হোসেন শাহী রাজবংশ
৫৮) সুলতান আলা-উদ-দীন-দুনিয়া-ওয়ালদীন আবুল মুজফফর হোসেন শাহ :
৮৯৯ হিঃ (১৪৯৩-৯৪ খ্রীঃ)—৯৩১ হিঃ (১৫২৫ খ্রীঃ)
সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান নিজাম খান সিকান্দার লোদী-৮৯৪-৯২৩ হিঃ (১৪৮৯-১৫১৭ খ্রীঃ)
• সুলতান ইব্রাহিম শাহ লোদী (সিকান্দার লোদীর পুত্র)-৯২৩-৯৩২ হিঃ (১৫১৭-১৫২৬ খ্রীঃ)
হাবসীবিজয়ী হোসেন শাহ সর্বসম্মতি ক্রমে গৌড়ের বাদশাহ হয়ে বঙ্গে একটি স্থিতিশীল রাজত্বের সূচনা করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ আশরাফ আল হোসেনী। রাজক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে সৈয়দ বংশীয় হোসেন শাহ হাবসীদের বঙ্গ থেকে বিতাড়িত করেন, এবং সেই সঙ্গে দেশীয় পাইকদের ক্ষমতা খর্ব করেন। তাঁর রাজত্বকালের শুরুতে দিল্লীশ্বর সিকান্দার লোদী কর্তৃক রাজ্যহারা জৌনপুরের শর্কি সুলতান হোসেন শাহকে আশ্রয় দান এবং মুকুটহীন শর্কি সুলতানকে রাজোচিত মর্যাদা প্রাদনের মাধ্যমে বিহার ও বাংলার পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে লোদী বাহিনীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব বোধ করার কৌশল ছিল গৌড়েশ্বর হোসেন শাহর প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
আলাউদ্দীন হোসেন শাহ বঙ্গের বাদশা হয়ে ৮৯৯ হিজরী সন থেকে নিজ নামে লিপি(১) উৎকীর্ণ এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেন। তাঁর উৎকীর্ণ আবিষ্কৃত লিপির মধ্যে প্রথম শিলালিপি (দে পাড়াতে প্রাপ্ত, তারিখ অংশে আংশিক ভগ্ন ও তথায় ৪ সংখ্যা মুদ্রিত) ৪ঠা অথবা ১৪ই অথবা ২৪শে জামাদি-উস-সানী ৮৯৯ (মার্চ, ১৪৯৪ খ্রীঃ) তে উৎকীর্ণ। তাঁর প্রচলিত সর্বশেষ ৯৩১ হিজরী (১৫২৫ খ্রীঃ) সনের মুদ্রিত দুইটি মুদ্রা(২) আবিষ্কৃত হয়েছে। অতএব লিপি ও মুদ্রা সাক্ষ্যে সুলতান হোসেন শাহর রাজত্বকাল ৮৯৯ হিজরী থেকে ৯৩১ হিজরী পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল বলা যায়।
এ যাবৎ হোসেন শাহর রাজত্বকালে উৎকীর্ণ সুবর্ণগ্রামে আবিষ্কৃত ১৫ই শাবান ৯২৫ হিজরী (১২ই আগষ্ট ১৫১৯ খ্রীঃ) সনে মসজিদ নির্মাণের প্রস্তর লিপি মূলে পণ্ডিতগণ মনে করে এসেছেন আলাউদ্দীন হোসেন শাহ ৯২৫ হিজরী (১৫১৯ খ্রীঃ) পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। সম্প্রতি তাঁর ৯৩১ সনে প্রচলিত পূর্ব উল্লেখিত প্রাপ্ত দুটি মুদ্রা সাক্ষ্যে তাঁর রাজত্বকাল আরও ছয় বৎসর সম্প্রসারণ করতে হয়। উল্লেখ্য মুদ্রা দুটির সাক্ষ্য যদি গ্রহণ যোগ্য বিবেচিত হয়, তবে বলতে হবে হোসেনশাহর রাজত্বর শেষ বছর ৯৩১ হিজরী (১৫২৫ খ্রীঃ)। সে ক্ষেত্রে তাঁর উত্তরাধিকারীর রাজত্বকাল সম্পর্কেও নূতন বিচারের প্রয়োজন হবে।
শিলালিপিতে ‘দলিল সাক্ষ্য মতে আল্লাহ্র খলিফা’ (খলীফত-উল্লাহ বিল হুজ্জতে ওয়াল বুরহান) এবং মুদ্রায় ‘ন্যায় বিচারক ও দানশীল সুলতান, নবীগণের নেতার বংশধর’ (আস-সুলতানুল আদিল আল বাজিল ওলাদু সাইয়েদুল মুরসালীন) এই লিপিগৎ আলাউদ্দীন হোসেন শাহর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে। আবিষ্কৃত মুদ্রা ও লিপি সাক্ষ্যে দেখা যায় সুলতান হোসেন শাহর রাজত্বকালে তাঁর পুত্র নসরত শাহ, মাহমুদ শাহ এবং পৌত্র ফিরোজ শাহর নিজ নিজ নামে মুদ্রা প্রচলন ও লিপি উৎকীর্ণ করেছেন। হোসেন শাহর সুদীর্ঘ রাজত্বকালে তাঁর পুত্র ও পৌত্রগণ রাজ্য শাসনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
রিয়াজ-উস-সালাতীন অনুসারে হোসেন শাহর অষ্টাদশ পুত্র ছিল। অদ্যাবধি তাঁর তিন পুত্রের নাম আবিষ্কৃত হয়েছে। যথা—১। শাহজাদা দানিয়েল (মুঙ্গের লিপি ৯০৩ হিজরী), ২। নাসিরুদ্দীন নশরত শাহ (সুলতান)। ৩। গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ (সুলতান)। হোসেন শাহর অন্যান্য পঞ্চদশ পুত্রের নাম জানা যায় নি।
হোসেন শাহর ধর্মীয় নীতি সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামিমুক্ত ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। তাঁর উচ্চপদস্থ রাজকর্মী ছিলেন মন্ত্রী গোপীনাথ বসু (পুরন্দর খাঁ)। ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন মুকুন্দ দাস, দেহরক্ষীদের প্রধান ছিলেন কেশব খান ছত্রী, সাকর মল্লিক ছিলেন রূপ গোস্বামী, দাবির-ই-খাস ছিলেন সনাতন গোস্বামী, টাঁকশালের অধ্যক্ষ ছিলেন অনুপ। তাছাড়া হোসেন শাহর অনেক রাজকর্মী হিন্দু ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে ৯২১হিজরী সনে জামাদিউল আওয়াল মাসের প্রথম সপ্তাহে, ৯২২ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তিতে, ১৫১৫ খ্রীস্টাব্দের মধ্য জুন মাসের সময় কালে যুগাবতার শ্রীচৈতন্যদেব গৌড়নগরীর রামকেলিতে পদার্পণ করেন।
সুদীর্ঘকাল রাজত্ব করার পর হোসেন শাহ মৃত্যুবরণ করেন। গৌড়দুর্গ মধ্যে বাংলাকোটে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। সমকালীন কবিকূল তাঁকে নৃপতিতিলক, জগৎভূষণ এবং কৃষ্ণাবতার বলেছেন।
(১) সম্প্রতি মহদীপুর ইন্দারাওয়ালা মসজিদে (আধুনিক কালের) রক্ষিত তিন খানা শিলালিপির মধ্যে দুই খানা সুলতান হোসেন শাহর রাজত্বকালে মসজিদ নির্মাণের লিপি।
(২) G.S Farrid “The duration of the reign of Hussain Shah in the light of a new coin dated 931 A.H.” Journal of the Numismatic Society of India, Vol-XXXIX,1977, pp, 145-48 Plate VIII 6,
এবং
A Coin of Ala-uddin Hussaon Shah of Bengal, dated 931 A.H.-a rejoinder, journal of the Numismatic Society of India, vol-XLV, 1988, pp. 196-200, Plate-IX 4.
৫৯) সুলতান নাসিরুদ্দীন আবুল মুজফফার নশরত শাহ : ৯৩১ হিঃ (১৫২৫ খ্রীঃ)—৯৩৯ হিঃ (১৫৩৩ খ্রীঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান ও সম্রাট—
• সুলতান ইব্রাহিম শাহ লোদী (সিকান্দারের পুত্র)-৯২৩ হিঃ (১৫১৭ খ্রীঃ)—৯৩২ হিঃ (১৫২৬ খ্রীঃ)। ১৫২৬ খ্রীস্টাব্দে পাণিপথের প্রথম যুদ্ধে মোঘল বীর বাবরের হাতে ইব্রাহিম লোদীর পরাজয়ে সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে।
• সম্রাট জাহীরুদ্দীন মহম্মদ বাবর-৯৩২ হিঃ (১৫২৬ খ্রীঃ)—৯৩৭ হিঃ ( ১৫৩০ খ্রীঃ)—ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।
• সম্রাট নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন (বাবরের পুত্র)-৯৩৭ হিঃ (১৫৩০ খ্রীঃ)—৯৪৭ হিঃ (১৫৪০ খ্রীঃ)—প্রথম দফাতে হুমায়ুনের রাজত্বকাল।
আলাউদ্দীন হোসেন শাহর মৃত্যুবরণের পর তাঁর অষ্টাদশ পুত্রর অন্যতম পুত্র নশরত শাহ গৌড়ের রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর সিংহাসনে আরোহণের তারিখ নিয়ে পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ আছে। মুদ্রা সাক্ষ্যে তাঁর পিতা হোসেন শাহর রাজত্বের শেষ বছর ৯৩১ হিজরী (১৫২৫ খ্রীঃ)। কিন্তু ৯৩১ হিজরী সনের পূর্বেই পিতার রাজত্বকালে সুলতান পদবাচ্যে নশরত শাহর প্রচলিত কিছু মুদ্রা ও উৎকীর্ণ বহু লিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। এই জন্য অনেকে মনে করেন নশরত শাহ পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সুলতান হিসাবে মুদ্রা প্রচলন ও লিপি উৎকীর্ণ করেন। কিন্তু হোসেন শাহর বিরুদ্ধে পুত্র নশরত শাহর বিদ্রোহের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে সম্রাট বাবরের সাক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন যে—নশরত শাহ পিতার মৃত্যুর পরে উত্তরাধিকার সূত্রে পিতৃ সিংহাসন লাভ করেন (বাবরনামা)।
নশরত শাহ রাজ সিংহাসনে আরোহণ করে তাঁর ভ্রাতাগণের সঙ্গে অত্যন্ত সদ্ব্যবহার করে মহানুভবতার পরিচয় দেন। তাঁর এই সদ্ব্যবহারের বিষয়ে তবকাত-ই-আকবরী এবং রিয়াজ-উস-সালাতীনে সমর্থন পাওয়া যায়। বস্তুত হোসেনশাহী রাজবংশে রাজার সঙ্গে উত্তরাধিকারের যৌথ শাসনের দৃষ্টান্ত নজিরবিহীন। নশরত শাহর রাজত্বকালেও তাঁর পুত্রগণের এবং ভ্রাতার প্রচলিত মুদ্রা লক্ষ্য করা যায়। তাঁর রাজত্বকালে তাঁর পুত্র বিব্বন শাহ* ও ফিরোজ শাহ এবং ভ্রাতা মাহমুদ শাহর সুলতান পদবাচ্যে প্রচলিত মুদ্রা লক্ষ্য করা যায়। এই মুদ্রাগুলি নিশ্চিত ভাবে যৌথ শাসনের অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে প্রকাশ করা মুদ্রা। সুলতানী যুগে সুলতান কর্তৃক নিজের পুত্রকে রাজ্যশাসনে অংশীদারের প্রমাণ পাওয়া যায় কিন্তু ভ্রাতার সঙ্গে এইরূপ মহানুভবতার কোন নজির নেই।
পিতার রাজত্বকালে নশরত শাহর সুলতান হিসাবে আখ্যায়িত হয়ে ৯০২, ৯১৮, ৯২২, ৯২৩, ৯২৪ ও ৯২৮ হিজরী সনের মুদ্রিত মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। তাছাড়া পিতার রাজত্বকালে তাঁর উৎকীর্ণ বহু লিপির মধ্যে গৌড়দুর্গ মধ্যে প্রাপ্ত তোরণ লিপি ৯২৬ হিজরী এবং উপনগরে (পুকুরিয়া) প্রাপ্ত ও বরেন্দ্র যাদুঘরে রক্ষিত ৯৩০ হিজরীর মসজিদ লিপি আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, তিনি পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ছিলেন না, থাকলে এই সব স্থানে তিনি লিপি উৎকীর্ণ করতে পারতেন না।
নশরত শাহ গৌড়ের বাদশাহ হয়ে দরবেশ সেখ আখি সিরাজুদ্দীন ওসমান (পীরান-ই-পীর) এর সমাধি সৌধে পিতার ৯২৬ হিজরীর ফটকের অনুরূপে ৯৩১ হিজরী সনে ফটক নির্মাণ করে নির্মাণ লিপি উৎকীর্ণ করেন। তাঁর শাসন কালে বহু লিপি ও মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। তিনি পিতার মৃত্যুর পর পিতার জন্য গৌড়দুর্গ মধ্যে অপূর্ব সুন্দর সমাধি সৌধ নির্মাণ করেন (বর্তমানে অবলুপ্ত)। গৌড় নগরে ৯৩২ হিজরী (১৫২৬ খ্রীঃ) সনে বড় সোনা মসজিদের নির্মাণ কার্য্য তাঁর শাসনকালে সমাপ্ত হয়। তিনি তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত কদম রসুল দরগার স্থলে ৯৩৭ হিঃ (১৫৩১ খ্রীঃ) কদম রসুল ভবন নির্মাণ করেন। এতদিন নশরত শাহর রাজত্বের শেষ বছর হিসাবে ৯৩৮ হিজরী সনকে ধরা হত। বর্তমানে তাঁর ৯৩৯ হিজরী সনের মুদ্রা ও শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। তাঁর ৯৩৯ হিজরী সনের শিলালিপিটি বীরভূম জেলার সিউড়িতে ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে বলে মর্তুজা বশীরের গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
শ্রীকর নন্দীর ‘মহাভারতে’ তৎকালীন সুলতান হোসেন শাহর নামের সঙ্গে নশরত শাহ নামও উল্লেখ হয়েছে। বলা হয়েছে তিনি ‘পুত্র সম রক্ষা করে সকল পরজা’। রিয়াজ-উস-সালাতীনে বলা হযেছে যে নশরত শাহ শেষ জীবনে অত্যাচারী হয়ে উঠেন। গৌড় দুর্গাভ্যন্তরে প্রাসাদ (বাইশগজী) নিকটবর্তী একনাকা নামক স্থানে পিতার সমাধি সৌধে জিয়ারত (উপাসনা) করে প্রাসাদে ফিরবার পথে এক খোজার যড়যন্ত্রে তিনি শাহাদত বরণ করেন।
নশরত শাহর রাজত্ব কালে হোসেন শাহী শাসনের ভাঙ্গন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ১৫২৬ খ্রীস্টাব্দে ইব্রাহিম লোদীকে পরাস্ত করে মোগল বংশীয় বাবর তখন দিল্লীশ্বর। তাঁর লোলুপ দৃষ্টি স্বাধীন বাংলার দিকে। নশরত শাহর রাজ্যের পূর্ব ও উত্তর সীমান্তর মত পশ্চিম ও দক্ষিণ সীমান্ত সুরক্ষিত ছিল না। একদিকে দিল্লীশ্বর বাবর অন্য দিকে উড়িষ্যারাজ প্রতাপরুদ্র, তাঁদের রাজ্যসীমা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট ছিলেন।
নশরত উত্তর-হোসেন শাহী রাজবংশের ইতিহাস চর্চায় মনে হয় তৎকালে উত্তরাধিকারের প্রশ্নে অমাত্যবর্গও দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন।
* সুলতান বিব্বন শাহর ৯৩৮ হিজরীতে প্রকাশিত মুদ্রা বিষয়ে মহঃ নূরুল ইসলাম (ঢাকা, বাংলাদেশ) বর্তমান লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং মুদ্রার ছবি, মুদ্রার বিবরণ ও পাঠ প্রেরণ করেন। (চিত্র নং ৪)।
(৬০) সুলতান আলাউদ্দীন আবুল মুজফফ’র বিব্বন শাহ : ৯৩৮ হিঃ (১৫৩১-৩২ খ্রীঃ)।
সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—
• নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন-৯৩৭—৯৪৭ হিঃ (১৫৩০-১৫৪০ খ্রীঃ)।
মুদ্রা সাক্ষ্যে হোসেন শাহী রাজবংশে এক নূতন নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। সুলতান নশরত শাহর ‘বিব্বন শাহ’ নামক এক পুত্রর সুলতান উপাধি সহ হোসেনাবাদ টাঁকশাল থেকে ৯৩৮ হিজরী সনে মুদ্রিত রৌপ্য মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে (Dimension : 28 mm dia and weight-10 grams))। আবিষ্কৃত মুদ্রাটিতে আরবী অক্ষরে লিখিত আছে—‘আল সুলতান বিন আল মুলতান (বিন) আল সুলতান আলা-আল দুনিয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুজফ্ফর বিব্বন শাহ আল সুলতান বিন নশরত শাহ আল সুলতান বিন হোসেন শাহ আল সুলতান আল হোসাইনী—খাল্লাদা আল্লাহু মূলকাহু ওয়া সুলতানাহু হোসাইনাবাদ’ (চিত্র নং ৪)
আলোচ্য মুদ্রার সাক্ষ্য যদি গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় তাহলে বলতে হবে নশবত শাহর ‘বিব্বন শাহ’ নাম এক পুত্রর নাম জনসমক্ষে প্রকাশিত হল। এতদিন পর্যন্ত আমরা সুলতান নশরত শাহর পুত্র ফিরোজ শাহর নাম জানতাম, যিনি স্বল্পকাল গৌড়ের সিংহাসন অলংকৃত করেছিলেন।
বিব্বন শাহর সুলতান উপাধি ধারণ পূর্বক হোসেনাবাদ টাঁকশাল থেকে মুদ্রাটির প্রকাশ কাল ৯৩৮ হিজরী। তাঁর পিতা সুলতান নশরত শাহর রাজত্বকালের শেষ বছরের মুদ্রা ও শিলালিপির প্রকাশ কাল ৯৩৯ হিজরী। অতএব তিনি (বিব্বন) পিতার রাজত্বকালে হয় পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, নয় পিতার সঙ্গে যৌথ শাসনকালে এই মুদ্রা প্রচলন করেন। পূর্বে উল্লেখ করেছি হোসেন শাহী রাজবংশে সুলতানের সঙ্গে পুত্র এমনকি ভ্রাতার যৌথ শাসনের ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত। তিনি সম্ভবতঃ পিতার শাসন কার্যে সাহায্যকারী হিসাবে দক্ষিণবঙ্গের শাসন কার্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সুলতান নশরত শাহর অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে হোসেনাবাদ টাঁকশাল থেকে নিজ নামে মুদ্রা প্রকাশ করেন। তৎকালে এই টাঁকশাল থেকে এই বংশের ভিন্নজনের মুদ্রাও লক্ষ্য করা যায়।
নশরত পুত্র বিব্বন শাহর আরও ঐতিহাসিক উপাদান আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর সম্বন্ধে বেশি কিছু বলা সম্ভব হবে না। তবে নশরত শাহর পুত্র বিব্বন শাহর নাম ইতিমধ্যে ইতিহাসের আলোকে উপস্থাপিত।
(৬১) সুলতান আলাউদ্দীন আবুল মুজফফর ফিরোজ শাহ : ৯৩৯হিঃ (১৫৩৩ খ্রীঃ)।
সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—
• নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন-৯৩৭—৯৪৭ হিঃ (১৫৩০-১৫৪০ খ্রীঃ)।
গৌড়ের নশরত শাহর গৌড়দুর্গাভ্যন্তরে শাহাদত বরণের পর প্রয়াত সুলতান পুত্র আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ গৌড়ের রাজসিংহাসন অলংকৃত করেন। ইতঃপূর্বে তিনি তাঁর পিতামহ সুলতান হোসেন শাহর রাজত্বকালে ৯২৩ হিজরী সনে এবং পিতা সুলতান নশরত শাহর রাজত্বকালে ৯৩৮ হিজরীতে সুলতান উপাধি ধারণ পূর্বক মুদ্রা প্রচলন করেন। এই মুদ্রাগুলি নিশ্চিত ভাবে তাঁর পিতামহ ও পিতার রাজ্য শাসনের সাহায্যকারী হিসাবে অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে প্রকাশিত মুদ্রা।
গৌড়েশ্বর হয়ে ফিরোজ শাহ ৯৩৯ হিজরী সনে মুদ্রা প্রচলন করেন। তাঁর রাজত্বকালে উৎকীর্ণ একটি শিলালিপি বর্ধমান জেলার কালনায় শাহ মসজিদের আস্তানার নিকট একটি পুরাতন মসজিদে আবিষ্কৃত হয়েছে। তদনুসারে ৯৩৯ হিজরীতে রমজান (নবম মাস) মাসের প্রথম দিবসে ২৭ শে মার্চ ১৫৩৩ খ্রীঃ) উলুগ মসনদ খাঁ মালিক কর্তৃক মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।
তাঁর পূর্ববর্তী সুলতান পিতা নশরত শাহর মুদ্রা ও শিলালিপি প্রকাশের শেষ বছর ৯৩৯ হিজরী আবার পরবর্তী সুলতান পিতৃব্য গিয়াসউদ্দীন মাহমুদের মুদ্রার প্রকাশ ৯৩৯ হিজরীতে। অতএব ৯৩৯ হিজরী সনেই ফিরোজ শাহর রাজত্ব শুরু এবং শেষ হয়। পিতা ও পিতৃব্যের রাজত্ব কালের মধ্যবর্তী সময়ে তাঁর রাজত্বকাল যে কয়েক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তা মুদ্রা সাক্ষ্যে নিশ্চিত ভাবে বলা যায়।
সুলতান ফিরোজ শাহ উত্তরাধিকার সূত্রে অকৃত্রিম ভাবে শিল্প-সাহিত্য প্রেমী ছিলেন। সমকালীন কবি শ্রীধর তাঁর পঞ্চগুণের কথা পঞ্চমুখে বলেন। যে সকল অমাত্য ও আমীর নশরত শাহর শহীদ হবার পরে গৌড়ে রাজ সিংহাসনের জন্য মাহমুদ শাহর তুলনায় ফিরোজ শাহকে অধিকতর যোগ্য বিবেচনা করেছিলেন, তাঁরা তাঁদের বিবেচনায় ফিরোজ শাহর মানবিক গুণাবলি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বলে মনে হয়। কিন্তু হত্যাকারীর নিষ্ঠুর হাত দৃশ্যত এক অত্যুৎকৃষ্ট শাসনামলের অবসান ঘটায় কারণ গৌড়ের রাজসিংহাসন প্রাপ্তির দৌড়ে মাহমুদ শাহ তাঁর অখ্যাত অবস্থান মেনে নিতে পারেন নি।
(৬২) সুলতান গিয়াস-উদ-দীন মাহমুদ শাহ : ৯৩৯-৯৪৫ হিঃ (১৫৩৩-৩৮ খ্রীঃ)
সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—
• নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন-৯৩৭—৯৪৭ হিঃ (১৫৩০-১৫৪০ খ্রীঃ)।
সুলতান ফিরোজ শাহর পর সুলতান হোসেন শাহর অপর এক পুত্র মাহমুদ শাহ গৌড়েশ্বর হন (৯৩৯ হিঃ)। ইতঃপূর্বে তিনি রাজক্ষমতা ভোগের অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে পিতা হোসেন শাহর রাজত্বকালে ৯১২, ৯২৩ হিজরীতে এবং ভ্রাতা নশরত শাহর রাজত্বকালে ৯৩৩-৯৩৫, ৯৩৮, ৯৩৯ হিজরীতে মুদ্রা প্রকাশ করেন। তিনি ভ্রাতা নশরত শাহর মহানুভবতার সুযোগে উচ্চাভিলাষী হয়ে ভ্রাতুষ্পুত্র সুলতান ফিরোজ শাহকে হত্যা করে সিংহাসন অধিকারের স্বপ্ন পূরণ করেন।
তাঁর রাজত্বকালে সাতখানি লিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। তন্মধ্যে একখানি লিপি চারখানি ইষ্টক সমন্বয়ে উৎকীর্ণ, এই লিপি কলকাতা-র ভারতীয় যাদুঘরে রক্ষিত আছে। দিনাজপুর জেলার ধোরাইলে প্রাপ্ত শিলালিপিটি বাংলা বর্ণে সংস্কৃত ভাষাতে উৎকীর্ণ। বাংলার অন্য কোন সুলতানের এই ধরনের লিপি পাওয়া যায় নি। তিনি স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রা প্রকাশ করেন।
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিশাল সাম্রাজ্য রক্ষায় মাহমুদ শাহ অক্ষম ছিলেন। সুলতান নশরত শাহর রাজত্বকালে যে ভাঙন প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয় তা মাহমুদ শাহর রাজত্বকালে চূড়ান্ত রূপ পায়। তাঁর রাজত্বকালে আফগান নেতা শের শাহর সৈন্যগণ ৯৪৪ হিজরীর ৬ই জেলকদ (৬ই এপ্রিল, ১৫৩৮ খ্রীঃ) গৌড় নগর অধিকার করেন। গৌড়েশ্বর মাহমুদ শাহ গৌড় নগর থেকে বিহারে পলায়ন পূর্বক মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের শরণাগত হয়ে গৌড়নগর পুনরুদ্ধারের পথে কাহাল গাঁয়ে শের শাহর পুত্র জামাল খাঁ কর্তৃক স্বীয় পুত্রগণের নিধন বার্তা শ্রবণে শোকাহত হয়ে প্রাণ ত্যাগ করেন (৯৪৫ হিঃ)। তাঁকে কাহালগাঁয়ে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে হোসেন শাহী রাজ বংশের পতন হয় এবং বাংলার দুইশত বৎসরের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়।
