সেন যুগ

সেন যুগ

পাল বংশের পশ্চাতে গৌড়বঙ্গে সেনবংশ কর্তৃক এক শক্তিশালী ও স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজয়সেনের দেবপাড়া লিপির পঞ্চম শ্লোকে তাঁদের ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’ ও ব্যারাকপুর তাম্রশাসনে চতুর্থ শ্লোকে ‘ক্ষত্রিয়’ এবং লক্ষ্মণসেনের মাধাইনগর তাম্রশাসনে চতুর্থ শ্লোকে ‘কর্ণাটক্ষত্রিয়’ পরিচয় পাওয়া যায়। বল্লালসেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে এবং দেবপাড়া প্রস্তরলিপিতে জানা যায় যে সেনযুগ চন্দ্রবংশজাত দাক্ষিণাত্য ক্ষৌণীন্দ্র বীর সেন বংশ-সম্ভূত ছিল। ষোড়শ শতকের আনন্দভট্ট প্রণীত ‘বল্লালচরিত’ গ্রন্থে জানা যায় সেনগণ পুরাণের প্রসিদ্ধ মহাবীর কর্ণের প্র-পৌত্র বীরসেন বংশজাত ছিলেন।

বিজয়সেনের দেবপাড়াতে অবস্থিত প্রদ্যুম্নেশ্বর মন্দিরের প্রশস্তি থেকে জানা যায় যে এই সেনবংশ (তস্মিন্ সেনান্ববায়ে) সামন্ত সেন জন্মগ্রহণ করেন (৫ম শ্লোক)। সামন্ত সেন দুর্বৃত্তানাময়মরিকুলাকীর্ণকর্ণাটলক্ষ্মীর শত্রুগণকে দমন করেছিলেন (৮ম শ্লোক) এবং বৃদ্ধবয়সে গঙ্গাতীরে হোমধূমসুগন্ধী ঋষিগণের বাসস্থানে বিচরণ করতেন। কিন্তু বল্লালসেন প্রদত্ত বর্ধমান জেলার অন্তঃপাতী নৈহাটিতে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে জানা যায় চন্দ্রবংশীয় রাজাগণ (সেন) সদাচারপালনখ্যাতি গর্বে গর্বান্বিত রাঢ়দেশকে অভূতপূর্ব প্রভাবে বিভূষিত করেছিলেন। তাঁদের বংশে প্রবল প্রতাপান্বিত সত্যনিষ্ঠ, অকপট, করুণাধার, শত্রুসেনাসাগরে প্রলয়তপন সামন্ত সেন জন্মগ্রহণ করেন।

অপরপক্ষে পালরাজাদের তাম্রশাসনে তাঁদের কর্মচারীর তালিকাতে নিয়মিতভাবে ‘গৌড়-মালব-খশ-হূণ-কুলিক-কর্ণাট-লাট-চাট-ভাট’ প্রভৃতি নাম উল্লেখিত হয়েছে (যথা-৭ম পালরাজা নারায়ণপালের ১৭তম রাজ্যবর্ষের তাম্রশাসন ইত্যাদি)। পালরাজাদের তাম্রশাসনে উল্লেখিত রাজকর্মচারীর তালিকায় ‘কর্ণাট’ এবং বল্লাল সেনের তাম্রশাসনে সূত্র ধরে মনে করা হয় যে সামন্ত সেনের অগ্রে রাঢ়বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত সেনগণ পালরাজাদের অধীনে সেনাধ্যক্ষ বা উচ্চরাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন এবং পালরাজাদের দুর্বলতার সুযোগে প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে ওঠেন ও পরিশেষে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন।

সেনাগণ কোনসময়ে বঙ্গদেশে অভ্যুস্থিত হন এবং গৌড়বঙ্গে আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হন তা এপর্যন্ত নিঃসন্দেহভাবে নির্ণীত হয় নি। আবিষ্কৃত সেনবংশের লেখমালাতে সামন্ত সেন সর্বপ্রথম রূপে উল্লেখিত। সামন্ত সেনের প্রদত্ত লিপি আবিষ্কৃত হয় নি। বিজয়সেনের দেবপাড়া প্রশস্তিতে সামন্তসেনের উল্লেখ আছে। বল্লালসেনের নৈহাটি তাম্রশাসন থেকে অনুমান করা যায় সামন্ত সেন রাঢ়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। সম্ভবতঃ তিনি তৃতীয় বিগ্রহপালের সামন্ত রাজা হিসাবে স্বীকৃত পান।

সামন্ত সেনের পুত্রের নাম হেমন্ত সেন। বিজয় সেনের দেবপাড়া লিপির দশম শ্লোকে উল্লেখ আছে হেমন্ত সেন ‘নিজভুজমদমত্ত অরাতি’ গণকে বিনাশ করেন। হেমন্ত সেন তুলনামূলকভাবে অধিকতর ক্ষমতার অধিকারী হন। বিজয়সেনের ব্যারাকপুর তাম্রশাসনে হেমন্ত সেনের নামের সঙ্গে ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি দেখা যায়। হেমন্ত সেনের এই ক্ষমতাবৃদ্ধি পালদের দুর্বলতার সুযোগে ঘটে থাকবে কারণ তৃতীয় বিগ্রহপালের পুত্র দ্বিতীয় মহীপালের স্বল্প রাজত্বকালে উত্তরবঙ্গে দিবেবাকের নেতৃত্বে কৈবর্ত-বিদ্রোহ ও বরেন্দ্রীতে তাঁদের স্বাধীনতা ঘোষণা, পরবর্তী পালরাজা দ্বিতীয় শূরপালদেবের স্বল্পকালে দুর্বল রাজত্ব এবং বরেন্দ্র উদ্ধারের জন্য রামপালের সামন্তরাজাদের মুখাপেক্ষিতার সুযোগে সেনগণ তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সুযোগ পান। হেমন্ত সেনের ‘রাজরক্ষা সুদক্ষ’ উপাধি (ব্যারাকপুর তাম্রশাসন) থেকে ধারণা হয় তিনি পালরাজা রামপালের অধীনে একজন সামন্তরাজা ছিলেন। হেমন্ত সেনের কোন লিপি আবিষ্কৃত হয়নি। হেমন্ত সেন তাঁর পিতা সামন্ত সেনের নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে কোন রাজ্যাধিকার পাননি বা তিনি নিজে তাঁর পুত্রের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট রাজ্য রেখে যান নি। পত্নী যশোদেবীর গর্ভে হেমন্ত সেনের পুত্রের নাম বিজয় সেন। বিজয় সেন-ই প্রথম সামন্তরাজ্য থেকে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

বিজয় সেন (১০৯৬-১১৫৯ খ্রী.)

বর্মণবংশের অভ্যুদয় এবং মদনপালদেবের দুর্বলতার কারণে গৌড়রাষ্ট্র যখন বিশৃঙ্খল, তখন সেনবংশীয় বিজয় সেন বরেন্দ্রভমিতে একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ক্রমশঃ ক্ষমতার উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেন। শূরবংশীয়া কন্যা বিলাসদেবীকে তিনি বিবাহ করেন। এই বৈবাহিক সম্পর্ক তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আনুকূল্য প্রদান করে। তিনি ছিলেন প্রবল প্রতাপান্বিত কলিঙ্গাধিপতি অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গের মিত্র (চোড়গঙ্গ সখঃ)। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতে রামপালের সামন্তরাজাদের তালিকাভুক্ত নিদ্রাবলীর বিজয়রাজ কারও মতে বিজয় সেন স্বয়ং। তিনি একজন শক্তিশালী সামন্তরূপে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। রামপালের মৃত্যুর পর বিজয় সেনকে গৌড়বঙ্গে ক্ষমতা দখলের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ বিজয় সেন অরিরাজবৃষিভশঙ্কর উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পরমমাহেশ্বর বা শৈব। বিজয় সেনের দেবপাড়া প্রস্তরলিপিতে জানা যায় (২০ ও ২১ শ্লোক) যে তিনি নান্য, বীর, রাঘব, বর্ধণ এবং গৌড়, কামরূপ ও কলিঙ্গের রাজাগণকে পরাজিত করেন।

সম্ভবতঃ নান্য ছিলেন মিথিলার কর্ণাটবংশীয় রাজা, বীর ছিলেন কোটাবীরের রাজা বীরগুণ, বর্ধণ ছিলেন কোশাম্বীর রাজা দ্বোরপবর্ধণ এবং রাঘব ছিলেন কলিঙ্গরাজ অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গের পুত্র। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে বিজয় সেন চোরঙ্গসখা ছিলেন। সম্ভবত বিজয় সেন কলিঙ্গ জয় করে বন্ধু অনন্তবর্মণ চোরঙ্গকে প্রদান করেন। তিনি কামরূপরাজাকে পরাজিত করেন। সম্ভবতঃ তৎকালে কামরূপরাজ ছিলেন একদা কুমারপালদেবের রাজকর্মী বৈদ্যদেব। বিজয়সেনের বিক্রমপুর থেকে প্রকাশিত ব্যারাকপুরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে জানা যায় চন্দ্র ও বর্মরাজদের রাজধানী বিক্রমপুর সেন সাম্রাজ্যের রাজধানী হয়েছিল। দেবপাড়া লিপির ২২ নং শ্লোকে জানা যায় বিজয় সেন গঙ্গার স্রোত ধরে এক ‘পাশ্চাত্যচক্রে’র বিরুদ্ধে নৌ-অভিযান প্রেরণ করেন।

কবি উমাপতি ধর রচিত দেবপাড়া প্রশস্তিতে উল্লেখ আছে বিজয় সেন গৌড়েন্দ্রকে সবলে আক্রমণ করেন (২০ নং শ্লোক)। কিন্তু বিজয় সেন সেই সময়ে সমস্ত গৌড়রাজ্য অধিকার করতে পারেন নি, কারণ রাজীবপুরে প্রাপ্ত মদনপালের ২২তম রাজ্যবর্ষে (১১৬৫ খ্রীঃ) রামাবতী নগরীর সন্নিধানস্থ জয়স্কন্ধাবার থেকে প্রদত্ত তাম্রশাসনে পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্ত্যন্তঃপাতী কোটীবর্ষ বিষয়ের অন্তর্গত হলাবর্ত মণ্ডলে কোন ব্রাহ্মণকে তিনি ভূমিদান করেছিলেন; গৌড়রাজ্য হস্তান্তরিত হলে মদনপাল কখনও ঐ সময়ে ঐ স্থানে ভূমিদান করতে পারতেন না। বিজয় সেন গৌড়েন্দ্রকে পরাজিত করেছিলেন মাত্র; যুদ্ধে জয়লাভ ও রাজ্যাধিকার এক কথা নয়। তৎকালে মদনপালদেব মগধে আশ্রয় গ্রহণ করলেও তাঁর প্রদত্ত রাজীবপুর তাম্রশাসন প্রমাণ করে যে মদনপালের রাজত্বকালে বিজয়সেন সমগ্র গৌড়রাজ্য অধিকারে অক্ষম ছিলেন।

তবুও বলা যায় যে সামান্য একজন সামন্ত হিসাবে জীবন শুরু করে বিজয়সেন পালবংশের পরে বাংলার বিনষ্ট রাষ্ট্রীয় ঐক্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে একটি অখণ্ড রাজ্য স্থাপনের গৌরব অর্জন করেন।

কবি উমাপতিধর ‘দেবপাড়া প্রশস্তি’তে তাঁর বহু গুণকীর্তণ করেছেন, কবি শ্রীহর্ষ তাঁর ‘বিজয় প্রশস্তি’ ও ‘গৌড়ৌবীশকুল প্রশস্তি’ রচনা করে বিজয় সেনের কৃতিত্ব বর্ণনা করেন। বিজয়সেন প্রায় ৬২ বৎসর সগৌরবে রাজত্ব করেন।

বল্লাল সেন (১১৫৯-১১৭৯ খ্রী.)

বিজয় সেনের পরে তাঁর শূরবংশীয়া মহিষী বিলাসদেবীর গর্ভজাত পুত্র বল্লাল সেন সেনবংশের রাজা হন। বল্লালসেন ‘দানসাগরে’র মঙ্গলাচরণে নিজেকে ‘গৌড়েশ্বর’ বলেছেন। ‘পরমেশ্বর পরমমাহেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ’ বল্লাল সেন ‘অরিরাজনিঃশঙ্কশঙ্কর’ উপাধি গ্রহণ করেন। ‘অদ্ভুতসাগরের’ ‘সপ্তর্ষীনামদ্ভুতানি’ প্রকরণে লিখিত আছে—‘‘ভুজ-বসু-দশমীতে (১০৮১) শকে শ্রীমদবল্লালসেন-রাজ্যাদৌ’’ ১০৮১ শকাব্দে (১১৫৯ খ্রীঃ) বল্লাল সেন রাজ্যলাভ করেন। তিনি পিতৃ-সিংহাসনে আরোহণ করে সমগ্র গৌড়রাষ্ট্র করায়ত্ত করতে যত্নবান হন। তাঁর পিতা বিজয় সেন পালবংশজ গৌড়েন্দ্র (মদনপাল) কে আক্রমণ করেই ক্ষান্ত হয়েছিলেন। বল্লাল সেন, স্বীয় অভীষ্ট সাধনের জন্য পালরাজবংশ উন্মূলিত করার সংকল্প করেন। গৌড় প্রবেশাধিকারের পূর্বে সেনরাজাগণ রাঢ়ে ও বঙ্গে প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। বল্লাল সেন গৌড়রাজ্য অধিকার করে গৌড়দুর্গ নির্মাণ করেন এবং গঙ্গা ও ভাগীরথীর মধ্যবর্তী স্থানে মৃত্তিকাগড় নির্মাণ করে গৌড়নগরকে গর্ভস্থ করেন। তৎকালে গঙ্গা গৌড় নগরের পূর্বদিকে ভাতিয়ানগর দিয়ে প্রবাহিত ছিল এবং অমৃতির নিকট গঙ্গা থেকে পৃথক হয়ে ভাগীরথী গৌড় নগরের পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত ছিল। বল্লাল সেন গৌড় নগরের বিশাল বিশাল দিঘি খনন করেন। বাগবাড়ীর মৃৎপ্রাচীরবেষ্টিত স্থানটি তাঁর উদ্যান বাটিকা ছিল তাঁর পুত্র লক্ষ্মণ সেনের সময় গৌড়নগর লক্ষ্মণাবতী নামে খ্যাত হয়। বল্লাল সেন পাল উপাধি যুক্ত গোবিন্দপালকে আক্রমণ করে মগধ জয় করেন। ‘লঘুভারত’ গ্রন্থে জানা যায় বল্লাল সেন মিথিলা জয় করতে অগ্রসর হন। ‘বল্লালচরিত’ গ্রন্থে জানা যায় তিনি পিতা বিজয় সেনের রাজত্বকালে মিথিলা অভিযান করেন। দেবপাড়া প্রশস্তিতে বিজয় সেন কর্তৃক মিথিলার রাজ্য নান্যকে পরাভূত করার দাবি আছে। জনপ্রবাদ অনুসারে বল্লাল সেন স্বীয় রাজাকে রাঢ়, বরেন্দ্র, বাগাড়ী, বঙ্গ ও মিথিলা এই পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক ভাগে একজন শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন, তবে মিথিলা সেন সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষ্মণ সেনের মাধাইনগর তাম্রশাসনে প্রতীয়মান হয় যে বল্লাল সেন কলিঙ্গ রাজ্য আক্রমণ করেন।

বঙ্গীয় কুলজী গ্রন্থে কৌলীন্য প্রথার উৎপত্তির সঙ্গে বল্লাল সেনের নাম জড়িত আছে। তাঁকে কৌলীন্য প্রথার প্রবর্তক হিসাবে গণ্য করা হয়, তবে কৌলীন্য প্রথার মূল প্রবর্তক নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ আছে। মাধাইনগরে প্রাপ্ত লক্ষ্মণসেনের তাম্রশাসনে বল্লাল সেন সম্বন্ধে বলা হয়েছে—‘যঃ কেবলং ন খলু সর্বনরেশ্বরানামেকঃ সমগ্রবিবুধামপি চক্রবর্ত্তী’ অর্থাৎ তিনি কেবল পৃথিবীর শাসকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন না। তিনি বিদ্বান সমাজেরও প্রধানতম ব্যক্তি ছিলেন। বল্লাল সেন শাকে খে-নব-খেদ্বন্দ্বে (১০৯০ শক-১১৬৮ খ্রীষ্টাব্দ) ‘অদ্ভুত সাগর’(জ্যোতিষের নিবন্ধ) গ্রন্থ আরম্ভ করেছিলেন, কিন্তু গ্রন্থ সমাপ্ত করে যেতে পারেন নি। তাঁর পুত্র লক্ষ্মণ সেন ‘অদ্ভুতসাগর’ গ্রন্থ সমাপ্ত করেন। বল্লাল সেন পূর্ণশশি-নব-দশমী শকাব্দে (১০১৯ শকাব্দ বা ১১৬৯ খ্রীঃ) ‘দানসাগর’ (স্মৃতির নিবন্ধ) গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ‘দানসাগর’ রচনায় দুই বৎসর সময় লেগেছিল। ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর’ ছাড়া বল্লাল সেন ‘আচার সাগর’, প্রতিষ্ঠাসাগর’, ও ‘ব্রতসাগর’ শীর্ষক অপর তিনখানি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন বলে জানা যায়, কিন্তু এই তিনখানি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ‘বেদ’ ও ‘স্মৃতি পুরাণে’ তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। গুরু অনিরুদ্ধের নিকট তিনি স্মৃতিশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। জ্ঞানী ও পণ্ডিত হিসাবে বল্লাল সেন বাংলার ইতিহাসে স্মরণীয় নৃপ।

বিহারের ভাগলপুর জেলার সনোখার গ্রামে বল্লালসেনের ৯তম রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ মূর্তিলেখ এবং বর্ধমান জেলার নৈহাটিতে তাঁর ১১তম রাজ্যবর্ষের তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে।

পুত্র লক্ষ্মণ সেন কর্তৃক পরিসমাপ্ত বল্লাল সেনের ‘অদ্ভুত সাগরে’ বল্লাল সেনের মৃত্যুর বিবরণ পাই। বল্লাল সেন বৃদ্ধ বয়সে পুত্র লক্ষ্মণ সেনের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে স্ত্রী রামদেবী সহ গঙ্গাতীরে বাণপ্রস্থ অবলম্বন করে গঙ্গা-সলিলে প্রাণ বিসর্জন দেন।

লক্ষ্মণ সেন (১১৭৯-১২০৬ খ্রী.)

লক্ষ্মণ সেনের সমকালীন রাজা—

কান্যকুব্জের সিংহাসনে গাহড়বাল-রাজ জয়চন্দ্র।

কলিঙ্গের সিংহাসনে দ্বিতীয় রাজরাজ এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় অনঙ্গভীম।

বল্লাল সেনের পরে তাঁর চালুক্যবংশীরা মহিষী রামদেবীর গর্ভজাত পুত্র লক্ষ্মণ সেন পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করেন। শ্রীধর দাসের ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ গ্রন্থ ১১২৭ শকাব্দের ২০ ফাল্গুন (১২০৬ খ্রীঃ) লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বের ২৭ বর্ষে সংকলিত। সেই হিসাবে লক্ষ্মণ সেনের রাজ্যারম্ভ ১১৭৯ খ্রীস্টাব্দে। কবিবর ধোয়ী লিখেছেন লক্ষ্মণ সেনের রাজ্যাভিষেক বিজয়পুরে অনুষ্ঠিত হয়। তবকাত-ই-নাসিরী প্রণেতা মিনহাজের মতে লক্ষ্মণ সেন ষাট বৎসর বয়সে রাজত্ব শুরু করেন। তিনি সেন যুগের অন্যতম রাজধানী গৌড়নগরকে সুশোভিত করেন এবং নিজের নামানুসারে গৌড়নগরের নাম ‘লক্ষ্মণাবতী’ নামকরণ করেন। সেন যুগের অপর রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। তিনি তাঁর রাজত্বের শেষের দিকে তীর্থশহর নদীয়াতে বাস করতেন।

তাঁর রাজত্বকালে উৎকীর্ণ সাতটি তাম্রশাসন গোবিন্দপুর, তর্পণদিঘি, আমুলিয়া, রামপাল, শান্তিপুর, ভাওয়াল এবং মাধাইনগরে পাওয়া গেছে। তাম্রশাসনগুলি তাঁর রাজত্বের ২য় রাজ্যবর্ষ থেকে ২৭ রাজ্যবর্ষের মধ্যে প্রদত্ত। তাছাড়া ঢাকাতে তাঁর ৩য় রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ মূর্তিলেখ পাওয়া গেছে। এই সমস্ত লেখমালা, তাঁর পুত্র ও পৌত্রের তাম্রশাসন, তাঁর সভাকবিদের রচিত স্তুতিবাচক শ্লোক এবং ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দীনের তাবাকাত-ই-নাশিরী গ্রন্থ থেকে লক্ষ্মণসেনের রাজত্বের ইতিহাস পাওয়া যায়।

লক্ষ্মণ সেন প্রথম বয়সে শৈব ও শেষ বয়সে পরমবৈষ্ণব হন। তাম্রশাসনে তাঁকে ‘পরমেশ্বর-পরমবৈষ্ণব পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ’ বলা হয়েছে। তিনি ‘অরিরাজমদনশঙ্কর’ ও ‘গৌড়েশ্বর’ উপাধি গ্রহণ করেন। গৌড়েশ্বর লক্ষ্মণ সেনের সময়কালে কান্যকুব্জের সিংহাসনে গাহড়বাল-রাজ জয়চন্দ্র, এবং কলিঙ্গের সিংহাসনে দ্বিতীয় রাজরাজ এবং পরে দ্বিতীয় অনঙ্গভীম সমাসীন ছিলেন। লক্ষ্মণ সেন স্বয়ং বিদ্বান ও বিদ্যোৎসাহী ছিলেন, তিনি পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ ‘অদ্ভুতসাগর’ সমাপ্ত করেন। তিনি কবি ছিলেন, তাঁর রচিত শ্লোকগুলি ‘সদুক্তিকর্ণামৃতে’ সংকলিত হয়েছিল। জয়দেব, ধোয়ীকবিরাজ, শরণ, গোবর্ধনাচার্য্য উমাপতিধর প্রমুখ কবিগণ লক্ষ্মণ সেনের রাজসভা অলংকৃত করতেন।

 ‘‘গোবর্দ্ধনশ্চ শরণো জয়দেব উমাপতিঃ

 কবিরাজশ্চ রত্নানি পঞ্চৈতে লক্ষ্মণস্য চ।’’

হলায়ুধ মিশ্র লক্ষ্মণ সেনের ধর্মাধিকারী ছিলেন। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন বল্লাল সেনের সভাপণ্ডিত, পরে মহামন্ত্রী। লক্ষ্মণ সেনের অধীনেও তিনি পূর্বপদে বহাল থাকেন এবং শেষ জীবনে ধর্মাধিকারী পদ প্রাপ্ত হন।*

লক্ষ্মণ সেন পিতা ও পিতামহের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে রণকুশলতার পরিচয় দেন। তৎকালে গৌড়দেশ, কলিঙ্গ ও কামরূপ অভিযান সংগঠিত হয়েছিল। সম্ভবতঃ লক্ষ্মণ সেন সম্পূর্ণরূপে গৌড়দেশ জয় করেন। যুগপৎ প্রশস্তিকারের উল্লেখ—লক্ষ্মণ সেন নিজ ভুজবলে সমর-সমুদ্র মন্থন করে গৌড়লক্ষ্মী লাভ করেছিলেন। লক্ষ্মণ সেনের উত্তরাধিকারীর তাম্রশাসনে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে তিনি পুরী, বারাণসী ও প্রয়াগে উচ্চ যজ্ঞযূপের সঙ্গে সমরজয়স্তম্ভমালা স্থাপন করেছিলেন। কবি শরণের বর্ণনাতে অতিরিক্ত ভাবে মগধ, চেদি ও ম্লেচ্ছ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উল্লেখ আছে।

বীর-বিক্রমী রাজা লক্ষ্মণ সেন তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে বার্ধক্যের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েন। তৎকালে তিনি কাজকার্য অপেক্ষা ধর্মকার্যে অধিক মনোযোগী হন। এই দুর্বলতার জন্য রাজ্যে অভ্যন্তরীণ বিপ্লবের সূত্রপাত হয়।

তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে মেঘনানদীর পূর্বতীরে দেববংশ স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে (দামোদর দেব ও দশরথ দেবের তাম্রশাসন)। সুন্দরবনের পূর্বখাটিকা বা খাঁড়ি অঞ্চলে বৌদ্ধ নরপতি ডোম্মন পাল স্বাধীনতা ঘোষণা করেন (রাক্ষসখালি তাম্রশাসন ১১১৮ শকাব্দ বা ১১৯৬ খ্রীঃ)। সর্বোপরি ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইখতিয়ার-উদ্দীন মহম্মদ বখতিয়ার খিলজী বঙ্গদেশে সেনা অভিযান করেন। মিনহাজউদ্দীন কৃত নাশিরী গ্রন্থে অষ্টাদশ সৈন্য সহ বখতিয়ারের নদীয়া বিজয় উপলক্ষে লক্ষ্মণ সেনের কলঙ্ককাহিনী বিশ্বাসযোগ্য না হলেও বলতে হবে বখতিয়ারের নদীয়া অভিযান এবং লক্ষ্মণ সেনের বঙ্গে (বিক্রমপুর) আশ্রয় গ্রহণের মধ্য দিয়ে বঙ্গে মুসলিম যুগের সূচনা হয়। তৎকালে লক্ষ্মণ সেন নদীয়াতে কেন ছিলেন, তার কারণ হতে পারে যে—পূর্বে উল্লেখিত ডোম্মন পাল ছিলেন লক্ষ্মণ সেনের সামন্ত রাজা। সেই সামন্ত রাজা মহারাজাধিরাজ উপাধি নিয়ে সুন্দরবন এলাকাতে খাঁড়ি অঞ্চলে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১১৯৬ খ্রীষ্টাব্দে তাম্রশাসন প্রদান করেন। এই ঘটনা রাজা লক্ষ্মণ সেনের সার্বভৌমত্বের প্রতি নিঃসন্দেহে হুমকি ছিল। অনুমান, বৌদ্ধরাজা ডোম্মন পালকে দমনের অভিপ্রায়ে লক্ষ্মণ সেন নদীয়াতে শিবির স্থাপন করেন। পবিত্র স্থান হিসাবে তীর্থশহর তাঁর পছন্দের ছিল। নদীয়াতে দীর্ঘ অবস্থানকালে তিনি বখতিয়ার খিলজীর সেনা অভিযানের সম্মুখীন হন এবং অতি দ্রুত বখতিয়ারের এক্তিয়ারের বাইরে বিক্রমপুরে চলে যান।

হয়তো বখতিয়ার খিলজীর লক্ষ্য ছিল গৌড় রাজা অপেক্ষা গৌড়েশ্বরকে করায়ত্ত করা। কিন্তু শত্রু সেনার আগমন বার্তা জ্ঞাত হয়ে শত্রু সেনার চোখের সামনেই নদীর ঘাটে প্রস্তুত ৩২ দাঁড়ের ময়ুরপঙ্খী নৌকা তাঁকে নিয়ে দিকচক্রবালে মিলিয়ে যায়।

তারপরে কিছু দিন বৃহত্তর বঙ্গে রাজত্ব করার পর লক্ষ্মণ সেন ১২০৬ খ্রীষ্টাব্দে বিক্রমপুরে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরগণ বিক্রমপুরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন রাজত্ব করেন। তাঁদের প্রদত্ত তাম্রশাসনে যবনদের বিরুদ্ধে জয়ের দাবি করেছেন। লক্ষ্মৌতী-র তুর্কী মুসলমানদের সঙ্গে বিক্রমপুরের সেন রাজাদের দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ চলেছিল বলে মনে হয়। যুগপৎ সেন রাজাগণ তাম্রশাসনে ‘যবনান্বয় প্রলয় কাল রুদ্র’ বলে অভিহিত হয়েছেন।

তরাইন, চান্দোয়াল ও ওদন্তপুরী জয় করে মুসলমানগণ যেভাবে সমগ্র দিল্লী-আজমীর, কনৌজ ও মগধে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন, নদীয়া জয়ের পর সেন সাম্রাজ্যে বা বৃহত্তর বঙ্গে তৎকালে তা সম্ভব হয় নি।

লক্ষ্মণ সেন পরবর্তী সেন বংশ

লক্ষণ সেনের বংশধরগণ বিক্রমপুরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ দিন রাজত্ব করেন। এপর্যন্ত আবিষ্কৃত তিন খানা তাম্রশাসনে লক্ষ্মণ সেনের বংশধরদের সম্বন্ধে জানা যায়।

১। মধ্যপাড়া (ঢাকা জেলা) তাম্রশাসন বা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ তাম্রশাসন—এই তাম্রশাসনটি তারিখহীন। এই তাম্রশাসন থেকে ‘পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ অরিরাজবৃষভশঙ্কর গৌড়েশ্বর বিশ্বরূপ সম্বন্ধে জানা যায়।

২। মদনপাড়া (ফরিদপুর জেলা) তাম্রশাসন—এটি সূর্য সেনের ২য় রাজ্যবর্ষে প্রদত্ত এবং বিশ্বরূপ সেনের ১৪ রাজ্যবর্ষে পুনঃ প্রদত্ত (দীনেশচন্দ্র সরকারের পাঠ অনুসারে)।

৩। ইদিলপুর (ফরিদপুর জেলা) তাম্রশাসন—এই তাম্রশাসন সূর্য সেনের তৃতীয় রাজ্যবর্ষে প্রদত্ত, উত্তর কালে বিশ্বরূপ সেনের রাজত্বে সংশোধিত ও পুনঃপ্রদত্ত।

এই তাম্রশাসনটি মদনপাড়া তাম্রশাসনের মত কেশব সেন প্রদত্ত মনে করা হত। পরবর্তী গবেষণায় দীনেশ চন্দ্র সরকারের মতে ‘কেশব সেন’ আসলে ‘বিশ্বরূপ সেন’ এর ভ্রান্ত পাঠ। দুই অক্ষর পরিসরে ‘সূর্য’ নামটি ঘষে তুলে চার অক্ষরের ‘বিশ্বরূপ’ নাম উৎকীর্ণ করার ফলে এই ভ্রান্ত পাঠের উৎপত্তি। দীনেশ চন্দ্র সরকার মহাশয়ের অপর সিদ্ধান্ত এই যে—সূর্য সেন তাঁর পিতা বিশ্বরূপ সেন কোন কারণবশতঃ সাময়িকভাবে রাজ্য পরিচালনায় অক্ষম হলে অন্তর্বর্তী সময়ে কয়েক বৎসর সিংহাসনে আরোহণ পূর্বক রাজ্য চালনা করেন। (এই প্রসঙ্গে দীনেশ চন্দ্র সরকার মহাশয়ের ‘শিলালিপি ও তাম্রশাসনাদির প্রসঙ্গ’ গ্রন্থখানি দ্রষ্টব্য)।

দীনেশচন্দ্র সরকার মহাশয় তাঁর গবেষণা কালে মূল তাম্রশাসন হারিয়ে যাবার জন্য জেমস প্রিন্সেপের প্রকাশিত প্রতিলিপি পুনঃ পরীক্ষা করে এই মত দেন। বস্তুতঃ ইদিলপুর তাম্রশাসনে ‘কেশব সেন’ বা জেমস প্রিন্সেপ কল্পিত তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মাধব সেন নামধেয় রাজাদের কোন অস্তিত্ব নেই।

বিশ্বরূপ সেনের মধ্যপাড়া (ঢাকা জেলা) তে প্রাপ্ত তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, কুমার সূর্যসেন ও কুমার পুরুষোত্তম সেন ব্রাহ্মণদের ভূমিদান করেছিলেন। পূর্বে লক্ষ্মণ সেনের পরবর্তী সেন রাজবংশ বিষয়ে ভিন্ন মত প্রচলিত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি দীনেশচন্দ্র সরকারের গবেষণা মোতাবেক লক্ষ্মণ সেনের পরে রাজা হন তাঁর পুত্র বিশ্বরূপসেন (আনুমানিক ১২০৬-১২২৫ খ্রীঃ)। বিশ্বরূপ সেনের রাজত্বকালে কোন কারণবশতঃ অন্তর্বর্তীকালীন রাজা হন বিশ্বরূপ সেনের প্রথম পুত্র সূর্য সেন (অনুমানিক ১২১০-১২১৫ খ্রীঃ)। বিশ্বরূপ সেনের দ্বিতীয় পুত্র পুরুষোত্তম সেনের রাজ্যাধিকারের কোন সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। মিনহাজউদ্দিনের সাক্ষ্য থেকে মনে হয় বিক্রমপুরে বিশ্বরূপ সেনের পর সেন রাজাগণ অন্তত ১২৪৫ মতান্তরে সম্ভবত ১২৬০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।

অদ্যাবধি আবিষ্কৃত সেন-তাম্রশাসন থেকে ‘কেশব সেন’ নামক কোন রাজার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না। তবে ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ নামক সংকলিত কাব্য গ্রন্থে পাঁচটি শ্লোকের রচয়িতা শ্রীমৎ কেশব সেন দেব। কেশব সেন দেব সেন বংশীয় রাজপুত্র হলেও তিনি যে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন সেন অভিলেখমালায় অদ্যাবধি তার প্রমাণ পাওয়া যায় নি।

‘পঞ্চরক্ষা’ নামক একখানি বৌদ্ধগ্রন্থের পাণ্ডুলিপিতে পরমসৌগত পরমরাজাধিরাজ গৌড়েশ্বর মধু সেনের উল্লেখ পাওয়া গিয়াছে। গ্রন্থটির তারিখ ১২১১ শকাব্দ (১২৮৯ খ্রীঃ)। উক্ত মধু সেন সেনবংশান্বয় ছিলেন কিনা বলা কঠিন।

উপসংহার

বীরসেন বংশসম্ভূত সামন্ত সেন, হেমন্ত সেনের পরে স্বাধীন সেন রাজা বিজয় সেন গৌড়েন্দ্র মদনপালকে বরেন্দ্র থেকে উৎখাত করেন এবং তৎপুত্র বল্লাল সেন সমগ্র গৌড়রাজ্য অধিকারে আনেন। বল্লালসেন গৌড়নগরে তাঁর আর একটি রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিশাল সাম্রাজ্যের সম্রাট হন। বল্লাল পুত্র লক্ষ্মণ সেন রাজধানী গৌড়নগরের নাম দেন লক্ষ্মণাবতী। উচ্চতার চরম শিখরে উন্নীত সেনরাজ্য লক্ষ্মণ সেনের সময়কালেই মগধ-বরেন্দ্রে মুসলিম সেনা-অভিযান সংগঠিত হয় এবং নদীয়া ও লক্ষ্মণাবতী হস্তচ্যুত হবার মধ্য দিয়ে সেন সাম্রাজ্যের পতনের সূত্রপাত হয়।

লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বকালে পশ্চিম থেকে অগ্রসরমান মুসলিমদের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তাঁর সমসাময়িক রাজা জয়চন্দ্রের রাজ্য গাহরবাল ছিল একটি শক্তিশালী শেষ প্রতিরোধ প্রাচীর স্বরূপ। লক্ষ্মণ সেন সেনা অভিযানে গাহরবাল শক্তিকে দুর্বল করে নিজের অজ্ঞাতে বাংলাতে মুসলিম আক্রমণের পথ প্রশস্ত করেন।

তৎকালে ভারতবর্ষের রাজশক্তিগুলি যদি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে আলেকজাণ্ডারের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রাসিয়য় ও গঙ্গারিদি নামক পৃথক জাতি জাতিসত্তা ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিপাশা নদীতীরে সৈন্য সমাবেশের ইতিহাসকে স্মরণ করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে পারতেন তাহলে তখন ভারতবর্ষে বা বাংলাতে বহিঃশত্রুর আগ্রাসন ব্যর্থ হতে পারত। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহান মোহাম্মদ ঘোরীর কাছে (১১৯২ খ্রীঃ) বা নদীয়াতে লক্ষ্মণ সেন বখতিয়ারের কাছে (১২০২/৩ খ্রীঃ) পরাজয়ের মুখ দেখতেন না।

বঙ্গে মুসলিম আক্রমন ব্যতীত সেন রাজবংশের পতন আরও অনেকগুলি কারণে সংগঠিত হয়েছিল। যথা—

মাৎস্যন্যায় অবসানে প্রজাপুঞ্জের নির্বাচিত গোপালদেব ও তাঁর বংশধরগণের প্রতি গৌড়জনের যেরূপ ভক্তি ছিল, পাল রাজবংশ উন্মূলনকারী বহিরাগত কর্ণাটবংশীয় সেনগণ সেরূপ ভক্তি লাভে ব্যর্থ ছিলেন। সেন যুগে পাল আমলের ধর্মীয় সহনশীলতা ও ধর্মীয় সমন্বয়বাদী নীতি পরিত্যক্ত হয়। সেন রাজাগণ বৌদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন। বৌদ্ধ পালরাজাগণের পুনরুত্থানের আশঙ্কাতে আরব্ধ বৌদ্ধ উৎপীড়ন লক্ষ্মণ সেনের সময়কালে যবন আক্রমনের পথে আনুকূল্য আনয়ন করেছিল বলে প্রতীতি হয়। সেন যুগে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের জাগরণের চেষ্টা ও সামাজিক বিভেদ সেন বংশ পতনের অন্যতম কারণ। এই কারণে সেন রাজ্যে মুসলিম সেনা অভিযানের সময় নির্যাতীত শ্রেণী সেনদের সঙ্গে ছিলেন না, আবার সুবিধাভোগী শ্রেণী সেনদের সাহায্য করেন নি। লক্ষ্মণ সেন গৌড়রাষ্ট্রের বহিঃশত্রু দমনে সমর্থ থাকলেও প্রজাপুঞ্জের সহযোগিতার অভাবে অভ্যন্তরীণ ঐক্য সাধনে এবং রাজ্যরক্ষায় সমর্থ ছিলেন না।

‘বল্লাল চরিতে’ উল্লেখ আছে বল্লাল সেন সুবর্ণবণিকদের শূদ্র ঘোষণা করেছিলেন। সেনদের আচরণে সুবর্ণবণিকগণ বীতশ্রদ্ধ হয়ে প্রবাসী হলে ধ্বসে পড়ে সেন সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক ভিত।

লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বের শেষদিকে তাঁর দুর্বলতার কারণে খাঁড়ি অঞ্চলে ডোম্মন পাল এবং মেঘনা নদীর পূর্বতীরে দেব বংশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

সেনরাজা লক্ষ্মণ সেন বৃদ্ধ বয়সে পুনরায় এক তরুণী রমণীকে বিবাহ করেন। বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা—বল্লভা অত্যন্ত প্রগলভা ছিলেন, পরবর্তীকালের জাহাঙ্গীরের মহিষী নূরজাহানের ন্যায় তিনিও গৌড়ের শাসন-ব্যবস্থাতে অহর্নিশি হস্তক্ষেপ করতেন। সভাসদদের বিরাগভাজন হয়েও চতুরারমণী বল্লভা নিজের প্রভাব অক্ষুণ্ণ রেখে লিপ্ত থাকতেন একের পর এক অবৈধ সম্পর্কে, ফলে সেনরাজ্যে রোপিত হয় প্রতিবিপ্লবের বীজ। সাম্রাজ্যের কোণে কোণে ধূমায়িত হয় অসন্তোষ, সংগঠিত হয় ষড়যন্ত্র ও ব্যভিচার। পারস্পরিক দ্বন্দ্বে রাজপ্রাসাদ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে, প্রজাগণও আত্মসম্বিত হারিয়ে ফেলেন। শাসনব্যবস্থায় বল্লভা কর্তৃক সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা বঙ্গে তুর্কী আক্রমণের পথ প্রশস্ত করে।

সেন রাজবংশের অমাত্যশ্রেণীর দুর্বলতা ও অযোগ্যতা এই রাজবংশের পতনের জন্য দায়ী। বখতিয়ারের মগধ জয়ের কাহিনী পল্লবিত হয়ে গৌড়ের লোকমানসে প্রভাব বিস্তার করেছিল। গৌড়জনমানসে তুর্কী আক্রমণের ভীতি লক্ষ্মণসেন সহ অমাত্যবর্গ যোগ্যতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারেন নি এবং সাহসের সঙ্গে বখতিয়ারের সেনা-অভিযানে বাধা দিতে পারেন নি।

লক্ষ্মণ সেন যৌবনে বিভিন্ন যুদ্ধে শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিলেও শেষবয়সে রাজ্যধর্ম অপেক্ষা ঈশ্বর চিন্তায় মত্ত ছিলেন। মহামন্ত্রী হলায়ুধ মিশ্র ধর্মাধিকারী পদ প্রাপ্ত হলে তদভ্রাতা পশুপতি মিশ্র মহামন্ত্রী হন। তিনিও নিজ পদকর্তব্য অপেক্ষা জ্যোতিষে আসক্ত ছিলেন। রাজা লক্ষ্মণ সেন পুত্রের উপর লক্ষ্মণাবতী ও বিক্রমপুরের দায়িত্ব প্রদান পূর্বক নদীয়াতে কবি ও ধর্মব্যবসায়ী পণ্ডিতগণের সঙ্গে বিশ্বপ্রেমের মহা-সঙ্গীতে আকাশ বাতাস মুখরিত করেছিলেন, সেই সময় বখতিয়ার খিলজীর লোলুপ দৃষ্টি গৌড়-রাজ্যের উপর পড়ে। শত্রু যখন দ্বার প্রান্তে উপস্থিত, গৌড় রাজ্যের মধ্যেই পঞ্চমবাহিনী মধুর বীণায় ঝঙ্কার তুলছিল আর গৌড়বাসী তারই তালে তালে নৃত্য করছিল।

পঞ্চমবাহিনীর নায়ক ছিলেন বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষায় শিক্ষিত পীর জালালুদ্দীন মহম্মদশাহ তাব্রেজী। তিনিও শেখ মৈনুদ্দীন চিস্তির মত ধর্মপ্রচারের উদ্দেশে ভারতে আসেন। জালালুদ্দীন তাব্রেজী লক্ষ্মণ সেনের শাসনকালে সেন সাম্রাজ্যে আস্তানা স্থাপন করেন। লক্ষ্মণ সেনের রাজ্যে মহঃ বখতিয়ার খিলজী কৃত সর্বব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞে পীর জালালুদ্দীন তাব্রেজীর যে বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল তা সহজেই অনুমেয়। নদীয়া-বিজয়কালে পীরকে ভিন্ন রূপে দেখা যায়। তাঁর আদেশে পাণ্ডুয়ার সমস্ত মঠ ও মন্দির ধ্বংস হয়।

ইসলামের অর্দ্ধচন্দ্র লাঞ্ছিত পতাকা বাংলার আকাশে উত্তোলনের যে মহান ব্রত নিয়ে তাব্রেজী সেনরাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন, বখতিয়ারের নদীয়া বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়।

* ‘‘বাল্যে খ্যাপিতরাজপণ্ডিতপদঃ শ্বেতাংশুবিম্বোজ্জল-

 চ্ছত্রোৎসিক্ত-মহামহত্ত্বনুপদং দত্ত্বা নবে যৌবনে।

 যস্মৈ যৌবন শেষযোগ্যমখিলক্ষ্মাপাল-নারায়ণঃ

 শ্রীমল্লক্ষ্মণসেনদেবনৃপতি ধর্ম্মাধিকারং দদৌ।।’’

 —ব্রাহ্মণ সর্ব্বস্ব-হলায়ুধ মিশ্র

.

সহায়ক গ্রন্থ

 ১. Final Report on the Survey and Settlement Operation in the

 District of Malda-1928-1935 by M.O. Carter.

 ২. HARICARITAM of Caturbhuja

 Edited by Sivaprasad Bhattacharya

(The Asiatic Society, Cal 16)

 ৩. RAMACARITAM of Sandhyakara Nandin

 Edited by MM. Haraprasad Sastri

 (The Asiatic Society-Calcutta—16. Pub.1969).

 ৪. tabakat-I-nasiri

 by Maulana Minhaj-Ud-Din-Abu-Umar-I-Usman,

 Translate from original Persian Manuscripts-

 MAJOR H.G. raverty

 ৫. The History of Bengal. Vol-I

 Edited by R. C. Majumdar

 Published by The University of Dhacca

 ৬. কবি জয়দেব ও শ্রীগীতগোবিন্দ—শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়-দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

 ৭. গৌড়ের ইতিহাস—রজনীকান্ত চক্রবর্তী-দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

 ৮. গৌড়ের ঐতিহাসিক ভূগোল (প্রাক মধ্যযুগ) রূপশ্রী চট্টোপাধ্যায়।

ফার্মা কে. এল. এম. প্রা. লি., কলকাতা

 ৯. গৌড়ের কথা—অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় (ড. দীনেশ চন্দ্র সরকারের ভূমিকা সম্বলিত)

 সাহিত্য লোক-কলকাতা।

১০. গৌড় কাহিনী—শ্রী শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ, ভারতজ্যোতি প্রকাশনী, কলকাতা

১১. গৌড় গোধূলি—সৌম্য ভট্টাচার্য্য, পারুল প্রকাশনী, কলকাতা

১২. গৌড়বঙ্গ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রাচীন নিদর্শন। (২য় সংস্করণ)

মোহম্মদ সালাউদ্দীন, জাতীয় সাহিত্য পরিষদ, ঢাকা

১৩. গৌড়বঙ্গের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (প্রথম ভাগ) ভাস্কর চট্টোপাধ্যায়

প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা

১৪. গৌড়বঙ্গের দেবদাসী—মহুয়া মুখোপাধ্যায়, এন. ই. পাবলিশার্স, কলকাতা।

১৫. গৌড় রাজমালা—রমাপ্রসাদ চন্দ। অতিরিক্ত সংযোজন—রাজবিবরণ—

রামপ্রাণ গুপ্ত—দে’জ পাবলিশিং

১৬. চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ভূগোল (প্রশ্ন উত্তরে)—মোঃ মুজিবুর রহমান-

নিউজকর্ণার পাবলিশিং, বগুড়া, বাংলাদেশ।

১৭. জগজ্জীবনপুর তাম্রশাসন ও ৪র্থ পালরাজা মহেন্দ্রপাল দেব

—গোপাল লাহা, মালদহ।

১৮. জানা অজানার দিনাজপুর—ধনঞ্জয় রায়, প্রকাশক-সাত্যকি চক্রবর্তী-মালদহ।

১৯. জানা অজানার মালদহ—শ্রী ওঙ্কার ব্যানার্জী—গৌড়ীয় প্রকাশনী।

২০. তবকাত-ই-নাসিরী—মীনহাজ-ই-সিরাজ,

 বঙ্গানুবাদ ও সম্পাদনা—আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, সোপান, কলকাতা।

২১. প্রাচীন ভারতের পথ পরিচয়—গৌরাঙ্গ গোপাল সেনগুপ্ত-সাহিত্য সংসদ, কলকাতা

২২. বাংলা সাহিত্যের সম্পুর্ণ ইতিহাস—শ্রী অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

সপ্তম সংস্করণ, মডার্ণ বুক এজেন্সী, কলকাতা

২৩. বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস (রাজশাহী বিভাগ-ইতিহাস ও ঐতিহ্য)

গীতিধারা, ঢাকা।

২৪. বাংলার ইতিহাস (প্রাচীন যুগ থেকে ১২০৪ খ্রীঃ)—ডঃ মোঃ শাহজাহান,

তুর্য প্রকাশন, ঢাকা

২৫. বাঙালীর ইতিহাস—আদিপর্ব-শ্রীনীহাররঞ্জন রায়।

২৬. ভারতের ইতিহাস—অতুলচন্দ্র রায় ও প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায়

মৌলিক লাইব্রেরী, কলকাতা।

২৭. ভারতের মুদ্রা—পরমেশ্বরী লাল গুপ্ত-অনুবাদ-অরুণ বিশ্বাস।

২৮. মধ্যযুগের গৌড়—শ্রী শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ, ভারতজ্যোতি প্রকাশনী, কলকাতা

২৯. মেগাস্থেনীসের ভারত-বিবরণ—রজনীকান্ত গুহ, বিশ্বভারতী

৩০. রাজতরঙ্গিনী-কহলন-অনুবাদক হরিলাল চট্টোপাধ্যায়,

 সম্পাদনা-অমিত ভট্টাচার্য্য, পারুল প্রকাশনী, কলকাতা।

৩১. রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়—রচনাবলী, সম্পাদনা-দিলীপ কুমার বিশ্বাস ও

 অমিতাভ ভট্টাচার্য,—পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ

৩২. শিলালেখ—তাম্রশাসনাদির প্রসঙ্গ—ডঃ দীনেশচন্দ্র সরকার, সাহিত্যলোক (১৯৮২)

৩৩. সেখ শুভোদয়া—হলায়ুধ মিশ্র

 প্রকাশক-বাইশ হাজারী ওয়কফ এস্টেটের পক্ষে

 শ্রীসূর্য্যকান্ত শেঠ।

 মুদ্রক-মালদা প্রেস, মালদহ।

৩৪. হিউয়েন সাঙের ভারত ভ্রমণ—বিপুল সাহা, প্রান্তিক, কলকাতা

 এবং লামা তারানাথের বিবরণ (নানা গ্রন্থে তাঁর উদ্ধৃতি)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *