শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহর বংশ এবং তুঘলক শাসন

শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহর বংশ এবং তুঘলক শাসন

২৫) সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ :—৭০০ হিঃ (১৩০০ খ্রীঃ)-৭২২ হিঃ (১৩২২ খ্রীঃ)

সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান আলাউদ্দীন মুহাম্মদ শাহ খিলজী—৬৯৫হিঃ (১২৯৬ খ্রীঃ)-৭১৬ হিঃ (১৩১৬ খ্রীঃ)। জালালুদ্দীন ফিরোজ শাহর ভ্রাতুষ্পুত্র

 ৬ই শাওয়াল ৭১৬ হিজরী (ডিসেম্বর ১৩১৬ খ্রীঃ) তারিখে মৃত্যুবরণ।

• সুলতান শিয়াবউদ্দীন উমর শাহ খিলজী—৭১৬ হিঃ (১৩১৬ খ্রীঃ)-৭১৭ হিঃ (১৩১৭ খ্রীঃ) মুহাম্মদের কনিষ্ঠ পুত্র

 ৭ই শাওয়াল ৭১৬ (ডিসেম্বর ১৩১৬) সিংহাসনে আরোহণ এবং ২৩শে মহরম ৭১৭ হিজরী (এপ্রিল ১৩১৭ খ্রীঃ) তারিখে কুতুবউদ্দীন মুবারক শাহ কর্তৃক নিহত।

• সুলতান কুতুবউদ্দীন মুবারক শাহ খিলজী—৭১৭ হিঃ (১৩১৭ খ্রীঃ)-৭২০ হিঃ (১৩২০ খ্রীঃ)—মুহাম্মদের পুত্র এবং উমর শাহর ভ্রাতা

 ২৪ শে মহরম ৭১৭ হিঃ (এপ্রিল ১৩১৭) সিংহাসনে আরোহণ এবং ৭২০ হিঃ (১৩২০ খ্রীঃ) খসরু খানের যড়যন্ত্রে নিহত।

• সুলতান নাসিরুদ্দীন খসরু শাহ—৭২০ হিঃ (১৩২০ খ্রীঃ)

 (জবরদখলকারী)

 মোবারকশাহর রাজকর্মী খসরু শাহ—গিয়াসউদ্দীন তুঘলক কর্তৃক পরাজিত ও নিহত।

• সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক শাহ গাজী মালিক—৭২০ হিঃ (১৩২০)-৭২৫ হিঃ (১৩২৫ খ্রীঃ) ভারতবর্ষে তুঘলক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।

দিল্লীর বলবনী রাজবংশ সম্ভূত বাংলার সুলতান রুকনুদ্দীন কাইকাউসের পরে শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ বাংলার স্বাধীন সুলতান রূপে সিংহাসনে আরোহণ করেন। শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ তাঁর উৎকীর্ণ মুদ্রা ও লিপিতে নিজেকে সুলতান বলে দাবি করেছেন, কিন্তু নিজেকে সুলতান-পুত্র বলে দাবি করেন নি। তিনি সম্ভবতঃ তাঁর পূর্বতন সুলতান কাইকাউসের অধীনস্থ বিহারের গভর্ণর ইখতিয়ারউদ্দীন ফিরোজ ইতগীন (মুঙ্গের লিপি), যিনি সুলতান কাইকাউসের পরে শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ নাম গ্রহণ পূর্বক ১৩০০ খ্রীস্টাব্দে (৭০০ হিঃ) স্বাধীন সুলতান হন।

ইতঃপূর্বে ইতিহাসবিদগণ সুলতান ফিরোজশাহের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন ৭০১ হিজরী, কিন্তু লক্ষ্মৌতী টাঁকশাল থেকে প্রকাশিত সম্প্রতি তাঁর ৭০০ হিজরীর রৌপ্য মুদ্রা প্রকাশিত হলে পূর্বেকার ধারণা ভ্রান্ত প্রতিপন্ন হয়।

ফিরোজ শাহ সুলতান হয়ে তাঁর রাজ্যের রাজধানী লক্ষ্মৌতী থেকে পাণ্ডুয়াতে*১ স্থানান্তরিত করেন। তৎকালে পাণ্ডুয়া (পুণ্ড্রনগর) একটি বড় হিন্দুনগর ছিল। ফিরোজ শাহ পাণ্ডুয়ার নাম ফিরোজাবাদ রাখেন।

সুলতান ফিরোজশাহর ছয় পুত্র। তিনি ৭২২ হিজরী (১৩২২ খ্রীঃ) তে পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে এক পুত্র শিয়াউদ্দীন বুগদা শাহর সুলতান হবার বাসনাকে চুর্ণ করে অপর এক পুত্র গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ সুলতান হন।

২৬) সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ : ১৩২২ খ্রীঃ (৭২২ হিঃ)-১৩২৪ খ্রীঃ (৭২৪ হিঃ)

 সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—

 • সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক ১৩২০ খ্রীঃ (৭২০হিঃ)-

 ১৩২৫ খ্রীঃ (৭২৫ হিঃ)

ফিরোজ শাহর পুত্র গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ লক্ষ্মৌতীর সিংহাসনে আরোহণ করে ৭২২ হিজরীতে উৎকীর্ণ লিপিতে নিজেকে সুলতান বিন সুলতান ঘোষণা করেন। তিনি পিতার শাসনকালে সম্ভবতঃ অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে ৭০১-৭১৩, ৭১৭, ৭২০-৭২২ হিজরীতে এবং পিতার মৃত্যুর পর ৭২৩ হিজরীতে নিজ নামে মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। সম্প্রতি তাঁর সুলতান রূপে ৭২২ হিঃ (১৩২২ খ্রীঃ) সনে উৎকীর্ণ পবিত্র স্থাপত্যের নির্মাণ লিপি উজির বেলডাঙ্গা (রাজশাহী) থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে এবং বরেন্দ্র যাদুঘরে রক্ষিত আছে।

সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহর ভ্রাতা নাসিরুদ্দীন ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দিল্লীর সুলতান বঙ্গ অভিযান করেন (৭২৪ হিঃ/জানুয়ারী ১৩২৪ খ্রীঃ) যুদ্ধে দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বঙ্গ সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহকে বন্দী করেন। পুরস্কার স্বরূপ নাসিরুদ্দীন ইব্রাহিমকে লক্ষ্মৌতীর শাসনভার প্রদান করে এবং তাঁতার খাঁ (বাহরম খাঁ) কে সপ্তগ্রাম ও সুবর্ণগ্রামের শাসক নিযুক্ত করে দিল্লীর সুলতান গিয়াসুদ্দীন তুঘলক বন্দী সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহর গলদেশে রজ্জু-বন্ধন পূর্বক দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেন। প্রত্যাবর্তনের পথে আফগানপুরে সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলকের মৃত্যু হয় (১৩২৫ খ্রীঃ/৭২৫ হিঃ)। তাঁর পুত্র মোহাম্মদ দিল্লীর রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হয়ে বাংলার শাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক রদ বদল করেন।

অতঃপর তুঘলক বংশের অভ্যুদয়ে বাংলা তিনটি শাসন বিভাগে বিভক্ত হয়। যথা-(১) লক্ষ্মৌতী (২) সপ্তগ্রাম (৩) সুবর্ণগ্রাম।

লক্ষ্মৌতী শাসন বিভাগ

২৭) নাসিরুদ্দীন ইব্রাহিম :  ১৩২৪ খ্রীঃ (৭২৪ হিঃ) ১৩২৬ খ্রীঃ (৭২৬ হিঃ) (গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহর ভ্রাতা এবং শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহর পুত্র)

সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান

• গিয়াসউদ্দীন তুঘলক ১৩২০ খ্রীঃ (৭২০ হিঃ)—১৩২৫ খ্রীঃ (৭২৫ হিঃ)

• মহম্মদ বিন তুঘলক ১৩২৫ খ্রীঃ (৭২৫ হিঃ)—১৩৫১ খ্রীঃ (৭৫২ হিঃ) (তুঘলকের পুত্র)

দিল্লী সম্রাট গিয়াসউদ্দীন তুঘলক নিযুক্ত লক্ষ্মৌতী শাসন বিভাগের গভর্ণর নাসিরুদ্দীন ইব্রাহিম পরবর্তী দিল্লী সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজ্যাভিষেকের পরেও লক্ষ্মৌতী থেকে ক্ষমতাচ্যুত হন নি। তিনি আনুগত্য প্রকাশ করে দিল্লী সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক এবং পরবর্তী সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের নামের সঙ্গে নিজ নাম যুক্ত করে মুদ্রা প্রকাশ করেন। সুলতান পুত্র সুলতান নাসিরুদ্দীন ইব্রাহিম মুদ্রায় নিজেকে ‘সুলতান-আল-মুয়াজ্জম’ এবং দিল্লীশ্বরকে ‘সুলতান-আল-আজম’ উপাধি রূপে অভিহিত করেন। তিনি দিল্লীর প্রতি অনুগত থাকলেও মহম্মদ বিন তুঘলক স্বল্পদিন পরে তাঁকে দিল্লীতে আহ্বান করে সুকৌশলে লক্ষ্মৌতীর সিংহাসন থেকে অপসৃত করেন।

২৮। কদর খান : ১৩২৬ খ্রীঃ (৭২৬ হিঃ)—১৩৩৯ খ্রীঃ (৭৪০ হিঃ)

সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক

 ১৩২৫ খ্রীঃ (৭২৫ হিঃ)—১৩৫১ খ্রীঃ (৭৫২হিঃ)

দিল্লীশ্বর মহম্মদ বিন তুঘলক লক্ষ্মৌতীর শূন্য সিংহাসনে মালিক পিন্দার বা বিন্দারকে ‘কদর খান’ উপাধি প্রদান পূর্বক গভর্ণর নিযুক্ত করেন। কদর খানের শাসন কালে সুবর্ণগ্রামের গভর্ণর বাহরম খান (তাঁতার) এর ১৩৩৩ খ্রীঃ (৭৩৪ হিঃ) তে মৃত্যু হলে বাহরম খানের শিলাহদার ফকরউদ্দীন বিদ্রোহী হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দিল্লীর সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের নির্দেশে বিদ্রোহী ফকরউদ্দীনের বিরুদ্ধে সমবেত সেনা অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। সেনা অভিযান কালে প্রাপ্ত বহু ধন-সম্পদ দিল্লীতে প্রেরণ বা সেনাদের মধ্যে বন্টন না করে আত্মসাৎ করে কদর খান স্বীয় রাজকোষে জমা করেন। কদর খানের এই অর্থগৃধ্নুতা তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়। তাঁর অভিযান কালে বিদ্রোহী ফকরউদ্দীন কদরখানের সৈন্যদের অর্থলোভে বশীভূত করে একদা বর্ষাকালে নৌকাযোগে কদর খানকে সুবর্ণগ্রামে হত্যা করেন।

লক্ষ্মৌতীর গভর্ণর কদর খানের শাসনকালে বাংলার একজন নতুন সুলতান গিয়াসউদ্দীন নুসরত শাহ-র *২ (মহম্মদ রেজাউল করিম, ‘স্বাধীন সুলতানী বাংলার একজন নতুন সুলতান’) ফিরোজাবাদ টাঁকশাল থেকে ৭৩৭ হিজরীর (১৩৩৬ খ্রীঃ) মুদ্রিত মুদ্রা আবিষ্কার হয়েছে। মনে হয় কদরখানের সুবর্ণগ্রাম অভিযানের সুযোগে জনৈক গিয়াসউদ্দীন নুসরত শাহ রাজ্যের এক অংশে স্বাধীনতা ঘোষণা করে মুদ্রা মুদ্রণ করেন। আগামীতে আরও গবেষণা ও মুদ্রাপ্রাপ্তি হলে এই নতুন সুলতান বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যাবে।

২৯) সুলতান আলাউদ্দীন আলী শাহ : ১৩৩৯ খ্রীঃ (৭৪০হিঃ)—১৩৪২খ্রীঃ (৭৪৩ হিঃ)

সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক

 ১৩২৫ খ্রীঃ (৭২৫ হিঃ)—১৩৫১ খ্রীঃ (৭৫২ হিঃ)

সুবর্ণগ্রাম অভিযানকালে কদর খানের মৃত্যু সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে লক্ষ্মৌতীতে কদর খানের সেনাধ্যক্ষ (আরিজ) আলী মুবারক ‘সুলতান আলাউদ্দীন আলী শাহ’ রাজউপাধি গ্রহণ পূর্বক লক্ষ্মৌতীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি একদা দিল্লীতে প্রতিষ্ঠিত তুঘলক রাজবংশের ফিরোজের বিশ্বস্ত ভৃত্য ছিলেন, পরবর্তীকালে কদর খানের অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেন।

তিনি তাঁর রাজধানী লক্ষ্মৌতী থেকে ফিরোজাবাদে (পাণ্ডুয়া) স্থানান্তরিত করেন এবং ফিরোজাবাদ টাঁকশালে ৭৪২, ৭৪৩ হিজরীতে মুদ্রা মুদ্রিত করেন। সম্ভবতঃ নৌশক্তিতে অধিক শক্তিধর সুবর্ণগ্রামের সুলতান ফকরউদ্দীন কর্তৃক বারংবার নদী তীরবর্তী লক্ষ্মৌতী আক্রান্ত হবার কারণে এবং স্বীয় শাসন এলাকাতে সুদৃঢ় শাসন ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য সুলতান আলাউদ্দীন আলী শাহ ফিরোজাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন।

সুলতান আলাউদ্দীন আলীশাহ ৭৪৩ হিজরী (১৩৪২খ্রীঃ) তে তাঁর উচ্চপদস্থ রাজকর্মী হাজী ইলিয়াস কর্তৃক নিহত হন। অতঃপর হাজী ইলিয়াস রাজউপাধি গ্রহণপূর্বক ফিরোজাবাদের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ৭৪৩ হিজরীতে ফিরোজাবাদ টাঁকশাল থেকে মুদ্রা প্রকাশ করেন এবং ৭৪৩ হিজরীর ২ রা শাবান শিলালিপি উৎকীর্ণ করেন।

সপ্তগ্রাম (সাতগাঁও) শাসন বিভাগ

৩০) বাহরাম খান (তাতার) : ১৩২৪ খ্রীঃ (৭২৪ হিঃ)

সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক, ৭২০-৭২৫ হিঃ (১৩২০-১৩২৫ খ্রীঃ)

দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুখলক বঙ্গে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহকে পরাজিত ও বন্দী করে পালিত পুত্র বাহরাম খানকে সুবর্ণগ্রাম শাসন বিভাগের সঙ্গে সপ্তগ্রামের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। পরবর্তী দিল্লীশ্বর মহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণের পরে বাংলার শাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক রদবদল হিসাবে ইজ্জ-উদ-দীন ইয়াহিয়াকে সপ্তগ্রামের গভর্ণর নিযুক্ত করেন।

৩১) ইজ্জ-উদ-দীন ইয়াহিয়া (আজম-উল-মূলক) : ১৩২৫ খ্রীঃ (৭২৫ হিঃ)—১৩৪৬ খ্রীঃ (৭৪৭ হিঃ)

সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক

 ১৩২৫—১৩৫১ খ্রীঃ (৭২৫-৭৫২ হিঃ)

দিল্লীর সুলতান কর্তৃক ‘আজম-উল-মূলক’ উপাধি প্রাপ্ত হয়ে ইজ্জ-উদ-দীন ইয়াহিয়া সপ্তগ্রাম শাসন বিভাগ দীর্ঘদিন শাসন করেন এবং সপ্তগ্রাম দীর্ঘ দিন দিল্লীর অধীনে থাকে। ৭৪৭ হিজরী (১৩৪৬ খ্রীঃ) তে লক্ষ্মৌতী শাসন বিভাগের সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সপ্তগ্রাম অধিকার করেন এবং উক্ত বর্ষে সাতগাঁও (সপ্তগ্রাম) টাঁকশাল থেকে মুদ্রা জারি করেন।

সুবর্ণগ্রাম (সোনার গাঁ) শাসন বিভাগ

৩২) বাহরাম খান (তাতার) : ১৩২৪ খ্রীঃ (৭২৪ হিঃ)—১৩৩৩ খ্রীঃ (৭৩৪ হিঃ)

সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক, ৭২০-৭২৫ হিঃ (১৩২০-১৩২৫) খ্রীঃ

• সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক, ৭২৫ হিঃ-৭৫২ হিঃ (১৩২৫-১৩৫১) খ্রীঃ

৩৩) পুনরায় গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ এবং যুগ্ম গভর্ণর ও সুলতান : ১৩২৫ খ্রীঃ (৭২৬ হিঃ)—১৩২৯ খ্রীঃ (৭৩০ হিঃ)

সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক ১৩২৫-১৩৫১ খ্রীঃ (৭২৫-৭৫২ হিঃ)

দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বঙ্গে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহকে পরাজিত ও বন্দী করে পালিত পুত্র বাহরাম খান (তাতার) কে সপ্তগ্রামের সঙ্গে সুবর্ণগ্রাম শাসন বিভাগের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। পরবর্তী দিল্লী সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক পিতা কর্তৃক বন্দী বাহাদুর শাহকে মুক্ত করে শর্তসাপেক্ষে সুবর্ণগ্রামের যুগ্ম গভর্ণর নিযুক্ত করেন।

গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ গভর্ণর হিসাবে ৭২৬ হিঃ (১৩২৫ খ্রীঃ) হতে ৭২৯ হিঃ (১৩২৮ খ্রীঃ) পর্যন্ত দিল্লী সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের আদেশে নিজের নামের সঙ্গে মহম্মদ বিন তুঘলকের নাম মুদ্রায়*৩ উৎকীর্ণ করেন এবং দিল্লী সম্রাটের নামে খুদবা প্রচলন রেখে দিল্লী সুলতানের দুইটি শর্ত পালন করেন। কিন্তু তৃতীয় শর্ত হিসাবে স্বীয় পুত্রকে জামিন স্বরূপ দিল্লীতে প্রেরণ করেননি। দিল্লী সুলতান নানা ভাবে চাপ সৃষ্টি করলে স্বাধীনচেতা গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ মুলতানে বিদ্রোহ জনিত কারণে দিল্লীর দুর্বলতার সুযোগে বিদ্রোহী হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং শুধুমাত্র নিজের নামে মুদ্রা*৪ জারি করেন (৭৩০ হিঃ)। বাহরম খান (তাতার) দিল্লী থেকে প্রেরিত সৈন্যের সাহায্যে বিদ্রোহী বাহাদুরকে নৃশংস ভাবে হত্যা করেন।

অতপর বাহাদুর বিজয়ী বাহরাম খান সুবর্ণগ্রানের একক শাসক হিসাবে রাজত্ব করেন এবং ৭৩৪ হিজরী (১৩৩৩ খ্রীঃ) তে মৃত্যুবরণ করেন।

এ যাবৎ ইয়াহইয়া প্রণীত তারিখ-ই-মোবারক শাহীর তথ্য অনুসারে বাহরম খাঁর মৃত্যু এবং পরবর্তী শাসক ফকর-উদ-দীন মোবারক শাহর সিংহাসন আরোহণের তারিখ ৭৩৯ হিঃ (১৩৩৮ খ্রীঃ) প্রচলিত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি সোনারগাঁও টাঁকশালে ৭৩৪ (১৩৩৩ খ্রীঃ) হিজরীতে উৎকীর্ণ ফকর-উদ-দীনের আবিষ্কৃত একটি রৌপ্য-মুদ্রার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বের মতামত ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে।

৩৪) সুলতান ফকর-উদ-দীন আবুল মুজফফর মোবারক শাহ : ১৩৩৩ খ্রীঃ (৭৩৪ হিঃ)—১৩৪৯ খ্রীঃ (৭৫০ হিঃ)

সমসাময়িক দিল্লী সুলতান—

• সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক-১৩২৫—১৩৫১ খ্রীঃ (৭২৫-৭৫২ হিঃ)

বাহরম খানের মৃত্যুর পর তাঁর সিলাহদার ফকরউদ্দীন স্বাধীনতা ঘোষণা করে রাজকীয় উপাধি গ্রহণ পূর্বক সুবর্ণগ্রামের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ৭৩৪ হিজরী হতে ৭৫০ হিজরী পর্যন্ত মুদ্রা মুদ্রিত করেন। তিনি স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার পরে ১৩৪৯ খ্রীঃ (৭৫০ হিঃ) তে পরলোক গমন করেন।

৩৫) সুলতান ইখতিয়ারউদ্দীন গাজী শাহ : ১৩৪৯ খ্রীঃ (৭৫০হিঃ)-১৩৫২ খ্রীঃ (৭৫৩ হিঃ)

সমসাময়িক দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক—১৩২৫ খ্রীঃ (৭২৫ হিঃ)-১৩৫১ খ্রীঃ (৭৫২ হিঃ)। ৭৫২ হিজরীর ২১ শে মহরম (১৩৫১ খ্রীঃ, ২০শে মার্চ) তিনি সিন্ধুনদীর তীরে মৃত্যু বরণ করেন।

• যুদ্ধকালীন অবস্থায় আহমদ আজাজ (খাজা-ই-জাহান) কর্তৃক নিযুক্ত বালক সুলতান-১৩৫১ খ্রীঃ (৭৫২ হিঃ)

• সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক—(মহম্মদ বিন তুঘলকের খুড়তুতো ভাই)-১৩৫১ খ্রীঃ (৭৫২ হিঃ)—১৩৮৮ খ্রীঃ (৭৯০ হিঃ)। ২৪ শে মহরম ৭৫২ হিঃ (২৩ শে মার্চ ১৩৫১ খ্রীঃ) যুদ্ধ ক্ষেত্রে বাদশাহ ঘোষণা ।

সুলতান ফরকউদ্দীনের মৃত্যুর পর ইখতিয়ারউদ্দীন গাজী শাহ সুবর্ণগ্রাম শাসন বিভাগের স্বাধীন সুলতান। তিনি ৭৫০ হিজরী হতে ৭৫৩ হিজরী (১৩৪৯-১৩৫২ খ্রীঃ) পর্যন্ত সোনার গাঁও টাঁকশাল থেকে মুদ্রা প্রচলন করেন। মুদ্রায় তিনি নিজেকে ‘সুলতান-বিন-সুলতান’ (সুলতানের পুত্র সুলতান) বলে দাবি করেছেন কিন্তু তাঁর পিতার নামের উল্লেখ করেন নি। সম্ভবতঃ তিনি ফকরউদ্দীন মুবারক শাহর পুত্র ছিলেন।

৭৫৩ হিজরী (১৩৫২ খ্রীঃ) তে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সুবর্ণগ্রাম দখল করেন এবং উক্ত বর্ষ (৭৫৩ হিঃ) থেকে সুবর্ণগ্রাম টাঁকশালে মুদ্রা প্রকাশ করেন।

.

*১ হুগলি জেলায় আরেকটি পাণ্ডুয়া থাকার কারণে জেনালের ক্যানিংহাম মালদহের পাণ্ডুয়াকে হজরত পাণ্ডুয়া বলার প্রস্তাব করেন।

*২ মহম্মদ রেজাউল করিম, স্বাধীন সুলতানী বাংলার একজন নতুন সুলতান।

*৩ ৭২৮ হিজরীর মুদ্রাতে উৎকীর্ণ ‘‘জরবে-বি-আমর-আল-ওয়াসিক-বিল্লাহ মোহাম্মদ বিন তুঘলক শাহ’’ এই অংশের অর্থ মহম্মদ বিন তুঘলকের আদেশে উৎকীর্ণ।

*৪ রিয়াজ উস সালাতীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *