রাজা গণেশ ও তাঁর বংশধর
৪২) রাজা গণেশ : ৮১৭-১৮ হিজরী (১৪১৫ খ্রীঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান খিজর খাঁ-১৪১৪-১৪২১ খ্রীঃ (৮১৭-৮২৪ হিঃ)
‘অদ্বৈতপ্রকাশ’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে রাজা গণেশ নরসিংহ নাড়িয়ালের পরামর্শে গৌডিয়া বাদশাহকে হত্যা করে গৌড়ের রাজা হন। তিনি রাজধর্ম অনুসারে রাজ্যশাসন করতে থাকেন। দীর্ঘ মুসলিম শাসনের পরে পুনরায় হিন্দুশাহী প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে ইসলামী রিয়াসত খতম হবার আশঙ্কায় আধ্যাত্মিক নেতা নূর-কুতব-উল-আলমের অনুরোধে জৈনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শরকী বাংলা আক্রমণ করেন।
রাজা গণেশ রাজ্য রক্ষার্থে রাজপুত্র যদুকে ইসলামে দীক্ষিত করে রাজমুকুট পুত্রকে প্রদান পূর্বক রাজ-সিংহাসন ত্যাগ করেন। তখন পীর নূর-কুতব-উল-আলম সুলতান ইব্রাহিমকে যুদ্ধে বিরত হয়ে স্বদেশে প্রতিগমনের অনুরোধ করেন। রাজা গণেশ ৮১৭ হিজরীর কিছু অংশ থেকে ৮১৮ হিজরীর কিছু অংশ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। এই সময়ে তাঁর মুদ্রিত মুদ্রা আবিষ্কৃত হয় নি।
৪৩) গণেশ পুত্র যদু (জালালুদ্দীন মহম্মদ শাহ) : ১৪১৫ খ্রীঃ (৮১৮ হিঃ)-১৪১৬-১৭ (৮১৯ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান খিজর খাঁ-১৪১৪-১৪২১ খ্রীঃ (৮১৭-৮২৪ হিঃ)
রাজা গণেশের পুত্র যদু ওরফে জিৎমল ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে জালালুদ্দীন মহম্মদ শাহ নামে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি নিজ নামে ৮১৮,৮১৯ হিজরীতে মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন।
৪৪) পুনরায় রাজা গণেশ (দনুজমর্দন দেব) : ১৪১৬-১৭ খ্রীঃ (৮১৯ হিঃ)—১৪১৮ খ্রীঃ (৮২১ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান খিজর খাঁ-১৪১৪-১৪২১ খ্রীঃ (৮১৭-৮২৪ হিঃ)
জৈনপুরের সুলতান ইব্রাহিমের মৃত্যুর পর আধ্যাত্মিক নেতা পীর নূর-কুতব-উল-আলমের ৮১৮ হিজরীর ৯ জেলকদ (১৪১৬ খ্রীঃ) মৃত্যু হলে রাজা গণেশ অনুকূল পরিস্থিতি বিবেচনা করে ৮১৯ হিজরীতে ইসলামে দীক্ষিত পুত্র যদুকে সিংহাসন চ্যুত করে পুনর্বার রাজসিংহাসনে আরোহণ করে যথাশাস্ত্র স্বর্ণধেনু যজ্ঞের মাধ্যমে পুত্র যদুকে স্বধর্মে ফিরিয়ে আনেন এবং বন্দী করেন। রাজা গণেশ ‘দনুজমর্দনদেব’ রাজউপাধি গ্রহণ করেন। শ্রীচণ্ডীচরণ আশ্রিত রাজা গণেশ (দনুজমর্দন দেব) ১৩৩৯, ১৩৪০ শকাব্দে (৮২০, ৮২১ হিজরী/১৪১৭, ১৪১৮ খ্রীস্টাব্দে) পাণ্ডুয়া, সুবর্ণগ্রাম ও চাটিগ্রাম টাঁকশাল থেকে মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন।
‘রিয়াজ-উস-সালাতীন’ মতে বন্দী যদু খেদমতগণের সাহায্যে পিতা গণেশকে হত্যা করেন।
পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে গণেশ বিদ্যুৎ-স্ফুলিঙ্গের মত আবির্ভূত হয়ে অসাধ্য সাধন করেন, প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে হিন্দু রাজ্যপ্রতিষ্ঠা করেন।
৪৫) মহেন্দ্র দেব : ১৪১৮ খ্রী (৮২১ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান খিজর খাঁ-১৪১৪-১৪২১ খ্রীঃ (৮১৭-৮২৪ হিঃ)
রাজা গণেশের মৃত্যুর পরে তাঁর অপর এক পুত্র মহেন্দ্র দেব সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি নিজ নামে ১৩৪০ শকাব্দে (৮২১ হিজরী/১৪১৮ খ্রীঃ) পাণ্ডুনগর (পাণ্ডুয়া), চাটিগ্রাম (চট্টগ্রাম) টাঁকশাল থেকে মুদ্রা প্রকাশ করেন। স্বল্পকাল রাজত্ব করার পর তিনি তাঁর ভ্রাতা যদু কর্তৃক সিংহাসন থেকে অপসারিত হন।
৪৬) পুনরায় যদু : (সুলতান জালালুদ্দীন আবুল মুজাফফর মহম্মদ শাহ)-১৪১৮ খ্রীঃ (৮২১ হিঃ)—১৪৩৩ খ্রীঃ (৮৩৬ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান খিজর খাঁ ১৪১৪-১৪২১ খ্রীঃ (৮১৭-৮২৪ হিঃ)
• সুলতান মইজুদ্দীন মুবারক শাহ (খিজরের পুত্র)-১৪২১-১৪৩৫ খ্রীঃ (৮২৪-৮৩৮ হিঃ)
পিতা গণেশকে হত্যা করার পর ভ্রাতা মহেন্দ্রদেবকে সিংহাসনচ্যুত করে গণেশ পুত্র যদু পুনরায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান রূপে পুনরায় পাণ্ডুয়ার রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন। যদু বা জিতমল্ল জালালুদ্দীন হয়ে বহু সংখ্যক হিন্দুর জাতিনাশ করেন। তিনি গৌড় নগর পুনরুদ্ধার করেন। গৌড় দুর্গের মৃত্তিকাগড়ের অভ্যন্তরে জালালিয়া দীঘি জালালুদ্দীনের অক্ষয় কীর্তি। তিনি গৌড় নগরীতেও অবস্থান করতেন। বাংলার সিংহাসনে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়ে তিনি পুনরায় ৮২১ হিজরী থেকে ৮৩৬ হিজরী পর্যন্ত মুদ্রা ও লিপি উৎকীর্ণ করেন। তাঁর উৎকীর্ণ মুদ্রাগুলি বিভিন্ন শ্রেণীতে বিন্যাস করা যেতে পারে। মুদ্রা ও লিপিতে তিনি নিজেকে ‘নাসির আল-ইসলাম ওয়া’ল মুসলিমীন’ (ইসলাম ও মুসলমানগণের সাহায্যকারী) বা ’নাসির-ই-আমীর আল-মু’মিনীন ঘাউস আল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন’ (মুসলিম জাহানের সেনাপতির সহায়ক, ইসলাম ও মুসলমানদের আশ্রয়স্থল) বা ‘খলীফত আল্লাহ্’(ঈশ্বরের খলিফা) রূপে ঘোষণা বা দাবি করে তৎকালীন মুসলিম জগতে নিজের রাজ-অধিকার যথাযথ প্রতিপন্ন করেন। তাঁর মুদ্রায় তিনি যে পুরো উপাধি ব্যবহার করেছেন তা হচ্ছে ‘জালাল-উদ-দুনিয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুজাফফর মহম্মদ শাহ আস-সুলতান।’ তিনি নিজেকে ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান প্রতিপন্ন করলেও নিজের হিন্দু অতীতকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলেননি। তাঁর এক ধরনের মুদ্রায় তিনি নিজেকে ‘বিন কানস শাহ’ (রাজা কানস বা গণেশের পুত্র) এবং আর এক ধরণের সুবৃহৎ দশ-তংকা ওজনের রৌপ্য মুদ্রায় নিজেকে ‘বিন কানস রাও’ রূপে উৎকীর্ণ করেছেন। এই মুদ্রায় সিংহমূর্ত্তি ক্ষোদিত আছে।
তাঁর উৎকীর্ণ আবিষ্কৃত লিপি ও মুদ্রার মধ্যে শেষ লিপির তারিখ ৮৩৬ হিজরীর ১০ই জামাদি-উল-আওয়াল (জানুয়ারী ১৪৩৩ খ্রীঃ)। সুলতান জালালুদ্দীন মহম্মদ শাহ এই তারিখের কিছু পরে স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেন। তিনি পাণ্ডুয়ার একলাখী ভবনে সমাধিস্থ আছেন।
‘‘বিন কান্স শাহ’’—
• Bhattasali, coins and chronology of Early independent Sultans of Bengal.
• A Karim corpus of the Muslim coins of Bengal.
‘‘বিন কানস্ রাও’—
• Journal of the Numismatic Society of India 1976
৪৭) সুলতান শামস-উদ-দীন আহমদ শাহ : ১৪৩৩ খ্রীঃ (৮৩৬ হিঃ)
—১৪৩৫-৩৬ খ্রীঃ (৮৩৯ হিঃ)।
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান মইজুদ্দীন মোবারক শাহ-১৪২১-১৪৩৫ খ্রীঃ (৮২৪-৮৩৮ হিঃ)
• সুলতান মুহাম্মদ (ফরীদের পুত্র, খিজরের পৌত্র)-১৪৩৫-১৪৪৬ খ্রীঃ—(৮৩৮-৮৪৯ হিঃ)
জালালুদ্দীন মহম্মদ শাহর (যদু) মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র শামসুউদ্দীন আহমদ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ৮৩৬ হিজরীতে মুদ্রা প্রকাশ করেন। সোনারগাঁও এর উত্তরদিকে মুয়াজ্জমপুরে শাহ লঙ্গরের দরগাহে প্রাপ্ত খণ্ডিত শিলালিপিতে ‘আহম্মদ শাহ’ উৎকীর্ণ আছে, তারিখ নেই। এটি তাঁর সময়ের মসজিদ লিপি মনে হয়। তাঁর দুইজন ক্রীতদাস সাদী খান এবং নাসির খান ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করেন। আহমদ শাহর হত্যার সঙ্গে সঙ্গে রাজা গণেশের বংশের পতন হয়। আহমদ শাহকে একলাখী ভবনে সমাধিস্থ করা হয়েছে। শামসুদ্দীন আহমদ শাহ রাজা গণেশের পৌত্র।
৪৮) গোলাম নাসির : ৮৩৯ হিজরী (১৪৩৫-৩৬ খ্রীঃ)।
সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান মুহাম্মদ শাহ-১৪৩৫-১৪৪৬ খ্রীঃ (৮৩৮-৮৪৯ হিঃ)
আহমদ শাহর হত্যার পর নাসির খান তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাদীখানকে হত্যা করে পাণ্ডুয়ার রাজসিংহাসনে আরোহণ পূর্বক রাজকীয় হুকুমনামা জারি করতে থাকেন। প্রভুহন্তা ক্রীতদাস নাসীর খান যখন তাঁর কলুষিত পাদস্পর্শে রাজসিংহাসন কলঙ্কিত করেন তখন নগরের অভিজাত শ্রেণী, আমীর ওমরাহ এবং আহমদ শাহর প্রভুভক্ত সৈন্যগণ সেই দিনেই বেইমান নাসিরখানের রক্তে রাজসিংহাসনের কলঙ্ককালিমা ধৌত করেন।
