ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সি, কাজা।
রাতের আকাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলেন ডক্টর রণদীপ সচদেব! এই অযুত নক্ষত্ররাশি কিংবা দুধের সরের মতো আকাশগঙ্গা ছায়াপথ শহরের ধুলো এবং কৃত্রিম আলোয় ভরা আকাশে দেখা যায় না। কী সুন্দর এই মহাবিশ্ব, কী অপূর্ব এই গ্রহ! তন্ময় হয়ে ভাবছিলেন তিনি।
আজকের দিনটা খুব ভালো কেটেছে ডক্টর সচদেবের। সায়ন্তন মুখার্জি অপহৃত হওয়ার পরে কেমন একটা দমবন্ধ করা গুমোট ভাব নেমে এসেছিল এই ল্যাবে। প্রচণ্ড চাপে পড়ে গেছিলেন তিনি, তাঁর একার কাঁধে এসে পড়েছিল ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব। সেই পথে কিছুটা হলেও সাফল্যের সংবাদ মিলেছে আজ। একটু হলেও চাপমুক্ত লাগছে তাঁর।
অ্যানিম্যাল ট্রায়ালের মাঝপথে সায়ন্তন মুখার্জির ঘটনাটা ঘটে। তবে তাঁরা যে ঠিক পথে এগোচ্ছিলেন বুঝতে পারলেন যখন শিবসাগর ভাইরাসে আক্রান্ত খরগোশ এবং বাঁদরের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে দেখা গেল। এরপর হিউম্যান ট্রায়াল। প্রাথমিকভাবে তিরিশজন স্বেচ্ছাসেবককে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে, আজ বিকেলের রিপোর্ট অনুসারে সবাই সুস্থ, সবার দেহে হেল্পার টি সেল এবং সাইটোটক্সিক টি সেল ডেভেলপ করেছে, বি লিমফোসাইট ও ম্যাক্রোফাজ তৈরি হয়েছে আশানুরূপ গতিতে। এবার দেখতে হবে মেমরি সেল তৈরি হতে কত সময় লাগে। এটা যদি তাড়াতাড়ি হয় তাহলে বলা যাবে টিকার প্রথম পর্যায়ে সাফল্য পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় দফায় প্রস্তুত রয়েছে এগারোশো স্বেচ্ছাসেবক, তাদের নিয়ে কাজ শুরু করা যাবে।
অফিসার্স কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে হুইস্কিতে চুমুক দিতে দিতে ডক্টর সচদেব ভাবছিলেন, আজ সায়ন্তন উপস্থিত থাকলে জমিয়ে সেলিব্রেট করা যেত। কিন্তু তাকে যে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে তার হদিশ কেউ জানে না। ঘটনার পর বেশ কিছুদিন হয়ে গেল। এখনও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি সায়ন্তনের। সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে কিছু বলা হয়নি, ডিরেক্টর ম্যাডাম হয়তো জানেন, কিন্তু তিনি অন্যদের সঙ্গে সেসব আলোচনা করেন না। তবে সেই ঘটনার পর থেকে তাঁর এবং বেণুগোপালের নিরাপত্তা বেড়ে গেছে। যেটুকু সময় ল্যাব কিংবা অফিসে কাটান, ছায়ার মতো নিরাপত্তারক্ষী লেগে থাকে পেছনে।
ডক্টর সচদেবের কোয়ার্টারের সামনেও নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। তিনজন সিআইএসএফ জওয়ান আট ঘণ্টা করে মোট চব্বিশ ঘণ্টা বাড়ির সামনে ডিউটি করে। এ ছাড়া বসানো হয়েছে সিসিটিভি এবং মোশন সেন্সর। শুধু ডক্টর সচদেবের বাড়ি নয়, নিরাপত্তা বেড়েছে পাশাপাশি সব বাড়ির। এখানকার কোয়ার্টারগুলো সব ছোটো ছোটো একতলা বাংলো ধরনের। একটা লিভিং রুম, স্টাডি, ওপেন কিচেন কাম ডাইনিং এরিয়া এবং টয়লেট– এই হল সব বাড়ির সাধারণ নকশা। প্রতিটা বাড়ির সামনে একটু বাগান আছে, পরিচর্যা করে সরকারি মালিরা। তাঁর কোয়ার্টারের ডান দিকে দুটো বাড়ি পরেই সায়ন্তনের বাড়ি, তার সামনেও এখন সশস্ত্র রক্ষী। তাঁর ঠিক বাঁ-দিকের বাড়িতে থাকেন বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট ডক্টর গৌতম মালহোত্রা, এর পাশের বাড়িতে আঁচল শেষাদ্রি। সবার বাড়ির সামনে সিকিউরিটি বসেছে। এই সারির কুড়িটি বাংলোর সবক-টার সামনে এখন কড়া প্রহরা!
সন্ধের ঠিক মুখে আচমকা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেছে ফেসিলিটির নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে। পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে গেছে। এমনিতেই নির্জন পাহাড়ি এলাকা, চারদিকে যতদূর দেখা যায় কোথাও মানুষজন নেই, শুধু রুক্ষ পাহাড় আর নীল রঙের সুতোর মতো আঁকাবাঁকা পথে প্রবহমাণ নদী, তার ওপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চারপাশটা পুরো ভূতুড়ে দেখাচ্ছে।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভার্গব চৌধুরি ফোন করে ডক্টর সচদেবকে সাবধান করে দিয়েছে। ‘ডোন্ট স্টেপ আউটসাইড হোম ডক্টর সচদেব, উই হ্যাভ আ মোস্ট আন-ইউজুয়াল পাওয়ার ফেলিয়োর ইন জেনারেটিং স্টেশন। প্লিজ ওয়েট টিল দ্য সাপ্লাই ইজ রেস্টোরড।’ বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন বা ইচ্ছে কোনোটাই তাঁর নেই, তিনি শুধু জানতে চেয়েছেন বারান্দায় বসতে পারেন কি না। ভার্গব তাতে সম্মতি দিয়েছে। হুইস্কি, জল এবং কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে অন্ধকার বারান্দায় বসে একা একাই ভ্যাকসিনের প্রাথমিক সাফল্য সেলিব্রেট করছেন তিনি। ঠিক রাত সাড়ে আটটার সময় ক্যান্টিন থেকে রাতের খাবার আসবে। বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সি যেহেতু নন-ফ্যামিলি স্টেশন সেজন্য সকলের দু-বেলার খাবার ক্যান্টিন থেকে আসে। আগে থেকে সময় এবং মেনু সিলেক্ট করে জানিয়ে দিতে হয়। ডিনার এসে গেলে সেই প্যাকেট নিয়ে ডক্টর সচদেব ঘরে ঢুকে যাবেন, এমনই তাঁর পরিকল্পনা।
এমার্জেন্সি জেনারেটরগুলো ইতিমধ্যে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই ফেসিলিটির বেশ কিছু অংশে দু-তিন মিনিটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তা ছাড়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়বে। সেজন্য তড়িঘড়ি আর্মির লোকজন ব্যাটারি-চালিত সব জেনারেটর চালু করে দিয়েছে। দূরে সেন্ট্রি পোস্টের আলোগুলো জ্বলে উঠে কেমন একটা আলো-আঁধারি পরিবেশ তৈরি করেছে। মাঝেমধ্যে ফেসিলিটির নিজস্ব দু-একটা গাড়ি হেডলাইট জ্বালিয়ে হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। সাময়িকভাবে আলোকিত হয়ে ফের বাড়ির সামনেটা অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।
আচ্ছা, বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে ‘মোস্ট আন-ইউজুয়াল’ বলল কেন ভার্গব? আবার কিছু অঘটন হল নাকি! এর আগে এখানে দু-একবার পাওয়ার ফেলিয়োর দেখেছেন ডক্টর সচদেব। জেনারেটর প্ল্যান্টে সমস্যা হতেই পারে, ডিজেল ট্যাঙ্কেও কখনো-সখনো ঝামেলা হয়। কিন্তু কোনোদিন ভার্গব বা সিকিউরিটি বিভাগের অন্য কেউ তাঁকে এভাবে সতর্ক করেনি। আজ কী হল? ডক্টর সচদেব ঠিক করলেন এই পেগটা শেষ করে ঘরে ঢুকে যাবেন।
আজ ঠান্ডাও পড়েছে মারাত্মক। শূন্যর নীচে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রায়ই নেমে যায়, কিন্তু আজ কতটা নেমেছে তা-ই হল প্রশ্ন। উলের ফুল স্লিভ টি-শার্ট তার ওপর পাফার জ্যাকেট, কানঢাকা টুপি, গরম প্যান্ট এবং মোজা পরেও শীত বেশ ভালো টের পাচ্ছেন। অ্যালকোহল পেটে গিয়েও শীতকে খুব একটা বাগে আনতে পারছে না। তবে একটু রিল্যাক্সড অবশ্যই লাগছে।
বাড়ির সামনে একটা ছায়ামূর্তিকে আসতে দেখলেন তিনি। কর্তব্যরত সিআইএসএফ জওয়ান আগন্তুককে আটকাল। দু-জনের মধ্যে কথা হল কিছুক্ষণ, তারপর আগন্তুককে ছেড়ে দিল নিরাপত্তারক্ষী। বাইরের গেট খুলে ছোট্ট বাগানের মাঝখানের রাস্তা ধরে ডক্টর সচদেবের ঘরের দিকে এগিয়ে এল আগন্তুক।
‘হু ইজ দেয়ার?’ গলা চড়িয়ে প্রশ্ন করলেন ডক্টর সচদেব।
‘আঁচল হিয়ার, ডক্টর সচদেব,’ বলতে বলতে আঁচল শেষাদ্রি চারধাপ সিঁড়ি ডিঙিয়ে বারান্দায় উঠে এল। ‘অন্ধকারে বসে কী করছ দেখতে এলাম।’
আঁচল শেষাদ্রির আগমনে মনে মনে খুশি হলেন ডক্টর রণদীপ সচদেব। তিনি এখন জীবনের ঠিক সেই পর্বে এসে পৌঁছেছেন, যখন নিজের স্ত্রী-র বদলে অন্যের স্ত্রীকে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। তাঁর বড়োছেলে আমেরিকায় চাকরি করে, ছোটোজন বেরিলিতে মা-র সঙ্গে থাকে। কিন্তু সেও ইউনিভার্সিটির একেবারে শেষ মাথায় পৌঁছে গেছে। এরপর দাদার মতো সেও নিশ্চয়ই উচ্চতর শিক্ষা এবং উপার্জনের আশায় আমেরিকায় পাড়ি দেবে। বেরিলিতে একা থাকবেন তাঁর স্ত্রী। বছর কয়েক বাদে সরকারি চাকরির মেয়াদ শেষ হলে ডক্টর সচদেব ফিরে যাবেন নিজের বাড়িতে।
কিন্তু সমস্যা হল স্ত্রী-র প্রতি দৈহিক বা মানসিক, কোনো আকর্ষণই আর বোধ করেন না ডক্টর সচদেব। এতদিনের বিবাহিত জীবনযাপন করার পর পরস্পরের শরীরের অলিগলি চেনা হয়ে গেছে। নতুন কোনো আকর্ষণ সেখানে অবশিষ্ট নেই। ডক্টর সচদেব দেশের নামকরা বিজ্ঞানী হলেও তাঁর স্ত্রী নিতান্ত সাধারণ গৃহবধূ। স্ত্রী-র সঙ্গে কথা বলা বা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও যাওয়া, ইদানীং এর কিছুতেই তিনি উৎসাহ পান না।
ডক্টর সচদেবের এই শুষ্ক জীবনে এক ঝলক তাজা বাতাস হল আঁচল শেষাদ্রি। মেয়েটির অনেক দুর্নাম, অনেকেই ওকে পছন্দ করে না, নাক উঁচু ও পুরুষচাটা বলে আড়ালে প্রচুর কথা হয়, কিন্তু ডক্টর সচদেব আঁচলকে পছন্দ করেন। মেয়েটি নিয়মিত তাঁর খবরাখবর নেয়, সরকারি নিয়মের বাইরে গিয়ে ছোটোখাটো উপকার করে এবং সর্বোপরি তাঁর এই নিরামিষ নিরানন্দ জীবনে টাটকা অক্সিজেন জোগায়। সেজন্য তিনি আঁচলের সান্নিধ্য উপভোগ করেন।
‘এই অন্ধকারে তুমি এলে কেন?’ ডক্টর সচদেব জানতে চাইলেন।
একটা বেতের চেয়ার টেনে বসে পড়েছে আঁচল। প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হুইস্কির বোতলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ক-টা নিয়েছ?’
‘তিনটে,’ আঙুল তুলে দেখালেন ডক্টর সচদেব, ‘তুমি নেবে নাকি একটা?’
‘একদম না, আমি নিলে তুমি আমার সঙ্গে আবার একটা নেবে। থ্রি ইজ এনাফ। শেষবার সুগার কত এসেছে?’
আজ থেকে সাঁইত্রিশ বছর আগে একজন তাঁর সঙ্গে ঠিক এইভাবে কথা বলত! কিন্তু এখন তাঁকে দেখে মনে মনে বিরক্ত হল ডক্টর সচদেব। কদর্য থ্যাবড়া মুখশ্রী, থলথলে শরীর, হাজার রোগের ডিপো। স্বামীর শরীরের খবর জানায় আগ্রহ নেই, সবসময় নিজের শারীরিক সমস্যার কথা বলতে ব্যস্ত। আঁচলের সঙ্গে ডক্টর সচদেবের বয়সের বিস্তর ব্যবধান, কম করে হলেও পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর হবে, কিন্তু আঁচল তাঁকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে, বউয়ের মতো শাসন করে। ডক্টর সচদেব খুশি হয়ে জবাব দিলেন, ‘দু-শোর নীচে নেমেছে, এক-শো বিরাশি।’
‘উঁহু, শরীর নিয়ে তোমার এই মিথ্যে বলার অভ্যাসটা আমি বদলাতে পারলাম না,’ আঁচল হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি ফাস্টিং রিপোর্টের ফিগার বলে আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না। আমার যতদূর মনে পড়ছে তোমার পিপি কাউন্ট এসেছিল থ্রি ফিফটি প্লাস। ঠিক কি না?’
‘হ্যাঁ,’ লাজুক হাসি হেসে স্বীকার করে নিলেন ডক্টর সচদেব, ‘তিনশো সাতান্ন। তুমি এত কাজের চাপের মধ্যে যেভাবে আমার খবর রাখো তাতে খুব অবাক লাগে।’
‘আমি পছন্দের মানুষদের খবর রাখতে চেষ্টা করি,’ আঁচল জবাব দিল, ‘কিন্তু তুমি তো জানো এখানে আমার কী বদনাম! সবাই আমাকে অপছন্দ করে, আড়ালে গালাগালি দেয়। তোমার মিসিং কলিগও আমাকে একেবারে পছন্দ করত না।’
‘তাই নাকি! জানি না তো, মুখার্জি কখনো তোমার নামে কিছু বলেনি।’
‘সামনে তো বলবে না, বুদ্ধিমান লোক, জানে আমি তোমাকে লাইক করি। কিন্তু আমার নামে বাজে কথা বলত, আমি জানি।’
‘আমি কিন্তু কখনো কিছু শুনিনি, মানে, অন্য কাউকে বলেছে, এরকম কিছুও আমার কানে আসেনি।’
‘চাপা লোক, কথা কম বলে,’ গভীর নিশ্বাস ফেলে আঁচল মন্তব্য করল, ‘এরকম লোক ছাড়া এসপিয়োনাজের কাজ হয় নাকি! কীরকম খতরনাক লোক দেখেছ, কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে, কেউ খুঁজে বের করতে পারছে না।’
‘আমার কিন্তু মনে হয় না মুখার্জি কোনো স্পাই র্যাকেটে আছে,’ হুইস্কির গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে ডক্টর সচদেব বললেন, ‘গভর্নমেন্ট ওর ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে ভালো করে খোঁজখবর না নিয়ে ওকে এই জায়গায় বসিয়েছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। আমার থেকে কত জুনিয়ার, কিন্তু অসম্ভব শার্প ব্রেন, আমাদের কাজে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা কিন্তু ওর জন্যই।’
আঁচল একটু প্রশ্রয় দেওয়ার মতো করে বলল, ‘রণদীপ, আসলে তুমি খুব ভালোমানুষ, একজন গুড হিউম্যান বিয়িং। তুমি জানো না তোমার নিজের মধ্যে কী পোটেনশিয়াল আছে, সেজন্য তুমি মুখার্জির প্রশংসা করছ। কিন্তু আল্টিমেট ব্রেকথ্রু তোমার হাত দিয়েই হল, আজ এটা সবাই বলাবলি করছে—’
ডক্টর সচদেব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই বিদ্যুৎ চলে এল। দু-জনে বারান্দা থেকে উঠে ঘরে গিয়ে বসলেন। বারান্দা থেকে হুইস্কির বোতল, গ্লাস, স্ন্যাক্সের ডিশ সব কিছু গুছিয়ে তুলে এনে সিঙ্কে রেখে দিল আঁচল। কাল সকালে হাউসকিপিংয়ের লোক এসে পরিষ্কার করে দিয়ে যাবে। কিচেনের লাগোয়া ডাইনিং এরিয়ায় বসে দু-জনের আড্ডা ফের শুরু হল। ডক্টর সচদেব জানতে চাইলেন ভ্যাকসিনের ব্যাপারে অফিসে কী আলোচনা হয়েছে।
‘সবাই বলাবলি করছিল, তুমি ঠিকমতো কাজটা পরিচালনা করতে পেরেছ বলে ফার্স্ট রাউন্ডের ট্রায়াল উতরে যাওয়া গেছে। সায়ন্তন মুখার্জি না থাকলেও কাজটা সম্ভব, এটা তুমি প্রমাণ করে দিয়েছ।’
‘ওরা কিন্তু ভুল বলছে,’ ডক্টর সচদেব বললেন, ‘শিবসাগর ভাইরাস অ্যাটিনুয়েশনের কাজ কিন্তু সায়ন্তন মুখার্জি নিজের হাতে করেছে। ওই ধাপ যতক্ষণ না অতিক্রম করা যাচ্ছে ততক্ষণ কিন্তু ভ্যাকসিন তৈরি করার কাজ শুরু করাই যায় না।’
‘কী বললে, অ্যাটিনুয়েশন? সেটা কী ব্যাপার?’ ভুরু কুঁচকে আঁচল জানতে চাইল।
‘অ্যাটিনুয়েশন বুঝতে গেলে ভ্যাকসিন কীভাবে কাজ করে সেটা তোমাকে আগে বুঝতে হবে ম্যাডাম,’ ডক্টর সচদেব হেসে বললেন, ‘একটা জীবাণু অর্থাৎ অ্যান্টিজেন দেহে প্রবেশ করলে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে উঠে সেই জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি করে এটুকু তুমি নিশ্চয়ই জানো? কোনো রোগের ভ্যাকসিন মানে সেই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার আগেই তার বিরুদ্ধে লড়াই করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এজন্য সেই রোগের জীবাণুকে নিষ্ক্রিয় করে আগে শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এর ফলে সেই জীবাণু দেহের ভেতরে গিয়ে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, তবে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায়। এই যে জীবাণুকে নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতি, একে বলে অ্যাটিনুয়েশন। জীবাণুর মধ্যে রোগ সৃষ্টি করার যে জিন রয়েছে তাকে খুঁজে বের করে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার প্রক্রিয়া হল এটা।’
‘বেশ বুঝলাম, সায়ন্তন মুখার্জি এই কাজটা করেছে,’ আঁচল বলল, ‘কিন্তু তারপর যে কাজগুলো হয়েছে তা তো তোমার হাত ধরে, ঠিক কি না?’
‘এভাবে বলা ঠিক হবে না, আসলে এ হল টিমওয়ার্ক, আর আমাদের কাজ এখনও সফল বলা যাবে না যতক্ষণ না স্বেচ্ছাসেবকদের দেহে মেমরি সেল তৈরি হচ্ছে।’
‘মেমরি সেল! সেটা আবার কী?’
‘নিষ্ক্রিয় জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অ্যান্টিবডি যেমন তৈরি হয় সেরকম কিছু মেমরি সেল তৈরি হয়। এই স্মৃতিধর কোষগুলো জীবাণুর প্রোটিনকে চিনে রাখে, পরে যদি সেই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে, তাহলে সঙ্গেসঙ্গে এই মেমরি সেল সক্রিয় হয়ে উঠে অ্যান্টিবডি তৈরি করা শুরু করে দেয়। সেজন্য অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়া নয়, ঠিকভাবে মেমরি সেল কাজ করছে এটা যতক্ষণ না প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ বলা যাবে না ভ্যাকসিন সফল হয়েছে।’
আঁচল কিছু বলার আগেই ফোন বেজে উঠল। ক্যান্টিন থেকে জানিয়ে দেওয়া হল খাবার নিয়ে গাড়ি রওনা হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে। ডক্টর সচদেব রিসিভারের মুখে হাত চাপা দিয়ে আঁচলের দিকে চেয়ে বললেন, ‘তোমার খাবার এখানে পাঠাতে বলব?’
‘বলে দাও।’ আঁচল হেসে জবাব দিল, ‘কিন্তু তুমি আরেকটা নতুন গসিপ তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিলে ক্যান্টিনের স্টাফদের।’
ফোনে কথা বলা শেষ করে আঁচলের মুখোমুখি এসে বসলেন ডক্টর সচদেব। সন্ধেটা খুব সুন্দর হয়ে উঠেছে এখন। অ্যালকোহল, না আঁচলের প্রভাব, নাকি দুটোই? কে জানে! তিনি বললেন, ‘আমাদের এই জায়গাটা বড়ো অদ্ভুত, তাই না? কিচেন আছে, আভেন, রেফ্রিজারেটর, ইউটেনসিল রয়েছে। কিন্তু রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চ ক্যান্টিনে গিয়ে খাও, ডিনার করো ঘরে বসে। টুকিটাকি স্ন্যাক্স, চা-কফি, ড্রিঙ্কস ছাড়া বাড়িতে আর কিছুই নেই!’
‘এগুলো তো ফ্যামিলি কোয়ার্টার নয়। পরে হয়তো কোনোকালে এখানে লোকজন পরিবার নিয়ে থাকবে, তখন নিশ্চয়ই এরকম ব্যবস্থা আর থাকবে না। সবাই ঘরে রান্না করেই খাবে।’
টিং টং করে দরজার বেল বেজে উঠল। ডক্টর সচদেব উঠে গিয়ে দরজা খুললেন। ক্যান্টিনের লোক এসেছে খাবারের প্যাকেট নিয়ে। নিজের এবং আঁচলের খাবারের প্যাকেট নিয়ে তিনি ডেলিভারি করতে আসা লোকটিকে ধন্যবাদ দিলেন। লোকটি ধন্যবাদ পেয়ে কেমন থতোমতো খেয়ে গেল, কুণ্ঠিতভাবে বলল, ‘না স্যার, থ্যাঙ্কস দেওয়ার কিছু নেই। বরং আজ দেরি হয়ে গেছে আমাদের, এমন সময় পাওয়ার ফেলিয়োর হল!’
‘নো ইসু, আমি এমনিতেই একটু দেরি করে খাই। রোজই আমাকে খাবার পরে গরম করে নিতে হয়।’ ডক্টর সচদেব লোকটিকে আশ্বস্ত করে দরজা বন্ধ করলেন। কিচেন প্ল্যাটফর্মে খাবারের প্যাকেট রেখে আঁচলকে জিজ্ঞেস করলেন সে এখন ডিনার করবে কি না। আঁচল ‘না’ বলাতে ফের বেশ জুত করে চেয়ারে এসে বসলেন ডক্টর সচদেব। তারপর বললেন, ‘হঠাৎ পাওয়ার কাট কেন হল, এনি আইডিয়া? কিছু শুনেছ?’
‘না তো।’
‘পাওয়ার কাট হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে ভার্গব আমাকে ফোন করেছিল। বাড়ির বাইরে অন্ধকারে বেরোতে বারণ করল। কিন্তু ওর একটা কথা শুনে আমার অবাক লেগেছে, এই পাওয়ার ফেলিয়োরকে ভার্গব “মোস্ট আন-ইউজুয়াল” কেন বলল বুঝিনি!’
‘তুমি জানতে চাওনি?’
‘নো, হি ওয়াজ এক্সট্রি্মলি বিজি অ্যাট দ্যাট টাইম। আমি ওর কথা শুনেই বুঝতে পারছিলাম, সেজন্য আর জিজ্ঞেস করিনি।’
কিছুটা দার্শনিকভাবে আঁচল মন্তব্য করল, ‘একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে আমাদের এখানে। প্রথমে সায়ন্তন মুখার্জির ঘটনা। তারপর এই পাওয়ার ফেলিয়োর। আজকের মতো দীর্ঘ পাওয়ার কাট এখানে আমি আগে কখনো দেখিনি। হতে পারে সেটাই ভার্গবের কাছে আন-ইউজুয়াল মনে হয়েছে।’
‘তা হবে কী করে, ডক্টর সচদেব, আমাকে ভার্গব পাওয়ার ফেলিয়োর হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে ফোন করেছিল। কিন্তু তখন ও জানবে কীভাবে পাওয়ার রেস্টোরেশনে কত সময় লাগবে! ও নিশ্চয়ই অন্য কিছু মিন করেছিল। কাল দেখা হলে জিজ্ঞেস করব।’
আরও কিছু সময় গল্প করার পর ডক্টর সচদেব বললেন, ‘এবার খেয়ে নেওয়া যাক।’
আঁচল সম্মতি দিল। সে নিজেই উঠে গেল খাবার গরম করতে। ডক্টর সচদেব রাতে খুব সামান্য আহার করেন। চিকেন স্টু, এক পিস রুটি এবং একটা আপেল। এই হল তাঁর নৈশাহার। আঁচল নিরামিষাশী, তার ডিশে দুটো রুটি, সঙ্গে পনিরের একটা পদ আর দই। খাবার টেবিলে মুখোমুখি বসে দু-জনে খাওয়া শুরু করলেন।
খাওয়ার মাঝপথে দরজার বেল ফের বেজে উঠল। একটু অবাক হয়ে ডক্টর সচদেব দরজার দিকে এগোতে যাচ্ছিলেন, তাঁর হাত ধরে বসিয়ে দিল আঁচল। কঠিন গলায় বলল, ‘তুমি বোসো, আমি না বলা পর্যন্ত দরজা খুলবে না।’
আঁচল দরজার ম্যাজিক আই দিয়ে বাইরে কে আছে দেখে নিজে দরজার পাশে লুকিয়ে পড়ল। হাত দিয়ে ইশারা করে ডক্টর সচদেবকে দরজা খুলে দিতে বলল। কিছুটা অবাক হলেও ডক্টর সচদেব বুঝলেন আঁচল লুকিয়েছে কারণ বাইরে যে ব্যক্তি এসেছে সে তাকে এখানে দেখুক আঁচল তা চায় না। তিনি দরজা খুলে দিতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল বেণুগোপাল। প্রচণ্ড উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘ভেরি গুড নিউজ স্যার, ডক্টর সায়ন্তন মুখার্জি হ্যাজ বিন রেসকিউড! লখনউয়ের একটা বাড়ি থেকে ডক্টর মুখার্জিকে কিছুক্ষণ আগে রেসকিউ করা হয়েছে, এইমাত্র দিল্লি থেকে অফিশিয়াল কনফার্মেশন এল।’
‘গ্রেট!’ লাফিয়ে উঠলেন ডক্টর সচদেব, ‘হাউ ইজ হি? সুস্থ আছে তো?’
‘পুরো সুস্থ নয়, ব্রুটালি অ্যাবিউজড। তবে সেরে উঠবে। কিন্তু আপনার মুশকিল হয়ে গেল ডক্টর সচদেব!’
‘আরে না না, আমাদের টিমওয়ার্ক আরও ভালো হবে। সায়ন্তন ইজ আ জিনিয়াস। দু-জনে একসঙ্গে কাজ করলে আমরা অনেক তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে পারব।’
‘সেটাই তো আমরা চাইছি না, ডক্টর সচদেব। আপনারা দু-জনে জুটি বাঁধলে কাজ ভালো হবে, তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন এসে যাবে বাজারে। শুধু তা-ই নয়, ভাইরাস স্ক্রিনিং অনেক সহজ হয়ে যাবে। আমার চেয়ে এসব কথা বেশি ভালো আর কে জানে?’
‘মানে! কী বলছ তুমি, আমি বুঝতে পারছি না?’ বিস্মিত হয়ে বললেন ডক্টর রণদীপ সচদেব, ‘তোমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে?’
বেণুগোপালের চোখ-মুখ বদলে গেছে। তার হাতে উঠে এসেছে একটা খুদে পিস্তল। চিবিয়ে চিবিয়ে বেণুগোপাল বলল, ‘আমাদের অস্ত্র ইন্ডিয়ায় ঢুকে গেছে। এখন সায়ন্তন মুখার্জি ফিরে এলেও মহামারি ঠেকাতে পারবে না। আর আপনি যদি না থাকেন, তবে মৃত্যুর তাণ্ডব শুরু হয়ে যাবে আপনাদের দেশে। গুডবাই—’
‘বেণুগোপান, প্লিজ আমার কথা শোনো,’ ডক্টর সচদেব মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে শেষ চেষ্টা করলেন, ‘তুমি আমাকে মেরে ফেলতে পারো, কিন্তু নিজে এখান থেকে বেঁচে বেরোতে পারবে না—’
‘মালুম হ্যয় মুঝে। ম্যয় শাহাদত কি মওত কে লিয়ে তৈয়ার হুঁ।’
বেণুগোপালের মুখে হিন্দি শুনে চমকে গেলেন ডক্টর সচদেব। এতদিনে একবারের জন্য তার মুখ থেকে হিন্দি শোনা যায়নি। বরং দক্ষিণের রাজ্যগুলোর মানুষ যেমন হিন্দিকে অপছন্দ করে, সেই ধরনের একটা মনোভাব তার মধ্যে লক্ষ করেছেন।
ডক্টর সচদেবের দিকে পিস্তল উঁচিয়ে ধরল বেণুগোপাল। তারপর হঠাৎ একটা অস্ফুট শব্দ করে টলে পড়ে গেল মাটিতে। তার হাতের পিস্তল থেকে গুলি বেরিয়ে সিলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল মেঝের ওপর। ডক্টর সচদেব অবাক হয়ে দেখলেন, দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে আঁচল। তার হাতে একটা পিস্তল। পিস্তলের নল দিয়ে হালকা ধোঁয়া বেরোচ্ছে!
‘আপনি খুব জোর বেঁচে গেলেন, ডক্টর সচদেব,’ আঁচল বলল, ‘সায়ন্তন মুখার্জিকে রেসকিউ করা হয়েছে সেটা জানার পর থেকেই মনে হয়েছিল আপনার ওপর একটা অ্যাটেম্পট হবে। উই ওয়্যার রাইট! ভার্গব—’
‘ইয়েস ম্যাম,’ দরজার বাইরে থেকে সাড়া এল। ঘরে ঢুকল ভার্গব চৌধুরি। তার হাতেও একটা পিস্তল। মাটিতে পড়ে আছে বেণুগোপালের নিষ্প্রাণ দেহ। হাত থেকে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়েছে তার আগ্নেয়াস্ত্রটা। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে ভার্গবকে আঁচল নির্দেশ দিল, ‘রিমুভ হিম ফ্রম হিয়ার। সার্চ হিজ রুম অ্যান্ড পার্সোনাল লকার। ইমিডিয়েট।’
কেমন ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন ডক্টর সচদেব। মনে হচ্ছে হঠাৎ যেন ভুল করে সিনেমার শুটিংয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন তিনি। খুব দুর্বল কণ্ঠে জানতে চাইলেন, ‘এসব কী হচ্ছে আঁচল?’
‘ “মোস্ট আন-ইউজুয়াল পাওয়ার ফেলিয়োর” কেন জানতে চাইছিলেন না, ডক্টর সচদেব?’ বেণুগোপালকে গুলি করার পর থেকে বদলে গেছে আঁচল শেষাদ্রির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং কথা বলার ধরন। সেই গায়ে-পড়া নরম-সরম ব্যাপারটা উধাও, পরিবর্তে কঠিন কণ্ঠে কথা-বলা বেশ একজন ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা ফুটে উঠেছে তার মধ্যে এবং ডক্টর সচদেবকে ‘তুমি’ ছেড়ে ‘আপনি’ বলা শুরু করেছে আঁচল, ‘আমাদের পাওয়ার জেনারেটিং স্টেশনের সুইচ রুমে ঢুকে পড়েছিল একটা লাদাখ টোড, আপনারা সায়েন্টিস্টরা যাকে চিনবেন বুফোটিস লাটাসটাই নামে। পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন ফিউজের মধ্যে ঢুকে ব্যাংটা শর্ট সার্কিট করে দিয়েছিল। কিন্তু কাজায় লাদাখ টোড গত বারো বছরে দেখা যায়নি, এরকম ঠান্ডার মধ্যে ওদের দেখাও যায় না। তখনই মনে হয়েছিল কেউ ইচ্ছে করে পাওয়ার কাট করিয়েছে। লাদাখে আমাদের আরেকটা ফেসিলিটি থেকে বেণুগোপাল ক-দিন আগেই ঘুরে এসেছে, নিশ্চয়ই ভুলে যাননি?’
‘বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? বেণুগোপাল কে? সে আমাকে মারতে চাইছিল কেন?’ বিহ্বল স্বরে প্রশ্ন করলেন ডক্টর সচদেব।
‘বলছি, ধৈর্য ধরে শুনুন। গতকাল রাতে লখনউ থেকে সায়ন্তন মুখার্জিকে রেসকিউ করা হয়েছে। খবরটা জানেন প্রতীক্ষা ম্যাম, আমি এবং ভার্গব। আরেকজন খবরটা পেয়ে যাবে অনুমান করেছিলাম, কিন্তু হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া জরুরি ছিল। বেণুগোপাল হল সেই লোক। ওর আসল নাম নিশ্চয়ই বেণুগোপাল নয়, আসল নাম আমরা জানার চেষ্টা করব, তবে লোকটা যে পাকিস্তানি আইএসআই-এর এজেন্ট সে-ব্যাপারে সংশয় নেই। একটু আগে ও-ই পাওয়ার স্টেশনে শর্ট সার্কিট করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল যাতে অন্ধকারে আপনার ওপর আক্রমণ করতে পারে। সেটা অনুমান করে আমি আপনার বাংলোয় চলে আসি। বেণুগোপাল সম্ভবত আমার পরিচয় আগেই জানত বা এখন জেনে গেছে, সেজন্য আমি থাকাকালীন এখানে ঢোকার ঝুঁকি নেয়নি। কিন্তু ডিনার টাইমে আপনি একা থাকবেন সেটা বুঝেই ও ফিরে এসেছিল। আমি যে একসঙ্গে ডিনার করার অজুহাতে এখানে থেকে যাব ব্যাপারটা বেণুগোপাল আন্দাজ করতে পারেনি।’
‘তোমার, মানে, ইয়ে, আপনার পরিচয় মানে?’ ডক্টর সচদেব প্রায় তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি আঁচল শেষাদ্রি নন?’
আঁচল হাসল। বলল, ‘হ্যাঁ, আমার নাম আঁচল শেষাদ্রি। কিন্তু আমি প্রতীক্ষা রায়নার সেক্রেটারি নই।’
‘তবে—’ চোয়াল ঝুলে পড়ল ডক্টর সচদেবের।
‘ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সির সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি হেড হিসেবে আপনারা ভার্গব চৌধুরিকে চেনেন। কিন্তু কখনো মনে প্রশ্ন তৈরি হয়নি, ডেপুটি হেডকে নিয়ন্ত্রণ করে কে? সিকিউরিটি হেড মানুষটি কোন জন?’
ডক্টর সচদেব বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
‘বিপদ কেটে গেছে ডক্টর সচদেব,’ আঁচল ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘আপনি রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারেন। তবে একটা কথা বলে যাই। আমার গায়ে-পড়া ব্যবহার দেখে আপনি হয়তো আমাকে চিপ উয়োম্যান মনে করেছেন। কিন্তু আমার কাজ ছিল আপনাকে নজরে রাখা, সেজন্য আমাকে একটু অভিনয় করতে হয়েছে আপনার সঙ্গে। যেভাবে দিনের পর দিন আমাকে খুশি করতে স্ত্রীর নামে কটু মন্তব্য করেছেন, তা আপনাকে মানায় না কিন্তু! আপনার স্ত্রীকে আরেকটু সম্মান করবেন, গুরুত্ব দেবেন। উনি একদিন দেখতে সুন্দরী ছিলেন, আপনার সন্তানের মা হয়েছেন আপনাকে ভালোবেসে, এখন বয়সকালে ওঁকে দূরে ঠেলে দেবেন না।’
