বাংলায় সুলতানী আমল ও সমকালীন দিল্লীর সুলতান বাংলায় খিলজী শাসন

বাংলায় সুলতানী আমল ও সমকালীন দিল্লীর সুলতান
বাংলায় খিলজী শাসন

১। ইখতিয়ারউদ্দীন মহম্মদ বখতিয়ার খিলজী : ৬০০ হিঃ/১২০৩-৪ খ্রীঃ (নদীয়া বিজয়)—৬০২ হিঃ (১২০৬ খ্রীঃ)

সমকালীন দিল্লীর শাসক—

সুলতান মঈজুদ্দীন মোহাম্মদ বিন সাম (মোহাম্মদ ঘুরী)

দিল্লী বিজয় (১১৯২ খ্রীঃ)

সুলতান উপাধি প্রাপ্তি (১২০২ খ্রীঃ)

মৃত্যুবরণ-১২০৬ খ্রী/৬০২ হিঃ

রাজ-প্রতিনিধি—কুতুবউদ্দীন আইবক।

বখতিয়ার খিলজী বঙ্গে মুসলিম যুগের সূচনা করেন। তত্ত্বগতভাবে বলতে গেলে তিনি ছিলেন মঈজুদ্দীন মোহাম্মদ বিন সামের (মোহাম্মদ ঘুরী) তদানীন্তন রাজপ্রতিনিধি কুতুবউদ্দীন আইবকের অধীনস্থ একজন সামান্য রাজকর্মী। সামান্য অবস্থা থেকে নিজ ভুজবলে নওদিয়াহ জয় করার পর গৌড় (লক্ষ্মণাবতী) অধিকার করে তথায় বিজিত বাংলার রাজধানী স্থাপন পূর্বক মঈজুদ্দীন মোহাম্মদ বিন সামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে ১৯ শে রমজান ৬০১ হিজরী (১২০৫খ্রীঃ) ‘গৌড় বিজয়ে’ মোহরাঙ্কিত স্মারক স্বর্ণমুদ্রা মুদ্রণ করেন। মুদ্রাটির প্রথম পিঠে অস্ত্র হাতে অশ্বারোহীর চিত্র বৃত্তের মধ্যে অঙ্কিত আছে। বৃত্তের চারিদিকে আরবী অক্ষরে ‘ফিমুন্তাসাফ রমজান সন আদি ওয়াসাতমায়রা’ এবং নাগরী অক্ষরে ‘গৌড় বিজয়ে’ উৎকীর্ণ আছে। মুদ্রাটির অন্য পিঠে আরবী অক্ষরে ‘আল সুলতান আল আজম মঈজুদ-দুনিয়া-ওয়া-অলদীন আবু অল মুজাফফর মোহাম্মদ বিন সাম’ উৎকীর্ণ আছে। ‘গৌড় বিজয়ে’ স্মারক মুদ্রাটি বঙ্গে মুসলিম শাসনের প্রথম মুদ্রা। মুদ্রায় তিনি মোহাম্মদ ঘুরীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও দখলিকৃত গৌড়রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন।

বখতিয়ার খিলজী নওদিয়াহ ও গৌড়-লক্ষ্মৌতীতে সেনা-অভিযান করলেও সমগ্র বঙ্গে সেনা অভিযান করতে পারেননি। রাজা লক্ষ্মণ সেন ও তাঁর বংশধরগণ দীর্ঘকাল রাজধানী বিক্রমপুরের রাজসিংহাসনে আসীন হয়ে স্বীয়-রাজ্য শাসন করেন। বখতিয়ার খিলজী নৌ-শক্তিতে শক্তিধর লক্ষ্মণ সেনের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানের পরিবর্তে অধিকতর নিরাপদ স্থান দেবকোটে রাজ্য শাসনের কেন্দ্রস্থল বা রাজধানী স্থাপন করে তিব্বত অভিযানে ব্রতী হন। তিব্বত অভিযানে শোচনীয় ব্যর্থতার গ্লানি বহন করে সর্বস্বান্ত বখতিয়ার খিলজী দেবকোটে প্রত্যাবর্তন করেন এবং তথায় শাহাদত বরণ করেন (১২০৬ খ্রীঃ)। কথিত হয় যে তাঁর রাজকর্মী আলি মর্দান কর্তৃক তিনি নিহত হন। দেবকোটে বখতিয়ার খিলজী সমাধিস্থ আছেন।

মিনহাজের মতে মোহাম্মদ ঘুরী ৩রা শাবান ৬০২ হিঃ (১৫ ই মার্চ ১২০৬ খ্রীঃ) তে নিহত হন। তার কিছুদিন পরেই অর্থাৎ ১২০৬ খ্রীস্টাব্দের এপ্রিল-মে-জুন মাসের মধ্যে বখতিয়ার খিলজী আলি মর্দান কর্তৃক নিহত হন। উক্তবর্ষে বিক্রমপুরে লক্ষ্মণ সেন মৃত্যু বরণ করেন।

২। মালিক ইজ-উদ-দীন মোহাম্মদ শিরাণ খিলজী : ১২০৬ খ্রীঃ (৬০২ হিঃ)—১২০৭ খ্রীঃ (৬০৪ হিঃ)

 সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবক

 (মামলুক বা দাস বংশের প্রতিষ্ঠাতা)

 ৬০২ হিঃ (১২০৬ খ্রীঃ)—৬০৭ হিঃ (১২১০খ্রীঃ)

 ৬০২ হিজরী সনের ১৭ই জিলকদ (জুন-১২০৬ খ্রীঃ)

 মঙ্গলবার কুতুবউদ্দীন লাহোরে রাজসিংহাসনে আরোহণ

 করেন।

বখতিয়ার খিলজীর শাহাদত বরণের সময় তাঁর অন্যতম প্রধান অমাত্য শিরাণ খিলজী লাখনোরে ছিলেন। প্রভুর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তিনি দেবকোটে আসেন এবং পরলোকগত নেতার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সম্পাদন ও শোকপালন করেন। দেবকোটে উপস্থিত খিলজী আমীর ও সৈনিকবৃন্দের নেতা নির্বাচিত হয়ে তিনি দেবকোটের রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন। অতঃপর তিনি প্রভুহন্তা আলি মর্দানকে যোগ্য শাস্তি প্রদানের জন্য আলি মর্দানের ইকতা বরসৌল আক্রমণ করে তাঁকে বন্দী করেন।

মোহাম্মদ শিরাণ খিলজী বখতিয়ারের ন্যায় প্রকাশ্যে স্বাধীনতা ঘোষণা না করলেও অভ্যন্তরীণ শাসন বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন। তিনি যোগ্যতার সঙ্গে রাজ্যশাসন করলেও আলী মর্দান কোতোয়াল হাজী বাবা ইস্পাহানীকে বশীভূত করে বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে পলায়ন পূর্বক দিল্লীতে সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবকের শরণাপন্ন হন এবং সুলতানকে লক্ষ্মৌতী রাজ্য আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করেন। সুলতানের নির্দেশে অযোধ্যার শাসক কায়েমাজরুমী লক্ষ্মৌতী রাজ্য আক্রমণ করেন (আনুমানিক জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী-১২০৭ খ্রীঃ)। প্রথমেই বখতিয়ার খিলজীর আমীর গঙ্গতরীর মুকতা হুসামউদ্দীন ইওয়াজ খিলজী (পরে সুলতান গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খিলজী) কায়েমাজ-রুমীর নিকট আত্মসমর্পণ করেন। মোহাম্মদ শিরাণ পলায়ন করেন। কায়েমাজ রুমী হুসামউদ্দীনকে দেবকোটের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু তাঁর প্রত্যাবর্তনের সংবাদে মোহাম্মদ শিরান দেবকোট আক্রমণ করে হুসামউদ্দীনকে দেবকোট থেকে বিতাড়িত করেন। পথিমধ্যে এই সংবাদ পেয়ে কায়েমাজ-রুমী পুনরায় সসৈন্যে দেবকোটে ফিরে এসে যুদ্ধে মোহাম্মদ শিরাণকে পারজিত করেন এবং দেবকোট থেকে বিতাড়িত করেন। পরবর্তীকালে মাকসিদাহ ও সন্তোষ অঞ্চলে খিলজীদের মধ্যে আত্মকলহে মোহাম্মদ শিরাণ খিলজী নিহত হন। আত্রেয়ী নদীর তীরে অবস্থিত সন্তোষে মোহাম্মদ শিরাণ খিলজী সমাহিত আছেন। মালিক হুসামউদ্দীন দিল্লী সুলতানের প্রতিনিধি হিসাবে দেবকোটে শাসনকার্য পরিচালনা করেন।

৩। মালিক হুসাম-উদ-দীন ইওজ খিলজী বিন হোসেন : ১২০৭ খ্রীঃ (৬০৪ হিঃ)—১২০৯ খ্রীঃ (৬০৬ হিঃ)

 সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবক ৬০২ হিঃ

 (১২০৬ খ্রীঃ)—৬০৭ হিঃ (১২১০খ্রীঃ)

হুসামুদ্দীন দেবকোটের রাজসিংহাসনে প্রায় দুই বৎসর শাসক হিসাবে বহাল থাকেন। দিল্লীর সম্রাট কুতুবউদ্দীন আইবক কর্তৃক নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে লক্ষ্মৌতী রাজ্যের শাসক হিসাবে আলী মর্দান বঙ্গদেশে আগমন করলে হুসামুদ্দীন প্রত্যুদগমনার্থ কৌশিকী নদী পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং আলী মর্দানের অনুকূলে শাসনভার ত্যাগ করেন। খিলজী আমীরদের মধ্যে গিয়াসুদ্দীন সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞ এবং কূটনীতিবিদ ছিলেন। তিনি তাঁর বিরোধী নেতৃবর্গের প্রতি সুব্যবহার করতেন এবং সুযোগের অপেক্ষাতে থাকতেন। দিল্লী সম্রাটের বিরুদ্ধাচরণ না করে আলি মর্দানকে সিংহাসন ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।

আলি মর্দান সম্বন্ধে পূর্বে উল্লেখ করেছি। বখতিয়ার খিলজীর হত্যাকারী আলি মর্দান মোহাম্মদ শিরাণ খিলজী কর্তৃক বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে পলায়ন পূর্বক দিল্লী সম্রাট কুতুবউদ্দীনের আশ্রয় গ্রহণ করেন (১২০৬ খ্রীঃ)। ৬০৫ হিজরী (১২০৮ খ্রীঃ) তে আলি মর্দান দিল্লীর সুলতান কুতুবউদ্দীনের গজনীতে সেনা অভিযানের সঙ্গী হন। কুতবউদ্দীন গজনী অধিকার করে তথায় চল্লিশ দিন রাজত্ব করার পর গজনীরাজ তাজউদ্দীন ইলদুজ কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে গজনী ত্যাগ করেন, কিন্তু সমর সঙ্গী আলি মর্দান ধৃত হন। এতে আলি মর্দানের বিশেষ ক্ষতি হয়নি, প্রভু পরিবর্তন হয় মাত্র। তিনি গজনী রাজ তাজউদ্দীনের সঙ্গে অচিরে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেন। একদা শিকার করতে গিয়ে সুলতানকে হত্যা করে তাঁর উজীর সালার জাফর নামক এক অমাত্যকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করার প্রস্তাব দিলে বুদ্ধিমান অমাত্য সালার জাফর আলি মর্দানকে দুটি অশ্ব দিয়ে গজনী রাজ্যসীমা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন। দিল্লীর সম্রাট কুতুবউদ্দীন আইবক আলি মর্দানকে লাহোরে সাদরে গ্রহণ করে বন্ধুত্বের পুরস্কার স্বরূপ তাঁকে লক্ষ্মৌতী রাজ্যের শাসক নিযুক্ত করে বঙ্গে প্রেরণ করেন।

৪। সুলতান আলি মর্দান খিলজী : ১২০৯ খ্রী (৬০৬ হিঃ)—১২১৩ খ্রীঃ (৬১০হিঃ) প্রথমে শাসক পরে সুলতান

 সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবক—৬০২ হিঃ (১২০৬ খ্রীঃ)-৬০৭ হিঃ

 (১২১০খ্রীঃ) চেগোয়াল খেলতে গিয়ে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে

 ভূপাতিত হয়ে ৬০৭ হিজরীতে মৃত্যু।

 সুলতান আরাম শাহ (কুতবউদ্দীন আইবকের পুত্র)

 ৬০৭ হিঃ (১২১০ খ্রীঃ)।

আলি মর্দান খিলজী দেবকোটের রাজসিংহাসনে আরোহণ করে শাসক হিসাবে লক্ষ্মৌতী রাজ্য শাসন করার অল্পদিন পরেই দিল্লীর সম্রাট কুতুবউদ্দীনের লাহোরে মৃত্যুঘটিত কারণে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে রাজকীয় উপাধি গ্রহণ পূর্বক স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজ নামে মুদ্রা প্রচলন ও লিপি উৎকীর্ণ করেন। তিনি দিল্লীর আধিপত্য পরিত্যাগ করে ৬০৭ হিজরী (১২১০ খ্রীঃ) তে স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেন। এই স্বর্ণমুদ্রা বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসাবে প্রচলিত প্রথম স্বর্ণমুদ্রা ।

সুলতান আলী মর্দান খিলজীর রাজত্বকালে পারস্য ভাষায় উৎকীর্ণ একটি লিপি (Bridge inscription) গৌড় নগরের কুড়ি মাইল দূরে সুলতানগঞ্জে আবিষ্কৃত হয়েছে।

ইতঃপূর্বে আলি মর্দানের পরবর্তী সুলতান গিয়াসউদ্দীন খিলজীর রাজত্বকালে ৬১৮ হিজরীর ৭ই জামাদি-উস-সানি (২৯শে জুলাই ১২২১ খ্রীঃ) তারিখে উৎকীর্ণ, বীরভূম জেলার বোলপুর অন্তর্গত সিয়ান গ্রামে প্রাপ্ত যুবরাজ আলী শের কর্তৃক খানকাহ নির্মাণের লিপিটিকে বাংলায় মুসলমান শাসকদের প্রদত্ত লিপির মধ্যে প্রথম লিপি বলা হত, কিন্তু সুলতানগঞ্জে Bridge inscription টি প্রাপ্তির পরে বলা যায় যে—বঙ্গে মুসলিম যুগের আবিষ্কৃত লিপির মধ্যে সুলতান আলা-উদ-দীন আলিমর্দানের রাজত্বকালে প্রদত্ত লিপিটি মুসলিমবঙ্গের প্রথম লিপি। *১

সুলতান আলি মর্দান খিলজীর ৬১০ হিঃ (১২১৩ খ্রীঃ) উৎকীর্ণ একটি মুদ্রার উপর আলোকপাত করতে গিয়ে G.S.Fard আলি মর্দানের রাজকীয় উপাধি আলা-উদ-দীন রূপে ব্যক্ত করেছেন। ‘তবকাত নাশিরী’তে তাঁর উপাধি ‘আলা-উদ্-দীন’ দৃষ্ট হয় (তবকত ২০)। তাঁর Bridge inscription-এ ইউসুক-সিদিক সাহেব অনুরূপ উপাধি উল্লেখ করেছেন।

সম্প্রতি সৈয়দ এজাজ হোসেন তাঁর গ্রন্থে আলি মর্দান খিলজীর ১টি স্বর্ণমুদ্রা ও ৩টি রৌপ্যমুদ্রার উপর আলোকপাত করে আলি মর্দানের রাজকীয় উপাধি রকন-উদ-দীন দাবি করেছেন। *২

আলি মর্দান খিলজী মুসলিমবঙ্গের প্রথম স্বাধীন সুলতান। স্বাধীনতা ঘোষণার পরে তিনি অত্যাচারী ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। আমীরগণ অতীষ্ঠ হয়ে সুলতান আলি মর্দানের নেতৃত্ব পরিহার করে হুসামুদ্দীনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং গোপনে সুলতান আলি মর্দানকে হত্যা করেন।

৫। পুনরায় হুসামউদ্দীন বিন হোসেন (সুলতান গিয়াসউদ্দীন ইউয়াজ খিলজী) ৬১০ হিঃ (১২১৩ খ্রীঃ)—৬২৪ হিঃ (১২২৭ খ্রীঃ)

 সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিস (কুতুবউদ্দীন আইবকের জামাতা)—

 ৬০৭ হিঃ (১২১০-খ্রীঃ)—৬৩৩ হিঃ (১২৩৬ খ্রীঃ)

অতঃপর হুসামউদ্দীন রাজসিংহাসনের অধিকার পুনরায় হস্তগত করে রাজ্যের রাজধানী দেবকোট থেকে লক্ষ্মৌতীতে স্থানান্তরিত করেন। তিনি স্থল-বাহিনীর পাশাপাশি শক্তিশালী নৌবহর গঠন করে রাজধানী লক্ষ্মৌতীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করেন এবং পূর্ববঙ্গ জয়ের সংকল্প করেন। প্রজাহিতৈষী নরপতি নাগরিক জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক নির্মাণকার্য (Amenities) যথা—সড়ক, মাদ্রাসা, খানকাহ, সুরম্য অট্টালিকা ইত্যাদি নির্মাণ করেন—যা পরবর্তীকালে লক্ষ্মৌতীতে আগত ঐতিহাসিক মিনহাজ কর্তৃক দৃষ্ট হয় এবং উক্ত হয়—ইউয়াজ খিলজী মনে প্রাণে একজন বাদশাহ ছিলেন। স্বাধীনতাকামী হুসামউদ্দীন ৬১৬ হিজরী সনে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ‘গিয়াসউদ্দীন ইউয়াজ খিলজী’ নাম ধারণ পূর্বক স্বনামে মুদ্রা প্রবর্তন করেন (৬১৬, ৬১৭, ৬১৯-২১ হিঃ)। পূর্বে উল্লেখ করেছি তাঁর রাজত্বকালে ৬১৮ হিঃ (১২২১ খ্রীঃ) তে উৎকীর্ণ খানকাহর শিলালিপি বীরভূমে আবিষ্কৃত হয়েছে।

গিয়াসউদ্দীন খিলজীর স্বাধীনতা ঘোষণায় দিল্লীর সুলতান ইলতুতমিসের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়ে। দিল্লীর সুলতান করদ রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য বঙ্গ অভিযান করে সুলতান গিয়াসউদ্দীন খিলজীকে পরাজিত করে কর দিতে বাধ্য করেন। গিয়াসউদ্দীন আনুগত্যের নিদর্শন স্বরূপ উপঢৌকন প্রদান পূর্বক সুলতান ইলতুতমিসের নামে খুদবা পাঠ ও তাঁর নামাঙ্কিত মুদ্রা ৬২২ হিজরী সনে (১২২৫ খ্রীঃ) প্রচলন করেন। দিল্লীর সুলতান দিল্লী প্রত্যাবর্তন করলে গিয়াসউদ্দিন ইউয়াজ খিলজী পুনরায় বিদ্রোহী হন। ৬২৪ হিজরী (১২২৭খ্রীঃ) তে সুলতান ইলতুতমিসের পুত্র নাসিরুদ্দীন মাহমুদ লক্ষ্মণাবতী আক্রমণ করে গিয়াসউদ্দীন ইউয়াজ খিলজীকে পরাজিত ও নিহত করেন। বাংলার স্বাধীনতার জন্য স্বাধীনচেতা গিয়াসউদ্দীনকে জীবন দিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে হল। অতঃপর মুসলিম-বঙ্গ পুনরায় দিল্লীর অধীনস্থ প্রদেশে পরিণত হল।

.

*১ A bridge inscription from Sultanganj from the reign of ‘Ala Din Ali Mordan Khalji (The first sultan of Bengal, C60. the first Islamic inscription of Bengal) – Mahammad Yusuf Siddiq University of Sharjha.

*২ The Bengal Sultanate, Politics, Economy and Coins—Syed Ejaz Hussain

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *