জাহান্নমের সওদাগর – ১৩

ক্যালকাটা পোস্ট-এর অফিস, কলকাতা।

নিজের কিউবিকলে বসে একটা সাদা কাগজে আঁকিবুঁকি কাটছিল আরশি। সামনে ডেস্কটপের স্ক্রিনে জোকারের ছবি। জোকার একপাশে মুখ ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, সঙ্গে তার একটা উক্তি ‘বিফোর ইউ জাজ মি, ডিল উইথ হোয়াট আই হ্যাভ ডেল্ট উইথ, ফিল হোয়াট আই হ্যাভ ফেল্ট, অ্যান্ড ট্রাই টু সারভাইভ হোয়াট আই হ্যাভ সারভাইভড!’

জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর আরশি আজ প্রথম অফিসে এল। তাকে ঘিরে অনেক কৌতূহল, অনেক জিজ্ঞাসু চোখের চাউনি। কিন্তু খেজুরে আলাপ করতে এসে আরশির কম্পিউটারের দিকে চোখ পড়তে সবাই অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাচ্ছে। মেসেজ ইজ লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার!

বাড়ির কম্পিউটার এখনও পুলিশের কাছ থেকে ফেরত পাওয়া যায়নি, অফিসে এসে সেজন্য আরশি প্রথমে নিজের মেল খুলল। অনেক মেল জমা হয়ে আছে, সেসবের উত্তর পরে দেওয়া যাবে, কিন্তু ইউনাইটেড নেশন’স অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমস থেকে ওকে পুরস্কার গ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানিয়ে যে মেল পাঠিয়েছে, আগে তার একটা ব্যবস্থা করা দরকার।

আরশির পাসপোর্ট আদালতের জিম্মায়, তা ছাড়া এই পরিস্থিতিতে অস্ট্রিয়ায় গিয়ে নিজের হাতে পুরস্কার নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং আরশি জানিয়ে দিল, বর্তমানে সে কিছু ব্যক্তিগত সমস্যায় রয়েছে, সেজন্য ভিয়েনায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই মেল পেয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই বিস্মিত হবেন, কারণ খুব বড়ো নির্বোধ না হলে কেউ ফোকটে বিদেশযাত্রার প্রস্তাব অস্বীকার করে না।

মেল-এর জবাব লেখা হয়ে গেলে আরশি পরিপাটি করে তার ইস্তফার চিঠি লিখল। একটা কপি এইচআর-কে মেল করে দিল, আরেক কপি প্রিন্ট আউট নিয়ে সই করে সত্যকাম বাগচির ঘরে পাঠিয়ে দিল। আরশি লিখল, এখনকার মানসিক অবস্থায় চাকরি করার মতো পরিস্থিতি নেই তার। তাই কাজে ইস্তফা দিতে ইচ্ছুক সে। তার জন্য আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে অফিস যে টাকা ব্যয় করেছে, তার পরিমাণ জানালে টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করবে। আজকের পর যেহেতু ও আর অফিসে আসবে না বলে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, সেজন্য মাকে বলে জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের চেক বই নিয়ে এসেছে আরশি।

যেসব বাঘা উকিল আরশির কেস লড়েছেন, তাঁদের ফিজ অনেক টাকা হবে। অত টাকা একজন মধ্যবিত্তর সেভিংস অ্যাকাউন্টে থাকে না। আরশির পরিকল্পনা হল, আজ চেক লিখে জমা করে ফেরার পথে ব্যাঙ্কে গিয়ে দু-তিনটে ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে ফেলবে। তাহলে চেক বাউন্স করবে না। মা আপত্তি করেনি এই প্রস্তাবে। শুধু জানতে চেয়েছিল, ‘চাকরি কেন ছাড়বি, তোর অফিস তো তোকে খুব সাপোর্ট করেছে?’

মাকে আরশি বুঝিয়েছে, সব অফিসের নির্দিষ্ট কিছু আইনকানুন এবং রীতিনীতি থাকে। এই আইনের জটিলতায় আটকে থাকলে আরশি যা করতে চায়, তা করতে পারবে না। সব ঘটনায় অফিস জড়িয়ে থাকবে। ওর যেকোনো কাজের প্রভাব এসে পড়বে অফিসে, কৈফিয়ত দিতে হবে ম্যানেজমেন্টকে।

‘কী করতে চাইছিস তুই?’ মা জানতে চেয়েছিল। আরশি হেসে বলেছে, ‘আই ওয়ান্ট টু বি অফিশিয়ালি আন-অফিশিয়াল!’ মা পুরোটা বোঝেনি, তবে এটুকু বুঝেছে, মেয়ে এমন কিছু পরিকল্পনা করেছে যার জন্য চাকরি ছেড়ে বেরিয়ে আসা জরুরি।

বরুণ এসে জানাল, আরশিকে চেম্বারে ডেকেছেন সত্যকাম। কিউবিকল ছেড়ে বেরিয়ে এগজিকিউটিভ এডিটরের ঘরে ঢুকল আরশি। সত্যকাম একটু ম্লান হেসে বললেন, ‘বোসো। কী ব্যাপার, হঠাৎ রেজিগনেশন দিচ্ছ কেন?’

অ্যারেস্ট হওয়ার দিন থেকে সত্যকাম এবং আরশির সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আরশির বিশ্বাস, ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির সামনে সত্যকাম যদি দৃঢ়ভাবে জানাতেন, আরশি যা কিছু করেছে সবটাই অ্যাসাইনমেন্টের স্বার্থে, তবে সেদিন পুলিশি নিগ্রহ সইতে হত না। মুশকিল হল, সত্যকাম বলেছেন আধখানা কাহিনি। তিনি তদন্তকারী দলের কাছে যে গল্পটা বলেছেন তাতে একটা ছোট্ট টুইস্ট ছিল। এনআইএ-কে বোঝানো হয়েছিল, আরশিকে অফিশিয়ালি একটা স্টোরি অ্যাসাইন করা হয় ঠিকই, কিন্তু সায়ন্তনকে নিজের বাড়িতে ডাকতে বলা হয়নি, সায়ন্তনের বাড়িতে যেতেও উৎসাহ দেওয়া হয়নি। আরশি যা করেছে সব নিজের ইচ্ছেয়। সোমকবাবু পরে যখন হাল ধরেছেন, ততক্ষণে জল অনেক দূর গড়িয়ে গেছে।

‘হঠাৎ নয়, ভেবেচিন্তেই চাকরি ছাড়ছি,’ আরশি না বসেই জবাব দিল, ‘আমি কাল থেকে আর আসব না।’

‘এভাবে চাকরি ছাড়া যায় না, আরশি,’ সত্যকাম বোঝাতে চাইলেন, ‘আগে অফিসকে নোটিশ দিতে হয়। তারপর এইচআর দেখবে তোমার কাছে অফিসের পাওনাগণ্ডা কিছু আছে কি না, এরপর—’

‘আমি নিয়মকানুন সবই জানি, সত্যকামদা।’ আরশি থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আবার এ-ও দেখেছি, কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে একজন সিনিয়র রিপোর্টারকে নোটিশ ছাড়া শুধু তিন মাসের মাইনে হাতে দিয়ে রাতারাতি অফিস থেকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আমার কাছে ওই গল্প করে লাভ নেই। এইচআর-কে মেল করে জানতে চেয়েছি, আমার পেছনে লিগাল এক্সপেন্স কী হয়েছে, সব কিছু আজ মিটিয়ে যাব। চেক বই নিয়ে এসেছি।’

‘চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া হয়ে যাচ্ছে, ভাই—’

‘সেটা আপনার মনে হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা আলাদা সত্যকামদা,’ আরশি তাড়া দিল, ‘আপনি আমার অ্যাপ্লিকেশনটা রেকমেন্ড করে এইচআর-এর কাছে পাঠিয়ে দিন। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।’

‘আমি এটা পারব না, আরশি। আমি সোমকবাবুকে জানাচ্ছি। উনি এসে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবেন।’

কথা না বাড়িয়ে আরশি সত্যকামের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ও জানত এই সিদ্ধান্ত সত্যকামদা একা নিতে পারবেন না। এখন অপেক্ষা করা সোমকবাবুর জন্য।

কিউবিকলে ফিরে গিয়ে আরশি কম্পিউটার থেকে এক্সটার্নাল হার্ড ডিস্কে ব্যাক-আপ তুলতে শুরু করল। হঠাৎ ওর খেয়াল হল কিউবিকলের বাইরে ভীতু ভীতু মুখে অনীক এসে হাজির হয়েছে। আরশি তার দিকে তাকাতে অনীক বলল, ‘কী শুনছি আরশিদি, আপনি নাকি রিজাইন করছেন?’

এই ক-দিনের অভিজ্ঞতায় আরশি দেখেছে অনীক ছেলেটা মন্দ নয়। একটু পাকা, কিন্তু আরশির জন্য প্রচুর ছোটাছুটি করেছে। দিল্লিতে গিয়ে দিনের পর দিন পড়ে থেকেছে, এনআইএ-র কাছ থেকে আপডেট নিয়ে অফিসকে জানিয়েছে, উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করেছে, এমনকী তিহারে গিয়ে আরশিকে দেখে এসেছে। সব কিছুর পেছনে অবশ্য সোমকবাবুর নির্দেশ ছিল, কিন্তু নিজের কাজ ফেলে অন্যের উপকারে আজকাল কেউ এত সময় ব্যয় করে না।

‘হ্যাঁ রে,’ আরশি বলল, ‘চাকরি করতে ইচ্ছে করছে না আর।’

অফিসের সবাই জানে আরশি বেশ সম্পন্ন ঘরের মেয়ে, বাবা নামজাদা চিকিৎসক ছিলেন, মা-ও পারিবারিকভাবে বেশ কিছু সম্পত্তির মালিক। সুতরাং খেয়ালে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার বিলাসিতা আরশি দেখাতে পারে। অনীক তাই জানতে চাইল, ‘এবার আপনি কী করবেন?’

‘বিয়ে।’

‘বিয়ে?’ অনীক অবাক হয়ে বলল।

‘কেন, তুই বিয়ে শব্দটা আগে শুনিসনি?’

‘না, মানে, আপনি তো—’ অনীক আমতা আমতা করল।

‘আমি তো কী?’ আরশি প্রশ্ন করল, ‘আমি তোকে বলেছিলাম, কোনোদিন বিয়ে করব না? দিল্লিতে একটা বড়োলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, ঠিক করেছি ওকেই বিয়ে করব।’

‘দিল্লিতে আপনার আবার কার সঙ্গে আলাপ হল, আরশিদি?’ অনীক অবাক হল, ‘ওখানে তো আপনি কোর্টকাছারি করেই কাটালেন!’

‘তিহারে পরিচয় হয়েছে,’ আরশি বলল, ‘নামকরা চিটিংবাজ। চারটে ব্যাঙ্ককে ধোঁকা দিয়ে ছ-শো কোটি টাকা হাতিয়েছে। ওর প্রপার্টি অ্যাটাচ করে সিবিআই মাত্র চল্লিশ কোটি তুলেছে, বাকি টাকার হদিশ নেই! কয়েক বছর জেল খেটে বেরিয়ে এসে ওই টাকা দিয়ে নতুন জীবন শুরু করবে। বুঝলি?’

অনীক টের পেল আরশি খুব খারাপ মুডে আছে। এরকম ফাজলামি কথাবার্তা ও আগে কখনো আরশিকে বলতে শোনেনি। অফিসের কেউই শোনেনি। শুকনো হাসি হেসে অনীক সরে গেল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে অফিসে লোকজনের সংখ্যা বাড়ল। পেখম-সহ আরও অনেকে এসে দেখা করে গেল। সবাইকে হুঁ হাঁ করে কথার জবাব দিয়ে কাটিয়ে দিল আরশি। কিন্তু পেখমকে বলল, ‘তোর ঘাড়ে আবার একটা কাজ চাপাব? করে দিবি? রিস্ক আছে কিন্তু।’

‘কী কাজ, আরশিদি?’ পেখম জানতে চাইল।

‘একজন তোর কাছে একটা জিনিস রাখতে দিতে পারে। সেটা লুকিয়ে আমার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। যতক্ষণ তোর কাছে জিনিসটা থাকবে, ততক্ষণ তোর রিস্ক, তোকে সেটা যেভাবে হোক লুকিয়ে রাখতে হবে।’

পেখম বেশ অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেল। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘জিনিসটা কী গো?’

‘এটাই হয়েছে মুশকিল,’ আরশি একটু বিব্রত মুখে বলল, ‘প্রথম কথা হল, জিনিসটা কী আমি জানি না। দ্বিতীয় সমস্যা হল, জিনিসটা আদৌ পাওয়া যাবে কি না, তা-ও বলতে পারছি না।’

‘এ তো বেশ জটিল রহস্য মনে হচ্ছে গো, আরশিদি!’ পেখম উত্তেজিতভাবে বলল, ‘অবশ্য তুমি যা সব কাণ্ড করছ, তাতে রহস্য তো থাকবেই। এনিওয়ে, জিনিসটা কে দেবে আমাকে?’

‘এটা হল, তিন নম্বর সমস্যা,’ আরশি বলল, ‘কে যে তোর হাতে মালটা দেবে, সেটাও আমি জানি না।’

‘পুরো সিডনি শেলডন কেস, আরশিদি,’ পেখম কোঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, ‘আমি লড়ে যাব। তুমি যা করতে চাইছ করে ফেলো।’

এই সময় আরশির মোবাইল বাজল। আরশি দেখল মা ফোন করেছে। কী ব্যাপার, হঠাৎ মা ফোন করল কেন? কিছুটা উদ্ বেগ নিয়ে আরশি ফোন ধরল। না, মা ঠিকই আছে। মা শুধু জানিয়ে দিল ব্যাঙ্কে গিয়ে ফিক্সড ভেঙে টাকা সেভিংস অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়ে গেছে। অফিসকে চেক দিতে এখন আর সমস্যা নেই।

এই হল আরশির মা সুদক্ষিণা! দিল্লি থেকে ফিরে বাড়ি ঢুকে আরশিকে দেখে মা এমন নির্বিকারভাবে বলল ‘আয়’, যেন সে বাজার করে ফিরল। মেয়ে যে তিহারের মতো সাংঘাতিক একটা জেলখানা থেকে জামিন পেয়ে বাড়ি ফিরল সে-ব্যাপারে মা-র কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। পেখম বলেছে ওদের বাড়িতে যখন এনআইএ তল্লাশি করছিল তখন মা একইরকম নিরুত্তাপভাবে তদন্তকারীদের বলেছিল, ‘যা যা দেখতে বা নিয়ে যেতে চান, নিয়ে যান। আলমারি লকার সব খুলে দেখিয়ে দিচ্ছি। আমাদের বাড়িতে কোনো চোরকুঠুরি নেই, তবু সন্দেহ হলে বলবেন সেই জায়গা দেখিয়ে দেব। কিন্তু অনুগ্রহ করে জিনিসপত্র ভাঙচুর করবেন না। বাড়িতে মেয়ে না থাকলে মেরামত করার মিস্তিরি জোগাড় করতে পারব না আমি।’ মা-র এই বক্তব্যর সামনে এনআইএ টিম বাড়ি তছনছ না করে শুধু আরশির কম্পিউটার, বইপত্র, পেনড্রাইভ এসব নিয়ে ফিরে গেছে।

মা-র কথা ভাবতে ভাবতে তিহার জেলের স্মৃতি ফিরে এল আরশির মনে। জেলখানার নাম সংশোধনাগার করার সুপারিশ যে করেছিল তাকে দেখতে বড়ো ইচ্ছে করে আরশির। সংশোধনের সুযোগ তো নেই-ই, বরং তার মতো বিনা দোষে সাজা পাওয়া মানুষ জেলখানায় ঢুকলে বেরিয়ে আসবে পাক্কা ক্রিমিনাল হয়ে।

পুলিশি হেফাজতে শারীরিক অত্যাচার সইতে হয় বলে উকিলরা চায় মক্কেলের জেল হেফাজত। কেন চান তাঁরা? জেল তো পুলিশের চেয়ে কোনো অংশে ভালো নয়। অন্তত আরশির তা-ই অভিজ্ঞতা।

এনআইএ-র হেফাজতে প্রথমদিন শিবানী পাণ্ডের হাতে নিগ্রহ ছাড়া আর মারধর খেতে হয়নি আরশিকে। কিন্তু নার্কো অ্যানালিসিসের পরেও শিবানীর দুর্ব্যবহার কমেনি। আরশিকে সে বার বার বলেছে, অনেক পাকা ক্রিমিনাল নার্কো টেস্টেও ধোঁকা দিতে পারে। আরশি নাকি সেই শ্রেণির অপরাধী। সেজন্য নার্কো অ্যানালিসিস করে কোনো দরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। পাটিয়ালা হাউস কোর্ট যখন আরশিকে তিহারে পাঠাল, তখন আরশি ভেবেছিল, যাক, এই খান্ডারনি মহিলার মুখোমুখি আর তাকে হতে হবে না। কিন্তু শিবানি পাণ্ডের চেয়ে অনেক বড়ো বিপদ যে তিহারে ওত পেতে বসে থাকতে পারে সেকথা ও জানত না।

তিহারে ছ-নম্বর জেল হল মহিলা জেল। পুলিশ তাকে ভ্যান থেকে নামিয়ে জেলের কর্তৃপক্ষর হাতে ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে দুঃস্বপ্ন শুরু হয়ে গেল। আরশির নাম-ধাম লেখা, আদালতের আদেশের কপি নথিভুক্ত করার পাশাপাশি তার জামাকাপড়ের ব্যাগ হাতের আংটি ও গলার চেন জমা নিয়ে নেওয়া হল। পায়ের চটি খুলে রেখে তাকে প্রবেশ করতে হল ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য।

এক মহিলা ডাক্তার দুই মহিলা ওয়ার্ডারকে সঙ্গে নিয়ে আরশির পরীক্ষা করলেন। আরশিকে বিবস্ত্র হতে হল। তারপর এক ওয়ার্ডার মহিলা হাতে পাতলা ল্যাটেক্স গ্লাভস পরে ওর যোনি এবং পায়ুছিদ্রতে আঙুল ঢুকিয়ে দেখলেন কিছু লুকোনো বস্তু রয়েছে কি না। হাঁ করিয়ে মুখের ভেতর এবং নাক-কানের ছিদ্র দেখা হল। মহিলা ডাক্তার নিজে কিছুই করলেন না, শুধু একটা রাইটিং বোর্ডে আটকানো কাগজে কীসব লিখে নিলেন। এরপর পোশাক ফেরত পেল আরশি, কিন্তু চুড়িদারের দোপাট্টা এবং চটি ফেরত দেওয়া হল না। সেই অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া হল তার সেল-এ।

আরশির বিরুদ্ধে যেহেতু ছিঁচকে অপরাধের মামলা নেই, সেজন্য তাকে একটা আলাদা ছোটো সেল দেওয়া হয়েছে। সেলের মধ্যে জোরালো আলো জ্বলছে, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগানো। একপাশে খুপরি মতো জায়গায় কোমরসমান উচ্চতার দেওয়ালের আড়ালে টয়লেট। ক্যামেরার মুখ যদিও অন্যদিকে ঘোরানো, কিন্তু এখানে কীভাবে টয়লেট ব্যবহার করা সম্ভব ভেবে আকুল হল আরশি। আর টয়লেট প্যান এবং মগের যা চেহারা তা দেখে ওর অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে এল!

একটু পরে একজন মহিলা ওয়ার্ডার এসে জানাল, এখানে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। টাকা দিলে মদের বোতল থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন সব কিছু মিলবে। আরশি একজোড়া চপ্পল চাইল। ওয়ার্ডার দোক্তা খাওয়া কালো দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘জরুর মিলেগা, লেকিন উসকে লিয়ে চারসও রুপিয়া দেনা হোগা!’ একজোড়া চটির জন্য চারশো টাকা? কিন্তু আরশি নিরুপায়। ওয়ার্ডারের দেওয়া মোবাইল থেকে ফোন করে অফিসের দিল্লি ব্যুরোর একজনকে টাকা নিয়ে পরের দিন পৌঁছে দিতে অনুরোধ করল আরশি। সে রাজি হয়ে যেতেই ম্যাজিকের মতো নতুন একজোড়া চটি এসে গেল আরশির জন্য।

স্বল্পমেয়াদি কারাবাসের অভিজ্ঞতায় আরশি দেখেছিল জেলের ভেতরে যে সমান্তরাল জীবন প্রবাহিত হয় সেখানে সব তালা খোলার একমাত্র চাবিকাঠি হল টাকা। টাকা দিলে ভালো খাবার থেকে শুরু করে নেশা করার জিনিস, সব পাওয়া যাবে। সাধারণত বিচারাধীন বন্দিদের ওপর টাকার জন্য জুলুম হয় বেশি, জুলুম করে সাজাপ্রাপ্তরা। আরশির ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম হয়েছিল, কারণ জেলের ওয়ার্ডাররা সবাই জানত তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত কিছু একটা অভিযোগ রয়েছে। সন্ত্রাসবাদীদের কে আর স্বেচ্ছায় ঘাঁটাতে চায়! তার কাছ থেকে যেটুকু বিনা ঝঞ্ঝাটে আদায় হচ্ছে, তা-ই যথেষ্ট। চটি ছাড়াও আরশি টাকা দিয়ে সাবান-টুথপেস্ট জোগাড় করল। তার টয়লেট সাফ করার জন্য পাঠানো হল একটি কমবয়সি মেয়েকে। ওয়ার্ডার পরে জানাল, এ মেয়েটি জিবি রোডের একজন বেশ্যা। এক খদ্দেরকে ছুরি চালিয়ে জখম করার জন্য তার শাস্তি হয়েছে। কিন্তু মেয়েটি পয়সাকড়ি দিতে পারবে না জানিয়েছে বলে তাকে দিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করানো থেকে শুরু করে লাইফার বা যাবজ্জীবন মেয়াদিদের গা-হাত-পা টেপানোর কাজ করানো হচ্ছে।

ওয়ার্ডারের মোবাইল থেকে মাকে দু-তিন বার ফোন করেছিল আরশি। জেলের ভেতর ওকে টাকাপয়সা দিতে হচ্ছে সেকথা বলেনি, কারণ মা-র ফোনে নিশ্চয়ই এনআইএ আড়ি পেতে সব কথা শুনছে। ব্যাপারটা তারা ভালোভাবে নেবে না। কিন্তু ডাক্তারি পরীক্ষার নামে তাকে যে শারীরিক হেনস্থা সামলাতে হয়েছে মাকে তা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল আরশি। কিন্তু মা নির্বিকারভাবে বলল, ‘কান্নাকাটি করে কী হবে, মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছিস, তখন অনেকবার ডাক্তারের সামনে কাপড় খুলতে হবে, ধরে নে তার সূচনা হল।’ আরশি ভেবে দেখল মা কথাটা ভুল বলেনি, মেয়েদের জননতন্ত্রের এমনই বৈশিষ্ট্য যে, ডাক্তারের সামনে জীবনে বহুবার উন্মুক্ত হতেই হবে, শরীরের অভ্যন্তরে ডাক্তারের হাত প্রবেশও করবে। ব্যাপারটাকে সম্ভ্রমহানি হিসেবে না ভাবাই ভালো। সুতরাং অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেল আরশি।

মা এমনই। নিঃশব্দে সাপোর্ট দেয় প্রয়োজনের মুহূর্তে। আজ যেমন চুপচাপ ব্যাঙ্কের কাজ সেরে রেখেছে।

ফের একবার আরশির ডাক এল এগজিকিউটিভ এডিটরের ঘর থেকে। সত্যকাম বাগচির মুখ এবার গম্ভীর। জানালেন, সোমক সান্যাল আজ অফিসে আসবেন না। আরশির ইস্তফা তিনি গ্রহণ করতে এইচআর-কে বলে দিয়েছেন। আইনি ব্যয়ের টাকা আরশিকে দিতে হবে কি না তা এক্ষুনি বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ওকে রিলিজ লেটার বা এক্সপিরিয়েন্স সার্টিফিকেট কিছুই দেওয়া যাবে না।

সত্যকাম বললেন, ‘আরশি, আরেকবার ভেবে দ্যাখো। সোমকবাবুর সঙ্গে কথা হল ফোনে, গলা শুনে মনে হল উনি তোমার সিদ্ধান্তে আঘাত পেয়েছেন! বাড়ি গিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দ্যাখো রেজিগনেশন উইথড্র করবে কি না। তাহলে আমাকে জানিয়ো, আশা করছি ব্যাপারটা ম্যানেজ করে দিতে পারব—’

জবাব না দিয়ে হেসে আরশি ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের কিউবিকলে ফিরে এসে কম্পিউটার বন্ধ করল। তারপর ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অফিস থেকে। অনেকগুলো চোখ ওকে আড়চোখে দেখছে বুঝতে পারছে আরশি, কিন্তু এখন ওর আর কোনো পিছুটান নেই, নিজেকে পালকের মতো হালকা লাগছে।

ট্যাক্সিতে উঠে ড্রাইভারকে ‘পার্ক স্ট্রিট ফ্লুরিজ’ বলে ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করল আরশি। এবার ফোন করতে হবে ভিগনেশ শর্মাকে। ক-বছর আগে আইপিএল নিয়ে আন্তঃরাজ্য বেটিং সিন্ডিকেটের মাথা ভিগনেশকে পার্ক স্ট্রিট থেকে গ্রেফতার করেছিল লালবাজারের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। তদন্তে জানা গেছিল, সারা ভারতে ছড়িয়ে থাকা ভিগনেশের অবিশ্বাস্য নেটওয়ার্কের কথা। ক্রিকেটের বেটিং সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে হাওয়ালা কারবার এবং বেআইনি কল সেন্টার চালানো, সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে কলকাতার তিরিশ বছরের এই যুবক। কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয় তার কারবারে, কিন্তু ছিপছিপে চেহারার ভিগনেশের চেহারা দেখলে তাকে মোটেই ক্রিমিনাল বলে মনে হয় না। বরং কলেজের ছাত্র বলে ভুল হয়।

আরশি ক্রিকেট বেটিংয়ের ওপর একটা স্পেশাল স্টোরি করার জন্য লালবাজারে গিয়ে ভিগনেশের দেখা পায়। ভিগনেশের ক্ষুরধার বুদ্ধি আরশিকে মুগ্ধ করে। ভিগনেশ বলেছিল, পুলিশ মুখ বন্ধ রাখার জন্য খুব মারধর করছে, কারণ সে মুখ খুললে অনেক পুলিশ অফিসার ফেঁসে যাবেন। আরশি জয়েন্ট সিপি-কে বলে থার্ড ডিগ্রি দেওয়া বন্ধ করাতে পেরেছিল। এজন্য আরশি দিদির কাছে ভিগনেশ অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। জামিন পেয়ে আরশির সঙ্গে দেখা করে তার হাত ধরে ভিগনেশ বলেছিল, ‘দিদি, আমি ক্রাইম করেছি ঠিকই, কিন্তু পুলিশ এই ক্রিমিনালের কাছ থেকে কম টাকা কামিয়েছে নাকি! যখন দিল্লির গুঁতো খেয়ে আমাকে তুলল, আমি তখন বললাম, কোর্টে সব বলে দেব, তখন থেকে এমন মার মারতে শুরু করল যে আমি মরে যেতাম। আপনি আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন। আপনার কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। যদি কোনোদিন দরকার হয়, আমাকে শুধু একটা ফোন করবেন, আপনার জন্য জান দিয়ে দেব।’

সকালে যখন ফোনে কথা হয়েছে, তখন ভিগনেশ বলেছিল, ‘আপনি অফিস থেকে বেরিয়ে আমাকে একটা ফোন করে দেবেন। আমার বাড়ি কলিন লেনে, আমি দশ মিনিটের মধ্যে ফ্লুরিজে পৌঁছে যাব।’ ‘আমি ট্যাক্সিতে উঠে পড়েছি,’ ভিগনেশকে জানিয়ে দিল আরশি। জবাবে ভিগনেশ জানাল, সে এক্ষুনি বেরোচ্ছে।

আরশির অফিস থেকে পার্ক স্ট্রিট দূরে নয়, কিন্তু চৌরঙ্গির জ্যামে আটকে গিয়ে পৌঁছোতে একটু সময় লেগে গেল। ফ্লুরিজের সামনে ট্যাক্সি থেকে নেমে আরশি লক্ষ করল, বুকের ওপর দু-হাত ভাঁজ করে ভিগনেশ অপেক্ষা করছে। তাকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকে একটা কোণে বসে আরশি চা আর স্যান্ডউইচের অর্ডার দিল। তারপর ভিগনেশকে তার এখনকার পরিস্থিতির কথা জানাল। ভিগনেশ ভুরু কুঁচকে পুরো ব্যাপারটা নিঃশব্দে শুনল।

‘আমার একটা কাজ করে দিতে হবে তোমাকে,’ আরশি বলল ভিগনেশকে, ‘সায়ন্তনের বাড়িতে একবার তোমাকে ঢুকতে হবে। বাড়ি এখন তালাবন্ধ আছে। ওকে কিডন্যাপ করার পর ওর বোনকে পুলিশ খবর দিয়েছিল। সে এসে বাড়ির তালা খুলে দেয়, পুলিশ তল্লাশি করে কিছু না পেয়ে ফিরে যায়। সেই থেকে বাড়ি তালাবন্ধ আছে। কাউকে পাঠিয়ে তালা ভেঙে ওই বাড়িতে ঢোকাতে হবে। অন্য কিছু না, সেই লোক দেখবে সায়ন্তনের ঘরে বেহালা আছে কি না। যদি থাকে তাহলে সেই বেহালার মধ্যে কিছু একটা জিনিস থাকবে— সিডি, পেনড্রাইভ, চিপ— এরকম কিছু। সেই জিনিসটা আমার চাই।’

‘কী আছে দিদি ওই পেনড্রাইভে?’ ভিগনেশ জানতে চাইল।

‘কী আছে, আমি জানি না,’ আরশি অকপটে বলল, ‘সত্যি বলতে কী, কিছু যে আদৌ পাওয়া যাবে তা নয়। কিন্তু সায়ন্তনের শেষ মেসেজটার মধ্যে সেরকম একটা ইঙ্গিত রয়েছে। কলেজে আমাদের একটা মিউজিক গ্রুপ ছিল, আমি গিটার বাজাতাম, সায়ন্তন বেহালা। আমার ধারণা ‘একদিন তোর আর আমার সুর এসে যেখানে মিশেছিল, তার মাঝে লুকিয়ে রইল আমার কথা। পারলে খুঁজে নিস।’ বলতে সায়ন্তন ইঙ্গিত করেছে আমাদের মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টের দিকে। নিশ্চয়ই ওর কোনো গোপন কথা ছিল যা আমাকে বলতে চেয়েছিল। সেটা জানা দরকার।’

ভিগনেশ পিঠ হেলিয়ে দিয়ে আরাম করে বসল, বলল, ‘দিদি, আপনাকে ছোটোভাই হিসেবে কয়েকটা কথা বলব, একটু মাথা ঠান্ডা করে শুনবেন?’

‘বলো, তবে আমার মাথা ঠান্ডাই আছে।’

‘না, দিদি, নেই।’ বিষণ্ণ হাসি হেসে ভিগনেশ বলল, ‘আমার সঙ্গে আপনার ফারাক কোথায় জানেন, আমি পাকা ক্রিমিনাল আর আপনি একজন ভালোমানুষ, বেকায়দায় পড়ে ফেঁসে গেছেন। আপনাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে, গায়ে হাত দিয়েছে, আপনি তাই অপমানিত হয়েছেন। রাগ করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন প্রতিশোধ নেবেন বলে ছুটে বেড়াচ্ছেন। আপনি যে প্ল্যান করেছেন, সেসব বাচ্চাদের গোয়েন্দা গল্পের বইয়ে থাকে, বাস্তবে এসব চলে না । আপনি কি বুঝতে পারছেন না এনআইএ আপনাকে চব্বিশ ঘণ্টা নজরে রাখছে? আপনি আমার মতো একজন মার্কামারা ক্রিমিনালকে নিজের ফোন থেকে কল করেছেন, তারপর এখানে দেখা করলেন, এসবের কোনো কিছু এজেন্সির কাছে অজানা থাকবে না। কেউ-না-কেউ নিশ্চয়ই আমাদের খেয়াল করছে। এরপর আমি যখন সল্টলেকের ওই বাড়িতে ঢুকব, তখন পুলিশ আমাকে চট করে ধরে নেবে। আপনি আবার ফাঁসবেন, এবার আরও বড়ো কেসে!’

আরশি একমনে ভিগনেশের কথা শুনছিল। সে চুপ করতে আরশি বলল, ‘তোমার বলা শেষ হয়েছে, ভিগনেশ ভাই?’

‘হ্যাঁ দিদি,’ ভিগনেশ বলল, ‘আপনি আমাকে দু-দিন সময় দিন, আমি একটু ভেবে দেখি আপনার জন্য কী করা যায়।’

‘তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না, আমার সব ভাবা আছে, এবার তুমি মন দিয়ে আমার কথাগুলো শোনো।’

পরিকল্পনার খুঁটিনাটি আরশি খুলে বলল। শুনতে শুনতে ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল ভিগনেশ শর্মার মুখ। আরশি থামতে সে বলে উঠল, ‘দিদি, আপনি সিম্পলি ব্রিলিয়ান্ট! আপনি ক্রিমিনালের বাপ আছেন! চিন্তা করবেন না, কাজ ঠিক হয়ে যাবে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *