জাহান্নমের সওদাগর – ১৬

কাঠমান্ডু, নেপাল।

দশদিন হতে চলল হোটেলে চুপচাপ বসে ভিক্টর বোগদান। একেবারে চুপচাপ নয় অবশ্য, রোজ সন্ধের দিকে একবার নিয়ম করে বাইরে বেরিয়ে ইন্টারনেট কাফে থেকে ইসলামাবাদে ফোন করতে হয় তাকে। কিন্তু প্রায় রোজ একই জবাব শুনতে শুনতে ভিক্টর বিরক্ত। অপেক্ষা করতে হবে। ইন্ডিয়া থেকে লাইন ক্লিয়ার না পেলে তাকে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। কবে লাইন ক্লিয়ার পাওয়া যাবে কে জানে, সেজন্য ভিক্টর মনে মনে বিরক্ত। কিছুটা ভয়ও করছে।

ভিক্টর জানে যে কাজের জন্য সে কাঠমান্ডুতে এসেছে, সেই কাজে এক জায়গায় বেশিদিন বসে থাকতে নেই। তাতে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। লোকের চোখে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা প্রবল। এর মধ্যে তাকে ঘিরে লোকজনের কৌতূহল বাড়তে শুরু করেছে, ভিক্টরের তা অজানা নয়। কিন্তু ভিক্টর পালিয়ে চলে যেতে পারছে না স্রেফ অ্যাটাচিগুলোর জন্য!

কী আছে অ্যাটাচিতে কে জানে! ভিক্টর যেদিন কাঠমান্ডু পৌঁছোল তার দু-দিন বাদে হোটেলে এসে হাজির লজিস্টিকস কোম্পানির প্রতিনিধি। পাঁচশো পিস লেদার অ্যাটাচির একটা কনসাইনমেন্ট ইস্তানবুল থেকে এসেছে তার নামে। কোথায় ডেলিভারি হবে জিনিসগুলো জানতে চায় কোম্পানির লোক।

হকচকিয়ে গেল ভিক্টর বোগদান। তার কাছে পাঁচশো দূরের কথা, একটা ব্রিফকেসও আসার কথা নয়। কিন্তু নাম এবং হোটেলের ঠিকানা মিলিয়ে দেখা গেল ভিক্টরের কাছেই সেগুলো পাঠানো হয়েছে। গভীর সংকটে পড়ে গেল সে! জিনিসগুলো তার হতেই পারে না সেকথা কেউ বিশ্বাস করছে না। ভিক্টর যত অস্বীকার করছে লজিস্টিকস কোম্পানির প্রতিনিধি তত বেশি সন্দিহান হয়ে উঠেছেন। এদিকে হোটেলের ম্যানেজার এবং অন্য কর্মচারীরাও তাকে চোরাকারবারি হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। হঠাৎ একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় ঝিলিক দিল তার।

নেপালে এসে পৌঁছোনোর পর হয়তো পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়েছে, কিন্তু সেকথা তাকে কেউ জানাতে ভুলে গেছে। অ্যাটাচিগুলো সম্ভবত তার রিক্রুটারের পাঠানো, সুতরাং দু-চারদিন বাদে লোক এসে ঠিক নিয়ে যাবে। কনসাইনমেন্ট এসেছে ইস্তানবুল থেকে, সুতরাং ঘটনাটা তা-ই হবে, কারণ ইস্তানবুলেই চীনা সিক্রেট সার্ভিসের রিক্রুটার মাইকেল তাকে ভারতে আসার প্রস্তাব দিয়েছিল।

অতএব কথা না বাড়িয়ে কাগজপত্রে সই করে অ্যাটাচি রিসিভ করে নিল ভিক্টর। কিন্তু সমস্যা হল রাখবে কোথায় এত বাক্স? হোটেলের ম্যানেজারকে সে এক আজগুবি কাহিনি শুনিয়ে বলল, তার এক বন্ধু চামড়ার জিনিসের ব্যাবসা করে, সে খবর পাঠিয়েছে এসব অ্যাটাচি তার জিনিস। এখানে একটা বড়ো অর্ডার আছে। ভিক্টর কাঠমান্ডুতে এসেছে জেনে তার নামে পাঠিয়েছে, বন্ধু নিজে কয়েকদিনের মধ্যেই এসে যাবে। এই ক-দিন জিনিসগুলো রাখার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। গল্পে প্রচুর জল ছিল, কিন্তু ম্যানেজার সেদিকে না গিয়ে জানাল, বেসমেন্টের গুদামে আপাতত এগুলো রাখা যেতে পারে। কিন্তু মালিকের অনুমতি ছাড়া কাজটা হচ্ছে বলে প্রত্যেক দিন নগদে পঞ্চাশ ডলার করে দিতে হবে, টাকা বাকি রাখা যাবে না। উপায়ান্তর না পেয়ে ভিক্টর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।

কিন্তু ঝামেলাটা বাধল ইসলামাবাদে ফোন করার পর। মির্জা তবরেজ বেগ স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, অ্যাটাচির ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। ওটা বেজিংয়ের সঙ্গে বুঝে নিতে হবে। ভিক্টর ফোন করল মাইকেলকে। মাইকেল বলল, হেডকোয়ার্টার থেকে জেনে বলবে। এরপর ফের মাইকেলকে ফোন করে এক আক্কেলগুড়ুম করা খবর পেল ভিক্টর বোগদান। পুরো অপারেশনের মাথা জেনারেল ওয়াং দেমিন আচমকা নিজের সার্ভিস রিভলভারের গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। নতুন লোক এসেছেন অপারেশনের দায়িত্বে। তিনি আলোচনা করবেন মির্জা তবরেজ বেগের সঙ্গে, তারপর যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভিক্টর বোগদান প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট হয়ে বলল, একাজে এমন জটিলতা সৃষ্টি হবে জানলে সে কাজ হাতে নিত না। তা ছাড়া, হোটেলের ম্যানেজার সুযোগ বুঝে বিশাল টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। প্রতিদিন পঞ্চাশ ডলার গুঁজে দিতে হচ্ছে তার হাতে! মাইকেল তাকে শান্তভাবে বোঝাল, এরকম বড়ো কাজে একটু-আধটু এদিক-ওদিক হয়েই যায়, সেটুকু মানিয়ে না নিলে এখন সবারই অসুবিধে। তবে টাকা নিয়ে ভাবতে হবে না, আজই ভিক্টরের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেদিনই ভিক্টরের ব্যাঙ্কে পাঁচ হাজার ডলার জমা পড়ল, ভাড়া ছাড়াও তার হয়রানির খেসারত।

 তবে টাকার চেয়েও প্রাণের মায়া বেশি। ইদানীং তার দিকে হোটেলের লোকজনের চোরাচাউনি বেড়ে গেছে। একজন টুরিস্ট গাদাগুচ্ছের টাকা দিয়ে বন্ধুর অর্ডারি মাল আগলাচ্ছে এই গল্প বিশ্বাস করার মানুষ আর নেই। কিন্তু এখন অ্যাটাচি ফেলে হোটেল ছেড়ে পালিয়ে গেলে নির্ঘাত এরা পুলিশে খবর দেবে, বাক্স থেকে সাপব্যাং কী বেরোবে জানা নেই, মাঝখান থেকে ভিক্টরকে জেল খাটতে হবে।

পুলিশ এবং আইন-আদালতকে সমঝে চলে ভিক্টর। কিন্তু কী আশ্চর্য, ঘুরে-ফিরে তার সঙ্গে বার বার আইনরক্ষকদের সংঘাত বেধে যায়!

ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল আমেরিকায়, রিসার্চ স্কলার হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে কাজ করার সময়। প্রায় বিশ বছর আগের ঘটনা। তখন ভিক্টর অল্প দিন হল বুখারেস্ট-এর কলেজে অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে আমেরিকায় এসেছে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চের জন্য। মাত্র কিছুদিনের মধ্যে সে বুঝে গেছিল রিসার্চ শেষ করে আমেরিকায় চাকরি করার চেয়ে অনেক সহজে বিপুল অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনা আছে জীবাণু গবেষণা থেকে।

আমেরিকার বিরুদ্ধে ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী জিহাদের ডাক দিয়েছে। তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে পরমাণু বা জীবাণু অস্ত্র। ভিক্টর দেখেছিল গবেষক, বিজ্ঞানী বা ওষুধ কোম্পানি সিয়াটলের ভিডব্লিউআর সায়েন্টিফিক এবং ভার্জিনিয়ার আমেরিকান টাইপ কালচার কালেকশন এ দুটো জীবাণু লাইব্রেরি থেকে জীবাণু সংগ্রহ করতে পারে। ভিক্টর দুটো সংস্থা থেকে কয়েক দফায় মাইক্রোব্যাকটিরিয়াম টিউবারকিউলোসিস এবং স্যালমোনেলা টাইফিমিউরিয়াম জোগাড় করতে পেরেছিল। অনলাইন বাজারে বেনামে চড়া দামে সেগুলো জার্মানির এক ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাকে বিক্রি করে দেয় সে। কিন্তু তার পরিচয় বেশিদিন গোপন থাকেনি। এবার ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে বলে তাদের অ্যানথ্রাক্স বা স্মলপক্স ভাইরাস চাই। জোগাড় করে না দিলে ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষকে তার কীর্তির কথা ফাঁস করে দেওয়া হবে। তবে ভাইরাস জোগাড় করে দিলে তাকে দেওয়া হবে মোটা ইনাম। ভিক্টর বুঝতে পারে ওষুধ কোম্পানির আড়ালে অন্য কেউ রয়েছে, ক্রেতা প্রকৃত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি হলে এভাবে হুমকি দিত না। কিন্তু তখন আর তার পিছিয়ে আসার উপায় ছিল না।

স্মলপক্স ভাইরাস চেয়ে জীবাণু লাইব্রেরির সঙ্গে যোগাযোগ করার সঙ্গেসঙ্গে টনক নড়ে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিশ্বের মাত্র কয়েকটা সংস্থার কাছে স্মলপক্স জীবাণু রাখা আছে। সেই ভাইরাস চাইলেই পাওয়া যায় না। তলব পেয়ে এফবিআই এসে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল ভিক্টর বোগদানকে। টানা বাহাত্তর ঘণ্টা ধরে জেরা করা হল। ভিক্টর আদালতে সামান্য হলেও বেনিফিট অফ ডাউট পেয়েছিল। কারণ সে জীবাণু বেচেছে জার্মান সংস্থার কাছে যারা আমেরিকার ন্যাটো জোটের সদস্য, সেইসূত্রে বন্ধু দেশ। সেই ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার পেছনে কারা আছে তার হদিশ এফবিআই পায়নি। ভিক্টরের দুর্বলতার সুযোগে ভয় দেখিয়ে একটা অনামি ওষুধ কোম্পানি আমেরিকা থেকে স্মলপক্সের ভাইরাস আমদানি করতে চেয়েছিল, এমনটাই তাদের মনে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও দু-বছর জেল খাটতে হয় ভিক্টরকে।

জেল থেকে খালাস পাওয়ার পর ভিক্টর বুঝল জার্মানির সেই সংস্থার অস্তিত্ব খাতায়-কলমে, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। সাইপ্রাসের এক সংস্থার নামে রয়েছে কোম্পানির মালিকানা। সাইপ্রাসের সেই সংস্থা আবার পাকিস্তানি ব্যবসায়ী মহম্মদ ইখলাখ হুসেন নামে এক ব্যক্তির। এই লোকটার পেছনে আছে আল কায়দা জঙ্গিগোষ্ঠী। এসব জেনে অবশ্য ভিক্টরের আর কোনো লাভ ছিল না, ততদিনে তার পুরোনো জীবন পালটে গেছে। আমেরিকা তাকে বহিষ্কার করল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কালো তালিকায় উঠে গেল তার নাম, বিশ্বের বহু দেশে তার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা রইল না। কিন্তু বিদেশের বেশ কিছু জঙ্গিগোষ্ঠী এবং দেশ আড়ালে থেকে তার খবর রাখছিল। ইরাক তাকে ডেকে নিল জীবাণু অস্ত্র নির্মাণ প্রকল্পে। এরপর ভিক্টর গেল সিরিয়ায়। কিছুদিন ইসলামিক স্টেটের হয়ে কাজ করার পর হামাস জঙ্গিরা তাকে লেবাননে আমন্ত্রণ জানাল। লেবানন থেকে ইরানে গিয়ে কিছু সময় কাটানোর পর তুরস্কে এসে পৌঁছোয় ভিক্টর। এখানে চীনের গুপ্তচর বাহিনী তাকে কাজ করার প্রস্তাব দেয়।

ভিক্টর যেসব দেশে কাজ করে এসেছে সেগুলোর সবগুলো যুদ্ধবাজ দেশ। সবসময় সেখানে অস্থিরতা, বোমা-গুলি চলছে, আকাশে চক্কর কাটছে বোমারু বিমান। প্রচুর টাকা, কিন্তু জীবনের ঝুঁকি মারাত্মক। বেশিরভাগ দেশ বোঝে না জীবাণু অস্ত্রর খুব বেশি উপযোগিতা আদৌ নেই। নির্বোধের মতো টাকা ঢালে তারা। একসময় হতোদ্যম হয়ে হাল ছেড়ে দেয়।

সেদিক থেকে চীনের প্রস্তাব ছিল অভিনব। কোনো গবেষণা বা কনসালটেন্সি নয়, তারা ভিক্টর বোগদানকে অন্য কাজে ব্যবহার করতে চায়। এক ভারতীয় বিজ্ঞানীকে জেরা করে তাঁর কাজ সম্পর্কে নিখুঁত খবর দিতে হবে। মাইকেল বলেছিল, নিজের পাসপোর্ট ব্যবহার করে যেতে হবে নেপাল, সেখানে পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স তাকে ভারতে ঢোকানোর ব্যবস্থা করবে। ভারত-নেপাল সীমান্ত হল ওপেন বর্ডার, এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে অসুবিধে নেই। ভিক্টর বুঝেছিল, চীনের পরিকল্পনা হলেও চীন নিজে সরাসরি যুক্ত থাকতে চায় না কাজটার সঙ্গে। অবশ্য তাতে তার অসুবিধে নেই, বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী এবং গুপ্তচর সংস্থার কাজকর্ম দেখে তার ধারণা হয়েছে এসব বোঝার চেষ্টা করে লাভ নেই। নিজের কাজ গুছিয়ে ডলার নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারলেই মোক্ষ!

কাঠমান্ডুতে এসে ভিক্টরের সব কিছু কিন্তু গোলমেলে লাগছিল। কেউ কিছু বলতে পারছে না, কোনো কাজ করতে হচ্ছে না, এভাবে বসে বসে সময় কাটানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। তার মধ্যে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে কতকগুলো অ্যাটাচি। এখনও পরিষ্কার হল না সত্যি সত্যি কে পাঠিয়েছে জিনিসগুলো। ভিক্টর ঘরে চুপচাপ বসে ভাবছিল আরেকটু পরে বেরিয়ে ইন্টারনেট কাফে থেকে মাইকেল এবং মির্জা তবরেজ বেগকে ফোন করে জানিয়ে দেবে আগামীকালের মধ্যে তাকে এই ঝামেলা থেকে উদ্ধার না করলে সে কাঠমান্ডু থেকে ফিরে যাবে। ঠিক এমন সময় তার রুমের ফোন বাজল।

ভিক্টর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। হোটেলের বাইরে গিয়ে ফোন করে। তাকে ফোন করার মতো কেউ নেই। তাহলে কে ফোন করল? ভাবতে ভাবতে ফোন তুলল সে। রিসেপশন থেকে জানাল বাইরে থেকে ফোন এসেছে, কল ফরোয়ার্ড করা হচ্ছে তাকে।

‘ডক্টর ভিক্টর বোগদান?’ একটা ভারী গলা জানতে চাইল।

‘ইয়েস, ভিক্টর হিয়ার। হু ইজ দিস?’

‘ডক্টর বোগদান, আজ রাতে আমরা ইন্ডিয়ায় রওনা হব। রুট ইজ ক্লিয়ার নাউ। গাড়িতে অনেকটা জার্নি করতে হবে, আপনি সেজন্য ডিনার করে রেডি হয়ে থাকবেন। রাত সাড়ে ন-টায় আপনি ঠমেলের সুইস বেকারির সামনে চলে আসুন। কোড ইজ “ডু ইউ হ্যাভ আ লাইটার”, মনে রাখবেন আপনার রেসপন্স হবে “সরি, আই ডোন্ট স্মোক”। ক্লিয়ার?’

‘ক্লিয়ার। কিন্তু ঠমেলের সুইস বেকারি কোথায় আমি জানি না। এই সিটিতে একটা বিরাট এলাকার নাম ঠমেল, আমার রাস্তাঘাট গুলিয়ে যায়।’

‘ওকে, প্লিজ রাইট ডাউন দ্য ডিরেকশন। আপনি হোটেল থেকে বেরিয়ে বাঁ-দিকের রাস্তা ধরবেন। দু-শো মিটার গিয়ে দেখবেন রাস্তা দু-দিকে ভাগ হয়ে চলে গেছে। আপনি আবার বাঁ-দিকের রাস্তা ধরবেন। প্রথমে একটা লিকার শপ, তারপর দর্জির দোকান, তার পাশে কস্টিউম জুয়েলারির দোকান। এই দোকানের সামনে থেকে রাস্তা পার হয়ে উলটোদিকে যাবেন। একটা এটিএম, তার পাশে পেট্রোল স্টেশন। সেখানে আমি থাকব—’

লিখতে লিখতে ভিক্টর বলল, ‘ঠিক আছে, আমি পৌঁছে যাব। কিন্তু অ্যাটাচিগুলোর কী হবে?’

‘হোটেলেই থাকুক। আমরা কালেক্ট করে নেব। কিন্তু আপনি রিসেপশনে বলবেন না চলে যাচ্ছেন।’

ফোন রেখে দিয়ে ভিক্টর তাড়াতাড়ি নিজের জিনিস গুছিয়ে নিল। তার সঙ্গে একটা ছোটো স্ট্রলি সুটকেস রয়েছে। কিন্তু সেটা নিয়ে বেরোতে গেলে সবাই বুঝবে সে চলে যাচ্ছে। সুটকেস থেকে একটা বড়ো প্লাস্টিকের ব্যাগ বের করে তাতে সব জিনিস ঠেসে ঢুকিয়ে নিল ভিক্টর। রুম সার্ভিসে ডিনার আনিয়ে খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ বিছানায় টান হয়ে শুয়ে থাকল সে। অনেকটা রাস্তা যেতে হবে, একটু বিশ্রাম দরকার।

রাত সোয়া ন-টা নাগাদ ব্যাগ নিয়ে বেরোবার জন্য তৈরি হল ভিক্টর। হোটেলের ম্যানেজার তার হাতের ব্যাগ দেখে জানতে চাইল, এত রাতে ভিক্টর কোথায় যাচ্ছে এই বিশাল ব্যাগ নিয়ে। ভিক্টর মুচকি হেসে জবাব দিল, ‘লন্ড্রি।’ ম্যানেজার একটু বিমর্ষ হয়ে বলল, ‘হোটেলেও তো লন্ড্রি সার্ভিস ছিল, স্যার।’ উত্তরে ‘আই সি, নেক্সট টাইম দেন’ বলে বেরিয়ে এসে নির্দেশমাফিক হাঁটা শুরু করল সে। দশ মিনিটের কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে গিয়ে দেখল একটা জাপানি হাইস মিনি ভ্যান অপেক্ষা করছে। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একজন মাঝবয়সি ব্যক্তি।

ভিক্টরকে আসতে দেখে লোকটি জিজ্ঞেস করল, ‘ডু ইউ হ্যাভ আ লাইটার?’

‘সরি, আই ডোন্ট স্মোক।’ ভিক্টর বলল।

লোকটি হাত বাড়িয়ে দিল, ‘ওয়েলকাম, ডক্টর বোগদান। আমি আসিফ। আসিফ ইকবাল।’

‘গ্ল্যাড টু মিট ইউ, স্যার।’ ভিক্টর উত্তর দিল।

গাড়িতে উঠে ভিক্টর দেখল ভেতরে চালক ছাড়াও আরেক ব্যক্তি রয়েছে। এই লোকটিও অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ভিক্টরকে অভ্যর্থনা করল। ‘আমার নাম জাহির আব্বাস।’ সে পরিচয় দিল। ভিক্টর উঠে বসার সঙ্গেসঙ্গে গাড়ি ছেড়ে দিল। দারুণ গাড়ি, এত দ্রুত ছুটে চলেছে, কিন্তু কোনো ঝাঁকুনি টের পাওয়া যাচ্ছে না।

‘আপনি ওই ইন্ডিয়ান সায়েন্টিস্টের কাছ থেকে সব খবর বের করতে পারবেন তো?’ আসিফ জানতে চাইল।

‘আমি ডেফিনিটলি চেষ্টা করব সব কিছু টেনে বের করতে। কিন্তু যদি কোঅপারেট না করে তাহলে আপনাদের হাত লাগাতে হবে, মারধরের ব্যাপারটা আমার আসে না।’

‘সে-ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, কীভাবে কথা বের করতে হয় আমরা জানি। আপনি শুধু টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো বুঝিয়ে দেবেন আমাদের।’

‘আচ্ছা, ওই ভদ্রলোকের কথা রেকর্ড করে যদি আপনারা বেজিংয়ে পাঠিয়ে দিতেন তবে তো এত ঝামেলা করার দরকার হত না, তাই না?’

‘না, হত না, মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ না পেলে অসুবিধে বিস্তর। কিছু একটা ব্যাপার বলত যা আমরা বুঝতে পারতাম না, তখন আবার লোকটাকে দিয়ে বলাতে হত।’

‘তা ঠিক।’ ভিক্টর বলল, ‘লোকটাকে কোথায় রাখা হয়েছে?’

‘আমরা জানি না, ওই ব্যাপারটা আবার অন্য লোক দেখছে। আপনি গেলেই সব বুঝতে পারবেন।’

বেশ কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। তারপর ভিক্টর বলল, ‘এখান থেকে ইন্ডিয়ার বর্ডার কত দূর?’

‘প্রায় আট ঘণ্টার পথ। কাঠমান্ডুর সবচেয়ে কাছের ভারতীয় সীমান্ত হল বীরগঞ্জ। আপনি চাইলে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন, কাল কিন্তু আপনার অনেক কাজ।’

‘একটু জল পাওয়া যাবে?’ ভিক্টর বলল।

‘শিয়োর। আসিফ, ওয়াটার প্লিজ।’

ফ্লাস্ক থেকে কাগজের গ্লাসে জল ঢেলে দিল আসিফ নামে লোকটি। জল পান করার কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুমে চোখের পাতা ভারী হয়ে এল ভিক্টরের। জলে কি কিছু মেশানো ছিল? ভিক্টর লক্ষ করল তার হাত-পা ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে, কথা বলতে গিয়ে টের পেল মুখ অবশ হয়ে গেছে। বেশি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভিক্টর সিটের ওপর এলিয়ে পড়ল।

রোদের তাপে যখন ভিক্টরের ঘুম ভাঙল, তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। ধড়মড়িয়ে সিটে উঠে বসে ভিক্টর দেখল গাড়ি বদলে গেছে, সেই সুন্দর হাইস মিনি ভ্যান আর নেই, একটা পুরোনো এসইউভি গাড়িতে চেপে চলেছে তারা। এয়ার কন্ডিশন কাজ করছে না কিংবা বন্ধ, খোলা জানলা দিয়ে রোদ এসে পড়েছে তার মুখের ওপর। বাইরে তাকিয়ে সে দেখল ধুলোমাখা ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে। গাড়িতে আসিফ এবং জাহির ছাড়া আরেকজন ব্যক্তি রয়েছে।

‘ঘুম হল ডক্টর বোগদান?’ জাহির নামে লোকটি হাসি হাসি মুখে জানতে চাইল।

‘জলে কী মিশিয়েছিলেন?’ ভিক্টর কড়া গলায় পালটা প্রশ্ন করল।

‘রিল্যাক্স ডক্টর বোগদান, উত্তেজিত হবেন না, তাতে শরীরের ক্ষতি হবে।’ লোকটি সেইরকম হাসি হাসি মুখে উত্তর দিল, ‘আমরা অনেকক্ষণ ভারতে ঢুকে পড়েছি, আর কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাব। তখন সব প্রশ্নের জবাব পাবেন।’

‘আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?’ ভিক্টর ফের প্রশ্ন করল।

‘আপনি ক্রিকেট দেখেন ডক্টর বোগদান?’ হঠাৎই আসিফ বলে উঠল।

‘না না, রোমানিয়া বিশ্বকাপে ফুটবল খেলে, কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে ওদেশে আগ্রহ নেই। সেজন্যই তো একটু রসিকতা করা গেল ডক্টর বোগদানের সঙ্গে!’ জাহির বলল।

কী সব অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা! মাথায় ঢুকছে না ভিক্টরের। ক্রিকেট-ফুটবল নিয়ে কথা উঠছে কেন? সে একটু অবাক হয়ে জাহিরের দিকে তাকাল।

‘কি ডক্টর বোগদান, কনফিউজড? আরে, কনফিউশনের কী আছে! রোমানিয়া ক্রিকেট খেললে আপনার জানা থাকত আসিফ ইকবাল এবং জাহির আব্বাস দু-জনেই প্রাক্তন পাকিস্তানি ক্রিকেটার।’ জাহির বলল, ‘আমাদের যেরকম টাফ লাইফ তাতে হাসিঠাট্টার অবকাশ নেই। এই সুযোগে আপনার সঙ্গে একটু মজা করে নিলাম।’

‘আপনারা কারা?’ বিস্মিত ভিক্টর জানতে চাইল।

‘আমি রতন মিশ্র, জয়েন্ট ডিরেক্টর অফ রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং।’ জাহির আব্বাস নামে লোকটি হঠাৎ খুব গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আপনার যা পেশা তাতে আপনি অবশ্যই র-এর নাম শুনেছেন ডক্টর বোগদান, ঠিক কিনা? আপনি আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করলে আপনার লাভ, বুঝবেন নিশ্চয়ই।’

ভিক্টর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরকম পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়েনি সে। যারা তাকে নিয়োগ করেছে, তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে ভয়ংকর বিপদে পড়ে গেছে ভিক্টর।

‘আমাকে এভাবে ধরে নিয়ে এলেন কেন? আমি ভারতের মাটিতে কোনো অপরাধ করিনি, আইন ভাঙিনি।’

‘এত অভিজ্ঞ মানুষ হয়ে এমন কাঁচা কথা বলে লোক হাসাবেন না, ডক্টর বোগদান। ইউ আর ওয়ার্কিং ফর দ্য এনিমি স্টেটস অফ আওয়ার কান্ট্রি হুইচ ইজ ট্যান্টামাউন্ট টু ডিক্লেয়ার ওয়ার আগেনস্ট ইন্ডিয়া। আপনি অপরাধ করেননি, কিন্তু মারাত্মক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। চক্রান্তে শামিল থাকা কিন্তু যথেষ্ট গুরুতর অপরাধ।’

মাথা নীচু করে বসে রইল ভিক্টর বোগদান। আরও মিনিট দশেক চলার পরে গাড়ি এসে থামল একটা বাড়ির সামনে। ভিক্টরকে নিয়ে সেই বাড়িতে ঢুকল সবাই।

 বৈশিষ্ট্যহীন একটা তিনতলা বাড়ি। গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে দোতলার একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হল ভিক্টরকে। ইতিমধ্যে ব্যাগ নিয়ে নেওয়া হয়েছে তার কাছ থেকে। ঘরের দেওয়ালে সাউন্ডপ্রুফ প্যাড লাগানো। এক পাশে অনেকগুলো কম্পিউটার, প্রচুর সুইচের প্যানেল, নানারকম আলো জ্বলছে-নিভছে। সামনে বসে কাজ করছে কয়েকজন লোক। রতন মিশ্র এবং অন্যরা ঘরে ঢুকতে সবাই উঠে দাঁড়াল। এক যুবক বাদে বাকিদের ঘরের বাইরে চলে যেতে বললেন রতন মিশ্র। ভিক্টরকে বসানো হল একটা চেয়ারে, তার দু-পাশে বসল গাড়ির বাকি দু-জন আরোহী।

রতন মিশ্র ভিক্টরকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই বুঝেছেন ডক্টর বোগদান, আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। আপনি চীন এবং পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থার হয়ে ভারতের ক্ষতি করার ষড়যন্ত্রে শামিল হয়েছেন, এর ফলে আপনার ফাঁসি পর্যন্ত হতে পারে। আপনার শাস্তি কতটা কম হবে সেটা নির্ভর করবে আপনি তদন্তে কতটা সহযোগিতা করেন তার ওপর।’

‘আপনারা কী জানতে চাইছেন?’ ভিক্টর প্রশ্ন করল।

‘ডক্টর সায়ন্তন মুখার্জি এখন কোথায়?’

‘আমি জানি না।’

‘আপনি জানেন না তা আমরা জানি। কিন্তু আপনাকে সেটা জেনে আমাদের বলতে হবে।’

‘কীভাবে জানব?’ ভিক্টর বলল।

‘আপনি ইসলামাবাদে মির্জা তবরেজ বেগকে ফোন করুন এখান থেকে। বলুন, আপনি ভারতে এসে পৌঁছেছেন নিজের উদ্যোগে। এবার ডক্টর সায়ন্তন মুখার্জির সঙ্গে আপনি কাজ মিটিয়ে ফিরে যেতে চান সেকথা বলুন।’

‘অসম্ভব, উনি ধরে ফেলবেন। আমি ভারতের কিছুই চিনি না। তাহলে এখানে কীভাবে আসব! তা ছাড়া আমার ভারতে আসার ভিসাও নেই।’ ভিক্টর মরিয়াভাবে বলল।

‘জানি। আপনি বলুন, কাল রাতে হোটেলে অ্যাটাচিগুলোর জন্য নেপালি পুলিশ রেড করেছে, তাই আপনি ভয়ে পালিয়ে এসেছেন।’

‘কিন্তু ওরা জেনে যাবে কোনো রেড হয়নি।’

‘হয়েছে, আপনি বেরিয়ে আসার পর। ক্রস চেক করলেও তবরেজ বেগ একই খবর পাবে।’

এরপর আধ ঘণ্টা পাখি-পড়া করে ভিক্টরকে শেখানো হল ফোনে কী কী বলতে হবে মির্জা তবরেজ বেগকে। বেশ কয়েক দফা মহড়ার পর রতন মিশ্র যে যুবককে ঘরে থেকে যেতে বলেছিলেন সে মির্জা বেগের নাম্বার ডায়াল করল।

প্রথম বার তিনেক পুরো রিং হয়ে ফোন কেটে গেল, তবরেজ বেগ ফোন ধরলেন না। এটাই স্বাভাবিক, ভারতের এক অচেনা নাম্বার থেকে তাঁকে ফোন করা হয়েছে, এই নাম্বার কার এসব না জেনে তিনি কল রিসিভ করবেন না।

একটু পরে অন্য একটা নাম্বার থেকে রিং ব্যাক করলেন মির্জা তবরেজ বেগ। জানতে চাইলেন কে ফোন করেছিলেন তাঁকে। সেই ছেলেটি ফোন ধরে হিন্দিতে বলল, ‘এটা রক্সৌলের ওরিয়েন্টাল হোটেল, এক সাহেব এসেছেন কাঠমান্ডু থেকে একটু আগে, তিনি কথা বলতে চাইছেন।’

‘নাম কী?’

‘ভিক্টর বোগদান স্যার, ফ্রম রোমানিয়া। কিন্তু পাসপোর্টে ইন্ডিয়ার ভিসা নেই, সেজন্য চেক ইন করানো যাচ্ছে না।’

স্পিকার ফোনে গলার আওয়াজ শুনে বোঝা গেল বিহারের রক্সৌল থেকে ভিক্টর বোগদান কথা বলতে চাইছে জেনে মির্জা তবরেজ বেগ বিস্মিত! ঘটনাটা কী তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন। দু-তিন সেকেন্ড ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, ‘ভিক্টরকে লাইনটা দিন।’

শেখানো তোতাপাখির মতো ভিক্টর বোগদান বলে গেল গতকাল রাত দশটা নাগাদ রয়্যাল নেপাল হলিডেজ হোটেলে পুলিশ হানা দিয়েছে অ্যাটাচিগুলির মধ্যে কী আছে দেখার জন্য। রেড শুরু হতেই ভিক্টর পালিয়েছে, কারণ সবাই তাকে অ্যাটাচির মালিক বলে দেখিয়ে দিয়েছিল। কাছের এক পেট্রোল স্টেশন থেকে একটা ভাড়ার জিপ ছাড়ছিল, সেটা বীরগঞ্জ যাবে, উপায়ান্তর না দেখে ভিক্টর তাতে চেপে চলে এসেছে। এখানে একজন টাঙাওয়ালা তাকে এক হাজার টাকা নিয়ে সীমান্ত পার করিয়ে দিয়েছে। এখন যেন তাকে দ্রুত এখান থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, না হলে তার খুব বিপদ।

রতন মিশ্রর নির্দেশমতো সায়ন্তন মুখার্জির কথা তোলা হল না একবারের জন্যও।

‘স্ট্যান্ড বাই দ্য ফোন, আই’ল বি ব্যাক সুন।’ এটুকু বলে ফোন ছেড়ে দিলেন মির্জা তবরেজ বেগ। রতন মিশ্র বুঝলেন প্রথম ধাক্কায় আইএসআই কর্তা অবিশ্বাস করেননি। তবে এখন নিশ্চয়ই কাঠমান্ডুতে ক্রস চেক করবে। হোটেল থেকে নেপালের পুলিশ সব অ্যাটাচি তুলে নিয়ে গেছে, তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বাক্সগুলোতে সম্ভবত কোনো বিপজ্জনক রোগের জীবাণু আছে, সেগুলোর জন্য যেন পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। হোটেলে যোগাযোগ করলেও জানতে পারবে ভিক্টর পালিয়েছে। সুতরাং সেদিক থেকে সমস্যা নেই।

দশ মিনিট বাদে আবার ফোন করলেন মির্জা তবরেজ বেগ। বললেন, ‘এক্ষুনি বাসিত বলে একজন আপনাকে ফোন করবে। সে আপনার সব ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু বাসিতের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে গেলে আমাকে আর টেলিফোন করবেন না।’

বাসিত বলে একজনের নাম দরিয়াগঞ্জের বাড়ি থেকে পাওয়া গেছে। এক টুকরো কাগজে লেখা ছিল বাসিতকে কত টাকা পেমেন্ট করা হয়েছে। অমরনাথ পটেল সেই খবর জানিয়ে রেখেছেন রতন মিশ্রকে। তিনি ভিক্টরকে নির্দেশ দিলেন বাসিতের সঙ্গে যতক্ষণ পারা যায় কথা চালিয়ে যেতে হবে। ভিক্টর নিঃশব্দে সায় দিল।

চার মিনিট এগারো সেকেন্ডের মাথায় বাসিত ফোন করল। ভিক্টর ফের বলল তার দুরবস্থার কথা এবং তাকে তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করল।

ভিক্টর ফিরে যেতে চায় শুনে বাসিত হাঁ হাঁ করে উঠল। ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ভিক্টরের চিন্তা করার কিছু নেই, সে হোটেলে বলে দিচ্ছে যেন আজকের দিনটা ভিক্টরকে সেখানে থাকতে দেয়। কাল সে এসে ভিক্টরকে নিয়ে যাবে।

‘আমাকে কোথায় যেতে হবে? আমি বাড়ি যেতে চাই।’ ভিক্টর বলল।

‘আরে, যে কাজে এসেছেন সেটা না করেই চলে যাবেন? আমি কাল সকালে এসে আপনাকে নিয়ে আসব।’ বাসিত জানাল।

‘কতদূর যেতে হবে আমাকে, জানেন নিশ্চয়ই আমার ইন্ডিয়ার ভিসা নেই?’

বাসিত আশ্বাস দিল, ‘আমি থাকতে ভয়ের কিছু নেই। এটা এমন কিছু দূর নয়, মেরেকেটে পাঁচশো কিলোমিটার হবে, ঘণ্টা দশেকের পথ।’ জায়গার নাম বাসিত উল্লেখ করল না।

হোটেলওয়ালার ভূমিকায় অভিনয় করা যুবকের কাছে বাসিত তার গেস্টকে আজকের দিনটা হোটেলে রেখে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল। আগামীকাল সে এসে সাহেবকে নিয়ে যাবে। বাসিত কোথা থেকে আসবে যুবক জানতে চাইল। বাসিত জানাল লখনউ থেকে।

বাসিত ফোন ছেড়ে দিতে ছেলেটি উঠে গিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসল। কিছুক্ষণ কাজ করার পর একটা কাগজ রতন মিশ্রর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘সত্যি কথা বলেছে, স্যার। টাওয়ার লোকেশন লখনউ। এই হল ঠিকানা।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *