ক্যালকাটা পোস্ট-এর অফিস, কলকাতা।
সন্ধের মুখে অফিস ক্যান্টিনে এক কাপ কফি নিয়ে বসে আরশি ভাবছিল আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে মাকে নিতে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাবে। ক-দিন ধরে দাঁত ব্যথায় মা কষ্ট পাচ্ছে। আরশি না থাকায় মা-র ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়নি। আজ হাতে সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কপি নেই। সেজন্য একটু আগে ফোন করে রাত ন-টায় ডাক্তারবাবুর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে।
আচমকা আরশির চিন্তাসূত্র ছিন্ন করে সামনের চেয়ারে ধপ করে এসে বসল পেখম। করুণ মুখ করে বলল, ‘আরশিদি, এবার বোধ হয় আমার চাকরিটা গেল!’
পেখমকে বেশ পছন্দ করে আরশি। মেয়েটা বছরখানেক হল ওদের কাগজে জয়েন করেছে। এন্টারটেনমেন্ট পেজ-এ আছে। মুচমুচে ভাষায় বিনোদন দুনিয়ার কেচ্ছা লেখার একটা স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে ওর। তা ছাড়া অল্পদিনের মধ্যে ফিল্মি দুনিয়ায় গুচ্ছের সোর্স তৈরি করে ফেলেছে মেয়েটা। নায়ক-নায়িকা বা প্রযোজক-পরিচালকের হাঁড়ির খবর জোগাড় করতে ওর জুড়ি নেই। পেখমের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে রুপোলি পর্দার কত কেচ্ছাকাহিনি আরশি জেনে গেছে তার হিসেব নেই। কে কার সঙ্গে বেড শেয়ার করছে, কে পার্টিতে কোকেন নিয়ে কেস খেয়েছে, এসব কাহিনি পেখম খুব রসিয়ে পরিবেশন করে।
তবে পেখম এমনিতে খুব ভালো মেয়ে। কাজের প্রয়োজনে যেটুকু গসিপ ওকে লিখতে হয় তার বাইরে কখনো অকারণে কারো পেছনে লাগে না, অফিসে সিনিয়রদের খুব সম্মান করে। আরশির সঙ্গে পেখমের বন্ধুত্বর একটা অন্যতম কারণ হল দু-জনেই মফসসলের মেয়ে। ছোটো শহরে বড়ো হওয়া মেয়েদের মধ্যে একটা আলাদা বন্ডিং হয় বলে আরশির ধারণা।
‘কীসের ইন্ট্রো দিলি একটু খুলে বল। আরেকটা ময়ূরাক্ষী কেস নাকি?’ আরশি বলল।
লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে পেখম বলল, ‘নাহ, এবার কেস আরও গুরুতর। রোহিণী গুপ্তা কমপ্লেন করেছে আমার নামে।’
‘রোহিণীকে আবার কী কাঠি করতে গিয়েছিলিস তুই? ওর কামব্যাক ছবিটা, কী নাম যেন, নিশ্চয় ওটা নিয়ে কিছু আজেবাজে লিখেছিস!’
‘বলছি তোমাকে,’ পেখম বলল, ‘আগে একটা কফি খাওয়াবে আমাকে? মানে চাকরি চলে গেলে তো কিনে খাওয়ার ক্ষমতা থাকবে না, তোমাদের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে খেতে হবে, সেজন্য এখন থেকে চেয়ে খাওয়া অভ্যেস করছি।’
‘অ্যাই, ন্যাকামি করবি না আমার সঙ্গে। তুই গিয়ে কফি নিয়ে আয়, আমি দাম দিয়ে দেব।’
‘একটা স্যান্ডউইচ বলব, আরশিদি?’ মুখটা আবার করুণ করে জানতে চাইল পেখম।
হেসে ফেলল আরশি, ‘হ্যাঁ, বল, আমার জন্যও একটা নিস।’
খুব খুশি হয়েছে এমন চোখ-মুখ করে কাউন্টারের দিকে ছুটল পেখম। ওর ছেলেমানুষি আচরণের জন্যই ওকে এত পছন্দ করে আরশি। তবে মাঝেমধ্যে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে মেয়েটা। কিছুদিন আগে অভিনেত্রী ময়ূরাক্ষী সরকারের ব্যাপারে যা হল। জাতীয় পুরস্কার পাওয়া অভিনেত্রী ময়ূরাক্ষী তখন দ্বিতীয়বার গর্ভবতী, সেই অবস্থায় গোয়ায় একটা ছবির শুটিং করছিল। এমন সময় ক্যালকাটা পোস্ট-এ খবর বেরোল, এক কোটিপতি ব্যবসায়ী বিশেষ বিমানে ময়ূরাক্ষীকে উড়িয়ে এনেছেন বাইপাসের ধারের একটা হোটেলে। সেখানে দু-জনের অভিসার সেরে ময়ূরাক্ষী ফের বিমানে উড়ে গেছে গোয়ায় শুটিং শেষ করার জন্য।
শুটিং ইউনিটের সবাই জানত ময়ূরাক্ষী কলকাতায় ফিরছে জরুরি ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য, অনাবাসী ভারতীয় স্বামীর পাঠানো বিমানে। কিন্তু ক্যালকাটা পোস্ট যখন চার্টার্ড বিমানের বুকিং সংক্রান্ত কাগজ, হোটেলের সিসিটিভির ফুটেজ ইত্যাদি সংগ্রহ করে ময়ূরাক্ষীর কীর্তি ফাঁস করে দিল, তখন পেখমের পাশাপাশি কাগজের মালিক সোমক সান্যালকেও টেলিফোনে হুমকি দেওয়া শুরু হয়। সোমকবাবু অবশ্য দমে যাননি, তিনি চেয়েছিলেন ময়ূরাক্ষী আদালতে যাক, তাহলে আরও খোলাখুলি ওর চরিত্র পাঠকের সামনে তুলে ধরা যাবে।
‘তুই এমন একটা ঝামেলা বাধালি কেন পেখম?’ জিজ্ঞেস করেছিল আরশি। পেখম বলেছিল, ‘আমাকে বিশ্বাস করো আরশিদি, আমি সেনসেশন ক্রিয়েট করার জন্য এটা লিখিনি। আমি শুধু লিখেছিলাম ময়ূরাক্ষীর পেটের বাচ্চাটার জন্য, মায়ের কাজকর্মের জন্য বাচ্চাটার প্রাণসংশয় হতে পারত! যে লোকটা লাখ লাখ টাকা দিয়ে ওকে বিছানায় নিয়ে যাচ্ছে সে কি আর লাফালাফি কম করবে?’ সেদিন পেখমের মধ্যে একটা সত্যিকার ভালোমানুষের সন্ধান পেয়েছিল আরশি।
ট্রে হাতে পেখম ফিরে এল। বলল, ‘স্যান্ডউইচ পেলাম না, পেস্ট্রি নিয়েছি। তুমি খাবে তো?’
‘হ্যাঁ, নিয়ে যখন এসেছিস, তখন খাব অবশ্যই। কিন্তু এদের পেস্ট্রি ভালো না, একটু শুকনো লাগে। যাকগে, তুই এখন বোস, কী হয়েছে খুলে বল। আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না, আজ একটু তাড়া আছে আমার।’
পেস্ট্রিতে একটা কামড় বসিয়ে তার সঙ্গে হুস করে খানিকটা কফি গলায় চালান করে পেখম বলল, ‘রোহিণীর পিআর এজেন্সি থেকে অফিসে ফোন করে শাসিয়েছে আমাদের কাগজে আর কখনো সাক্ষাৎকার দেবে না। তাই নিয়ে পীযূষদা আমার ওপর খচে বোম! বলেছে, এত ঝামেলা পাকাস তুই, তোকে খবরের কাগজে চাকরি দেওয়াই ভুল হয়েছে।’
পীযূষ রায় ক্যালকাটা পোস্ট-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বিনোদনের পাতাটা ও-ই দেখে। সেলিব্রিটিদের সঙ্গে মেলামেশা করার সুবাদে লোকটা নিজেকেও সেলিব্রিটি বলে মনে করে। ওকে সেজন্য অফিসের অনেকেই পছন্দ করে না। আরশির সঙ্গেও তেমন সদ্ভাব নেই।
‘তুই রোহিণীর নামে কী লিখেছিলিস?’
‘আমি লিখেছিলাম ছবিতে ওর কস্টিউম নির্বাচন ঠিক হয়নি। স্লিভলেস পরার জন্য ওর অ্যাক্সিলারি টেইল দেখা যাচ্ছে, এমনকী কসমেটিক সার্জারির স্কার পর্যন্ত ক্লোজ শটে বোঝা যাচ্ছে।’
‘কী বললি, অ্যাক্সিলারি টেইল? সেটা কী জিনিস?’ আরশি জানতে চাইল।
‘সে কী, তুমি অ্যাক্সিলারি টেইল-এর নাম জানো না? কী করে বোঝাই বলো তো তোমাকে! আচ্ছা, তুমি মেয়েদের বগলের কাছে ঝুলে থাকা দলাপাকানো মাংসপিণ্ড দেখেছ তো? ওটাই অ্যাক্সিলারি টেইল। আমাদের ব্রেস্ট থেকে কিছু টিসু বগলের দিকে উঠে গেছে। বাচ্চা হওয়ার পর যখন বুকে দুধ আসে, তখন অনেক সময় এই টিসুগুলো ফুলে উঠে দলা পাকিয়ে যায়। আবার হরমোন কমবেশি হলে বা দেহের ওজন বেড়ে গেলেও অনেক সময় এই অ্যাক্সিলারি টেইল তৈরি হতে পারে। রোহিণীর আগেকার ছবিতে এটা তুমি দেখতে পাবে না, কিন্তু এখন ওর বাচ্চা হওয়ার পর অ্যাক্সিলারি টেইল ডেভেলপ করেছে। রোহিণী মুম্বইয়ের কসমেটিক সার্জন অর্জুন বাজাজের কাছে অপারেশন করিয়েছে, তবে অপারেশন খুব সাকসেসফুল হয়নি এই ছবিটা দেখে তা বোঝাই যাচ্ছে। এই ছবিতে রোহিণী স্লিভলেস পরে যতবার ক্লোজ-আপে এসেছে, ওর বগলের ফোলা ভাব দেখা গেছে। এমনকী অপারেশনের হালকা দাগও বোঝা গেছে। আমি সেটাই লিখেছিলাম।’
মাথার কোঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে চোখ বড়ো করে হাত নেড়ে যতক্ষণ পেখম ব্যাপারটা বোঝাচ্ছিল, ততক্ষণ ওর দিকে একভাবে তাকিয়ে ছিল আরশি। পেজ থ্রি রিপোর্টিংয়ের দুনিয়াটা একেবারে আলাদা। এখানে সেলিব্রিটিদের সবসময় মাইক্রোস্কোপের নীচে ফেলে রাখে মিডিয়া। তাদের কত তুচ্ছ শারীরিক ত্রুটিবিচ্যুতি অনায়াসে খবরের হেডলাইন হয়ে আলোড়ন ফেলে। আবার সেলিব্রিটিদের জনসংযোগ এজেন্সির কড়া নজর থাকে সাংবাদিকদের ওপর। একচুল বেচাল হলেই সাংবাদিককে হুমকি, খবরের কাগজকে আইনি নোটিশ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে তারা।
ইংরেজি কাগজের আরেক জ্বালা হল এর প্রিন্ট ও অনলাইন সংস্করণ মিলিয়ে পাঠক ছড়িয়ে আছে সারা দেশে। ফলে প্রশংসা বা সমালোচনা সবটাই আসে খুব দ্রুত।
‘এখন আমি কী করব, আরশিদি?’ পেখম জিজ্ঞেস করল।
আরশি হাসল। বলল, ‘কিছুই করবি না। চুপচাপ থাকবি। পীযূষ হয়তো তোকে মিথ্যে বলে চাপে রাখছে, ওকে রোহিণী গুপ্তার পিআর টিম সত্যি ফোন করেছে কি না কে জানে। যদি সিরিয়াস কিছু হয় তাহলে এইচআর নিশ্চয় তোকে মেল করে কৈফিয়ত চাইবে। তখন দেখা যাবে।’
পেখম কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই প্রায় দৌড়োতে দৌড়োতে এসে হাজির হল বরুণ। বলল, ‘আরশিদি, স্যারের ঘরে এখনই একবার আপনাকে ডাকছে। আপনাকে মোবাইলে পাওয়া যাচ্ছে না, তাই আমি খুঁজতে এলাম।’
বরুণের ‘স্যার’ মানে এই কাগজের এগজিকিউটিভ এডিটর সত্যকাম বাগচি। বরুণ ওঁর পিয়োন। আড্ডা ছেড়ে উঠতে হবে ভেবে একটু বিরক্ত হল আরশি। কিন্তু খুশিও হল আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাবে এটা বলার জন্য ওকে আর আলাদা করে সত্যকামের ঘরে ঢুকতে হবে না। পেখমের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘তুই চিন্তা করিস না, ধীরে-সুস্থে খেয়ে নীচে আয়। বাকি কথা পরে হবে। আমি কাউন্টারে দাম দিয়ে দিচ্ছি।’
‘আমি পেমেন্ট করে দিয়েছি, আরশিদি,’ পেখম বলল। আরশি কথা বলতে বলতে কাউন্টারের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেছিল, থমকে গিয়ে হাত মুঠো করে কিল দেখাল পেখমকে! পেখম আর ও দু-জনেই হাসল।
লিফটে নেমে দোতলার করিডোরের একেবারে শেষপ্রান্তে এগজিকিউটিভ এডিটরের ঘর। ঘরে ঢুকে আরশি দেখল সত্যকাম ছাড়াও সেখানে নিউজ এডিটর নয়নিকা ভরদ্বাজ এবং পুলিশ বিটের রিপোর্টার অনীক বসে আছে। আরশিকে দেখেই উত্তেজিতভাবে সত্যকাম বলে উঠলেন, ‘এই যে আরশি এসে গেছে। নয়নিকা, লেট’স স্টার্ট।’
‘আমি ক্যান্টিনে ছিলাম,’ চেয়ারে বসতে বসতে আরশি বলল, ‘আমার মোবাইল অন রয়েছে সারাক্ষণ, মনে হয় সিগনালের সমস্যা।’’
‘নো ইসু,’ সত্যকাম বললেন, ‘একটা গুড নিউজ আছে তোমার জন্য। তুমি পাকিস্তানের ড্রাগ কার্টেল নিয়ে যে সিরিজটা লিখেছিলে সেটা ইউনাইটেড নেশন’স অফিস অন ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম থেকে একটা পুরস্কার পেয়েছে। বেস্ট রিপোর্ট অন ড্রাগ অ্যাবিউজ ইন সাউথ ইস্ট এশিয়া। আমি তোমাকে কনগ্র্যাচুলেট করছি, আই অ্যাম ট্রুলি ভেরি ভেরি হ্যাপি, কারণ তুমি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবক-টা বড়ো মিডিয়া হাউসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুরস্কারটা ছিনিয়ে এনেছ।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, সত্যকামদা। থ্যাঙ্কস টু ইউ অল।’ আরশি হেসে বলল।
‘কিপ ইট আপ, আরশি,’ হেসে বললেন নয়নিকা ভরদ্বাজ, ‘তুমি আমাদের প্রত্যাশা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছ। সবাই বলছে নার্কো টেররিজম নিয়ে এত ভালো লেখা গত দশ বছরে কোনো ভারতীয় মিডিয়ায় লেখা হয়নি। তুমি যেভাবে পেশোয়ারের হেরোইন ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি রিপোর্ট করেছ তা একেবারে ইউনিক। উই আর ভেরি হ্যাপি।’
অনীকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আরশি দেখল একেবারে ভাবলেশহীন মুখ করে ছেলেটা ঘরের এসি মেশিনের ডানার ওঠানামা লক্ষ করছে। খুবই প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া। অনীক একটা পাক্কা মেল শভিনিস্ট। আরশির সাফল্য ওর তেতো লাগার কথা। কিন্তু কথা হল, ওকে কেন ডাকা হয়েছে এখানে?
সত্যকাম সম্ভবত আরশির ভাবনা বুঝতে পারলেন। গলা সামান্য পরিষ্কার করে বললেন, ‘এনিওয়ে আরশি, তুমি ইউএন থেকে অফিশিয়ালি খবর পেলে তারপর আমরা সেটা সেলিব্রেট করার কথা ভাবব। এখন যেজন্য তোমাকে ডেকেছি, সেটাই বলি। তুমি পার্ক স্ট্রিটের ঘটনাটা কিছু শুনেছ?’
‘কোন ঘটনা?’
‘হাইস্ট্রিট শপিং মল-এর ফুডকোর্টের ব্যাপারটা।’
‘না তো, কী হয়েছে?’ বিভ্রান্ত হয়ে আরশি জানতে চাইল।
‘আমি বলছি,’ নয়নিকা বললেন, ‘দিন দশেক আগে ওই মল-এর ফুডকোর্টে খাওয়ার পর কিছু লোক অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের হাসপাতালে ভরতি করা হয়। কর্পোরেশন থেকে ওই শপিং মল সিল করে দিয়েছে। কিন্তু খবর পাওয়া যাচ্ছে যারা হাসপাতালে ভরতি হয়েছিল তাদের সবাই মারা গেছে, মোট একুশজন। সরকার ব্যাপারটা স্বীকার করেনি এখনও, কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যকে অ্যালার্ট করে বলেছে এটা একটা বায়োলজিক্যাল টেররিস্ট অ্যাটাক। এরকম আরেকটা সংক্রমণ ত্রিপুরায় হয়েছে, আগরতলায়। সেখানেও বেশ কিছু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সির একটা টিম পাঠিয়েছে কলকাতায়। অনীক ব্যাপারটা লালবাজার থেকে জেনেছে, একটা মোবাইল নাম্বারও পাওয়া গেছে। মুশকিল হল ওদের কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না! যেহেতু এটা টপ সিক্রেট মিশন সেজন্য কেউ কোঅপারেট করছে না। তুমি ব্যাপারটা একটু দ্যাখো।’
অনীকের দিকে ফের তাকাল আরশি। যথারীতি ভাবলেশহীন মুখ করে বসে আছে। আরশি ইচ্ছে করে খোঁচা দিল, ‘নয়নিকাদি, আমি কী করে পারব বুঝতে পারছি না! অনীক কমপিটেন্ট ছেলে, গোটা পুলিশ মহল ওর গুলে খাওয়া, ও যদি অ্যাকসেস না পায়, আমি পাব কী করে? আমি তো দীর্ঘদিন পুলিশ বিট করিনি।’
‘আমার বিশ্বাস তুমি পারবে,’ সত্যকাম বললেন, ‘অ্যাই অনীক, তুই চুপ করে আছিস কেন? একটু বল না, কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে!’
অনীকের মুখে এবার কথা ফুটল। বলল, ‘ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সির টিমটা এক্সাইড মোড়ের ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে এসে উঠেছে। এটা খুব আশ্চর্য ব্যাপার যে, ওরা কোনো সরকারি গেস্ট হাউসে ওঠেনি। মুভমেন্ট করছে অ্যাপ ক্যাবে। পার্ক স্ট্রিটের কয়েকটা হোটেল ঘুরে নিজেদের মতো করে কিছু খাবারের নমুনা তুলেছে। তিনজন আছে টিমে, এদের লিড করছে যে লোকটা, সে একজন বাঙালি বিজ্ঞানী। তার একটা মোবাইল নাম্বার লালবাজার থেকে জোগাড় করেছি, কিন্তু লোকটা ফোন রিসিভ করেনি। আজ হোটেলে গেছিলাম, দেখা করেনি। সিকিউরিটি বেরিয়ে এসে বলল, দেখা হবে না।’
‘আমার কিন্তু বায়ো-টেররিজম বা ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।’ অকপটে জানাল আরশি।
নয়নিকা বললেন, ‘আমরা কেউই বিশেষ কিছু জানি না, শুধু জানি যে খবরটা ক্যালকাটা পোস্টকে ব্রেক করতে হবে। কিছুদিন আগেই করোনা ভাইরাসের মতো একটা জীবাণু পুরো বিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছে, মানুষ দরজা এঁটে মুখোশ পরে বাড়িতে বসে থেকেছে। তারপর যখন পরিস্থিতি একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়ে আসছে তখন আবার এই ভাইরাস অ্যাটাক।’
কম্পিউটার থেকে একটা প্রিন্ট আউট বের করে আরশির দিকে এগিয়ে দিলেন সত্যকাম, ‘এই দ্যাখো, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ওয়েবসাইট কী বলছে। ২০০১ সাল থেকে মোট যতগুলো সংক্রামক রোগ ভারতে হানা দিয়েছে এটা তার একটা লিস্ট। কলেরা, জিকা, সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লু, ডেঙ্গু, মেনিনজাইটিস, জাপানি এনসেফ্যালাইটিস, সার্স, প্লেগ কী নেই এর মধ্যে। বাপরে বাপ, সব আপদ আমাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে একেবারে!’
আরশি হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিল। অনীক ওর দিকে একটা ছোটো চিরকুট এগিয়ে দিল। তাতে একটা মোবাইল নম্বর লেখা। শুধুই নম্বর, কারো নাম নেই।
‘ভদ্রলোকের নাম কী?’
‘জানি না,’ কায়দা করে কাঁধ ঝাঁকাল অনীক, ‘আমি একবার অ্যাডিশনাল সিপি সাহেবকে ফোনে লোকটাকে ডক্টর মুখার্জি বলে সম্বোধন করতে শুনেছি। কিন্তু পুরো নাম জানতে পারিনি। হোটেলের রেজিস্টারে কোনো এন্ট্রি নেই ওদের নামে।’
হতাশ হল আরশি। এত সামান্য সূত্র থেকে কী করে এক্সক্লুসিভ টেনে বের করবে সে! ব্যাপারটা তো ম্যাজিক নয়।
‘তুমি কী ভাবছ আমি গেস করতে পারছি, আরশি। তুমি ভাবছ, সত্যকামদা হাসিমুখ করে একটা কঠিন কেস তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছে, তাই তো? একদম তা নয় কিন্তু। আমার ধারণা সরকারের সঙ্গে মিডিয়ার এই চোর-পুলিশ খেলাটা আমাদের হাউসে একমাত্র তুমি ক্র্যাক করতে পারবে। মানুষের কিন্তু জানার অধিকার আছে, সত্যি কী ঘটছে। এটা আমাদের সকলের জীবনমৃত্যুর ব্যাপার।’
সত্যকামের দিকে তাকাল আরশি। মাঝারি উচ্চতার রোগা এই মানুষটার মধ্যে একজন একরোখা তেজি সাংবাদিক বাস করে তা সোনালি ফ্রেমের আড়ালে থাকা উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখের দিকে চাইলে বোঝা যায়। আরশি যখন ক্যালকাটা পোস্ট-এ যোগ দেয় সত্যকাম তখন ছিলেন চিফ রিপোর্টার। নামি কাগজের চাকরি ছেড়ে নতুন কাগজে এসেছিলেন স্বাধীনভাবে কাজ করবেন বলে। তখন একমাথা চুল ছিল তাঁর, এখন অনেক হালকা হয়ে এসেছে। সোমক সান্যালের দিক থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো স্বাধীনতা দেওয়া আছে তাঁকে। নয়নিকাও খুব ভালোমানুষ, আদতে উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা হলেও অনেক পুরুষ ধরেই কলকাতার অধিবাসী ওঁদের পরিবার। নয়নিকাদি ‘দুবাই মর্নিংস্টার’ কাগজে কাজ করতেন, কলকাতার টানে অনেক কম মাইনের চাকরিতে যোগ দিয়েছেন।
আরশি মাস্টার্স ডিগ্রি করার পরেই ক্যালকাটা পোস্ট-এ জয়েন করেছিল। বেশ কয়েক বছর নানা ধরনের রিপোর্টিং করার পর ওকে টেনে নেওয়া হল সম্পাদকীয় বিভাগে। বাইরে ঘোরাঘুরি করার সুযোগ কমে যাওয়ায় আরশি প্রথমে একটু হতাশ হয়েছিল। সেটা বুঝে ওকে বিশেষ কিছু পলিটিকাল রিপোর্টিং-এর দায়িত্ব দেন সত্যকাম। এখন ও সেটাই করে।
সত্যকাম আর নয়নিকাকে মুখের ওপর না বলতে পারবে না আরশি। এঁদের কাছে ওর অনেক ঋণ। সে বলল, ‘আমি খুব চেষ্টা করব।’
হাসি ফুটল সত্যকাম এবং নয়নিকার মুখে, কিন্তু ঝপ করে লোডশেডিং হয়ে গেল অনীকের মুখে। বেচারা হয়তো আশা করেছিল আরশি শেষ পর্যন্ত অ্যাসাইনমেন্টটা নিতে সম্মত হবে না।
‘আমি কি আজ একটু বেরোতে পারি, সত্যকামদা?’ আরশি বলল, ‘মাকে নিয়ে একটু ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ছিল। আর সম্ভব হলে আমি একবার ক্যাপিটাল হোটেলে চক্কর দিয়ে যাব।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, যাও,’ সত্যকাম বললেন।
আরশি অফিস থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিল। সন্ধে নামছে কলকাতায়। রাস্তায় প্রচুর গাড়ি। বিচ্ছিরি জ্যাম। সিটে গা এলিয়ে দিয়ে আরশি ভাবতে শুরু করল কোথা থেকে কাজ শুরু করা যায়। এক বছর আগে প্রায় এরকম একটা পুরোপুরি শূন্য জায়গা থেকে শুরু করেছিল নার্কো টেররিজমে পাকিস্তানি ড্রাগ কার্টেলের ভূমিকা নিয়ে ওর লেখা।
আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ইরান এই তিন দেশের মাধ্যমে মাদক উৎপাদন ও চোরাচালান সারা বিশ্বের কাছে মাথাব্যথার কারণ। মাদক চোরাচালানের মানচিত্রে এই অঞ্চলটা গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল বা সোনালি ত্রিভুজ নামে পরিচিত। ‘ইউনাইটেড নেশন’স অফিস অফ ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম’-এর বিচারে সারা বিশ্বে যত বেআইনি মাদক কেনাবেচা হয় তার একটা বড়ো অংশ আসে এই সোনালি ত্রিভুজের পথ বেয়ে। আফগানিস্তানে চাষ হওয়া পোস্ত থেকে আফিং উৎপন্ন হওয়ার পর তা পৌঁছোয় পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশে। সেখানে আফিং থেকে তৈরি হয় হেরোইন, তারপর করাচি বন্দর থেকে ইরান ঘুরে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। পাকিস্তান থেকে কিছু মাদক সরাসরি ভারতে প্রবেশ করে লাহোর-অমৃতসর করিডোর ধরে তা চলে যায় দিল্লি-মুম্বই-কলকাতার মতো বড়ো শহরে। সীমান্ত থেকে দেশের যত ভেতরে প্রবেশ করে মাদক, তত বাড়ে তার দাম। পঞ্জাবে এক পুরিয়া ‘চিট্টা’ বা ব্রাউন সুগারের দাম যদি হয় দু-হাজার টাকা, তবে মহারাষ্ট্রে গিয়ে তার মূল্য দাঁড়াবে চার-পাঁচ হাজার টাকা। এই বিপুল মুনাফা চলে যায় আফ-পাক জঙ্গি গোষ্ঠীর কাছে। এই টাকা ব্যবহার করা হয় বিশ্ব জুড়ে জেহাদি সন্ত্রাসে। সেজন্য সোনালি ত্রিভুজের মতো মিষ্টি নাম আন্তর্জাতিক ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির কাছে এক মূর্তিমান আপদ।
নার্কোটিক কন্ট্রোল ব্যুরোর কলকাতা অফিসের চেনাজানা কাজে লাগিয়ে আরশি সটান হাজির হয়েছিল চন্ডিগড়ে এনসিবি-র জোনাল ইউনিটের ডিরেক্টর দীপক সালগাঁওকরের কাছে। মহারাষ্ট্র ক্যাডারের এই আইপিএস অফিসার প্রথমে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না একজন ছোটোখাটো চেহারার বাঙালি মেয়ে দুর্ধর্ষ ড্রাগ মাফিয়াদের নিয়ে খবর করার আগ্রহে কলকাতা থেকে এসে হাজির হয়েছে। কিন্তু দিন চারেক ভালো করে আরশিকে জেরা করে এবং কলকাতা থেকে সব তথ্য যাচাই করে তিনি ওকে অমৃতসরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। অমৃতসরে কিছুদিন থাকার পর আচমকা আরশির পরিচয় হয়ে যায় হাজি বশির নুরজাই-এর এক শাগরেদ ইমতিয়াজের সঙ্গে।
আফগানিস্তানের কুখ্যাত আফিং ব্যবসায়ীদের রক্ষাকর্তা হাজি বশির নুরজাই ছিল সিআইএ-র এজেন্ট। আফিং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তোলাবাজি করে তার যেমন রোজগার হত, তেমনই আয়ের আরেকটা উৎস ছিল মুজাহিদদের কাছ থেকে স্টিংগার মিসাইল কিনে সিআইএ-র কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনার সঙ্গে মুজাহিদদের লড়াইয়ের সময় আমেরিকা সেখানে প্রচুর তাপসন্ধানী স্টিংগার মিসাইল পাঠিয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন কাবুল থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর আমেরিকা বুঝতে পারে স্টিংগার মিসাইল আফগান মুজাহিদ নেতাদের হাতে থেকে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই মিসাইল ব্যবহার করে যাত্রীবাহী বিমানে আক্রমণ চালানো যেতে পারে এমন আশঙ্কায় সিআইএ চড়া দামে অব্যবহৃত মিসাইল কিনে নিতে শুরু করে।
হাজি বশির নুরজাই তিরিশ হাজার ডলারে এক-একটা মিসাইল কিনে আমেরিকার কাছে আশি হাজার ডলারে বিক্রি করত। পরে দাম উঠেছিল এক লক্ষ পঁচিশ হাজার ডলার পর্যন্ত। নাজিবুল্লা সরকারের পতনের পর তালিবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করে প্রথমে ইসলাম বিরোধী বলে পোস্ত চাষ বন্ধ করে দিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মতামত বদলে গেল। তাদের নতুন দোস্ত ওসামা বিন লাদেন বোঝাল যে, দুনিয়া জুড়ে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম চালাতে হলে প্রচুর অর্থ চাই। সেই অর্থ আসতে পারে পোস্ত চাষ থেকে। হাজি বশিরকে কোণঠাসা করে তারা নিজেরা পোস্ত খেতের মালিকদের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে নিল। তালিবান এবং আল কায়দা গোষ্ঠীর সাহায্যে এগিয়ে এল পাকিস্তানের পারভেজ মুশারফের সরকার। আফগানিস্তান থেকে আফিং পৌঁছোতে লাগল পেশোয়ারে, সেখানে কেমিক্যাল ট্রিটমেন্টের পর উৎপন্ন হেরোইন ইরানের চাবাহার বন্দর ঘুরে চলে আসে ভারতে।
নুরজাই গোষ্ঠীর প্রধান হাজি বশির আফিং ব্যাবসা থেকে লাভবান হলেও সে সন্ত্রাসবাদী নয়। তালিবান-আল কায়দা-পাকিস্তানের চক্করে পড়ে তার রোজগার ভীষণ কমে গেল। অন্যদিকে পুরোনো বন্ধু আমেরিকার কাছ থেকেও সে সদয় ব্যবহার পেল না। ৯/১১-র পরে মার্কিন সেনা যখন আফগানিস্তানের মাটিতে পা রাখল, তখন হাজি বশির তাদের কাছে গেছিল। কিন্তু সঙ্গেসঙ্গে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে সে ছাড়া পেল ঠিকই, কিন্তু ততদিনে জর্জ বুশ প্রশাসনের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যেভাবে কলম্বিয়া বা মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেলকে শায়েস্তা করেছে, একেবারে সেই ধাঁচে আফগান পোস্তচাষিদের জব্দ করার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সুতরাং, হাজি বশির নুরজাই এবার সত্যি সত্যি বেকার হয়ে পড়ল।
এই অবস্থায় ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু করল হাজি বশির। আফগানিস্তানে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের খুব অভাব। পোশাক, ওষুধ, বেবি ফুড ইত্যাদি ভারত থেকে নিয়ে গেলে বেশ দু-পয়সা লাভ হয়। এখন এটাই তার প্রধান কাজ। বশিরের বয়স বাষট্টি বছর, সব কাজ সে নিজে করতে পারে না, তার এজেন্টরা একসঙ্গে চার-পাঁচজন এসে জিনিস কিনে ফিরে যায়। অনেকটা সিঙ্গাপুর-ব্যাঙ্কক থেকে কলকাতায় যেভাবে ইলেকট্রনিক জিনিস বা কসমেটিক্স প্রোডাক্ট ঢোকে সেই ধরনের ব্যাবসা। এসবের ফাঁকে টুকটাক হাতবদল হয় মাদকদ্রব্যের।
আরশি এসব জেনেছিল ইমতিয়াজের কাছ থেকে। তার ভরসায় এক মাস পরে গিয়ে হাজির হয়েছিল পেশোয়ারে। পাকিস্তানের ভিসা পাওয়া বেশ কঠিন, আরশি ভিসার আবেদনে লিখেছিল পেশোয়ারের হেরিটেজ সাইট নিয়ে একটা লেখার জন্য সে পাকিস্তানে যেতে চায়, কোনো কারণে সহজেই আবেদন মঞ্জুর হয়ে যায়।
পেশোয়ারে পৌঁছে আরশি বুঝতে পেরেছিল তার পেছনে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর এজেন্টরা চব্বিশ ঘণ্টা লেগে রয়েছে। টানা এক সপ্তাহ তাকে ফলো করে আইএসআই নিশ্চিত হয় আরশি ইতিহাস নিয়ে লেখালিখি করার জন্যই এসেছে। সদর রোডের ওপর যেখানে পেশোয়ার মিউজিয়াম, ঠিক তার বিপরীত দিকে গভর্নর হাউস এবং সরকারি সচিবালয়। প্রথম দিকে সারাদিন মিউজিয়ামে পড়ে থাকত আরশি, গান্ধারশিল্পর নিদর্শন এবং প্রাচীন শক-কুষাণ মুদ্রা নিয়ে পড়াশোনা করত। পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যালকাটা পোস্ট-এ আরশির কয়েকটা লেখাও প্রকাশিত হয়। সেসব দেখে গোয়েন্দা-বাহিনী ধরে নেয় তাকে আর নজরে রাখার দরকার নেই।
এবার আরশি ইমতিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ইমতিয়াজ তার জন্য নিয়ে আসে পাঠানদের পোশাক, পাগড়ি ইত্যাদি। মুখে লাগানো হয় নকল দাড়িগোঁফ। ইমতিয়াজের ভাই সেজে তার সঙ্গে পেশোয়ারের কুখ্যাত অস্ত্র এবং মাদক কেনাবেচার হাট ‘কারখানা বাজার’-এ দিনের পর দিন ঘুরে দেখে আরশি, লুকিয়ে ছবি তোলে।
‘আমার জন্য এত ঝুঁকি নিচ্ছেন কেন?’ জানতে চেয়েছিল আরশি, ‘বশিরভাই আমাকে কোনোদিন চোখে দেখেননি, তিনিই-বা আপনাকে আমার জন্য এতটা ঝুঁকি নেওয়ার অনুমতি দিলেন কেন?’
‘আরে চুপ, চুপ,’ ঠোঁটের ওপর হাত রেখে বলেছিল ইমতিয়াজ, ‘তোমার গলার আওয়াজ শুনে সবাই বুঝে যাবে তুমি একজন মহিলা। তখন সর্বনাশ হবে!’
‘আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না।’ আরশি হোটেলে ফেরার আগে যে বাড়িতে পোশাক বদল করার জন্য যেত, সেখানে গিয়ে অনুযোগ করেছিল।
ইমতিয়াজ গম্ভীরভাবে বলেছিল, ‘তুমি দুনিয়ার সামনে পাকিস্তানের আসল চেহারাটা তুলে ধরো, আমরা তা-ই চাইছি। হাজি বশিরের সঙ্গে কেউ ইমানদারি দেখায়নি, তার নিজের দেশের লোক তাকে ভাতে মারতে চেয়েছে, আমেরিকা তাকে ব্যবহার করে চায়ের এঁটো কাপের মতো ছুড়ে ফেলেছে। কিন্তু আমরা পাঠানরা এখনও ইমানদারি, ইনসানিয়াত এগুলো মানি। সন্ত্রাস আমাদের ব্যাবসা নয়, আমরা টেররিস্টদের সঙ্গে ভিড়ে যাইনি। তোমার লেখার মাধ্যমে এই কথাগুলো দুনিয়াকে জানিয়ে দিয়ো।’
প্রায় পনেরোদিন কারখানা বাজারে ঘুরে ঘুরে আরশি দেখেছিল কী করে শুকনো পোস্ত ফল চিরে ভেতরের আঠালো রস জমিয়ে আফিং তৈরি করা হয়। ফুটন্ত গরম চুনজলে সেই আফিংয়ের দলা ফুটিয়ে ঠান্ডা করে ছেঁকে নিলে বেরিয়ে আসে মরফিন। এর সঙ্গে অ্যাসেটিক অ্যানহাইড্রাইড, ক্লোরোফর্ম, সোডিয়াম কার্বনেট, অ্যালকোহল, ইথার এবং হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড মিশিয়ে তৈরি হয় ধপধপে সাদা হেরোইন পাউডার। করাচি বন্দর থেকে সেই মাদক পাঠানো হয় ইরানের চাবাহার বন্দরে, সেখান থেকে আসে মুম্বই বা গুজরাতের বন্দরে। কাস্টমস খেয়াল রাখে কোন জাহাজের লাস্ট পোর্ট অফ কল কোথায়, সেই বুঝে তল্লাশি কমবেশি করা হয়। ইরানের বন্দর থেকে আসা জাহাজে সেরকম তল্লাশি হয় না, সেই সুযোগ কাজে লাগায় পাকিস্তানি মাদক ব্যবসায়ীরা।
ট্যাক্সিতে বসে এসব ভাবতে ভাবতে আরশি তন্ময় হয়ে গেছিল। টুং করে মোবাইলের আওয়াজে ওর সম্বিত ফিরে এল। একটা মেল এসেছে। ‘ইউনাইটেড নেশন’স অফিস অন ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম’ থেকে ওকে একটা মেল পাঠিয়ে লেখাটিকে পুরস্কৃত করা হবে সেই খবর জানিয়েছে। বিদ্যুচ্চমকের মতো একটা আইডিয়া আরশির মাথায় এল! মোবাইল থেকে পাক মাদকচক্র নিয়ে ওর লেখাটার পিডিএফ বের করে তার সঙ্গে এই ইউএন-এর চিঠিটা জুড়ে অনীকের দেওয়া নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ করে দিল। ছোটো করে নিজের পরিচয় এবং উদ্দেশ্য জানাল।
প্রায় সঙ্গেসঙ্গে মেসেজের গায়ে দুটো নীল দাগ পড়ল। আরশি অধীর হয়ে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। ডক্টর মুখার্জি টাইপিং দেখাচ্ছে!
‘শিলিগুড়ির ডক্টর্স কলোনির আরশি? প্রেসিডেন্সি? পলিটিকাল সায়েন্স?’
আরশি বিস্মিত হল মেসেজটা দেখে। লোকটা তাকে চিনল কী করে? ডিপি-তে ছবি নেই, তাই বোঝা যাচ্ছে না লোকটা কে! সে ভয়ে ভয়ে লিখল, ‘ইয়েস।’
‘আমি সায়ন্তন। বায়োলজি অনার্স। মনে পড়ছে? রাতে ফোন করছি।’
