ক্যালকাটা পোস্ট-এর অফিস, কলকাতা।
সোমক সান্যালের ঘরের করিডোর ধরে এগোচ্ছিল আরশি। তার পাশাপাশি হাঁটছিলেন অমরনাথ পটেল। আরশি মনে মনে ভাবছিল সময় কত তাড়াতাড়ি বদলে যায়!
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এখান থেকে আরশিকে তুলে নিয়ে গেছিল ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির লোকজন। তাদের কাছে আরশি তখন ছিল একজন সন্দেহভাজন অপরাধী। অফিসের অন্যান্য অনেকে তখন ভেবেছিল নিশ্চয়ই কিছু একটা অপরাধ করেছে মেয়েটা, নইলে সন্ত্রাস দমনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারত সরকারের বিশেষ বাহিনী কাউকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়!
অল্প ক-দিনের ব্যবধানে ছবিটা এক-শো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেছে। আরশির অনুরোধে সাড়া দিয়ে যেকোনো অফিসার না পাঠিয়ে অমরনাথ নিজে চলে এসেছেন কলকাতায়। এর মধ্যে আরশি তাঁর কাছে যে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে দেওয়ার অনুরোধ করেছে, সবই অমরনাথ যথাযথ গুরুত্ব সহকারে তাকে জোগাড় করে দিয়েছেন।
সোমকের ঘরে ঢুকেও বসলেন না অমরনাথ, দাঁড়িয়ে রইলেন দরজার এক পাশে। হাতের ইশারায় তিনি আরশিকে বোঝালেন, আপাতত এখানেই থাকবেন তিনি।
মাথা ঝাঁকিয়ে আরশি একটা চেয়ার টেনে সোমকের সামনে বসল। সোমক আরশিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সবাইকে ডেকে নেব?’
‘ডাকুন, আমি তৈরি আছি।’
ইন্টারকমে সত্যকাম বাগচি এবং নয়নিকা ভরদ্বাজকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন সোমক সান্যাল। আরশি জানতে চাইল, ‘অনীককে ডাকবেন না?’
‘অনীককে ডাকার দরকার আছে?’ পালটা প্রশ্ন করলেন সোমকবাবু।
‘দরকার নেই, তবে ডেকে নিন। শুরুতে ছিল যখন, শেষটাতেও থাকুক।’
ফের ফোন তুলে অনীককে ডেকে পাঠালেন সোমক সান্যাল।
কিছুক্ষণের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে তিনজন সোমকবাবুর ঘরে এসে হাজির হল। আরশিকে বসে থাকতে দেখে সবাই অবাক হল। নয়নিকা ভরদ্বাজ অমরনাথকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তটস্থ হয়ে গেলেন। তারপর উদ্ বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলেন, ‘ফারদার ট্রাবল?’
‘ট্রাবল কি না এখনও পরিষ্কার নয়।’ সোমক গম্ভীরভাবে বললেন, ‘আরশি এখন আবার কাজে যোগ দিতে চাইছে। ওকে নেওয়ার আগে আপনাদের সকলের মতামত জানার জন্য ডেকেছি।’
‘আমি কী মতামত দেব স্যার, আরশিদি প্রচুর সিনিয়র জার্নালিস্ট, ওঁর ব্যাপারে আমি কী বলব!’ সবার আগে মুখ খুলল অনীক।
‘নয়নিকা—’
‘আমি আরশিকে ওয়েলকাম করছি,’ নয়নিকা ভরদ্বাজ নিজের মতামত স্পষ্ট করে দিলেন, ‘একটা খারাপ অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে ও রিজাইন করেছিল, কিন্তু ফাইনালি দ্য ক্রাইসিস ইজ ওভার। আরশির মাধ্যমে একটা ব্যাপার আমাদের সবার সামনে খুব স্পষ্ট হয়ে গেছে, তা হল মেয়েরা একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঝুঁকি নিয়ে রিপোর্টিং করতে পারে। আই অ্যাম রিয়েলি প্রাউড অফ হার!’
‘আমারও বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই,’ সত্যকাম জানালেন, ‘আমি তো ওকে রেজিগনেশন দেওয়ার সময় নিষেধ করেছিলাম। এখন আমাদের অফিসের পলিসিতে যদি কোনো বাধা না থাকে তবে ওকে ইমিডিয়েটলি জয়েন করতে বলব, এই ঘটনাটা ও লিখুক আমাদের জন্য, ওর চেয়ে ভালো আর কেউ ব্যাপারটা জানে না—’
‘তোমাকে কাজে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ওঁদের কারো আপত্তি নেই, আরশি,’ সোমক সান্যাল বললেন, ‘আমারও নেই, সেজন্য তোমার ইস্তফার চিঠি আমি এখনও অ্যাকসেপ্ট করিনি। তবে তোমার আচরণে আমি ক্ষুব্ধ হয়েছি যথেষ্টই। অফিস তোমার জন্য এত কিছু করল, আর তুমি সেসব কিছু ছুড়ে ফেলে দিয়ে রেজিগনেশন দিয়ে বেরিয়ে গেলে! আবার চিঠিতে লিখলে উকিলদের ফি ফেরত দিয়ে দেবে! দিস ইজ আনফেয়ার। তোমাকে আগে বলতে হবে তুমি ইস্তফা দিয়েছিলে কেন!’
‘আমি অফিসে খুব নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলাম,’ আরশি বলল, ‘অফিসে কেউ একজন জানত ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সির যে বিজ্ঞানী কলকাতায় এসেছেন, সেই সায়ন্তন মুখার্জি আমার কলেজের বন্ধু। অথচ আমি জানতাম না কিছুই। সায়ন্তন মুখার্জি ঠিক কোন কাজে এখানে এসেছেন এবং তদন্ত করে কী পেয়েছেন সেসব বের করার জন্য আমাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সায়ন্তন যে ধরনের গোপন কাজে শহরে এসেছিল তাতে ওর নাগাল কোনো সাধারণ রিপোর্টার পেত না, রাষ্ট্রসংঘর হাজার পুরস্কার ঝুলিতে থাকলেও নয়। কিন্তু আমি ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেই সায়ন্তন আমার মেসেজের উত্তর দিয়েছিল। এর ফলে ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগ করতে সুবিধে হয়। সায়ন্তন একজন নিঃসঙ্গ মানুষ, ওর বাবা-মা দু-জনে পথদুর্ঘটনায় মারা গেছেন, বোন থাকে বাইরে, কলকাতায় আত্মীয়স্বজন যারা আছে, তাদের সঙ্গে সেরকম যোগাযোগ নেই। আমাকে পেয়ে ও আমাকে আঁকড়ে ধরতে চাইবে, আমার সঙ্গে সব কিছু তথ্য শেয়ার করবে, এই ব্যাপারগুলো মাথায় রেখে আমাকে এই অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছিল। যিনি একাজ করেছিলেন, তিনি সায়ন্তন সম্পর্কে অনেক খবর রাখতেন, কিন্তু আমার সেসব কিছুই জানা ছিল না। এমনকী সায়ন্তনকে অপহরণ করার জন্য আমাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। যখনই আমার কাজ ফুরিয়ে গেল, তখনই আমাকে পুলিশের চোখে সন্দেহভাজন সাজিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হল। সেই লোক যদি অফিসে বসে থাকেন, তবে তাঁর পাশাপাশি কাজ করতে গেলে তিনি আমার গতিবিধির খবর পেয়ে যাবেন। তাই বাধ্য হয়ে আমি ইস্তফা দিয়েছিলাম।’
‘সে কী, আমাদের লোক এর মধ্যে যুক্ত! কে সে? তুমি কার কথা বলছ?’ সোমক সান্যাল বিস্মিত হলেন।
‘নয়নিকাদি, আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই,’ আরশি বলল, ‘এনআইএ-র টিমের সামনে আপনি এই ঘরে বসে বলেছিলেন আমি সায়ন্তনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেই ওকে অপহরণ করা হয়েছে। আপনি কী করে জানলেন, আমি সায়ন্তনের বাড়িতে গেছিলাম এবং কখন সেখান থেকে বেরিয়েছি? আমি তো অফিসে কাউকে জানাইনি কোথায় যাচ্ছি। সায়ন্তনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি আপনাদের কারো সঙ্গে যোগাযোগও করিনি, সোজা বাড়ি চলে গেছিলাম। তাহলে আপনি জানলেন কীভাবে?’
ঘাবড়ে যাওয়া মুখে নয়নিকা ভরদ্বাজ বললেন, ‘আমি কী করে জানব বলো, আমাকে তো সত্যকামদা সকালে ফোন করে জানালেন তুমি ডক্টর মুখার্জির বাড়িতে গেছিলে। সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেই ভদ্রলোককে কিডন্যাপ করা হয়েছে।’
সত্যকাম শুকনো মুখে বললেন, ‘আমি বলেছিলাম? কী জানি মনে পড়ছে না তো! তা, তুমি আমাকে অ্যাকিউজ করছ নাকি?’
‘করছি,’ আরশি ভাবলেশহীন মুখে মন্তব্য করল।
‘সোমকবাবু, প্লিজ স্টপ দিস। একজন স্টার রিপোর্টার হয়ে গেছে বলে সে আমাকে যা খুশি বলে পার পেয়ে যাবে এ হতে পারে না! হয় ওকে রাখুন, নয় আমাকে। আমি ওর সঙ্গে কাজ করতে পারব না।’
চেয়ার ছেড়ে উঠে যাওয়ার উদ্যোগ করেছিলেন সত্যকাম বাগচি। তাঁর কাঁধে একজোড়া শক্ত হাত চেপে বসল। নিঃশব্দে তাঁর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন অমরনাথ। ঘাড় ঘুরিয়ে তাঁর ঠান্ডা চোখজোড়ার দিকে তাকিয়েই আবার বসে পড়লেন সত্যকাম।
একগোছা কাগজ টেবিলের ওপর ছুড়ে দিয়ে আরশি ঠান্ডা গলায় বলল, ‘এখানে আপনার ব্যাঙ্ক ডিটেল রয়েছে। চারটে অ্যাকাউন্টে বেশ কয়েক কোটি টাকা রয়েছে। এ ছাড়া বাইপাসের ওপর দুটো ফ্ল্যাট, একটা পেন্টহাউস, শান্তিনিকেতন আর মন্দারমণিতে দুটো রিসর্ট। এত টাকা কোথা থেকে পেলেন সত্যকামদা? আপনার মাইনের টাকায় তো এত কিছু হয় না। কে দিয়েছে আপনাকে টাকা?’
সত্যকামের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তোতলাতে তোতলাতে বললেন, ‘আমি পারিবারিক কিছু সম্পত্তি পেয়েছি রিসেন্টলি, এগুলো সেভাবে পাওয়া। আমার কাছে প্রমাণ আছে।’
আরশি কঠিন স্বরে বলল, ‘মাত্র এক বছরে এত সম্পত্তি করেছেন, তাই না সত্যকামদা? করোনা ভাইরাস ভারতের অর্থনীতির কতটা ক্ষতি করেছে তাই নিয়ে দিল্লিতে অর্থমন্ত্রী এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের সাক্ষাৎকার নিতে গেছিলেন আপনি। তারপর থেকে আপনার সম্পত্তি ফুলেফেঁপে উঠেছে। এদিকে আমি প্রথমে বাবাকে হারিয়েছি। আমার একমাত্র বন্ধু সাংঘাতিক অত্যাচার সয়েছে। আমি নিজে পুলিশের মার খেয়েছি, জেল খেটেছি। আর আপনি…! দিল্লিতে আপনি কার সঙ্গে ডিল করে এসেছেন?’
আরশির চোখে চোখ রাখতে পারছিলেন না সত্যকাম। রীতিমতো ঘর্মাক্ত মুখে তিনি বলার চেষ্টা করলেন, ‘সোমকবাবু, আপনি প্লিজ আমাকে বাঁচান! এসব কী পাগলামি হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না—’
‘আজ আরশি আমাদের অফিসের একজনকে চেয়েছিল এখানে।’ থেমে থেমে বলে উঠলেন অমরনাথ, ‘কেন জানেন? যাতে আপনার অ্যাকাউন্টের ডিটেইলস্ যে একদম অথেন্টিক, সেটা সবার সামনে বলা যায়। কিন্তু আর কাউকে না পাঠিয়ে আমি এসেছি। কেন বলুন তো? কারণ আপনার মতো লোক, যারা এখানে বসে শত্রুদেশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করছে, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য আইন-আদালতের হাঙ্গামা আমার পোষাবে না। আরশি দেখেছে, শুধু সন্দেহের বশেই কী করে ফেলি আমরা। আপনার ক্ষেত্রে তো সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই…’
‘দাঁড়ান!’ কাঁপা গলায় বললেন সত্যকাম, ‘আমি সব বলব। ওদের জালে ফেঁসে গেছিলাম বলেই এই অবস্থা হয়েছে! আরশি প্লিজ। সোমকবাবু, নয়নিকা… হেল্প মি!’
অমরনাথ সত্যকামের হাত দুটো পিছমোড়া করে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন।
আরশি বলল, ‘মিস্টার পটেল খুব ভালোমতো জানেন কীভাবে আপনাকে দিয়ে কথা বলানো যায়। আশা করি ওঁদের সঙ্গে আপনি আবার চালাকি করতে গিয়ে নিজের বিপদ বাড়াবেন না।’
সত্যকামকে নিয়ে অমরনাথ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সবাই কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর অনীকই প্রশ্ন করল, ‘কারা টাকা দিচ্ছিল সত্যকামদাকে?’
‘জানি না রে।’ আরশির মাথাটা খুব ভারী ঠেকছিল। নীচু গলায় ও বলল, ‘এনআইএ সাহায্য করেছে বলেই এগুলো জানা গেল। এবার কারা এসব দিয়েছে—সেটা নিশ্চয়ই ওরাই খুঁজে বের করবে।’
* * *
রাতে বাড়িতে ফিরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আরশি বাবাকে খুঁজছিল। এত তারার মধ্যে বাবা কোনটা? একটা কষ্ট ওর বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে উঠছিল। বাবার সঙ্গে আজ একবার দেখা না হলেই নয়!
অনেক চেষ্টা করে ঋষিপ্রতিম বসুকে চিনতে পারল আরশি। ওই তো, জ্বলজ্বলে বৃহস্পতির পাশে উজ্জ্বল যে তারাটা হাসি হাসি মুখে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে, ওটাই তো বাবা! আরশি চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল হাতের তালুতে মুছে বলল, ‘বাবা, তোমার সেই ছোট্ট বাবুই পাখি কিন্তু আজ তোমার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়েছে। শয়তানদের চক্রান্ত তছনছ করে দিয়েছি আমি।’
ঋষিপ্রতিম কথা বললেন না। সুদূর নক্ষত্রলোক থেকে তেমনই হাসিমুখে তিনি তাকিয়ে রইলেন আরশির দিকে। মেয়ের নিঃশব্দ কান্না কি পৌঁছোচ্ছিল তাঁর কাছে? জানে না আরশি। তেমনই, মা যে কখন ছাদে উঠে পাশে দাঁড়িয়েছে— তা-ও সে টের পায়নি।
‘খেতে আয় নীচে। চিংড়ির চপ করেছি আজ। ঠান্ডা হয়ে গেল এতক্ষণে!’
মা এইরকমই। চুপচাপ সাপোর্ট দিয়ে যায়। চিংড়ির চপ আরশির ভীষণ প্রিয়!
ঋষিপ্রতিমও ওটা খুব, খুব ভালোবাসতেন!
