১.১২ জেল থেকে ফেরার পর

জেল থেকে ফেরার পর মামুন কিছুদিনের জন্য নিরিবিলিতে পারিবারিক জীবন কাটাবেন ঠিক করলেন। ঢাকার বাসা ছেড়ে দিয়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে চলে এলেন মাদারিপুরের নিকটবর্তী এক গ্রামে। এখানে তিনি তাঁর এক চাচার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন।

মামুন কখনো দাড়ি রাখেননি, কিন্তু মাথায় বাবরি চুল। চেহারা ও পোশাকে তিনি নজরুল ইসলামের অনুকরণ করেছেন বরাবর, যদিও সে রকম কিছু কবিখ্যাতি তাঁর হয়নি। ছাত্রজীবনের শেষে কবিতা রচনার চেয়ে রাজনীতিতেই তিনি মেতে উঠেছিলেন বেশি। সেই সময়ে কলকাতা শহরে যে-কোনো শিক্ষিত মুসলমান যুবকের কাছে রাজনীতি ছিল এক অবধারিত আকর্ষণ। সেই রাজনীতি উপলক্ষ করেই প্রতাপের সঙ্গে তাঁর খানিকটা বিচ্ছেদ ঘটতে থাকে। তার আগে দু’জনে ছিলেন একেবারে হরিহর আত্মা, রিপন কলেজের ছেলেরা ঐ দুই বন্ধুকে ঠাট্টা করে বলতো তাল-বেতাল। প্রতাপ ল কলেজে ভর্তি হলে মামুনও ল পড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর ধৈর্যচ্যুতি হলো, পড়াশুনো ছেড়ে তিনি কৃষক-মজদুর প্রজা পার্টিতে যোগ দিয়ে পুরোপুরি ঝাঁপিয়ে পড়লেন রাজনীতিতে।

মাদারিপুরে গ্রামের বাড়িতে বসে মামুনের মনে পড়ে সেই সব দিনের কথা। মাঝখানের পনেরো কুড়ি বছরে কত রকম উত্থান-পতন ঘটে গেল।

মামুনের বয়েস এখন চল্লিশ, তাঁকে ঐ নামে ডাকবার আর বিশেষ কেউ নেই। তাঁর পিতার ইন্তেকাল হয়েছে অনেক আগেই। তাঁর বড় ভাইয়ের সঙ্গে নানা বিষয়ে মতান্তর হয় বলে তিনি দায়ুদকান্দির সম্পত্তির ভাগ ছেড়ে দিয়ে মাদারিপুরে তাঁর অপুত্রক চাচার এই সম্পত্তিটি গ্রহণ করেছেন। এখানে তিনি অনেকটা অপরিচিত, এখানকার মানুষ তাঁকে চেনে সৈয়দ মোজাম্মেল হক নামে এবং আওয়ামী মুসলিম লীগের একজন মাঝারি নেতা হিসেবে সমীহ করে। তিনি বেশ লম্বা, স্বাস্থ্যও মজবুত, গায়ের রং অনেকটা কালোর দিকে। ঢাকায় একটা ঠাট্টা প্রচলিত আছে যে সৈয়দদের মধ্যে অনেক ভেজাল ঢুকে পড়েছে, যাদের গায়ের রং ফর্সা নয়, তাদের কোনো আরব রক্ত-সম্পর্ক নেই, তারা এফিডেবিট করা সৈয়দ। হিন্দুদের মধ্যেও যেমন বেঁটে বামুন আর কটা শুদুর সন্দেহজনক। মামুন নিজেও এ ব্যাপার নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে অনেক মস্করা করেছেন। গ্রামদেশে অবশ্য এসব বৃত্তান্তের প্রচলন নেই, তারা মামুনকে দূর থেকে দেখলেই সালাম জানায়, অনেকেই পারিবারিক সমস্যায় পরামর্শ নিতে আসে তাঁর কাছে।

মামুনের প্রথমা পত্নীর মৃত্যু হয়েছে বিয়ের তিন বছরের মধ্যেই, তারপর তিনি ফিরোজাকে বিবাহ করেন। এই ফিরোজা ছিলেন তাঁরই এক বন্ধুর স্ত্রী, এই বন্ধুটি ছেচল্লিশের দাঙ্গায় নোয়াখালিতে নিহত হয়েছেন। অসহায় বন্ধুপত্নীকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বিপত্নীক মামুন বুঝতে পারেন যে তাঁকে বিবাহ করাই শ্রেষ্ঠ পন্থা। ফিরোজা তখন নিঃসন্তান ছিলেন। সহজেই রাজি হয়ে যান। গৃহিণী হিসেবে ফিরোজা এই ধরিত্রীর মতনই সর্বংসহা, তাঁর রান্নার হাত চমৎকার, রান্না ঘরে তিনি দিনের অধিকাংশ সময় কাটাতে ভালোবাসেন। মামুনের আগের পক্ষের একটি পুত্র সন্তান আছে, এ পক্ষের দুটি কন্যা, ফিরোজা তিনজনকেই সমান চোখে দেখেন, সেইজন্য সংসারের ব্যাপারে মামুন পুরোপুরি ভারমুক্ত।

বিকেলের দিকে মামুন হাঁটতে হাঁটতে আড়িয়েল খাঁ নদীর তীরে চলে আসেন। নদী নয়, নদ, এর প্রকৃতি অতি দুর্দান্ত। কার নামে এই নদীর নাম হয়েছিল কে জানে, হয়তো কোনো পীর বা ফকিরের নামে, কিন্তু কেমন যেন দস্যু দস্যু ধ্বনি আছে। এই নদী যখন তখন তীরভূমির ওপর দস্যুতা করে। হঠাৎ গেল গেল রব পড়ে যায়, ঝুপ ঝাঁপ শব্দ হয়, কিনারা থেকে অনেকখানি দূরে ফাটল ধরে, প্রায় চোখের নিমিষে সেখানে জলের ছলছল খেলা শুরু হয়ে যায়।

স্থানীয় লোকেরা নদীর এই চরিত্র জানে, তাই তারা নদীর ধারে খুব প্রয়োজন ছাড়া বেশি সময় কাটায় না, বিশেষত বর্ষাকালে। খরস্রোতের জিহ্বা ভূমির সঙ্গে মানুষকেও টেনে নিয়েছে এমন অনেক নজীর আছে। অন্যদের কাছে সাবধানবাণী শুনেও মামুন গ্রাহ্য করেন না, তিনি নদী প্রান্তে একটি বটগাছের তলায় এসে বসেন। খানিকটা বিপদের ঝুঁকি তাঁর ভালো লাগে। বটগাছটি খুবই প্রাচীন, এই গাছটি বহু ঘটনার সাক্ষী, অন্তত শ খানেক বছর সে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। দুর্দান্ত আড়িয়েল খাঁ নদ এতদিন তাকে উদরসাৎ করতে পারেনি, সুতরাং ভয়ের কী আছে!

এখন ভরা বর্ষা, এই সময় নদী-নদগুলি দেখলে চক্ষু জুড়িয়ে যায়। জলের কী চমৎকার স্বাস্থ্য। জলের কী সাবলীল খেলা। ইলিশ মাছ ধরা নৌকোগুলি এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ওরা যেন জলস্রোতেরই অঙ্গ! মাঝে মাঝে যখন ওরা জাল তোলে তখন ইলিশের চকচকে রূপালি ঝিলিক চোখে পড়ে।

সন্ধের দিকে জেলে নৌকোগুলো ঘাটের কাছে এসে ভেড়ে, কেউ কেউ তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, মাছ নিবেন নাকি, কত্তা? মামুন দু’দিকে মাথা নাড়েন। হাতে মাছ ঝুলিয়ে দু’মাইল হেঁটে বাড়ি ফেরার দৃশ্যটাই তাঁর ঘোর অপছন্দ। বস্তুত খাদ্যদ্রব্যের ওপর কোনো আসক্তিই তাঁর নেই। খিদে পেলে বাড়ির লোক খেতে দেবে, কী খাবার দেবে তা বাড়ির লোকের চিন্তা, তাঁর নয়। মামুন বেশ কয়েকটি বছর গ্রামে গ্রামে কাটিয়েছেন, দু’বার জেল খেটেছেন, খাদ্যের বাছ-বিচার নেই বলেই সে রকম কষ্ট পাননি।

মামুনের সামনে একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ পড়ে আছে। অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা-সঙ্কুল আবর্তে এতগুলো বছর কাটলো। এর পর কী? নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে মামুন নিজের জীবনের কথা ভাবেন। নদী যায় সমুদ্রের দিকে, মানুষের জীবন যায় মৃত্যুর দিকে। চল্লিশ বছরে পা দিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে মামুন এখন মৃত্যুর কথা ভাবেন। সে মৃত্যু কত দূরে তিনি জানেন না। তাঁর আব্বা-চাচারা কেউই ষাট বাষট্টির বেশি বাঁচেননি, মামুনেরও যদি সেইরকম আয়ু হয় তা হলে মাঝখানের বছরগুলি তিনি কীভাবে কাটাবেন? রাজনীতি আর তাঁর মন টানছে না। তিনি তো আর ব্যক্তিগত স্বার্থে, ক্ষমতার লোভে রাজনীতির অন্দর মহলে প্রবেশ করেননি। উদ্দেশ্য ছিল অন্য। আবার, সাধারণ মামুলি মানুষের মতন বিনা উদ্দেশ্যে জীবন কাটানোও তো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়!

নদীর ধারে বুড়ো বটগাছতলায় একা বসে থাকা সৈয়দ মোজাম্মেল হক ওরফে মামুনকে দেখে কেউ বুঝতে পারবে না, মানুষটি এখন কী গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর দুঃখের অবধি নেই। এখন, এমনকি তিনি কবিতা রচনা করতেও অক্ষম। মাঝখানের কয়েক বছরের অনভ্যাসে কবিতার ভাষা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন বাকরুদ্ধ, পশ্চিম বাংলায় রবীন্দ্রোত্তর কবিতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, পূর্ব বাংলাতেও বাচ্চা কবিরা অন্য রকম ভাষায় লেখে। ঢাকাতে একদিন তো মোতাহার ভাই বলেছিলেন, আরে সৈয়দ, হইলো কী কও তো! এখনকার পোলাপানরা যা ল্যাখে তার কিছুই বুঝি না! বাংলা কবিতার এখন কোনো অভিভাবক নাই!

বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের এক ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন জে দাশগুপ্ত। দ্বিতীয়। মহাযুদ্ধের বছরগুলিতে বরিশালে থাকবার সময় মামুনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। লাজুক, খামখেয়ালী ধরনের মানুষটি, জাতে ব্রাহ্ম, চেহারাটি অনেকটা খেয়া নৌকোর মাঝির মতন, সামনের সঙ্গে গ্রহ-নক্ষত্র বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি যে একজন কবি তা মামুন বুঝতেই পারেননি। পার্টিশানের পর ভদ্রলোক ভারতে চলে যান, শোনা যায় সেখানে তিনি নাকি অর্থনৈতিক অসুবিধের মধ্যে পড়েছিলেন, কিন্তু তিনিই যে প্রসিদ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশ তা জানতে মামুনের অনেক দিন লেগে গিয়েছিল।

মামুন ঐ কবির দুটি কাব্যগ্রন্থ সংগ্রহ করে পড়েছিলেন। ঝরা পালক’ বইয়ের একটি কবিতার নাম হিন্দু-মুসলমান, তার প্রথম লাইনগুলি এই রকম :

মহামৈত্রীর বরদ-তীর্থে–পুণ্য ভারতপুরে
পূজার ঘন্টা মিশিছে হরষে নমাজের সুরে সুরে!
আহ্নিক যেথা শুরু হয়ে যায় আজান বেলার মাঝে,
মুয়াজ্জেনদের উদাস ধ্বনিটি গগনে গগনে বাজে;
জপে ঈদগাতে তসবী ফকির, পূজারী মন্ত্র পড়ে,
সন্ধ্যা-ঊষায় বেদবাণী যায় মিশে কোরানের স্বরে;
সন্ন্যাসী আর পীর
মিলে গেছে হেথা,–মিশে গেছে হেথা মশজিদ, মন্দির!

কবিতাটি পড়তে পড়তে মামুন চোখের জল সামলাতে পারেননি। তখন সাম্প্রদায়িকতা দিনে দিনে কালকেতুর মতন বাড়ছে, মামুন নিজেও তাতে সচেতনভাবে খানিকটা কণ্ঠ মিলিয়ে ছিলেন, হঠাৎ এই কবিতা তাঁর বুকে একটা ধাক্কা মারে। এমন মিলনের কথা আগে তো কেউ বলে নি। মামুন ততদিনে লাহোর কনফারেন্সে ঘোষিত পৃথক পাকিস্তান সৃষ্টির প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন এবং প্রচারে নেমেছিলেন। এই সময়ে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, তবে কি সব ভুল? হিন্দু-মুসলমান মিলে মিশে থাকতে পারে না? কেন পারবে না? মামুনের অনুতাপ বোধ হয়েছিল।

জীবনানন্দ দাশের ঐ কবিতাটি যে রবীন্দ্রনাথের ‘ভারত তীর্থ কবিতার একটি অক্ষম অনুকরণ তা মামুনের মনে পড়েনি। রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি গভীর ভাবের বটে, কিন্তু প্রত্যক্ষ নয়, মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। খেয়া পারাপারের মাঝির মতন চেহারার এই কবি হিন্দু-মুসলমানকে সার্থক ভাবে চিনেছেন, তাই তিনি লিখতে পেরেছেন :

এ ভারত ভূমি নহেক’ তোমার, নহেক’ আমার একা
হেথায় পড়েছে হিন্দুর ছায়া,-মুসলমানের রেখা;…
…’কাফের’, ‘যবন’ টুটিয়া গিয়াছে,–ছুটিয়া গিয়াছে ঘৃণা,
মোলেম বিনা ভারত বিকল, বিফল হিন্দু বিনা…

মামুন অভিনন্দন জানিয়ে ঐ জীবনানন্দ দাশকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, এবং তাঁর ওপর একটি প্রবন্ধ লিখবেন ঠিক করেছিলেন। কিন্তু এই উচ্ছ্বাস বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। জীবনানন্দের পরবর্তী কাব্য পুস্তকটি পড়ে তিনি হতবাক। এ কি একই লোকের লেখা? এর যে মাথা মুণ্ডু কিছুই বোঝা যায় না? অমন একজন অসাম্প্রদায়িক, মানবতা প্রেমিক কবি শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গেলেন নাকি? ‘সাতটি তারার তিমির’, যেমন বইয়ের নাম, তেমনই সব প্রলাপ! বইটিতে হিন্দুমুসলমান বিষয়ে একটি কবিতাও নেই! মাঝে মাঝে যে-সব মানুষের কথা বলা আছে, তারা কারা? কিছুই চেনা যায় না, কিছুই বোঝা যায় না।

সেইখানে যূথচারী কয়েকটি নারী
ঘনিষ্ঠ চাঁদের নিচে চোখ আর চুলের সংকেতে
মেধাবিনী;…

যূথ কথাটা হাতিদের সম্পর্কে প্রযোজ্য, নারীরা কী করে যূথচারী হবে? ব্যাকরণের কী মা বাপ নেই? মোতাহার ভাই ঠিকই বলেছিলেন যে বাংলা কবিতার কোনো অভিভাবক নাই এখন। আগে কেউ একটি ভুল শব্দ প্রয়োগ করলে প্রধান প্রধান কবিরা আপত্তি জানাতেন। নিজস্ব মতামত দিতেন। রবীন্দ্রনাথ কৃষ্টি আর সংস্কৃতি এই দুটি শব্দ নিয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য জানাননি? এই যে জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘চোখ আর চুলের সংকেতে মেধাবিনী’, এর অর্থ কী? এ তো উন্মাদের বাক্যচ্ছটা! রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে এরকম যথেচ্ছাচার প্রশ্রয় পেত? ‘বিচিত্রা ভবনে মিটিং বসতো না? মামুন ঐ জীবনানন্দের কবিতা পড়া বন্ধ করে দিলেন, ঢাকায় একবার যুবলীগের একটি সভায় মোহম্মদ তোয়াহা, আলি আহাদের সামনে কোনো প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশের উল্লেখ শুনে তিনি বলেছিলেন, ঐ কবির কথা বাদ দাও, নিজেদের কারুর কথা বলো, পশ্চিম বাংলার এ কবি পলায়নবাদী। তাই শুনে একদল ছাত্র হৈ হৈ করে বলে উঠেছিল, মামুন ভাই, আপনি চুপ করুন, চুপ করুন! আপনারা ব্যাকডেটেড, আপনাদের যুগ শেষ! জীবনানন্দ শুধু পশ্চিম বাংলা বা পূর্ব বাংলার নন, তিনি আবহমানকালের বাংলার।

সেই সভায়, মামুন মনে বড় ব্যথা পেয়েছিলেন। তিনি ব্যাকডেটেড? সব কটি প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত, যে-কোনো রকম বিপজ্জনক পদক্ষেপেই তিনি পিছ-পা হন না, তবু তাঁকে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা, যাঁদের আজকাল ‘ছাত্র সমাজ’ বলে অভিহিত করা হয়, তারা ব্যাকডেটেড বলে দিল? তার পর থেকে মামুনের কলমে আর কবিতা আসে না। কবিতা হচ্ছে। অনাগত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত, শুধু স্মৃতির চর্বিত চর্বন তো নয়, এটুকু মামুন জানেন।

রাজনীতি আর নয়, কবিতাও নয়, তা হলে বাকি রইলো কী? মামুন উটপাখির মতন এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সময়ে সংসারে মুখ খুঁজতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেখানেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। ফিরোজার অনেক গুণ আছে বটে, তবু তিনি বিরক্তিকর, পারতপক্ষে মামুন তাঁর সঙ্গে কথা বার্তা এড়িয়ে চলেন। গৃহিণী গৃহমুচ্যতে, কিন্তু গৃহিণীর সঙ্গেই যদি সময় কাটাতে ভালো না। লাগে, তা হলে আর সংসারে থাকার কোনো তাৎপর্য রইলো কী?

ফিরোজার প্রথম বিবাহের সময় নাম ছিল নাদেরা, মামুন সেই নাম বদল করে দেন। ফিরোজার অন্য অনেক গুণ থাকলেও তিনি বড় বেশি ধর্ম ধর্ম করেন, অনেকটা বাতিকগ্রস্তের মতন। কয়েকদিন আগে ঈদ উৎসব প্রতিপালিত হয়েছে, তার আগে ফিরোজার নিবন্ধে। মামুনকে প্রতিদিন রোজা রাখতে হয়েছে। মামুন নিষ্ঠার সঙ্গে সব কিছু করেছেন বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিবাদ ছিল। নামাজে বসার সময়েও মন যদি বিক্ষিপ্ত থাকে, তাহলে সে প্রার্থনার মূল্য কতটুকু? মামুনের পিতা মরহুম সৈয়দ আবদুল হাকিম শেষ জীবনে কট্টর ধর্মপন্থী হয়েছিলেন বলে মামুনের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তার ঠিক বিপরীত। মামুন ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন হতে হতে প্রায় নাস্তিকতার প্রান্তে চলে গিয়েছিলেন। ছাত্র জীবনে অধিকাংশ বন্ধুই ছিল হিন্দু, তাদের প্রভাবও অনেকটা কাজ করেছিল। হিন্দু যুবকেরা তখন বোলশেভিজম-এর দিকে। ঝুঁকেছে। নাস্তিক হওয়াই তাদের মধ্যে ফ্যাসান।

কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান করে মামুনের ঘোর ভাঙে। তখন তিনি বুঝেছিলেন। যে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে নাস্তিকতার কোনো স্থান নেই। একজন গোঁড়া মুসলমান। একজন গোঁড়া হিন্দুকে পছন্দ করতে পারেন, কিন্তু একজন নাস্তিক এদের চোখে ধ্বংসযোগ্য। নাস্তিকতা হলো বিশ্বাসের প্রতি অপমান! ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে, তার মধ্যে একজন নাস্তিকতা সমর্থকের স্থান থাকতে পারে না। গ্রামে ঘোরার সময় তিনি। কোরান-হাদিস পাঠ করতে লাগলেন মন দিয়ে, বক্তৃতার সময় কায়দা মাফিক উদ্ধৃতিও দিতে শুরু করলেন। কিন্তু তাঁর মনের গভীরে আর কোনো দিনই ধর্ম-বিশ্বাস প্রোথিত হয়নি।

ফিরোজার আর একটি দোষ তিনি গান-বাজনা একেবারে পছন্দ করেন না, বাড়িতে গ্রামোফোন রেকর্ড বাজালেও তাঁর আপত্তি। হায়, মামুন বড় সাধ করে নাদেরার নাম বদল করে ফিরোজা রাখলেন, সেই ফিরোজাই কিনা সঙ্গীতের শত্রু। বিয়ের প্রথম দু’এক বছর সে রকম কিছু বোঝা যায়নি, পুরো সংসারের কত্রী হবার পর তাঁর ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত হয়েছে, ইদানীং তাঁর শরীরে যত মেদ লাগছে, তত তাঁর মতামত সুদৃঢ় হচ্ছে। ঈষৎ স্থূলকায়া হলেও ফিরোজা বেশ রূপসী। চাঁপা ফুলের মতন গায়ের রং, টিকোলো নাকটি সোনার নাকছাবিতে বড় সুন্দর মানায়। ফিরোজার মেয়ে দুটিও হয়েছে ফুটফুটে, বাচ্চা হুরী পরীর মতন।

কবিতা রচনা বন্ধ হয়ে গেলেও মামুনের সঙ্গীত-প্রীতি এখনো তীব্র। তাঁর নিজের গলাতেও সুর আছে, গাইতে পারেন ভালোই। ‘যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকা বনে’, এই গানটি কোথাও শুনলে বা মামুন নিজে গাইলে অমনি মনে পড়ে যায় বুলা অর্থাৎ গায়ত্রীর কথা। দায়ুদকান্দিতে সত্যসাধন চক্রবর্তীর বাড়িতে সেই কিশোরীর কণ্ঠে প্রথম এই গানটি শুনেছিলেন, আজও সেই কণ্ঠস্বর কানে বাজে। এতগুলি বছর কেটে গেল তবু বুলার স্মৃতি অম্লান রয়ে গেছে। সেই স্মৃতির মধ্যে দুঃখ-জ্বালা নেই বরং তা মধুর। বুলার বিয়ে হয়েছিল গ্রামের বাড়িতে, মামুনও সেই সময় গ্রামে উপস্থিত ছিলেন এবং নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন। নববধূর সাজে কী যে অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছিল বুলাকে, চন্দনের ফোঁটা দেওয়া তার লজ্জারুণ মুখোনি যেন একটা স্বর্গীয় কুসুমের মতন। তার স্বামীটিও খুব রূপবান, দু’জনে যেন একেবারে রাজযোটক। বুলার হাতে মামুন যখন তার উপহারটি তুলে দিতে গিয়েছিল, তখন বুলা মুখ তুলে বলেছিল, এসেছেন মামুনদা!

কলকাতায় ফিরে মামুন প্রতাপের কাছে বুলার বিবাহের সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছিলেন। শুনতে শুনতে প্রতাপ জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোর খুব কষ্ট হয়েছে, না রে মামুন? তুই কোন আক্কেলে ওর বিয়ে দেখতে গেলি?

মামুন অবাক হয়ে বলেছিলেন, কষ্ট? কেন একথা বললি? না তো, আমার বেশ আনন্দ হয়েছে। বুলার অমন ভালো বিয়ে হয়েছে। সেটা তো আনন্দের কথা!

প্রতাপ বলেছিলেন, তুই বুলাকে ভালোবেসেছিলি। তুই ওকে নিয়ে কবিতা লিখেছিস।

–আমি তো তাজমহল নিয়েও কবিতা লিখেছি। তা বলে কি তাজমহলে আমার বেডরুম বানাতে চাই? সুন্দরকে একটু দূরে রেখেই বন্দনা করা ভালো।

প্রতাপ কথাটা বোধহয় ঠিক ধরতে পারেননি। প্রতাপ কবিতার মর্ম বোঝেন না। তিনি। মুখটা অন্যপাশে ফিরিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন।

বুলারা এখন কোথায় আছে কে জানে! সুখে আছে নিশ্চয়ই।

স্মৃতির মুখচ্ছবিতে কালের মালিন্য লাগে না। বিয়ের পরেও বুলাকে মামুন আর একবার দেখেছিলেন। তখন বুলার বয়েস উনিশ কুড়ির বেশি নয়। বুলার সেই বয়েসের চেহারাই তাঁর মনশ্চক্ষে ভাসে। পশ্চিম বাংলার পত্রপত্রিকা দেখলে মামুন আগ্রহের সঙ্গে খুঁজে দেখেন তাতে ধুলার কোনো উল্লেখ আছে কি না। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল গায়িকা হিসেবে বুলা একদিন বিখ্যাত হবেই। হয়তো বিয়ের পর সে আর গানের চর্চা রাখেনি, কিংবা স্বামীর সঙ্গে বোধহয় থাকে পশ্চিমবাংলা ছাড়িয়ে আরও দূরে কোথাও! প্রতাপের সঙ্গে বেশ কিছুদিন মামুনের চিঠি পত্রে যোগাযোগ ছিল, কিন্তু প্রতাপ কোনো চিঠিতে বুলার উল্লেখ করেননি।

তুলনামূলক বিচারে বুলার চেয়ে ফিরোজার, সৌন্দর্য কোনো অংশে কম নয়। রূপ-উপাসক মামুন এক রূপবতাঁকেই জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছেন, কিন্তু সেই জীবনসঙ্গিনী তাঁর মর্ম-সহচরী হতে পারলো না। এ দুঃখ কারুকে জানাবার নয়! ফিরোজা একেবারেই ঘরোয়া, সংসারের চৌহদ্দির বাইরে তাঁর চোখ যায় না। এই সংসারের মধ্যে মামুন এর মধ্যেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। কিন্তু এর পর কোন পথে যাবেন?

অন্ধকার হয়ে এসেছে, গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে উড়ছে জোনাকি। বাতাসে একটা বৃষ্টি বৃষ্টি সোঁদা গন্ধ। এক নৌকোর মাঝি হেঁকে হেঁকে ডাকছে যেন কাকে।

মামুন গুন গুন করে গান ধরলেন, ‘দুঃখ আমার অসীম পাথার পার হলো যে পার হলো….’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *