জাহান্নমের সওদাগর – ২

ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সি, কাজা, হিমাচল প্রদেশ। এখন।

কাচের দেওয়ালের ওপাশে পাঁচটা নানা রঙের খরগোশ কাঠের ফ্রেমে শক্ত করে বেঁধে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাণীগুলোর মুখে পরানো হয়েছে রাবারের তৈরি স্বচ্ছ রেসপিরেটর মাস্ক। মুখোশের এক প্রান্তে সরু টিউব লাগানো রয়েছে যা চলে এসেছে কাচের দেওয়ালের এপারে। প্রাণীগুলো এই পরিস্থিতিতে ছটফট করছে। ওরা বুঝতে পেরেছে ওদের জীবনের অন্তিম লগ্ন ঘনিয়ে এসেছে।

দৃশ্যটা দেখতে কোনোদিনই ভালো লাগে না সায়ন্তনের, আজও লাগছে না। কিন্তু উপায় নেই, বিজ্ঞানী হিসেবে এটাই কাজ ওর। ল্যাব টেকনিশিয়ানের দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারা করল সায়ন্তন। সঙ্গেসঙ্গে সামনের এরোসল ডিসপেনসারের একটা সুইচ অন করে দিল টেকনিশিয়ান। সরু নল বাহিত হয়ে এখন শিবসাগর ভাইরাস প্রবেশ করছে প্রাণীগুলোর ফুসফুসে। ঠিক কুড়ি সেকেন্ড পরে নিজে থেকে মেশিন বন্ধ হয়ে যাবে। খরগোশগুলোকে তখন কাঠের ফ্রেম থেকে মুক্ত করে খাঁচায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে ওদের।

ঘড়িতে এখন সন্ধে ছ-টা। এই মুহূর্তে আর কিছু করার নেই সায়ন্তনের, অপেক্ষা করতে হবে যতক্ষণ না খরগোশগুলোর দেহে রোগের লক্ষণ ফুটে ওঠে। শিবসাগর হেমারেজিক ফিভারের ভাইরাস খুব দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়, তাও প্রাণীগুলোর অসুস্থ হতে বারো ঘণ্টা সময় লাগবে। তার মানে কাল সকালের আগে কিছু করার নেই।

আর আধ ঘণ্টার মধ্যে রাতের শিফট শুরু হয়ে যাবে, সুপারভাইজারকে সব বুঝিয়ে দিয়ে ল্যাব থেকে বেরিয়ে যাবে সায়ন্তন। কোয়ার্টারে ফিরে একটা রিপোর্ট লিখতে হবে ওকে। তারপর যদি সময় পায় তবে ডিনারের আগে ছোটো করে একটু হুইস্কি নিয়ে নেটফ্লিক্সে মুভি দেখবে কিংবা বেহালা নিয়ে বসবে। অনেকদিন বেহালায় হাত দেওয়া হয়ে ওঠেনি। এরকম নির্জন জায়গায় এভাবেই রাতগুলো কেটে যায় ওর।

আচমকা দেওয়ালে ঝোলানো টেলিফোনটা রিনরিন করে মিষ্টি সুরে বেজে উঠল। পাশে ডিসপ্লে প্যানেলে ভেসে উঠেছে একটা সংখ্যা। ফাইভ ফাইভ সিক্স টু। এটা সায়ন্তনের কোড। ডিরেক্টর অফিসের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রয়েছে এই ফোনের। যার কোড দেখাবে সে ছাড়া অন্য কেউ ফোন তুললে কিছুই শুনতে পাবে না। তাকে রিসিভার তুলে বোতাম টিপে দিতে হবে নিজস্ব পার্সোনাল সিক্রেট কোড। তবে ডিরেক্টর অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। প্রতি সাতদিন অন্তর বদলে যায় কোড দুটো। তাই একজনের কথা অন্য কেউ লুকিয়ে শুনবে তার সম্ভাবনা শূন্য।

রিসিভার তুলে হেলমেটের হিয়ারিং প্যানেলে কানেক্ট করে সায়ন্তন বলল, ‘গুড ইভনিং ম্যাম, সায়ন্তন হিয়ার।’

‘সায়ন্তন, তুমি চট করে একবার আমার চেম্বারে এসো তো,’ বেশ উত্তেজিত শোনাল ডিরেক্টর প্রতীক্ষা রায়নার গলা, ‘উই নিড টু টক আর্জেন্টলি।’

প্রতীক্ষা রায়না দেশের একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, মলিকিউলার বায়োলজিতে পিএইচ ডি, অনেকগুলো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপত্র রয়েছে। নিপাট ভদ্রমহিলা। একসময় দিল্লির সায়েন্টিফিক মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ছিলেন। হঠাৎ কী হল যে ডিরেক্টর ম্যাডাম পালটা ‘গুড ইভনিং’ বলার সৌজন্যটুকু দেখালেন না? নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু ঘটেছে।

বায়োসেফটি লেভেল ফোর ল্যাবরেটরিতে ঢোকা এবং বেরোনো কাজ দুটো বেশ সময়সাপেক্ষ। ল্যাবের দরজার পাসকোড টাইপ করে সায়ন্তন দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না গেট খোলে। নিঃশব্দে ইস্পাতের ভারী দরজা খুলে গিয়ে সায়ন্তনের সামনে উন্মুক্ত হল আরেকটা ঘর। সামনে এরকম আরও কয়েকটা ঘর রয়েছে। পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এই ঘরগুলো পেরিয়ে বেরোতে ল্যাব থেকে হয়। প্রতিটা ঘর এয়ারটাইট, অর্থাৎ, এখানে বাইরের বাতাস ঢুকবে বেরোবে না। একটা ঘরের কাজ শেষ না হলে পরের ঘরের দরজা খোলে না। এই পথটাকে বলা হয় স্যানিটারি প্যাসেজ।

প্রথম ঘরটায় ঢুকে সায়ন্তনকে চার মিনিট অপেক্ষা করতে হল। অতিবেগুনি রশ্মি দিয়ে ওর পোশাক এখানে জীবাণুমুক্ত করা হল। সায়ন্তন যে ভাইরাস নিয়ে কাজ করছে সেই শিবসাগর ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়েছে বেশিদিন নয়। যেহেতু এই ভাইরাসের চরিত্র অনেকটাই অজানা সেজন্য সায়ন্তনকে ল্যাব প্রোটোকল অনুসারে পরতে হয়েছে হ্যাজমেট ডি সুট। বিপজ্জনক জিনিস নাড়াচাড়া করার প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীরা হ্যাজার্ডাস মেটিরিয়াল বা হ্যাজমেট সুট পরেন। লেভেল ডি মানে হল সর্বাধিক নিরাপত্তা। বহুস্তরীয় এই পোশাকের আনাচকানাচ অতিবেগুনি রশ্মি সাফ করে দেওয়ার পর সায়ন্তন পরের ঘরটাতে ঢুকল।

এখানে পোশাক খুলতে হবে। কিন্তু যেমন-তেমনভাবে খোলা যাবে না। নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে সায়ন্তন একে একে রাবারের জুতো, রেসপিরেটর, হেলমেট, গগলস, গ্লাভস, সুটের ওপর ও নীচের অংশ এবং অন্তর্বাস খুলে বিনের মধ্যে রাখল। এখান থেকে এগুলো স্টেরিলাইজেশনের জন্য অটোক্লেভ মেশিনে চলে যাবে।

সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পরবর্তী ঘরে ঢুকল সায়ন্তন। এই ঘরে রয়েছে স্নানের ব্যবস্থা। সাবান মেখে ভালো করে স্নান করে তোয়ালে দিয়ে গা মুছে পরের ঘরে ঢুকল সে। এখানে লকারে রাখা রয়েছে ওর নিজস্ব পোশাক। ফেডেড জিন্স-টি-শার্টের ওপর একটা উইন্ডচিটার চাপিয়ে সায়ন্তন বেরিয়ে এল ল্যাব থেকে।

স্যানিটারি প্যাসেজ শেষে সিকিউরিটি স্টেশন। এখন ডিউটিতে রয়েছে স্যামুয়েল। লোকটি গোয়ানিজ। সে কোন সার্ভিসের লোক, সায়ন্তন জানে না। ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সিতে কাজ করে অনেকগুলো সিকিউরিটি এজেন্সি। রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং, আইবি, সিআইএসএফ, আর্মি– সব গুলিয়ে যায় সায়ন্তনের।

তবে স্যামুয়েল বেশ হাসিখুশি লোক। মাঝবয়সি, একটু ভারী শরীর, চুলে ক্রু কাট। সায়ন্তনকে দেখে একগাল হেসে বলল, ‘গুড ইভনিং, ডক্টর মুখার্জি। ছুটি হল আজকের মতো?’

‘গুড ইভনিং, স্যাম। ছুটি কি না জানি না,’ সায়ন্তন বলল, ‘ডিরেক্টর ম্যাম চেম্বারে ডেকেছেন।’

কথা না বাড়িয়ে লগবুক বের করে বাড়িয়ে দিল স্যামুয়েল। সায়ন্তন বেরোনোর সময় লিখে সই করল। তারপর বায়োমেট্রিক ডিভাইসে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে ল্যাব থেকে বেরিয়ে এল। পুরো প্রক্রিয়া সারতে ওর সময় লাগল কুড়ি মিনিট।

সায়ন্তনের ল্যাব বেসমেন্ট লেভেলে। সেখান থেকে লিফটে লেভেল টু-এ উঠে এল সে। এই বাড়ির গঠন অনেকটা রুশ বাবুশকা পুতুলের মতো। একটা বড়ো পুতুলের মধ্যে ছোটো পুতুল, তার মধ্যে আবার আরেকটা ছোটো পুতুল, কিছুটা সেইরকম। বিএসএল ফোর ল্যাব সব দেশে সাধারণত বেসমেন্ট লেভেলে থাকে। কারণ, ল্যাবের ভেতরে সবসময় নেগেটিভ এয়ার প্রেশার রাখতে হয় যাতে মারাত্মক প্যাথোজেন বাতাসে ভেসে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। বেসমেন্ট লেভেলে ল্যাব থাকলে বায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।

ওপরে উঠে ডিরেক্টরের ঘরের দিকে এগোল সায়ন্তন। নির্জন করিডোর, মাথার ওপর জোরালো আলো, দু-পাশে সারি সারি বন্ধ স্টিলের দরজা। কিন্তু কোথাও কেউ নেই, কান পাতলেও সামান্য আওয়াজ পাওয়া যাবে না। দেখলে মনে হবে জায়গাটা ভূতুড়ে বা পরিত্যক্ত। প্রথম দিকে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং-এ আসা-যাওয়া করার সময় সায়ন্তনের অস্বস্তি হত। কল্পবিজ্ঞান সিনেমার সেট-এর মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে এমন অনুভূতি হত। এখন সেটা আর হয় না। সায়ন্তন জানে দেশের অন্যতম সুরক্ষিত অঞ্চল ওদের এই গবেষণাকেন্দ্র। সর্বত্র সিসিটিভি, মোশন সেন্সর বসানো, প্রত্যেকের পরিচয়পত্রে লাগানো আছে জিপিএস ট্র্যাকার। কেউ নির্ধারিত জায়গার পরিবর্তে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে কি না কঠোরভাবে মনিটর করছে সিকিউরিটি এজেন্সির লোকেরা। সামান্য নিয়মভঙ্গে হতে পারে কঠোর শাস্তি।

অবশ্য এই সতর্কতা জরুরি। করোনা অতিমারির পর বায়ো-ওয়েপন বা জীবাণু অস্ত্রর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সি গঠন করা হয়েছে। কাজা শহর থেকে মানালি যাওয়ার পথে জনমানবশূন্য উপত্যকায় এক হাজার একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সির ফেসিলিটি। এরকম আরও একটা ইউনিট তৈরি হয়েছে লাদাখে। সেখানে সায়ন্তন কখনো যায়নি, তবে সেখানকার বিজ্ঞানীদের সঙ্গে প্রায়ই ভিডিয়ো কনফারেন্স করতে হয় ওদের। যা বুঝেছে ওখানেও প্রায় একইরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ডিরেক্টরের ঘরের দরজার ওপর বসানো ফেস রেকগনিশন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াল সায়ন্তন। ম্যাডাম যখন ওকে ডেকেছেন, তখন তাঁর সেক্রেটারি নিশ্চয় কম্পিউটারের ভিজিটর মডিউলে সায়ন্তনের ডেটা ফিড করে দিয়েছে। মুখ মিলিয়ে দেখে তবে স্বয়ংক্রিয় দরজা খুলবে। তিন-চার সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হল সায়ন্তনকে। তারপর টিং করে একটা শব্দ করে দু-পাশে সরে গেল স্টিলের ভারী দরজা।

ভেতরে প্রথম ঘরটাতে প্রতীক্ষা ম্যাডামের সেক্রেটারি আঁচল শেষাদ্রি বসে। সায়ন্তন দেখল, আঁচল কম্পিউটারে মাথা নিচু করে কী সব কাজ করছে। সায়ন্তন ঢুকেছে সেটা বুঝেও তাকাল না। আসলে সুন্দরী বলে মেয়েটার একটু ডাঁট আছে। আঁচল খুব লম্বা নয়, মেরেকেটে পাঁচ ফুট। শরীরের নীচের দিক একটু ভারী। কিন্তু মুখশ্রী মিষ্টি, পিঠ পর্যন্ত লম্বা চু্ল। সবসময় চাপা পোশাক পরে থাকে বলে ওর ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স চট করে ছেলেদের চোখ টানে। মেয়েটা তা জানে এবং উপভোগ করে ব্যাপারটা।

‘গুড ইভনিং, আঁচল,’ সায়ন্তন বলল, ‘ম্যাম কলড মি আ ফিউ মিনিটস বিফোর। শি আস্কড মি টু মিট হার।’

‘ওহ, ডক্টর মুখার্জি,’ মেয়েটা এমন ভাব করল যেন এইমাত্র সায়ন্তনের অস্তিত্ব টের পেল, ‘এক সেকেন্ড বসুন, প্লিজ। ম্যামের কাছ থেকে জেনে নিই উনি ফাঁকা আছেন কি না।’

সোফায় বসতে বসতে মনে মনে আঁচলকে খিস্তি করল সায়ন্তন। শালা, হারামি! বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়ো যাকে বলে এ মেয়েটা পারফেক্ট তাই। সায়ন্তন এখানকার সিনিয়র সায়েন্টিস্ট, আঁচল সেটা খুব ভালোমতো জানে। কিন্তু ডিরেক্টরের নাগাল পেতে গেলে যেহেতু ওকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই, সেজন্য সবাইকে ওর অনুগ্রহপ্রার্থী বলে মনে করে। তা ছাড়া, আঁচল মনে করে যেসব পুরুষ নিজেদের বউবাচ্চা ছেড়ে এই নির্জন গবেষণাগারে চাকরি করতে এসেছে, তারা সবাই ওর পেছনে পেছনে ঘুরছে। সায়ন্তনের মতো যারা অবিবাহিত অথচ আঁচলকে পাত্তা দেয় না, সুযোগ পেলেই তাদের হয়রান করে প্রতিশোধ নেয় সে।

এই ফেসিলিটির মহিলা বিজ্ঞানীরা অবশ্য মনে করে, আঁচলের কাছ থেকে ছেলেরা সামান্য কিছু ভদ্র ব্যবহার পেলেও মহিলাদের সঙ্গে ওর ব্যবহার আরও খারাপ। কিছুদিন আগে ভাইরোলজিস্ট নীহারিকা শ্রীবাস্তব আঁচলকে মারতে গেছিল। দিল্লির প্রতিরক্ষা মন্ত্রক থেকে আসা একটা অত্যন্ত জরুরি চিঠি আঁচল নীহারিকাকে না পাঠিয়ে নিজের কাছে পুরো এক সপ্তাহ চেপে রেখেছিল। নীহারিকাকে সেজন্য শোকজ করা হয়। তখন এই অফিসের মধ্যেই দু-জনের তর্কাতর্কি শেষ পর্যন্ত হাতাহাতি অবধি গড়ায়।

‘আপনি ভেতরে যান, ডক্টর মুখার্জি,’ কান থেকে ফোন নামিয়ে হাতের ইশারা করল আঁচল।

‘মে আই কাম ইন, ম্যাম?’ দরজা অল্প একটু ফাঁক করে মুখ বাড়াল সায়ন্তন।

‘ইয়েস সায়ন্তন, বোসো, আমি তোমার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছি।’

‘আমি ল্যাব থেকে সোজা এসেছি, ম্যাম,’ সায়ন্তন জবাব দিল।

‘জানি, সম্ভবত আমি একটু বেশি এক্সাইটেড হয়ে পড়েছি। কিন্তু আমার কিছু করার নেই, মিনিস্ট্রি থেকে আমার ওপর মারাত্মক চাপ দেওয়া হচ্ছে।’ প্রতীক্ষা রায়না বললেন।

সায়ন্তন লক্ষ করল প্রতীক্ষা ম্যাডামের মুখ উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে। এমনিতে ফর্সা মানুষ, পানপাতার মতো মুখে সবসময় একটা স্নিগ্ধ গাম্ভীর্য লেগে থাকে। কিন্তু এখন সেসব উধাও। সায়ন্তন কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে, ম্যাম?’

প্রতীক্ষা রায়নার চেম্বার বেশ ছিমছাম। বড়োসড়ো টেবিলের ওপর অ্যাপলের কম্পিউটার, গোটা পাঁচেক নানা রঙের ফোন। একপাশে ছোটো সোফা। ঘরের ভেতরটা ক্রিম রং করা। ডান দিকের দেওয়ালে টিভি স্ক্রিনের মতো একটা বিশাল মনিটর– তাতে সবুজ, বেগুনি আর লাল রঙের বেশ কিছু বিন্দু দপদপ করছে। এগুলো আসলে জিপিএস ট্র্যাকারের সিগনাল। সবুজ রঙের বিন্দুগুলো বিজ্ঞানীদের চিহ্নিত করছে, বেগুনি হল প্রশাসনিক অফিসারের দল এবং লাল হল নিরাপত্তারক্ষীরা।

চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারির আওতায় থাকতে হবে ভেবে প্রথম দিকে সায়ন্তনের খুব অস্বস্তি হত। কিন্তু এখন বোঝে নিজেদের সুরক্ষার জন্য এই নজরদারি প্রয়োজন। তবে সিকিউরিটি সার্ভিসের লোকেরা প্রধানত জোনাল মার্কিংকে গুরুত্ব দেয়, এক জায়গার কর্মী অকারণে অন্য জায়গায় চলে গেলে তাদের সমস্যা হয়। সেই ব্যক্তিরও ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু কেউ নিজের জায়গা ছেড়ে না নড়লে অকারণে হেনস্থা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে প্রতীক্ষা রায়না বললেন, ‘অসমের পর গত সাত দিনে পূর্ব ভারতের দু-জায়গায় ফের শিবসাগর হেমারেজিক ফিভার আউটব্রেক হয়েছে, তার মধ্যে তোমার কলকাতাও রয়েছে। আরেকটা হটস্পট হল ত্রিপুরার আগরতলা। কিন্তু আমি যে খবর পেয়েছি তাতে মনে হচ্ছে এটা ভাইরাসের নতুন কোনো স্ট্রেন। অনেক বেশি শক্তিশালী, ইতিমধ্যে দু-জায়গায় মোট চল্লিশজন মারা গেছে। চিকিৎসা করার সুযোগ পাওয়া যায়নি বলতে পারো। ইন্টারেস্টিংলি, ত্রিপুরাতে দু-জন মারা গেছে, যারা শিবসাগরে অয়েল রিফাইনারিতে কাজ করত এবং তাদের ভ্যাকসিন নেওয়া ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কাজ হয়নি।’

‘নতুন স্ট্রেন কেন মনে হচ্ছে, ম্যাম?’ সায়ন্তন জানতে চাইল।

‘ইনফেকশনের ধরন দেখে,’ প্রতীক্ষা জবাব দিলেন, ‘শিবসাগরের ভাইরাস আউটব্রেক ছিল বায়ুবাহিত সংক্রমণ। আমাদের প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে আগরতলায় সংক্রমণ ছড়িয়েছে শকুন্তলা রোডের একটা বিউটি পার্লার থেকে, সম্ভবত ত্বকের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করেছে, আর কলকাতার আউটব্রেক পার্ক স্ট্রিটের শপিং মলের ফুডকোর্টের জল থেকে। ভাইরাসের একই স্ট্রেন থেকে সাধারণত এরকম হয় না। এ ছাড়া, এই দু-জায়গায় ভাইরাস কাজ করেছে ভীষণ দ্রুত। প্রথমে শীত লাগা, মাথার যন্ত্রণা, জ্বর এবং শ্বাসকষ্ট। এরপর শুরু হচ্ছে পেশির খিঁচুনি, সারা শরীরে অ্যালার্জিক রাশের মতো চাকা চাকা লালচে দাগ দেখা যাচ্ছে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে লসিকা গ্রন্থি থেকে রক্তপাত শুরু হচ্ছে। পেশেন্ট যন্ত্রণায় জ্ঞান হারাচ্ছে, তারপর একসময় কোমায় চলে যাচ্ছে। পোস্টমর্টেম করে দেখা গেছে ফুসফুস, হার্ট, কিডনি ঘোলাটে জলে ভরতি। পুরো ব্যাপারটাই ঘটছে খুব তাড়াতাড়ি, দিন তিনেকের মধ্যে রোগী মারা যাচ্ছে।’

সায়ন্তন চিন্তিত হল। করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে দেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই অসমের শিবসাগর জেলায় হানা দিয়েছিল এই নতুন ভাইরাস। সামান্য সর্দিজ্বর থেকে দেহের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ হয়ে আচমকা মানুষ মারা যেতে শুরু করে। ভাগ্য ভালো, চট করে বোঝা গেছিল এটা নতুন ভাইরাস হলেও সিম্পটোম্যাটিক ট্রিটমেন্টে প্যারাসিটামল, লিভোসেট্রিজিন এবং সেকেন্ডারি ইনফেকশনের ক্ষেত্রে জেমিফ্লক্সাসিন দিয়ে চিকিৎসা করলে উপসর্গ চলে যায়। আরও দেখা গেল, যাদের ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়া আছে, তারা আক্রান্তদের সংস্পর্শে এলেও সংক্রমিত হচ্ছে না। সেজন্য মোটামুটি তিন-চার মাস সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি আয়ত্তে চলে আসে। সায়ন্তনদের টিমের এখন কাজ হল শিবসাগর ভাইরাসের জন্য একটা ডেডিকেটেড টিকা খুঁজে বের করা। তা ছাড়া এই ভাইরাস কীভাবে ভারতে এল সেটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

‘তোমাকে একবার কলকাতায় যেতে হবে, সায়ন্তন।’ প্রতীক্ষা ম্যাডাম বললেন, ‘আমি চাইছি তুমি ওখানে গিয়ে নিজে সিচুয়েশন অ্যাসেস করে রিপোর্ট রেডি করো। নাইসেড এবং অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ থেকে এপিডেমিয়োলজিস্টরা এর মধ্যে প্রচুর স্যাম্পল সংগ্রহ করেছেন। সেগুলো আসছে আমাদের কাছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমাদের একবার ফিল্ডে যাওয়া দরকার আউটব্রেকের প্যাটার্ন স্টাডি করার জন্য। একটা নিরীহ ভাইরাস এত তাড়াতাড়ি ভিরুলেন্ট হয়ে উঠল কীভাবে তা-ও দেখতে হবে। কলকাতা তোমার নিজের শহর, সেজন্য তোমার কাজ করতে সুবিধে হবে।’

কলকাতায় যেতে পারবে সেকথা ভেবে সায়ন্তন মনে মনে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল। হোক না ছোটো টুর, তবু কলকাতায় ফেরার ব্যাপারটাই আলাদা। সায়ন্তন বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল কলকাতামুখো হওয়ার সুযোগ পায়নি। এম এসসি করে দিল্লিতে চলে এসেছিল, সেখানেই গবেষণা, তারপর বিদেশযাত্রা, ফিরে এসে আবার দিল্লি এবং শেষ পর্যন্ত ন্যাশনাল বায়ো-ডিফেন্স এজেন্সিতে যোগ দিয়ে এই বিজন বিভুঁইয়ে চলে আসা।

‘ম্যাম, ডু ইউ হ্যাভ এনি স্পেসিফিক ডেট অফ জার্নি?’ সায়ন্তন প্রশ্ন করল।

‘নো, বাট অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল। প্রেফারেবলি বাই টুমরো আফটারনুন। তুমি অবশ্য একা যাবে না, ভার্গব উইল অ্যাকম্প্যানি ইউ। হি হ্যাজ বিন ইনস্ট্রাক্টেড টু লুক আফটার ইয়োর সিকিউরিটি।’

সেরেছে, ওর সঙ্গে ভার্গব চৌধুরিকে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছেন ম্যাডাম! ভার্গব হল এই ফেসিলিটির এক্সক্লুসিভ সিকিউরিটি ফোর্সের ডেপুটি হেড। প্রায় সাড়ে ছ-ফুট লম্বা, পেশিবহুল পেটানো চেহারা। গায়ের রং চাপা, সেজন্য একটু ডার্ক শেডের পোশাক পরে, চোখে সবসময় সানগ্লাস। ভার্গব কথা বলে খুব কম, লম্বা সফরে সঙ্গী হিসেবে মোটেই আকর্ষণীয় নয়।

‘ভার্গবকে পাঠানোর কী দরকার, ম্যাম?’ সায়ন্তন একটু ‘কিন্তু কিন্তু’ করে বলে ফেলল, ‘কলকাতায় আমার আর কী সিকিউরিটি লাগবে! আমি সরকারি গেস্ট হাউসে থাকব, স্যাম্পল কালেকশন করব, কিছু লোকের সঙ্গে ইন্টার‍্যাকশন হবে। ব্যস, এই তো আমার কাজ। এখানে কোনো সিকিউরিটি লাগবে না, ম্যাম।’

‘না, সায়ন্তন, সিকিউরিটি কভার তোমার প্রয়োজন হবে। আমি তোমার টুর প্ল্যান যেভাবে ভেবেছি তাতে তুমি হোটেলে উঠবে, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ট্র্যাভেল করবে। তোমার হোটেল বুকিং থেকে সব কাজ করে দেওয়ার জন্য ভার্গবকে বলে দেওয়া হয়েছে। খুব তাড়াহুড়ো করে তোমাকে পাঠাতে হচ্ছে বলে আমি কিছু অফিশিয়াল চ্যানেল ব্যবহার করছি, নইলে আমি তোমাকে এখান থেকে চন্ডিগড় গিয়ে সেখান থেকে ফ্লাইটে দিল্লি হয়ে কলকাতা যেতে বলতাম। কিন্তু, সময় খুব কম, তাই তুমি আর ভার্গব কাল বিকেলে এখান থেকে চপারে চন্ডিগড় গিয়ে ওখান থেকে এয়ারফোর্সের বিমানে কলকাতায় যাবে। ব্যস, ওই পর্যন্তই, তারপর তোমরা অফ ইয়োর ওন। ভার্গব থাকলে তোমার অনেক সুবিধে হবে, আফটার অল ও বাঙালি!’

‘ম্যাম, ভার্গব নামেই বাঙালি। ও ঠিকমতো বাংলা বলতেই পারে না। ওরা তিন পুরুষ ধরে হরিয়ানার বাসিন্দা, চেহারাও বাঙালিদের মতো নয়। সিকিউরিটি হিসেবে ও যাচ্ছে যাক, কিন্তু বাঙালি সহযাত্রী থাকায় আমার বাড়তি সুবিধে হবে, এমন আপনি ভাববেন না।’ সায়ন্তন হেসে উত্তর দিল।

প্রতীক্ষা রায়নাও হাসলেন। আজ এই প্রথমবার। বললেন, ‘বুঝেছি, তুমি ওকে নিতে চাইছ না, কারণ নিজের শহরে ফিরে একটু নিজের মতো রিল্যাক্স করবে, তাতে ও বাধা দিতে পারে বলে তোমার মনে হচ্ছে। সেটা আমি ভার্গবকে বলে দেব যাতে ও তোমার ওপর খবরদারি করা শুরু না করে। কিন্তু বিলিভ মি সায়ন্তন, তোমার একটা সিকিউরিটি কভার খুব দরকার এই সফরে।’

‘কেন, ম্যাম?’

‘তুমি বেসিক্যালি সায়েন্টিস্ট, ল্যাবে মুখ গুঁজে সময় কাটিয়ে দাও। কিন্তু অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হেড হিসেবে আমাকে অনেক দিকে লক্ষ রাখতে হয়। আমি দেখতে পাচ্ছি, আমাদের দেশে একের পর এক ভাইরাসের ওয়েভ আসছে। এটা শুরু হয়েছে প্রায় কুড়ি বছর আগে। প্রায় প্রতি বছর কোথাও-না-কোথাও একটা নতুন ভাইরাসের আউটব্রেক হচ্ছে। ব্যাপারটা নিছক কোইন্সিডেন্স বলে আমার মনে হয় না। খুব পরিকল্পনা করে কোনো দেশ একাজটা করছে বলে আমার বিশ্বাস। শিবসাগর ভাইরাস আউটব্রেকের ফার্স্ট ওয়েভে সেকেন্ডারি ইনফেকশন প্রতিরোধ করতে জেমিফ্লক্সাসিন এত ভালো কাজ করল! কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সেকেন্ডারি ইনফেকশনে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। এত দ্রুত এরকম কী করে হতে পারে আমি বুঝতে পারছি না।’

‘আপনি কী বলছেন, ম্যাম!’ সায়ন্তন উত্তেজিত স্বরে বলল, ‘তার মানে, এই অল্প সময়ের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাওয়ার পিছনে কারো হাত আছে?’

‘আমি অলমোস্ট শিয়োর, সায়ন্তন। তুমি মেডিক্যাল ডিটেকটিভ হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছ, সেজন্য শুধু একজন সায়েন্টিস্ট হিসেবে নয়, নিজেকে একটু গোয়েন্দাগিরির জন্য প্রস্তুত রেখো। আর, যদি আমার সন্দেহ সত্যি হয়, তবে ডেফিনিটলি ইউ আর অ্যাট রিস্ক। যে বা যারা ভাইরাস ছড়াচ্ছে, তারা চাইবে না তুমি সফল হও।’

তাহলে এজন্য ম্যাডাম নিরাপত্তা নিয়ে এত কিছু ভাবছেন! কিন্তু ভাইরাসের জেনেটিক চরিত্র বদলে তাকে আরও বেশি আগ্রাসী করে তোলা কিংবা অল্প কিছুদিনের মধ্যে তার সেকেন্ডারি ইনফেকশনের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ দুর্বৃত্তর কাজ নয়, এমনকী বিশ্বের কোনো সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীও এধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। একাজে যে বিপুল পরিকাঠামো প্রয়োজন হয় একমাত্র তা জোগাতে পারে কোনো দেশ।

সায়ন্তনের মনে পড়ল কিছুদিন আগে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভারতের দুই প্রতিবেশী দেশ প্রসঙ্গে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, এমন প্রতিবেশী যেন আর কারো ভাগ্যে না জোটে!

ডিরেক্টরের ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে সায়ন্তন ভার্গবের মুখোমুখি হয়ে গেল। সায়ন্তনকে দেখে মুচকি হেসে ভার্গব বলল, ‘আমি বালো বাংলা বলতে পারে না, কিন্তু বুঝতে পারে। কলকাতায় গিয়ে আমার বেঙ্গলি ইমপ্রুভ করবে আশা করছে।’

সায়ন্তন পালটা হেসে বলল, ‘কথাটা “বালো” নয় “ভালো”, আর “বলতে পারে না” হবে না, হবে “বলতে পারি না।” “আশা করছে”ও ভুল বলা হল, আসল কথাটা হবে “আশা করছি।” তবে কলকাতায় গিয়ে তোমার বাংলা ইমপ্রুভ করার সম্ভাবনা খুব কম, কারণ কলকাতায় বাঙালি বেশ কমে গেছে। যারা আছে তারা নিজেদের বাঙালি পরিচয় নিয়ে লজ্জিত। তারা ইংরেজি আর হিন্দিতে কথা বলে। সুতরাং তোমার অসুবিধে হবে না।”

কথাগুলো বলে সায়ন্তন ভার্গবের প্রতিক্রিয়া শোনার জন্য আর অপেক্ষা করল না। দ্রুত বেরিয়ে এল অফিস বিল্ডিং ছেড়ে। হাতে সময় খুব কম। ব্যাগ গোছাতে হবে। জামাকাপড়ের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু দরকারি ইনস্ট্রুমেন্ট সঙ্গে নেওয়া। সেগুলো হাতের কাছে না থাকলে কোনো কাজই করা যাবে না।

আজ রাতের জন্য ওর কপালে হুইস্কি, নেটফ্লিক্স বা বেহালা কোনোটাই নেই, বুঝল সায়ন্তন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *