জাহান্নমের সওদাগর – ১২

ইস্তানবুল, তুরস্ক।

মঙ্গোলিয়া থেকে রওনা হওয়ার পনেরো দিনের মাথায় ইস্তানবুলে এসে পৌঁছোল রুস্তম কারিমভ। এত লম্বা পথ তাকে গাড়িতে একা যেতে হবে ভেবে প্রথমে তার ভয় হয়েছিল। কিন্তু যাত্রা শুরু করার পর রুস্তম টের পেল কী অবিশ্বাস্য এক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সে।

ম্যাপ দেখে যাত্রা শুরু করার আগে রুস্তম বার বার গুনছিল মোট ক-টা দেশ তাকে পার হতে হবে। গুনতে গিয়ে হিসেব বার বার গুলিয়ে যাচ্ছিল। মঙ্গোলিয়া থেকে রওনা দিয়ে তাকে কাজাখস্তান হয়ে কিরঘিজস্তানের মাথা ছুঁয়ে প্রবেশ করতে হবে তার নিজের দেশ উজবেকিস্তানে। সেখান থেকে তুর্কমেনিস্তান পেরিয়ে ইরানে ঢুকে যাবে সে। ইরান-আজারবাইজান সীমান্ত ঘেঁষে তাকে প্রবেশ করতে হবে তুরস্কে। এরপর ইস্তানবুল।

চীনা গুপ্তচর সংস্থা মিনিস্ট্রি ফর স্টেট সিকিউরিটি অবশ্য সবরকম সাহায্য করে গেছে যাতে এই দুরূহ মিশনে রুস্তম সফল হয়। প্রতিটা দেশে প্রবেশ করার পর নির্ধারিত সময়ে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় নম্বরের নতুন গাড়ি। দেওয়া হয়েছে নতুন পরিচয়ের পাসপোর্ট, অন্যান্য কাগজপত্র। যত্ন করে পুরোনো থেকে নতুন গাড়ির লুকোনো কুঠুরিতে ট্রান্সফার করা হয়েছে ভাইরাসের ভায়াল। ভাইরাস যাতে গরমে নষ্ট না হয়ে যায়, সেজন্য আগাগোড়া কোল্ড চেন বজায় রাখা হয়েছে।

গাড়ি চালানোর সময় রুস্তমকে মনে রাখতে হয়েছে কিছুতেই গতি বাড়ানো যাবে না, কারণ ঝাঁকুনিতে ভাইরাসের ভায়াল ভেঙে গেলে কেলেঙ্কারি হবে। কোনো বিস্ফোরণ ঘটবে না, কিছু বোঝাও যাবে না, কিন্তু পরে মহামারি ছড়িয়ে পড়বে ঘটনাস্থলের আশেপাশে। তা ছাড়া, বহুকাল গাড়ি চালায়নি রুস্তম, স্টিয়ারিংয়ের ওপর এখন তার কতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তা সে নিজেই জানে না। এক এক দেশে ট্র্যাফিক আইন আলাদা, রুস্তম যদি অ্যাক্সিডেন্ট করে বা ট্র্যাফিক আইন ভেঙে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, তবে পুরো মিশন কম্প্রোমাইজড হয়ে যাবে।

ভাইরাস যদি রুস্তমকে বহন করে না নিয়ে আসতে হত, তবে সে নিশ্চিন্তে বিমানে সফর করতে পারত। কিন্তু বায়ো-প্রিপারেত প্রোগ্রামে কাজ করার সময় রুস্তম শিখেছে সঙ্গে বেশি জীবাণু থাকলে বিমানে সফর করা উচিত নয়। ধরা পড়ার সম্ভাবনা যেমন বেশি, তেমনই ভয়াবহ হল জীবাণুবাহী বিমান দুর্ঘটনায় পড়লে তার পরিণতি। যেখানে বিমান ভেঙে পড়বে সেখানকার জনপদে সবার অজান্তে ছড়িয়ে যাবে ভয়ংকর সংক্রমণ। মারা যাবে নিরীহ মানুষ।

ইস্তানবুলে রুস্তমের বাড়িওয়ালা মারা গেছেন, তবে তাঁর স্ত্রী জীবিত। তিনি রুস্তমকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে রুস্তম যে বাড়িভাড়ার টাকা নিয়মিত পাঠিয়ে গেছে, সেজন্য প্রচুর ধন্যবাদ দিলেন। তাঁর কথা থেকে রুস্তম বুঝতে পারল উত্তর কোরীয় সিক্রেট সার্ভিসের লোকেরা ভদ্রমহিলাকে নিয়ম করে টাকা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি রুস্তমের ঘরদোর সাফসুতরো করার ব্যবস্থা করেছে। কারণ এক মহিলা নাকি প্রায়ই এসে ঘরদোর পরিষ্কার করে দিয়ে যেত। দুঃখের বিষয় হল, সেই পরিচারিকা মহিলাটি বোবা, কথা বলতে পারে না, সেজন্য বাড়িওয়ালি তার পরিচয় জানতে পারেননি। অবশ্য তাঁর বাড়ি সাফসুতরো থাকছে, এতে তিনি যারপরনাই খুশি!

দু-দিন আগে রুস্তমের এক বন্ধু এসে ঘরে একটা বড়ো দামি রেফ্রিজারেটর রেখে গেছে। ইস্তানবুলে রুস্তমের এত বন্ধু আছে মহিলা জানতেন না। এখনকার দিনে এতজন উপকারী বন্ধু পাওয়া সত্যি খুব ভাগ্যের ব্যাপার। এই লোকটিকে হাতের কাছে পেয়ে বাড়িওয়ালি অনুরোধ করেছিলেন তাঁর খারাপ হয়ে যাওয়া মাইক্রোওয়েভ আভেনটা যদি একটু সারানোর ব্যবস্থা করা যায়। সারানো নয়, রুস্তমের বন্ধু একটা ঝকঝকে নতুন মাইক্রোওয়েভ তাঁকে উপহার দিয়ে গেছে!

শহরে পৌঁছে রুস্তম কারিমভ প্রথমেই বন্ধুর দোকানে ছুটল না। দু-দিন ধরে যতটা পারা যায় পায়ে হেঁটে চারপাশে ঘুরে ঝুঁকির বিষয়গুলো বুঝে নিতে চাইল। চীনারা রুস্তমের হাতে অনেক টাকা দিয়েছে। নাইটক্লাবে গিয়ে বহুদিন পরে প্রাণভরে মদ্যপান করল সে। নাইটক্লাবে এসে একটা ব্যাপার লক্ষ করে রুস্তমের খারাপ লাগল। সব জায়গায় পূর্ব ইউরোপের প্রাক্তন কমিউনিস্ট দেশের মেয়েরা চুটিয়ে দেহব্যাবসা করছে। স্থানীয় লোকজন এদের নাম দিয়েছে ‘নাতাশা’। এরকম একজন নাতাশার সঙ্গে ভাব জমিয়ে তাকে কিছু টাকাপয়সা দিয়ে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর গল্প শুনল সে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর শুধু প্রাক্তন সোভিয়েত স্যাটেলাইট দেশগুলোই সমস্যায় পড়েনি, সমস্যায় পড়েছে কমিউনিস্ট ব্লকের সদস্য সব দেশ। রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া, ইউক্রেন— কেউ ভালো নেই। মন খারাপ হয়ে গেল তার।

তবে শহরের নিরাপত্তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আঁটোসাঁটো। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টিকে নিয়ে ঝামেলা আগেই ছিল, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আল কায়দা এবং অন্যান্য ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সন্ত্রাস। বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসবাদী হামলার সামনে পড়েছে ইস্তানবুল। সেজন্য পুলিশি কড়াকড়ি বেশ ভালোরকম।

তৃতীয় দিন সকালে বাড়ি থেকে বেরোল রুস্তম। গলি থেকে বেরিয়ে ইস্তিকলাল স্ট্রিটে উঠে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল ট্যাক্সিম স্কোয়ারের দিকে। ট্যাক্সিম স্কোয়ারে পৌঁছে রুস্তম দেখল স্টারবাকস-এর একটা নতুন দোকান হয়েছে। টেক অ্যাওয়ে কাউন্টারে এসে সে বলল, ‘সুফুর কাভে।’

‘সুজাক?’

‘ইভেট, বিউয়িক।’

কাগজের বড়ো কাপে ধোঁয়া ওঠা গরম কফি নিয়ে আস্তে আস্তে চুমুক দিতে দিতে চারদিক সতর্কভাবে জরিপ করা শুরু করল রুস্তম কারিমভ। না, তাকে কেউ অনুসরণ করছে বলে মনে হয় না। রুস্তমের বাঁ-হাতে ধরা রয়েছে ভাইরাসের সুটকেস। বন্ধুকে বলা আছে তার দোকানে থার্মোকলের বাক্স এবং ড্রাই আইস জোগাড় করে রাখতে। যতক্ষণ না জীবাণু সুটকেসের ভেতরের এরোসল ডিস্পেনসারে ঢুকে যাচ্ছে, ততক্ষণ একে ঠান্ডা রাখতে হবে। তারপর ভারতে পৌঁছোতে যা সময় লাগবে তাতে কিছু ভাইরাস কার্যকারিতা হারাবে, তবে সত্তর শতাংশ জীবাণু বেঁচে থাকবে। পঞ্চাশ ভাগ অ্যাটাচি যদি ঠিকভাবে কাজ করে তাহলে শুধু ভারত কেন, পুরো বিশ্বকে ধ্বংস করে দেওয়া যাবে। সুতরাং রুস্তমের খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।

ট্যাক্সিম স্কোয়ার থেকে আয়া সোফিয়াগামী রুটের বাতানুকূল ট্রামে উঠল রুস্তম কারিমভ। ট্রাম গ্র্যান্ড বাজারের কাছে আসতে নেমে পড়ল সে। রাস্তা পার হয়ে বাজারে প্রবেশ করার আগে একটা এটিএম থেকে বেশ কিছু লিরা তুলে নিল। ডলার জিনিসটা রুস্তম খুব পছন্দ করে, পকেটে পর্যাপ্ত ডলার থাকলেও সেগুলো হাতছাড়া করতে তার মন সায় দিল না।

ইস্তানবুলের গ্র্যান্ড বাজারের আয়তন, রুস্তম কোথায় যেন একবার শুনেছিল, তেত্রিশ লক্ষ বর্গফুটের বেশি। এত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এলে তার দিক ভুল হয়ে যায়। লোকজনের ধাক্কাধাক্কি যথাসম্ভব এড়িয়ে খানিকটা ভুল রাস্তায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত বন্ধুর দোকানের সামনে এসে পড়ল সে। ফোনে বলা ছিল দোকান ফাঁকা রাখতে, সেজন্য কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে দরজায় ‘ক্লোজড’ লেখা বোর্ড ঝুলিয়ে ইব্রোক্সিম আবদুল্লায়েভ একা বসে কম্পিউটারে হিসেব মেলাচ্ছিল। রুস্তম সামনে এসে দাঁড়াতে মুখ তুলল সে, সঙ্গেসঙ্গে প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে কাউন্টারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে রুস্তমকে জড়িয়ে ধরল।

‘রুস্তম!’

‘ইব্রোক্সিম!’

দুই প্রৌঢ় কিছুক্ষণ গলা জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ইব্রোক্সিম বলল, ‘কোথায় ডুব মেরেছিলিস এতদিন? তোর চেহারা একদম খারাপ হয়ে গেছে!’

রুস্তম হাসল। হাতের সুটকেসটা সন্তর্পণে নামিয়ে রেখে বলল, ‘নানা দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম কাজের ধান্দায়। সেরকম কিছু সুবিধে হল না, তাই ফিরে এলাম।’

ইব্রোক্সিমের বোধ হয় আশেপাশের দোকানে বলা ছিল কাউকে দোকানে ঢুকতে দেখলে চা পাঠাতে। একটি কিশোর দরজা ঠেলে ভেতরে এসে দু-কাপ চা দিয়ে গেল। ইব্রোক্সিম বলল, ‘নে খা, তোর পছন্দের সেই আপেল চা।’

বেগুনি রঙের তরলে চুমুক দিয়ে রুস্তমের বিস্বাদ লাগল। একটু আগে খাওয়া মার্কিন কফির কড়া স্বাদ এখনও জিভে লেগে রয়েছে। তবু বন্ধু অখুশি হবে ভেবে হাসি হাসি মুখে পুরো কাপ শেষ করে সে বলল, ‘আহ্, গ্রেট। পরে আরেকবার খাব। সঙ্গে ইজগারা কোফতে। আচ্ছা, দাম বেড়েছে ওর? লাস্ট যখন খেয়েছিলাম তখন এক প্লেট দশ লিরা নিয়েছিল, মনে আছে।’

‘দাম জিজ্ঞেস করছিস কেন?’ আহত কণ্ঠে ইব্রোক্সিম বলল, ‘দাম নিয়ে ভাবতে হবে না, আমিই সব খাওয়াব, তুই আমার কতদিনের বন্ধু বল তো!’

‘আরে না না, আমি সেজন্য দাম জানতে চাইনি,’ রুস্তম সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল, ‘জিনিসপত্রর দাম এই ক-বছরে কত বেড়েছে তার একটা আন্দাজ চাইছিলাম।’

‘তাহলে বাদ দে, তোর কৌতূহল মেটানোর জন্য অনেক সময় পাবি। এখন বল, তুই এতদিন কোথায় ছিলিস আর কী করছিলিস?’

রুস্তম কারিমভ একটু চিন্তিত হল। বন্ধুকে নিজের পেশা সম্পর্কে কতদূর বলা যায়, এ বিষয়ে অনেক আগে থেকেই ভাবছে সে। কিন্তু জুতসই একটা গল্প খাড়া করতে পারেনি। রুস্তম বোঝে এখন তাকে আর বিজ্ঞানী বলে বিবেচনা করা যায় না। সে এখন পুরোদস্তুর বায়ো-টেররিস্ট। ইব্রোক্সিমকে সত্যি কথা বলে দিলে রুস্তমের মন হালকা হবে অবশ্যই, তবে বন্ধুর তাতে কী প্রতিক্রিয়া হবে তা অনুমান করা কঠিন।

‘আমি উত্তর কোরিয়া আর চীনে ছিলাম এই ক-বছর। ছিলাম বলতে, নিজের ইচ্ছেতে নয়, ওরা আমাকে আটকে রেখেছিল। ওখানে রিসার্চের কাজ করছিলাম।’

ইব্রোক্সিম হাঁ হয়ে গেল, ‘ওরা তোকে কিডন্যাপ করেছিল?’

‘না, কোরিয়ায় আমি নিজেই গেছিলাম রিসার্চের কাজ করতে পারব ভেবে। গিয়ে দেখলাম পুরোটাই ফাঁদ, কিন্তু বেরিয়ে আসার উপায় ছিল না আমার। পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়লে আমাকে হিংস্র ডালকুত্তা দিয়ে খাইয়ে দিত! তাই আমি ঝুঁকি নিইনি। এরপর চীনারা আমাকে কোরিয়ার কাছ থেকে ধার নিল। এখন আমি ওদের হয়ে কাজ করি, ওরাই আমাকে এখানে পাঠিয়েছে।’

রুস্তমের কথার বেশিরভাগ ইব্রোক্সিমের মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। রুস্তম ছেলেবেলা থেকে পড়াশোনায় খুব ভালো, বন্ধুদের মধ্যে সবার আগে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছে। একসময় সে সরকারি গাড়িতে চলাফেরা করত, তাকে ঘিরে রাখত সাদা পোশাকের নিরাপত্তারক্ষী, সবাই বলত এরা নাকি কেজিবি। ইব্রোক্সিম বুঝত, বন্ধু খুব একটা কেউকেটা হয়েছে। তবে বন্ধুদের সঙ্গে তার আচরণের ওপর পদমর্যাদার কোনো প্রভাব যে পড়েনি এই ব্যাপারটা ইব্রোক্সিমের খুব ভালো লাগত।

এরপর ইব্রোক্সিম চলে এল ইস্তানবুলে, ব্যাবসা করবে বলে। তার ব্যাবসাবুদ্ধি বেশ প্রখর। তুর্কি আর উজবেক ভাষার মধ্যে যেহেতু অনেক মিল রয়েছে তাই দ্রুত শিখে নিল স্থানীয় ভাষা। গ্র্যান্ড বাজারে কেনাকাটা করতে এসে একদিন এক ইংরেজ-কন্যার ভারি পছন্দ হয়ে গেল ইব্রোক্সিমকে। ছ-মাসের মধ্যে তাদের বিয়ে হয়ে গেল। তবে ইব্রোক্সিমের সাহেব শ্বশুর শর্ত দিয়েছিলেন তাঁর মেয়ে ইস্তানবুলে গিয়ে থাকবে না, জামাইকে আসতে হবে ব্রিটেনে। রাজি হয়ে গেছিল সে। বড়োলোক শ্বশুর তার ব্যাবসায় প্রচুর মূলধন জোগান দিয়েছে, সেজন্য ব্যাঙ্ক থেকে কোনো ঋণ নিতে হয়নি ইব্রোক্সিমকে। মাঝেমধ্যে লন্ডনে গিয়ে বউকে দেখে আসা, বাচ্চাদের পড়াশোনার খবরাখবর নেওয়া, এ ছাড়া তার বিশেষ সাংসারিক দায়িত্ব নেই। সব কিছু শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে সামলায়।

সব মিলিয়ে সুখে আছে ইব্রোক্সিম, তবে লেখাপড়া কম জানার জন্য রুস্তমের সামনে সে একটু গুটিয়ে থাকে। রুস্তমের কাজকর্ম সম্পর্কে ধারণা করা তার পক্ষে সম্ভব নয় এটা ইব্রোক্সিম মেনে নিয়েছে। রুস্তমকে খুব খুঁটিয়ে প্রশ্ন না করে সে জানতে চাইল, ‘তোর কাজটার ব্যাপারে বল। যেরকম অ্যাটাচি তোর দরকার, সে-জিনিস আমার গোডাউনে মজুত আছে। পাঁচশো পিসের বেশিই হবে। একটা আনিয়ে রেখেছি তোকে দেখাব বলে।’

ইব্রোক্সিম চামড়ার যে অ্যাটাচিটা দেখাল, সেটা যে অত্যন্ত দামি তা বুঝতে রুস্তমের সমস্যা হল না। কিন্তু চামড়ার কোয়ালিটি কেমন সেসব তার দেখার দরকার নেই। সে মনোযোগ দিয়ে দেখল অ্যাটাচির লাইনিং এবং কবজা। দেখেশুনে সে সন্তুষ্ট হল। পেটের সামনের বেল্টের সঙ্গে বাঁধা ট্র্যাভেল পাউচ থেকে একটা নকশা বের করল সে। চীনা সিক্রেট সার্ভিস যদি এ জিনিস আগে হাতে পেয়ে যেত তবে ইস্তানবুলে তারা রুস্তমকে পাঠাত না। রুস্তম তার ঘরের ফলস সিলিংয়ের মধ্যে কাগজটা লুকিয়ে রেখেছিল। ছাদ না ভেঙে চীনারা এই নকশা হাতে পেত না এবং সেক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা আওয়াজে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসতেন। নকশার কাগজটা ইব্রোক্সিমের সামনে মেলে দিল রুস্তম।

খুব সাধারণ নকশা। হাতের আঙুলের মতো একটা সরু ভেপোরাইজার ডিভাইসে দু-রকম কেমিক্যাল ভরা থাকবে, তার সঙ্গে যুক্ত ভাইরাসের ভায়াল। লিভারে চাপ দিলে একটা ছোটো হাতুড়ি এসে ভাইরাসের ভায়ালে ঠুক করে আঘাত করে সেটাকে ভেঙে ফেলবে, ভাইরাস এসে মিশে যাবে ভেপোরাইজার ডিভাইসের কেমিক্যালের সঙ্গে। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি হবে গ্যাস, সেই গ্যাস প্রবেশ করবে এরোসল স্প্রেয়ারে। লিভারে দ্বিতীয়বার চাপ দেওয়ার সঙ্গেসঙ্গে চালু হবে এরোসল স্প্রেয়ার, অ্যাটাচির নীচের ছিদ্র দিয়ে বাতাসে ভেসে বেরিয়ে আসবে ভাইরাস। অ্যাটাচির বাহক লিভারে চাপ দেওয়ার পর ঘটনাস্থল ছেড়ে যাওয়ার জন্য ঠিক পনেরো সেকেন্ড সময় পাবেন।

ইব্রোক্সিম ভালো করে নকশাটা দেখে বলল, ‘অ্যাটাচির লাইনিংয়ে জিনিসটা বসিয়ে জিনিসটা চালু করার জন্য একটা বোতাম বসিয়ে দেওয়া খুব বেশি কঠিন না। কিন্তু এই নকশা অনুযায়ী মালটা কে বানিয়ে দেবে মাথায় আসছে না। আমার কারিগররা সবাই চামড়ার কাজ করে, কিন্তু এই কাজ তো তাদের দিয়ে হবে না।’

‘জানি, তোর লোক পারবে না। কিন্তু তোর চেনা সোনার কারিগর নিশ্চয়ই আছে?’

‘তা আছে। বাজারের দক্ষিণ দিকের পুরোটাই তো সোনার দোকান। কিন্তু সোনার কারিগর কী করবে?’

‘একটু মন দিয়ে নকশাটা দ্যাখ, জটিল কিছু নয়, সরঞ্জামগুলো জোগাড় করা যত কঠিন মনে করছিস, তা-ও নয়। শুধু একটু ইম্প্রোভাইজ করতে হবে। ভেপোরাইজার টিউবের কাজ তুই ইঞ্জেকশন সিরিঞ্জ দিয়ে তৈরি করে নিতে পারবি। স্প্রিং আর হ্যামার পেয়ে যাবি ঘড়ির দোকানে। স্প্রেয়ার বানিয়ে নেওয়ার জন্য আলাদা কষ্ট করার দরকার নেই, ফেলে দেওয়া ডিয়োডোর‍্যান্টের ক্যান থেকে মুখের অংশ কেটে নিলে হয়ে যাবে। আর পুরো সিস্টেমটা অ্যাসেম্বল করার জন্য প্রয়োজন ঝালাইয়ের কাজ জানা একজন দক্ষ মিস্ত্রির। সেই লোক তো তোর হাতেই আছে।’

একদৃষ্টে নকশাটার দিকে তাকিয়ে থেকে ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে লাফিয়ে উঠল ইব্রোক্সিম, ‘ভাই, তুই রিয়েলি জিনিয়াস! এখানেই তোর মতো একজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে আমার মতো একটা অশিক্ষিত ব্যাবসাদারের ফারাক।’

‘আমি ভেবেছিলাম তুই জানতে চাইবি কাজটা যখন এত সহজ তখন চীনারা নিজেদের দেশে না করে আমাকে তুরস্কে পাঠাল কেন?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তা-ই তো,’ ইব্রোক্সিম কিছুটা থতোমতো খেয়ে বলল, ‘ব্যাপারটা গোপন এমন একটা ইঙ্গিত তুই দিয়েছিলিস, কিন্তু পুরোটা জানি না। গোলমেলে ব্যাপার নাকি কিছু?’

‘পুরোটাই। আমার সুটকেসে কী আছে জানিস?’ বলতে বলতে ঢাকনা খুলে ভেতরে তিন ধাপে শুয়ে থাকা ছোটো ছোটো কাচের অ্যাম্পিউলের ট্রে বের করে নিয়ে এল রুস্তম, ‘এই যে ভায়াল দেখছিস, এর মধ্যে ঘুমিয়ে আছে দৈত্য! হেমারেজিক ফিভার আর মেনিঞ্জোএনসেফেলাইটিসের জীবাণু। এদের চিকিৎসা নেই, একবার আক্রান্ত হলে তুই খতম। সুটকেসে ভরে এ জিনিস ভারতে পাঠাবে চীন। সেখানে বিভিন্ন শহরে রেল স্টেশন, সাবওয়ে, এয়ারপোর্টে ছড়িয়ে দেওয়া হবে ভাইরাস। গোলমেলে নয়?’

যেরকম নির্বিকারভাবে কথাগুলো রুস্তম বলে গেল তাতে বিস্মিত হয়ে গেল ইব্রোক্সিম, ‘তুই এই মানুষ-মারা কাজ করছিস কেন, রুস্তম? ইসলামের কাছে এসব তো হারাম!’

‘আর হারাম,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল রুস্তম, ‘ইসলামের নামে পুরো বিশ্বে কী ভয়ংকর তাণ্ডব চলছে তার খবর যদি তুই রাখতিস, তবে হয়তো অন্য কথা বলতিস। সারা দুনিয়ায় যত সন্ত্রাসবাদী হামলা, তার প্রায় প্রত্যেকটার সঙ্গে জড়িত ইসলামিক টেররিস্ট অর্গানাইজেশন। কেন রে ভাই, ইসলাম কি মানুষ মারার লাইসেন্স দিয়েছে নাকি তোদের? তালিবান বা ইসলামিক স্টেট-কে গোটা দুনিয়ার মুসলমানের ভালোমন্দ স্থির করার ঠিকাদারি কে দিয়েছে? কেউ না। ইরাক ইরান সিরিয়ায় মুসলমানকে মুসলমান মারছে, ওদিকে পাকিস্তান কাশ্মীরে ক্রমাগত টেররিস্ট অ্যাটাক করে যাচ্ছে, এসবের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইসলাম। চীনের মতো কিছু দেশ এর ফায়দা লুটছে। হারাম কি শুধু তাহলে আমি একা করছি?’

রুস্তম দ্রুত বিশ্ব রাজনীতির যেসব প্রসঙ্গ ছুঁয়ে গেল সেইসব কথাগুলো ইব্রোক্সিম কখনো-সখনো টিভির বিতর্কে শুনেছে। তবে এসব ব্যাপারে তার ধারণা নিতান্ত অস্পষ্ট। তবু সে কিছুটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে বলল, ‘দ্যাখ, আমরা দু-জন মুসলমান হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নে আমাদের ছেলেবেলায় কিন্তু ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি দেখিনি। তবে তুই যা বলছিস—’

‘তুই বল দেখি, তোদের প্রেসিডেন্ট আয়া সোফিয়ার মতো একটা প্রাচীন স্থাপত্যের মর্যাদা পরিবর্তন করে সেটাকে মসজিদ বলে ঘোষণা করে দিল কেন? এটা বাকি বিশ্বকে উসকানি দেওয়া নয়? কামাল আতাতুর্ক কি এজন্য দেশটাকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন!’

ইব্রোক্সিম কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে রুস্তম বলল, ‘তুই থাম, আগে তোর টাকাপয়সার ব্যাপারটা ক্লিয়ার করে নিই। পুরো টাকা তোকে আজই নগদে দিয়ে দেব।’ বলতে বলতে একতাড়া লিরা কাউন্টারের ওপর রাখল সে, ‘গুনে নে, যা চেয়েছিলিস, পুরো আছে।’

‘লিরা! ডলারে পেমেন্ট করবি না?’

‘তুই কনসাইনমেন্ট পাঠিয়ে দিয়ে আমাকে টেক্সট করিস, তোর কাছে ডলার পৌঁছে যাবে।’

‘তাহলে লিরা?’

‘পুরোটা শোন, তুই তো কাজটা করে দিবি বলে রাজি হয়েছিস, কিন্তু এরপর যখন ইন্ডিয়ায় আউটব্রেক হবে, তখন ব্যাপারটা কোনোভাবে জানাজানি হলে দুনিয়ার সব সিক্রেট সার্ভিস তোর পেছনে পড়ে যাবে, সেকথা মাথায় আছে তোর?’

আশঙ্কাটা ইব্রোক্সিমের মনে তৈরি হচ্ছিল, জিজ্ঞেস করার সুযোগ পাচ্ছিল না, রুস্তম প্রসঙ্গ উত্থাপন করায় তার পক্ষে প্রশ্ন করা সহজ হয়ে গেল, ‘হ্যাঁ, সেটা ভেবেছি, তবে তুই যখন আছিস—’

‘আরে, আমি আছি বলে নয়, তুই নিজের সিকিউরিটি নিজে ব্যবস্থা করবি। আমি বলে দিচ্ছি তোকে কী করতে হবে।’

‘বল—’

‘কনসাইনমেন্ট কার কাছে কীভাবে পাঠাতে হবে, মনে আছে?’

ইব্রোক্সিম একগাল হাসল। ব্যাবসার কথা তার খুব ভালো মনে থাকে। সে বলল, ‘হ্যাঁ, মুম্বইয়ের মেহতা এন্টারপ্রাইস, লেদার মার্চেন্ট। কার্গোশিপে মাল যাবে।’

‘ব্যস, ওখানে তুই পাঁচশো পিস এইরকম লেদারের অ্যাটাচি পাঠিয়ে দে। একদম খালি, ভেতরে কিছু থাকবে না। আর ভাইরাস ভরতি করে একইরকম দেখতে আরও পাঁচশো পিস অ্যাটাচি ভিক্টর বোগদান বলে একজনের নামে প্লেন-এ কাঠমান্ডুতে পাঠিয়ে দিবি। প্রেরক হিসেবে আমার নাম-ঠিকানা থাকবে। যদি কোনোদিন তদন্ত হয়, তবে সবাই জানবে তুই মেহতা এন্টারপ্রাইসকে মাল পাঠিয়েছিস এবং সেই জিনিসগুলো সব ক্লিন। আর প্লেনে সিকিউরিটি চেকিংয়ে মাল আটকে গেলে সবাই আমাকে খুঁজবে, তোকে নয়।’

এটা বেশ স্বস্তিদায়ক ব্যবস্থা বলে ইব্রোক্সিম আবদুল্লায়েভের মনে হল। সে জিজ্ঞেস করল, ‘এই বাকি পাঁচশো সুটকেসের দাম কে দেবে?’

‘আরে, সে-টাকাই তো তোকে আমি ডলারে পেমেন্ট করব বললাম,’ রুস্তম বলল, ‘তবে যে অ্যাটাচি তোর হাতে রেডি আছে সেগুলোতে ভাইরাস লোড করে আগে পাঠিয়ে দে। দেরি হলে ভাইরাস নষ্ট হয়ে যাবে। মেহতা এন্টারপ্রাইসকে দু-দিন পরে পাঠালে কোনো ক্ষতি নেই, কারণ ওই সুটকেসে কিছু থাকবে না। আমি হিসেব করে দেখেছি মুম্বই পৌঁছোতে জাহাজ বিস্তর ঘুরবে, কম করে হলেও বারো-তেরোদিন। দার্দানেলস বসফোরাস হয়ে ইজিয়ান সি, সেখান থেকে মেডিটারেনিয়ান হয়ে রেড সি এবং সুয়েজ ক্যানাল পেরিয়ে আরব সাগর। ওই পথে ভাইরাস পাঠালে প্রচুর দেরি হবে। কিন্তু ফ্লাইটে সাত-সাড়ে সাত ঘণ্টায় কাঠমান্ডু পৌঁছে যাবে। বুঝেছিস?’

ঘাড় কাত করে ইব্রোক্সিম সম্মতি দিল। তার হাতে ভাইরাসের সুটকেস তুলে দিল রুস্তম কারিমভ। দু-জনে মিলে ধীরে ধীরে থার্মোকলের বাক্সে শুকনো বরফের ওপর ভাইরাসের ভায়াল থাকে থাকে বসিয়ে দিল। ক্যাশবাক্সে টাকা গুছিয়ে রেখে, দোকানে তালাচাবি দিয়ে দুই বন্ধু বাইরে এল। বাজারের বাইরে রাস্তায় সারি সারি অজস্র খাবারের দোকান। একটা দোকানে বুফে লাঞ্চের ভালো অফার রয়েছে দেখে দু-জনে সেখানে প্রবেশ করল। তুর্কিরা প্রচুর খাবার খায়, নানারকম পদ থরে থরে সাজানো। রুস্তম এগুলো কিছুই চেনে না। ইব্রোক্সিম তাকে খাবার বেছে নিতে সাহায্য করল। খাবারের প্লেট নিয়ে দুই বন্ধু একটা ফাঁকা কোণে এসে বসল।

‘আমি তোকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, তুই জবাব দিসনি এখনও,’ খেতে খেতে রুস্তম বলল, ‘চীনারা কেন এ কাজটা নিজেদের দেশে না করে আমাকে দিয়ে এখানে করাতে পাঠাল সে-ব্যাপারে কিছু ভাবলি?’

‘উঁ, না,’ মুখে খাবার নিয়ে ইব্রোক্সিম বলল, ‘মনে হয় এই টেকনোলজি ওরা জানে না, তাই—’

‘ধুর, কেজিবি-র কাছে চীন এখনও দুধের শিশু। আসলে এভাবে যে কোনোদিন জীবাণু ছড়ানো যায়, চীন সেকথা ভাবেনি। ওদের পরিকল্পনায় ছিল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল, ঠিক যেমন কোল্ড ওয়ারের সময় আমরা ভাবতাম। কিন্তু ওভাবে জীবাণু ছড়ানো যায় না। মিসাইল ভারতের হাতেও আছে। চীন যে মুহূর্তে দিল্লিকে টার্গেট করবে, ঠিক তার পরের মুহূর্তে বেজিংয়ে আছড়ে পড়বে ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র। সুতরাং ওভাবে জীবাণুযুদ্ধে জেতা যাবে না, জীবাণু ছড়াতে হবে নিঃশব্দে। সেজন্য ওদের দরকার একটা সাইলেন্ট মেকানিজম। আমি ওদের অনেক কষ্টে বুঝিয়েছি এই কৌশল সোভিয়েত ইউনিয়ন অনেক আগে আয়ত্ত করেছে, আমার পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে নকশা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। আর তুই যদি ইস্তানবুল থেকে ভারতে অ্যাটাচি পাঠাতে পারিস তাতে ওদের সুবিধে বেশি, কারণ ভারত এখন চীনে তৈরি কোনো জিনিস দেশে ঢুকতে দেয় না। এইভাবে আমি ওদের বুঝিয়ে বেরিয়ে এসেছি, আর ফিরে যেতে চাই না। তুই জেনে রাখ, এই যে আমরা একসঙ্গে বসে খাচ্ছি, আমাদের কেউ-না-কেউ ঠিক লক্ষ করছে। এই লোকগুলো দেখছে আমি তোর সঙ্গে কথা বলছি, তার মানে কাজ এগোচ্ছে—’

‘তুই চীনে ফিরবি না? কোথায় যাবি তাহলে?’

‘আই হ্যাভ অ্যান অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইন সামারা, ইব্রোক্সিম!’ খানিকটা দার্শনিকভাবে বলল রুস্তম কারিমভ।

‘সামারা! তুই রাশিয়ায় যাবি? ওখানে কেজিবি, মানে এখন যারা এফএসবি, তোকে হাতে পেলে টুকরো টুকরো করে কাটবে তো! কার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট তোর, এই বুড়ো বয়সে প্রেম-ট্রেম করছিস নাকি?’

রুস্তম ম্লান হাসি হাসল। বলল, ‘না রে, সামারায় একদিন যেতেই হবে, সবাইকে যেতে হয়, তোকেও যেতে হবে।’

বন্ধুর কথা ঠিক বুঝল না ইব্রোক্সিম। তবে অনুভব করল, খুব প্রতিভাবান যেসব মানুষ জীবনে সংসারধর্ম করেনি, প্রৌঢ়ত্বের সামনে এসে তারা বোধ হয় এরকম ছিটগ্রস্ত হয়ে যায়।

খাবারের দোকান থেকে বেরিয়ে এসে একবার তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য ইব্রোক্সিম বার বার রুস্তমকে অনুরোধ করল। কিন্তু রুস্তম রাজি হল না। একটা হুক্কাবার-এ বসে দু-জনে কিছু সময় ধূমপান করল। তারপর ফেরার পথ ধরল রুস্তম।

এরপর কাজের চাপে দিন চারেক ইব্রোক্সিম আর যোগাযোগ করতে পারল না রুস্তমের সঙ্গে। পঞ্চম দিনে ভাইরাস ভরতি পাঁচশো অ্যাটাচি কাঠমান্ডুর ভিক্টর বোগদানের নামে বুক করে প্লেন-এ তুলে দিয়ে রুস্তমকে টেক্সট করল সে। সিকিউরিটি চেকিংয়ে সুটকেসের ভেতরের কলকবজা ধরা পড়ে যায় কি না তাই নিয়ে প্রচণ্ড উৎকণ্ঠায় ছিল ইব্রোক্সিম। প্লেন টেক অফ করার পর রুস্তমকে টেক্সট করে রিল্যাক্স করবে বলে হামাম-এ ঢুকে স্টিম বাথ আর ম্যাসাজ নিয়ে সে গেল এক পরিচিত ‘নাতাশা’র ডেরায়। সেখানে ঘণ্টাদুয়েক কাটিয়ে বেরিয়ে এসে ইব্রোক্সিম দেখল রুস্তম মেসেজের জবাব দেয়নি। এবার সে রুস্তমকে ফোন করল। কিন্তু ফোন সুইচড অফ।

পরদিন দোকান খোলার প্রায় সঙ্গেসঙ্গে একটি তরুণ এসে ইব্রোক্সিমের হাতে একটা মোটা খাম তুলে দিয়ে দ্রুত হেঁটে অদৃশ্য হয়ে গেল। ভেতরে এক বান্ডিল ডলার, সঙ্গে একটা চিঠি। রুস্তম লিখেছে, ‘চিঠিটা পড়ে নষ্ট করে দিবি। আমার খোঁজে কেউ এলে কাঠমান্ডুর কনসাইনমেন্টের ব্যাপারে কিছু বলবি না।’

তার মানে রুস্তম ফোন বন্ধ করার আগে ইব্রোক্সিমের মেসেজ দেখেছে। কিন্তু এখন কোথায় সে? অন্যের হাতে টাকা পাঠাল কেন?

বিকেলের দিকে রুস্তম কারিমভের খোঁজে ইব্রোক্সিমের দোকানে একজন এল। রুস্তম তার দোকানে অ্যাটাচি তৈরি করার অর্ডার দিয়েছে কি না জানতে চাইল। ইব্রোক্সিম জানাল, কারখানায় অ্যাটাচি তৈরি হচ্ছে, এক সপ্তাহের মধ্যে মেহতা এন্টারপ্রাইসকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। লোকটি ফের জানতে চাইল গত ক-দিনে তার সঙ্গে রুস্তমের দেখা হয়েছে কি না। ইব্রোক্সিম জানাল, হয়নি, যতবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে রুস্তমের ফোন বন্ধ পেয়েছে। তবে রুস্তম বলেছিল, তাকে একবার রাশিয়ায় যেতে হবে। সামারা শহরে। সম্ভবত সেখানেই গেছে সে।

রুস্তমের খোঁজে আসা লোকটি বিভ্রান্ত মুখে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *