জাহান্নমের সওদাগর – ১

পোখরা, নেপাল। কুড়ি বছর আগে।

বিকেলের দিকে ফেওয়া লেকের চারপাশটা জমজমাট হয়ে ওঠে। হোটেল থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে রুস্তম কারিমভ লেকের ধারে এসে দাঁড়াল।

যদিও সারাদিন লেকের ধারে টুরিস্টের ভিড় লেগে রয়েছে, কিন্তু এ সময় ভিড়টা রোজ বাড়তে থাকে। যেসব টুরিস্ট ভোরবেলায় ‘মাছাপুছরে’ বা ‘ফিশ টেল’ নামে পরিচিত অন্নপূর্ণা রেঞ্জের অদ্ভুত ত্রিকোণাকৃতি চুড়োর ওপর সূর্যোদয়ের ছবি তোলা মিস করে গেছে, তারা সারাদিন গাড়ি নিয়ে ছোটাছুটি করে ব্যাট কেভ, ডেভি’স ফলস বা গোর্খা মিউজিয়াম দেখা শেষ করে সূর্যাস্তর ছবি তুলবে বলে লেকের ধারে চলে এসেছে। সারাদিন পর্যটক নিয়ে লেকের জলে ভেসেছে যে নৌকোগুলো, সেগুলো একে একে পাড়ে এসে নোঙর করছে। বকের ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে জলের ওপর।

লেকসাইড রোডের অসংখ্য ছোটো ছোটো পানশালাগুলোর আলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। দু-এক জায়গায় লাইভ ব্যান্ডের মিউজিশিয়ানরা তাদের জিনিসপত্র সাজাচ্ছে, কোথাও বারবিকিউয়ের আয়োজন হচ্ছে। বাতাসে ভাসছে অ্যালকোহল এবং ঝলসানো মাংসর মিশ্র সুঘ্রাণ।

ডিসেম্বর মাসের শেষ এটা। ঠান্ডা পড়েছে বেশ। ভারতীয় টুরিস্টরা গায়ে জ্যাকেট, গলায় মাফলার, কানঢাকা টুপি পরে হি-হি করে কাঁপছে। কিন্তু রুস্তমের কাছে এই ঠান্ডা কিছু নয়, তার দেশ উজবেকিস্তানে এরকম হালকা শীতে লোকে সোয়েটার বা জ্যাকেট কিছুই পরে না, পশমের জামা পরে দিব্যি কাজ চালিয়ে দেয়। লেকের ধারে প্রচুর বিদেশি টুরিস্ট ঘুরছে, তাদের কেউ কেউ হাতকাটা গেঞ্জি আর বারমুডা পরে রয়েছে। এদের অনেকেই গাঁজা টেনে রয়েছে বলে এদের শীতের অনুভূতি এখন কম। কিছু বিদেশি, তাদের চেহারা দেখে রুস্তম অনুমান করল আমেরিকান হতে পারে, অবশ্য গায়ে সোয়েটার চাপিয়েছে।

রুস্তম পরেছে ফ্লানেলের রঙিন শার্ট, ধূসর কর্ডের ট্রাউজার। পায়ে স্নিকার। রুস্তমের বয়স উনচল্লিশ, উচ্চতা পাক্কা ছ-ফুট, চওড়া কাঁধ এবং সরু কোমর। তার চেহারায় এশিয়া ও ইউরোপ, দুই মহাদেশের ছাপ রয়েছে। তার চুল আর চোখের মণির রং কালো, কিন্তু গায়ের রং ইউরোপের মানুষের মতো সাদা।

বেশিক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা রুস্তমের পক্ষে সম্ভব হল না। ছবি তোলার জন্য টুরিস্টরা ঠেলাঠেলি লাগিয়েছে। কতরকম অ্যাঙ্গল থেকে ছবি তোলা যায় তার প্রতিযোগিতা চলছে। রুস্তম কিছুটা বিরক্ত হল। তারপর একটু এগিয়ে ‘ক্লাব আমস্টারডাম’ নামে একটা পানশালার সামনে এসে দাঁড়াল। ঘড়িতে চারটে কুড়ি। সময় হয়ে গেছে।

‘মাছাপুছরে কি অন্নপূর্ণা রেঞ্জের সবচেয়ে উঁচু পিক?’

প্রশ্ন শুনে পাশের লোকটার দিকে তাকাল রুস্তম। ছেলেটার বয়স তিরিশের বেশি হবে না। উচ্চতা পাঁচ ফুট ন-দশ ইঞ্চি হবে। ছিপছিপে, মেদহীন শরীর। টি-শার্ট আর জিন্স পরা, বুকের কাছে সানগ্লাস ঝুলছে। চোখ-মুখ ধারালো।

‘না, ফিশ টেল সবচেয়ে উঁচু পিক নয়। সবচেয়ে উঁচু হল অন্নপূর্ণা ওয়ান।’ জবাব দিল রুস্তম।

ছেলেটা হাসল। তারপর করমর্দন করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল, ‘আমি ফ্যালকন।’

হাসল রুস্তমও। ছেলেটার প্রসারিত হাত চেপে ধরে বলল, ‘দিস ইজ আইবিস। গ্ল্যাড টু মিট ইউ।’

‘আমাদের একটু বসে কথা বলতে হবে। কোথায় যেতে পারি আমরা?’ রুস্তম জানতে চাইল।

হাতের ইশারায় লেকসাইড রোডের পুব দিক দেখাল ছেলেটা, ‘ওদিকে চলুন। ওখানে কিছুটা ফাঁকা পাওয়া যাবে।’

পর পর রেস্তরাঁ, সুভেনির শপ, ট্র্যাভেল এজেন্সি, মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টার, বইয়ের দোকান ইত্যাদি পেরিয়ে ছেলেটার পাশাপাশি হেঁটে চলল রুস্তম। কিছুটা এগোনোর পর রাস্তা পার হয়ে একটা তিনতলা হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াল ছেলেটা। নিয়ন সাইনবোর্ডে লেখা শাংগ্রিলা গেস্ট হাউস। একতলার কাচের মোটা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার সঙ্গেসঙ্গে উদ্দাম মিউজিকের চাপা আওয়াজ কানে এল রুস্তমের। এখানে সম্ভবত ছেলেটা নিয়মিত আসা-যাওয়া করে, তাকে কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। তার পিছু পিছু হেঁটে দোতলায় উঠে এল রুস্তম। এখানে মিউজিকের আওয়াজ আরও জোরালো, একটা বন্ধ দরজার পেছন থেকে আসছে সেই শব্দ। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একটা উনিশ-কুড়ি বছরের মেয়ে সিগারেট খাচ্ছে। হট প্যান্ট, ডেনিমের খাটো টপ, হাইহিল জুতো এবং চড়া মেক-আপ। মেয়েটা রুস্তমের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। সেটা লক্ষ করে ছেলেটা তাকে স্থানীয় ভাষায় কিছু ধমক দিল, অপ্রস্তুত হয়ে সরে গেল মেয়েটা। রুস্তমরা দু-জনে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

ভেতরে অন্ধকার। তারস্বরে হিন্দি গান চলছে। একটা বৃত্তাকার ছোটো মঞ্চে দুটি মেয়ে নাচছে। প্রায় উলঙ্গ, রুমালের মতো একটুকরো কাপড় দিয়ে তৈরি ব্রা আর প্যান্টি পরা। দুটি মেয়েরই চুলে রং করা, স্টেজের চারপাশে বসানো স্ট্রোব লাইটের ঝলকানিতে ওদের বেশ আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। কিন্তু রুস্তম জানে, এরা সবাই গরিব ঘরের মেয়ে, পেটের দায়ে নিতান্ত বাধ্য হয়ে এই লাইনে নেমেছে।

ঝলমলে আলো নিভিয়ে মেয়ে দুটিকে যদি বাইরে নিয়ে এসে ওদের সব মেক-আপ ঘষে তুলে ফেলা হয় তবে অপুষ্ট চেহারার দু-জন নিরীহ কিশোরীকে খুঁজে পাওয়া যাবে।

তার দেশেও একই অবস্থা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে স্বাধীনতা মিলেছে ঠিকই, কিন্তু দারিদ্র্য আষ্টেপৃষ্ঠে দেশটাকে নাগপাশে বেঁধে ফেলেছে।

একটা ছোটো টেবিলে মুখোমুখি দুটো চেয়ার। ফ্যালকনের সঙ্গে সেখানে বসল রুস্তম। চারপাশে এরকম আরও ছোটো ছোটো টেবিল রয়েছে। সেখানে বসে অনেকে মদ্যপান করছে। সারা ঘরে অ্যালকোহল, সিগারেট এবং নানারকম খাবারের একটা মেশানো গন্ধ ঘুরপাক খাচ্ছে।

রুস্তমরা বসার সঙ্গেসঙ্গে অর্ডার নেওয়ার জন্য একটা মেয়ে এগিয়ে এল। এই মেয়েটারও পোশাক খুব ছোটো। ডিপ নেক টপের সঙ্গে খাটো স্কার্ট। হাতের ট্রে-তে মেয়েটা গোল করে পাকানো দুটো ভেজা তোয়ালে এনেছে দু-জনের জন্য। হাত থেকে ট্রে নামিয়ে রেখে মেয়েটা রুস্তমের গা ঘেঁষে প্রায় টেবিলের ওপর শুয়ে পড়ল। ময়লা অন্তর্বাসের আড়াল থেকে উঁকি দিল শঙ্খর মতো একজোড়া স্তন। সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল রুস্তম। তার অস্বস্তি বুঝতে পেরে রুক্ষভাবে মেয়েটাকে কিছু বলল ফ্যালকন। মেয়েটা ভয় পেয়ে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

‘কী নেবেন, সাহেব?’ জানতে চাইল ছেলেটা।

‘শুধু বিয়ার।’ রুস্তম বলল।

‘সঙ্গে?’

‘পপকর্ন। সল্টেড।’

ফ্যালকন এবার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দো বড়া কার্লসবাড লেকে আও। সাথমে পপকর্ন দেনা, সল্টেড। অর আভি ইধার পরেশান মৎ করনা।’

মেয়েটা নিঃশব্দে মাথা নেড়ে চলে গেল।

‘টাকা পেয়ে গেছেন নিশ্চয়? এবার জিনিসটা দিন।’ হাত পাতল ছেলেটা।

পকেট থেকে একটা ছোটো বাক্স বের করে টেবিলে রাখল রুস্তম। তাসের প্যাকেটের মতো সাইজ, গা-টা শক্ত পলিমার দিয়ে তৈরি। বলল, ‘এর ভেতরে দুটো ভায়াল আছে। খুব সাবধানে রাখতে হবে। কে নিয়ে যাবে এখান থেকে? তার সঙ্গে একবার কথা বলতে পারলে ভালো হত।’

ছেলেটা বাক্সটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল। একবার খুলতে চাইল জিনিসটাকে। রুস্তম ইশারায় সেটা ফেরত দিতে বলল ফ্যালকনকে। বাক্সটা হাতে নিয়ে আলতো চাপে ঢাকনা খুলে দেখিয়ে দিল কীভাবে খুলতে হবে। বাক্সর ভেতর থেকে উঁকি দিল ইঞ্জেকশনের অ্যামপিউলের মতো ফিনফিনে কাচের তৈরি দুটো সরু শিশি। শিশির মধ্যে ঘোলাটে জলের মতো কিছু জিনিস রয়েছে। তারপর ফের মুখ বন্ধ করে ফ্যালকনের হাতে ফেরত দিল।

‘ভায়াল দুটো অপারেশনের আগে বাক্সর বাইরে বের করা ঠিক হবে না। জিনিসটা রেফ্রিজারেটরে রাখতে হবে, তবে ডিপ ফ্রিজে নয়। খেয়াল রাখবে যাতে ঠোকাঠুকিতে কাচ ভেঙে না যায়। কাচ ভেঙে গেলে কিন্তু বিপদ, নিজে মরবে অন্যকেও মারবে, কেউ বাঁচবে না এর হাত থেকে।’

মুখ হাঁ করে রুস্তমের কথা শুনছিল ছেলেটা। রুস্তম থামতে জানতে চাইল, ‘এটা কি বিষ? এর ট্রিটমেন্ট নেই কোনো?’

বিষ নয়, ভায়ালে রয়েছে ভাইরাস। রুস্তম ভাইরাসের নাম জানে, কিন্তু বলতে চাইল না। ফ্যালকন কোন লেভেলের এজেন্ট তার জানা নেই, জানার আগ্রহও নেই। কিন্তু তার পেশায় বেশি কথা না বলাই দস্তুর। সে বলল, ‘নাম জানি না। এর ট্রিটমেন্ট আছে, কিন্তু ইন্ডিয়ার হাতে নেই। ইন ফ্যাক্ট, ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে কোনো দেশের হাতে নেই। এখানে এখনও এই জিনিস পরীক্ষা করা হয়নি। তোমাদের হাত ধরে ইন্ডিয়ায় প্রথমবার হবে।’

ওয়েটার মেয়েটি বিয়ারের বোতল আর পপকর্নের বাটি নিয়ে ফিরে এসেছে। পরিপাটি করে সাজিয়ে দিল টেবিলের ওপর। গেলাসে বিয়ার ঢেলে দিল বোতল কাত করে। রুস্তমের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি হাসল। হাসিটা ফিরিয়ে দিল রুস্তম। পকেট থেকে কয়েকটা নোট বের করে মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিল। মেয়েটি টাকাগুলো মাথায় ছুঁইয়ে সরে যেতেই ফ্যালকনের দিকে তাকিয়ে সে বুঝল ব্যাপারটা ছেলেটা মোটেই পছন্দ করেনি। মনে মনে হাসল রুস্তম। এই ছোকরা কতদিন সিক্রেট সার্ভিসে কাজ করছে তার জানা নেই, কিন্তু আচরণে অনেকটাই আনাড়ি। পানশালায় এসে অস্বাভাবিক ব্যবহার করতে নেই এটা ওকে কেউ শেখায়নি। যত বেশি রুক্ষ ব্যবহার করা হবে মেয়েটির সঙ্গে, তত বেশি করে সে মনে রাখবে রুস্তমের মুখ। রুস্তম হয়তো আর কোনোদিন নেপালে আসবে না, কিন্তু পেছনে একটা সূত্র রেখে যাওয়া তার কাছে মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়।

পরিস্থিতি বদল করার জন্য রুস্তম জানতে চাইল, ‘এটা ইন্ডিয়ায় কে নিয়ে যাবে? তার সঙ্গে একবার কথা বলা যায়? তাকে সেফটি টিপস বলে দেওয়া দরকার।’

‘আমি নিয়ে যাব কঁাকরভিটা বর্ডার পর্যন্ত। ওখানে লোক থাকবে। আমি তাকে হ্যান্ডওভার করব। ওপারে ইন্ডিয়ার পানিট্যাঙ্কি। সেখান থেকে এটা চলে যাবে শিলিগুড়ি।’

‘এখান থেকে কঁাকরভিটা কতদূর? কীভাবে যাবে?’

ফ্যালকন একটু ভেবে বলল, ‘প্রায় ছ-শো কিলোমিটার। বাসে যাব, পোখরা থেকে বাস সার্ভিস আছে।’

‘রাস্তার অবস্থা কেমন?’

‘হাইওয়ে খারাপ নয়। দু-এক জায়গায় রাস্তা খারাপ আছে।’

‘বি কেয়ারফুল।’ গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল রুস্তম, ‘আইস বক্সে করে নিয়ে যেয়ো, অনেকটা রাস্তা। বক্সটা ঠিকমতো রাখবে নিজের কাছে, ঝাঁকুনিতে যেন ভেঙে না যায়। জিনিসটা তোমার গায়ের ওপর ভেঙে গেলে তোমাকে বাঁচানোর কেউ নেই কিন্তু! আই হোপ, জিনিসটা কতটা মারাত্মক তা আমি তোমাকে বোঝাতে পেরেছি?’

ছেলেটা একটু আহত হল কথা শুনে। রাগ রাগ গলায় বলল, ‘আমি হেমেন্দ্র বিশ্বকর্মা, মিস্টার আইবিস। পিপল কল মি “ইঞ্জিনিয়ার”। ডু ইউ নো এনিথিং অ্যাবাউট আওয়ার গড বিশ্বকর্মা? হি ইজ দ্য ডিভাইন আর্কিটেক্ট, ক্রিয়েটর অফ দ্য ওয়র্ল্ড। তাঁর মতো আমিও একজন কারিগর। আমার হাতে এমন জিনিস তৈরি হয়, যাতে সবসময় সতর্কতা লাগে। আমি অসাবধান হলে এই কাজ করতে পারতাম না।’

ফের মনে মনে হাসল রুস্তম। যতটা ভেবেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি কাঁচা ফ্যালকন। হঠাৎ কেমন উত্তেজিত হয়ে নিজের আসল নাম বলে ফেলল। এভাবে কেউ নিজের পরিচয় দেয় নাকি? তাহলে কোডনেম বা পাসওয়ার্ডের সতর্কতার আর কী মূল্য থাকল! ছেলেটাকে একটু খেলানোর ইচ্ছে হল রুস্তমের। হালকা হাসি হেসে বলল, ‘আমি তোমার দক্ষতা নিয়ে কোনো সন্দেহ করছি না। কিন্তু যেহেতু এ জিনিস তোমাদের কাছে নতুন, সেজন্য একটু সাবধান করে দিচ্ছিলাম। বাই দ্য ওয়ে, তুমি কী জিনিস বানাও, এক্সপ্লোসিভ?’

‘নো স্যার, ওয়েপনস। স্মল আর্মস।’ এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোমর থেকে রুমালে মোড়া একটা পিস্তল বের করে টেবিলে রাখল ফ্যালকন। রুস্তমের ঘড়িতে একটা আলো আছে, সেটা জ্বালিয়ে সে এক ঝলক দেখল জিনিসটাকে। মন্দ নয় জিনিসটা। চোখের ইশারায় পিস্তলটা তুলে রাখতে বলল রুস্তম। কোমরে পিস্তল গুঁজতে গুঁজতে ফ্যালকন বলল, ‘আমার হাতে তৈরি। কেমন হয়েছে?’

‘ভালো। হাতে তৈরি বলে মনে হয় না। তবে মাজলের ভেতরে ফিনিশিং কেমন সেটাই আসল কথা। লোকাল মেড হলে একটু সমস্যা হয়, অনেক সময় ভালো ফিনিশ থাকে না। ফায়ারিং স্মুদ হয় না।’

‘ফিনিশ আমি নিজের হাতে করি। অসমান জায়গা ফাইল দিয়ে ঘষে সমান করে দিই।’

‘তাহলে ঠিকই আছে। তোমার ওয়ার্কশপ কোথায়, এখানে না কাঠমান্ডুতে?’

‘এখানে নয়। বীরগঞ্জে। ওপারে ইন্ডিয়া, বিহার বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে প্রচুর ইললিগ্যাল আর্মস ম্যানুফ্যাকচার হয়। আমরা ওখান থেকে কাঁচামাল আনি।’

‘শুধু পিস্তল, না, আরও কিছু তৈরি হয়?’

‘আগে ওয়ান শটার তৈরি হত, এখন নাইন এম এম পিস্তল এসে যাওয়ায় ডিমান্ড নেই।’ এ পর্যন্ত বলে হঠাৎ ফ্যালকনের হুঁশ হল বড্ড বেশি বলা হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘আপনি গান ক্যারি করেন না?’

শার্টের ভেতরে আর্ম হোলস্টারে রাখা আছে রুস্তমের আগ্নেয়াস্ত্র। শার্টের দু-তিনটে বোতাম আলগা করে সামনের দিক ফাঁক করে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইশারা করল সে। ফ্যালকন সেদিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকাতে ডান হাতে হোলস্টার খুলে জিনিসটা দেখার সুযোগ করে দিল। ঝকঝকে কালো খুদে পিস্তলটাকে দেখে লোভে চকচক করে উঠল ফ্যালকনের চোখ-মুখ। সে জানতে চাইল, ‘রাশিয়ান?’

‘না, ডিজাইন রাশিয়ার, কিন্তু তৈরি হয়েছে ইস্ট জার্মানিতে। রাশিয়ার মাকারভের ইম্প্রোভাইজড ভার্সন, এর নাম পিস্তল এম। পূর্ব জার্মানির সিকিউরিটি সার্ভিস ব্যবহার করত।’

‘দারুণ! আমার হিংসে হচ্ছে!’

জামার বোতাম বন্ধ করল রুস্তম। বলল, ‘এখন আর পাওয়া যায় না এ জিনিস। না হলে তোমাকে একটা জোগাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করতাম।’

উত্তেজিতভাবে এক বড়ো চুমুকে অনেকখানি বিয়ার পেটে চালান করে ফ্যালকন বলল, ‘একটা যদি হাতে পেতাম তাহলে এর অনেক কপি বানানো যেত।’

‘এত অস্ত্র দিয়ে হবে কী?’

‘আমি অস্ত্র তৈরি করি, কিন্তু কার কী কাজে লাগে জানি না। পার্টি কিনে নিয়ে যায়, ব্যস। আমার কাম খতম!’

‘তুমি তাহলে টাকার বিনিময়ে লোকের হয়ে কাজ করে দাও, তাই তো?’

ফ্যালকন মাথা নেড়ে সায় দিল। ‘হ্যাঁ, আমি নেপাল পুলিশে কাজ করতাম, এখন কাজ ছেড়ে দিয়েছি। নিজেই কাজ করি। পুরো স্বাধীন।’

‘এ জিনিস দিয়ে তোমরা ইন্ডিয়ার ক্ষতি করতে চাইছ কেন? কী হবে একাজ করে?’

‘আমি জানি না,’ মাথা নেড়ে বলল ফ্যালকন, ‘এটা এদেশের একটা গ্রুপের পরিকল্পনা। ভারতের সঙ্গে ওদের পুরোনো শত্রুতা, ওরা চাইছে শিলিগুড়ি করিডোরে ঝামেলা তৈরি করতে। আমি এর বেশি কিছু জানি না আর জানতেও চাই না। জেনে আমার লাভ নেই। আমাকে বলা হয়েছে আপনার সঙ্গে দেখা করে বিষের শিশি সংগ্রহ করে ইন্ডিয়ায় পাঠাতে হবে। তারপর কী হবে আমি জানি না। সত্যি বলতে কী, আমাকে যে লোক কাজের দায়িত্ব দিয়েছে তাকে আমি চোখেও দেখিনি। সব ডিল ফোনে হয়েছে। আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যেমন পেমেন্ট পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেভাবে আমাকেও টাকা দেওয়া হয়েছে। ব্যস, আমার কাজ শেষ।’

ফ্যালকনের মতো রুস্তম কারিমভ নিজেও এখন এক ভাড়াটে সেনা। তবে তার ট্রেনিং হয়েছে কেজিবির হাতে। কাজের সুবাদে তাকে বিভিন্ন দেশে ঘুরতে হয়েছে, সেইসূত্রে গুপ্তচর জগতের আচার-আচরণ সম্পর্কে তার কিছু ধারণা তৈরি হয়েছে। তার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। এই ছেলেটা যেমন হুড়মুড়িয়ে সব কিছু ঢেলে দিল, রুস্তম কখনো সে-কাজ করবে না।

এখানে এখন আর কাজ নেই। রুস্তম বলল, ‘ওঠা যাক তাহলে?’

‘হ্যাঁ, চলুন।’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ফ্যালকন।

ক্যাশ কাউন্টারের সামনে বেশ ভিড়। ফ্যালকন পেমেন্ট করতে গেছে। রুস্তম দেখল ওয়েটার মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে ডেকে ফের কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিতে পারলে ভালো হত। মেয়েটির কাজে লাগত। কিন্তু এখানে মেয়েটিকে ফের বকশিশ দিতে গেলে হেমেন্দ্র বিশ্বকর্মা সন্দেহ করবে। রুস্তম তাই মুখ ফিরিয়ে নিল। এ মেয়েটি নিশ্চয় দেহব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত। পানশালায় কাজ করা অধিকাংশ মেয়েই তাই করে। তার দেশের মেয়েরাও ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য নানারকম পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ছে যেখানে শ্রমের পাশাপাশি শরীর বিক্রি করাও বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুস্তম ব্যাপারটাকে সমর্থন করতে পারে না।

দু-জনে রাস্তায় নেমে এল। ফ্যালকন বা হেমেন্দ্র বিশ্বকর্মা জানতে চাইল রুস্তমকে হোটেলে ছেড়ে আসবে কি না। রুস্তম জানাল, দরকার নেই। সে নিজেই চলে যেতে পারবে। পরস্পরকে বিদায় জানিয়ে দু-জন দু-দিকের রাস্তা ধরল।

কিছুটা এগিয়ে একটা স্যুভেনির শপে ঢুকে পড়ল রুস্তম। পিকচার পোস্টকার্ড, নতুন-পুরোনো ইংরেজি বই, ফেং শুই আইটেম ইত্যাদি পাওয়া যায় এখানে। এটা-ওটা নাড়াচাড়া করে দেখতে শুরু করল রুস্তম। কিছু সময় কাটাতে হবে এখানে যতক্ষণ মধুমিতা না আসে। বেশিক্ষণ অবশ্য রুস্তমকে অপেক্ষা করতে হল না, পানশালার ওয়েটার মেয়েটি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে ঢুকল। জোরে হেঁটে আসতে হয়েছে অনেকটা পথ। পোশাক বদলে ফেলেছে মধুমিতা, পানশালার পোশাকের বদলে এখন তার পরনে জিন্স আর সোয়েটার। রুস্তমের হাতে মধুমিতা একটা বোতামের মতো জিনিস তুলে দিয়ে বলল, ‘এর মধ্যে সব কিছু রয়েছে, সাহেব।’ রুস্তম নিঃশব্দে জিনিসটা পকেটে রাখল। তারপর ট্রাউজারের পকেট থেকে একতাড়া নোট বের করে মেয়েটির হাতে তুলে দিল।

‘এখানে পঁচিশ হাজার আছে।’

সেদিকে তাকিয়ে একটু আশাহত স্বরে মেয়েটি বলল, ‘আমার ডলারের কী হল? আমি তো ডলার চেয়েছিলাম।’

‘তোমার সিকিউরিটির কথা ভেবে তোমাকে ডলার দিলাম না, ডিয়ার,’ রুস্তম বলল, ‘পোখরা ছোটো জায়গা, এখানে তুমি ডলার ভাঙাতে গেলে টার্গেট হয়ে যাবে। পরের কাজটার জন্য তোমাকে ডলারে পেমেন্ট করব, আই প্রমিস। কাল তুমি শিলিগুড়ি যাওয়ার জন্য কখন রওনা হবে?’

‘আমি সকাল বেলা বেরিয়ে যাব। আপনি চিন্তা করবেন না,’ মধুমিতা উত্তর দিল।

‘বেশ। শিলিগুড়ি যাওয়ার পর তুমি আমাদের কাছ থেকে নেক্সট ইনস্ট্রাকশন পাবে। তুমি “সিটি ভিউ” হোটেলে উঠবে তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওখানে আমরা তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব। এখন আমি দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার তিন-চার মিনিট পরে তুমি বেরোবে। সোজা বাড়ি চলে যাবে, কোথাও দাঁড়াবে না। বুঝেছ?’

রুস্তম বেরিয়ে গেল। তার কিছু পরে দোকান থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল মধুমিতা। তার বাড়ি পোখরা শহরের পুরোনো অংশে। লেকসাইড ছেড়ে সাড়ে তিন-চার কিলোমিটার গেলে পোখরার আরেকটা চেহারা হাঁ করে বসে থাকে। ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, ঝুপড়ি ঘরবাড়ি, আবর্জনাপূর্ণ নর্দমা। এখানেই মধুমিতার বাড়ি। হেঁটেই যাতায়াত করে সে। ছ-হাজার টাকা মাসমাইনের চাকরিতে গাড়িতে চড়া সম্ভব হয় না। হাতে আরেকটু পয়সা জমলে মধুমিতা একটা স্পোর্টস সাইকেল কিনবে ঠিক করে রেখেছে।

গত ক-দিনে তার জীবন অনেক বদলে গেছে। এখন নিজেকে আর পানশালার সামান্য ওয়েটার বলে মনে হচ্ছে না। একটা নতুন কাজের সুযোগ হঠাৎ এসে পড়েছে তার সামনে। অ্যাডভেঞ্চার, রিস্ক, টাকা– সব আছে এই কাজে। শুধু বুদ্ধি করে চলতে হবে। আপাতত তার কাজ শিলিগুড়ি যাওয়া, সেখানে নাকি কয়েকদিনের মধ্যে একটা রোগ ছড়িয়ে পড়বে। প্রচুর মানুষ মারা যাবে। আতঙ্কিত হয়ে পড়বে লোকজন। কারা করবে এই কাজ সে জানে না। তাকে শুধু পুরো ঘটনার রিপোর্ট পাঠাতে হবে এই সাহেবের কাছে। রোগ থেকে কীভাবে নিজেকে বাঁচাতে হবে সেই কৌশল এবং ওষুধ দিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে।

ক-দিন আগে সাহেব তাদের পানশালায় এসে মধুমিতার সঙ্গে আলাপ করে জানায়, একটা কাজ করে দিলে তাকে মোটা টাকা দেওয়া হবে। মধুমিতাদের পানশালায় ওয়েটারদের মধ্যে টেবিল ভাগ করা আছে। মধুমিতার দায়িত্বে থাকা এগারো নম্বর টেবিলে এক কাস্টমার রোজ সন্ধেবেলা আসে। তার টেবিলের নীচে বসিয়ে দিতে হবে একটা ছোট্ট ক্যামেরা। সাহেব তাকে সেই কাস্টমারের ছবি দেখিয়েছিল। লোকটাকে মধুমিতা চেনে, গুন্ডা টাইপের। সবাই ওকে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ নামে ডাকে। প্রতিদিন দু-একজনকে সঙ্গে নিয়ে মদ্যপান করতে আসে। ‘ইঞ্জিনিয়ার’ টেবিলে এসে বসলেই ক্যামেরা চালু করতে হবে যাতে সে কার সঙ্গে কী আলোচনা করছে সেটা রেকর্ড করা যায়।

যেদিন সাহেব ‘ইঞ্জিনিয়ার’কে নিয়ে একসঙ্গে পানশালায় আসবে, সেদিন তারা বেরিয়ে গেলে সেই ক্যামেরাটা দিতে আসতে হবে সাহেবের হাতে। কীভাবে ক্যামেরা অপারেট করতে হবে তা মধুকে হাতে ধরে শিখিয়ে দিয়েছিল সাহেব। কাজ শেষ করে হাতে নগদ টাকা পেয়ে গেছে মধুমিতা, তার মনে খুব আনন্দ। এরপর শিলিগুড়ির কাজটা করে এলে হাতে প্রায় এক লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে। তার অভাবী পরিবারে টাকাটা খুব প্রয়োজন।

‘উফ!’

আচমকা চোখে অন্ধকার দেখল মধুমিতা। কী-একটা জিনিস এসে বিঁধেছে তার বাঁ-দিকের পাঁজরে, বগলের কয়েক সেন্টিমিটার নীচে। ভয়ংকর গরম একটা লোহার শিক ঢুকিয়ে দিলে যেমন অনুভূতি হয়, ঠিক তেমন লাগল। জিনিসটার ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেল মধু। তার ডান হাত প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় চলে গেছে ব্যথার জায়গায়। হাতটা সামনে এনে মধুমিতা দেখল হাতে রক্ত লেগে রয়েছে।

পাশে একটা অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে এল রুস্তম কারিমভ। তার হাতে রিভলভার। সাইলেন্সার লাগানো। সে আরেকটা গুলি চালাল মধুকে লক্ষ করে। এবার গুলিটা লাগল মধুমিতার ঘাড়ের কাছে। একটু কেঁপে উঠে তার শরীর স্থির হয়ে গেল। জুতো দিয়ে মৃতদেহটাকে রাস্তার একপাশে কয়েক পাক গড়িয়ে দিল রুস্তম। মধুমিতার পকেট হাতড়ে তার ছোটো লেডিজ পার্সটা বের করে তার থেকে টাকাপয়সা সব নিজের পকেটে ভরে নিল। ব্যাগের ভেতরে থাকল শুধু লিপস্টিক, অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট আর এক প্যাকেট কন্ডোম। রুস্তম এরপর উবু হয়ে বসে মেয়েটির গলার চেন, হাতের ঘড়ি এবং আংটি খুলে পকেটে চালান করল। এক ঝটকায় টেনে ছিঁড়ে দিল জামার কিছুটা অংশ। চুল ধরে মুখ ঘষে দিল রাস্তার মাটিতে। দুটো ঘুষিতে নাক এবং ঠোঁটের একাংশ ফাটিয়ে দিল। পুলিশ দেখে বুঝবে ছিনতাই করতে এসে দুষ্কৃতী বাধা পেয়েছে। ধস্তাধস্তির পর গুলি করে খুন করেছে মেয়েটিকে। পানশালার এক সাধারণ ওয়েটারের জন্য পুলিশের খুব বেশি মাথা ঘামানোর কথা নয়!

মেয়েটাকে মারতে চায়নি রুস্তম, কিন্তু না মেরে উপায় ছিল না।

হেমেন্দ্রকে গত এক সপ্তাহ ধরে অনুসরণ করছে রুস্তম। শাংগ্রিলা গেস্ট হাউসের পানশালায় ঘন ঘন যাতায়াত করে ছেলেটি। এখানে বসে সবরকম ডিল করে। টেবিল নির্দিষ্ট আছে। সেই টেবিলের ওয়েটার মধুমিতা ছেত্রী। তাকে হাত করতে রুস্তমের দেরি হয়নি। টাকার লোভে মেয়েটি হেমেন্দ্র বিশ্বকর্মার ওপর আড়ি পাততে রাজি হয়ে গেছিল। গত সাত দিনে যাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে তাদের সকলের ছবি আর কথা এখন ক্যামেরাবন্দি। এরা সাধারণ উগ্রপন্থী গোষ্ঠী নয়, নিশ্চয় অন্য কোনো দেশের হয়ে কাজ করছে। এখান থেকে এদের পরিকল্পনা সম্পর্কে অনেক খবর পাওয়া যাবে। কিন্তু মধুমিতা ছেত্রীকে না মারলে পেছনে একটা সাক্ষী থেকে যেত। রুস্তম সেটা হতে দিতে পারে না।

ট্রাউজারের পকেট থেকে হিপ ফ্লাস্ক বার করে এক চুমুক হুইস্কি গলায় ঢেলে শিস দিতে দিতে হোটেলে ফেরার পথে পা বাড়াল রুস্তম কারিমভ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *