিছানার ওপর রুস্তমের গা ঘেঁষে বসে পড়লেন, ‘চীনের মিনিস্ট্রি অফ স্টেট সিকিউরিটি এত কাঁচা কাজ করতেই পারে না! জেনারেল ওয়াং দেমিন সম্পর্কে আমাদের কাছে যে রিপোর্ট আছে তা থেকে বোঝা যায় উনি খুব সতর্ক এবং সাবধানী ব্যক্তি। উনি এমন করতেই পারেন না।’

‘জেনারেল ওয়াং ভুল করেননি, তাঁকে দিয়ে ভুল করানো হয়েছিল। লেফটেন্যান্ট জেনারেল চেন অনেকদিন ধরেই জেনারেল ওয়াংকে সরানোর মতলব করছিলেন। ওদের ল্যাবের ডিরেক্টর হিসেবে কর্নেল লি না যোগ দেওয়ার পর দু-জনে মিলে হাত মিলিয়ে জেনারেল ওয়াংকে সরানোর পরিকল্পনা করে। জেনারেল ওয়াং-এর মহিলাঘটিত দুর্বলতার খবর জেনে টোপ হিসেবে কর্নেল লি না-কে ব্যবহার করা হয়। কর্নেল লি না মাউন্টেন রিসর্টে সারারাত জেনারেল ওয়াং-এর সঙ্গে কাটিয়ে ভোরবেলায় নাটক করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। বেরিয়ে এসে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল চেনকে জানিয়ে দেন জেনারেল ওয়াং-এর কাছ থেকে চলে এসেছেন। এরপর লেফটেন্যান্ট জেনারেল চেন ফোন করে জেনারেল ওয়াংকে বলেন, কর্নেল লি না তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন। সম্মান বাঁচাতে জেনারেল ওয়াং এয়ারপোর্টে বসে সার্ভিস রিভলভার থেকে মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। জেনারেল ওয়াং যাকে যাকে বিশ্বাস করেছিলেন, তারা সবাই মিলে তাঁকে শেষ করেছে।’

‘লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াং কেন এমন করলেন, উদ্দেশ্য কী ওঁর?’

‘ডলার! বিশ্বের সবচেয়ে লোভনীয় জিনিস।’

‘ডলার!’ একসঙ্গে বলে উঠলেন রতন মিশ্র এবং অমরনাথ পটেল।

‘হ্যাঁ, ডলার,’ রুস্তম কারিমভ স্বগতোক্তির মতো বলে চলল, ‘সোভিয়েত ইউনিয়নে ছেলেবেলায় আমরা টাকাপয়সাকে ঘৃণা করতে শিখেছিলাম। কমিউনিজমকে বাঁচানোর তাগিদে আমরা ক্যাপিটালিস্ট ব্লকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে উদ্ বুদ্ধ হয়েছিলাম। পরমাণু বোমা কিংবা জীবাণু অস্ত্র, সব কিছু আমাদের কাছে ছিল ক্যাপিটালিস্ট দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার হাতিয়ার। আমি নিজেও সেই মহান আদর্শের টানে জীবাণু গবেষণার কাজে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝেছি, এসব আসলে ফাঁকা আওয়াজ। দেশভক্তির নামে দেশকে বিক্রি করে দেওয়ার কৌশল। যাদের আদর্শ বলে মনে করতাম, একে একে তারা সবাই ডলারের কাছে নিজেদের বেচে দিল! সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশটাই হারিয়ে গেল মানচিত্র থেকে। এরপর উত্তর কোরিয়া এবং চীনে গিয়ে দেখলাম কমিউনিজমের নামে চরম স্বৈরতন্ত্র চলছে, যারা সবাইকে সাম্যবাদী হওয়ার উপদেশ দিচ্ছে, তারা এক একজন এক একটা পাক্কা মাফিয়া ডন, কথায়-কাজে বিন্দুমাত্র মিল নেই। কিন্তু সবার টিকি বাঁধা একটা জিনিসের কাছে— ডলার!’

‘কাঠমান্ডুর অ্যাটাচিগুলোতে কোন ভাইরাস আছে, ডক্টর কারিমভ?’ অমরনাথ পটেল প্রশ্ন করলেন।

‘কোনো ভাইরাস নেই। শুধু জল আছে টিউবের মধ্যে। মঙ্গোলিয়া থেকে বেরিয়ে আসার পরেই আমি কোল্ড চেন বন্ধ করে দিয়েছিলাম, ভাইরাস অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছিল। ইরান অতিক্রম করার সময় শুকনো বালির পাহাড় দেখে সব ভাইরাস ওখানে ফেলে দিই। ইস্তানবুলে কোনো ভাইরাস পৌঁছোয়নি।’

‘তবে আপনি ইব্রোক্সিমকে দিয়ে এত সব কাণ্ডকারখানা করতে গেলেন কেন?’

‘চীনের সিক্রেট সার্ভিসের লোক তো আমাকে মনিটর করছিল। আমি ইব্রার কাছে না গেলে ওরা সন্দেহ করত, বেজিংকে রিপোর্ট করত। সেই রিপোর্ট ভুল কারো হাতে পড়লে আমি আর পালাতে পারতাম না।’

‘পালিয়ে ভারতে এলেন কেন, ডক্টর কারিমভ?’ রতন মিশ্র বললেন, ‘আপনাকে যখন ভিক্টর বলে চিনতাম, তখন বলেছিলাম ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অপরাধে আপনার ফাঁসি হতে পারে। কিন্তু রুস্তম কারিমভ তো শুধু ষড়যন্ত্র নয়, ভাইরাস ছড়িয়ে এদেশের মানুষকে হত্যা করেছে। জেনেশুনে ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে এলেন, ডক্টর কারিমভ?’

রুস্তম বিষণ্ণ হাসি হাসল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘আমাকে ফাঁসি দিতে চাইলে দিতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে আছে মঙ্গোলিয়া ফেসিলিটির মাদার কম্পিউটার রিমোট অ্যাকসেস অ্যাক্টিভেট করার পাসওয়ার্ড। না, আমার কাগজপত্রর মধ্যে পাবেন না, সেসব তো আপনাদের হেফাজতে রয়েছে। পাসওয়ার্ড রয়েছে আমার মাথায়, বিশাল একটা আলফা-নিউমেরিক কোড, পুরোটা মুখস্থ করেছি আমি। এখন সেই পাসকোড আপনাদের কাছে মূল্যবান না আমার প্রাণ, সেই সিদ্ধান্ত আপনাদের নিতে হবে!’

বাইরে বেরিয়ে এসে রতন মিশ্র অমরনাথ পটেলকে বললেন, ‘দেখলে, কী সাংঘাতিক ধড়িবাজ লোক! ঠিক নিজের বেরিয়ে যাওয়ার পথ রেডি করে তারপর আমাদের হাতে ধরা দিয়েছে।’

সবাই মিলে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালেন। আরশি বলল, ‘আমি এখান থেকে হোটেলে চলে যাব। কাল সকালে আমার কলকাতায় ফেরার ফ্লাইট আছে। মিস্টার পটেল, আপনার কাছ থেকে আমি কি একটা সাহায্য পেতে পারি?’

‘ডেফিনিটলি মিস বসু, আপনি বলুন কী করতে হবে?’

‘বেশি কিছু নয়, আপনাদের কলকাতা অফিসের যেকোনো একজন অফিসারকে বলে দেবেন আমার সঙ্গে একটু যোগাযোগ রাখতে। আপনারা আপনাদের অপরাধীকে পেয়ে গেছেন, কিন্তু আমার কাহিনি এখনও শেষ হতে বাকি আছে!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *