আরশির বাড়ি, সাদার্ন অ্যাভিনিউ।
বাড়ির নাম ‘আরশিনগর’। মেয়ের নামে বাড়ির নাম রেখেছিলেন আরশির বাবা। ছোট্ট দোতলা বাড়ি, সামনে একফালি বাগানে কিছু ফুলের গাছ। শৌখিন বিলিতি ফুল নয়, বাবা পছন্দ করত টগর-জবা-জুঁই-বেল এইসব দিশি ফুল। গরমকালে যখন জুঁই বা বেলফুলের সৌরভ ভুরভুর করে চারদিক মাতিয়ে তোলে, তখন আরশির মন কেমন করে ওঠে বাবার জন্য। না, বাবা এই বাগান দেখে যেতে পারেনি। এমনকী বাড়ি নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়া দেখার সুযোগও বাবা পায়নি। বাবা চলে যাওয়ার পর বাড়ির কাজ শেষ হয়েছে। এবাড়িতে বাবা কোনোদিন আসেনি, কিন্তু আরশির মনে হয় বাবা ছড়িয়ে আছে এবাড়ির সব কিছুতে।
দোতলার ব্যালকনিতে বসে নীচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল আরশি। সাদার্ন অ্যাভিনিউ হল কলকাতার সেই বিরল রাস্তাগুলোর মধ্যে অন্যতম যেখানে ফুটপাথে এখনও বেশ কিছু গাছ আছে। আরশিদের বাড়ির সামনে রয়েছে একটা ঝাঁকড়া আম গাছ। এই গাছে কী আম হয় তা খেয়ে দেখার সৌভাগ্য আরশির এত বছরে একবারের জন্যও হয়নি। আমের গুটি বেরোনোর পর থেকেই পাড়ার বাচ্চা ছেলেরা সেগুলো পেড়ে খেতে শুরু করে। অন্য বছরের মতো এবছরও গাছে মুকুল থেকে গুটি বেরিয়েছিল এপ্রিল মাস নাগাদ। ছেলেরা বহু আগেই সেগুলো পেড়ে খেয়ে নিয়েছে। গাছটা প্রতি বছরের মতো এবারেও হাসিমুখে সব ফল বিলিয়ে দিয়েছে।
গাছটাকে বেশ নির্বিরোধী বলে মনে হয় আরশির। ওপরদিকে গাছের ডালে কাক বাসা বেঁধেছে। গাছটা মেনে নিয়েছে ওর দেহে আরেকটা প্রাণীকে আশ্রয় দিতে। গুঁড়িতে পেরেক আর লোহার তার দিয়ে ঝোলানো রয়েছে বেশ কয়েকটা বিজ্ঞাপনের ছোটো বোর্ড। কামাখ্যা-ফেরত জ্যোতিষী, অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন করানোর সাইবার কাফে, বাড়িতে গিয়ে বিউটি পার্লারের সার্ভিস দেওয়ার সৌন্দর্য বিশেষজ্ঞ– সবার সবরকম বিজ্ঞাপন বিনা পারিশ্রমিকে প্রদর্শন করার দায়িত্ব নিয়েছে গাছটা, প্রতিবাদহীনভাবে। পেরেক ঠুকে বোর্ড লাগানোর সময় নিশ্চয় ওর কষ্ট হয়েছে, কিন্তু হাসিমুখে সেই কষ্ট সহ্য করে নিয়েছে গাছটা।
বাবা যেন অনেকটা এরকম ছিল। অন্যের বিপদ নিজের বিপদ মনে করে ছুটে যেত। বাবার কষ্ট হত নিশ্চয়, কিন্তু বুঝতে দিত না কাউকে। রাতবিরেতে মরণাপন্ন রোগীকে দেখার জন্য বাবা কতবার নিজে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেছে আরশি মনে করতে পারে না। অনেকে বলত, আপনি এত দায়িত্ব নেবেন না। অন্য ডাক্তারবাবুরা যখন ফোনের রিসিভার নামিয়ে রেখে শান্তিতে ঘুমোচ্ছেন, তখন আপনিও নিজের দায়িত্বটাকে ফোনের রিসিভারের মতো নামিয়ে রাখুন! অন্যের উপকার করতে গিয়ে কোনদিন বিপদে পড়ে যাবেন।
তারা ঠিকই বলেছিল হয়তো। কাজের পেছনে ছুটতে ছুটতে বাবা একদিন এত দূরে চলে গেল, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। পেছনে পড়ে রইল নির্মীয়মাণ সাধের বাড়ি, আদরের ‘বাবুই’ মানে আরশি এবং সুদক্ষিণা অর্থাৎ আরশির মা।
সাতটা বাজে, সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে চারপাশে। ব্যালকনি থেকে আরশি দেখল একটা হলুদ ট্যাক্সি এসে থামল বাড়ির সামনে। জ্বলে উঠল ভেতরের আলো। তার মানে মিটার দেখে বিল মেটাচ্ছে প্যাসেঞ্জার। আরশি একটু চঞ্চল হল। সায়ন্তন এল কি? বেশি অপেক্ষা করতে হল না, এক মিনিটের মধ্যেই ট্যাক্সির দরজা খুলে বেরিয়ে এল সায়ন্তন। তারপর এগোল ওদের বাড়ির গেটের দিকে।
দ্রুত একতলায় নেমে দরজা খুলে দিল আরশি, ‘ভেতরে আয়, তুই চিনে এলি কী করে? অ্যাপ ক্যাব হলে না হয় কথা ছিল!’
‘আগে দু-একবার এসেছি তো, কনফিডেন্স ছিল ঠিক চিনতে পারব। অ্যাপ ক্যাব নিলে সঙ্গে মোবাইল রাখতে হত, আমার লোকেশনও ট্র্যাক করা যেত। তাই আমি ইচ্ছে করেই হলুদ ট্যাক্সি ধরলাম। তবে খুব গরম লেগেছে রে, বাপরে বাপ, আজকাল এত গরম পড়ছে নাকি কলকাতায়!’
‘চল চল, তাড়াতাড়ি ওপরে গিয়ে ঘরে বোস, আমি এসি চালিয়ে দিচ্ছি,’ আরশি সায়ন্তনের হাত ধরে টান দিল, ‘তোকে আজ আমার নিজের তৈরি স্পেশাল শরবত খাওয়াব। এক গ্লাস খেলে পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে যাবে।’
খুব ছোটো জমির ওপর আরশিদের বাড়িটা। আড়াই কাঠার মতো জায়গা। কর্পোরেশনের নিয়মে চারদিকে ছাড় দিতে হয়েছে, সেইসঙ্গে বাবার বাগান। ফলে ওদের বাড়িটা অনেকটা ডু-প্লে ধরনে তৈরি। একতলায় সামান্য একটু বসার জায়গা সোফা এবং বইয়ের আলমারি দিয়ে সাজানো। এক পাশ থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়, সেখানেই লিভিং রুম। একটা ঘরে আরশি থাকে, সেটা ওর স্টাডি কাম লিভিং রুম। পাশের ঘরটা মা-র। আগে দু-জনে একই ঘরে থাকত, কিন্তু ওকে অনেক সময় রাত জেগে কাজ করতে হয় বলে আরশি নিজের ঘর আলাদা করে নিয়েছে। আরশির ঘর ছিমছাম। ছোটো একটা ডিভান, বইয়ের তাক, কম্পিউটার টেবিল।
সায়ন্তনকে নিজের ঘরে বসিয়ে এসি চালিয়ে দিয়ে আরশি ছুটল শরবত বানাতে। সায়ন্তনের শরবত প্রীতি কলেজে সুবিদিত ছিল। প্যারামাউন্টের হেন কোনো শরবত নেই যা সায়ন্তন চেখে দেখেনি। শুধু তা-ই নয়, কপিলা আশ্রম থেকে শুরু করে রালিজ– শহরের সব বিখ্যাত শরবতের দোকান ছিল ওর নখদর্পণে। ওকে শরবত খাওয়াবে বলে আরশি আজ সারাদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। দোকান থেকে কিনে আনা বোতলবন্দি মিশ্রণ নয়, নিজের হাতে তৈরি শরবত বন্ধুকে খাওয়াতে চায় ও।
দুটো বড়ো গ্লাসে ভরতি আমপোড়া শরবত নিয়ে ঘরে ফিরে আরশি দেখল সায়ন্তন ওর গিটারটা নিয়ে বসে টুংটাং শুরু করেছে। টেবিলের ওপর গেলাস রেখে আরশি বলল, ‘আগে শরবত খেয়ে নে, তারপর গিটার দেখবি।’
‘তুই এখনও গিটার বাজাস, আরশি?’ বলতে বলতে চোঁ করে এক চুমুকে সবটা শরবত খেয়ে ফেলে হাত দিয়ে মুখ মুছল সায়ন্তন, ‘আহ, দারুণ করেছিস, ভেতরটা জুড়িয়ে গেল।’
‘আর নিবি?’ জানতে চাইল আরশি।
‘একটু পরে দিস। এখন খেলে ল অফ ডিমিনিশিং রিটার্ন অনুসারে অপটিমাম স্যাটিসফ্যাকশন হবে না। সেটা এমন শরবতের পক্ষে খুব অপমানজনক হবে।’
ফিক করে হেসে ফেলল আরশি। এই তো কেন্দ্রীয় সরকারের গোপন প্রকল্পে কাজ করা রাশভারী বিজ্ঞানীর আড়াল থেকে কলেজের বন্ধুটা উঁকি দিতে শুরু করেছে! সে বলল, ‘গিটারে বহুদিন হাত দেওয়া হয়নি। আগে সময় পেলে একটু- আধটু বাজাতাম, এখন একদম সময় পাই না। তুই বেহালা বাজাচ্ছিস, না, তোরও আমার দশা?’
গিটারে জামাইকা ফেয়ারওয়েল বাজাতে শুরু করে দিয়েছে সায়ন্তন। ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে– ‘ডাউন দ্য ওয়ে হোয়্যার দ্য নাইটস আর গে, অ্যান্ড দ্য সান শাইনস ডেইলি অন দ্য মাউন্টেন টপ…।’ গিটার থেকে চোখ না সরিয়ে সায়ন্তন জবাব দিল, ‘মাঝখানে একদম ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন আবার একটু সময় পাচ্ছি, কাজা জায়গাটায় তো এন্টারটেনমেন্টের স্কোপ খুব কম, প্রায় নেই বললেই হয়, সেজন্য কাজ না থাকলে বাজাই।’
‘ভালো। আমাদের মিউজিক ক্লাবের সবাই মা সরস্বতীকে নমস্কার করে ইনস্ট্রুমেন্ট তুলে রাখেনি তাহলে।’
বাজনা থামিয়ে ক্লান্তির হাসি হাসল সায়ন্তন, ‘না রে, তুই যা ভাবছিস তা নয়। আমিও সেভাবে সময় পাই না। কলকাতায় যেদিন এলাম তার আগের দিন একটু তাড়াতাড়ি ল্যাব থেকে বেরিয়ে বেহালা নিয়ে বসব ভেবেছিলাম। হঠাৎ ডিরেক্টর ডেকে বলল, কালই কলকাতায় যেতে হবে। ব্যস, বেহালা মাথায় উঠল, আমি কোয়ার্টার্সে ফিরে ব্যাগ গোছাতে শুরু করলাম।’
‘কলকাতায় কী এমন হয়েছে রে, যার জন্য তোরা ছুটে এলি এখানে? আমরা তো শহরে থেকে কিছুই বুঝতে পারছি না। সামান্য ফুড পয়জনিং-এর তদন্ত করতে আসিসনি তা তো বুঝতেই পেরেছি, কিন্তু ঘটনাটা কী, বায়ো-টেররিজম?’
‘তোর মা কোথায় রে, আরশি, দেখছি না যে?’
‘মা-র একটা দাঁত তোলা হয়েছে। মাসির বাড়ির কাছেই ডাক্তারবাবুর চেম্বার, সেজন্য মা ওখানেই আছে। পরশু চলে আসবে।’
‘তাহলে তুই বাড়িতে একা?’
‘হ্যাঁ, আপাতত। কিন্তু তোকে যে প্রশ্নটা করলাম তার জবাব দে আগে। একদম এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করিস না।’
সায়ন্তন হেসে বলল, ‘তোর কি মনে হচ্ছে আমি এড়িয়ে যাচ্ছি? তাহলে তো তোর মেসেজের কোনো জবাব দিতাম না, এখানে আসা তো দূরের কথা। আসলে এতদিন পর দেখা হল, আমার শুধু পুরোনো কথা মনে পড়ছে, কেজো কথা না হয় একটু পরে শুরু করা যাবে।’
‘প্লিজ, সায়ন্তন, তুই রাগ করিস না আমার কথায়। আমি স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের কাজের কথাই ভাবছি।’ আরশি কিছুটা অনুতপ্ত হল।
‘তোর ওপর রাগ করব, পাগল নাকি! তোকে ইউনাইটেড নেশন’স অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে, তুই এখন কত বিখ্যাত মানুষ বল তো?’ সায়ন্তন চিমটি কাটতে ছাড়ল না।
আরশি মুখ গোমড়া করে বলল, ‘হ্যাঁ, বিখ্যাত তো বটেই! সেজন্যই তো চাকরি বাঁচাতে তোর সামনে বসে কপির জন্য মালমশলা চেয়ে কান্নাকাটি করছি।’
‘তুই বায়ো-টেররিজম বলতে কী বুঝিস, আরশি?’
একটু চুপ করে থেকে আরশি নিজের অবস্থান ঠিক করে নিল। তারপর বলল, ‘তেমন কিছুই বুঝি না। জীবাণু মানে ব্যাকটিরিয়া ভাইরাস দিয়ে একটা দেশ বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণ, এইরকম আর কি! যেমনটা ক-দিন আগে করোনা নিয়ে হল। আমি শিয়োর নই, কিন্তু শুনেছি করোনা নাকি চীনের তৈরি জীবাণু অস্ত্র।’
‘ঠিক বলেছিস, মোদ্দা ব্যাপারটা হল ক্ষতিকর জীবাণুকে ব্যবহার করে শত্রুপক্ষকে ধ্বংস করা। যখন একটা দেশ আরেকটা দেশের বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র প্রয়োগ করছে আমরা সেটাকে বলছি বায়োলজিক্যাল ওয়ার। আর একটা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী কিংবা ধর্মীয় সম্প্রদায় যখন কারো বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র প্রয়োগ করছে তা হল বায়ো-টেররিজম। তবে এই সীমারেখা আজকাল প্রায়ই গুলিয়ে যায়, একটা দেশও বায়ো-টেররিস্ট হয়ে উঠতে পারে, যেমন– চীন। বিশ্বের প্রায় সব ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির বিশ্বাস করোনা ভাইরাস উহানের ল্যাব থেকে চীন পরিকল্পনা করে ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু নিশ্চিতভাবে একথা বলা যাবে না, কারণ চীন কোনো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলকে ওদের গবেষণাগার ঘুরে দেখতে অনুমতি দেয়নি।’
‘তোরা কলকাতায় কেন? এখানে কী হয়েছে?’ মোবাইলের রেকর্ডিং অন করে সায়ন্তনের পাশে রাখল আরশি, ‘তুই মন খুলে বলতে পারিস, আমি তোকে কোথাও কোট করব না, তুই যেটুকু বলবি, সেটুকু লিখব। কিন্তু রেকর্ড করে রাখছি নয়তো এই পলিটিকাল সায়েন্সের মগজ থেকে সব বেরিয়ে যাবে।’
সায়ন্তন হাসল, ‘রেকর্ড করে রাখ, তাতে যদি তোর সুবিধে হয়। কিন্তু যা লিখবি, আমাকে দেখিয়ে নিস, নইলে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে। আমাদের ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সি মনে করছে আগরতলা এবং কলকাতা এই দু-জায়গায় একটা হেমারেজিক ফিভার আউটব্রেক হয়েছে যা নাশকতামূলক কাজ। অর্থাৎ জীবাণু ছড়িয়ে কাজটা করা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে। ধারণাটা ঠিক কি না দেখতে আমাদের টিম এসেছে।’
‘হাইস্ট্রিট মল-এর ফুডকোর্টের জলে নাকি ভাইরাস পাওয়া গেছে?’
‘তুই তো খবর রাখিস দেখছি।’
‘এটুকুই জানি, তার বেশি খবর পাইনি। এটা কোন ভাইরাস, নাম কী? তোরা কী করে বুঝছিস ব্যাপারটা ন্যাচারাল আউটব্রেক, না, ইচ্ছাকৃত সংক্রমণ?’
‘দাঁড়া, একে একে বলি,’ সায়ন্তন বলল, ‘এই ভাইরাসটা নতুন, এর নাম শিবসাগর ভাইরাস। আমরা সাধারণভাবে জীবাণুর নাম ঠিক করি প্রথম যে জায়গায় আউটব্রেক হল তার নামানুসারে। কঙ্গো-র ইবোলা নদীর তিরে পাওয়া ভাইরাসের নাম ইবোলা, জার্মানির মারবার্গ শহরে মহামারি ঘটিয়েছে যে জীবাণু তার পরিচয় মারবার্গ ভাইরাস, আমেরিকার লাইম নামে একটা ছোটো শহরে মহামারি সৃষ্টি করার জন্য দায়ী ব্যাকটিরিয়ার নাম লাইম ব্যাকটিরিয়া– এইরকম আর কি। তবে কলেরা, প্লেগ, অ্যানথ্রাক্স, স্মলপক্স এসব খানদানি রোগের জীবাণুকে আমরা তাদের পুরোনো নামেই ডাকি। কলকাতার ভাইরাসটার প্রথম আউটব্রেক লক্ষ করা গেছে কয়েক মাস আগে অসমের শিবসাগর জেলায়। সেজন্য আমরা এর নাম দিয়েছি শিবসাগর ভাইরাস। এটা একটা আরএনএ-বেসড জুনোটিক ভাইরাস।’
‘শেষটা কী বললি, একটু ব্যাখ্যা কর, প্লিজ। আমি না বুঝলে কাগজের পাঠককে বোঝাব কী করে?’
‘এটুকু টেকনিক্যাল কথা কিন্তু আসবেই রে, আরশি। যেখানে যা বুঝবি না, সেটা তুই পরে গুগল করে নিজের মতো করে দেখে নিস। এখনকার মতো শুনে রাখ, ভাইরাস একটা অদ্ভুত জিনিস, জীবিত বা মৃত কোনোটাই বলা যায় না। দেহের বাইরে মৃত, দেহের ভেতরে প্রবেশ করলে জীবিত। ভাইরাসের গঠন অধিকাংশ ক্ষেত্রে খুব সিম্পল, ভেতরে থাকে ডিএনএ বা আরএনএ, বাইরে একটা প্রোটিনের মেমব্রেন। আর জুনোটিক মানে হল, যে ভাইরাস প্রাণীদেহ থেকে মানুষে ছড়ায়।’
আরশি মাথা চুলকোল, ব্যাপারটা বেশ জটিল, এসব ভজঘট ব্যাপার সহজ করে লিখতে না পারলে পাঠকের মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাবে। এমনিতেই চারশো শব্দর বেশি বড়ো লেখা কেউ পড়তে চায় না আজকাল, তার ওপর এত টেকনিক্যাল কথাবার্তা থাকলে লোকে ছুঁয়ে দেখবে কি না সন্দেহ!
‘কী করে বুঝলি, এটা ন্যাচারাল আউটব্রেক নয়, ভাইরাসটা নতুন বলে?’
‘এখনও বুঝিনি, তবে সন্দেহ সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। প্রথম কারণ, তুই যা বললি, এই ভাইরাস নতুন, আগে বিশ্বে কোথাও দেখা যায়নি। দ্বিতীয়ত, খুব দ্রুত এর জিন মিউটেট করে ভিরুলেন্স বেড়ে যাচ্ছে। তিন নম্বর কারণ হল, বায়ো-টেরর অ্যাটাকের প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।’
‘বায়ো-টেরর অ্যাটাকের প্যাটার্ন কীরকম হয়, একটু বুঝিয়ে বল?’ আরশি জানতে চাইল।
‘খুব বেশি অঞ্চল জুড়ে সাধারণত বায়ো-টেরর অ্যাটাক দেখা যায় না। একটা শহরে নির্দিষ্ট থাকে। কারণ বায়ো-ওয়েপনের ডেলিভারি মেকানিজম এখনও খুব সহজলভ্য নয়। এক সপ্তাহ থেকে শুরু করে দেড় দু-মাস চলে ব্যাপারটা, তারপর স্তিমিত হয়ে যায়। মানুষ মারা্র থেকেও ভয় দেখানো এক্ষেত্রে বেশি জরুরি। এখানে ঠিক তা-ই ঘটেছে। শিবসাগরে প্রথম যে লোকটা আক্রান্ত হয়েছিল সে শুয়োরের মাংসের চাট দিয়ে দিশি দারু খেয়েছিল। এরপর তার হেমারেজিক ফিভার ডেভেলপ করে, পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়। এ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, ভাইরাস ছড়াচ্ছে আক্রান্তর শ্বাসপ্রশ্বাস থেকে, কারণ বাড়ির বাকি কেউ শুয়োরের মাংস খায়নি।
‘তারপর আগরতলায় কিছুদিন বাদে যে মহিলা আক্রান্ত হলেন তিনি বিউটি পার্লারে গেছিলেন পেডিকিয়োর করাতে। প্রথমে তাঁর কাফ মাসলে লালচে দাগ দেখা দিল, সেইসঙ্গে সর্দিজ্বর এবং কাশি। দু-দিনের মধ্যে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হল, এক এক করে সব ভাইটাল অর্গ্যান বসে গেল। ভদ্রমহিলা তাঁর আড়াই বছরের বাচ্চাটাকে একবার কোলে নিয়েছিলেন, বাচ্চাটাও গায়ে রাশ বেরিয়ে এবং জ্বর হয়ে মারা গেল। বাড়িতে জামাকাপড় কাচাকুচির কাজ করতেন এক মহিলা, এবার তাঁর হাতে অবিকল সেই লালচে চুলকুনি দেখা গেল, তারপর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি! তিনি কিন্তু কোনো রোগীর সংস্পর্শে আসেননি, শুধু তাদের ব্যবহার করা পোশাক কাচাকুচি করেছিলেন। আমাদের অনুমান, ভাইরাস এখানে দেহে প্রবেশ করেছে শরীরের চামড়া ভেদ করে। একে বলে কিউটেনিয়াস ইনফেকশন।
‘এবার কলকাতার কথা ধর। একইদিনে হাইস্ট্রিটের ফুডকোর্ট থেকে খাবার খেয়ে প্রচুর মানুষ আক্রান্ত। ভয়ে ফুডকোর্ট সিল করে দেওয়া হল। ফুডকোর্টের সব খাবারের দোকানের স্যাম্পল নেওয়া হয়েছে, কোথাও কোনো ভাইরাসের চিহ্ন মেলেনি। কিন্তু আক্রান্ত সকলের মধ্যে মিল হল সবাই সেদিন মল-এর কুলার থেকে জল খেয়েছিল। কুলারের জল আসে যে ট্যাঙ্ক থেকে তাতে জীবাণুর খোঁজ পাওয়া গেছে। এখানেই সন্দেহ আমাদের। সচরাচর একটা ভাইরাস এভাবে ছড়ায় না। যে ভাইরাস এয়ারবোর্ন সে সাধারণত জলের মাধ্যমে ছড়াবে না। আবার এয়ারবোর্ন কিংবা ওয়াটারবোর্ন ভাইরাস হবে যে ভাইরাস সে একইসঙ্গে ত্বক ভেদ করে কিউটেনিয়াস ইনফেকশন ছড়াবে না। এরকম তখনই হতে পারে যদি সেই ভাইরাসের জিনের চরিত্র বদল করে তাকে শক্তিশালী করে তোলা হয়। ন্যাচারাল মিউটেশনে এমন ঘটতে বহুদিন লেগে যাবে, কিন্তু ল্যাবরেটরিতে ফরমায়েশ মাফিক ভাইরাসের জেনেটিক মিউটেশন খুব তাড়াতাড়ি ঘটানো যেতে পারে। শিবসাগর ভাইরাসের ক্ষেত্রে ঠিক এই ব্যাপারটা লক্ষ করা যাচ্ছে।’
সায়ন্তন থামল। তারপর বলল, ‘আরেকবার শরবত খাওয়াবি বলেছিলিস না? চটপট নিয়ে আয়!’
আরশি দৌড়ে শরবত নিয়ে এল। এবার গ্লাসে সবুজের পরিবর্তে গাঢ় গোলাপি রঙের তরল দেখে সায়ন্তন ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা আবার কোথা থেকে আমদানি করলি?’
‘খেয়ে দ্যাখ।’
সায়ন্তন হালকা চুমুক দিল দু-তিনবার। চোখ বুজে স্বাদ বোঝার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘বেদানার রস দিয়ে বেস তৈরি সেটুকু বুঝলাম। মশলাগুলো কিন্তু সেভাবে বুঝতে পারলাম না। ভাজা জিরে গুঁড়ো আর আমচুর আছে মনে হল।’
‘থাক, এখানে তোকে পণ্ডিতি ফলাতে হবে না। বেদানার রসের সঙ্গে জিরে আর আমচুর, কী বিদঘুটে কম্বিনেশন রে বাবা! তুই শরবতের কেমিক্যাল অ্যানালিসিস না করে যা বলছিলিস, সেটাই বলতে থাক। আরেকটা কথা, রাতে খেয়ে যাবি কিন্তু, এখানে থেকেও যেতে পারিস, আরও ঘর আছে।’
শরবতের গ্লাস খালি করে নামিয়ে রাখল সায়ন্তন, ‘না রে, খাওয়া বা থাকা কোনোটাই এবার হবে না। আমার সঙ্গে একটা জাম্বুবান এসেছে হিমাচল থেকে, তার কাজ আমাকে নিরাপত্তা দেওয়া। আমি না ফিরলে সে কেলেঙ্কারি বাধাবে।’
‘যাহ্, লোকটা কিন্ত মোটেই জাম্বুবান নয়, দারুণ স্মার্ট! যেমন হাইট, তেমনি ফিগার।’
সায়ন্তন হকচকিয়ে গেল, ‘সে কী, তুই ভার্গবকে চিনলি কী করে? পরিচয় আছে নাকি মালটার সঙ্গে?’
মুচকি হেসে আরশি বলল, ‘ক্যাপিটাল হোটেলে রেকি করতে গেছিলাম। করিডোরে দেখেছি তখন, হোটেলের স্টাফ চিনিয়ে দিল।’
‘ওর উৎপাতে আমি আর বেণুগোপাল, মানে আমার সঙ্গে যে টেকনিশিয়ান এসেছে, তটস্থ হয়ে রয়েছি। এমনিতে আমাদের কাজকর্ম খুবই গোপনীয়, কিন্তু সিকিউরিটির নামে লোকটা যা করছে সেটা ভীষণ বাড়াবাড়ি। আরে, আমার শহরে এসে আমি কোথায় যাব, ওকে নাকি গুগল ম্যাপে তার লাইভ লোকেশন শেয়ার করতে হবে! সেজন্য আমি সঙ্গে মোবাইল আনিনি, ঘরে রেখে এসেছি, ওকে বলব, ভুলে ফেলে গেছি।’
‘তোরা কী এমন গোপন রিসার্চ করিস যার জন্য এত সাবধানে থাকতে হয়? আমাদের দেশে তো আরও অনেকগুলো মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট আছে, তাদের ক্ষেত্রে তো এরকম কড়াকড়ি নেই।’
‘শোন আরশি, অন্য রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সিকে গুলিয়ে ফেললে হবে না। কাজা টাউন থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে মানালি যাওয়ার রাস্তায় স্পিতি ভ্যালির একটা জনমানবহীন জায়গায় এক হাজার একর জমিতে আমাদের এই ফেসিলিটি তৈরি হয়েছে মাত্র এক বছর হল। বলতে পারিস, প্রায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তুলেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক, শুধুমাত্র বায়ো-টেররিজম প্রতিহত করার জন্য। দেশের মানুষকে জীবাণুযুদ্ধে নিরাপত্তা দেওয়ার কাজ আমাদের, প্রতিনিয়ত গবেষণা চলছে নানারকম ব্যাকটিরিয়া-ভাইরাস নিয়ে, তাদের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন বা এফেকটিভ ট্রিটমেন্ট কী হতে পারে, আমরা তা-ই খুঁজে বেড়াচ্ছি। ওখানে কী সাংঘাতিক নিরাপত্তা তুই ভাবতে পারবি না। পুরো ফেসিলিটি উঁচু প্রাচীরে ঘেরা, তার বাইরে কাঁটাতারের বেড়া। চারদিকে সিসিটিভি, মোশন সেন্সর, সিকিউরিটি পোস্ট। এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিংয়ে যেতে হলে তোকে নিজস্ব বাসে করে যেতে হবে, হাঁটার অনুমতি নেই। গুরুত্বপূর্ণ ল্যাব বা অফিস, সব ওভারব্রিজ বা সাবওয়ে দিয়ে কানেক্টেড। পুরো ফেসিলিটি নো ফ্লাই জোন হিসেবে ঘোষণা করা আছে, বিমান বা ড্রোন দূরের কথা, তুই একটা ঘুড়ি পর্যন্ত ওড়াতে পারবি না। একমাত্র ছাড় আর্মি চপারের। কত বলব আর! নিরাপত্তার শেষ নেই।’
থুতনির নীচে দু-হাত জড়ো করে আরশি একমনে সায়ন্তনের কথা শুনছিল। ওর মনে অনেক প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে বন্ধুর কথা শুনতে শুনতে। কিন্তু এত প্রশ্ন একবারে করবে কীভাবে? ইতিমধ্যে সায়ন্তন একবার দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে আড়চোখে তাকিয়েছে, আরশি তা দেখেছে। এখন রাত ন-টা। খুব বেশি হলে আর আধ ঘণ্টা আটকে রাখতে পারবে ওকে। কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার আগে আরেকদিন দেখা করার সময় চেয়ে নিতে হবে। আরশির কথাটা বোধ হয় সায়ন্তন নিজেও বুঝতে পারল। বলল, ‘তোর অনেক প্রশ্ন বুঝতে পারছি, কিন্তু সব কথা একটা সিটিংয়ে হবে না। আরেকদিন বসব তোর সঙ্গে, কাল হবে না, পরশু তুই আমাদের সল্টলেকের বাড়িতে চলে আয়। বাড়ি এখন ফাঁকা, চাবি রাখা আছে পাশের বাড়ির কাকুর কাছে, আমি বা বোন এলে যাতে ঘরে ঢুকতে পারি। তা, বোনই আসে বছরে একবার, আমি তো প্রায় সাত-আট বছর পর কলকাতায় এলাম। ওখানে বসব দু-জনে, আরেকটু তাড়াতাড়ি, আজকের মতো সন্ধে করব না।’
‘কাকু-কাকিমা কোথায়?’
‘নেই,’ ছাদের দিকে তর্জনী দেখাল সায়ন্তন, ‘রোড অ্যাক্সিডেন্ট। দু-জনেই স্পট ডেড। বছর চারেক আগে। আনফরচুনেট কী জানিস, আমি বাবা-মাকে দেখতে পর্যন্ত পাইনি। ওই সময় আমি নিজেই হাসপাতালে ভরতি ছিলাম। ভ্যাকসিনের সাইড এফেক্ট। মারাত্মক অসুস্থ ছিলাম, জ্ঞান ছিল না প্রায়। যতদিনে সুস্থ হলাম ততদিনে বোন বাবা-মা-র শ্রাদ্ধশান্তি সেরে ফের মুম্বইয়ে ফিরে গেছে।’
‘তোরা কি ভ্যাকসিন নিজেদের ওপর পরীক্ষা করিস নাকি?’ আরশি কৌতূহলী হল।
‘না না, তা করব কেন,’ সায়ন্তন বলল, ‘আমার বলার ভুল। আমরা যারা বিষাক্ত প্যাথোজেন নিয়ে কাজ করি তাদের সুরক্ষার জন্য অনেকরকম ভ্যাকসিন নিতে হয়। চার-পাঁচ ধরনের ভ্যাকসিন নিলে অনেক সময় অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন হতে পারে, আমারও তা-ই হয়েছিল।’
‘বুঝলাম। পরশু যখন বলবি আমি তোদের বাড়িতে চলে যাব। আমাকে ঠিকানাটা একবার টেক্সট করে দিস। কিন্তু আজ ওঠার আগে তোকে আর দু-একটা প্রশ্ন করব, যদি তোর সময় থাকে।’
‘বল—’
‘এই শিবসাগর ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা আছে?’
‘ভাইরাল জ্বরের সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা হয় না। জ্বর, মাথাব্যথা, কাশি এসবের জন্য উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা এবং সেকেন্ডারি ইনফেকশন আটকানোর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক– সংক্ষেপে এই হল চিকিৎসা। অসমে তা-ই করা হয়েছে। জেমিফ্লক্সাসিন বলে একটা অ্যান্টিবায়োটিক খুব ভালো কাজ দিয়েছে ওখানে। তা ছাড়া কনট্যাক্ট ট্রেসিং করে যাদের ভালনারেবল মনে হয়েছিল তাদের প্রায় আড়াইশোজনকে ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল, কারণ শিবসাগর ভাইরাসের সঙ্গে সাধারণ ফ্লুয়ের ভাইরাসের মিল আছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগের কোনো সংক্রমণ হয়নি, কিন্তু ইন্টারেস্টিংলি দু-জন অসমে বেঁচে গেলেও ত্রিপুরায় এসে মারা গেছে। তদন্ত করে দেখা গেছে, এই দু-জন, সম্পর্কে কাকা-ভাইপো, শিবসাগর অয়েল রিফাইনারির কর্মী, ত্রিপুরায় আক্রান্ত একজনের পরিচিত। সম্প্রতি তাদের দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, আগরতলায় যখন ভাইরাস এসে পৌঁছেছে, তখন ভিরুলেন্স বেড়ে গেছে, ভ্যাকসিনে আর কাজ হচ্ছে না।’
‘তোরা কি এই ভাইরাসের জন্য স্পেসিফিক ভ্যাকসিন তৈরি করার চেষ্টা করছিস?’
‘করছি তো বটেই। কিন্তু আরশি, তোকে একটা কথা খোলাখুলি বলি, বায়ো-টেররিস্ট অ্যাটাক যত সহজ, বায়ো-ডিফেন্স কিন্তু তার চেয়ে ঢের বেশি কঠিন। এমন কোনো ভ্যাকসিন নেই যা দিয়ে সব ভাইরাস আক্রমণ রুখে দেওয়া যায়। ব্রড স্পেক্ট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক যেমন বহু ব্যাকটিরিয়ার ক্ষেত্রে কার্যকরী হয়, ভাইরাসের ক্ষেত্রে কিন্তু সেরকম কিছু নেই। ডিপিটি-র মতো কয়েকটা ভ্যাকসিন ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কম্বাইন্ড ভ্যাকসিন বলে কিছু হয় না। অ্যান্টি ভাইরাল ড্রাগের প্রচুর সীমাবদ্ধতা, তা ছাড়া সাইড এফেক্ট অনেক। সেজন্য আমরা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি আজকাল, একটা ভাইরাস যেতে-না-যেতেই আরেকটা চলে আসছে, দম নেওয়ার ফুরসত পাওয়া যাচ্ছে না। ইন ফ্যাক্ট, এখন আমাদের পঙ্গপাল হানা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে।’
‘পঙ্গপাল! কেন?’
‘আরে কিছুদিন আগে বালুচিস্তান থেকে যে পঙ্গপালের ঝাঁক এসে রাজস্থান-হরিয়ানা-উত্তরপ্রদেশে দাপিয়ে বেড়াল, তাদের মধ্যে বেশ কিছুর দেহে নতুন ব্যাকটিরিয়ার সন্ধান পেয়েছি আমরা। পোকামাকড়কে দীর্ঘদিন ধরেই নানা জীবাণুর বাহক বানিয়ে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। আমেরিকা রাশিয়া একসময় এ নিয়ে প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট করেছে। আচমকা পাকিস্তান থেকে যখন পতঙ্গের ঝাঁক উড়ে এল, তখনই আমাদের মনে হয়েছিল এর মধ্যে নির্ঘাত কোনো গড়বড় আছে। ঠিক তা-ই। সেটা নিয়েও লড়ছি আমরা। গত কয়েক বছরে ভারতে দফায় দফায় যেভাবে নতুন নতুন জীবাণু হানা দিয়েছে, অতীতে কখনো সেরকম হয়নি। সেজন্য আমাদের মনে হয় আমরা ধারাবাহিক জীবাণু-সন্ত্রাসের সঙ্গে লড়াই করছি।’
‘আমাদের এডিটর একই কথা বলছিলেন। উনি আমাকে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের একটা রিপোর্ট দিয়েছেন। সেখানে ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভারতে যে ক-টা গুরুত্বপূর্ণ জীবাণুহানা হয়েছে, তার বিবরণ আছে।’
‘কই দেখি, হাতের কাছে আছে?’
আরশি ওর টেবিলের ড্রয়ার খুলে সত্যকাম বাগচি যে প্রিন্ট আউট ওকে দিয়েছিলেন সেটা বের করে সায়ন্তনের হাতে দিল। সায়ন্তন চোখ বুলিয়ে বলল, ‘ইনকমপ্লিট।’
‘কীরকম?’ আরশি জানতে চাইল।
‘কেমন মেয়ে তুই, নিজের বাবার ঘটনাটা ভুলে গেলি?’
‘মানে, কী বলছিস তুই, সায়ন্তন?’ আরশি বিভ্রান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল।
‘তোদের শিলিগুড়ির নিপা আউটব্রেক এই লিস্টে নেই। ২০০১-এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি। তুই-ই তো বলেছিলিস ওই সময় তোর বাবা এক পেশেন্টকে দেখতে গিয়ে ইনফেক্টেড হন, পরে জ্বরে তিনি মারা যান। তারপরেই তো তোরা শিলিগুড়ির পাট চুকিয়ে কলকাতায় চলে এলি, ফ্যামিলি হিস্ট্রি ভুলে মেরে দিয়েছিস?’
‘হ্যাঁ, বাবা তো পেশেন্ট দেখতে গিয়ে জ্বর বাধিয়ে মারা গেল। ওই সময় এক দেড় মাস শিলিগুড়িতে ভাইরাল ফিভার দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু সেটা নিপা ভাইরাস আউটব্রেক, তা তোকে কে বলল? একথা আগে তো শুনিনি।’
‘তখন কেউ জানত না রে, আরশি, নিপা ভাইরাস জীবাণুটা কী। অনেক পরে, ২০০৬ সালে, সিডিসি, মানে, সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোল, ওদের রিপোর্টে জানাল ওই ঘটনাটা ছিল নিপা আউটব্রেক।’
‘তার মানে তুই বলতে চাইছিস, আমার বাবা বায়ো-টেররিজমের শিকার?’
‘ব্যাপারটা তো তা-ই দাঁড়াচ্ছে।’ গম্ভীরভাবে জবাব দিল সায়ন্তন।
