কিনলিং মাউন্টেন রিজার্ভ, সাংশি, চীন।
জেনারেল ওয়াং দেমিনের দুটো হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, মুখ ঢাকা কালো কাপড়ের টুপিতে। সেই অবস্থায় তাঁকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে একদল সেনা। চোখে দেখতে পাচ্ছেন না বলে জেনারেল ওয়াং ঠিকমতো হাঁটতে পারছেন না। তিনি থেমে গেলেই রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিঠে-কাঁধে-ঘাড়ে মারছে তারা। তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়াতে হবে ভেবে জেনারেল ওয়াং ভয় পাচ্ছেন না, একজন ফৌজির শরীর ও মন সবসময় তৈরি থাকে বুলেটকে স্বাগত জানানোর জন্য, কিন্তু বাহিনীর অধস্তন সদস্যরা অন্তিম মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে যেরকম আচরণ করছে, সেটা মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
এখন শীতকাল। নানা রকমের পর্ণমোচী গাছের শুকনো পাতা মাড়িয়ে জেনারেলকে নিয়ে আসা হল একটা ফাঁকা জায়গায়। এখানে তাঁকে বেঁধে ফেলা হল ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের মতো একটা মোটা কাঠের ফ্রেমের সঙ্গে। হাতের বাঁধন খুলে হাত দুটো বাঁধা হল দু-পাশে। যিশু খ্রিস্টের মতো ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলেন জেনারেল। একটি কণ্ঠ সেনাদের আদেশ দিল বন্দুক হাতে নিয়ে নিশানা স্থির করতে। এক্ষুনি ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসবে গুলি।
আচমকা কেউ চড়া গলায় নির্দেশ দিল, ‘স্টপ!’ দেখতে পাচ্ছেন না জেনারেল, কিন্তু আওয়াজ শুনে বুঝলেন, সেনারা বন্দুক নামিয়ে ফেলল। সেই চড়া কণ্ঠস্বর আবার বলল, ‘ওর চোখের বাঁধন খুলে দাও। দেখুক, কে এসেছে!’ এক ঝটকায় সরিয়ে দেওয়া হল জেনারেল ওয়াংয়ের মাথায় পরানো কালো টুপিটা। জেনারেল তাকিয়ে দেখলেন সামনে কামানবাহী গাড়ির ওপর লাল রঙের গদি- আঁটা জমকালো চেয়ারে বসে রয়েছে তাঁর স্ত্রী মেইফেং।
‘আমাকে বাঁচাও মেইফেং, আমি কোনো দোষ করিনি,’ কাতর স্বরে বলে উঠলেন জেনারেল ওয়াং। কিন্তু মেইফেং কঠিন স্বরে বলল, ‘ব্যভিচারের একটাই শাস্তি দেমিন, মৃত্যুদণ্ড!’ এক লহমায় বন্দুক তুলে ধরে ট্রিগার টিপে দিল সেনারা, জেনারেল ওয়াং দেখতে পেলেন লাল-হলুদ রঙের আগুনের পেছন থেকে তাঁকে লক্ষ করে ঝাঁকে ঝাঁকে গরম সিসের টুকরো উড়ে আসছে!
ধড়মড়িয়ে বিছানার ওপর উঠে বসলেন জেনারেল ওয়াং। কী ভয়ানক স্বপ্ন, আর কী প্রচণ্ড বাস্তব! আতঙ্কে তাঁর শরীর ঘামে ভিজে গেছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। বেডসাইড টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে ঢক ঢক করে পুরোটা খেয়ে নিলেন তিনি, বুকের ভেতরের কষ্ট তাতে একটু কমল। তাকিয়ে দেখলেন, পাশে অকাতরে ঘুমোচ্ছে কর্নেল লি না। জেনারেল নিশ্চয়ই ঘুমের মধ্যে চেঁচামেচি করেননি, তাহলে লি না-র ঘুম ভেঙে যেত। তাহলে আরও বিব্রত হতেন তিনি।
কর্নেল লি-র দেহে একগাছি সুতো পর্যন্ত নেই। নির্মেদ ফর্সা শরীর, গভীর নাভি, সুডৌল স্তন, ভারী নিতম্ব, দু-পায়ের ফাঁকে নির্লোম গোলাপি ত্রিভুজ। ঠিক যেমন পছন্দ তাঁর। বহু যুদ্ধের পোড়-খাওয়া জেনারেল ওয়াং গতকাল রাতে বিছানার লড়াইয়ে পুরোপুরি পর্যুদস্ত হয়েছেন এই কন্যার কাছে। তার নতুন নতুন কৌশলের কাছে ধরাশায়ী হয়েছে জেনারেলের পঁয়তিরিশ বছরের বিবাহিত জীবনের সঞ্চিত সব অভিজ্ঞতা! ব্যাপারটা অ্যাডভেঞ্চার হতে চলেছে বুঝে জেনারেল চেয়েছেন আগ্রাসী হতে, মেইফেং কিংবা বেজিংয়ের পেশাদার রূপোপজীবিনীদের কাছে তাঁর যেসব ফ্যান্টাসি অধরা থেকে গেছে, কাল তার কিছু প্রয়োগ কর্নেল লি-র ওপর করেছেন তিনি। একেবারেই আপত্তি করেনি সে। এ মেয়ে খেলতে এবং খেলাতে জানে। জানে, কীভাবে ওপরওয়ালাকে খুশি করতে হয়। জেনারেলের শরীর থেকে শেষ বিন্দু আনন্দরস নিংড়ে তাঁকে দমছুট করে দিয়েছে। রাত তিনটে নাগাদ দু-জনে ঘুমোতে গেছেন।
নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লেন জেনারেল ওয়াং। কোমরে জড়িয়ে নিলেন একটা সাদা তোয়ালে। বাথরুমে ঢুকে পরিষ্কার হয়ে ঢুকলেন রান্নাঘরে। এত সকালে এক কাপ কফির জন্য চাকরবাকরদের উত্ত্যক্ত করে লাভ নেই, নিজেই বানিয়ে নেবেন। কফিমেকারে একটা বড়ো কাপের এক কাপ জল গরম করতে দিলেন। স্বপ্নটা দেখার পর থেকে মাথার ভেতরে যে অস্বস্তিটা তৈরি হয়েছে সেটাকে কাটাতে হলে ধোঁয়া ওঠা গরম কফি চাই। কফিতে কয়েক ফোঁটা রাম মিশিয়ে দিলে আরও ভালো হয়।
কফি তৈরি হয়ে গেলে কাপ হাতে নিয়ে বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডো খুলে তার সামনে দাঁড়ালেন জেনারেল ওয়াং। স্বপ্নে দেখেছিলেন শীতকাল, কিন্তু বাস্তবে এখন হেমন্ত। কিনলিং পাহাড়ের সবুজ ঢাল বেয়ে নেমে আসছে শীতল বাতাস, প্রাণ জুড়িয়ে যায় এই বাতাসের স্পর্শে। বেশ কিছুক্ষণ জানলার সামনে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে চেষ্টা করলেন তিনি। কিন্তু নাহ্, স্বপ্নের ছবিগুলো থেকে থেকে মনে পড়ে গিয়ে সব কিছু কেমন এলোমেলো করে দিচ্ছে! জেনারেল ওয়াং কমিউনিস্ট চীনের পিপলস আর্মির একজন ঝানু অফিসার, এসব স্বপ্ন-টপ্ন নিয়ে তিনি কোনোদিন ভাবেন না। তবে আজকের মতো এত জীবন্ত স্বপ্ন এর আগে তিনি কখনো দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না। স্বপ্নটা দেখার পর থেকে শুধু মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটবে। খুব খারাপ কিছু!
খারাপ কী ঘটতে পারে? তাঁর নারীসংসর্গের অভ্যাস সম্পর্কে মেইফেং ভালো মতোই অবহিত। কিন্তু মেইফেং এসব নিয়ে বিচলিত নন, স্বামীর উচ্চপদস্থ সামরিক চাকরির সুবাদে তিনি বেজিং শহরে আলিশান সরকারি অ্যাপার্টমেন্টে থাকছেন, পার্টি করছেন, সরকারি গাড়ি নিয়ে শপিং করছেন, ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুলে পড়াচ্ছেন— সব মিলিয়ে দিব্যি আছেন। তাঁর দিক থেকে বিশেষ ভয় নেই।
কর্নেল লি না? তাকেও ভয় পাওয়ার কারণ আছে বলে মনে হয় না। অনেক মহিলা অধস্তনকে এর আগেও বিছানায় নিয়ে গেছেন জেনারেল ওয়াং। চীনের সামরিক বাহিনীতে এ প্রায় অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কমবয়সি মহিলা অফিসারদের সিনিয়র পুরুষ অফিসারদের সঙ্গ দিতে হবে। কর্নেল লি-র মতো একজন চৌকস মেয়ে নিশ্চয়ই তাঁকে অপদস্থ করার জন্য জোর করে সহবাসের অভিযোগ আনবে না। কারণ সে খুব ভালো করে জানে তাকে এত অল্প বয়সে জীবাণু অস্ত্র গবেষণাগারের প্রধান হিসেবে নির্বাচন করেছেন জেনারেল ওয়াং। তা ছাড়া, যদি সহবাসে সম্মতি না থাকে তবে ইনার মঙ্গোলিয়া অটোনমাস রিজিয়ন থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পথ উজিয়ে সাংশি প্রভিন্সের এই ভিলায় কেন এলেন প্রৌঢ় জেনারেলের সঙ্গে দেখা করতে?
হ্যাঁ, এই ভিলায় নিশিযাপন করা নিয়ে একটা ভয় আছে। কিনলিং মাউন্টেন রিজার্ভের মধ্যে গত সাত-আট বছরে গোটা চল্লিশেক বিলাসবহুল ভিলা নির্মিত হয়েছে। এগুলো প্রধানত কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চপদস্থ কর্তাদের সম্পত্তি। এ ছাড়া, বেশ কয়েকজন সফল পেশাদার ডাক্তার-উকিল-অ্যাকাউন্ট্যান্ট এখানে ভিলা তৈরি করেছেন। পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে ভিলা নির্মাণ করার জন্য সাংশি প্রদেশের প্রশাসনকে প্রচুর ঘুস দিতে হয়েছে। তাতে বেজায় খেপেছেন দেশের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাংশি প্রভিন্সে কিনলিং পাহাড়ের অবস্থান এক মনোরম জায়গায়। একদিকে ইয়াংঝি নদী, অন্যদিকে বিখ্যাত ইয়াং সিকিয়াং। এই পাহাড়ের ঢালে বেআইনিভাবে একের পর এক ভিলা গড়ে উঠছে খবর পেয়ে প্রেসিডেন্ট ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হল বেশিরভাগ ভিলার মালিক হল তাঁর পার্টির পলিটবুরো সদস্যরা। বছরে দু-একবার যখনই ভিলা ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ করেন প্রেসিডেন্ট, তখনই তাঁকে বাকিরা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয় পরিবারের সদস্যদের নামে তিনি যে হংকং-এ কোটি কোটি ডলারের সম্পত্তি কিনে রেখেছেন, সে-বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাদের কাছে আছে। ব্যস, ওখানেই প্রসঙ্গ ধামাচাপা পড়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট বোঝেন পার্টির সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাঁর নেই। কিন্তু সেনা তাঁর নিয়ন্ত্রণে, তিনি সেনাকে চোখ রাঙাতে পারেন। সেজন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য এখানে ভিলা নির্মাণ করতে পারবেন না। এমনকী এসব ভিলায় তাঁদের থাকার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এখানে গতরাতে নিশিযাপন করে সেই আইন ভেঙেছেন তিনি এবং কর্নেল লি না।
অবশ্য জেনারেল ওয়াং এই ভিলার মালিক নন। তিনি নারী ও সুরায় কিঞ্চিত আসক্ত হলেও হাত পেতে পয়সা নেননি কখনো। তাঁর সারাজীবনের বেতনের টাকা পুরোটা জমালেও কুড়িটি ঘর বিশিষ্ট এই ভিলা বানানো সম্ভব নয়। এক পলিটবুরো সদস্যর কাছ থেকে ভিলায় থাকার জন্য চাবি চেয়ে নিয়েছেন তিনি। ভিলার মালিক সানন্দে চাবি তুলে দিয়েছেন, বলা যায় না, কোনদিন পালটা উপকার চাইতে হতে পারে!
বিছানার পাশে রাখা টেলিফোন টুং টাং শব্দ করে বেজে উঠল। ফোনটা রয়েছে লি না যেদিকে ঘুমিয়ে রয়েছে সেই প্রান্তে। জেনারেল ওয়াং যথাসম্ভব সন্তর্পণে বিছানায় বসে কানে রিসিভার ঠেকালেন। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, কর্নেল লি আড়মোড়া ভাঙতে শুরু করেছে।
‘গুড মর্নিং, জেনারেল,’ বেজিং থেকে জেনারেল ওয়াং-এর সেক্রেটারির গলা ভেসে এল, ‘উই হ্যাভ আ পিস অফ অ্যালার্মিং নিউজ ফর আস। রুস্তম কারিমভকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইস্তানবুল থেকে লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেছে।’
জেনারেল ওয়াং-এর কপালে ভাঁজ পড়ল। তিনি জানতে চাইলেন ঠিক কী ঘটেছে।
সেক্রেটারি জানাল, ইস্তানবুলে পৌঁছে রুস্তম কারিমভ তার বন্ধু ইব্রোক্সিম আবদুল্লায়েভের কাছে নির্ধারিত সূচি মেনে গেছিল। সেখানে পরিকল্পনা অনুসারে জীবাণুবাহী অ্যাটাচি তৈরি করতে দিয়েছে সে। কিন্তু তারপরেই সে রাতারাতি উবে গেছে ইস্তানবুল থেকে। শহরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। ইব্রোক্সিমকে জেরা করে জানা গেছে, রুস্তম রাশিয়া যাচ্ছে। সামারা শহরে কারো সঙ্গে তার দেখা করার কথা। সামারা শহরে কয়েকজন এজেন্টকে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত তারা কোনো খবর দিতে পারেনি।
‘অ্যাটাচিগুলোর কী খবর, রওনা হয়েছে জাহাজে?’ জেনারেল ওয়াং প্রশ্ন করলেন।
‘হ্যাঁ স্যার, জাহাজ এখন আরব সাগরে, আজ বন্দরে ভিড়বে। ইব্রোক্সিম কথা বলেছে মেহতা এন্টারপ্রাইসের সঙ্গে। তারা রেডি আছে মাল রিসিভ করার জন্য।’
‘কোল্ড চেন ঠিক আছে তো?’
‘হ্যাঁ, ইব্রোক্সিম তা-ই তো বলেছে। রুস্তম নিজের কাজ গুছিয়ে করেছে, ইব্রোক্সিমকে ঠিকঠাক ব্রিফিং করেছে। কিন্তু তারপর থেকেই লোকটার আর হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘সর্বনাশ, ইব্রোক্সিম জেনে গেছে ওই সুটকেসে ভাইরাস যাচ্ছে?’ আঁতকে উঠলেন জেনারেল।
‘হ্যাঁ স্যার, রুস্তম ওকে বলেছে এই অ্যাটাচির মধ্যে ভাইরাস আছে। ইব্রোক্সিম বলেছে, রুস্তম সাবধানে কাজ করার জন্য ওকে বিশেষ জোর দিয়ে বলেছিল, তখনই ও জানতে পারে।’
‘লিকুইডেট হিম ইমিডিয়েটলি। মাই অর্ডার।’ জেনারেল চেঁচিয়ে উঠলেন। কর্নেল লি না উঠে বালিশে হেলান দিয়ে বসে ছিল, জেনারেল ওয়াংকে চেঁচাতে দেখে ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠল, ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড ডিয়ার, কী হয়েছে?’
কর্নেল লি-র প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জেনারেল ওয়াং সেক্রেটারির কাছে জানতে চাইলেন, ‘আর ওই ইন্ডিয়ান সায়েন্টিস্টের খবর কী? সে কেমন আছে আমাদের বন্ধুদের কাছে? সে ঠিক আছে তো?’
‘আমার কাছে খবর নেই, স্যার। তবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল চেন গতকাল রাত দুটো অবধি আপনাকে এবং কর্নেল লি-কে টেলিফোনে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু লাইন পাওয়া যায়নি। মনে হয়, কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। আপনি কি একবার কমরেড চেন-এর সঙ্গে কথা বলবেন, স্যার? ওঁকে বলব আপনাকে ফোন করতে?’
‘দরকার নেই, চেন-এর মতো ভুলভাল লোকের সঙ্গে আমি কথা বলি না। এখনই সরাসরি ইসলামাবাদে কথা বলে নিচ্ছি। আরেকটা কথা, কর্নেল লি-কে যোগাযোগ করার চেষ্টা কোরো না, বাচ্চা মেয়ে, এসব শুনে ঘাবড়ে যেতে পারে। আমি পরে ওর সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি। সামারায় রুস্তমের চেনাজানা কেউ থাকে কি না সেটা চেক করতে বলো। আর হ্যাঁ, প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে ফোন এলে বলবে, আমি ল্যাব ৮৮-তে এসেছি, আজ রাতের মধ্যে ফিরে যাব।’
সেক্রেটারি ‘হ্যাভ আ নাইস ডে, স্যার’ বলে ফোন ছেড়ে দিল। এবার কর্নেল লি না-র দিকে তাকানোর ফুরসত পেলেন জেনারেল ওয়াং। লি না-র স্তন, গলা এবং গালে জেনারেলের আদরের চিহ্ন এখনও প্রকট। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে জেনারেল ওয়াং-এর বুক ধড়াস করে উঠল, গতকালের ভালোবাসা উধাও, শীতল দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে কর্নেল লি। খুব ঠান্ডা গলায় সে প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার জেনারেল, ফোনে আমার ব্যাপারে কাকে কী বললেন?’
‘একটা ব্যাড নিউজ ডার্লিং, রুস্তম কারিমভকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, লোকটা নাকি ইস্তানবুল থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে। হঠাৎ রাশিয়ার সামারা শহরে চলে গেছে, সেখানে নাকি কারো সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল—’
বিছানার একপাশে খুলে-রাখা শার্ট তুলে নিয়ে সেটাকে গায়ে গলানোর ফাঁকে ফের সেইরকম ঠান্ডা স্বরে কর্নেল লি বলল, ‘রুস্তম কারিমভকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাতে আমার কী করার আছে? ওকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব তো আমার নয়! আমার নাম তবে উঠল কেন?’
জেনারেল ওয়াং বেশ বিচলিত হলেন মনে মনে। লি না এভাবে কথা বলছে কেন? কিছুক্ষণ আগেও নিজের উন্মুক্ত বুকের ওপর জেনারেলের মুখ চেপে ধরে আদুরে বেড়ালের মতো অস্ফুট শব্দ করছিল যে মেয়ে, এখন তার কথা বলার ধরন দেখে শঙ্কিত হলেন তিনি। বিষয়টাকে হালকা করার জন্য বললেন, ‘আসলে রুস্তম মিসিং, সেকথা জানানোর জন্য ওরা কাল আমার সঙ্গে তোমাকেও ফোন করেছিল। ফোনে পায়নি, সেটাই বলল। আমি ম্যানেজ করে দিয়েছি—’
‘আপনি কী ম্যানেজ করেছেন আমার তা জেনে লাভ নেই, জেনারেল,’ সাপের মতো ফুঁসে উঠল কর্নেল লি না, ‘আপনি শুনে রাখুন, আমি গরিব চাষি পরিবারের মেয়ে। অনেক কষ্টে পড়াশোনা করে ডাক্তার হয়েছি, মিলিটারিতে জয়েন করেছি। আমার চাকরির যদি কোনো ক্ষতি হয় তবে আমি আপনাকে ছাড়ব না!’
এত চট করে কর্নেল লি-র আসল চেহারা বেরিয়ে আসবে ভাবতে পারেননি জেনারেল ওয়াং। দমে গেলেন তিনি। হ্যাঁ, ক্রাইসিস একটা হয়েছে ঠিকই, তবে সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা ঠিক রাশিয়া থেকে খুঁজে বের করবে রুস্তম কারিমভকে। রুস্তম যে কাজ করেছে তা গর্হিত হলেও খুব স্বাভাবিক। বহুদিন দেশছাড়া যে মানুষ, একটু আলগা পেলে সে খুঁটি-ছুট গোরুর মতো পালাতে চাইবে, এমন হতেই পারে। কিন্তু কথা হল, সেজন্য কর্নেল লি এমন আচরণ করবে কেন? জেনারেল ওয়াং তার ওপরওয়ালা জেনেও মেয়েটি যেসব কথা তাঁকে এইমাত্র শোনাল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে তিনি কর্নেলের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ করতেন। আপাতত তিনি নিজে অনেকগুলো শৃঙ্খলা ভেঙে বসে আছেন, তাই এই মুহূর্তে পুরোপুরি কাউন্টার অ্যাটাকে যেতে পারছেন না। কিছুটা নীচুস্বরে তিনি বললেন, ‘আমি দেখছি তো ব্যাপারটা, তুমি খামোখা এত টেনশন করে এই সুন্দর সকালটা নষ্ট কোরো না।’
এক হ্যাঁচকা টানে বিছানার সাদা চাদরটাকে তুলে নিয়ে সেটাকে দ্রুত ভাঁজ করে ফেলল কর্নেল লি না। বিছানায় পড়ে থাকা ব্রেসিয়ার-প্যান্টি নিয়েও ভাঁজ করে এক জায়গায় জড়ো করল। তারপর একপাশে দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা ব্যাকপ্যাকের মধ্যে জিনিসগুলোকে ঢোকানো শুরু করল। জেনারেল ওয়াং বুঝতে পারছিলেন না, কী করতে চাইছে মেয়েটি। তিনি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, ‘এসব কী হচ্ছে ডার্লিং—’
‘ডোন্ট কল মি ডার্লিং এনি মোর,’ কঠিন স্বরে বলল কর্নেল লি, ‘এগুলো আপনার দুষ্কর্মের প্রমাণ। এসবের মধ্যে আপনার বীর্য, মুখের লালা এবং শরীরের লোম পাওয়া যাবে। আমি নিজের ইচ্ছেয় আপনার কাছে আসিনি, আমাকে মেসেজ পাঠিয়ে জরুরি আলোচনার নাম করে আপনি এখানে ডেকে এনেছেন, সেই মেসেজও আমার কাছে রয়েছে। যদি ল্যাবে ফিরে আমি দেখতে পাই আমার সার্ভিসের কোনো ক্ষতি হয়েছে, তাহলে আপনি বিপদে পড়বেন জেনারেল, খুব বড়ো বিপদ হবে আপনার—’
শার্ট আগেই পরা হয়ে গেছিল, এবার প্যান্টে কোনোরকমে পা ঢুকিয়ে দ্রুত পরে নিয়ে ব্যাগ কাঁধে ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কর্নেল লি। এতক্ষণে ভয় অন্তর্হিত হয়ে ক্রোধ জমা হয়েছে জেনারেলের মনে, একটা সেদিনকার মেয়ে তাঁকে ব্ল্যাকমেল করার ভয় দেখাচ্ছে! তিনি চুপচাপ মেনে নিচ্ছেন ব্যাপারটা? কর্নেল লি-র গাড়ি স্টার্ট করার আওয়াজ শোনার সঙ্গেসঙ্গে তিনি তাঁর কর্তব্য স্থির করে ফেললেন।
সবচেয়ে কাছের এয়ারপোর্ট হল জিয়াং জিয়াং ইয়াং, এখান থেকে খুব বেশি হলে পঞ্চাশ কিলোমিটার পথ। নিশ্চয়ই সেখানেই যাবে কর্নেল লি না। তারপর নিজের পরিচয় দিয়ে মঙ্গোলিয়াগামী কোনো বিমানে উঠবে। কপাল ভালো থাকলে হয়তো ছোটোখাটো সামরিক বিমান জুটে যেতে পারে। যেভাবেই ফিরতে চেষ্টা করুক, এখন কম করে হলেও পাঁচ-ছ-ঘণ্টা সময় পাবেন জেনারেল ওয়াং। মিনিস্ট্রি অফ স্টেট সিকিউরিটির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে বেশ কিছু দুর্বৃত্তকে হাতে রাখতে হয়। তাদের একজন হল হিটম্যান ঝাও জুন। তাকে ফোন করলেন নিজের মোবাইল থেকে। তিন-চারবার রিং হওয়ার পর ঘুমজড়ানো গলা শোনা গেল, ‘হ্যালো—’
জেনারেল বুঝলেন ঝাও মোবাইলের পর্দায় নিশ্চয়ই তাঁর নাম লক্ষ করেনি, তাহলে অবশ্যই অভিবাদনটুকু জানাত। বাধ্য হয়ে তিনি নিজেই নিজের পরিচয় দিলেন। এবার চমকে উঠে সতর্ক হল ঝাও জুন। জেনারেল ওয়াং যখন এত সকালে ফোন করেছেন, তখন অবশ্যই গুরুতর কিছু ঘটেছে! সে বলল, ‘বলুন স্যার, আপনার জন্য কী করতে পারি?’
জেনারেল ওয়াং জানালেন, একটা টপ সিক্রেট প্রোজেক্ট নিয়ে আলোচনা করার জন্য তিনি গতকাল কিনলিং মাউন্টেন রিজার্ভের একটা ভিলায় এসেছেন। কিন্তু কর্নেল লি না নামে একজন মহিলা অফিসারের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাচ্ছে, এই মহিলা দেশবিরোধী শক্তির হয়ে কাজ করছেন। সকাল থেকে সেই কর্নেলকে ভিলায় দেখা যাচ্ছে না। তিনি পরিচারকদের কাছে খবর পেয়েছেন, কিছুক্ষণ আগে গাড়ি নিয়ে সেই অফিসার জিয়াং জিয়াং ইয়াং এয়ারপোর্টের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট চাইছেন ওই অফিসার পালিয়ে যাওয়ার আগেই তাকে খতম করতে হবে। এমনকী লাশ এবং সঙ্গের সব জিনিসপত্র গায়েব করে দিতে হবে যাতে কেউ জানতে না পারে। ইমিডিয়েটলি সবাইকে কাজে লাগাতে হবে। কর্নেলের একটা ছবিও তিনি মোবাইলে পাঠিয়ে দিলেন।
ঝাও সংক্ষেপে জানাল, এক্ষুনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, চিন্তা নেই কোনো।
সকালের সেই ভয়ংকর দুঃস্বপ্নর পর আসলে নিজের ওপর আস্থাটা সাময়িকভাবে টাল খেয়ে গেছিল, বুঝতে পেরেছেন জেনারেল ওয়াং। এখন সেই হারানো আত্মবিশ্বাস একটু একটু করে ফিরে আসছে। ফের বড়ো এক কাপ কফি এবং কয়েকটা টোস্ট বানিয়ে তিনি জানলার ধারে এসে বসলেন। এবার ইসলামাবাদে একবার ফোন করতে হবে। বেজিং টাইম থেকে ইসলামাবাদ টাইম তিন ঘণ্টা পিছিয়ে, এখন সকাল সাড়ে সাতটা, মানে ইসলামাবাদে ভোর সাড়ে চারটে। আরেকটু পরে তিনি ফোনটা করবেন। ভাইরাস অ্যাটাচির ব্যাপারে ওদের কাছে কী ডেভেলপমেন্ট আছে তা জানা দরকার।
কফি-টোস্ট শেষ করে একতলায় নেমে এলেন জেনারেল ওয়াং। বাইরে প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে রয়েছে হারবিন জেড-৯ চপার। এখানকার কাজ শেষ হলে এই চপারে তিনি তাইয়ুয়ান উসু এয়ারপোর্টে চলে যাবেন, সেখান থেকে বেজিং। পাইলট এবং পার্সোনাল সিকিউরিটি অফিসারকে তিনি সকাল ন-টা তিরিশ মিনিটে ফ্লাই রেডি কন্ডিশনে থাকার নির্দেশ দিয়ে ওপরে ফিরে গেলেন। স্নান সেরে বেরিয়ে এসে ইউনিফর্ম পরে স্যাটেলাইট ফোন নিয়ে চেয়ারে বসলেন।
আইএসআই-এর ইন্ডিয়া অপারেশন ডেস্কের প্রধান ব্রিগেডিয়ার মির্জা তবরেজ বেগ-কে পাওয়া গেল একবার ডায়াল করেই। দু-একটা প্রীতিসূচক কথাবার্তার পর জেনারেল ওয়াং প্রশ্ন করলেন, ‘ব্রিগেডিয়ার সাহেব, আজ সব অ্যাটাচি পৌঁছে যাবে, আপনার লোককে বলুন পারলে যেন আজই বন্দর থেকে মাল খালাস করে নেয়।’
‘মাশাল্লা জনাব,’ ব্রিগেডিয়ার বেগ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন, ‘এবার হিন্দুস্তান বুঝবে পাক-চীন আয়রন ফ্রেন্ডশিপ কাকে বলে! আমরা দশদিনের মধ্যে সারা ভারতে ভাইরাস ছড়িয়ে দেব, আল্লার কসম।’
ব্রিগেডিয়ারের উচ্ছ্বাস কিছুটা কমলে জেনারেল ওয়াং আসল কথায় এলেন, ‘ওই ইন্ডিয়ান সায়েন্টিস্টের কী খবর?’
‘লোকটাকে নিয়ে খুব চাপে আছি, জনাব।’ একটু অস্বস্তি ফুটে বেরোল ব্রিগেডিয়ার বেগের গলায়, ‘ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট লোকটাকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে, আমরা ডেরা বদল করে করে কোনোভাবে সামাল দিচ্ছি। এভাবে কতদিন সামলানো যাবে বুঝতে পারছি না। ওর টেকনিক্যাল কথা আমার কোনো আদমি বুঝতে পারছে না, শুধু শুধু লোকটাকে আটকে রেখেছি আমরা। কিন্তু এখন ছেড়ে দেওয়াও যাবে না—’
‘ভিক্টর বোগদান যোগাযোগ করেনি? তার এতদিনে নেপালে ঢুকে যাওয়ার কথা!’
‘জি জনাব, ভিক্টর ফোন করেছিল। কয়েকদিন আগে কাঠমান্ডুতে পৌঁছে রয়্যাল নেপাল হলিডেজ হোটেলে উঠেছে। কিন্তু হিন্দুস্তান এখন নেপাল বর্ডারে খুব কড়া পাহারা বসিয়েছে, কিছুতেই ভিক্টরকে ইন্ডিয়াতে ঢোকানো যাচ্ছে না।’
ভিক্টর বোগদান কাঠমান্ডু পৌঁছেছে জেনে কিঞ্চিৎ স্বস্তি পেলেন জেনারেল ওয়াং। যাক, সব পরিকল্পনা তাহলে ঘেঁটে যায়নি। রুস্তম কারিমভের কাছ থেকে লোকটা সম্পর্কে যা শুনেছেন তাতে লোকটা বিরাট মাপের বিজ্ঞানী না হলেও একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো লোক নয়। বয়সে রুস্তমের কাছাকাছি, আমেরিকার কোন একটা নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেছে। কিন্তু আমেরিকায় থাকাকালীন কী-একটা কারচুপি করে ধরা পড়ে সে-দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়। ভিক্টর চায় খুব দ্রুত বড়োলোক হতে। সেজন্য অপকর্ম করতে তার আপত্তি নেই। রুস্তমের সুপারিশে তাকে মোটা টাকায় ভাড়া করেছে চীনা গুপ্তচর সংস্থা।
আগেই জানা ছিল, ওই ভারতীয় বিজ্ঞানীকে দেশের বাইরে বের করে নিয়ে আসা যাবে না। তার পেট থেকে খবর বের করতে হলে কোনো বিজ্ঞানীকে পাঠাতে হবে। কিন্তু কাকে পাঠানো হবে? কোনো চীনা বা পাকিস্তানি বিজ্ঞানী ভারতে গিয়ে ধরা পড়লে মহা বিপদ। এই সমস্যার সমাধান হয়েছে ভিক্টরের মাধ্যমে, তাকে নেপালে পাঠানো হয়েছে, সেখান থেকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থার।
ব্রিগেডিয়ার মির্জা তবরেজ বেগকে কাজের গতি বাড়ানোর জন্য আরেক দফা তাড়া দিয়ে ফোন ছেড়ে দিলেন জেনারেল ওয়াং। এবার বেরোতে হবে। কিন্তু এখনও কর্নেল লি না-র কোনো খবর পাওয়া গেল না কেন? মেয়েটা কি অন্য রাস্তায় যাচ্ছে তাহলে? তিনি মোবাইল থেকে ফোন করলেন ঝাও জুনকে। বেশ ক-বার রিং হয়ে যাওয়ার পর ঝাও ফোন তুলল।
‘কী খবর?’
‘গাড়িটা পেয়েছি স্যার, এয়ারপোর্ট যাওয়ার রাস্তায় হাইওয়ের ওপর একধারে দাঁড় করানো রয়েছে। কিন্তু ভেতরে কেউ নেই। কোনো জিনিসপত্রও দেখছি না।’
‘উল্লুক কোথাকার!’ রাগে চিৎকার করে উঠলেন জেনারেল ওয়াং দেমিন, ‘একটা কাজও তোমরা ঠিকমতো করতে পারো না। এখান থেকে মেয়েটা পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে তোমাকে জানিয়েছি, নিশ্চয়ই তোমরা কাজে নামতে দেরি করেছ। নইলে এমন হবে কী করে! যে করে হোক মেয়েটাকে খুঁজে বের করে খতম করার চেষ্টা করো। হাইওয়ের দু-পাশে সব গ্রামে তল্লাশি চালাও—’
ঝাও কী-একটা কৈফিয়ত দেওয়ার চেষ্টা করল, কানে না তুলে ফোন কেটে দিয়ে নীচে নেমে এলেন জেনারেল ওয়াং। তাঁর চপার আকাশে ডানা মেলার জন্য তৈরি হয়ে গেছে, তিনি সিটে বসে বেল্ট বাঁধার সঙ্গেসঙ্গে রোটর ব্লেড ঘুরতে শুরু করে দিল। হালকা লাফে বাতাসে ভেসে উঠল হেলিকপ্টার।
এক ঘণ্টা পরে তাইয়ুয়ান উসু এয়ারপোর্টে পৌঁছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল চেন-কে ঘোর অনিচ্ছা নিয়ে ফোন করলেন জেনারেল ওয়াং। লোকটাকে তিনি বিশেষ পছন্দ না করলেও চেন যেহেতু পদমর্যাদায় তাঁর ঠিক পরেই, সেজন্য কর্নেল লি-র ব্যাপারে কিছুটা জানিয়ে রাখা ভালো।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল চেনের সঙ্গে যোগাযোগ হতে সে খুব উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘গতকাল থেকে এসব কী হচ্ছে জেনারেল, আমি তো পাগল হয়ে যাচ্ছি!’
‘কী হয়েছে?’ জানতে চাইলেন জেনারেল ওয়াং।
‘অনেকগুলো ইসু, স্যার। প্রথমত, রুস্তম কারিমভকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, ভিক্টর বোগদান জানতে চাইছে ওর কাছে অ্যাটাচির একটা কনসাইনমেন্ট এসেছে, সেগুলো নিয়ে কী করবে? এখন হোটেলের একটা ঘরে রেখে দিয়েছে, কিন্তু হোটেল মালিক আর রাখতে রাজি হচ্ছে না। আর জেনারেল, তিন নম্বর ব্যাপারটা আপনাকে নিয়ে। কর্নেল লি না একটু আগে অভিযোগ করেছে, আপনি ওকে ধর্ষণ করেছেন। ওর কাছে নাকি সব এভিডেন্স আছে।’
তীব্র আতঙ্কে প্রায় দম বন্ধ হয়ে এল জেনারেল ওয়াং-এর। তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘কর্নেল লি না এখন কোথায়? কার কাছে এসব অভিযোগ করেছে সে?’
‘কর্নেল লি না এখন কিনলিং মাউন্টেন রিজার্ভের কোনো একটা ভিলায় আছে। কী সব পাগলের মতো কথাবার্তা বলছে মেয়েটা! আপনি ওকে খুন করতে পারেন বলে সকাল বেলা নাকি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছিল। মাঝরাস্তায় গাড়ি রেখে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে কমপ্লেন করেছে, আমাদের এখানেও রিপোর্ট করেছে। আচ্ছা স্যার, ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছে বলুন দেখি? ভিক্টরের কাছে যে অ্যাটাচি গেছে, সেগুলো কাদের? আমাদের কনসাইনমেন্ট তো এখন জাহাজে!’
হঠাৎই জেনারেল ওয়াং অনুভব করলেন তাঁর দুটো পায়ে কোনো জোর নেই, মনে হচ্ছে জেলি দিয়ে তৈরি। চোখের সামনেও সব কিছু ঝাপসা হয়ে যেতে দেখলেন তিনি। উত্তর না দিয়ে ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন জেনারেল ওয়াং। সকালে দেখা স্বপ্নটা এত দ্রুত সত্যি হতে চলেছে ভাবতে পারেননি!
