জাহান্নমের সওদাগর – ৭

সায়ন্তনের বাড়ি, সল্টলেক।

‘তোর মুখ গোমড়া কেন? মোবাইল কেন হাতে? চাপে আছিস মনে হচ্ছে!’ জুতোর স্ট্র্যাপ খুলতে খুলতে আরশি জানতে চাইল।

‘কিছুটা,’ একটু ম্লান হেসে সায়ন্তন জবাব দিল, ‘জাম্বুবানটার সঙ্গে আজ প্রচুর কথা কাটাকাটি হয়েছে। আগের দিন ওকে না জানিয়ে তোদের বাড়ি যাওয়াটাকে একদম ভালোভাবে নেয়নি, আমাকে রীতিমতো থ্রেট দিয়েছে আজ যদি ওর সঙ্গে লোকেশন শেয়ার না করি, তবে ডিরেক্টরের কাছে অভিযোগ করবে।’

‘ও কি জানে তুই আমাদের বাড়িতে গেছিলিস?’

‘না, বলিনি। কোথায় গেছিলাম জানতে চেয়েছিল, বলেছি এক বন্ধুর বাড়ি। তাতে সন্তুষ্ট নয়, ঠিকানা জানতে চায়। আহ্লাদ আর কী!’

আরশি সোফায় বসে বলল, ‘আহ্লাদের কী আছে, তোর ভালোর জন্যই করছে তো। ওর ডিউটি এটাই।’

‘ছাড় তো, বিরক্তিকর লোক একটা! অন্যের প্রাইভেসি রেসপেক্ট করে না মোটে। বেণুগোপাল আমাকে বলল, ওকে মোবাইল খুলে রোজ কললিস্ট আর সব মেসেজ দেখাতে হচ্ছে। আমার সঙ্গে অবশ্য এসব করে সুবিধে হবে না—’

‘লোকটা কি পুলিশ, না সিক্রেট সার্ভিস?’ আরশি প্রশ্ন করল।

‘সিক্রেট সার্ভিস। আমাদের বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সির নিজস্ব সিকিউরিটি সার্ভিস আছে, তার ডেপুটি হেড। জানিস তো, লোকটা কিন্তু বাঙালি?’

‘তাই?’ আরশি অবাক হল, ‘আগে বলিসনি তো, তাহলে একবার ওকে একটু বাজিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম।’

‘হুঁ, তবেই হয়েছে!’ মুখে প্রবল অবজ্ঞা ফুটিয়ে বলল সায়ন্তন, ‘প্রথম কথা, ও নামেই বাঙালি, পুরো নাম ভার্গব চৌধুরি, কিন্তু বাংলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। হরিয়ানার ছেলে, সেখানেই অনেক পুরুষের বাস। দ্বিতীয় কথা, ও মোটেই বাজার লোক নয়। সুতরাং, ওকে বাজানোর ভাবনা তুই মাথা থেকে বাদ দিতে পারিস।’

বন্ধুর পছন্দর কথা মনে রেখে দুটো বড়ো বড়ো চিকেন কবিরাজি কিনে এনেছিল আরশি। অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে মোড়া থাকায় জিনিসটা বেশ গরম আছে। সায়ন্তন রান্নাঘর থেকে ডিশে কাজু আর পোট্যাটো চিপস নিয়ে এল। সঙ্গে খুশবুদার লিকার চা। ডিশের ফাঁকা জায়গায় কবিরাজি দুটোকে নামিয়ে রাখল আরশি। বলল, ‘স্ট্রিটফুড খাবি তো? আমাকে ভাইরাস ধরলে তুই বাঁচাবি, কিন্তু তোর কিছু হলে ওই জাম্বুবান ছাড়া বাঁচানোর কেউ নেই, মনে রাখিস!’

‘খাওয়ার সময় এসব ভাবতে নেই,’ একগাল হাসতে হাসতে গরম কবিরাজিতে কামড় বসাল সায়ন্তন, ‘কাল আমরা চলে যাচ্ছি রে, তার আগে আজ প্রাণভরে খেয়ে নিই।’

‘এখানে তোদের কাজ শেষ?’ আরশি অবাক হল, ‘কী পেলি তোরা, একটু বল না?’

‘সিদ্ধান্ত নেওয়া মুশকিল, তবে বায়ো-টেরর অ্যাটাক হতে পারে, প্যাটার্নে মিল আছে। হয়তো কেউ ভাইরাস ছেড়ে দেখতে চাইছে আমরা কীভাবে রেসপন্ড করি। এরপর আরও বড়ো অ্যাটাক আসবে।’

‘টেররিস্ট গ্রুপের কাজ, বলছিস?’

‘কাদের কাজ তা খুঁজে বের করবে ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি, ওটা আমাদের কাজ নয়। আমরা শুধু আমাদের মতামত জানিয়ে দেব।’

ব্যাগ থেকে আরশি একটা ছোটো ডায়েরি ধরনের নোটবুক বের করে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর বলল, ‘তোর সঙ্গে আগেরদিন যা যা কথা হয়েছিল তার থেকে কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছি আমি, সেগুলো যদি বুঝিয়ে বলিস খুব সুবিধে হয়।’

মুখে সন্দেহ নিয়ে আরশির হাতের নোটবইয়ের দিকে তাকাল সায়ন্তন, ‘তোকে কিন্তু আমি একটা কথা খুব পরিষ্কার করে আবারও বলে দিচ্ছি যে, আমাকে না দেখিয়ে কিছু লিখবি না। একটা রিপোর্ট বেরোলে আমার শুধু চাকরি যাবে তা-ই নয়, জেল হয়ে যাবে, তুইও সাংঘাতিক বিপদে পড়বি। আমার মুখ খোলার কথাই নয়, তবু বন্ধু বলেই তোর সঙ্গে টপ সিক্রেট ইনফরমেশন শেয়ার করছি। আমাকে বিপদে ফেলিস না, ভাই!’

‘তোর কি মনে হচ্ছে আমি তোকে বিপদে ফেলব, তাহলে বলিস না—’

‘সরি রে,’ আরশির হাত চেপে ধরল সায়ন্তন, ‘আজ মন ভালো নেই একদম, একটু কড়া কথা বলে ফেললাম তোকে—’

‘বুঝেছি,’ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আরশি বলল, ‘খবরে কতটা কী লেখা যায়, তা এতদিনে কিছুটা শিখেছি। যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা জড়িত, সেখানে বেফাঁস কিছু লিখব না, নিশ্চিন্ত থাকতে পারিস। জীবাণুযুদ্ধ নিয়ে একটা সিরিজ লিখব, তাতে হয়তো কলকাতার ঘটনার সামান্য উল্লেখ থাকতে পারে। কপি জমা দেওয়ার আগে তোকে মেল করে দেখিয়ে নেব।’

সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে সায়ন্তন বলল, ‘বল-’

‘আমার প্রথম প্রশ্ন হল, বায়ো-ওয়েপনের ডেলিভারি মেকানিজম সহজলভ্য নয় বলেছিলিস। ব্যাপারটা কী বুঝিয়ে দে।’

সায়ন্তনের মুখ দেখে মনে হল প্রথমেই একটা সুবিধেজনক প্রশ্ন পেয়ে খুশি হয়েছে। সে বলল, ‘রাইট, জীবাণুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল ডেলিভারি মেকানিজম অর্থাৎ শত্রুর বিরুদ্ধে তা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তার ব্যবস্থাপনা। অ্যানথ্রাক্স বা প্লেগের জীবাণু যদি কারো কাছে মাত্র পাঁচশো গ্রাম থাকে, তাহলে থিয়োরিটিক্যালি সেই জীবাণু ব্যবহার করে সে কলকাতা শহরের সব মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। তবে বাস্তব ছবিটা একেবারেই আলাদা। মনে কর, একটা মিসাইলের পে-লোড হিসেবে জীবাণু-বোমা বসিয়ে কলকাতার দিকে তাক করে ছুড়েছে কোনো একটা দেশ। প্রথমত, মিসাইল কাউকে না জানিয়ে নিঃশব্দে রাডার এড়িয়ে এয়ারস্পেসে ঢুকতে পারবে না। তার ফলে জানাজানি অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং ভারত প্রত্যাঘাত করবেই। দ্বিতীয়ত, বোমা তো ফাটল, কিন্তু বাতাসের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করবে কে? পাকিস্তান বা চীন হয়তো বায়ো-মিসাইল ছুড়েছে ভারতকে লক্ষ করে। দেখা গেল, জীবাণু-বোমা ফাটার পর বাতাসের গতিপথ বদল হয়ে সেই ভাইরাস সীমান্ত পেরিয়ে ওদের দেশেই ফিরে গেল। কিংবা জীবাণু রিলিজ হওয়ার পর তার বেশিরভাগ বাতাসে ভেসে গাছপালায় আটকে গেল। মিসাইল ছাড়া যদি খুব নীচু দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমান ব্যবহার করে জীবাণু ছড়ানো হয়, সেক্ষেত্রেও কিন্তু একই ঘটনা ঘটতে দেখা যাবে। আমেরিকা ভিয়েতনামকে ভাতে মারার চেষ্টা করেছিল “এজেন্ট অরেঞ্জ” নামে একটা বিষাক্ত রাসায়নিক শস্যখেতে ছড়িয়ে দিয়ে। কিন্তু “এজেন্ট অরেঞ্জ” ব্যবহার করে প্রত্যাশিত ফলাফলের ধারে-কাছে পৌঁছোনো যায়নি। জল বা খাবারে জীবাণু মিশিয়ে কিন্তু বেশি মানুষকে একসঙ্গে হত্যা করা সম্ভব নয়। প্রথম দশ-বিশজন মারা যাওয়ার পরেই আক্রমণের এলিমেন্টস অফ সারপ্রাইজ নষ্ট হয়ে যাবে।’

‘আমি নেট-এ দেখছিলাম, আমেরিকা-রাশিয়া দু-দেশেই মিসাইলের মাথায় জীবাণু-বোমা বসিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করার ছক কষেছে একসময়।’

‘হ্যাঁ, করেছে তো, এমনকী আইসিবিএম মানে যাকে বলে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল বা আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, তাতে জীবাণু-অস্ত্র জুড়ে পরস্পরকে আক্রমণ করার ছক হয়েছে অনেকবার। কিন্তু কোনো দেশ এখনও পর্যন্ত বায়ো-ওয়েপন যুদ্ধের কাজে লাগায়নি। কারণ, জীবাণু-অস্ত্র এমন গোলমেলে জিনিস, যার ফলে শত্রুসেনার সঙ্গে নিজেরও আক্রান্ত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা। মনে কর, দুটো দেশের সীমান্তে সেনাবাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদল বিপক্ষকে লক্ষ করে জীবাণু অস্ত্র প্রয়োগ করল। কিন্তু বাতাসের গতিবিধি পরিবর্তিত হয়ে সেই জীবাণু ছড়িয়ে পড়ল মিত্রসেনার ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সময় স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মান সেনার বিরুদ্ধে টুলারেমিয়া জীবাণু প্রয়োগ করেছিল। তবে তারা নিজেরাও রেহাই পায়নি, ১৯৪২ সালে রাশিয়ার দক্ষিণ অংশে টুলারেমিয়া আউটব্রেক দেখা দেয়। রাশিয়া কোনোদিন ব্যাপারটা সরকারিভাবে স্বীকার করেনি, তবে ওই যে বলেছিলাম, হঠাৎ কোনো রোগে আক্রান্তর সংখ্যা প্রচুর বেড়ে গেলে বুঝতে হবে বায়ো-অ্যাটাক, এখানেও সেভাবেই বোঝা গেছে।’

‘টুলারেমিয়া কী রোগ রে, আগে কখনো নাম শুনিনি তো!’

‘ইংরেজিতে রাবিট ফিভার বলে, বিরল রোগ, ব্যাকটিরিয়া থেকে হয়। গায়ে রাশ বেরোয়, শীত করে, জ্বর আসে, শরীরের সব গ্ল্যান্ড ফুলে যায়। ঠিকমতো শনাক্তকরণ বা দ্রুত চিকিৎসা না হলে রোগীর বাঁচা কঠিন।’

বাইরে বিকেলের আলো কমে আসছে দেখে সায়ন্তন আরশির অনুমতি নিয়ে উঠে গেল। বহুদিন এবাড়িতে সন্ধেবেলা আলো জ্বলেনি। সায়ন্তন যখন আজ এসেছে, তখন একবার সারাবাড়িতে কিছুক্ষণের জন্য হলেও সব আলো জ্বালাবে। আরশি একা বসে ইন্টারনেটে পড়া বিভিন্ন হেমারেজিক ফিভারের লক্ষণ মনে মনে মিলিয়ে দেখছিল। সবগুলো রোগের লক্ষণ প্রায় এক। তাহলে আলাদা করে রোগ চিহ্নিত করা যাবে কী করে? মিনিট পাঁচেক পরে ফের দু-কাপ চা নিয়ে সায়ন্তন ফিরে আসতে জানতে চাইল আরশি।

সায়ন্তন হেসে বলল, ‘খুব ভালো প্রশ্ন, তবে টেকনিক্যাল শব্দ ব্যবহার না করে বোঝানো যাবে না। জীবাণুর পরিচয় বের করার জন্য মাস স্পেক্ট্রোমিটার ব্যবহার করা হয়। স্যাম্পল থেকে সব প্রোটিন বের করে সেটাকে ছোটো ছোটো টুকরোতে ভেঙে তার মধ্যে ভাইরাসের সিগনেচার প্রোটিন, যাকে বলে পেপটাইড, সেটাকে খুঁজে বের করা হয়।’

‘পুরো হিব্রু হয়ে গেল, বস—’

‘উপায় নেই, এর চেয়ে সহজ করে বলা যাবে না। তবে তুই যেমন ভাবছিস, তোদের রিডার নিতে পারবে না, আমার ধারণা সেটা ভুল। কলকাতার লোক বহুদিন আগেই স্টিফেন হকিং কিংবা রিচার্ড ডকিন্স পড়া শুরু করেছে। “দ্য টেলিগ্রাফ” কাগজে “নো হাউ” বলে একটা সাপ্লিমেন্ট বেরোত আগে, পথিক গুহ এডিটর ছিলেন, সেখানেও অসাধারণ সব লেখা প্রকাশিত হত। সুতরাং, লোকে একেবারে বুঝবে না এমন নয় কিন্তু।’

‘নো হাউ’ এখনও বেরোয়, তবে আলাদা সাপ্লিমেন্ট হিসেবে নয়, কাগজের ভেতরেই থাকে।’

‘তা হতে পারে, আমি জানি না। বহুকাল টেলিগ্রাফ পড়া হয় না। হিমাচলে “ট্রিবিউন” বেশি চলে, আমরা ওটাই পড়ি।’

‘বেশ, তোর কথা অনুযায়ী আমি এই টেকনিক্যাল শব্দগুলো রেখে দেব,’ আরশি বলল, ‘এবার আমি শিবসাগর ভাইরাসের কথায় আসছি। এই জীবাণু সংক্রমণ আটকানোর জন্য কিছু উপায় আছে?’

‘মানে কাঁচা হলুদের রস খাওয়া, ভিটামিন সি ট্যাবলেট মুখে ফেলে রাখা, এসবের কথা জানতে চাইছিস?’ সায়ন্তন একটু বিদ্রূপের সুরে বলল, ‘নাহ্, ছেলেবেলায় ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া আর শরীরচর্চা করে ইমিউনিটি যদি শরীরে তৈরি না হয়, তবে বুড়ো বয়সে গাদাগুচ্ছের ভুলভাল জিনিস খেয়ে ইমিউনিটি বাড়ানো যাবে না।’

‘আরে, তা বলিনি আমি,’ আরশি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘আমি জানতে চাইছি যে, দেশে যাতে এই ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য তোরা কী সাজেশন দিচ্ছিস।’

‘সাজেশন? না রে, কোনো সাজেশন নেই। একটা সূক্ষ্ম জীবাণু, আকার খুব বেশি হলে কয়েক ন্যানোমিটার, সেটা কে কখন লুকিয়ে কোথায় ছড়িয়ে দিচ্ছে, বোঝা সম্ভব নয়। আমাদের কথা ছাড়, আমেরিকা এত উন্নত দেশ, কিন্তু ওদেশেও অ্যানথ্রাক্স মেল পাঠিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা মানুষ মেরেছে। তাও আবার ৯/১১-র ঠিক পরে, যখন সারাদেশ হাই সিকিউরিটি অ্যালার্টে রয়েছে। আমাদের কাজ বায়ো-ডিফেন্স মজবুত করা, তবে সেটা বলা সহজ, করা খুবই কঠিন। যত দ্রুত টের পাওয়া যাবে একটা রোগ ছড়িয়ে পড়ছে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে তত সুবিধে হবে। ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়াকে চট করে ধরা যাবে এমন বায়ো-সেন্সর ডেভেলপ করতে হবে। তুই এক্ষুনি জিজ্ঞেস করবি, বায়ো-সেন্সর কাকে বলে, তাই বলে দিচ্ছি, বায়ো-সেন্সর মানে হল, শরীর থেকে নেওয়া কোনো জৈব বস্তুকে বিশ্লেষণ করার উপযোগী মেকানিজম। ধরে নে, তোর শরীর থেকে রক্ত নেওয়া হল। এক্ষেত্রে রক্ত হল অ্যানালাইট। এবার অ্যানালাইটকে ফেলতে হবে বায়ো-রিসেপ্টরের সামনে। বায়ো-রিসেপ্টর মানে এনজাইম, ডিএনএ বা অন্য কোনো কেমিক্যাল। অ্যানালাইটকে বায়ো-রিসেপ্টর বিশ্লেষণ করে যে সিগনাল পাবে– আলো, তাপ, ভর কিংবা ক্ষারধর্মের পরিবর্তন– তা পাঠানো হবে ট্রান্সডিউসার ইউনিটে। ট্রান্সডিউসার ইউনিট সিগনালকে অপ্টিক্যাল বা ইলেকট্রিক্যাল সিগনালে বদল করে পাঠাবে ইলেকট্রনিক ইউনিটে, সেখানে প্রাপ্ত সিগনালকে ডিজিটাল সিগনালে পরিবর্তন করে তুলে দেওয়া হবে ডিসপ্লে ইউনিটের হাতে। তুই জেনে যাবি, তোর রক্তে ভাইরাল লোড কতটা। এই হল বায়ো-সেন্সরের কাজ।’

‘দোকানে ব্লাডসুগার মাপার যেসব যন্ত্র পাওয়া যায় সেগুলোকে কি বায়ো-সেন্সর বলা যায়?’

‘ডেফিনিটলি। তুই তো বুঝেছিস ব্যাপারটা। প্রেগন্যান্সি টেস্টিং কিট হল বায়ো-সেন্সরের আরেকটা পরিচিত নমুনা। এবার মনে কর যদি এমন কিছু একটা যন্ত্র ডেভেলপ করা গেল যা দিয়ে রক্তে সুগার মাপার মতোই ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা সম্ভব হবে, তাহলে কত সুবিধে হয় বল তো?’

‘সেরকম একটা রিসার্চ চলছে আমাদের ওখানে, একটা কিট ডেভেলপ করার চেষ্টা করছি আমরা যা নাক বা মুখ থেকে বেরোনো মিউকাসের মধ্যে ভাইরাস আছে কি না চট করে বলে দেবে—’

আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল সায়ন্তন, আচমকা টেবিলের ওপর রাখা ওর মোবাইল বেজে উঠল। নামটা কী উঠল আরশি আড়চোখে তাকিয়ে বুঝল না, কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে সায়ন্তনের ভুরু কুঁচকে গেল। বোঝা গেল, এই ফোনটা আসায় খুশি হয়নি সে। ফোন নিয়ে সায়ন্তন উঠে গেল, ফিরে এল একটু পরে। মুখ দেখে আরশির মনে হল সায়ন্তন কারো সঙ্গে ঝগড়া করে এল। হয়তো ভার্গব ফোন করেছিল, মনে হল আরশির। সায়ন্তনকে ঘাঁটাতে সাহস পেল না সে। বলল, ‘অনেক কথা হল আজ তোর সঙ্গে। এবার উঠব। তোকেও তো বেরোতে হবে, আগামীকাল চলে যাবি যখন—’

‘তোর সব প্রশ্ন শেষ? চাইলে আরও দু-একটা প্রশ্ন করতে পারিস। আমি আরেকটু সময় দিতে পারব।’

মেঘ না চাইতে জল! আরশি পড়ে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে চেষ্টা করল পুরোদমে, ‘তোর কাছে শুনে আমি কাল ইন্টারনেটে আমাদের শিলিগুড়ির ঘটনাটা দেখছিলাম। কী আশ্চর্য, বাবার নার্সিং হোমে তো ব্যাপারটার সূচনা, কিন্তু আমরা কেউ কিছু জানতাম না।’

‘তোদের নার্সিং হোমের এখন কী খবর?’ সায়ন্তন জানতে চাইল।

‘কবে বিক্রি হয়ে গেছে। এখন শপিং মল।’

‘ভারতের প্রথম নিপা আউটব্রেক,’ সায়ন্তন থেমে থেমে বলল, ‘আমি সিডিসি-তে যখন অ্যাডভান্সড ট্রেনিংয়ের জন্য গেছিলাম, তখন এটা ছিল আমার রিসার্চ প্রোজেক্ট। কিন্তু এদেশে কেউ তলিয়ে দেখল না ব্যাপারটা কী। এমনকী সিডিসি-র ঘোষণা হওয়ার পরেও কেউ উৎসাহ দেখায়নি। সেজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় নেই।’

‘এখন কি নিপার ভ্যাকসিন বেরিয়েছে?’

‘আমেরিকায় একটা ভ্যাকসিন বেরিয়েছে বছরখানেক আগে, ‘নিপারাব’ নাম। রাবিজ ভাইরাসের মৃত শরীরে নিপা-র জিন ঢুকিয়ে তৈরি। এ ছাড়া কিছু অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ আছে, তা দিয়েই ট্রিটমেন্ট হয়। আমরা, না, শুধু আমরা বলব কেন, সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা হন্যে হয়ে খোঁজ করছেন একটা অল-পারপাস ভ্যাকসিনের। কিন্তু জীবাণুর প্রোটিনের এত বৈচিত্র্য, ডিএনএ এবং আরএনএ ভাইরাসের চরিত্রে এত ফারাক, যার ফলে এটাকে আকাশকুসুম ধারণা ছাড়া আর কিছু বলা যাচ্ছে না। বহু বছর ধরে কাজ চলছে এসব নিয়ে। পালটা চলছে মানুষ মারার জন্য নিত্যনতুন জীবাণু তৈরি করার গবেষণা।’

‘কিন্তু ডেলিভারি মেকানিজম যদি কাজ না করে তবে জীবাণু অস্ত্র বানিয়ে কী লাভ? জীবাণু অস্ত্র কি আদৌ ওয়েপন অফ মাস ডেস্ট্রাকশন হয়ে উঠতে পারবে?’

‘মাস ডেস্ট্রাকশন নয়, মাস কিলিং। মানুষ মরবে, কিন্তু ঘরদোর, রাস্তাঘাট রেললাইন সব ঠিক থাকবে, এটাই তো যুদ্ধবাজরা চায়। দেশ দখলের পর পুনর্গঠনের জন্য টাকা খরচ করতে হবে না। তবে এখনও কিন্তু বিশ্বের কোথাও বৃহদাকারে জীবাণুযুদ্ধ হয়নি। অবশ্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র প্রয়োগের ভূরি ভূরি ঘটনা রয়েছে, যাকে আমরা বলি টার্গেটেড অ্যাসাসিনেশন।’

‘টেররিস্ট গ্রুপগুলো জীবাণু অস্ত্র তৈরি করছে না, যেমন ধর, আল কায়দা? ওদিকে সাদ্দাম হুসেন অ্যানথ্রাক্সের স্টকপাইল বানিয়েছিল বলে শোনা যায়।’

‘বায়ো-ওয়েপনসকে কী বলা হয় জানিস, পুয়োর ম্যান’স নিউক্লিয়ার বম্বস। জঙ্গিগোষ্ঠী তো পরমাণু বোমা বানাতে পারবে না, সেজন্য তাদের পছন্দ জীবাণু অস্ত্র, যা কাজ করে নিঃশব্দে, নীরবে। তবে জঙ্গিগোষ্ঠীর দ্বারা জীবাণু অস্ত্রর আক্রমণ খুব বেশি ঘটেনি। ১৯৮৪-তে আমেরিকার অরেগন শহরে একটা স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার জন্য স্যালাড বার-এ টাইফয়েডের ব্যাকটিরিয়া ছড়িয়ে বহু মানুষকে অসুস্থ করেছিলেন আমাদের দেশের ধর্মগুরু দ্য গ্রেট রজনীশ। তিনি অবশ্য নিজের হাতে কাজটা করেননি, তাঁর বকলমে অপারেশন চালিয়েছিল মা আনন্দশীলা এবং মা পূজা নামে দুই সহচরী। আবার ১৯৯৫-এ টোকিয়োর সাবওয়ে স্টেশনে আরেকটা ধর্মীয় গোষ্ঠী আউম শিনরিকিয়ো সদস্যরা সারিন নামে একটা নার্ভ গ্যাস ছড়িয়ে বেশ ক-জনকে মেরেছিল। আউম শিনরিকিয়োর আমেরিকার অফিসে হানা দিয়ে দেখা যায় তারা জীবাণু হামলার ছক কষেছে। আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী ওসামা বিন লাদেনের পরিত্যক্ত ডেরা থেকে বেশ কিছু জীবাণু অস্ত্র তৈরির জিনিসপত্র এবং ম্যানুয়াল পেয়েছে। তবে আল কায়দার হাতে বায়ো-ওয়েপন ছিল এমন প্রমাণ নেই। সাদ্দাম হুসেনও জীবাণু অস্ত্র নির্মাণ কর্মসূচি নিয়েছিল, তবে সাফল্য আসার আগেই আমেরিকা ইরাকে হানা দিয়ে সব তছনছ করে দিয়েছে।’

আবার একটা ফোন এল সায়ন্তনের মোবাইলে। ফের ফোন নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল সায়ন্তন। এবার বেশ মিনিট কুড়ি কথা বলে থমথমে মুখে ফিরে এসে সোফায় বসল সায়ন্তন। বলল, ‘তুই কি এবার বেরোবি? আমার বেরোতে একটু সময় লাগবে, অনেক তালাচাবি দিতে হবে। তারপর পাশের বাড়িতে চাবি জমা দিয়ে বেরোব। তুই বরং এগিয়ে যা।’

আরশি সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছিল সায়ন্তন ঘর থেকে উঠে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে। সে উঠে পড়ল। দরজার কাছে গিয়ে আরশি নীচু হয়ে জুতোর স্ট্র্যাপ বাঁধছে, সায়ন্তন ডাকল, ‘আরশি—’

সায়ন্তনের গলায় কিছু একটা ছিল যার ফলে চমকে তার দিকে তাকাল আরশি। বলল, ‘বল—’

‘তোকে একটা কথা বলব ভেবেছিলাম,’ এটুকু বলেই সায়ন্তন হঠাৎ সতর্ক হয়ে গেল, ‘না, আজ থাক, পরে বলব। যোগাযোগ রাখিস।’

‘রাখব, এতদিন পরে খুঁজে পেয়েছি যখন চট করে হারাতে দিচ্ছি না।’ আরশি হেসে বলল।

‘হ্যাঁ, এই শহর এখন আর আমার নিজের নেই। পরিচিত অনেক আছে, কিন্তু বন্ধু বলতে তুই একা। কথাটা আজ তোলা থাকল, কিন্তু পরে বলব তোকে, খুব দরকারি একটা কথা—’

‘বলিস, যখন তোর মর্জি হবে, এখন চলি।’

আরশির ট্যাক্সি এসে গেছিল। উঠে দরজা বন্ধ করে পিঠ এলিয়ে দিল সিটে। পিঠে ব্যথা করছে ক-দিন হল। একটানা কম্পিউটারের সামনে ঝুঁকে বসে কাজ করার ফল। আজ আর অফিসে ঢুকবে না আরশি। এখন সোজা বাড়ি।

সায়ন্তন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। রাস্তার বাঁকে আরশির গাড়ি অদৃশ্য হয়ে যেতে ঘরে ফিরে একে একে দরজা-জানলা বন্ধ করা শুরু করল। এই বাড়িতে আটকে রয়েছে ওর পুরো ছেলেবেলা, বাবা-মা-র স্মৃতি এবং আরও অনেক কিছু। কিন্তু দু-দণ্ড বসে স্মৃতিচারণ করার অবকাশ নেই, এখনই ফিরতে হবে হোটেলে।

সকাল থেকে কেউ একজন বার বার ফোন করে ওকে ভয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে। বার বার সাবধান করছে এখানকার ফিল্ড ওয়ার্কের তথ্য নষ্ট না করে ফেললে কপালে দুর্ভোগ আছে। লোকটা কে সায়ন্তন বুঝতে পারছে না, ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রোটোকল ব্যবহার করে ফোন করছে, সেজন্য টেলিফোন নাম্বার উঠছে না, শুধু কলিং কার্ড নাম্বার দেখা যাচ্ছে।

সায়ন্তনের মোবাইল নাম্বার ইতিমধ্যে অনেকে পেয়ে গেছে তা ভালোই বুঝতে পেরেছে সে। একাধিক সরকারি ল্যাবরেটরিতে যেতে হয়েছে ওদের, সেখানে ফোন নাম্বার দিতে হয়েছে। ফোন নাম্বার দিতে হয়েছে কলকাতা পুলিশের কাছেও। পুলিশের কাছ থেকে কোনো কোনো রিপোর্টার নাম্বার জোগাড় করে ফেলেছে, এটা আরশি বলেছে। এদের কেউ কি ফোন করে ভয় দেখাচ্ছে?

কিন্তু সায়ন্তনকে ভয় দেখিয়ে কার কী লাভ? ওদের কলকাতা সফর থেকে এমন কোনো তথ্য উঠে আসেনি যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাইস্ট্রিট মল ছাড়াও আরও দু-চার জায়গা থেকে রানডম স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে যদি কিছু পাওয়া যায় সেই আশায়, সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা বাকি। সায়ন্তনের কাছে রাখা নমুনা নষ্ট করে ফেললেও ব্যাকআপ রাখা আছে কলকাতার কয়েকটা ল্যাবে। তাহলে একা সায়ন্তনকে ভয় দেখিয়ে লাভ কী?

সম্ভবত প্র্যাঙ্ক কল। কোনো সাংবাদিকের কাজ হতে পারে। বেশ ক-জন সাংবাদিক খবরের আশায় ঘুরঘুর করছে চারপাশে। কিন্তু সায়ন্তনের নাগাল পায়নি। হতাশা থেকে তাদের কেউ মজা করছে।

তবে ব্যাপারটা যদি সিরিয়াস হয় তাহলে চিন্তার কথা। সন্ত্রাসবাদীদের নেটওয়ার্ক ছড়ানো সর্বত্র। শিবসাগর ভাইরাসের আউটব্রেকের পেছনে যদি কোনো টেররিস্ট গোষ্ঠীর হাত থাকে তবে তারা হয়তো ভাবছে সায়ন্তন অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। নাহ্, একটু সাবধান হতে হবে।

বাড়ির সদর দরজার তালা বন্ধ করে চাবিটা পাশের বাড়ির কাকিমার হাতে তুলে দিয়ে সায়ন্তন রাস্তায় নামল। ইতিমধ্যে অ্যাপ ক্যাবের চালক ফোন করে জানিয়েছে রাস্তার মুখে চলে এসেছে, কিন্তু পিকআপ পয়েন্টে আসতে পারছে না, কারণ গার্ডরেল দিয়ে রাস্তা বন্ধ রয়েছে। কিছু আগে যখন আরশি বেরোল, তখন কোনো গার্ডরেল ছিল না, এখন আচমকা গার্ডরেল এল কীভাবে! তবে সল্টলেকে পুলিশ যখন-তখন রাস্তা আটকে নাকা চেকিং করে সেটা সায়ন্তন আগেও দেখেছে।

ট্যাক্সিটা হেডলাইট অন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে যাতে অন্ধকারে চিনতে সুবিধে হয়। সায়ন্তন এগিয়ে গিয়ে দরজার হাতলে হাত রাখার সঙ্গেসঙ্গে দু-জন মানুষ যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। একজন একটা মিশমিশে কালো পিস্তল সায়ন্তনের গলায় ঠেকিয়ে বলল, ‘চিল্লাও মৎ, নহি তো—’

আরেকজন ততক্ষণে ড্রাইভারকে তার সিট থেকে হ্যাঁচকা টানে বের করে মাটিতে ফেলে তার পেটে একটা ভয়ংকর জোরালো লাথি কষিয়েছে। যন্ত্রণায় পেট চেপে ধরে দু-তিন পাক গড়িয়ে গেল ড্রাইভার। সেই ফাঁকে লোকটা চালকের আসনে বসে গাড়ি স্টার্ট করে দিল।

সায়ন্তনকে সিটের ওপর ফেলে তার বুকে উঠে বসেছে একটা লোক। দম বন্ধ হয়ে আসছে ওর। সায়ন্তন লোকটাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। তার ডান বাহুতে সুচের মতো কী-একটা তীক্ষ্ণ জিনিস ফুটিয়ে দিল লোকটা। সঙ্গেসঙ্গে জ্ঞান হারাল সায়ন্তন!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *