সহযাত্রী

সহযাত্রী

সিতিকণ্ঠ সিংহঠাকুরের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় রেলের গাড়িতে। ঘণ্টা তিনেক মাত্র তিনি আমার সহযাত্রী ছিলেন। কিন্তু এই তিন ঘণ্টা আমার জীবনে এমন অপূর্ব তিন ঘণ্টা যে, তার স্মৃতি আমার মনে আজও জ্বল্-জ্বল্ করছে। এক এক সময়ে মনে হয় যে, সিতিকণ্ঠ সিংহঠাকুরের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় আমার একটা কল্পনা মাত্র। আসলে তাঁর সঙ্গে আমার কখনো সাক্ষাৎ হয় নি, কখনো কোনো কথাবার্তা হয় নি। সমস্ত ব্যাপারটি এতই অদ্ভুত যে, সেটিকে সত্য ঘটনা বলে বিশ্বাস করবার পক্ষে আমার মনের ভিতরেই বাধা আছে। লোকে বলে, স্বপ্ন কখনো কখনো সত্য হয়, সম্ভবত এ ক্ষেত্রে সত্য আমার কাছে স্বপ্ন হয়ে উঠেছে। এখন, ঘটনা কি হয়েছিল, বলছি।

বছর পাঁচ-ছয় আগে আমি একদিন রাত দশটায় ঝাঝা থেকে একখানি জরুরি টেলিগ্রাম পাই যে সেখানে আমার জনৈক আত্মীয়ের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ, আর যদি আমি তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই, তা হলে সেই রাত্রেই আমার রওনা হওয়া প্রয়োজন। আমি আর তিলমাত্র বিলম্ব না করে একখানি ঠিকা গাড়িতে হাবড়ার দিকে ছুটলুম। সেখানে গিয়ে শুনলুম যে, মিনিট-পাঁচেক পরেই একখানি গাড়ি ছাড়বে, যাতে আমি ঝাঝা যেতে পারি। গাড়িখানি অবশ্য Slow passenger এবং ছাড়ে অসময়ে, তবুও দেখি ট্রেন একেবারে ভর্তি, কোথাও ভালো করে বসবার স্থান নেই, শোবার স্থান তো দূরের কথা। খালি ছিল শুধু একটি ফার্স্ট ক্লাস compartment। তাই আমি একখানি ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কিনে সেই গাড়িতেই চড়ে বসলুম। প্রথমে সে গাড়িতে আমি একাই ছিলুম, মধ্যে কোন্ স্টেশনে মনে নেই, একটি বৃদ্ধ ইংরেজ ভদ্রলোক কামরায় এসে ঢুকলেন। তিনি এসেই আমার সঙ্গে আলাপ শুরু করলেন। এ কথা-সে কথা বলবার পর হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, বৌবাজারের কসাই- কালী ভদ্রকালী না দক্ষিণাকালী? আমি বললুম, “জানি নে।” তিনি একটি বাঙালি হিন্দুসন্তানের মুখে এতাদৃশ অজ্ঞতার পরিচয় পেয়ে একটু আশ্চর্য হয়ে গেলেন; পরে বললেন যে, তিনি এ দেশে পূর্বে এঞ্জিনীয়র ছিলেন, এখন বিলেতে বসে তন্ত্র শাস্ত্র চর্চা করছেন, মাত্র সম্প্রতি বাঙলায় ফিরে এসেছেন নানারূপ কালীমূর্তি দর্শন করবার জন্য। তার পর সমস্ত রাত ধরে আমার কাছে কালীমাহাত্ম্য বর্ণনা করলেন। সে রাত্তিরে মন আমার নিতান্ত উদ্‌বিগ্ন ছিল, সুতরাং তাঁর কথা আমার কানে ঢুকলেও মনে ঢোকে নি, নইলে আমি কালীর বিষয়ে এমন একখানি treatise লিখতে পারতুম, যার প্রসাদে আমি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে Doctor উপাধি পেতুম। আমার অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করে তিনি তার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন এবং আমি সব কথা খুলে বললুম। শুনে তিনি চোখ বুজে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তোমার আত্মীয় ভালো হয়ে গেছে।”

শেষ রাত্তিরে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ভোরে চোখ খুলে দেখি, ট্রেন আসানসোল স্টেশনে হাজির, এবং আমার সাহেব সহযাত্রীটি অদৃশ্য হয়েছেন। কামরাটি খালি দেখে ভাবলুম যে, এই বৃদ্ধ ইংরেজ ভদ্রলোকের বিষয় আমি তো স্বপ্ন দেখি নি? রাত্তিরের ব্যাপার সত্য কি স্বপ্ন, তা ঠিক বুঝতে না পেরে আমি গাড়ি থেকে নেমে refreshment room এ প্রবেশ করলুম এক পেয়ালা চায়ের সাহায্যে চোখ থেকে ঘুমের ঘোর ছাড়াবার জন্য।

মিনিট-দশেক পরে গাড়িতে ফিরে এসে দেখি সেখানে দুটি নতুন আরোহী বসে আছেন। একজন পল্টনি সাহেব, আর-এক জন সাধু। সাহেবটির চেহারা ও বেশভূষা দেখে বুঝলুম, তিনি হয় একজন কর্নেল নয় মেজর, আভিজাত্যের ছাপ তাঁর সর্বাঙ্গে ছিল। আমি গাড়িতে ঢুকতেই তিনি শশব্যস্তে উঠে পড়ে আমার বসবার জন্য জায়গা করে দিলেন। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বসে পড়লুম; কিন্তু আমার চোখ পড়ে রইল ঐ সাধুটিরই উপর। প্রথমেই নজরে পড়ল, তিনি একটি মহাপুরুষ না হলেও একটি প্রকাণ্ড পুরুষ। তাঁর তুলনায় কর্নেল-সাহেবটি ছিলেন একটি ছোকরা মাত্র। স্বামীজি যেমন লম্বা তেমনি চওড়া। চোখের আন্দাজে বুঝলুম যে তাঁর বুকের বেড় অন্তত আটচল্লিশ ইঞ্চি হবে। অথচ তিনি স্থুল নন। এ শরীর যে কুস্তিগীর পালোয়ানের সে বিষয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ রইল না। কুস্তিগীর হলেও তাঁর চেহারাতে চোয়াড়ে ভাব ছিল না। তাঁর বর্ণ ছিল গৌর, অর্থাৎ তামাতে রুপোর খাদ দিলে এই উভয় ধাতু মিলে যে রঙের সৃষ্টি করে, সেই গোছের রঙ। তাঁর চোখের তারা দুটি ছিল ফিরোজার মতো নীল ও নিরেট। এরকম নিষ্ঠুর চোখ আমি মানুষের মুখে ইতিপূর্বে দেখি নি। তাঁর গায়ে ছিল গেরুয়া রঙের রেশমের আলখাল্লা, মাথায় প্রকাণ্ড গেরুয়া পাগড়ি ও পায়ে পেশোয়ারী চালি। তাঁকে দেখে আমি একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলুম, কারণ, পাঠান যে সাধু হয় তা আমি জানতুম না; আর আমি ধরে নিয়েছিলুম যে, এ ব্যক্তি পাঠান না হয়ে যায় না। এঁর মুখে-চোখে একটা নির্ভীক বেপরোয়া ভাব ছিল যা এ দেশের কি গৃহস্থ, কি সন্ন্যাসী, কারো মুখে সচরাচর দেখা যায় না।

আমি হাঁ করে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে রয়েছি দেখে সন্ন্যাসী আমাকে বাঙলায় বললেন, “মশায় কি মনে করেছেন যে, আমি ভুল করে এ গাড়িতে উঠেছি—থার্ট ক্লাস ভেবে ফার্স্ট ক্লাসে ঢুকেছি? এত কাণ্ডজ্ঞানশূন্য আমি নই, এই দেখুন আমার টিকিট।”

কথাটা শুনে আমি একটু অপ্রস্তুতভাবে বললুম, “না, তা কেন মনে করব। আজকাল অনেক সাধু-সন্ন্যাসীই তো দেখতে পাই ফার্স্ট ক্লাসেই যাতায়াত করেন। এমন কি, কেউ কেউ একা একটি সেলুন অধিকার করে বসে থাকেন।”

এর উত্তর হল একটি অট্টহাস্য। তার পর তিনি বললেন, “সে মশায়, পরের পয়সায়। আমার মশায়, এমন ভক্ত নেই যাদের বিশ্বাস আমাকে ফার্স্ট ক্লাসে বসিয়ে দিলেই তারা স্বর্গে seat পাবে। গেরুয়া পরলেই যে পরের কাছে হাত পাততে হবে, বিধির এমন কোনো বিধান নেই।”

“তা অবশ্য।”

“কে কি কাপড় পরে, তার থেকে যদি কে কিরকম লোক তা চেনা যেত তা হলে তো আপনাকেও সাহেব বলে মানতে হত।”

আমার পরনে ছিল ইংরাজি কাপড়, সুতরাং সন্ন্যাসী ঠাকুরের এই বিদ্রূপ নীরবে আমাকে সহ্য করতে হল।

এর পরেই তিনি ধ্যানস্তিমিত-লোচনে আকাশের দিকে মুখ তুলে রইলেন। অন্যমনস্কভাবে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকবার পর, তিনি এক দৃষ্টে কর্নেল-সাহেবকে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল কর্নেল-সাহেবের কামান-প্ৰমাণ বন্দুকটির উপর। তিনি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, “May I have a look at your weapon, sir?”

কর্নেল-সাহেব উত্তর করলেন, “Certainly here it is”; এই বলে তিনি বন্দুকটি স্বামীর হাতে তুলে দিলেন। স্বামীজি “thank you” বলে সেটি করতলগত করলেন। তারপর সেটি নেড়ে চেড়ে বললেন, “It’s a Winchester reapeater.”

“Thats right.”

“Splendid weapon but no use for us Shikaris.”

“No, it’s not a sporting gun.”

“Would you care to have a look at my gun? “ I am sure you will like it.” এই বলে তিনি বেঞ্চের নীচ থেকে একটি বন্দুকের বাক্স টেনে নিয়ে, একটি রাইফেল বার করে, “Let me take out the balls” বলে তার ভিতর থেকে দুটি টোটা নিষ্কাশিত করে সাহেবের হাতে তুলে দিলেন। সাহেব সে বন্দুকটি দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন, এবং দু-তিনবার মৃদুস্বরে বললেন, “It’s a beauty”, তার পরে জিজ্ঞাসা করলেন, “Did you get it in calcutta?”

“No, I brought it out from England.”

“It must have cost you a lot of money. “ “Two hundred and fifty pounds.”

এর পর সাহেব-স্বামীতে যে কথোপকথন হল—তা আমার অবোধ্য। মনে আছে শুধু দু-চারটি ইংরাজি কথা—যথা Twelve-bore, 454, Holland & Holland প্রভৃতি। আন্দাজ করলুম, এ-সব হচ্ছে বন্দুক নামক বস্তুর নাম ধাম রূপ গুণ ইত্যাদি। তার পর সীতারামপুর স্টেশনে সাহেব নেমে গেলেন এবং যাবার সময় স্বামীজির করমর্দন করে বললেন, “Well, good bye, glad to have met you”। স্বামীজিও উত্তর করলেন, “Au revoir” ।

আমি এতক্ষণ অবাক হয়ে স্বামীজির কথাবার্তা শুনলুম এবং তার থেকে এই সার সংগ্রহ করলুম যে, তিনি বাঙালি, ইংরাজি, শিক্ষিত, ধনী ও শিকারী। এ রকম লোকের সাক্ষাৎ জীবনে একবার ছাড়া দুবার পথে-ঘাটে মেলে না।

এরপর স্বামীজি যে ব্যবহার করলেন, তা আমার আরো অদ্ভুত লাগল। সন্ন্যাসী হলেও দেখলুম, তিনি আসনসিদ্ধ যোগী নন। এমন ছটফটে লোক এ বয়সের লোকের ভিতর দেখা যায় না। পাঁচ মিনিট অন্তর তিনি এখান থেকে উঠে ওখানে বসতে লাগলেন, বিড়-বিড় করে কি বকতে লাগলেন এবং মধ্যে মধ্যে গাড়ির ভিতরেই পায়চারি করতে লাগলেন। শুধু পাশ দিয়ে আর-একখানি গাড়ি চলে গেলে তিনি জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পাশের গাড়ির যাত্রীদের অতি মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। আমরা তেড়ে চলেছি পশ্চিম মুখে, আর অপর গাড়িগুলি তেড়ে চলেছে পূর্ব মুখে; পথমধ্যে উভয়ের মিলন হচ্ছে সেকেণ্ডখানিকের জন্য। এ অবস্থায় এক গাড়ির লোক অপর গাড়ির লোকেদের কি লক্ষ্য করতে পারে বুঝতে পারলুম না। বুঝলুম যে, নিজের গাড়ির লোকের চাইতে অপর গাড়ির লোক সম্বন্ধে তাঁর ঔৎসুক্য ঢের বেশি। কারণ, সীতারামপুরের পরে তিনি অনেকক্ষণ আমার সঙ্গে কথা কওয়া দূরে থাক্ আমার প্রতি দৃপাতও করেন নি। তাঁর এ ব্যবহার দেখে আমি যে আশ্চর্য হয়েছি তা তিনি লক্ষ্য করেছিলেন। কারণ, তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, “আপনি বোধ হয় জানতে চান যে, আমি পাশের চলন্ত ট্রেনে কি খুঁজছি। আচ্ছা, আমি সংক্ষেপে বলছি, মন দিয়ে শুনুন।”

আমার নাম সিতিকণ্ঠ সিংহঠাকুর। জাতি ব্রাহ্মণ, পেশা জমিদারি। আমার বাবার ছিল মস্ত জমিদারি; উত্তরাধিকারিস্বত্বে আমি এখন তার মালিক। বাবা যখন মারা যান আমি তখন নেহাৎ নাবালক। কাজেই কোর্ট অব ওয়ার্ডস্ সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের ভার নিলে, আর আমার শিক্ষক হলেন একজন ইংরাজ ভদ্রলোক। তিনি এককালে ছিলেন কাপ্তেন। আমি কখনো স্কুল-কলেজে পড়ি নি। আমি যা কিছু শিখেছি সে-সবই তাঁর কাছে। তিনি আমাকে কি শিখিয়েছেন জানেন?—ঘোড়ায় চড়তে, বন্দুক ছুঁড়তে, ইংরাজিতে কথা কইতে। এ তিন বিষয়ে বাঙলার জমিদারের ছেলের মধ্যে আমি বোধ হয়, বোধ হয় কেন, নিশ্চয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ। আমার ইংরাজি কথা তো আপনি শুনেছেন। আর আমি যে কিরকম সওয়ার তা জানে বাঙলার পয়লা নম্বরের ঘোড়ারা। আর আমি একটা গণ্ডারকে পঁচিশ ফুট দূর থেকে এক গুলিতে ধরাশায়ী করতে পারি। আমার লক্ষ্য অব্যর্থ।—আমার দ্বিতীয় শিক্ষক ছিলেন একজন ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন সংস্কৃতভাষা ধর্মকথা পূজাপাঠ আর তন্ত্রমন্ত্র। জমিদারের ছেলের ধর্মজ্ঞান থাকা না কি নিতান্ত দরকার। তাই আমি একসঙ্গে ঘোর হিন্দু ও ঘোর সাহেব— একাধারে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়।

তবে এ বেশ কেন? আমি গেরুয়া পরেছি কাঞ্চনের অভাবে নয়, কামিনীর অভাবে। কথাটা শুনে বোধ হয় আপনি ভাবছেন যে বড়ো মানুষের ছেলের আবার কামিনীর অভাব! আমি কিন্তু মশায়, আর-পাঁচ জনের মতো নই। টাকা থাকলেই বদখেয়ালী হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। জীবনে এক ফোঁটা মদও খাই নি, একটান তামাকও টানি নি, আর অদ্যাবধি নিজের স্ত্রী ছাড়া অপর কোনো স্ত্রীলোককে স্পর্শ করি নি। আমি পর পর তিনটি বিবাহ করি, তিনটিই গত হয়েছে।

আমার প্রথম বিবাহ নাবালক অবস্থাতেই হয় একটি সমান ঘরের মেয়ের সঙ্গে। সে স্ত্রীটি ছিল যেমন বড়ো জমিদারের মেয়ে হয়ে থাকে। তার ছিল কুল শীল ভদ্রতা; ছিল না শুধু রূপ আর বুদ্ধি। ছেলেবেলা দুধ খেয়ে খেয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি নীল গাই। কিন্তু সে গাই কখনও রিয়োয় নি, এই যা রক্ষে।

দ্বিতীয়টি আমি নিজে দেখে বিয়ে করি। গেরেস্তের মেয়ে। সে ছিল যেমন সুন্দরী, তেমনি বুদ্ধিমতী—যাকে কথায় বলে রূপ লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। জমিদারির কাজকর্ম সব তার হাতে ছেড়ে দিয়ে আমি শুধু শিকার করেই বেড়াতুম। অমন মেয়ে বোধ হয় বাঙলাদেশে লাখে একটি পাওয়া যায় না। রূপে তাকে অনেকে বোধ হয় টেক্কা দিতে পারে, কিন্তু গুণে নয়।

তার মৃত্যুর পর আমি আবার বিয়ে করি—স্ত্রীবিয়োগের এক মাসের মধ্যে। এই তৃতীয় পক্ষই আমাকে এ বেশ ধরিয়েছে। এর থেকে মনে ভাববেন না যে সে দেব্যা হয়ে আমার সম্পত্তি ভোগদখল করছে, আর আমি রাস্তায় রাস্তায় ‘এক সের আটা আওর আধা সের ঘিউ মিলা দে ভগবান’ বলে সকাল-সন্ধ্যা চীৎকার করে বেড়াচ্ছি। ছেলেবেলায় একটি গান শুনেছিলুম-

মরি হায় হায়, শুনে হাসি পায়,
কাল শশী যাবেন কাশী
ভস্মরাশি মেখে গায়।

শর্মাও কৌপীন-কমণ্ডলু ধারণ করে কাশী যাবার ছেলে নয়। আমার তৃতীয় পক্ষ দেশ ছাড়া হয়েছেন বলে আমিও দেশছাড়া হয়েছি। কথাটা একটু হেঁয়ালির মতো শোনাচ্ছে না?—ব্যাপার কি হয়েছে, আপনাকে বলছি। তা আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, সে আপনার খুশি। I don’t care a rap for other people’s opinion.

আমাদের বাড়ির ভিতরের বাগানে একটি প্রকাণ্ড দিঘি আছে—মেয়েদের স্নানের জন্য। আমার তৃতীয়া স্ত্রী বিবাহের মাসকয়েক পরে একদিন সন্ধেবেলা সেখানে গা ধুতে যান ও সেই পুকুরে ডুবে মারা যান। আমি অবশ্য তখন বাড়ি ছিলুম না, আসামে খেদা করতে গিয়েছিলুম। আমার স্ত্রীর মৃত্যুর খবর আমার কানে পৌঁছতে প্রায় সাত দিন লাগে, আর আমি বাড়ি ফিরে দেখি যে, আমার স্ত্রী চলে গিয়েছেন—তবে লোকান্তরে কি দেশান্তরে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারলুম না। এ সন্দেহের কারণ বলছি।

সে ছিল নিতান্ত গরিবের মেয়ে, কিন্তু অপরূপ সুন্দরী। স্বর্গের অপ্সরা ভুলে মর্তে এসে পড়েছিল। পয়সার অভাবে বাপ বহুকাল মেয়েটির বিয়ে দিতে পারে নি। আমি যখন এ বিবাহের প্রস্তাব করি তখন তার বয়েস আঠারো। তার বাপ প্রথমে এ প্রস্তাবে সম্মত হয় নি শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলুম। ঘুঁটে-কুডুনীর মেয়ে রাজরানী হবে, এতেও আপত্তি! এরকম মুখছোপ খাওয়া আমার বংশের অভ্যাস নেই। আমি সেই হতভাগা ব্রাহ্মণকে বলে পাঠালুম যে, যদি সে তার মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি না হয় তো মেয়েটিকে জোর করে কেড়ে নিয়ে আসব, আর তার ঘর দোর হাতি দিয়ে ভাঙিয়ে জলে ফেলে দেব। তখন সে ভয়ে মেয়ে তুলে নিয়ে এসে আমার হাতে কন্যাসম্প্রদান করলে। দুদিন না যেতেই কানাঘুষোয় শুনলুম যে, এ বিবাহে বাপের কোনো আপত্তি ছিল না—আপত্তি ছিল মেয়ের। আমারই এক ছোকরা আমলার সঙ্গে তার বিবাহের সম্বন্ধ হয়, এবং তাকে ছাড়া আর কাউকেও বিবাহ করবে না, এই পণ সে ধরে বসেছিল। ছোকরাটি ছিল তাঁর গায়ের লোক, দেখতে সুপুরুষ, আর গাইতে বাজাতে ওস্তাদ। উপরন্তু তাকে সচ্চরিত্র বলে জানতুম। বলা বাহুল্য, এ গুজব শোনবামাত্র আমি ছোকরাটিকে আমার বাড়ি থেকে দূর করে দিলুম। তার কিছুদিন পরেই আমার স্ত্রী জলে ডুবে মারা গেলেন। সুতরাং আমার মনে এ সন্দেহ রয়েই গেল যে, সে মরে নি—পালিয়েছে। সে যে কি প্রকৃতির মেয়ে ছিল তা আমি বলতে পারি নে, কারণ, বিবাহের পর তার সঙ্গে আমার ভালো করে আলাপ-পরিচয় হয় নি। সে ছিল বিদ্যুৎ দিয়ে গড়া, তাই তাকে ছুঁতে ভয় করতুম। বিদ্যুৎকে পোষ মানাবার বিদ্যে আমি জানতুম না। বহুমূল্য রত্ন বাক্সেই বন্ধ ছিল, হঠাৎ একদিন অন্তর্ধান হল। এই ঘটনা ঘটবার পর থেকেই আমার মন একেবারে বিগড়ে গেল। ওঃ, কি রূপ তার! তবে তার বিয়োগে যত না হল দুঃখ, তার চাইতে বেশি হল রাগ। সে বোঝে নি যে, স্বর্গের অপ্সরাও মর্তে এসে কেউটের লেজে পা দিতে পারে না।

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, “সংসারে বীতরাগ হয়েই বুঝি আপনি কাষায়-বাসন ধারণ করেছেন?”

তিনি উত্তর করলেন, “সংসারে বীতরাগ হয়েছি বলে আত্মহত্যা করবার তো কোনো কারণ নেই। পৃথিবী দেদার বাঘ-ভালুক গুলি খাবার আশায় বসে রয়েছে, তাদের বঞ্চিত করে নিজে গুলি খেয়ে বসব কেন? তা ছাড়া আমার তৃতীয় পক্ষ গত হবার পর তো আমি অনায়াসে চতুর্থ পক্ষ করতে পারতুম। আমার আত্মীয়স্বজন দেশময় আমার উপযুক্ত মেয়ের খোঁজ করছিলেন; আমি নিঃসন্তান, আমাদের বংশরক্ষা তো হওয়া চাই। কিন্তু এই সময়ে এমন একটি ঘটনা ঘটল যাতে করে চতুর্থ পক্ষ আর এ যাত্রা করা হল না।

“আমি বাড়ি থেকে কলকাতায় যাচ্ছিলুম। রানাঘাট স্টেশনে একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল, আমাদের গাড়ি পাশে এসে লাগতেই সে গাড়িখানি ছেড়ে দিলে। দেখি, সে- গাড়ির একটি থার্ড ক্লাসের কম্পার্টমেন্টে আমার সেই গুণধর আমলাটি বসে আছে, আর পাশে একটি অপূর্ব সুন্দরী যুবতী। সে যুবতীটি যে আমার তৃতীয়পক্ষ, তা বুঝতে আমার আর দেরি হল না— যদিও তার মুখটি ভালো করে দেখতে পাই নি। তবে instinct বলেও তো একটি জিনিস আছে। সেইদিন থেকে আমি শুধু ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়াই—একদিন না-একদিন তাদের ধরবই, এ লুকোচুরি খেলার একদিন সাঙ্গ হবেই।

গেরুয়া ধারণের উদ্দেশ্য—যাতে করে তারা আমাকে চিনতে না পারে। আর সঙ্গে এই বন্দুক নিয়ে বেড়াই, তার কারণ জানেন? এবার যেদিন ও-দুজনের সাক্ষাৎ পাব, সেদিন এর দুটি গুলি দুজনের বুকের ভিতর বসে যাবে। আমার স্ত্রী হরণ করে নিয়ে যাবে, আর অক্ষত শরীরে হেসে-খেলে বেড়াবে, এমন লোক এ দুনিয়ায় আজও জন্মায় নি। তারপর অস্ত্যত্তরস্যাং দিশি দেবতাত্মা হিমালয়ো নাম নাগাধিরাজঃ—তার ক্রোড়ে আশ্রয় নেব।’

এই কথা বলতে না বলতে ট্রেন দেওঘর স্টেশনে এসে পৌছল। পাশ দিয়ে একটি ট্রেন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেল। সিতিকণ্ঠ সিংহঠাকুর জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলছেন, “এই যে, ট্রেনে তারা যাচ্ছে।”

এই বলেই তিনি বন্দুক হাতে করে তড়াক করে প্লাটফরমে লাফিয়ে পড়লেন। তারপর বন্দুকের ঘোড়া দুটি টানলেন। দুবার শুধু ক্লিক ক্লিক আওয়াজ হল। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, তার ভিতর টোটা নেই। তখন তিনি আলখাল্লার বুকের পকেট থেকে দুটি টোটা বার করে বন্দুকে পুরলেন— ইতিমধ্যে সে ট্রেনখানি অদৃশ্য হয়ে গেল। আমাদের গাড়িও ছেড়ে দিলে। সিতিকণ্ঠ বন্দুক হাতে দেওঘরের স্টেশনের প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর সিতিকণ্ঠকে জীবনে আর কখনো দেখি নি, নিজের গাড়িতেও নয়, পাশের গাড়িতেও নয়। আমি শুধু ভাবি, সিতিকণ্ঠ সিংহঠাকুর এখন কোথায়? হিমালয় না সাগরপারে, জেলে না পাগলা গারদে?

আশ্বিন ১৩৩৬

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সহযাত্রী

সহযাত্রী

সহযাত্রী

আমি প্যারিস থেকে জার্মানির কলোন শহরে যাচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম সাত ঘণ্টার যাত্রাটা একটা ডিটেকটিভ নভেল পড়েই কাটিয়ে দেব। পরে দেখলাম নভেলটা মোটেই তারিয়ে তারিয়ে পড়ার জিনিস না। ডিটেকটিভ নভেলের চেয়ে থ্রিলারের উপাদানই এতে বেশি। এদিকে থ্রিলারে আমার চট করে মন বসতে চায় না। শার্লক হোমস বা পোয়ারো-র ফ্যান আমি, বুদ্ধির খেলা দেখতেই ভালোবাসি? এই নভেলটা আমাকে বড্ড বেশি ছুটোছুটি করাচ্ছিল। আমি দুম করে বইটা বন্ধ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বসলাম। ১আর জানালার বাইরে চোখ মেলে দেখবার চেষ্টা করলাম স্যাঁকেতা স্টেশন আসার উপক্রম হল কিনা। আর তখনই আমার নজরে পড়ল সামনে বসা প্রৌঢ় ভদ্রলোকের উৎসুক মুখটি। ট্রেনে ওঠার সময় এই ভদ্রলোকটি আমার সামনে বসেছিলেন কিনা মনে করতে পারলাম না।

প্যারিস ছাড়ার পর আর কেউ তো এই কামরায় ঢোকেনি। তাহলে ইনি কখন এলেন? আর ওভাবেই বা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ওরকম অসহায় হাসিই বা হাসছেন কেন? উনি কি আমাকে চেনেন? দুর, তাই-বা কী করে হবে? আমি ভারতীয় ছাত্র, মাত্র সাত মাস আছি প্যারিসে, আমার সঙ্গে এরকম কারও কোনো পরিচয় ঘটেনি এর মধ্যে। দু-চার জন বয়স্ক প্রফেসর ছাড়া আমি এই বয়সের বেশি লোকের ধারপাশেও ঘেঁষিনি এতদিনে। তাহলে?

একটা জিনিস আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করেছে ভদ্রলোকের চেহারার মধ্যে। সেটা কী? আমি অনেকক্ষণ ধরে ওর গোটা চেহারার খুঁটিনাটি নজর করে দেখলাম। কই, না তো! চেহারার কোথাও তো কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নেই— না নাকে, না চোখে, না চুলে, না ঠোঁটে। না হাতে, না দেহে, না পোশাকে, না হাবেভাবে। পাছে ভদ্রলোক বিরক্ত হন তাই এক ঝটকায় বইটা ফের তুলে নিয়ে তাতে মন দিলাম। কিন্তু না, মন কিছুতেই আর বইতে গিয়ে বসছে না। ভদ্রলোকের দিকে না তাকিয়েও আমি বুঝতে পারছি যে, ভদ্রলোকও আমাকে নিয়েই কিছু একটা ভাবছেন। হয়ত পূর্বের মতো সেরকম মিটিমিটি হাসছেনও। আমাকে নিয়েও ভদ্রলোকের মনে কিছু কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। আমার ভয়ানক ইচ্ছে হল আয়নাতে একবার নিজের মুখটা দেখার। আমি বইটা ফের সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালাম কম্পার্টমেন্টের আয়নাটার মুখোমুখি হব বলে। একটা আলতো ঝাঁকানি দিলাম কলারের টাইটায়, আর বেশ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম আয়নার মধ্যে। আর চমকে উঠলাম আয়নায় প্রতিফলিত দৃশ্যটি দেখে।

আমার বুঝতে এতটুকু দেরি হল না, কেন আমার সামনে উপবিষ্ট প্রৌঢ় ভদ্রলোক সমানে আমাকে দেখে যাচ্ছিলেন। কারণ ওঁর সুটের রং ও কাপড়, জামার কাপড় ও রং, টাই-গোঁফ চশমা ও টুপি হুবহু আমার মতন। আর দু-জনের চেহারা দু-টিও এক। শুধু ফরাসি ভদ্রলোকের গায়ের রংটা একটু বেশি ফর্সা, আর বয়সের জন্য চেহারাতেও কিছুটা ঢিলেঢালা ব্যাপার। নতুবা ওঁকে যেকোনো লোক দেখলে আমার ভবিষ্যৎ চেহারা আঁচ করতে এবং আমাকে দেখলে ওর বিগত যৌবন সম্পর্কে ধারণা করতে পারবে। মুখে একটু রংচং বুলিয়ে আর চোখে একটা কালো চশমা পরে আমি অনায়াসেই ওঁর হয়ে কোথাও হাজিরা দিতে পারি। আর উনিও যদি একটু রংটং মেখে যুবা সাজেন তো… না আর ভাবতে পারলাম না। আমার মাথাটা কীরকম ভেতরে ভেতরে দুলতে লাগল। আমার মনে হল আমার সামনে আমার একটা জীবন্ত ক্যারিকেচার। ভীষণ রাগও হল ওঁর ওপর, আবার কিছুটা মায়াও। আমি স্থির করলাম গোটা জার্নিতে ওঁর দিকে আর তাকাবই না। তাই ফের থ্রিলারটা উঠিয়ে নিয়ে মনসংযোগ করার চেষ্টা করলাম।

কিন্তু একেকটা সময় থাকে যখন মনসংযোগ দিয়ে কিছু করা জেগে জেগে ঘুমোনোর মতো অস্বস্তিকর, অসম্ভব ব্যাপার হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রেও আমার ঠিক তাই হল। আমি বই পড়ার বদলে সামনে বসা মানুষটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ও তাঁর চরিত্র বিশ্লেষণ করতে লাগলাম। আমি মনে মনে বিভিন্ন পোশাকে ওকে সাজিয়ে আমার চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম। হঠাৎ কি ভেবে ওকে ধুতি-পাঞ্জাবিতেও কল্পনা করলাম। কিন্তু প্রতিবারই আমার গায়ে কাঁটা দিল যখন খেয়াল হল যে লোকটার সঙ্গে আমার প্রৌঢ় চেহারার কোনোই ফারাক নেই। ওই অত শীতেও আমার শরীরটা ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠতে লাগল। আমার একটা অকারণ ভয়ও হল সহসা। লোকটা আসলে আমিই নই তো?

শেষের কথাটা মনে উদ্রেক হতেই আমার স্থৈর্য চুলোয় গেল। আমি ফিরে আরেক বার ভদ্রলোকের দিকে না তাকিয়ে পারলাম না। কিন্তু যতক্ষণে মুখ তুলে ফের তাঁর দিকে তাকিয়েছি ততক্ষণে দেখি তিনি নির্বিকার আমার সুটকেসটাই র‍্যাক থেকে নামিয়ে নিয়ে কামরার বাইরে হন্টন লাগিয়েছেন। কারণ ট্রেন তখন এসে দাঁড়িয়েছে স্যাঁকেতা স্টেশনে।

প্রচন্ড আতঙ্ক হল ভেতরে ভেতরে। এ কি! আমার সুটকেস নিয়ে লোকটা চম্পট দিল বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে। আমি ছুট লাগালাম ওঁর পিছনে। কিন্তু করিডরে পা ফেলে লোকটা যে কোথায় উধাও হল তা এতটুকু হদিশ মিলল না। ভয়ের চোটে কোটের ভেতরের পকেটে হাত চালিয়ে দিলাম। না, পাসপোর্ট টিকিট টাকার ওয়ালেট আর অন্যান্য পরিচিতিপত্র সব ঠিক আছে। সুটকেসটার মধ্যে রাখা জামাকাপড়, বইপত্র আর শেভিং সেটটা উধাও হল।

স্যাঁকেতাঁ স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে, কিন্তু আমার প্ল্যাটফর্মে নামার সাহস হচ্ছে না। যদি ট্রেন ছাড়ে তাহলে ওঠার আর বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকবে না। এই পাগল করা শীতের মধ্যে এই স্টেশনে পায়চারি করতে হলে নিউমোনিয়াকে সঙ্গী করে কলোন পৌঁছোতে হবে আগামীকাল। আমি মানে মানে নিজের কামরায় ফিরে, নিজের জায়গাটিতেই বসে পড়লাম। আর তখনই চোখে পড়ল সামনের র‍্যাকে ঠিক আমার মতন একটা স্যুটকেশ, যেটা নির্ঘাৎ ওই ভদ্রলোকের ফেলে যাওয়া লাগেজ। তৎক্ষণাৎ ঠিক করলাম ওই সুটকেসটাই হস্তগত করে আমি কলোন স্টেশনে নামব।

ট্রেন এখন ফ্রান্সের বর্ডার ক্রস করে জার্মানিতে ঢুকল। আমি বুকে আঙুল টিপে দেখে নিলাম পাসপোর্ট, টিকিট সব ঠিক আছে কিনা। ভীষণ বাসনা হল সামনের র‍্যাকের সুটকেসটা খুলে দেখি ওতে কী আছে। আমার কাজে লাগে কিনা। কিন্তু ভয় হল। আমার চাবিতে যদি স্যুটকেসটা না খোলে তাহলে পাশের লোকজনের মনে সন্দেহ জাগতে পারে। ঠিক করলাম সুটকেসটা নিয়ে একেবারে হোটেলে গিয়েই খুলব।

একটু পরে আখেন স্টেশনে জার্মান পুলিশ এসে পাসপোর্ট চেক করতে লাগল। আমার কাছে আসতেই আমি পাসপোর্টটা কোটের ভেতরের পকেট থেকে বার করে দিলাম। পুলিশটা কোনো ছাপ না মেরেই আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ডাঙ্কেসন! অর্থাৎ থ্যাঙ্ক ইউ।

আমি পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে বোকার মতন বসে রইলাম খানিকক্ষণ। তারপর সেটাকে পকেটে গলিয়ে দেওয়ার বদলে খুলে ফেললাম। আসলে একটা গুপ্ত ভয় তখন আমার বুকের মধ্যে লাফালাফি করছে। লোকটা আমার পাসপোর্টে ছাপ মারল না কেন?

ইউরোপের কোনো নাগরিক হলে ট্রেনে অন্তত ওই ছাপটাপ মারার রেওয়াজ আর নেই। কারণ ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ভিসার চল উঠে গেছে অনেক দিন যাবৎ। কিন্তু আমি তো ভারতীয়, আমার বইতে তো ছাপ মারতেই হবে। আমি ভয়ে ভয়ে চোখ চালালাম পাসপোর্টের পরিচয়পত্রের অংশের দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই আমার ভেতরের রক্ত প্রায় হিম হয়ে বসল। আমি দেখলাম আমার পাসপোর্টে নাম লেখা আছে মঁসিয়ুর মার্সেল রেমঁ এবং ছবির জায়গায় সাঁটা আছে কিছুক্ষণ পূর্বেও আমার সামনে বসা ভদ্রলোকটির ফটো। যে চেহারা আমার আশঙ্কা, আমারই হয়ে উঠবে আর বছর ত্রিশেক বাদে। আমি দড়াম করে পাসপোর্টটা বন্ধ করে বুকপকেটে গুঁজে দিলাম। আমার সমস্ত শরীর ঘেমে উঠেছে। আমার ভেতরে মৃত্যুভয়ের সমতুল্য একটা ভয় জেগে উঠেছে।

এরপর কখন কোন স্টেশন পার হলাম, কখন, কাকে টিকিট দেখালাম, কখন রাত দুটো বাজল আর কখন, কীভাবে কলোন স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি ডেকে পূর্বনির্ধারিত এক হোটেলে এসে মার্সেল রের্মর নামে ঘর বুক করে এই ঘরে এসে উঠলাম—আমার আর সঠিক মনে পড়ছে না। এইমাত্র আমি আমার চাবি ঘুরিয়ে রের্মর সুটকেস খুলে দেখলাম আমারই জামাকাপড় বইপত্র ও শেভিং সেটে ওঁর সুটকেস বোঝাই। বুঝতে পারছি না কিছুতেই, সুটকেসটা ওঁর না আমার।

কিন্তু এখন আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছি ওতে আমার নয়, মার্সেল রের্মর প্রতিবিম্ব পড়েছে। কিংবা বলা চলে আমি সাত ঘণ্টার মধ্যে ত্রিশ বৎসর বেশি বয়সের একটা মানুষ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছি। আমার চুলে ইতস্তত পাক ধরেছে, চামড়া কিছুটা আলগা হয়ে গেছে, চোখের পাওয়ার কিছুটা বেড়েছে এবং গায়ের রং কিছুটা ফর্সা হয়ে গেছে। আমি রাজীব মিত্র, একজন বয়স্ক সাহেব বলে কলোনের এক নামী হোটেলের কক্ষে প্রশস্ত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

আমার ভয়ানক ক্লান্তি বোধ হচ্ছিল। আমি জামাকাপড় খুলে উলঙ্গ হয়ে বিছানায় টান হয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমিয়ে পড়তে পড়তেও আমার মনে হল এই ঘুম থেকে আমি হয়তো আর জাগব না।

কিন্তু জাগলাম। প্রতিদিনের মতোই জাগলাম। ঠিক সাতটায়। শুয়ে শুয়ে বিছানায় বেড-টি খেলাম। আরেকটু পরে ব্রেকফাস্টের সঙ্গে সকালের কাগজ এল। ওমলেট আর চা খেতে খেতে জার্মান কাগজের পাতা ওলটাতে লাগলাম। পড়তে তো পারছি না। হঠাৎ একটা ছবি ও খবরে এসে দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। এ কী! এ তো আমারই মুখ ছাপা হয়েছে কাগজে! কেন ছাপল? কোথায় পেল আমার ছবি?

আমি বেল টিপে ওয়েটারকে ডাকলাম। বললাম, এই খররটা পড়ে আমার ইংরেজিতে মানে করে দাও। ছেলেটি ওর ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে মানে করতে গিয়ে বলল, প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ছাত্র ভারতের রাজীব মিত্র গতকাল রাত্রে স্যাঁকেত স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে নিজের নেকটাই দিয়ে একটি ফরাসি মেয়েকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে এবং পরে ওই নেকটাই নিজের গলায় বেঁধে ওয়েটিং রুমের সিলিং-এ ঝুলে পড়ে। জানা যাচ্ছে ফরাসি মেয়েটির সঙ্গে রাজীবের প্রেম ছিল। ওদের দেখা করারও কথা ছিল স্যাঁকোঁয় রাত সাড়ে নটায়।

ওয়েটার চলে গেছে। আমি আমার ব্রেকফাস্ট ও সকালের কাগজ হাতে নিয়ে খাটে বসে আছি। আমি জানি না আমি এরপর কোথায়, কেন যাব। আমার ভীষণ দুঃখ হচ্ছে নিজের জন্য। আমার চোখে জলও ভেসে উঠছে। কেন আমি অকারণ অন্য একটা লোকের বাকি জীবনটা অতিবাহিত করতে যাব? আমি তো তাঁর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়বর্গ, পারিপার্শ্বিক কিছুই চিনি না। এটা কি কোনো জীবন হতে পারে?

হঠাৎ আমার নজরে পড়ল আমার গলায় নেকটাইটা। বাঁচালে এই খুদে জিনিসটাই আমাকে বাঁচাতে পারে। আমি হঠাৎ উৎসুক হয়ে সিলিং-এ একটা আংটা খুঁজছি। আছে কী? না থাকলে?

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *