আলতাই স্তেপ, ইনার মঙ্গোলিয়া অটোনমাস রিজিয়ন।
নিজের ঘরে বসে নিঃশব্দে রাতের খাবার খাচ্ছিল রুস্তম কারিমভ। সেঁকা পাঁউরুটি, মাংসের ঝোল, সেদ্ধ আলু। তার সঙ্গে ছোটো এক বোতল ভদকা। খাবার বিনামূল্যে, তবে মদটা তাকে পয়সা খরচ করে কিনতে হয়েছে। কুমিস নামে দুধ থেকে তৈরি একটা মদ এখানে সবাই পান করে, সেটা ফ্রি, কিন্তু জিনিসটা একেবারে সহ্য করতে পারে না সে। বিস্বাদ, নোনতা খেতে, তা ছাড়া ছাগলের বোঁটকা গন্ধ তার মধ্যে। অথচ বাকিরা চেটেপুটে সে-জিনিসই খায়।
ছোটো একটা ঘর বরাদ্দ হয়েছে রুস্তমের জন্য। খাট ছাড়া একটা ব্যক্তিগত ব্যবহারের উপযোগী বেঁটে আলমারি এবং টেবিল-চেয়ার দেওয়া হয়েছে তাকে। সব জিনিস খুব নিম্নমানের কাঠের তৈরি। ঘরে জানলা নেই, ভেতরের বাতাস বাইরে টেনে বের করে দেওয়ার জন্য ফ্যান লাগানো আছে দেওয়ালের গায়ে। ঘরের লাগোয়া টয়লেট, সেখানে ঠান্ডা-গরম দু-রকম জলের কল, কমোড, বেসিন এবং স্নান করা ও কাচাকুচির জন্য বালতি রয়েছে।
নিজের ঘরের চেহারা দেখলে রুস্তমের মনে হয় তাকে জেলখানার সেলে থাকতে দেওয়া হয়েছে। সায়েন্টিস্ট হলে কী হবে, এককুচি কাগজ ল্যাব থেকে নিয়ে আসার হুকুম নেই। দিনের শেষে দেহতল্লাশি করে তারপর রক্ষীরা তাকে ঘরে ফেরার অনুমতি দেয়। গবেষণা সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র তাকে ল্যাবেই রেখে আসতে হয়। রুস্তমের একমাত্র সান্ত্বনা, শুধু তাকে নয়, বাকি সব বিজ্ঞানীদের সঙ্গে একইরকম আচরণ করে এরা।
ল্যাব ৮৮-তে যোগদান করার কিছু দিনের মধ্যে রুস্তম কারিমভ চীনের জীবাণু অস্ত্র গবেষণার বিশালতা দেখে বিস্মিত হয়ে গেছে। চীন-মঙ্গোলিয়া সীমান্তে এরকম একটা জনশূন্য প্রান্তরে মাটির নীচে একটা আস্ত শহর বানিয়ে ফেলেছে চীনারা। পুরো শহর দেখা হয়নি, দেখার অনুমতি নেই তার, তবু যতটুকু দেখেছে তাতে তাজ্জব হয়ে গেছে রুস্তম।
মাটির দু-শো মিটার নীচে কম করেও বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আড়াইশো বাড়ি নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে গবেষণাকেন্দ্র, অফিস, কোয়ার্টার্স, হাসপাতাল, দোকান প্রভৃতি সব কিছু রয়েছে। এ ছাড়া আছে নিজস্ব পানীয় জল সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। রেললাইনের মাধ্যমে শহরের বাড়িগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ব্যাটারিচালিত ছোটো ছোটো ট্রেন শহরে ঘোরে, কোথাও যেতে হলে পরিচয়পত্র দেখিয়ে তাতে উঠতে হবে। শহরের একপ্রান্তে বসানো আছে বিশাল অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। এই শহরের বর্জ্য জল বা বাতাস পরিবেশে মুক্ত করার আগে এখানে শোধন করা হয়।
মাটির নীচে এলাহি বন্দোবস্ত থাকলে কী হবে, ওপর থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই। কাগজে-কলমে চীন বাকি বিশ্বকে জানিয়েছে ল্যাব ৮৮ হল একটা কৃষি গবেষণাকেন্দ্র। উপগ্রহচিত্র থেকে যাতে টের পাওয়া না যায় সেজন্য মাটির ওপরে অল্প কিছু বাড়িঘর, এয়ারফিল্ড, বিমানের হ্যাঙার এসব রয়েছে। উপগ্রহচিত্র থেকে কিছু বাড়ির মাথায় চিমনি দেখা যাবে, গবেষণাকেন্দ্রে যেমন হামেশাই থাকে। কিন্তু সেগুলো যে মাটির নীচে থেকে বাড়ি ভেদ করে আকাশের দিকে উঠেছে, তা বোঝার উপায় নেই।
প্রায় তিন হাজার মানুষ এখানে কাজ করে। তার মধ্যে বেশিরভাগ হল সেনা কিংবা সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্ট। বিজ্ঞানী এবং টেকনিশিয়ান মিলে খুব বেশি হলে আড়াইশো জন। এদের মধ্যে অধিকাংশ চীনা, রুস্তমের মতো অল্প দু-তিনজন বিদেশি। চীনা বিজ্ঞানীরা সবসময় আতঙ্কের মধ্যে কাজ করেন, সেটা তাঁদের মুখ-চোখ দেখলে টের পায় রুস্তম। প্রত্যাশিত ফলাফল না দিতে পারলে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হবে তাঁদের, সেকথা তাঁরা ভালোমতো জানেন। এরকম মানসিক চাপ নিয়ে গবেষণার কাজ করা যায় না, রুস্তম জানে। বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এখানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ করে চীনা প্রশাসন ও সামরিক বাহিনী। বিজ্ঞানীরা নীরবে মুখ বুজে সব কিছু সহ্য করতে বাধ্য হন।
খাওয়া শেষ করে ভদকার বোতলে মুখ লাগিয়ে লম্বা একটা চুমুক দিল রুস্তম কারিমভ। ভাগ্য তাকে কোথায় এনে ফেলেছে! এখন অবশ্য আর কোনো কিছু তার নিয়ন্ত্রণে নেই।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর একে একে জীবাণু গবেষণাকেন্দ্রগুলো বন্ধ হতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা দেশ ছাড়তে আরম্ভ করেন। সবাই আমেরিকা-ব্রিটেন-ফ্রান্স যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছাড়লেও খুব কম বিজ্ঞানী এসব দেশে থাকার অনুমতি পেয়েছেন। এমন একজনের কথা রুস্তমের খুব মনে পড়ে। তাঁর নাম কানাতজান আলিবেকভ। রুস্তমের প্রাক্তন বস এখন আমেরিকায় থাকেন, বায়ো-ডিফেন্স বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর দারুণ খ্যাতি। আমেরিকানরা তাঁর নামটা ছোটো করে মার্কিন কেতায় কেন আলিবেক বলে ডাকে।
সোভিয়েত জৈব অস্ত্র প্রকল্প বায়ো-প্রিপারেত-এর অন্যতম প্রধান কর্তাব্যক্তি ছিলেন কমরেড আলিবেকভ। বয়সে রুস্তমের চেয়ে বছর দশেক বড়ো। রুশ নন, তিনি কাজাখস্তানের মানুষ। খুব অল্প বয়সে এত বড়ো একটা প্রকল্পর মাথায় বসে ছিলেন তিনি। না, একেবারে মাথায় অবশ্য নয়, বায়ো-প্রিপারেত-এর ডিরেক্টর পদটি কেজিবি কখনো রাশিয়ান ছাড়া অন্য জাতির লোকের জন্য ছাড়েনি। সেই পদে ছিলেন কমরেড কালিনিন, পুরো নামটা কী ছিল এখন রুস্তম ভুলে গেছে। যাই হোক, কানাতজান আলিবেকভের সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি এখনও রুস্তমের মনে টাটকা। রুস্তম তখন জুনিয়ার সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজাখস্তানের স্তেপনোগোরস্ক অ্যানথ্রাক্স ফেসিলিটিতে কাজ করত। কমরেড আলিবেকভ রুস্তমের মতো এশীয় বলে তাঁকে মনে মনে গভীর শ্রদ্ধা করত সে। কিন্তু হঠাৎ যে কী মতিচ্ছন্ন হল তাঁর, তিনি পরিবার নিয়ে রাতারাতি পালিয়ে গেলেন আমেরিকায়!
আসলে ডলারের সামনে সব মতবাদ এবং আদর্শ অচল, বহুদিন হল তা বুঝতে পেরেছে রুস্তম। সেই ১৯৯৫ সালে স্তেপনোগোরস্ক ফেসিলিটি দেখতে যখন মার্কিন প্রতিনিধি দল এসেছিল তখনই রুস্তম চোখের সামনে দেখেছিল ডলারের লোভ মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে।
কাজাখস্তানে আমেরিকান মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি অ্যান্ডি ওয়েবার ছিলেন মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান। তাঁকে নাকি স্তেপনোগোরস্ক ফেসিলিটি দেখতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন খোদ প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নাজারবায়েভ। খবর পেয়ে স্তেপনোগোরস্ক ফেসিলিটির ডিরেক্টর কমরেড গেন্নাদি লেপিয়োশকিন-এর সে কী হম্বিতম্বি। তিনি সবাইকে ডেকে বললেন, ‘আমি এখানে একটা ক্যাপিটালিস্টকেও ঢুকতে দেব না। তাতে যা হয় হোক। তোমরা কে কে আমার সঙ্গে আছ?’
‘আমরা সবাই’ বলে একটা সম্মিলিত ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে শূন্যে উঠে এসেছিল অনেকগুলো মুষ্ঠিবদ্ধ হাত। হাত তুলেছিল রুস্তম কারিমভ নিজেও। কিন্তু সে ভালোমতো জানত, যদি প্রেসিডেন্ট নাজারবায়েভ সত্যি মার্কিন প্রতিনিধি দলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন, তবে তাঁকে কোনোভাবে প্রতিরোধ করা যাবে না। আর, ল্যাবরেটরি দেখানোর মধ্যে অসুবিধেজনক কিছু নেই, কারণ ততদিনে স্তেপনোগোরস্ক ফেসিলিটির গৌরবের দিন অন্তর্হিত হয়েছে। ল্যাবের ভবনের গায়ে ফাটল ধরেছে, শ্যাওলা গজিয়েছে নানা জায়গায়, বেশিরভাগ ইনস্ট্রুমেন্ট অকেজো, বহু জিনিস চোরাপথে বিক্রি হয়ে গেছে।
অ্যান্ডি ওয়েবারকে প্রথমে ফিরে যেতে বললেও একটু পরে যখন ফ্যাক্সে প্রেসিডেন্টের সম্মতিপত্র এল, কমরেড লেপিয়োশকিন ভোল বদল করে আমেরিকানদের বন্ধু হয়ে গেলেন। রাতে ডিনার পার্টিতে মদের ফোয়ারা ছুটল, রুস্তম সবিস্ময়ে দেখল কমরেড লেপিয়োশকিন অ্যান্ডি ওয়েবারের কাছে হাত কচলাতে কচলাতে স্তেপনোগোরস্ক ফেসিলিটির জন্য মার্কিন সাহায্য চাইছেন। তিনি যদি আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পান তবে বড়োই ভালো হয়, নেশায় চুর লেপিয়োশকিন বার বার একই আবদার করছিলেন আমেরিকানদের কাছে। মার্কিনরা ব্যাপারটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছিল রুস্তম আর তার সহকর্মীদের!
এ দৃশ্য দেখার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার সময় রুস্তমের কোনো গ্লানি বা অপরাধবোধ হয়নি। রুস্তমের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল জীবাণু অস্ত্র সম্পর্কে তার যা অভিজ্ঞতা রয়েছে তাতে বিদেশে কাজ জুটিয়ে নিতে অসুবিধে হবে না। আমেরিকা এর আগে শত্রু দেশের বহু বিজ্ঞানীকে নিজেদের প্রয়োজনে কাজে লাগিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নাতসি বিজ্ঞানীদের অপরাধ ক্ষমা করে তাদের অনেককে আমেরিকা নিজেদের দেশে টেনে এনে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজে লাগিয়েছিল। নাতসি বিজ্ঞানীদের খুঁজে বের করে তাঁদের আমেরিকার বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োগ করার জন্য সিআইএ শুরু করেছিল ‘পেপারক্লিপ’ নামে একটা গোপন প্রোজেক্ট।
কেজিবির কাছে ইন-সার্ভিস ট্রেনিংয়ের সময় রুস্তম কারিমভকে বাধ্যতামূলকভাবে কিছু ইতিহাস জানতে হয়েছে। সেই সূত্রে তার জানা যে, আমেরিকার চন্দ্রাভিযানের নেপথ্য নায়ক একজন নাতসি বিজ্ঞানী, তাঁর নাম ভের্নহের ফন ব্রাউন, তিনি ‘পেপারক্লিপ’ প্রোজেক্টের সবচেয়ে মূল্যবান শিকার। যিনি হিটলারের থার্ড রাইখের স্বপ্ন সফল করার জন্য কুখ্যাত ভি-টু ক্ষেপণাস্ত্র বানিয়ে ইউরোপকে তটস্থ করে তুলেছিলেন, তিনি রিচার্ড নিক্সনের আদেশে আবার স্যাটার্ন-ফাইভ রকেটে চাপিয়ে লুনার মডিউলকে চাঁদে পৌঁছে দিয়েছিলেন!
বায়ো-ওয়েপনস-এর ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সময় জাপান জীবাণু অস্ত্র তৈরি করত ল্যাব-৭৩১ নামে একটা গবেষণাকেন্দ্রে। ফাইটার জেট থেকে চীনের ওপর বিষাক্ত পোকামাকড় ছড়ানো হত এখান থেকে। জাপানিরা যুদ্ধবন্দিদের ওপর নৃশংস এক্সপেরিমেন্ট করত, তাদের মধ্যে বহু আমেরিকানও ছিল। কিন্তু যুদ্ধশেষে আমেরিকার হাতে যখন ল্যাব-৭৩১-এর চিফ শিরো ইশি দলবল নিয়ে ধরা পড়ল, তখন আমেরিকা শর্ত দিল, যুদ্ধাপরাধ মাফ করে দেব, কিন্তু আমাদের বলতে হবে কোন গবেষণা কতদূর এগিয়েছে। নাতসি জীবাণু অস্ত্র বিশেষজ্ঞ এরিখ ট্রোব-এর ক্ষেত্রেও আমেরিকা একই নীতি নিয়েছিল— কোঅপারেট অর প্রসিকিউশন। তিনিও দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়েছিলেন।
এই অবস্থায় রুস্তমের জন্য কি কোথাও একটা কাজ জুটবে না? নিশ্চয়ই জুটবে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে তাসখন্দ থেকে চোরাপথে বুলগেরিয়া হয়ে তুরস্কে এসে পৌঁছেছিল রুস্তম। পুরোটাই সড়কপথে, কারণ বিমানে চোরাই যন্ত্রপাতি এবং ভাইরাসের ভায়াল নিয়ে ওঠার উপায় ছিল না।
ইস্তানবুলে পৌঁছে রুস্তমের সামনে বাস্তব পরিস্থিতি উন্মোচিত হল যা সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘেরাটোপে বসে জানা সম্ভব ছিল না। ছেলেবেলার এক বন্ধু ইস্তানবুলে ব্যাবসা করে, গ্র্যান্ড বাজারে তার চর্মজাত জিনিসের বিশাল দোকান, সে খুশি হয়ে রুস্তমকে তার বাড়িতে থাকার অনুমতি দিয়েছিল। তার বাড়ির এক কোণের একটা ঘরে ল্যাবরেটরি বানিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে টুকটাক কাজ শুরু করেছিল সে। বন্ধু খেয়াল রাখত না রুস্তম কী করছে, কারখানা ও দোকান, এই ছিল তার জগৎ। বউ-বাচ্চা থাকত লন্ডনে, বাড়ির চাবি তার হেফাজতে রেখে সে প্রায়ই ইংল্যান্ডে চলে যেত। বন্ধুর সৌজন্যে থাকা-খাওয়ার অভাব তার না হলেও কাজ জোটাতে পারছিল না রুস্তম।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন যে বহুদিন আগেই আমেরিকায় জীবাণু অস্ত্র গবেষণা নিষিদ্ধ করেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্দরে বসে সেকথা রুস্তম শোনেনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু বাদ দিয়ে বাকি সব জীবাণু নষ্ট করে ফেলেছে আমেরিকা। সোভিয়েত কর্তারা সব জেনেও কাল্পনিক মার্কিন আক্রমণের জুজু দেখিয়ে বায়ো-ওয়েপন তৈরি করার কাজে বছরের পর বছর কোটি কোটি রুবল ঢেলে চলেছেন। এখন জীবাণু অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের আর খুব একটা আমেরিকার দরকার নেই। যারা জীবাণু অস্ত্রর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অর্থাৎ বায়ো-ডিফেন্স তৈরির কাজে সহায়তা করতে পারবেন, প্রয়োজন তাঁদের।
রুস্তম কারিমভ এই জায়গায় পিছিয়ে। জীবাণু ছড়িয়ে কৃত্রিম মহামারি সৃষ্টি করার প্রশিক্ষণ থাকলেও ভ্যাকসিন বানানোর কৌশল তার জানা নেই। অতএব বাদ গেল আমেরিকা এবং অন্যান্য পশ্চিমি দেশ।
কাজকর্ম বা রোজগার কোনোটাই নেই, হাতে সঞ্চিত অর্থ ফুরিয়ে আসছে, রুস্তম ভাবছে দেশে ফিরে গেলে উজবেক সরকার তাকে ক্ষমা করে দেবে কি না, এমন সময় ইস্তানবুলের এক পানশালায় রুস্তমের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল সাদ্দাম হুসেনের সিক্রেট সার্ভিসের এক এজেন্টের সঙ্গে। সে টোপ দিল বাগদাদে এসে কাজ করার জন্য। দেওয়ালে প্রায় পিঠ ঠেকে গেছিল রুস্তমের, প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য হল সে।
উজবেকিস্তানের নুকুজ শহরে কেমিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে বেশ কিছু নার্ভ এজেন্ট হাতিয়েছিল রুস্তম। কিন্তু সেগুলোতে ইরাকি সিক্রেট সার্ভিসের বিশেষ আগ্রহ নেই, তারা জিনিসগুলো কিনে নিল ঠিকই, তবে তাদের প্রধান আগ্রহ জীবাণু অস্ত্র তৈরি করায়। সেজন্য কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে তারা ল্যাবরেটরি নির্মাণ করেছে। রুস্তম জেনে অবাক হল, রাশিয়া ১৯৯৫ সালে জৈব অস্ত্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ইরাকের কাছে বিক্রি করেছে। শুধু তা-ই নয়, তার মতো বেশ ক-জন প্রাক্তন সোভিয়েত বিজ্ঞানীকে ইতিমধ্যে গবেষণার কাজে নিয়োগ করেছে তারা।
রুস্তম খুশি মনে অ্যানথ্রাক্স আর কিউ ফিভারের স্টক তাদের কাছে বেচে দিল। এই স্টক কাজে লাগিয়ে কীভাবে আরও বেশি উৎপাদন করা যাবে বুঝিয়ে দিল তাদের। সব মিলিয়ে ভালো রোজগার হল তার। কিন্তু এর মধ্যে আন্তর্জাতিক চাপে সাদ্দাম হুসেন ইউনাইটেড নেশন’স স্পেশাল কমিশন-এর পর্যবেক্ষক দলকে বাগদাদে ঢুকতে দিতে বাধ্য হলেন। আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাগদাদ ছেড়ে পালাল রুস্তম। পালিয়ে ভালো করেছিল সে, কারণ মরুভূমিতে সাদ্দামের গোপন ল্যাবরেটরির হদিশ ইউএন-এর পর্যবেক্ষক দল খুঁজে বের করতে না পারলেও সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছিল। এরপর একে একে সেই বিজ্ঞানীরা খুন হতে শুরু করলেন। এসব খুনের পেছনে নাকি ইজরায়েলের সিক্রেট সার্ভিস মোসাদের হাত ছিল।
রুস্তম এরপর চীনের হয়ে কাজ করার সুযোগ পায়। নিপা ভাইরাস নিয়ে কাজ করছিল রুস্তম, চীনের সিক্রেট সার্ভিস ব্যাপারটা জেনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। রুস্তম কি পারবে এই ভাইরাস নেপালে পৌঁছে দিতে, ভারতের ওপর প্রয়োগ করা হবে জিনিসটা? চীন সরাসরি যুক্ত থাকতে চায় না এই কাজের পেছনে, নেপালে একজনের হাতে ভাইরাস পৌঁছে দিলে বাকি কাজ সে করবে।
ততদিনে বুদ্ধি খুলেছে রুস্তমের, জীবাণু অস্ত্র বেচতে গেলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকা দরকার, এই ব্যাপারটা তার মাথায় ঢুকেছে। নিপা ভাইরাস নেপালে ডেলিভারি দেওয়ার পাশাপাশি চীন-ভারত সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করল সে। বিশেষ করে শিলিগুড়ির মতো একটা ছোটো শহরে ভাইরাসের আউটব্রেক হলে চীন তা থেকে কীভাবে লাভবান হতে পারে, সেকথা তার মাথায় আসছিল না। ব্যাপারটা বোঝার জন্য রুস্তম নিজে শিলিগুড়ি শহরে হাজির হয়, বেশ কিছুদিন হোটেলে বসে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই সময় চীনের আচরণ তার বোধগম্য হয়নি।
এখন অবশ্য রুস্তম কারিমভের কাছে ষড়যন্ত্রর চেহারাটা স্পষ্ট। নেপালের রাজতন্ত্র বিরোধী কমিউনিস্টদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি রাজাকে দেখাতে চেয়েছিল নেপালের অর্থনীতিতে ভারতের ভূমিকা কত ভঙ্গুর। সেজন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল শিলিগুড়ি শহরকে।
ভারত-নেপাল বাণিজ্যে শিলিগুড়ির একটা বিশাল ভূমিকা আছে। শিলিগুড়ি হয়ে পণ্যবাহী ট্রাক পৌঁছোয় নেপালে। নেপালের বিশেষ কিছু নিজস্ব উৎপাদন নেই, সবটাই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। যদি মাত্র এক সপ্তাহ শিলিগুড়ি-নেপাল সড়কপথ বন্ধ থাকে, নেপালে খাদ্যশসের দাম বেড়ে মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। তখন আসরে নামবে চীন, তারা নেপালকে খাদ্য এবং অন্যান্য সামগ্রী পাঠিয়ে প্রমাণ করে দেবে ভারত নয়, কমিউনিস্ট চীন হল নেপালের প্রকৃত বন্ধু। নেপালের রাজা ভারতের দিক থেকে মুখ ফেরাতে বাধ্য হবেন।
তবে নিপা মহামারির জন্য শিলিগুড়ি করিডোর বন্ধ হলেও নেপালে পণ্য রফতানি কমায়নি ভারত। রক্সৌল এবং সুনৌলি সীমান্ত দিয়ে আরও বেশি করে মাল পাঠিয়ে নেপালে পণ্য পরিবহণ স্বাভাবিক রাখা হয়েছিল। ষড়যন্ত্র এভাবে বানচাল হয়ে যাবে ভাবেনি চীন, নিপা আউটব্রেকের মাত্র পাঁচ মাস পরে, ২০০১ সালের পয়লা জুন রহস্যময়ভাবে পুরো রাজপরিবারের মৃত্যু হল। রাজার বাসভবন নারায়ণহিতি রয়্যাল প্যালেস-এ নৈশভোজের আসরে যুবরাজ দীপেন্দ্র হঠাৎ প্রবেশ করে এলোপাথাড়ি গুলি চালানো শুরু করলেন। রাজা বীরেন্দ্র এবং রানি ঐশ্বর্য-সহ পুরো রাজপরিবার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শেষ। দীপেন্দ্র নিজেও নিজেকে গুলি করে তিনদিন পরে হাসপাতালে মারা গেলেন। যাঁর রাজা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, রাজা বীরেন্দ্রর সেই চীন-ভক্ত ভাই জ্ঞানেন্দ্র, রাতারাতি মাথায় মুকুট চাপিয়ে সিংহাসনে বসার অধিকার পেয়ে গেলেন। জ্ঞানেন্দ্র অবশ্য বেশিদিন টিকতে পারেননি, অচিরেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে কমিউনিস্টরা নেপালের দখল নিয়ে নেয়।
এরপর চীনপন্থী কমিউনিস্টরা রটনা শুরু করে রাজপরিবারের হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারতের সিক্রেট সার্ভিস র-এর হাত রয়েছে। কিন্তু রুস্তম জানে সত্যি ঘটনা কী। আসলে চীন ভারতকে ভয় পায়। কারণ চীন জানে এশিয়ায় চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে একমাত্র বাধা হতে পারে ভারত। ভারতীয়দের মেধাকে ভয় পায় বেজিং। সেজন্য সবসময় সীমান্ত বিবাদ জিইয়ে রেখে ভারতকে চাপে রাখতে চায়। পাকিস্তানি টেররিস্টদের স্বপক্ষে বার বার রাষ্ট্রসংঘের পাশে দাঁড়ায়।
ইরাক এবং চীনের হয়ে কাজ করার পর রুস্তমের হাতে যে টাকা এসেছিল তাই দিয়ে ইস্তানবুলে সে নিজের জন্য একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে সারাক্ষণ গবেষণার কাজ করত। ইন্টারনেটের ব্যবহার জানত না রুস্তম, এবার সে ইন্টারনেটের ব্যবহার শিখে গবেষণার পরিধি বাড়াতে শুরু করল। মলিকিউলার বায়োলজির ক্ষেত্রে অনেক নতুন নতুন উদ্ভাবন এই কয়েক বছরে ঘটে গেছে যা রুস্তমের জানা ছিল না। ইন্টারনেটে কাজ করতে করতে তার পরিচয় হয় ‘জোনাথন’ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। জোনাথন আসলে উত্তর কোরিয়ার সিক্রেট সার্ভিস মিনিস্ট্রি অফ স্টেট সিকিউরিটির এক কেস অফিসার, তাঁর প্রকৃত নাম জি হুন। তাঁর কাছ থেকে পিয়ং ইয়ং-এ যাওয়ার প্রস্তাব পেল রুস্তম।
অনেকদিন পর ভাড়াটে সেনার ভূমিকা ছেড়ে ফের রিসার্চের সুবিধে পাবে ভেবে প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল রুস্তম কারিমভ। ইস্তানবুলের বাড়ি তালাবন্ধ রেখে জোনাথনের সঙ্গে সে পিয়ং ইয়ং-এর উদ্দেশে রওনা দিল। কিন্তু একদম প্রথম দিনেই রুস্তম বুঝে গেল এখানে সে বন্দি।
উন্মাদ কমিউনিস্ট নেতা সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেক দেখেছে রুস্তম, মার্কস-লেনিন যারা একবর্ণ চর্চা করেনি, যারা দেশের নাগরিকদের সাম্যবাদের মাহাত্ম্য নিয়ে জ্ঞান দেয়, কিন্তু নিজেরা চরম ভোগবিলাসের জীবনযাপন করে। তবে উত্তর কোরিয়ায় এসে সে বুঝল, এখনও অনেক কিছু দেখা তার বাকি ছিল।
উত্তর কোরিয়ার শাসক নিজেকে কমিউনিস্ট দাবি করলেও তিনি নিজে ডিভাইন থিয়োরি অফ কিংশিপ-এ বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ স্বয়ং ঈশ্বর তাঁর হাতে মানুষের কল্যাণ করার দায়িত্ব সমর্পণ করেছেন। দেশ চলে তাঁর নিজের খেয়ালে। প্রেসিডেন্ট নিজে থাকেন রাজার হালে, কিন্তু দেশের মানুষের দুরবস্থা অবর্ণনীয়। দেশে চরম খাদ্যসংকট থাকলেও পরমাণু এবং জৈব অস্ত্রর পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে দেশটা। টাকা জোগাচ্ছে চীন। প্রেসিডেন্ট চান সামরিক শক্তির সাহায্যে সারা বিশ্বকে পায়ের নীচে দাবিয়ে রাখতে।
পিয়ং ইয়ং-এর অদূরে ডেমোক্র্যাটিক পিপলস রিপাবলিক অফ নর্থ কোরিয়ার বায়োলজিক্যাল ওয়েপনস রিসার্চ ফেসিলিটি। লোকালয়ের এত কাছে সাধারণত জৈব অস্ত্র গবেষণা কেন্দ্র থাকে না। এর আগে বহু দেশে জৈব অস্ত্র গবেষণাগার থেকে বাতাসে জীবাণু ভেসে বেরিয়ে মহামারি সৃষ্টি করেছে। রুস্তমের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সোয়ার্দলোভস্ক দুর্ঘটনার কথা সবাই জানে। আমেরিকার প্লাম আইল্যান্ডের ঘটনাও সকলের জানা। কিন্তু উত্তর কোরিয়া এসবে ভ্রূক্ষেপহীন। গবেষণাগার থেকে রোগ সংক্রমণ ছড়িয়ে দু-চারশো মানুষ মারা গেলে ক্ষতি নেই, সাধারণ মানুষের প্রাণের দাম এতটাই কম।
প্রথমেই রুস্তমকে জানিয়ে দেওয়া হল, অনুমতি না নিয়ে সে দেশ ছাড়তে পারবে না। সেজন্য তাকে পাসপোর্ট জমা রাখতে হবে। মাইনের টাকা ব্যাঙ্কে জমা পড়বে, তবে সেই টাকা তুলে অন্যত্র পাঠানো যাবে না, এদেশেই খরচ করতে হবে। একসঙ্গে বেশি টাকা তুলতে গেলে আগে থেকে কারণ জানিয়ে অনুমতি নিতে হবে। তার ইস্তানবুলের বাড়ির ভাড়া মাইনে থেকে কেটে দিয়ে দেওয়া হবে, যাতে ফিরে গিয়ে সে বাড়িটা পায়। এখানে খাওয়া, পোশাক, চিকিৎসা ইত্যাদি সব রাষ্ট্রের ব্যয়। তবে তার গতিবিধি সীমাবদ্ধ থাকবে ফেসিলিটির চৌহদ্দির মধ্যে।
তাকে জেলখানায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে বুঝে গেছিল রুস্তম কারিমভ। ফিরে যাওয়ার উপায় নেই বলে সে চেষ্টা করছিল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে। দেশদ্রোহী সন্দেহে কয়েকজনকে চোখের সামনে সাজা পেতে দেখেছে রুস্তম। কাউকে হিংস্র কুকুরের সামনে ফেলে দেওয়া হয়েছে, কাউকে হাত-পা বেঁধে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের চৌবাচ্চায় ছুড়ে ফেলা হয়েছে, আবার কারো পেট ফালা ফালা করে চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে মেরে ফেলা হয়েছে। অমানুষিক সব শাস্তি। রুস্তম বুঝে গেছিল পালাতে চাইলে তার পরিণতি এরকম হবে। সেজন্য সে মন দিয়েছিল গবেষণার কাজে।
উত্তর কোরিয়া অবশ্য ইরাকের মতো গুছিয়ে গবেষণাগার স্থাপন করতে পারেনি। তার প্রধান কারণ হল আন্তর্জাতিক স্যাংশন, আরেকটা কারণ হল ততদিনে সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব লোপ পেয়েছে। চীন কোরিয়াকে অর্থ দিতে রাজি, কিন্তু টেকনোলজি নয়। কারণ, উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের মতো চীনের প্রেসিডেন্টও স্বপ্ন দেখেন একদিন তামাম দুনিয়ার মালিক হবেন। অতএব, তিনি প্রযুক্তি হস্তান্তরে নারাজ। যেহেতু চীনের সঙ্গে বাকি বিশ্বের কারো সদ্ভাব নেই, সেজন্য উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে তার কিঞ্চিৎ দায়বদ্ধতা রয়েছে। তবে ওখানেই সম্পর্কের ইতি, টাকাকড়ি দেওয়া ছাড়া উত্তর কোরিয়ার জীবাণু গবেষণায় চীনের অন্য ভূমিকা নেই।
বেশ কয়েক বছর এভাবে কাটানোর পর হঠাৎ রুস্তম কারিমভকে জানানো হল তাকে চীনে গিয়ে গবেষণার কাজ করতে হবে। জেনারেল ওয়াং দেমিন নামে এক অফিসার নিজে রুস্তমকে নিতে এলেন। চীনা জেনারেলের সৌজন্যে রুস্তমকে তার দশ-বারো বছরের মাইনের টাকা পুরোটাই ডলারে মিটিয়ে দেওয়া হল। তা-ও আবার নগদে। রুস্তম এসে হাজির হল এই গবেষণাকেন্দ্রে।
পিয়ং ইয়ং-এ থাকাকালীন রুস্তম করোনা ভাইরাসের কথা শোনেনি। মঙ্গোলিয়ায় এসে বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের তাণ্ডব সম্পর্কে জানতে পারল সে। চীনের হুবেই বলে কোনো একটা প্রদেশে উহান বলে একটা জায়গা আছে, সেখানকার বায়োলজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি থেকে এই ভাইরাস কৌশলে ছড়ানো হয়েছিল। করোনা ভাইরাস হু-হু করে সংক্রমণ ছড়ায়, মানুষকে ঘায়েল করে, কিন্তু প্রাণে মারে খুব কম। চীন চায় না মানুষ মারা যাক, তাহলে তাদের উৎপাদিত সামগ্রী কিনবে কে? কিন্তু মানুষকে ভয় দেখিয়ে পঙ্গু করে ঘরবন্দি করে রাখতে হবে। তাহলে অর্থনীতি ধাক্কা খাবে। লোকের হাতে টাকা কমে গেলে তারা সস্তা জিনিস খুঁজবে। চীন তার সস্তা পণ্য ছড়িয়ে বিশ্ব বাজার ধরবে।
পরিকল্পনা প্রথমদিকে কাজ করেছিল ঠিকমতো। তবে কিছুদিনের মধ্যে পুরো পৃথিবীর চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল ছকটা। করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা যখন প্রতি মিনিটে বাড়ছিল, পুরো দুনিয়া লুকিয়ে পড়েছিল বাড়ির মধ্যে। ধীরে ধীরে সকলের উপলব্ধি হল, রাস্তায় নীল রঙের গাড়ির সংখ্যা গুনতে বসলে যেমন মনে হবে সারা শহরে নীল রঙের গাড়ি সবচেয়ে বেশি, করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা অনেকটা সেই ধরনের। সারা বিশ্বে প্রতিদিন নানা রোগে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়, কিন্তু সেদিকে কারো হুঁশ নেই। সবাই করোনায় মৃতের দেহ গুনছে।
একদিন এই অবস্থান পরিষ্কার হতে ভয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াল বিশ্ব। ভাইরাসের টিকাও এসে গেল বাজারে। পরিকল্পিতভাবে ভাইরাস ছড়ানোর জন্য কাঠগড়ায় তোলা হল চীনকে। বাণিজ্যিক সুবিধে কিছু হল না, উলটে সুবিধে পেয়ে গেল চিরশত্রু ভারত। বিভিন্ন আমেরিকান কোম্পানি চীন থেকে তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট গুটিয়ে চলে গেল ভারতে। ভারত একগুচ্ছ চীনা অ্যাপকে নিষিদ্ধ করল, দেখাদেখি সেই পথে হাঁটল বিশ্বের বহু দেশ। বিশ্ব রাজনীতিতে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ল চীন।
উহানের ল্যাবরেটরির দিকে সবাই এখন তাকিয়ে আছে। সেখানে নতুন করে জীবাণু গবেষণা শুরু করা সম্ভব নয়। সেজন্য ইনার মঙ্গোলিয়া অটোনমাস রিজিয়নের এই ফেসিলিটিতে নতুন করে গবেষণা শুরু করেছে চীন। দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে এই গবেষণাগার গড়ে তোলা হয়েছে। এরকম ক্লোজড সিটির সঙ্গে রুস্তম কারিমভ পরিচিত, রুশ-মার্কিন ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় কেজিবি মাটির নীচে এরকম অনেকগুলো শহর তৈরি করেছিল।
চীনা সিক্রেট সার্ভিস আবিষ্কার করেছে ‘বনফায়ার’ নামে একটি গোপনতম প্রকল্পে এক সময় কাজ করত রুস্তম কারিমভ। এদের দাবি এখানে সেই গবেষণা ফের শুরু করতে হবে।
তবে চীনা রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেশি সময় দিতে রাজি নয়। তারা রুস্তমের তৈরি একটা ডিজাইনার হেমারেজিক ফিভার ভাইরাস ধীরে ধীরে উত্তর-পূর্ব ভারতে ছড়াতে শুরু করেছে। কিন্তু বাধা আসছে অন্য জায়গায়। এক-শো তিরিশ কোটি জনসংখ্যার দেশকে শায়েস্তা করতে হলে জীবাণু অস্ত্রর ডেলিভারি মেকানিজম উন্নত করতে হবে। নয়তো দু-এক জায়গায় ভাইরাস ছড়িয়ে দু-চারশো লোক মেরে কিছু লাভ নেই।
সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা একটা পদ্ধতি ব্যবহার করতেন এক সময়। বিশেষভাবে নির্মিত অ্যাটাচিতে বসানো থাকত এরোসল স্প্রেয়ার। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন বা অন্য যেকোনো জনবহুল জায়গায় দাঁড়িয়ে বোতাম টিপলে বেরিয়ে আসত ভাইরাস। যিনি কাজটা করতেন, তিনি ঘটনাস্থল ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে আসতেন। এভাবে অবশ্য জীবাণুর কার্যকারিতা দেখা হত, মানুষ মারা এর উদ্দেশ্য ছিল না।
সেই অ্যাটাচির নকশা রয়েছে রুস্তমের ইস্তানবুলের বাড়িতে। চীনা কর্তৃপক্ষকে রুস্তম রাজি করিয়েছে তাকে ইস্তানবুলে ফিরিয়ে দিতে। তার চামড়ার ব্যবসায়ী বন্ধুকে বলা হয়েছে পাঁচশো লেদার অ্যাটাচি তৈরি করে দিতে হবে। সে জানিয়েছে এক মাস সময় দিলে কাজটা করে দিতে পারবে।
আরেকটা কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রুস্তমকে। একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী সহজে দ্রুত ভাইরাস শনাক্ত করা যায় এমন একটা পদ্ধতি উদ্ভাবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। তিনি সফল হলে চীনের পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাবে। চীনের নির্দেশে সেই বিজ্ঞানীকে কিডন্যাপ করেছে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা। তবে তাঁকে ভারতের বাইরে নিয়ে আসা যাবে না, সেখানে কাউকে পাঠিয়ে জেরা করে জেনে নিতে হবে কতদূর সাফল্য মিলেছে এই গবেষণায়। কাজটা অত্যন্ত কঠিন, একমাত্র কোনো বিজ্ঞানীই পারবে আরেক বিজ্ঞানীর কাজ বুঝতে। সেরকম বিজ্ঞানী আছে চীনের হাতে, কিন্তু এরকম বিপজ্জনক মিশনে যেতে তাঁরা কেউ রাজি নন।
অগত্যা তাঁরই মতো এক ভবঘুরে বিজ্ঞানীকে রাজি করিয়েছে রুস্তম। সে ভারতের ভিসা পাবে না, নেপাল পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া এবং কাজ শেষ হলে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পাক গুপ্তচর সংস্থার। পুরো ব্যাপারটা কোঅর্ডিনেট করবে রুস্তম।
আগামীকাল এখান থেকে রওনা হবে রুস্তম। একাই যাবে সে। তবে চীনা সিক্রেট সার্ভিস যে তাকে নজরছাড়া হতে দেবে না তা সে খুব ভালোমতো জানে। রুস্তম কারিমভ অবশ্য আর পালাতে চায় না। পালিয়ে যাবে কোথায়? ষাট বছর বয়স হতে চলল, এই বয়সে তার পেশায় নতুন করে জীবন শুরু করা যায় না।
অনেক রাত হল। বাইরে কনকনে ঠান্ডা, কিন্তু ঘরে রুম হিটারের দৌলতে রুস্তমের গরম লাগছে। থার্মোস্ট্যাটের কাঁটা সেট করে বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে।
