শিলিগুড়ি, ভারত। কুড়ি বছর আগে।
লোকেশ ছেত্রীর হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। একটু জোরে পা ফেলতে গেলে দম নিতে অসুবিধে হচ্ছে।
অথচ এমন হওয়ার কোনো কারণ নেই। শীতের দিন, রোদের তাপ নেই, গাছপালার ছায়ায় দিব্যি পথ চলা যায়। লোকেশ পাহাড়ি ছেলে, তরতর করে খাড়া পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে উঠে যাওয়ার অভ্যাস আছে, সমতলভূমিতে তার সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তা-ও একটা অদ্ভুত অসুবিধে হচ্ছে বুকের মধ্যে।
শালুগাড়া ফরেস্ট দু-ভাগে চিরে মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে গেছে সেবক রোড। পিচঢালা মসৃণ রাস্তা, হুস হুস করে দু-একটা গাড়ি মাঝেমধ্যে তাকে পাশ কাটিয়ে যাতায়াত করছে। এগুলোর বেশিরভাগ টুরিস্টদের গাড়ি, গ্যাংটক-কালিম্পং-ডুয়ার্স যাচ্ছে বা সেখান থেকে প্যাসেঞ্জার নিয়ে ফিরছে। স্থানীয় মানুষ যাতায়াত করে লোকাল বাস, ভাড়া-খাটা জিপ-টাটা সুমো কিংবা বাইকে। সেরকম কিছু গাড়িও তাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল।
চাইলেও লোকেশের গাড়িতে ওঠার অনুমতি নেই। শিলিগুড়ি থেকে কিছু রাস্তা অবশ্য ট্রেকারে এসেছে সে। তারপর ট্রেকার ছেড়ে হাঁটা শুরু করেছে। লোকেশের গন্তব্য সামনে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প। আর্মি ক্যাম্পের সামনে বাস-জিপ-সুমো সব দাঁড়ায়। কিন্তু লোকেশকে বলা আছে গাড়িতে নয়, পায়ে হেঁটে সবার নজর এড়িয়ে ক্যাম্পে প্রবেশ করতে হবে। এমন কিছু রাস্তা নয়। পাহাড়ি পথে রোজ বিশ-পঁচিশ কিলোমিটার হাঁটার অভ্যাস আছে তার। এটুকু পথ তার কাছে নস্যি!
তবে এখন এই অল্প রাস্তা অতিক্রম করাই বেশ কষ্টকর হয়ে উঠেছে। নিশ্বাসের কষ্টর পাশাপাশি একটু গা ম্যাজম্যাজ করছে লোকেশের, গলায় হালকা সুচ ফোটার মতো একটা ব্যথা লাগছে, হঠাৎ কয়েকটা হাঁচিও হল!
পানিট্যাঙ্কি থেকে ফিরে শিলিগুড়ির হোটেলের ঘরে কাল সারারাত এসি চালিয়ে ঘুমিয়েছে লোকেশ। তার এসির দরকার ছিল না। কিন্তু তাকে বলে দেওয়া হয়েছিল, হোটেলে অবশ্যই এসি রুম নিতে হবে। এসি থেকে ঠান্ডা হাওয়া বেরোনোর পথে রাখতে হবে কাচের শিশিটাকে।
কী আছে শিশিটায় সেটা লোকেশ জানে না। একটা মোটা কাচের শিশি, ভেতরে একদম তলানি একটু ঘোলাটে জল, মুখটা কর্কের ছিপি দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করা। ভয়ে ভয়ে ছিপি খুলে শিশির ভেতরের তরলের ঘ্রাণ নিয়েছিল সে। সেরকম কোনো গন্ধ পায়নি। শিশির মুখ এঁটে এসির সামনে একটা চেয়ার টেনে এনে তার ওপর সারারাত বসিয়ে রেখেছিল।
ওখানেই গণ্ডগোল হয়ে গেছে। এসিটা ঘরের জানলার নীচে দেওয়াল কেটে বসানো, হোটেলের রুমে হরদম যেমন হয়। লোকেশ পানিট্যাঙ্কি থেকে হাতে পেয়েছে কড়কড়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা, অনেকদিন এতগুলো টাকা একসঙ্গে তার হাতে আসেনি। সন্ধে থেকে বসে একটা পুরো বোতল ব্লেন্ডার্স প্রাইড তন্দুরি চিকেন দিয়ে শেষ করার পর খুব গরম লাগছিল, সেজন্য খালি গায়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছিল সে। নেশার চোটে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি। সারারাত এসির হাওয়া থেকে ঠান্ডা লেগে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের বাইরে একটা দোকান থেকে এক কাপ কড়া আদা-চা খেয়েছে, তবে সেটা যে খুব বেশি কাজে লাগেনি তা ভালো বোঝা যাচ্ছে এখন।
খুব ক্লান্ত লাগছে লোকেশের। রাস্তা থেকে নেমে গিয়ে পাশের একটা গাছের নীচে পা ছড়িয়ে বসল সে। একটু বিশ্রাম নিয়ে তবে উঠবে। বেশিক্ষণ বসা যাবে না, দুপুর বারোটায় আর্মি ক্যাম্পে চেঞ্জ অফ গার্ড হবে। সেই সময় মিনিট পাঁচেক নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটু ঢিলেঢালা থাকে। সেই পাঁচ মিনিট সময়ের মধ্যে ওকে ক্যাম্পে ঢুকে ক্যান্টিনের খাবারের শিশির তরল পদার্থটিকে মিশিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে।
গাছতলায় মিনিট দশেক জিরিয়ে শরীর একটু ঠিক হয়েছে বলে মনে হল। লোকেশ উঠে পড়তে গিয়ে টের পেল পায়ে জোর পাচ্ছে না। এই প্রথম আতঙ্কিত হল সে! এ কী কাণ্ড, পা কাজ করছে না কেন? গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে ফের ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে লোকেশ বুঝল শুধু পা নয়, তার হাত দুটোও বশে নেই। থরথর করে কাঁপছে, ভারী জিনিস বেশিক্ষণ ধরে রাখলে যেমন হয়, অনেকটা সেইরকম।
হঠাৎ প্রবল কাশির দমক এল। কাশতে কাশতে লোকেশের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শুকনো কাশি, গলা চিরে যাচ্ছে কাশতে গিয়ে। আচমকা একদলা রক্ত বেরিয়ে এল থুতুর সঙ্গে। চোখ-মুখে অন্ধকার দেখল লোকেশ। গাছতলায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে রইল সে।
কতক্ষণ সেই অবস্থায় পড়ে ছিল লোকেশ জানে না। জ্ঞান ফিরতে দেখল হাসপাতালে শুয়ে আছে সে। তার মুখে অক্সিজেন মুখোশ পরানো, তা সত্ত্বেও নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। বুকে মনে হচ্ছে পাথর বসানো, মাথার ভেতরেও লক্ষ লক্ষ সুচ ফোটার অনুভূতি।
শয্যার পাশে রীতাকে দেখতে পেল লোকেশ। রীতা কি তাকে হাসপাতালে ভরতি করিয়েছে?? খবর পেল কী করে? এখানে নিজের কী পরিচয় দিয়েছে রীতা– লোকেশের বোন, বউ না প্রেমিকা? রীতা অত্যন্ত চালাক মেয়ে, সে নিশ্চয়ই হাসপাতালে নিজের ঠিক পরিচয় দেয়নি।
ডাক্তার ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর লোকেশের কাছে এল রীতা। এক ঝটকায় অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলে দিল। বাতাসের অভাবে জল থেকে তোলা মাছের মতো ছটফটিয়ে উঠল লোকেশ। রীতা মুখটা তার কানের সামনে নামিয়ে হিংস্র গলায় বলল, ‘এক কাম ভি ঠিকসে নহি কর সকতে হো তুম। উয়ো বোতল কঁহা হ্যয়?’
‘আভি কঁহা পতা নহি, মেরা জেব মে রখা থা।’ অতি কষ্টে থেমে থেমে বলল লোকেশ।
‘নিকম্মা, মাদার…’ বিড়বিড় করে গালি দিতে দিতে দরজার দিকে এগোল রীতা। লোকেশ রীতাকে আপ্রাণ বলার চেষ্টা করল যাওয়ার সময় মুখোশটা পরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তার গলা দিয়ে আর শব্দ বেরোল না। বিছানার ওপর ছটফট করতে করতে এক সময় নিস্তেজ হয়ে পড়ল লোকেশ। সব কিছু ঝাপসা হয়ে গেল তার চোখে সামনে।
* * *
হোটেলের ঘরে বসে টেলিভিশনে ইংরেজি খবর শুনতে শুনতে রুস্তম কারিমভ বেশ আনন্দ পাচ্ছিল। শহরটা পুরো পাগল হয়ে গেছে অজানা জ্বরের আতঙ্কে। চার সপ্তাহে কম করে হলেও চল্লিশজন মানুষ মারা গেছে এক রহস্যময় জ্বরের সংক্রমণে।
মাত্র লাখ পাঁচেক মানুষ থাকে এই শহরে, প্রচুর লোক পালিয়ে গেছে, ফাঁকা রাস্তাঘাট খাঁ খাঁ করছে একেবারে। রুস্তম যে হোটেলে রয়েছে, সেখানে এই মুহূর্তে সে-ই একমাত্র বোর্ডার। বাকি সব পালিয়েছে। হোটেলের প্রচুর স্টাফ পালিয়ে গেছে, ম্যানেজার এবং তাঁর সঙ্গে দু-একজন থেকে গেছে। ভিন শহরে এসে সাহেব আতান্তরে পড়ে যাবে, সেজন্য তারা দু-বেলা দুটো খেতে দিচ্ছে রুস্তমকে।
ওরা যদি জানত এই কাণ্ডকারখানার পেছনে যার হাত সে ওদের নাকের ডগায় বসে আছে তাহলে কী হত ভাবলে হাসি পাচ্ছে রুস্তমের। হ্যাঁ, হাসি, ভয় নয়। রুস্তম ভয় পাচ্ছে না, কারণ ভাইরাসের দৌড় তার ভালোমতো জানা আছে। এই ভাইরাস রুস্তমের নিজের হাতে তৈরি।
একজন পলিটিকাল লিডারের কথা শুনেছে রুস্তম, লোকটি প্রভিনশিয়াল গভর্নমেন্টের মিনিস্টার, দলবল নিয়ে বাস টার্মিনাস এবং রেল স্টেশন পাহারা দিচ্ছেন। ডাক্তারবাবুরা শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, মিনিস্টার তাদের যাওয়া আটকাতে মরিয়া চেষ্টা করছেন, ডাক্তার পালিয়ে গেলে রোগীদের চিকিৎসা করবে কে? এমনকী সপরিবার ট্রেনে উঠে ডাক্তারবাবু বসে গেছেন, কিছুতেই তিনি নামতে রাজি হচ্ছেন না, দলের ছেলেদের কাছ থেকে এরকম খবর পেয়ে স্টেশনে ছুটে এসেছেন সেই মিনিস্টার, হাতজোড় করে অনুরোধ করে তাঁকে নামিয়ে এনেছেন ট্রেন থেকে।
এখানেই কিছুটা খটকা লেগেছে রুস্তম কারিমভের। ডাক্তার বা সাধারণ মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে কেন? ক্ষতি হওয়ার কথা তো আর্মি ক্যাম্পের। তাদের পরিবারের মহিলা বা বাচ্চারা যদি শহর ছেড়ে চলে যেত, তার কারণ বুঝতে অসুবিধে হত না।
ফ্যালকন এবং তার সঙ্গীদের রেকর্ড করা কথোপকথন শুনে রুস্তম বুঝেছে এই লোকগুলো চীনের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। শিলিগুড়ি শহরের কাছে কোথাও এক আর্মি ক্যাম্পে অ্যাটাক করার কথা এদের। রুস্তমের সঙ্গে ইস্তানবুলে এদের দলের যে ব্যক্তির আলোচনা হয়েছিল সে চেয়েছিল একটা ভাইরাস, সেজন্য এক লক্ষ মার্কিন ডলার দিতে রাজি ছিল সে। কিন্তু রুস্তম নেপালে যাদের হাতে নিপা ভাইরাসের ভায়াল তুলে দিয়ে এসেছে তারা কেউ জিনিসটার ঠিক পরিচয়টা জানত না সেটা তাদের কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট।
এই লোকগুলো উগ্র কমিউনিস্ট, মাও-পন্থী, এদের লক্ষ্য নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাত করা। নেপালের রাজা বীরেন্দ্র ভারতের বন্ধু, তিনি ক্ষমতায় থাকলে ভারতে চীন নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। যুবরাজ দীপেন্দ্র বাবার উত্তরসূরি হিসেবে সিংহাসন লাভ করলে তাতেও এদের ফায়দা নেই, কারণ মিষ্টি স্বভাবের যুবরাজ বাবার মতোই ভারতের বন্ধু। কিন্তু কোনোভাবে যদি রাজার ভাই জ্ঞানেন্দ্রকে রাজা বানানো যায়, তবে চীন-পন্থী এই গোষ্ঠীর লাভ। পানশালায় বসে দিনের পর দিন এসব কথা আলোচনা করেছে এরা।
কিন্তু দেশে এত বড়ো বড়ো শহর থাকা সত্ত্বেও শিলিগুড়ির মতো একটা ছোটো শহরের সেনা ছাউনি এদের আক্রমণের লক্ষ্য কেন, বুঝতে পারছে না রুস্তম। কিছু একটা রহস্য অবশ্যই আছে এর মধ্যে। ব্যাপারটা যতক্ষণ বোঝা না যাচ্ছে, ততক্ষণ শান্তি পাচ্ছে না সে।
এত কিছু অবশ্য না বুঝলেও হয় রুস্তমের। ভাইরাস বেচে দেওয়া হয়ে গেছে, ডলার জমা পড়ে গেছে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে, ব্যস, তার কাজ শেষ। এবার সেই জীবাণু নিয়ে কে কী করবে, খাবে না মাথায় মাখবে, সেসব জেনে তার কোনো লাভ নেই।
তবু একটা কারণে রুস্তম মাথা ঘামাচ্ছে। নিছক ভাড়াটে সেনা নয় সে। ডক্টর রুস্তম কারিমভ সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আরও বহু বিজ্ঞানীর মতো সে-ও কর্মহীন, বেকার। ল্যাব থেকে চুরি করে নিয়ে আসা কিছু ভাইরাস ব্যক্তিগত গবেষণাগারে কালচার করে বিক্রি করে পেট চলে রুস্তমের। কোন দেশের সঙ্গে কার বিবাদ কিংবা কোন জঙ্গিগোষ্ঠী কোথায় সরকারের বিরুদ্ধে লড়ছে, এসব খবর অগ্রিম পেলে রুস্তমের বাজার ধরায় সুবিধে হয়।
টেলিভিশন বন্ধ করে হোটেলের একতলায় নেমে এল রুস্তম। বেশ কিছুদিন হল তার মদের স্টক ফুরিয়ে গেছে। আগামীকাল শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে আজ একটু পান না করলে চলছে না! বাইরে সব দোকানপাট বন্ধ, তবে ম্যানেজার কথা দিয়েছিল যেভাবে হোক সন্ধেবেলা একটা ছোটো বোতল জোগাড় করে দেবে।
‘কিছু পাওয়া গেল?’ রিসেপশনের কাঠের ডেস্কে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাঙা ইংরেজিতে ম্যানেজারের কাছে জানতে চাইল রুস্তম।
ম্যানেজার মুখ নীচু করে খবরের কাগজ পড়ছিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সন্তর্পণে ড্রয়ার খুলে কাগজে মোড়া একটা বোতল তুলে দিল তার হাতে। রুস্তম বুঝল লোকটা চরম ভীতু, হোটেলের মেন গেট বন্ধ, তারা দু-জন ছাড়া ধারে-কাছে আর কেউ নেই। তা সত্ত্বেও এমন ভয় পাচ্ছে বলার নয়! সে জিজ্ঞেস করল, ‘হাউ মাচ?’
‘থ্রি হান্ড্রেড, স্যার।’ লোকটা বলল।
পকেট থেকে তিনটে এক-শো টাকার নোট বের করে লোকটার হাতে তুলে দিল রুস্তম। তারপর হালকা গলায় বলল, ‘কী অবস্থা বাইরে? আমি কাল যেতে পারব তো? ভিসা ফুরিয়ে আসছে আমার।’
‘স্বাভাবিক হয়ে আসছে, স্যার। কিছু দোকান-বাজার খুলেছে, নতুন করে হাসপাতালে আর পেশেন্ট ভরতি হয়নি। কলকাতা থেকে মিনিস্টার সাহেব তিরিশজন ডাক্তারবাবুর একটা টিম নিয়ে এসেছেন, তারা এখন পুরো ব্যাপারটা দেখছে।’
‘কিছু জানা গেল না, না?’ রুস্তম কৌতূহলীভাবে জানতে চাইল, ‘মানে, রোগটা কী, কোথা থেকে এল, এইসব কিছু?’
‘পুরোপুরি বোঝা যায়নি স্যার, আমি অন্তত জানি না। যেটুকু শুনেছি সব লোকের মুখে শোনা কথা।’
‘কী শুনেছ?’
ম্যানেজার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফোঁস করে, ‘এমন ঘটনা বাপের জন্মে শুনিনি, স্যার। ঘটনাটা শুরু হয়েছিল মাসখানেক আগে। আমাদের এখানকার এক ডাক্তারবাবু, নাম ঋষিপ্রতিম বসু, খুব ভালোমানুষ, নিজের নার্সিং হোম আছে, ফ্যামিলি নিয়ে গাড়িতে জলপাইগুড়ি যাচ্ছিলেন। সেবক রোড দিয়ে যাওয়ার সময় উনি একজন নেপালিকে রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখেন। লোকটার গায়ে খুব জ্বর ছিল, অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল লোকটা। উনি গাড়ি থেকে নেমে লোকটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের নার্সিং হোমে ভরতি করে দেন। নেপালিটার সঙ্গে কোনো কাগজপত্র ছিল না যা থেকে পরিচয় পাওয়া যায়। ওর বউ বলে পরিচয় দিয়ে একটা নেপালি মেয়ে তিন-চারদিন পরে নার্সিং হোমে আসে, দশ হাজার টাকা জমা দেয়, কালিম্পঙের একটা ঠিকানাও দিয়েছিল। কিন্তু লোকটা বাঁচেনি, সেদিনই মারা যায়, আর ওর বউও আর আসেনি। কালিম্পঙের ঠিকানাও ভুয়ো। ডাক্তারবাবু নিজের হাতে লোকটার চিকিৎসা করেছিলেন, দেখা গেল ডাক্তারবাবুর জ্বর এসেছে। দু-জন নার্স দিদিমণি, তাঁরাও এই পেশেন্টের দেখাশোনা করেছিলেন, তাঁদেরও জ্বর এল। সঙ্গে কাশি, নিশ্বাসের কষ্ট আরও কত কী! কোনো ওষুধে কাজ হল না স্যার, ডাক্তারবাবু মারা গেলেন, নার্স দিদিমণিরাও চলে গেলেন। এরপর নার্সিং হোমের একটা সুইপারকে রোগে ধরল। দু-তিন দিনের মধ্যে সে-ও ফিনিশ।’
একটানা উত্তেজিতভাবে কথা বলে দম নেওয়ার জন্য একটু থামল ম্যানেজার। সেই সুযোগে রুস্তম একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘কিন্তু পুরো শহরে সংক্রমণ ছড়াল কী করে?’
‘ওই সুইপার আর নার্স দিদিমণিদের বাড়ির লোক প্রথমে আক্রান্ত হল, তাদের থেকে আবার কয়েকজন সংক্রমিত হল, এভাবে ছড়িয়ে গেল রোগটা। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কুড়ি-পঁচিশজন শেষ। ডাক্তার রুগি দেখতে গিয়ে নিজেই বিপদে পড়ে যাচ্ছে, ভয় পেয়ে ডাক্তারবাবুরা কলকাতায় চলে যেতে শুরু করল। ব্যস, আর কী, এবার সাধারণ মানুষ বুঝে গেল ডাক্তারবাবুরা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন, তখন এখানে পড়ে থাকলে তাদেরও মরতে হবে। সবাই দলে দলে পালাতে শুরু করে দিল।’
‘যে নার্সিং হোমে পেশেন্ট ভরতি ছিল তার কী অবস্থা, খোলা আছে?’
‘না স্যার, মালিক নেই, নার্সিং হোম কী করে খোলা থাকবে! ডাক্তারবাবু মারা যাওয়ার পরেই কর্পোরেশন থেকে নার্সিং হোম সিল করে দিয়েছে।’
‘ডাক্তারবাবুর ফ্যামিলির কিছু হয়নি, মানে, যারা সেদিন গাড়িতে ছিল?’
‘ভগবান বাঁচিয়ে দিয়েছেন স্যার, ডাক্তারবাবুর বউ-বাচ্চার কিছু হয়নি। ডাক্তারবাবুর বউ তো সেদিন টিভিতে বললেন, নেপালিটাকে মাতাল ভেবে উনি সারারাস্তা মুখে শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন, মেয়েকে একটা রুমাল হাতে দিয়ে বলেছিলেন নাক-মুখ চাপা দিতে। সেজন্য মনে হয় ওঁদের কিছু হয়নি। রোগটা বাতাসে ছড়ায়, তাই না স্যার?’
বেমক্কা এমন একটা প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে গেল রুস্তম কারিমভ। সে কি বেশি কৌতূহল দেখিয়ে ফেলেছে? লোকটা হঠাৎ এ প্রশ্ন করবে কেন? সে একটু থতোমতো খেয়ে বলল, ‘আমি কী করে বলব! আমি তো এখানে এসে হোটেলের বাইরে একদিনও বেরোইনি!’
‘সবাই তা-ই বলাবলি করছে, স্যার।’ ম্যানেজার বলল, ‘এই রোগ নাকি আগে কোনোদিন এদেশে ছিল না।’
‘রোগটা কী সেটা জানা গেছে?’
‘না, স্যার। শুনেছি নতুন একটা অসুখ ধরা পড়েছে কলকাতায় রক্ত পরীক্ষা করে। বাইরে থেকে একটা টিম আসবে শুনলাম।’
‘কীসের টিম? কী করবে তারা?’
‘পুরো ঘটনা তো জানি না স্যার, মন্ত্রী টিভিতে বলছিলেন, সেটাই শুধু শুনেছি। উনি বললেন, ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, দিল্লি না মুম্বই কোথা থেকে বিশেষজ্ঞদের একটা দল আসবে, তারা সব কিছু খতিয়ে দেখবে।’
আর কথা না বাড়িয়ে রুস্তম নিজের ঘরে ফিরে গেল। ম্যানেজার লোকটা ভালো, সরল ধরনের, রুস্তমকে বিদেশে এসে বিপদে ফেঁসে যাওয়া টুরিস্ট ভেবে যতটা পারে সাহায্য করছে। কিন্তু বেশি তথ্য এর কাছে নেই, সব কিছু টেলিভিশন দেখে এবং খবরের কাগজ পড়ে জানা। রুস্তমের কাছে যেসব তথ্য মূল্যবান তা এর কাছে পাওয়া যাবে না। তবু লোকটা খোঁড়া ইংরেজিতে এতক্ষণ তার সঙ্গে কথা চালিয়ে গেল সেটাই বড়ো কথা।
কিন্তু কোথাও কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে নিশ্চয়ই। ফ্যালকন বলেছিল, সীমান্ত পর্যন্ত সে নিজে নিয়ে যাবে ভাইরাসের শিশি। তারপর তুলে দেবে অন্য কারো হাতে। ফ্যালকনের সঙ্গীদের কথাবার্তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, সেই লোকটার দায়িত্ব হবে আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে শিশির জিনিসটা খাবারে মিশিয়ে দেওয়া। এখানেই একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। আর্মি ক্যাম্প পর্যন্ত ভাইরাসের ভায়াল পৌঁছোয়নি, ক্যারিয়ার হিসেবে যাকে নিয়োগ করা হয়েছিল সে কোনোভাবে ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিল। তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে আসার সময় একজন চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী এবং মেয়ে আক্রান্ত হয়নি, কারণ তারা নাক-মুখ ঢাকা দিয়ে রেখেছিল। তবে অন্য যেসব নার্স বা প্যারামেডিক লোকটাকে অসাবধানে ছোঁয়াছুঁয়ি করেছে, তারা আক্রান্ত হয়েছে।
হ্যাঁ, নিপা ভাইরাস বাতাসে ছড়ায়। তবে আক্রান্ত প্রাণীর দেহরস থেকে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। এটা একটা জুনোটিক ভাইরাস। ঠিক দেড় বছর আগে মালয়েশিয়াতে শুয়োরের খামার থেকে এই রোগ প্রথম ছড়ায়। মালয়েশিয়া থেকে শুয়োরের দেহরস সংগ্রহ করে তা থেকে ভাইরাস বের করেছে রুস্তম। কাজটা ভয়ানক রকমের কঠিন। প্রথমে মুরগির ডিমে ইঞ্জেকশনের সাহায্যে শুয়োরের দেহরস ঢুকিয়ে দিতে হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে ভাইরাস বংশবৃদ্ধি করে হোস্ট মানে ডিমটাকে নষ্ট করে দেবে। এবার সেই ডিমের ভেতরের পচে যাওয়া তরল থেকে ভাইরাসকে আলাদা করে নিয়ে তাকে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে।
এ হল একেবারে আদিম পদ্ধতি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সময় নাতসি সায়েন্টিস্টরা এভাবে কাজ করত। পুরো ১৯৫০-এর দশক জুড়ে চালু ছিল এই পদ্ধতি। তখন বিশালাকার ফারমেন্টার মেশিন ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার সময় রুস্তম ল্যাব থেকে যেসব ইনস্ট্রুমেন্ট চুরি করে পাচার করতে পেরেছিল তা দিয়ে এর চেয়ে বেশি কাজ হয় না। রুস্তম খুশি, কারণ তার ভাইরাস কাজ করেছে। লক্ষ্য ভুল হলে তার কিছু করার নেই, যারা জীবাণু অস্ত্র কিনেছে, সেটা তাদের ব্যাপার।
পরদিন রাতে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে দার্জিলিং মেল ধরার জন্য পৌঁছে রুস্তম দেখল প্ল্যাটফর্মে প্রচুর লোকের ভিড়। অসংরক্ষিত কামরায় ওঠার জন্য লোকজন হুড়োহুড়ি করছে, পুলিশ কোনোমতে তাদের সামাল দিচ্ছে। এসি টু টিয়ার-এ রুস্তমের রিজার্ভেশন। কামরা খুঁজে উঠে নিজের আসনে বসল সে। সঙ্গের ব্যাগটাকে সিটের নীচে রেখে শেকল দিয়ে বেঁধে দিল, একটা ব্যাগ শুধু রইল তার কাছে। এর মধ্যে টিকিট, পাসপোর্ট, টাকাপয়সা ছাড়াও রুস্তমের পিস্তল রয়েছে। গাড়িতে উঠে সবার সামনে আর্ম হোলস্টার খোলা যাবে না, আবার অস্ত্র নিয়ে রাতে ঘুমোনোও কঠিন।
জলের বোতল কেনার জন্য প্ল্যাটফর্মে নামল রুস্তম। জল কিনে ফিরে এসে সে দেখল তার কামরার সামনে অনেক লোকের ভিড়। নিজের জায়গায় পৌঁছে রুস্তম দেখল তার বাকি তিন সহযাত্রী এসে গেছেন। এক ভদ্রলোক, তাঁর সঙ্গী এক মহিলা এবং একটি কিশোরী। এদের বিদায় জানাতে এত লোক এসেছে, নিশ্চয়ই এরা কোনো ভিআইপি হবে। কথাবার্তা সব বাংলায় হচ্ছে, রুস্তম তার একবর্ণ বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝল একটা খুব আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মহিলা এবং সম্ভবত তাঁর মেয়ে, দু-জনেই কান্নাকাটি করছে।
ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর ভদ্রলোক একটু আমতা আমতা করে অনুরোধ করলেন রুস্তম যদি তার লোয়ার বার্থ ছেড়ে দিয়ে আপার বার্থে যেতে রাজি থাকে তবে খুব ভালো হয়। সঙ্গের মহিলা তাঁর বোন, মেয়েটি তাঁর ভাগনি। এদের দু-জনকে দুটো লোয়ার বার্থ দিতে পারলে ভালো হয়। রুস্তম দ্বিধা না করে জানিয়ে দিল তার অসুবিধে নেই, সে আরেকটু পরেই ওপরের বার্থে চলে যাবে।
ভদ্রলোক অনেক ধন্যবাদ দিলেন রুস্তমকে। জানালেন, বোনের স্বামী মারা গেছেন ভাইরাল ফিভারে। সেজন্য বোন ও তাঁর মেয়েকে কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
কিছু খবর পাওয়া যাবে সেই আশায় রুস্তম জানতে চাইল, রোগের উপসর্গ কেমন ছিল। ভদ্রলোক জানালেন, প্রথমে প্রচণ্ড শীত করে জ্বর এসেছিল, তার সঙ্গে কাশি এবং মাথাব্যথা। এরপর তীব্র শ্বাসকষ্ট, ডায়েরিয়া। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে রোগী কোমায় চলে গেছিল, সেই অবস্থায় মৃত্যু।
‘আমাদের দেশ সম্বন্ধে একটা বিশ্রী ধারণা নিয়ে আপনি ফিরে যাচ্ছেন,’ ভদ্রলোক রুস্তমকে বললেন, ‘কী যে হয়ে গেল হঠাৎ!’
ভদ্রলোককে সান্ত্বনা দিয়ে রুস্তম বলল, ‘আমার দার্জিলিং আর সিকিম যাওয়ার কথা ছিল, যেতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু ভারতীয়দের আতিথেয়তার একটা সম্পূর্ণ অচেনা দিক আমার দেখা হল। হোটেলের ম্যানেজার আমাকে এক মাস ধরে থাকতে দিয়েছে, খাবারও পেয়েছি। নইলে বিপদে পড়তাম।’
‘আপনি আগেই চলে গেলেন না কেন এখান থেকে?’ জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।‘ট্রেন কিংবা বাস সার্ভিস তো বন্ধ হয়নি। বাগডোগরা থেকে ফ্লাইটও চালু ছিল।’
‘আমার অ্যাডভান্স টিকিট বুকিং ছিল। দার্জিলিং-সিকিম থেকে ফিরে ট্রেন ধরার কথা। এই টিকিট ক্যানসেল করলে নতুন টিকিট পাব কি না বুঝতে পারছিলাম না। সেজন্য আর রিস্ক নিইনি।’
কেমন যেন অসন্তুষ্ট মুখে ভদ্রলোক বললেন, ‘তাই বলে এক মাস শিলিগুড়িতে হোটেলে বসে কাটিয়ে দিলেন এই এপিডেমিকের মধ্যে? নাহ্, আপনি ঠিক করেননি একেবারেই!’
একটু বিপদের গন্ধ পেল রুস্তম কারিমভ। সন্দেহ করছে নাকি? হোটেলের ম্যানেজারকে এই গল্প শুনিয়ে এসেছে সে, ম্যানেজার সন্দেহ করেনি, কিন্তু সবাই সমান সহজ-সরল হবে এমন কথা নেই।
প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য রুস্তম বলল, ‘সাংবাদিক হিসেবে এ-ও আমার এক নতুন অভিজ্ঞতা। এনিওয়ে, আপনার বোনের স্বামী ভাইরাল ফিভারে আক্রান্ত হলেন কী করে?’
‘সেকথা আর বলবেন না, বলতে গেলে ও-ই জেদ করে এই রোগটাকে শহরে নিয়ে এসেছেন।’
‘কীরকম?’
‘ডাক্তার মানুষ তো, রাস্তার ধারে একটা অসুস্থ নেপালিকে পড়ে থাকতে দেখে গাড়িতে তুলে নিজের নার্সিং হোমে ভরতি করেছিল। লোকটা তো বাঁচলই না, বোনের স্বামীও চলে গেল।’
এরা তাহলে সেই পরিবারের সদস্য যাদের কথা রুস্তম হোটেলের ম্যানেজারের কাছে শুনেছিল! মনে মনে আরও কিছু খবর পাওয়ার আনন্দে রুস্তম লাফিয়ে উঠল।
‘খুব ছোঁয়াচে রোগ, তাই না?’
‘মারাত্মক ছোঁয়াচে,’ ভদ্রলোক বললেন, ‘যারা নেপালিটার কাছাকাছি এসেছিল, তাদের অনেকে মারা গেছে। আমাদের ভাগ্য ভালো বোন আর ভাগনি বেঁচে গেছে।’
‘বটেই তো, এত ছোঁয়াচে রোগ থেকে ওঁরা বেঁচে গেছেন, এটা বিশাল ব্যাপার। কী করে হল ব্যাপারটা, এনি আইডিয়া?’
‘নেপালিটাকে যখন ঋষি, মানে, আমার বোনের স্বামী, গাড়িতে তুলল, তখন লোকটার পাশে একটা মোটা কাচের শিশি পাওয়া গেছিল। বোন ভাবল, এতে নিশ্চয় মদ আছে, লোকটা মাতাল, মদের গন্ধ নাকে আসবে বলে নিজের আর মেয়ের নাক-মুখ চাপা দিয়ে রেখেছিল। ঋষির কিন্তু ধারণা হয়েছিল, লোকটা বিষ খেয়েছে, সেজন্য লোকটার সঙ্গে কাচের শিশিটাকেও তুলে এনেছিল পরীক্ষা করবে বলে। কিন্তু শিশিতে বিষ-টিষ কিছু পাওয়া যায়নি।’
‘তারপর…’
‘নেপালিটা মারা যাওয়ার পরেই ঋষি জ্বরে পড়ল। দু-জন নার্স একইসঙ্গে অসুস্থ হল। দেরিতে হলেও ভগ্নীপতি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল, তাড়াতাড়ি নিজেকে একটা ঘরে আলাদা করে নিল। খাবারদাবার সব ঘরের বাইরে রেখে দিতে বলত, কখন কী ওষুধ দিতে হবে, বাড়ি কীভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে, সব ঘরের ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বলে দিত, মারা যাওয়ার আগে অবধি একটা ঘরে একাই ছিল।’
‘খুব জোর বেঁচে গেছে আপনার বোন আর ভাগনি, নিজেকে কোয়ারান্টাইন না করে নিলে সবার মধ্যে রোগ ছড়িয়ে যেত।’
ভদ্রলোক সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। ট্রেন কিষানগঞ্জ স্টেশন ছাড়ার পরেই কামরার আলো একে একে নিভতে শুরু করল। রুস্তম আগেই ওপরে উঠে গেছে। তার রাতের আহার বলতে শুধু একটা আপেল। নীচের পরিবারটিও খুব সামান্য খেল। রুটি, তরকারি, আচার, দই। রুস্তম মনে মনে ভাবছিল, কোথায় যেন পড়েছে, এই পৃথিবীতে যাদের ভাগ্য একসুতোয় গাঁথা থাকে, তাদের বার বার দেখা হয়ে যায়। রুস্তমের সঙ্গে এদের ভাগ্য কি একসুতোয় গাঁথা হয়ে গেল নাকি? এদের সঙ্গে জীবনে আর কোনোদিন যেন দেখা না হয়! বিশেষ করে কিশোরীটির দিকে তাকিয়ে তার কষ্ট হচ্ছিল। মেয়েটি জানে না, তার বাবার মৃত্যুর পেছনে রয়েছে রুস্তমের হাত।
আলো নিভিয়ে দেওয়ার আগে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে রুস্তম বলল, ‘গুড নাইট, মিস–’
‘আই অ্যাম আরশি বসু,’ মেয়েটি বলল, ‘ইয়েস, গুড নাইট।’
