গৌড়াধিপ শশাঙ্ক

গৌড়াধিপ শশাঙ্ক (পৃথিব্যাং পরমদৈবত শ্রীপরমভট্টারক
মহারাজাধিরাজ-পরমমাহেশ্বর শ্রীশশাঙ্কদেব)

শশাঙ্ক গৌড়ের প্রথম সার্বভৌম অধীশ্বর, যাঁর অধিকার বাংলার ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। বাণভট্ট প্রণীত ‘হর্ষচরিত’, হিউ-এন-সাঙের (Yuan Chwang) ভ্রমণবৃত্তান্ত, আবিষ্কৃত তাম্রশাসন, মুদ্রা, সীলের ছাঁচে উৎকীর্ণ লেখ ও প্রাচীন গ্রন্থ থেকে আমরা শশাঙ্ক নামক গৌড়াধিপের অস্তিত্ব অবগত হই। রোটাসগড়ের পর্বতদুর্গে প্রাপ্ত সীলের ছাঁচে উৎকীর্ণ ‘শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক’ লেখ থেকে মনে হয় যে, তিনি কোন সার্বভৌম রাজার অধীনস্থ শাসক হিসাবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। মনে হয় তিনি কনৌজ অধিপতি ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধিধারী মৌখরীরাজদের অনুগত মালবরাজ মহাসেনগুপ্তর অধীনস্থ সামন্ত ছিলেন।

৬০৬ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে কোন সময় শশাঙ্ক স্বাধীনতা ঘোষণা করে গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং বাংলার রাজাদের মধ্যে প্রথম সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেন। মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তঃপাতী কর্ণসুবর্ণ ছিল শশাঙ্কের রাজ্যের রাজধানী। সম্প্রতি প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যে এই তথ্য সংশয়াতীত বলে গণ্য হয়েছে। হিউ-এন-সাঙ (Yuan Chwang) কর্ণসুবর্ণকে কী-লো-না-সু-ফা-লা-না বলেছেন।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় শশাঙ্ক শৈব (পরম মাহেশ্বর) ছিলেন। তাঁর প্রচলিত স্বর্ণ মুদ্রায় বৃষভবাহন মহাদেবের মূর্তি দেখা যায়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হিউ-এন-সাঙ এবং বাণভট্ট শশাঙ্ককে বৌদ্ধবিদ্বেষী বলেছেন (চিত্র নং-১)। কিন্তু তাঁদের এই বক্তব্যে কিছু স্ব-বিরোধিতা আছে। কারণ শশাঙ্কের মৃত্যুর অব্যবহিত কাল পরে পরিব্রাজক হিউ-এন-সাঙ শশাঙ্কের রাজ্যে প্রচুর পরিমাণ বৌদ্ধ বিহার দেখেছিলেন। সম্প্রতিকালে কর্ণসুবর্ণে খননকার্যে হিউ-এন-সাঙ বর্ণিত রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের (লো-টো-ওয়েই-চিহ) অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। রাজনৈতিক কারণ ব্যতিরেকে ব্যক্তিগত জীবনে শশাঙ্ক শিবের উপাসক হলেও তিনি পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন।

পূর্বভারতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতার অধিকারী বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা শশাঙ্কের রাজ্য গৌড়, মগধ, দণ্ডভুক্তি, উৎকল ও কঙ্গোদে বিস্তৃত ছিল। ‘আর্য মঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ থেকে জানা যায় যে গৌড়াধিপ শশাঙ্ক তাঁর অধিকার বারাণসী পর্যন্ত বিস্তার করেন। তাঁর সমসাময়িক রাজা কনৌজে হর্ষবর্ধন এবং কামরূপে ভাস্কর বর্মণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। যশোরে প্রাপ্ত শশাঙ্কের কিছু মুদ্রায় তাঁর ‘নরেন্দ্রগুপ্ত’ উপাধি দৃষ্ট হয়। হিউ-এন-সাঙের পুণ্ড্রবর্ধনে আগমনের (৬৩৭-৬৩৮ খ্রীঃ) কিঞ্চিৎ পূর্বে কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্ক নরেন্দ্রগুপ্ত নিজ রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। পরিব্রাজক হিউ-এন-সাঙের মতে শশাঙ্কের মৃত্যুকাল ৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে। তাঁর-মৃত্যুর পরে তাঁর উত্তরসূরী মানবদেব শশাঙ্কের রাজ্য রক্ষা করতে পারেন নি।

শশাঙ্কের লেখমালা—(১) রোটাসগড়ে (বিহার) দুর্গপ্রাকারে উৎকীর্ণ মহাসামন্ত শশাঙ্কদেবের লাঞ্ছন-মুদ্রার ছাঁচ, (২) মেদিনীপুর তাম্রশাসন (রাজ্যাঙ্ক ৮), মেদিনীপুর তাম্রশাসন (রাজ্যাঙ্ক-১৯), (৩) এগরা তাম্রশাসন (তারিখহীন), (৪) গঞ্জাম (উড়িষ্যা) তাম্রশাসন (গুপ্ত সংবত ৩০০ বা ৬১৯ খ্রীঃ)।

মাৎস্যন্যায়

শশাঙ্কোত্তর কালে প্রায় শতবর্ষ ব্যাপী মাৎস্যন্যায়ের যুগ প্রতিষ্ঠিত ছিল। বৌদ্ধগ্রন্থ ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ থেকে জানা যায় তৎকালে গৌড়ের রাষ্ট্রব্যবস্থা পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কলহে দীর্ণ হয়েছিল এবং গৃহ যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। এই সময় নৃপকুলের স্থায়িত্বের অভাব এবং অবিরাম বৈদেশিক আক্রমণে গৌড় ও বঙ্গের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা ও অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল। এই অরাজকতা-ই পাল তাম্রশাসনে মাৎস্যন্যায় বলে বিবেচিত হয়েছে। মাৎস্যন্যায়ের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’, ‘মনুসংহিতা’ (সপ্তম অধ্যায়), রঘুনাথ বর্মার ‘লৌকিক ন্যায় সংগ্রহ’ প্রভৃতি গ্রন্থে উল্লেখ আছে। মাৎস্যন্যায়ের অবস্থা এই রকম যে—উপযুক্ত রাজশক্তির অভাবে প্রবল দুর্বলকে গ্রাস করে বা মাছেদের রাজত্ব সৃষ্টি করে। তিব্বতীয় লেখক লামা তারনাথ বাংলা সম্বন্ধে বলেছেন যে তৎকালে বাংলাদেশে কোন রাজা না থাকায় প্রত্যেক ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, সামন্ত নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন। এই বর্ণনা থেকে বাংলায় ‘মাৎস্যন্যায়’ বা অরাজক অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়।

গৌড়দুর্গের নিকটবর্তী খালিমপুরে প্রাপ্ত দ্বিতীয় পালরাজা ধর্মপালদেবের ৩২ রাজবর্ষে প্রদত্ত তাম্রশাসনে গোপালের রাজপদ লাভের বিবরণ উল্লেখ আছে। যথা—

 মাৎস্যন্যায়মপোহিতুং প্রকৃতিভির্লক্ষ্ম্যাঃ করং গ্রাহিতঃ
 শ্রীগোপাল ইতি ক্ষিতীশ-শিরসাং চূড়ামণিস্তৎসুতঃ।
 যস্যানুক্রিয়তে সনাতনযশোরাশির্দিশামাশরে
 শ্বেতিন্না যদি পৌর্ণমাসীরজনীজ্যোৎস্নাতিভারশ্রিয়া।।৪।।

অর্থাৎ মাৎস্যন্যায় দূর করার অভিপ্রায়ে প্রকৃতিপুঞ্জ যাঁকে রাজলক্ষ্মীর কর গ্রহণ করিয়ে (রাজা নির্বাচিত করে) দিয়েছিলেন, পূর্ণিমা-রজনীর জ্যোৎস্না-রাশির অতিমাত্র ধবলতাই যাঁর স্থায়ী যশোরাশির অনুকরণ করতে পারত, নরপাল-কুলচূড়ামণি গোপাল নামক সেই প্রসিদ্ধ রাজা বপ্যট হতে জন্মগ্রহণ করে ছিলেন। আলোচ্য তাম্রশাসন সাক্ষ্য দেয় শ্রীগোপাল পাল যুগের প্রথম রাজা। খালিমপুর তাম্রশাসনে জানা যায়—মাৎস্যন্যায় দুর করার অভিপ্রায়ে ‘প্রকৃতি’ গোপালকে রাজা করেছিলেন। এই উক্তির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেকে মনে করেন ‘প্রকৃতি’ অর্থে প্রজাবৃন্দ কর্তৃক গোপাল রাজা নির্বাচিত হন, আবার অনেকে মনে করেন ‘প্রকৃতি’ অর্থে রাষ্ট্রের অমাত্যবর্গ কর্তৃক গোপাল রাজা নির্বাচিত হন। যেমন কহ্লনের রাজতরঙ্গিণীতে সাতজন রাজকর্মী, যাঁদের প্রকৃতি বলে উল্লেখ আছে, তাঁরা জৌলাকাকে কাশ্মীরের রাজা করেছিলেন।

তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে একথা বলা যেতে পারে যে—তৎকালে নিপীড়িত মানুষের পক্ষ থেকে সমাজের কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জরুরীকালীন ব্যবস্থা হিসাবে গোপালকে নেতা-নির্বাচন করেন। পরে রণকুশল ব্যপট-তনয় সুযোদ্ধা গোপাল স্বীয় প্রতিভা ও কুশলতার বলে দেশে শান্তি ও শৃংখলা ফিরিয়ে সকলের আস্থাভাজন হয়েছিলেন। এইভাবে খ্রীস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলার ইতিহাসে ঘটেছিল এক ঐতিহাসিক বিপ্লব।

এই ঐতিহাসিক তাম্রশাসনটি মালদহ (অবিভক্ত) জেলার ভোলাহাট থানার খালিমপুর গ্রামে হল কর্ষণের সময় মাটির তলা থেকে পাওয়া যায়। ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে নভেম্বর মাসে ঐ গ্রামের মেরী নাম্নী এক কৃষকপত্নীর নিকট থেকে তদানীন্তন মালদহ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উমেশ চন্দ্র বটব্যাল তাম্রশাসনটি সংগ্রহ করেন। হরিদাস পালিত মহাশয় তাম্রপট্টটির বিষয়ে অবগত করান। রজনীকান্ত চক্রবর্তী মহাশয় তাম্রশাসনের পাঠোদ্ধার করেন। তাম্রশাসনটি এশিয়াটিক সোসাইটির হস্তে অর্পিত হয়। তাম্রশাসনটির দৈর্ঘ ও প্রস্থ যথাক্রমে inline.jpg পুরু, এটির সম্মুখ ভাগে তেত্রিশ ও পশ্চাদভাগে ঊনত্রিশটি পঙক্তি আছে। বর্তমানে তাম্রশাসনটি কলকাতা যাদুঘরে রক্ষিত আছে।

তাম্রশাসনটির প্রাপ্তি সম্বন্ধে M.O. CARTER তাঁর গ্রন্থে (১৯৩৮) বলেছেন—It was found in 1893 at khalimpur (now Known as khale Alampur, a village laying about six miles east of Gour on the apposite side of Bhattia beel.) by Mr. Batabayal, then District Magistrate of Malda..” খালিমপুর বা খালে আলমপুরের পার্শ্ব দিয়ে এক বিশাল খালের অস্তিত্ব অদ্যাবধি বিদ্যমান আছে। মানকি থেকে পাটমোন্না হয়ে খালিমপুর গ্রামের উত্তর দিক দিয়ে খালটি একদা প্রবাহিত গঙ্গার পরিত্যক্ত নদী-খাত ছাটিয়া-ভাটিয়ার (বিল) সাথে যুক্ত দেখা যায়। স্থানটির পার্শ্ব দিয়ে বিশাল খাল থাকার কারণে এবং মালদহ (অবিভক্ত) জেলার অন্য আলমপুরের সঙ্গে পার্থক্য নিরূপণের জন্য এই আলমপুর ‘খালে-আলমপুর’ (খালিমপুর) নামে পরিচিত হয়। এবং অত্র স্থানে প্রাপ্ত ধর্মপালদেবের ৩২ রাজ্যবর্ষে প্রদত্ত তাম্রশাসনটি ‘খালিমপুর তাম্রশাসন’ রূপে পরিচিত হয়। দেশ ভাগের পর বর্ত্তমান বাংলাদেশের চাঁপাই-নবাবগঞ্জ জেলান্তঃপাতী ভোলাহাট উপজেলার ২নং গোহালবাড়ী ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ড গোহালবাড়ীর দক্ষিণপূর্বে খালে আলমপুর মৌজা-J.L. No. 22, এই তাম্রশাসনের প্রাপ্তিস্থান। খালিমপুরের দক্ষিণে দেড় কি. মি. দূরত্বে তাম্রশাসনে বর্ণিত শুভস্থলীর নুন্ননারায়ণের মন্দিরের অবস্থান ছিল বলে প্রতীতি হয়। স্থানটি বর্তমান কালের জাগলবাড়ী মৌজা J.L. No. 26 এ অবস্থিত। বহুপূর্বকাল থেকে স্থানটি যোগীবারি > জঙ্গলবাড়ী> জগদ্দলবাড়ী হিসাবে পরিচিত ছিল। জাগলবাড়ীতে প্রাপ্ত উপকরণ অতীত যুগের মন্দিরের সাক্ষ্য প্রদান করে।

পালরাজা ধর্মপালদেব পাটলিপুত্র জয়স্কন্ধাবার থেকে তাঁর রাজত্বের ৩২তম বর্ষে যুবরাজ ত্রিভূবন পালের অনুরোধে মহাসামন্তাধিপতি নারায়ণ বর্মাকে শুভস্থলীতে নারায়ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা ও লাটদেশীয় ব্রাহ্মণদের সেবার্থে চারটি গ্রাম এবং একটি হাট ও পাড়া দান করেন। এই ভূমিদান বিষয়ক তাম্রশাসনে বুদ্ধের দশবলকে স্মরণ করে প্রসঙ্গক্রমে পালবংশের অভ্যুদয় কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

ধর্ম্মপালদেবের ৩২ রাজ্যবর্ষে প্রদত্ত তাম্রশাসনের (খালিমপুর তাম্রশাসন) প্রাপ্তিস্থান-খালে আলমপুর।

ভোলাহাট উপজেলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *