ধরমপুর, হরিয়ানা।
রাতের অন্ধকারে ধুলো উড়িয়ে পর পর পাঁচটা কালো রঙের এসইউভি গাড়ি এসে থামল গ্রামের একপ্রান্তে ফাঁকা মাঠের মতো জায়গায় সদ্য তৈরি হওয়া একটা বাড়ির সামনে। বাড়িটা একতলা হলেও বেশ বড়ো, বাইরের দেওয়ালে এখনও প্লাস্টার হয়নি, দরজা-জানলার ফ্রেমেও রঙের ছোঁয়া পড়েনি। বাড়ির দরজায় তালা ঝুলছে, জানলাগুলোও সব ভেতর থেকে বন্ধ, কোথাও কোনো আলো জ্বলছে না। প্রথম এসইউভি থেকে লাফিয়ে নামলেন অমরনাথ পটেল এবং রতন মিশ্র। অমরনাথ পটেল শক্ত করে ধরে রয়েছেন বছর কুড়ি বয়সের এক তরুণের জামার কলার। সেই তরুণ ভয়ে ভয়ে সামনের বাড়িটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘নওশাদ ভাইয়াকা মকান।’
অমরনাথদের পিছু পিছু অন্য গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে পনেরোজন সশস্ত্র কম্যান্ডো এবং সাদা পোশাকের আরও কয়েকজন অফিসার। অমরনাথ একজন অফিসারকে ইশারায় বললেন বাড়ি ঘিরে ফেলতে। বারোজন কম্যান্ডো মুহূর্তে বাড়ির চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দু-জন অ্যাসল্ট রাইফেলধারী কম্যান্ডো সতর্কভাবে এগোল প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ স্টিক নিয়ে। দরজা খুলে দেওয়ার কেউ নেই, সুতরাং দরজা ভেঙেই ঢুকতে হবে। অমরনাথ পটেল এবং রতন মিশ্র দুটো গাড়ির ফাঁকে তরুণটিকে রেখে দু-পাশে দু-জন দাঁড়ালেন। তাঁদের সঙ্গে রইল কার্বাইনধারী একজন কম্যান্ডো।
এনআইএ এবং র-এর যৌথ অভিযানে যাকে প্রথমে ধরা হয়েছে সেই তরুণের নাম ব্রিজেশ সিংহ। সারাদিন খাটাখাটনির পর ব্রিজেশ ঘুমোচ্ছিল, আচমকা দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ল কম্যান্ডোরা। ঘুম ভেঙে যেতে ব্রিজেশ দেখল, তার মাথার সামনে অন্তত গোটা দশেক বন্দুকের কালো নল তাক করা রয়েছে। বাড়িতে মাঝরাতে হঠাৎ পুলিশ এল কেন তা বুঝে ওঠার আগেই এলোপাথাড়ি চড়থাপ্পড় এসে পড়তে শুরু করল তার মুখে। ব্রিজেশ আর্তনাদ করে উঠল, ‘আরে সাব, মৎ মারো মুঝে। ক্যয়া গলতি কিয়া হ্যয় ইয়ে তো বোলো —’
চড়থাপ্পড় থামতে নেতা গোছের একজন এগিয়ে এসে জানতে চাইল, ‘কঁহা হ্যয় তেরা মোবাইল?’ ভয়ে ভয়ে তাক থেকে এনে মোবাইল ফোন এদের হাতে তুলে দিল সে। এতক্ষণ ব্রিজেশের মা একপাশে দাঁড়িয়ে পুলিশি তাণ্ডব দেখতে দেখতে দেখতে আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপছিলেন। নেতা গোছের লোকটা তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘ঘরমে কিতনা মোবাইল হ্যয়?’
‘একই হ্যয়, জি,’ ব্রিজেশের মা আতঙ্কগ্রস্ত স্বরে জানালেন।
‘আচ্ছি তরাসে তলাশ করো—’ কম্যান্ডোদের আদেশ দিলেন সেই ব্যক্তি। তারপর ব্রিজেশের দিকে ফিরে জানতে চাইলেন, ‘কঁহাসে মিলা ইয়ে মোবাইল?’
ব্রিজেশ পেশায় মোটর সাইকেল মেকানিক। কিন্তু পড়াশোনা বিশেষ না জানলেও তার বুঝতে অসুবিধে হয়নি নওশাদ ভাইয়ার দোকান থেকে কেনা এই সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল ফোনটি হল যত ঝামেলার কারণ। গ্রামে মোবাইলের একটামাত্র দোকান, সেখানে নতুন পুরোনো সব ধরনের মোবাইল বিক্রি হয়। খুব দামি মোবাইল অবশ্য নওশাদের দোকানে পাওয়া যায় না, গ্রামে বেশি টাকা দিয়ে ফোন কেনার লোক নেই। কিন্তু কম দামে পুরোনো স্মার্ট ফোন পাওয়া যায় এই দোকানে। বাইরে তাদের গ্রামের সুনাম নেই একথা ভালো জানা আছে ব্রিজেশের, এসব ফোন কোথা থেকে আসে কিছুটা অনুমান করতে পারে সে। গ্রামের মানুষও সব কিছু জানে। তবে আজ পর্যন্ত চোরাই মোবাইল কেনার জন্য গ্রামের কাউকে পুলিশে ধরেছে, এমন হয়নি।
কাল ব্রিজেশ যখন নওশাদ ভাইয়ার দোকানে গেছিল, তখন নওশাদ দোকানে ছিল না। তার ভাইপো আরিফ ছিল দোকানে। আড়াই হাজার টাকায় ফোনটা কিনে ব্রিজেশ পানিপত শহরে চলে গেছিল গ্যারাজের জন্য কিছু পার্টস কিনতে। কাজ সেরে বাড়ি ফিরে ব্রিজেশ জানতে পারল নওশাদ ভাইয়া বার তিনেক মোবাইল ফোনটার জন্য ঘুরে গেছে। এটা নাকি বিক্রির জন্য নয়, ভাইপো না বুঝে বিক্রি করে ফেলেছে, ব্রিজেশ যেন ভুলেও ফোনটা চালু না করে, বার বার বলে গেছে সে।
রাতে আর নওশাদ ভাইয়ার দোকানে যায়নি ব্রিজেশ। আজ সকালে গিয়ে দেখেছে দোকান বন্ধ। বাড়িতেও কেউ নেই। এরকম মাঝে মাঝে হয়, নওশাদ ভাইয়া তার বিবি আর ভাইপোকে নিয়ে কোথায় যেন কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যায়। ঠিক আছে, ফিরে এলে ফোন ফেরত দেওয়া যাবে’খন, এখন ফোনটা ব্যবহার না করে উপায় নেই। ফোন না থাকায় ব্রিজেশের খুবই সমস্যা হচ্ছে। তার পুরোনো মোবাইলের সিম নতুন মোবাইলে ঢুকিয়ে আজ সারাদিন ব্যবহার করেছে সে। অত্যন্ত ভালো ফোন, যেমন পরিষ্কার আওয়াজ, তেমন পরিষ্কার ছবি!
পুলিশের মার খেয়ে ব্রিজেশ বুঝতে পেরেছে এই ফোন নিশ্চয়ই কোনো ভিআইপির। সেটা জানত বলেই বিক্রি হয়ে গেছে বলে ভয় পেয়েছিল নওশাদ ভাইয়া। কিন্তু কথা হল আরিফের গলতির জন্য পুলিশের মার কেন একা খাবে ব্রিজেশ? তার মাথা গরম হয়ে গেল। সে পুলিশকে পুরো ঘটনা খুলে বলার পাশাপাশি নওশাদের বাড়ি চিনিয়ে দিতে রাজি হল। তবে পুলিশকে সে একথাও জানাল যে, নওশাদরা বাড়িতে কেউ নেই।
প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের বিস্ফোরণে নওশাদের বাড়ির সদর দরজা ভেঙে কবজা থেকে ঝুলে পড়েছে। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করেছে। আশেপাশে বাড়ি নেই, তবে দূরে দু-একটা বাড়ির আলো জ্বলে উঠেছে। দরজা খোলা হতেই হুড়মুড়িয়ে পুরো বাহিনী ঢুকে পড়ল বাড়ির ভেতরে। অমরনাথ পটেল এবং রতন মিশ্র ব্রিজেশকে নিয়ে এগোলেন দরজার দিকে। তাঁদের পেছনে পেছনে চলল কম্যান্ডো।
ভেতরে ঢুকে কম্যান্ডোরা প্রথমেই সব আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। একের পর এক ঘরের দরজা লাথি মেরে ভাঙছে তারা। তাদের পেছন পেছন যাচ্ছেন অমরনাথরা। প্রতিটা ঘরে মানুষের বসবাসের চিহ্ন প্রকট। জামাকাপড়, বাসন, কাগজপত্র সব ছড়িয়ে পড়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে, খুব তাড়াহুড়ো করে সবাই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। সাদা পোশাকে থাকা অফিসাররা এক এক করে জিনিসগুলো গুছিয়ে সংগ্রহ করছিলেন। রান্নাঘরের তাকে মশলার কৌটোর আড়াল থেকে বেরোল নাইন এম এম কার্বাইনের প্রচুর গুলি। আটার বস্তা থেকে পাওয়া গেল একটা এ কে-৪৭ রাইফেল, ডালের কৌটোর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল দুটো গ্রেনেড, একটা ভোজালি। এসব দেখে অমরনাথদের পাশাপাশি ব্রিজেশ নিজেও অবাক হয়ে যাচ্ছিল। এত অস্ত্র কোথা থেকে এল নওশাদ ভাইয়ার কাছে?
একটা বন্ধ লোহার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল পুরো বাহিনী। নিরেট লোহার এই দরজা ভাঙা বেশ কঠিন। বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু ঘরের ভেতরে কেউ থাকলে বিস্ফোরণে তার ক্ষতি হতে পারে। কয়েকজন কম্যান্ডো দৌড়ে গাড়ি থেকে অ্যাসিটিলিন টর্চ নিয়ে এল। তালা কেটে এক্সপ্লোসিভ ডিটেক্টর দিয়ে ভালো করে দেখে নেওয়া হল বুবি ট্র্যাপ গোছের কিছু রয়েছে কি না। নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল সবাই।
ছোটো ঘরটায় রয়েছে একটা লোহার খাট, প্লাস্টিকের র্যাক, ওষুধপত্র, অক্সিজেন সিলিন্ডার, কিছু এঁটো বাসন। ঘরের একপাশে প্লাস্টিকের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি একটা অস্থায়ী টয়লেট, সেখানে বালতি-মগের সঙ্গে পড়ে রয়েছে রক্তমাখা একটা পাজামা। খাটে পাতা পাতলা তোশকের ওপরের দু-তিন জায়গায় রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেল। সব জিনিস সংগ্রহ করে বেরিয়ে এলেন অমরনাথ পটেল এবং রতন মিশ্র।
বাইরে পুলিশের গাড়ি ঘিরে জমা হয়েছে গ্রামের লোক। তাদের জিজ্ঞেস করে জানা গেল গতকাল সন্ধের পর নওশাদকে আর এলাকায় দেখেনি কেউ। গ্রামের মুদি দোকানের এক কর্মচারী জানাল, ক-দিন আগে নওশাদের বাড়িতে মালপত্র দিতে এসে সে অপরিচিত ক-জন লোককে দেখেছিল। গ্রামের সরপঞ্চ জানালেন, বছরখানেক আগে এই বাড়ি তৈরি করে নওশাদ উঠে আসে। এরকম ফাঁকা জায়গায় বাড়ি তৈরি করছে কেন জানতে চাওয়ায় নওশাদ বলেছিল একলপ্তে অনেকটা জমি সস্তায় পেয়েছে, তাই এখানেই বাড়ি বানাবে। বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে দেশ থেকে তার কিছু আত্মীয়স্বজন এখানে এসে থাকতে পারবে।
নওশাদের দেশ কোথায়? সরপঞ্চ বলল, তার জানা নেই। তবে নওশাদ এই গ্রামে এসে প্রথমে যে বাড়িতে ভাড়া থাকত তার মালিক হয়তো বলতে পারবেন। তক্ষুনি অমরনাথরা ছুটলেন সেই বাড়ির উদ্দেশে। এই বাড়িটা গ্রামের অন্যপ্রান্তে, বিস্ফোরণের শব্দ এখানে পৌঁছোয়নি। মালিক গুরবিন্দর সিংহ একজন দাগি ক্রিমিনাল জেনে তাকে ব্রিজেশের মতো ঘুমন্ত অবস্থায় তুলল কম্যান্ডো বাহিনী। গুরবিন্দর হকচকিয়ে গেলেও যখন বুঝল তার কোনো কুকীর্তির জন্য পুলিশ আসেনি, তখন সে কিছুটা স্বস্তি পেল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেল, নওশাদের বাড়ির ঠিকানা সেও জানে না। সম্ভবত উত্তরপ্রদেশের লোক, আজমগড় জেলা হতে পারে।
এক ঘণ্টার মধ্যে পুরো অপারেশন শেষ করে ফেরার পথ ধরলেন অমরনাথরা। ব্রিজেশ আর গুরবিন্দরকে সঙ্গে নেওয়া হল। গাড়ি থেকে ফোন করে হরিয়ানা পুলিশের ডিজি-কে অমরনাথ পটেল অবিলম্বে দিল্লি, পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ এবং রাজস্থানের সঙ্গে সব সীমান্ত সিল করে দিতে বললেন। অনেক দেরি হয়ে গেছে, তবু একটা চেষ্টা করে দেখা যাক!
লোদি রোডে এনআইএ হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে শিবানী পাণ্ডের ওপর ব্রিজেশকে জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব দিয়ে অমরনাথ নিজে ইন্টারোগেশন রুমে ঢুকে গেলেন গুরবিন্দরকে নিয়ে। প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। রতন মিশ্র চলে গেছেন নিজের অফিসে। দু-জনকেই আজ বিকেল চারটের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে যেতে হবে, আজ মিটিংয়ে থাকবেন ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসর স্বয়ং। তাই বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ নেই তাঁদের কারো কাছে।
হরিয়ানা পুলিশ ইতিমধ্যে এনআইএ-র কাছে গুরবিন্দর সিংহর ফাইল স্ক্যান করে ইমেল-এ পাঠিয়ে দিয়েছে। দেখা গেল, এই লোকটার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে ব্যাঙ্কের এটিএম ভেঙে টাকা লুঠের অভিযোগ রয়েছে। অমরনাথ ভালোই জানেন, ২০১৬ সালে সরকার আচমকা পুরোনো এক হাজার এবং পাঁচশো টাকার নোট বাতিল করে দেওয়ায় পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা সমস্যায় পড়ে যায়। ভারতের বাজারে ছড়িয়ে রাখা প্রচুর জাল নোট হঠাৎ বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে তারা অসুবিধেয় পড়ে। আইএসআই এই পরিস্থিতিতে স্লিপার সেলগুলোকে নির্দেশ দেয় যেভাবে হোক নতুন দু-হাজার এবং পাঁচশো টাকার নোটের নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। এর ফলে সে-বছর সারাদেশে প্রচুর এটিএম ভাঙার ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত ছিল হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের দুষ্কৃতীরা, আড়াল থেকে এদের পরিচালনা করছিল আইএসআই। সুতরাং অভিযোগ ঠিক হলে গুরবিন্দরের একটা পাকিস্তান-সংযোগ রয়েছে।
ঝানু অপরাধীদের মারধর করে বিশেষ সুবিধে হয় না। অমরনাথ স্থির করলেন অন্য রাস্তা নিতে হবে। গুরবিন্দরের ফাইলের প্রিন্ট আউটে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে হিড়হিড় করে তার জামার কলার ধরে টেনে নিয়ে ফের গাড়িতে গিয়ে বসলেন অমরনাথ। সঙ্গে নিলেন বিক্রমকে। ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন ‘সেই জায়গা’য় গাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। অমরনাথের গাড়িচালক আগে দু-একবার এই কৌশল দেখেছে। ‘সেই জায়গা’ শোনার সঙ্গেসঙ্গে সে দ্রুত গাড়ি নিয়ে হাজির হল হাইওয়ের ওপর।
এতক্ষণ গুরবিন্দর সিংহ চুপচাপ বোঝার চেষ্টা করছিল কী ঘটতে চলেছে। এবার সে কিছু একটা আশঙ্কা করে ভয়ে ভয়ে অমরনাথের কাছে জানতে চাইল, ‘মুঝে কঁহা লে যা রহে হো সাব, ম্যয় তো কুছ ভি নহি কিয়া—’
‘তেরি ফিল্ম কাফি লম্বি দিনো সে চল রহা হ্যয়, আজ উসকি “দি এন্ড” করনা হোগা!’ অমরনাথ জবাব দিলেন।
তাঁর নির্দেশমতো একটা ফাঁকা জায়গায় ড্রাইভার গাড়ি থামাল। অমরনাথ এবং তাঁর বিক্রম টেনে-হিঁচড়ে গুরবিন্দরকে গাড়ি থেকে নামালেন। গুরবিন্দর নামতে চাইছিল না, কারণ সে বুঝে গেছে এরপর কী ঘটবে। তাকে জোর করে নামিয়ে অমরনাথ এক লাথি কষিয়ে বললেন, ‘জলদি ভাগ হিঁয়াসে—’
‘মুঝে এনকাউন্টার মৎ করো, সাব,’ অমরনাথের পা জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল গুরবিন্দর। সে বুঝে গেছে তাকে পালাতে দিয়ে পেছন থেকে গুলি করবে পুলিশ। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সে জানাল, জেলে থাকার সময় তার সঙ্গে নওশাদের পরিচয়। নওশাদ নিয়মিত আসত তার ভাইপো আরিফের সঙ্গে দেখা করতে। জেল থেকে বেরোনোর পর গুরবিন্দরের সঙ্গে বেশ কিছুদিন নওশাদের দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। হঠাৎ একদিন গ্রামে এসে হাজির হয় নওশাদ। বলে, তাকে এবং তার ভাইপো আরিফকে পুলিশ খুঁজছে। এই গ্রামে কিছুদিন লুকিয়ে থাকতে হবে। গুরবিন্দর তাকে বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি হয়, কিন্তু শর্ত ছিল তার বাড়িতে থাকাকালীন কোনো বেআইনি কাজকর্ম করা যাবে না। নওশাদরা সেইমতো চুপচাপ থাকত, একটা দোকান দিয়েছিল, সেটা মোটামুটি ভালোই চলত। কিছুদিন পরে নওশাদ তার বিবিকে নিয়ে এল। এরপর নওশাদ বলে ধরমপুর গ্রাম তার ভালো লেগে গেছে। এখানেই নিজের বাড়ি তৈরি করবে সে। বাড়ি করে পাকাপাকিভাবে থাকা শুরু করে সে।
যতক্ষণ গুরবিন্দর তার কাহিনি শোনাল নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে একটা আস্ত সিগারেট শেষ করলেন অমরনাথ পটেল। তারপর এক ঝটকায় গুরবিন্দরের হাত থেকে নিজের পা ছাড়িয়ে নিলেন। অমরনাথের হাতে উঠে এসেছে একটা পিস্তল। গুরবিন্দর আগ্নেয়াস্ত্র চেনে, স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন ম্যাগনাম পিস্তল দেখে তার রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল! সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত এই পিস্তল, এর গুলি ছোটে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ভেদ করে।
‘হো গয়ি না তেরি কহানি?’ বলতে বলতে পিস্তলের সেফটি ক্যাচ ঠেলে সরালেন অমরনাথ, ‘আভি ভাগ যা তুরন্ত—’
মরিয়া হয়ে গুরবিন্দর বলল, ‘গোলি মৎ চালাইয়ে সাব, ম্যয় আপকো নওশাদকা ঘর লে যায়েঙ্গে—’
অমরনাথ একেবারে গুরবিন্দরের কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কঁহা হ্যয় নওশাদকা ঘর?’
‘এহি হ্যয় সাব, দিল্লিমে। দরিয়াগঞ্জ। চলিয়ে, হম আপকো দিখা দেঙ্গে—’
চটপট গাড়িতে উঠে পড়লেন অমরনাথ। বিক্রমকে বললেন, ‘অফিসকে বলো রিইনফোর্সমেন্ট পাঠাতে, আমাদের লোকেশন ট্র্যাক করতে থাকুক। কিন্তু লোকাল পুলিশকে যেন কিছু না জানায়।’
এরপর শিবানী পাণ্ডেকে ফোন করে তিনি জানতে চাইলেন নতুন কিছু তথ্য পাওয়া গেল কি না। শিবানী জানাল, ব্রিজেশ বলেছে আরিফ খুব ভালো ছুরি চালাতে জানে। গ্রামের ছেলেদের আরিফ দেখিয়েছে কী করে ছুরি ছুড়ে গাছ থেকে ফল পাড়তে হয়। আরিফের একটা ছবি পাওয়া গেছে ব্রিজেশের ফোনে, কেনার সময় ক্যামেরায় কেমন ছবি আসে দেখার জন্য ছবিটা তুলেছিল সে। ছবিটা তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিতে বলে রতন মিশ্রকে ফোনে ধরলেন অমরনাথ।
রতন মিশ্র বললেন, ‘আরে, আমি এক্ষুনি তোমাকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। একটার পর একটা ঘটনায় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার!’
‘কেন, কী হয়েছে?’ জানতে চাইলেন অমরনাথ।
‘আমাদের কাঠমান্ডু স্টেশন খবর দিয়েছে, ওখানে রয়্যাল নেপাল হলিডেজ হোটেলে ভিক্টর বোগদান নামে একজন ফরেনার এসে উঠেছে দিন কয়েক আগে। লোকটির মুভমেন্ট খুব সন্দেহজনক, কোথাও বেরোয় না হোটেল থেকে। ওর কাছে বেশ কিছু লেদার অ্যাটাচি রয়েছে। লোকটি হোটেলে জানতে চেয়েছে কীভাবে ইন্ডিয়ায় যাওয়া যায়। কিন্তু ওর ইন্ডিয়ায় আসার ভিসা নেই।’
‘তাতে কী?’ অমরনাথ একটু বিরক্ত হলেন।
‘পুরোটা শোনো আগে। লোকটির কাছে যেরকম অ্যাটাচি রয়েছে ঠিক সেইরকম অ্যাটাচি মুম্বই পোর্টে এসেছে মেহতা এন্টারপ্রাইস নামে একটা ট্রেডার্সের নামে। কাঠমান্ডু এবং মুম্বই দু-জায়গায় শিপমেন্ট এসেছে ইস্তানবুল থেকে। মুম্বইয়ের কনসাইমেন্ট পাঠিয়েছে ‘ইব্রা’জ লেদারক্র্যাফটস’ নামে একটা কোম্পানি, কিন্তু কাঠমান্ডুতে যে অ্যাটাচি গেছে তার প্রেরক সেই রুস্তম কারিমভ। এদিকে সিআইএ আমাদের সঙ্গে একটা ইনফরমেশন শেয়ার করেছে। ওদের স্যাটেলাইট চীনের ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির কিছু কথা ইন্টারসেপ্ট করেছে। তাতে ভারতে ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এক ধরনের ইমপ্রোভাইজড অ্যাটাচি পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে। ভিক্টর বোগদান লোকটির নামও শোনা গেছে। তাকে কাঠমান্ডুতে পাঠিয়েছে চীনের ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি, সেখান থেকে তাকে ভারতে নিয়ে আসার দায়িত্ব আইএসআই-এর। কিন্তু কোঅর্ডিনেশনের কিছু সমস্যার জন্য ভিক্টর কাঠমান্ডুতে আটকে রয়েছে। বিরাট কিছু ঘটতে চলেছে, তাই না?’
‘ভিক্টর বোগদান লোকটি কে? চীন যদি তাকে ভারতে পাঠাতে চায়, তবে ভারতের ভিসা করে সরাসরি পাঠাতে পারত। এরকমভাবে পাঠাবে কেন? রতন, আই থিঙ্ক ইউ আর চেজিং আ রেড হেরিং। আমাদের এখন ফোকাসড থাকতে হবে।’
‘হতে পারে, তোমার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করছি না,’ রতন মিশ্র বললেন, ‘কিন্তু যতদূর জানা গেছে, ভিক্টর বোগদান একজন রোমানিয়ান সায়েন্টিস্ট, আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে ভাইরোলজি নিয়ে রিসার্চ করত। স্মলপক্স ভাইরাস চুরি করার চেষ্টা করার মতো গুরুতর অভিযোগে তাকে আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই লোকটিকে ব্ল্যাকলিস্ট করে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন, অনেক দেশ ওকে ভিসা দেয় না, তার মধ্যে ভারত অন্যতম।’
‘তা-ই যদি হয়, তবে লোকটিকে তুলে নিয়ে এসো। ওর অ্যাটাচিগুলো পরীক্ষার ব্যবস্থা করো।’
‘উঁহু, এত সহজ নয়। আফটার অল, নেপাল ফরেন কান্ট্রি। এখন নেপালের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুব সেনজিটিভ। নেপালকে না জানিয়ে লোকটিকে তুলে নিয়ে আসা কঠিন। আবার নেপালকে জানিয়ে অপারেশন করা যাবে না। আমাদের অন্য কিছু করতে হবে।’
‘মেহতা এন্টারপ্রাইসের অ্যাটাচিগুলো তো দেখাই যায়।’
‘ইয়েস, দেখা হয়েছে অলরেডি। একটা অ্যাটাচি জোর করে তুলে এনে মুম্বই অফিস পরীক্ষা করেছে।’
‘কী আছে তাতে?’
‘কিছু নেই, ফাঁকা। একদম সাধারণ ব্রিফকেস।’
‘ডিকয়!’ উত্তেজিতভাবে বললেন অমরনাথ।
‘রাইট, আমিও তা-ই ভেবেছি। আসল ভাইরাস ভরতি অ্যাটাচি ঢুকবে কাঠমান্ডু থেকে শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে। আবার সেই শিলিগুড়ি, সেই রুস্তম কারিমভ, বুঝতে পারছ ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে?’
‘হুঁ, খুব জটিল। আমিও থই পাচ্ছি না।’
অমরনাথ ফোন ছেড়ে দিলেন। দরিয়াগঞ্জে এসে গেছেন তাঁরা। গাড়ির মিররে আরও দুটো এসইউভি-কে দেখা যাচ্ছে। নিজেদের গাড়ি চেনেন তিনি, রিইনফোর্সমেন্ট এসে গেছে। তিনি গাড়ি থামাতে নির্দেশ দিলেন। পেছনের দুটো গাড়িও তাঁর গাড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেল। সেখান থেকে বেরিয়ে এল এনআইএ-র একদল সাদা পোশাকের অফিসার। কয়েকজন মহিলা অফিসারও এসেছে।
গুরবিন্দর সিংহ প্রথমে নওশাদের ডেরা চিনতে একটু থতোমতো খাচ্ছিল। মাত্র কয়েকবার এসেছে এই জায়গায়, তার কাছে খুব বেশি চেনা নয় এখানকার রাস্তাঘাট। অমরনাথ অভিজ্ঞ দৃষ্টিতে বুঝলেন, গুরবিন্দর সত্যিই জায়গাটা চিনতে পারছে না। এত সকালে রাস্তায় খুব বেশি লোক নেই, তবে একটা চায়ের দোকান পাওয়া গেল গলির মধ্যে। সেই দোকানটা দেখে উজ্জ্বল হয়ে উঠল গুরবিন্দরের মুখ। এই দোকানে ‘দমদার চায়ে’ পাওয়া যায় যার জন্য অনেক দূর থেকে লোক আসে। দোকানের ওপরতলায় নওশাদের আস্তানা।
গুরবিন্দরের দেখানো পথে বাড়ির পেছনদিকের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল এনআইএ বাহিনী। সামনে পাহারায় রইল চারজন। পুরোনো দিনের বাড়ি, সরু, নোংরা সিঁড়ি। দোতলার ঘরের কাঠের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দুটো পাল্লা অসমান, ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরের দৃশ্য কিছুটা দেখা যায়। এক অফিসার সেই ফাঁক দিয়ে দেখে জানালেন, কেউ একজন বিছানায় শুয়ে আছে চাদর ঢাকা দিয়ে। অমরনাথ দরজা ভাঙার আদেশ দিতেই এক ধাক্কায় পুরোনো নড়বড়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল পুরো বাহিনী।
বিছানার ওপর লোকটি গভীর ঘুমে মগ্ন। আওয়াজে তার ঘুম ভাঙেনি। চাদর সরিয়ে দিতেই ‘ওহ গড’ শব্দটা ছিটকে বেরিয়ে এল অমরনাথ পটেলের মুখ থেকে। বিছানায় পড়ে আছে এক যুবকের গলাকাটা লাশ! গা ঠান্ডা এবং শক্ত হয়ে গেছে। শিবানী পাণ্ডের পাঠানো ছবি টাটকা দেখেছেন বলে এক ঝলক দেখেই অমরনাথ বুঝলেন মৃত ব্যক্তি আরিফ। তার বোকামির জন্য পুলিশের হাতে সায়ন্তন মুখার্জির কিডন্যাপারদের সম্পর্কে সূত্র চলে গেছে। সুতরাং তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে!
কিন্তু দরজা তাহলে ভেতর থেকে বন্ধ করল কে?
এদিক-ওদিক তাকিয়ে সমাধান পেয়ে গেলেন অমরনাথ। পাশের ঘরের জানলার গরাদের সঙ্গে একটা বেডকভার শক্ত করে বাঁধা। খুন করে সেই পথে বেরিয়ে গেছে আততায়ী। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা হয়েছে প্রতিবেশীদের চোখে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। দু-চার দিন পরে পচা গন্ধ পেয়ে যদি দেহ আবিষ্কার হত, তবে তার মধ্যে অনেক সময় পেয়ে যেত খুনিরা।
একজন ডিএসপিকে স্থানীয় থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে আরিফের লাশ ময়নাতদন্তে পাঠানো এবং ঘরে ভালো করে তল্লাশি চালিয়ে দরকারি সব জিনিস বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়ে অমরনাথ বিক্রমকে নিয়ে ফেরার পথ ধরলেন। গুরবিন্দর রইল বাহিনীর জিম্মায়, নওশাদ বা তার বিবির ছবি পাওয়া গেলে সে চিনিয়ে দিতে পারবে।
গাড়িতে উঠে চোখ বুজে সিটে গা এলিয়ে দিলেন অমরনাথ। চব্বিশ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে একটানা কাজ করে চলেছেন, শরীর চলছে না আর! এবার একটু বিশ্রাম দরকার। তারপর ফের বিকেলের মিটিংয়ের রিপোর্ট তৈরি করতে বসতে হবে।
আধ ঘণ্টা পাওয়ার ন্যাপ নিয়ে চোখ খুলে অমরনাথ দেখলেন গাড়ি অফিসের কাছাকাছি এসে গেছে। এখন বেশ ফ্রেশ লাগছে। সবাই সারারাত পরিশ্রম করেছে, সেজন্য অফিসে ঢুকে ড্রাইভারকে জোর করে বিশ্রাম নিতে পাঠালেন, বিক্রমকেও ছেড়ে দিলেন। ওপরে ইন্টারোগেশন রুমে উঁকি দিয়ে দেখলেন ব্রিজেশ মাটিতে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। মারধরের চিহ্ন নজরে না পড়ায় স্বস্তি পেলেন অমরনাথ, আদালতের ধমক খেয়ে একটু হলেও সাবধান হয়েছে শিবানী। খোঁজ নিয়ে তিনি জানলেন, শিবানী একটু আগে বিশ্রামের জন্য নিজের চেম্বারে ঢুকেছে।
নিজের ঘরে ঢুকে প্রথমে অ্যাটাচড টয়লেটে গিয়ে ভালো করে স্নান করলেন অমরনাথ। ফিরে এসে এসি চালু করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর ক্যান্টিনকে ফোনে বলে দিলেন, কুড়ি মিনিট পরে উপমা এবং চা পাঠাতে। এই কুড়ি মিনিট তিনি মনে মনে রিপোর্টের পয়েন্টগুলোকে সাজিয়ে নেবেন। ঘরের বাইরে লাল আলোটা জ্বেলে দিলেন যাতে কেউ এসময় হুট করে ঢুকে না পড়ে।
ঠিক কুড়ি মিনিট পরে আলো নিভিয়ে দেওয়ার সঙ্গেসঙ্গে দরজায় টুকটুক করে নক করার শব্দ হল। অমরনাথ বললেন, ‘প্লিজ কাম ইন—’
ক্যান্টিনের লোকের পেছন পেছন শিবানী পাণ্ডে ঢুকল। হাতে স্পাইরাল নোটপ্যাড। চোখ-মুখ বেশ উত্তেজিত, নিশ্চয়ই কোনো খবর আছে। হাতের ইশারায় ক্যান্টিনের লোক বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললেন তিনি। ক্যান্টিনের লোক খাবার রেখে বেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে?’
‘ভেরি কনফিউজিং ব্যাপার, স্যার। কলকাতা থেকে রিপোর্ট পাঠিয়েছে, তার মাথামুন্ডু বুঝতে পারছি না। কাল সারাদিন ভিগনেশ শর্মা বাড়ি থেকে কোথাও বেরোয়নি। কিন্তু রাতে কলকাতার প্রচুর জায়গায় গাড়ি নিয়ে ঘুরেছে। সন্ধে সাড়ে সাতটায় কলিন লেনের বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। প্রথমে গেছে হাওড়ার কদমতলা, সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা আমহার্স্ট স্ট্রিট। এখানে কিছু সময় থেকে বেরিয়ে এসে গেছে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি, তারপর বাঁশদ্রোণী, সেখান থেকে শ্যামবাজার। প্রতিটা জায়গায় আমাদের টিম ওকে অনুসরণ করেছে, কিন্তু সন্দেহজনক কিছু পায়নি। যে বাড়িগুলোতে গেছে, তাতে ওর পরিচিত লোকজন থাকে। ভোর চারটের সময় শ্যামবাজার থেকে বেরিয়ে যখন বাড়ি ফিরছে, তখন নাকা চেকিংয়ের জন্য গাড়ি থামিয়ে ভালো করে তল্লাশি করা হয়েছে। গাড়িতে কিছু পাওয়া যায়নি।’
খাওয়া বন্ধ করে অমরনাথ জানতে চাইলেন, ‘আর ওই লেডি জার্নালিস্ট আরশি বসু, তার খবর কী?’
‘চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর আরশি বসু আর বাড়ি থেকে বেরোয়নি। কেউ দেখাও করতে আসেনি ওর সঙ্গে।’
আচমকা উত্তেজিত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন অমরনাথ পটেল। বললেন, ‘শিবানী কুইক, এক্ষুনি কলকাতায় ফোন করে খবর নাও কাল রাতে সায়ন্তন মুখার্জির বাড়িতে কোনো ব্রেক ইন হয়েছে কি না। আমার হিসেব ঠিক হলে আজ কেউ আরশি বসুর সঙ্গে দেখা করতে আসবে। আমাদের টিম এক মুহূর্তের জন্য যেন ওই দু-জনের বাড়ি থেকে চোখ না সরায়!’
শিবানী পাণ্ডে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, ফিরে এল পনেরো মিনিট পরে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘ইউ আর অ্যাবসোলিউটলি রাইট, স্যার। কাল রাতে কেউ সায়ন্তন মুখার্জির বাড়িতে ঢুকেছিল। ওখানে একদল বানজারা ক-দিন হল আস্তানা গেড়ে বসেছিল, আজ সকাল থেকে তাদের দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে তাদের কাজ।’
‘আরশি বসুর বাড়ির খবর পেয়েছ? মেয়েটা বেরিয়েছিল? কোনো ভিজিটর এসেছে ওর কাছে?’
‘হ্যাঁ, স্যার। সকালে ওর বাড়িতে মেয়েটার একজন কলিগ দেখা করতে এসেছিল। মেয়েটার নাম পেখম মৈত্র, ক্যালকাটা পোস্টের এন্টারটেনমেন্ট রিপোর্টার। এক ঘণ্টা থেকে চলে গেছে।’
‘ওহ, শিট,’ হাতের তালুতে সজোরে ঘুসি মেরে মনে মনে নিজেকে গালি দিলেন অমরনাথ, ‘আমরা যা ভেবেছিলাম এই মেয়েটা তার চেয়ে অনেক বেশি স্মার্ট, শিবানী। আমাদের চোখের সামনে থেকে জিনিসটা নিয়ে বেরিয়ে গেছে, আমরা বুঝতেও পারলাম না—’
‘কী বলছেন স্যার, কিছুই তো বুঝতে পারছি না!’ বিস্মিত কণ্ঠে বলল শিবানী।
‘মেয়েটার ফোনে সায়ন্তন মুখার্জির পাঠানো সেই মেসেজটা মনে আছে “যেখানে তোর সঙ্গে আমার সুর এসে মিশেছিল একদিন সেখানে লুকোনো রইল আমার কথা। পারলে খুঁজে নিস”?’
‘হ্যাঁ, স্যার—’
‘আমাদের টিম যখন ভিগনেশ শর্মার পেছনে সারা কলকাতা ছুটে বেরিয়েছে সেই সময় আরশি বসু লোক লাগিয়ে সায়ন্তন মুখার্জির বাড়িতে ঢুকে সেই জিনিসটা বের করে এনেছে। সকালে ওর যে কলিগ এসেছিল, নির্ঘাত তার হাত দিয়ে জিনিসটা ডেলিভারি হল।’
‘দু-জনকে তুলতে বলব, স্যার?’ শিবানী পাণ্ডে উত্তেজিত হয়ে পড়ল।
‘কোর্টের দাবড়ানি এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে শিবানী,’ ম্লান হাসি হাসলেন অমরনাথ, ‘দু-জনকে তুলবে কীসের ভিত্তিতে? সায়ন্তন মুখার্জির বাড়িতে তালা ভেঙে আরশি বসু লোক ঢুকিয়েছে প্রমাণ করতে পারবে? ওর যে কলিগ দেখা করতে এসেছিল তার বিরুদ্ধে আমাদের অ্যালিগেশন কী, তাকে তোলা হবে কোন যুক্তিতে?’
‘স্যার, ভিগনেশ শর্মাকে কিন্তু তোলা যায়, ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে যখন—’
‘নাহ্, যায় না,’ অমরনাথ বললেন, ‘ওর আগেকার অপরাধের সঙ্গে এখনকার ঘটনার যোগাযোগ নেই। আদালতকে কী বলব আমরা? কেউ সারারাত উদ্দেশ্যহীনভাবে গাড়ি চালিয়ে রাস্তায় ঘুরেছে এই গ্রাউন্ডে কাউকে অ্যারেস্ট করা যায় না। আমাকে ভাবতে দাও একটু।’
