জাহান্নমের সওদাগর – ১০

অপহরণকারীদের আস্তানা। স্থান: অজ্ঞাত।

থকথকে কাদার চৌবাচ্চার মধ্যে সায়ন্তনকে কেউ ফেলে দিয়েছে! এঁটেল মাটির কাদা সম্ভবত, যতবার শ্বাস নেওয়ার জন্য সায়ন্তন চৌবাচ্চা থেকে মাথা তুলছে, ওর গা থেকে চুঁইয়ে পড়ছে ঘন কাদাগোলা। কিন্তু মাথা তুলে শ্বাস নিতে গেলেই চৌবাচ্চার পাশে বসে থাকা ড্রাগনের মুখ থেকে আগুনের হলকা বেরিয়ে আসছে, সেইসঙ্গে ড্রাগনের নিশ্বাসের তীব্র দুর্গন্ধ! আচ্ছা, ড্রাগনের মুখে এত বাজে গন্ধ হয় কেন, ওরা কি দাঁত মাজে না? ড্রাগনের হাত থেকে বাঁচার জন্য সায়ন্তনকে আবার ডুব দিতে হচ্ছে কাদার মধ্যে। বাতাসের অভাবে বুক ফেটে যাচ্ছে তার।

পাশ থেকে কেউ একজন ভারী গলায় বলল, ‘লাগতা হ্যয় বান্দাকো হোশ আ গয়া।’

অন্য কেউ জবাব দিল, ‘লেকিন আভি উসকো পরেশান মৎ করো। ইতনা ড্রাগ তুমহারে আদমি নে ইসে দিয়ে থে কি ইসকা মওত হো যাতা। বাল বাল বাঁচ গয়া!’

ভারী গলা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘হমারে কামকে বারেমে আপ মৎ সোচিয়ে, ডক্টরসাব। আপ জ্যয়সা মাশরুফ আদমি হমারে সহারাকে লিয়ে আয়ে, ইসিলিয়ে আপকো বহোত বহোত শুক্রিয়া। আভি আপকো হম হমারে তরফসে অলবিদা কহতে হ্যয়।’

সায়ন্তন চোখ খুলল। একটা মাঝারি মাপের ঘরে লোহার খাটে পাতলা তোশকের ওপর তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মাথার নীচে একটা পাতলা বালিশ কিংবা ভাঁজ করা চাদর রয়েছে। ঘরে টিউবলাইট জ্বলছে, বেশ উঁচু সিলিং থেকে ঘুরছে একটা ফ্যান। ঘরে জানলা নেই, ওপরদিকে পায়রার খোপের মতো গোটা দুই ঘুলঘুলি রয়েছে। যে খাটে সায়ন্তন শুয়ে রয়েছে তার পাশে একটা ছোটো কাঠের র‍্যাক। তার ওপর একটা স্টেথো, প্রেশার মাপার যন্ত্র, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, গোটাকতক খালি অ্যাম্পিউল। একপাশে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার দাঁড় করানো রয়েছে। ঘরের দরজা লোহার। দরজার একপাশে একটা জায়গা নীল রঙের প্লাস্টিকের পর্দা দিয়ে ঘেরা।

মাথার ভেতরে একটা দপদপ করা যন্ত্রণা আর সারা শরীর ব্যথা। তা সত্ত্বেও সায়ন্তন টের পেল তার মাথা বেশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে। ট্যাক্সিতে ওঠার মুখে তাকে আক্রমণ করেছিল এই লোকগুলো, একটা ঘুমপাড়ানি ইঞ্জেকশন দিয়েছিল বাহুতে, এ পর্যন্ত বেশ মনে পড়ছে। তার পরের ঘটনা সব ঝাপসা। কত দিন অজ্ঞান হয়ে ছিল সায়ন্তন, এক দিন না দু-দিন, নাকি তার চেয়েও বেশি?

ডান হাত নাড়াতে গিয়ে সায়ন্তন টের পেল হাতটা খাটের সঙ্গে নাইলনের দড়ি দিয়ে বাঁধা। আবার বাঁ-পাটাকেও এরা বেঁধে রেখেছে। নিজেকে খুব অসহায় বলে মনে হল সায়ন্তনের, নাহ্, ভার্গবের নিষেধ অমান্য করে শহরে বেপরোয়া ঘুরে বেড়ানো মোটেই উচিত হয়নি।

ভারী কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ‘গরিবখানামে আপকি স্বাগত করতা হুঁ, জনাব। আভি তবিয়ত ক্যয়সা হ্যয় আপকি?’

কণ্ঠস্বর আসছে সায়ন্তনের মাথার পেছন দিক থেকে। লোকটাকে দেখতে পাচ্ছে না সে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করতেই লোকটা ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ‘আভি অ্যয়সা কোশিশ মৎ কিজিয়ে, হুজুর। মুলাকাত হোনেকা বহোত ওয়ক্ত বাদ মে মিল জায়েগা। তব হি মেরা চেহরা দেখ লিজিয়ে গা।’

‘আমাকে এভাবে ধরে নিয়ে আসা হল কেন?’ সায়ন্তন প্রশ্ন করল। কথা বলতে গিয়ে সে টের পেল গলা দিয়ে জোরে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে রয়েছে। সে অতিকষ্টে বলল, ‘থোড়া পানি মিলেগা?’

‘হাঁ হাঁ হুজুর, পানি কিঁউ নহি মিলেগা? আপ হমকো বিলকুল বে-দিল না সমঝিয়ে!’ একটা লোমশ মোটা হাত পেছন থেকে কাচের গ্লাসে জল এগিয়ে দিল। সায়ন্তন বাঁ-হাত দিয়ে গ্লাসটা কোনোমতে ধরে ঢক ঢক করে এক নিশ্বাসে সব জলটুকু খেয়ে নিল।

‘বোলিয়ে জনাব, আপকি খানাকে লিয়ে ক্যয়া চিজ মাঙ্গাউ? আপ দো রোজ বেহোঁশ থে, ভুখ তো জরুর লগা হুয়া হোগা!’

এমনভাবে লোকটা কথা বলছে যেন সায়ন্তন হোটেলে এসে উঠেছে। সায়ন্তন মনে মনে রেগে গেলেও এখন চেঁচামেচি করে লাভ হবে না বুঝে শান্তভাবে ফের জানতে চাইল, ‘আমাকে আপনারা এভাবে ধরে নিয়ে এলেন কেন? আপনারা কারা? আমার সঙ্গে আপনাদের কীসের শত্রুতা?’

পেছন থেকে কণ্ঠস্বর একটু হাসল। তারপর বলল, ‘দাওয়াত ভেজনে সে আপ থোড়ি উস দাওয়াত কো স্বীকার করতে জনাব, ইসিলিয়ে আপকো উঠাকে লে আয়ে। হমারে মজবুরি সমঝনে কো কোশিশ কিজিয়ে।’

‘উঠিয়েই-বা নিয়ে এলেন কেন? কী দরকার আমার সঙ্গে?’

লোকটা এবার একটু কঠিনভাবে বলল, ‘সব প্রশ্নের জবাব আপনি যথাসময়ে পেয়ে যাবেন। অধৈর্য হবেন না, তাতে আপনার ক্ষতি হবে।’

‘এই জায়গাটা কোথায়? আমাকে কোথায় নিয়ে আসা হয়েছে?’

‘জায়গার নাম জেনে কী হবে আপনার? বাড়ি থেকে একটু দূরে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু পরে আমরা আপনাকে ঠিক বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব, সেজন্য চিন্তা করবেন না।’

ঘটাং করে দরজায় একটা শব্দ হল। ফিকে নীল বোরখা পরা এক মহিলা হাতে করে খাবারের থালা নিয়ে ঢুকলেন। পেছন থেকে যে লোকটা এতক্ষণ তার সঙ্গে কথা বলছিল সে সায়ন্তনের ডান হাতের বাঁধন খুলে দিল। বিছানার ওপর উঠে বসল সায়ন্তন। এবার লোকটার দিকে দেখার সুযোগ হল তার। লোকটা ছ-ফুটের বেশি লম্বা, দশাসই চেহারা, মুখোশে ঢাকা মুখ। কালো কাপড়ে তৈরি বালিশের কভারের মতো দেখতে মুখোশটা, চোখ আর মুখের জায়গায় ছিদ্র করা, ঠিক যেরকম মুখোশ পরা সন্ত্রাসবাদীদের সিনেমা বা টিভির পর্দায় দেখা যায়! কাবুলিওয়ালাদের মতো পোশাক পরা লোকটার কাঁধে আড়াআড়িভাবে ঝুলছে অ্যাসল্ট রাইফেল।

মহিলাটি খাবারের থালা নামিয়ে রেখে ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। লোকটা আবার বিনয়ের অবতার হয়ে বলল, ‘আপ খা লিজিয়ে, হুজুর। শায়েদ হমারে খানা আপ জ্যয়সা মশহুর আদমিকো খানেকা লায়েক নহি হ্যয়, লেকিন আভি কে লিয়ে এহি ভোজন করিয়ে। শামকো হম আপকো শাহি খানা জরুর খিলায়েঙ্গে, ওয়াদা করতা হুঁ।’

এগিয়ে এসে লোকটা সায়ন্তনের ডান হাতের বাঁধন খুলে দিল। সায়ন্তন ধীরে ধীরে উঠে বসল বিছানার ওপর। মাথা ঘুরছে এখনও, গা গোলাচ্ছে। অ্যানাস্থেশিয়ার ওভারডোজ, বুঝল সায়ন্তন। খিদে পেয়েছে, এই প্রথম টের পেল সে। কিন্তু তার আগে একবার বাথরুমে যাওয়া দরকার, তলপেট টনটন করছে। কড়ে আঙুল দেখিয়ে ইশারায় সায়ন্তন বোঝাল তার টয়লেটে যাওয়া প্রয়োজন। মুখোশধারী যেন জানত সায়ন্তন টয়লেটে যেতে চাইবে। খুব সাবলীলভাবে এগিয়ে এসে সে সায়ন্তনের পায়ের বাঁধন খুলে তাকে খাট ছেড়ে নামতে সাহায্য করল। তারপর হাঁটিয়ে নিয়ে গেল নীল পর্দায় ঘেরা জায়গাটার দিকে। পর্দা দিয়ে ঘেরা জায়গার পেছনে অস্থায়ী শৌচালয়, মাটিতে একটা চকচকে নতুন প্যান বসানো। সঙ্গে এক বালতি জল এবং মগ।

পেট হালকা করে হাত ধুয়ে ফিরে এসে খাটে বসল সায়ন্তন। তৎক্ষণাৎ লোকটা তার পা ফের বেঁধে দিল। সায়ন্তনের হাসি পেল, মুখোশধারী যখন ওকে ধরে বাথরুমে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন টের পেয়েছে লোকটা অতীব বলশালী। গায়ের জোরে একে হারানো অসম্ভব। হাত-পা না বাঁধলেও সায়ন্তনের দিক থেকে বিপদের কোনো কারণ নেই।

থালার ঢাকনা খুলে সায়ন্তন দেখল চারটে মোটা রুটি, প্রচুর মশলা দেওয়া ঘন ডাল এবং একবাটি সুজি জাতীয় জিনিস রয়েছে। কিন্তু খিদে থাকা সত্ত্বেও তার পক্ষে দেড়খানার বেশি রুটি খাওয়া সম্ভব হল না। খুব বমি পাচ্ছে, অ্যানাস্থেশিয়া কেটে যাওয়ার পরে যেমন লাগে। কোনোক্রমে খাওয়া শেষ করেই সায়ন্তন বিছানায় শুয়ে পড়ল। মুখোশধারী এতক্ষণ একটাও বাক্য ব্যয় করেনি। সায়ন্তন শুয়ে পড়তে তার ডান হাত ফের বেঁধে দিয়ে আলো নিভিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল সায়ন্তন।

সায়ন্তনের ঘুম ভাঙল দূরে কোথাও বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন যাওয়ার আওয়াজে। অনেক লম্বা গাড়িটা, সম্ভবত মেল ট্রেন, মালগাড়ি নয়, মালগাড়ির গতি কম বলে চাকার আওয়াজ অন্যরকম হয়। ট্রেনের শব্দ মিলিয়ে যেতে বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করল সায়ন্তন, তখনই মনে পড়ল যেভাবে তার হাত-পা বাঁধা, তাতে হাত কিংবা পা, যেকোনো একটা না খুলে দিলে উঠে বসা সম্ভব নয়। সায়ন্তন চেঁচিয়ে হাঁক দিল, ‘কোই হ্যয়?’

সঙ্গেসঙ্গে দরজা খুলে গেল। সকালের সেই মুখোশধারী ঘরে ঢুকে দ্রুত আলো জ্বেলে দিল। পেছন পেছন এসে ঢুকল সেই মহিলা, তার হাতে স্টিলের গ্লাসে চা এবং বিস্কুট। সায়ন্তনের সামনে গ্লাস নামিয়ে রেখে মহিলা বেরিয়ে গেলেন। মুখোশধারী হাতের বাঁধন খুলে দিতে সায়ন্তন উঠে বসল।

চায়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে সায়ন্তন আড়চোখে দেখল ঘরে দু-জন লোক এসে ঢুকল। দু-জনের উচ্চতা প্রায় একইরকম, পাঁচ ফুটের এদিক- ওদিক, একজন সামান্য লম্বা, কালো চুল, গোল মুখ, চোখে কালো চশমা। একজনের গোঁফ আছে, অন্যজনের গোঁফদাড়ি কিছুই নেই। মুখোশধারী তাড়াতাড়ি বাইরে থেকে দু-জনের জন্য দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার এনে দিল। বসতে বসতে একজন ইংরেজিতে বলল, ‘গুড ইভনিং, ডক্টর মুখার্জি। উই হ্যাভ সাম ভেরি ইমপর্ট্যান্ট ডিসকাশন। বাট বিফোর উই প্রসিড এনি ফারদার, আই ওয়ান্ট টু টেল ইউ দ্যাট, ইউ হ্যাভ ভেরি লিটল টাইম টু টেক ইয়োর ডিসিশন!’

সায়ন্তন চুপ করে রইল।

লোকটা আবার বলল, ‘ডক্টর মুখার্জি, আমরা আপনাকে শিবসাগর ভাইরাস সংক্রান্ত সব তথ্য নষ্ট করে ফেলার জন্য সতর্ক করেছিলাম। আপনি শোনেননি। শুনলে আপনাকে কষ্ট পেতে হত না। আশা করছি, আপনি এখন আমাদের সঙ্গে কোঅপারেট করবেন। যদি না করেন, বুঝতেই পারছেন, সেক্ষেত্রে আপনার সমস্যা হবে—’

সায়ন্তন কোনো জবাব দিল না।

বিরক্ত হয়ে লোকটা বলল, ‘চুপ করে থাকলে বেঁচে যাবেন ভাববেন না ডক্টর মুখার্জি, কী করে মুখ খোলাতে হয় আমরা জানি। আরিফ—’

আরেকজন, যে এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল, সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার হাতে একটা স্টিলেটো ধরনের ছুরি। সায়ন্তনের দিকে কয়েক পা এগিয়ে আসতেই আরেকজন তাকে থামিয়ে দিল, ‘রুক যাও, আরিফ—’

লোকটা এবার কড়া গলায় বলল, ‘আমি আপনাকে একটা করে প্রশ্ন করব, আপনি তার ঠিকঠাক জবাব দেবেন। একটা বাজে কথা বলবেন, সঙ্গেসঙ্গে আরিফ আপনার শরীর চিরে সেখানে মরিচ গুঁড়ো লাগিয়ে দেবে। আপনি যত খুশি চিৎকার করতে পারেন, আশেপাশে সাহায্য করার মতো কেউ নেই।’

সায়ন্তন বলল, ‘আপনারা আমার সঙ্গে এমন করছেন কেন? আমি তো আপনাদের কোনো ক্ষতি করিনি।’

‘আপনার কাজই আমাদের ক্ষতি, ডক্টর মুখার্জি।’

‘কেন একথা বলছেন বুঝতে পারছি না,’ সায়ন্তন জবাব দিল, ‘আমি একজন সায়েন্টিস্ট, সামান্য একটা সরকারি চাকরি করি। মানুষকে রোগের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সবসময় চেষ্টা করি, এর চেয়ে বেশি কিছু তো করিনি।’

প্রশ্নকারী হাসল। বলল, ‘আন্ডারস্টেটমেন্ট হয়ে গেল ডক্টর মুখার্জি। আপনি ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টের এপিডেমিক ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের একজন ব্রাইট অফিসার। আপনি শুধু একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী নন, তার সঙ্গে ভারতের অন্যতম সেরা ফিল্ড এপিডেমিয়োলজিস্ট। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকা থেকে এক বছর আগে আপনি বায়ো-টেররিজমের ওপর স্পেশালাইজেশন করে এসেছেন। এরপরেও বলবেন আপনি সামান্য মানুষ?’

‘আপনি এপিডেমিক ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস সম্পর্কে কী জানেন?’

‘বেশি কিছু নয় ডক্টর মুখার্জি, যেটুকু আপনার সম্পর্কে জানার জন্য দরকার, সেটুকু জানি। এপিডেমিক ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ভারত সরকারের একটা এলিট প্রোজেক্ট। দিল্লির ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রোগ্রামটা চালু করেছে ২০১২ সালে, এখন অবধি পাশ করে বেরিয়েছেন মাত্র পঁয়ত্রিশজন অফিসার। আপনি তাঁদের মধ্যে একজন। আপনি ফিল্ড ইনভেস্টিগেশনে এমন দক্ষতা দেখিয়েছেন যে গভর্নমেন্ট আপনাকে আটলান্টার সিডিসি-তে কাউন্টার বায়ো-টেররিজম নিয়ে ট্রেনিং নিতে পাঠিয়েছিল। এখন আপনি হিমাচলে ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সিতে কাজ করেন। একটা ভাইরাস, আপনারা নাম দিয়েছেন শিবসাগর ভাইরাস, সেটা কোথা থেকে এল, কীভাবে ছড়াচ্ছে, ট্রিটমেন্ট কী এসব রিসার্চের পুরোটাই আপনি দেখছেন। কি, ঠিক বললাম তো, ডক্টর মুখার্জি?’

এরা কারা সায়ন্তন এখনও বুঝতে পারছে না। তবে একটা ব্যাপার খুব ভালো মতো বোঝা যাচ্ছে যে, তার সম্পর্কে ভালো করে জেনেবুঝে তারপর তাকে অপহরণ করা হয়েছে। আরেকটা ব্যাপার হল, এরা যেভাবে কথা বলার সময় বার বার ‘ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট’ শব্দটা বলছে, তা থেকে মনে হয় এরা ভারতীয় নয়। কিংবা, হয়তো ভারতের কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী যারা দেশকে অপছন্দ করে!

‘শিবসাগর ভাইরাস সম্পর্কে আমি এখনও বিস্তারিত কিছু জানি না। কলকাতার ল্যাবে নানারকম স্যাম্পল জমা দেওয়া আছে, তারা রিপোর্ট দিলে তবে জানা যাবে।’

‘ল্যাবের রিপোর্টের বাইরে অনেক কিছু আছে। আপনি জেনেছেন ভাইরাসটা দু-মাসের মধ্যে অনেক বেশি পাওয়ারফুল হয়ে উঠেছে। শিবসাগর ভাইরাস এখন যেমন বাতাসে ভেসে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে, তেমনই গায়ের চামড়া দিয়ে কিংবা খাবারের সঙ্গে মিশেও শরীরে ঢুকতে পারে। আপনি একটা টেস্ট কিট প্রায় ডেভেলপ করে ফেলেছেন যা দ্রুত বলে দেবে দেহে ভাইরাস আছে কি না, থাকলে ভাইরাল লোড কতটা। সেই কাজটা কতদূর এগিয়েছে, ডক্টর মুখার্জি?’

‘আপনারা ভুল করছেন। টেস্টিং কিটের কনসেপ্টটা এখনও থিয়োরিটিক্যাল, সত্যি কাজ করে কি না দেখার জন্য প্রচুর রিসার্চ বাকি।’

‘আরিফ—’

বিদ্যুৎচমকের মতো ঝলসে উঠল আরিফের হাত। তীক্ষ্ণ একটা জিনিস এসে ছুঁয়ে গেল সায়ন্তনের বাহু। ছুরি চালিয়ে প্রায় দু-ইঞ্চি লম্বা জায়গা কেটে ফেলেছে আরিফ। মুহূর্তের মধ্যে একমুঠো লঙ্কাগুঁড়ো ক্ষতর ওপর ছিটিয়ে দিল। যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল সায়ন্তন।

অন্য লোকটা তারিফ করার ভঙ্গিতে বলল, ‘আরিফের হাতের কাজ খুব ভালো। আপনার চামড়া কেটেছে, কিন্তু পেশিতে ছুরি বসেনি, কোনো শিরাও কাটেনি। তবে রেগে গেলে আরিফের হাতে এতটা নিয়ন্ত্রণ থাকে না!’

অসম্ভব জ্বালা করছে ক্ষতস্থানটা, মনে হচ্ছে আগুন চেপে ধরেছে কেউ জায়গাটার ওপর। কষ্টে চোখে জল বেরিয়ে এল সায়ন্তনের। কোনোমতে সে বলল, ‘আপনারা আমাকে মেরে ফেলতে পারেন, কিন্তু বিশ্বাস করুন টেস্টিং কিট তৈরি করার কাজ কিছুই এগোয়নি। শুধু ভাবনাচিন্তা চলছে ব্যাপারটা নিয়ে।’

‘কী ভেবেছেন সেটাই বলুন।’

‘ভাইরাস ডিটেকশনের জন্য লেজার রশ্মি ব্যবহার করছি আমরা। ভাইরাসে আক্রান্ত বলে যাকে সন্দেহ করা হচ্ছে তার মুখ থেকে একফোঁটা থুতু স্লাইডের ওপর রেখে তার সঙ্গে মেশানো হবে কেমিক্যাল ডাই, এরপর সেই স্লাইড পাঠানো হবে একটা ন্যানো-ইন্টারোফেরোমেট্রিক সেন্সরের মধ্যে। স্লাইডে ফেলা হবে লেজার বিম, সেই লাইটের রিফ্র্যাকশন দেখে বলে দেওয়া যাবে লোকটি ভাইরাসে আক্রান্ত কি না এবং আক্রান্ত হয়ে থাকলে ভাইরাল লোড কতটা—’

‘আপনি আমাকে মূর্খ ভাবছেন, ডক্টর মুখার্জি? লেজার রে দিয়ে ভাইরাস খুঁজে বের করবেন? এরপর তো কেরোসিন তেল দিয়ে স্পেস শাটল চালানোর গল্প শোনাবেন মনে হচ্ছে! আরিফ—’

নিমেষের মধ্যে ফের ছুরি চালাল আরিফ। আগের ক্ষতস্থানের কিছুটা নীচে তৈরি হল আরেকটা ক্ষত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একখাবলা লঙ্কাগুঁড়ো মাখিয়ে দিল আরিফ। যন্ত্রণায় প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়ল সায়ন্তন। প্রায় দশ মিনিট মাথা নীচু করে বসে ব্যথাটা সামলাতে চেষ্টা করল সে। লোকটা বলল, ‘মেপে দেখুন, এবারের কাটা জায়গাটা আগেরটার চেয়ে বেশি গভীর। আপনি যত বেশি সময় নষ্ট করবেন, ক্ষতগুলো তত বেশি বেশি গভীর হতে থাকবে।’

দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সায়ন্তনের অবস্থা এখন প্রায় তা-ই, সে অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে ঝাঁঝিয়ে বলে উঠল, ‘আপনারা আমাকে পুরো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মারধর করছেন কেন? আপনি নিজে কি বিজ্ঞানী, যে আমার কথার শুরুটা শুনেই পুরোটা বুঝে গেলেন? আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না, বিশ্বাস না হলে আপনারা নেট-এ দেখে নিন কীভাবে ভাইরাস ডিটেকশনে লেজার ব্যবহার করা হচ্ছে আজকাল। তা যদি না পারেন তবে এমন একজনকে নিয়ে আসুন, যাকে বুঝিয়ে দিলে কথাগুলো বুঝবে।’

লোকটাকে এই প্রথম একটু বিভ্রান্ত মনে হল সায়ন্তনের। সে বলল, ‘ঠিক আছে, একজন আসবেন, আপনি তাঁকে বুঝিয়ে দেবেন। এখন বলুন তো, আপনার রিসার্চ টিমে কারা আছে?’

‘আমার পুরো ইউনিট।’

‘এর মধ্যে সায়েন্টিস্ট ক-জন?’

‘আমাকে নিয়ে দু-জন। রণদীপ সচদেব আমার সহকর্মী। কিন্তু আপনি আমাকে মেরে ফেললেও সে একা টেস্টিং কিট ডেভেলপ করতে পারবে।’

চিন্তিত মুখে লোকটা জানতে চাইল, ‘ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টকে শিবসাগর ভাইরাসের ট্রিটমেন্ট সম্পর্কে আপনারা কী সাজেশন দিয়েছেন?’

‘এখনও কিছু দিইনি। ল্যাব থেকে সব রিপোর্ট আসুক, তারপর জানাব। এখন উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা চলবে, যেমন এতদিন চলছিল। এখনও ভ্যাকসিনের কথা ভাবা যাচ্ছে না, কারণ ভাইরাসের ক্যারেকটার খুব দ্রুত চেঞ্জ হচ্ছে।’

‘কীরকম পরিবর্তন লক্ষ করছেন?’

‘ভাইরাস যত ছড়াচ্ছে, ভিরুলেন্স তত বাড়ছে। মর্টালিটি রেট বেড়ে গেছে। ভাইরাস নতুন নতুন কায়দায় স্প্রেড করছে। আপনিও জানেন সেটা, নিজেই বলেছেন।’

‘আর কী কী লক্ষ করেছেন?’

‘শিবসাগর আগরতলা আর কলকাতায় পাওয়া ভাইরাসের জিন সিকোয়েন্সে মিল নেই। মডিফাই করেছেন আপনারা।’

‘আমরা করেছি আপনাকে কে বলল?’ লোকটা প্রশ্ন করল। সায়ন্তন টের পেয়েছে লোকটা একেবারে মূর্খ নয়, কিছুটা পড়াশোনা জানে, জেরা করার জন্য কিছুটা প্রস্তুত হয়ে এসেছে। কিন্তু আলোচনা সিলেবাসের বাইরে গড়াতে সে আর স্বচ্ছন্দ বোধ করছে না।

‘আপনারা ছাড়া আর কে করবে! আপনারা ভাইরাস তৈরি করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, এখন আমাকে ধরে এনে জানতে চাইছেন, সরকার মহামারি আটকাতে কী কী করছে। কিন্তু আপনারা জানেন না, বায়ো-টেররিজম কোনো একটা দেশে আবদ্ধ থাকে না, এক দেশ থেকে সহজে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকী আপনাদের দেশেও।’

‘আমাদের দেশ মানে, ডক্টর মুখার্জি? আমি-আপনি একই দেশের লোক। উই আর ইন্ডিয়ানস।’

‘আই ডোন্ট বিলিভ সো! আপনার মুখ থেকে অনেকবার যেভাবে “ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট” কথাটা বেরিয়েছে, ওভাবে কোনো ভারতীয় কথা বলে না। আপনি ভারতীয় হলে বলতেন “আমাদের সরকার”।’

ক্রুদ্ধভাবে লোকটা বলল, ‘ওহ্, আপনি খেয়াল করেছেন তবে! ভেরি ইন্টেলিজেন্ট! হ্যাঁ, আমরা কেউ ইন্ডিয়ান না। ইন্ডিয়া আমাদের দুশমন।’

যে লোক নিজেকে খুব স্মার্ট মনে করে, তার ডিফেন্সে সামান্য একটু চিড় ধরে গেলে সে বেসামাল হয়ে যায়। সায়ন্তন এটা আগেও লক্ষ করেছে। ব্যথার সমুদ্রে ডুবে যেতে যেতে সায়ন্তন টের পেল লোকটার ডিফেন্সে সামান্য হলেও একটু ফাটল ধরেছে। মনে মনে আনন্দ পেল সায়ন্তন।

লোকটা এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর ‘বাসিত’ বলে জোরে হাঁক দিল। সঙ্গেসঙ্গে দরজা খুলে আবির্ভূত হল সেই মুখোশধারী। হাতের ইঙ্গিতে সায়ন্তনকে দেখিয়ে আরিফকে নিয়ে লোকটা বেরিয়ে গেল। বাসিত এগিয়ে এসে দেখল, সায়ন্তন বিধ্বস্তভাবে বসে আছে, তার পোশাক ও বিছানা রক্তে ভেজা। জিভ দিয়ে একটা চুকচুক করে আক্ষেপসূচক আওয়াজ করে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

একটু পরে বাসিত ফিরে এল। সঙ্গে বোরখা পরা এক মহিলা। তবে আগের মহিলা নয়, কারণ এই মহিলার উচ্চতা আগেরজনের চেয়ে বেশি। মহিলাটি গরমজল দিয়ে সায়ন্তনের ক্ষত ধুয়ে সেখানে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। তারপর সায়ন্তনের রক্তে ভেজা জামা খুলে তাকে একটা কামিজ জাতীয় পোশাক পরিয়ে দিল। একটা সাদা পাজামা এনে বিছানার ওপর রাখল। পায়ের বাঁধন খুলে দিয়ে ইঙ্গিতে বাথরুমের ঘেরা জায়গাটা দেখিয়ে সেখানে গিয়ে পাজামা পরে নিতে বলল।

একটা হাত পুরো অকেজো, ব্যথায় নাড়াচাড়া করা যাচ্ছে না। এক হাতে কোনোমতে প্যান্ট খুলে পাজামা পরে ফিরে এসে সায়ন্তন দেখল তার বিছানার চাদর বদলে দিয়েছে মহিলাটি। একটা থালায় সকালের মতো খাবার ঢাকা দেওয়া, সঙ্গে কাঁসার গ্লাসে দুধ জাতীয় পানীয়।

সায়ন্তনের খিদে ছিল না। তাও থালার ঢাকনা ফাঁক করে দেখল রুটির সঙ্গে কষিয়ে রাঁধা লালচে-কালো মাংস। বাসিত ঘরে নেই দেখে সায়ন্তন মহিলাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইয়ে জগহকা নাম ক্যয়া হ্যয়?’

‘ধরমপুর।’ মহিলা সংক্ষিপ্ত জবাব দিল।

‘ধরমপুর?’ সায়ন্তন একটু ভেবে বলল, ‘পহেলে নাম নহি সুনা, কঁহা হ্যয় ইয়ে জগহ?’

‘পানিপত ডিস্ট্রিক্ট, হরিয়ানা।’ মহিলা এদিক-ওদিক তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল।

হরিয়ানা! কলকাতা থেকে তাকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে এনে ফেলেছে অপহরণকারীরা। দু-দিন অজ্ঞান হয়ে ছিল সায়ন্তন, সেই অবস্থায় সম্ভবত গাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে, অচেতন ব্যক্তিকে ট্রেনে আনার ঝক্কি অনেক। সে বলল, ‘আপ খানা লে যাইয়ে, বিলকুল ভুখ নহি হ্যয় মুঝে।’

‘আপ খা লিজিয়ে, খানেকা বাদ আপকো দাওয়া লেনা হ্যয়।’

সায়ন্তন কোনোমতে একটা রুটি খেল। পানীয়র গ্লাসে চুমুক দিয়ে বুঝল জিনিসটা গরমমশলা, কেশর ইত্যাদি দিয়ে ফোটানো দুধ। স্বাদ ভালো, কিন্তু সায়ন্তন বেশি খেতে পারল না। দু-তিন চুমুক খেয়ে গ্লাস নামিয়ে রাখল। মহিলা দুটো ট্যাবলেট সায়ন্তনের হাতে দিয়ে খেয়ে নিতে ইঙ্গিত করল।

ওষুধ খাওয়া হয়ে গেলে মহিলা বাসনপত্র নিয়ে চলে গেল। সায়ন্তন একবার কায়দা করে জানতে চেয়েছিল, ‘বাসিতভাই আভি কঁহা গয়ে?’ প্রশ্নের কোনো জবাব মেলেনি। মহিলা কাজকর্ম সেরে আলো নিভিয়ে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল। সঙ্গেসঙ্গে গভীর অন্ধকারে ডুবে গেল ঘর।

ব্যথায় ঘুম আসছে না। ব্যথার পাশাপাশি একটা গভীর অপমানবোধ মানসিকভাবে যন্ত্রণা দিচ্ছে সায়ন্তনকে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সায়ন্তন ভাবছিল, তার হাত-পা কোনোটাই এখন বাঁধা নেই। শারীরিকভাবে সে এতটাই কাহিল হয়ে পড়েছে যার ফলে তাকে বেঁধে রাখা অপ্রয়োজনীয় বুঝে গেছে এরা। সায়ন্তন সিনেমার নায়ক হলে এই পরিস্থিতিতে বিছানার পাশে রাখা কাচের গ্লাসটা ভেঙে অস্ত্র তৈরি করার কথা ভাবতে পারত। তারপর দরজার পাশে লুকিয়ে থেকে অপহরণকারীর ওপর আকস্মিক হামলা করে বাইরে বেরিয়ে আসত সে। বাইরে নির্ঘাত একটা অরক্ষিত মোটরবাইক বা গাড়ি থাকবে যার ইগনিশনের চাবিটা কেউ ভুল করে ফেলে রেখে গেছে। সায়ন্তন যেহেতু নায়ক, তাই সে বাচ্চাদের ট্রাই-সাইকেল থেকে ফাইটার জেট, সব কিছু চালাতে জানে। গাড়ি নিয়ে নিমেষে উধাও হয়ে যেত সায়ন্তন।

মুশকিল হল, সায়ন্তন সিনেমার নায়ক তো একেবারেই নয়, বরং এই মুহূর্তে সে কিছুটা ভিলেন হয়ে রয়েছে। জাদুবলে যদি এখন সায়ন্তন মুক্তি পেয়ে যায়, তবে সিকিউরিটি প্রোটোকল ভাঙার দরুন তাকে অফিস থেকে শো-কজ করা হবে। ডিসিপ্লিনারি কমিটির সামনে নিজের আচরণের জবাবদিহি করতে হবে। আরশি ছেলেবেলার বন্ধু বলে তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম, এই ছেঁদো কাহিনি শুনিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ওপরওয়ালাদের সন্তুষ্ট করা যাবে না।

আচ্ছা, আরশিকে সেদিন কথাটা বলে দিলে কি ভালো হত? আরশি বুঝত তার কথা? সময়ের ব্যবধানে দু-জনে দু-দিকে ছিটকে গেছিল, তাদের দেখা হওয়ার আর কথাই ছিল না। তারপর যখন দেখা হয়ে গেল, তখন সায়ন্তন বুঝল এবার কথাটা বলা যেতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কথাটা বলে ওঠা গেল না।

সকাল থেকে ভার্গবের সঙ্গে বিবাদ, তারপর বার বার হুমকি ফোন। মেজাজটা একদম ঘেঁটে গেছিল। অবশ্য আরশি বেরিয়ে যাওয়ার পর সব কিছু রেকর্ড করে বাড়িতে লুকিয়ে রেখে এসেছে সায়ন্তন। আরশিকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে সেটা জানিয়ে দিয়েছে সায়ন্তন, বলেছে, মেসেজ দেখা হয়ে গেলে ডিলিট করে ফেলতে। কিন্তু আরশি কি আদৌ ব্যাপারটায় গুরুত্ব দিয়েছে? ও তো ওর কপি নিয়েই ব্যস্ত শুধু।

সায়ন্তন কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে, সে এখন পাক জঙ্গিদের হেফাজতে। না, ঠিক পাক জঙ্গি বলতে যেরকম লশকর বা জৈশ-কে বোঝায়, এরা তা নয়, এরা হল আইএসআই-এর স্লিপার সেল। এদের কাজে লাগিয়েছে চীন, পাকিস্তানের বন্ধু দেশ। শিবসাগরে যে মহামারির সূচনা তাকে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে চায় চীন। সায়ন্তনের তদন্ত সেদিকেই দিকনির্দেশ করছে।

ভারতের অভ্যন্তরে গোপন অপারেশন চালানোর ক্ষমতা চীনের নেই। সেজন্য সাহায্য করতে কোমর বেঁধে নেমেছে পাকিস্তান। ভার্গব বার বার তাকে সাবধান করেছিল। সায়ন্তন শোনেনি, ভুল করেছে খুব। প্রচণ্ড ভুল! সে সুপারম্যান নয়, একদল সশস্ত্র মানুষের সঙ্গে মারপিট করে নিজেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা তার নেই। সায়ন্তন মুক্তি পেতে পারে একমাত্র যদি পুলিশ ওকে উদ্ধার করতে আসে।

ওষুধের প্রভাবে ব্যথা কমেছে কিছুটা, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। দূরে আবার বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন ছুটে যাওয়ার শব্দ শুনতে শুনতে সায়ন্তন ঘুমিয়ে পড়ল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *