বাংলায় আফগান শাসন

বাংলায় আফগান শাসন

(৬৩) শের শাহ (গৌড় নগর অধিকার) : ১৫৩৮ খ্রীঃ (৯৪৪ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন-১৫৩০-১৫৪০ খ্রীঃ (৯৩৭-৯৪৭ হিঃ)।

আফগানী শের শাহ সূর ৬ই জেলকদ ৯৪৪ (৬/৪/১৫৩৮) তারিখে গৌড় নগর অধিকার পূর্বক লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগে নগরের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেন। শের শাহ গৌড় নগরে মোগল সম্রাট হুমায়ুনের আগমন বার্তা প্রাপ্ত হয়ে গৌড়ের রাজকোষ থেকে ছয় কোটি স্বর্ণমুদ্রা হস্তগত করে রাঢ় দেশে প্রস্থান পূর্বক হুমায়ুনের দিল্লী প্রত্যাবর্তনের পথে অবরোধে সচেষ্ট হন।

(৬৪) বাংলাতে সম্রাট নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন : ১৫৩৮-৩৯ খ্রীঃ (৯৪৫ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• স্বয়ং নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন-১৫৩০-১৫৪০ খ্রীঃ (৯৩৭—৯৪৭ হিঃ)।

বাংলার সুলতান মাহমুদ শাহর প্রবর্তনায় দিল্লীর সম্রাট নাসিরুদ্দীন হুমায়ুনের গৌড় আক্রমণ কালে পথিমধ্যে মাহমুদ শাহর মৃত্যু হলে দিল্লীর সম্রাট গৌড় নগর অধিকার করে বাংলার প্রভু হন। তিনি গৌড় নগরী সংস্কার করে স্বল্পদিন গৌড়ে থাকেন। গৌড় নগরীতে আমোদে প্রমোদে কালাতিপাত করে সম্রাট হুমায়ুন জাহাঙ্গীর কুলী বেগকে গৌড়ের শাসক নিযুক্ত করে দিল্লীর উদ্দেশে গৌড় নগর ত্যাগ করেন (মার্চ ১৫৩৯ খ্রীঃ, ৯৪৫ হিঃ)। যাত্রা পথে সম্রাট হুমায়ুন চৌসা নামক স্থানে শের শাহর সম্মুখীন হন। চৌসার যুদ্ধে, তিনি শের শাহর নিকট পর্যুদস্ত হয়ে নিজামউদ্দীন নামক এক ভিস্তিওয়ালার সাহায্যে নদী পার হয়ে প্রাণ নিয়ে পলায়ন করেন (সফর ৯৪৬ হিঃ জুন, ১৫৩৯) বাংলা, বিহার, জৌনপুর ও কনৌজ শের শাহর অধিকারভুক্ত হয়।

(৬৫) জাহাঙ্গীর কুলী বেগ : ১৫৩৯ খ্রীঃ (৯৪৫-৪৬ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন-১৫৩০-১৫৪০ খ্রীঃ (৯৩৭—৯৪৭ হিঃ)।

দিল্লীর উদ্দেশে গৌড় নগর ত্যাগ করার প্রক্কালে দিল্লীর সম্রাট হুমায়ুন জাহাঙ্গীর কুলী বেগকে বাংলার শাসক নিযুক্ত করেন। চৌসার যুদ্ধে বিজয়ী শের শাহর সৈন্যগণ গৌড় নগর অধিকার করেন। ফলে গৌড় নগর পুনরায় শের শাহের অধীনে আসে।

(৬৬) ফরীদ উদ্দীন আবুল মুজফফর শের শাহ : ১৫৩৯-১৫৪০খ্রীঃ (৯৪৬-৯৪৭ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন-১৫৩০-১৫৪০খ্রীঃ (৯৩৭—৯৪৭ হিঃ)

১৫৩৯ খ্রীস্টাব্দে চৌসার যুদ্ধে জয় লাভ করে শের শাহ গৌড় নগরী অধিকার পূর্বক রাজকীয় উপাধি গ্রহণ করে গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১৫৪০ খ্রীস্টাব্দে কনৌজের যুদ্ধে শের শাহের কাছে হুমায়ুন পরাজিত হয়ে পারস্যে পলায়ন করলে শের শাহ দিল্লীর সিংহাসন অধিকার করেন এবং খিজর খাঁকে বাংলার শাসক (গভর্ণর) নিযুক্ত করেন। বাংলা দিল্লী সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়।

দিল্লীর সম্রাট হবার পরে শের শাহ ১৫৪৫ খ্রীঃ (৯৫২ হিঃ) তে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে কালিঞ্জরদুর্গ অবরোধ কালে তোপখানায় অগ্নিসংযোগ হওয়ায় দগ্ধ হয়ে শের শাহ প্রাণ ত্যাগ করেন।

(৬৭) খিজর খাঁ : ১৫৪০-১৫৪১ খ্রীঃ (৯৪৭-৯৪৮ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান শের শাহ-১৫৪০-১৫৪৫ খ্রীঃ (৯৪৭—৯৫২হিঃ)

 (ভারতবর্ষে আফগান বংশের প্রতিষ্ঠাতা)

দিল্লীর সুলতান শের শাহ কর্তৃক নিযুক্ত বাংলার শাসক খিজর খাঁ রাজক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে বিদ্রোহাত্মক কার্যকলাপ আরম্ভ করেন। তিনি বাংলার পূর্বতন সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহর কন্যাকে বিবাহ করে রাজোচিত আচার-ব্যবহারের অনুষ্ঠান শুরু করেন। এই সংবাদে শের শাহ বাংলায় আগমন পূর্বক খিজর খাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তিনি বাংলাকে কয়েকটি ছোট ছোট শাসন তান্ত্রিক এলাকাতে বিভক্ত করে শাসক নিযুক্ত করেন এবং কাজী ফজিলতকে প্রশাসনিক ঐক্যের জন্য সমগ্র বঙ্গের আমীর নিযুক্ত করে দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেন।

(৬৮) কাজী ফজিলত : ১৫৪১-১৫৪৫ খ্রীঃ (৯৪৮-৯৫২ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান শের শাহ-১৫৪০-১৫৪৫ খ্রীঃ (৯৪৭—৯৫২ হিঃ)

কাজী ফজিলত ওরফে কাজী ফজিহত দিল্লীশ্বর শের শাহর জীবিত কাল পর্যন্ত তাঁর প্রদত্ত দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। ১৫৪৫ খ্রীস্টাব্দে শের শাহর মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র জামাল খাঁ ‘ইসলাম শাহ’ উপাধি ধারণ পূর্বক দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করে বাংলার প্রশাসনিক ব্যবস্থা বাতিল করে কাজী ফাজিলতের স্থলে সামসুদ্দীন মহম্মদ খাঁ সুরকে বাংলার শাসক করেন।

(৬৯) সুলতান বারবক শাহ : ১৫৪২-৪৩ খ্রীঃ (৯৪৯ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান শের শাহ-১৫৪০-১৫৪৫ খ্রীঃ (৯৪৭—৯৫২ হিঃ)

 (তোপখানাতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ-৯৫২ হিঃ)

সম্রাট শের শাহর অধীনস্থ বাংলাতে বারবাক-উদ-দুনিয়া ওয়াল-দীন আবুল মুজফ্ফর বারবক শাহ নামধারী একজন স্বাধীন সুলতানের ৯৪৯ হিজরীতে মুদ্রিত দুইটি মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে, একটি কিশোরগঞ্জ জেলার যশোদলে এবং অন্যটি সিলেটের সোনাখিরাতে। বারবক শাহর শাসনস্থল এবং শাসনের সময়কাল সঠিক নির্ণয় করতে না পারলেও তাঁর মুদ্রা সাক্ষ্যে বলা যায় যে ৯৪৯ হিজরীতে বাংলার কোন অংশে বারবক শাহ স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করতেন। মুদ্রা সাক্ষ্যে এই নব আবিষ্কৃত সুলতানের নাম ও পদবী বারবাক-উদ-দুনিয়া ওয়াল দীন আবুল মুজফফর বারবাক শাহ বিন হুমায়ুন শাহ খল্লদুল্লাহ মুলকাহু ও সুলতানুহু, ৯৪৯ হিজরী’।*

(৭০) মহম্মদ খাঁ (সুলতান শামস-উদ-দীন আবুল মুজফফর মহম্মদ শাহ গাজী) প্রথমে শাসক পরে সুলতান—১৫৪৫-১৫৫৫ খ্রীঃ (৯৫২-৬২ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান জামাল খাঁ (ইসলাম শাহ) শের শাহর পুত্র-১৫ রবিউল আওয়াল ৯৫২-৯৬০ হিঃ (১৫৪৫-১৫৫৩ খ্রীঃ)

• সুলতান ফিরোজ শাহ (ইসলাম শাহর পুত্র) মাতুল আদিল শাহ কর্তৃক নিহত—৯৬০ হিঃ (১৫৫৩ খ্রীঃ)

• আদিল শাহ (মোবারিজ খাঁ) ইসলাম শাহর পিতৃব্যপুত্র ও শ্যালক—৯৬০-৯৬৪ হিঃ (১৫৫৩-১৫৫৬ খ্রীঃ)

দিল্লীর সম্রাট ইসলাম শাহ নিযুক্ত বঙ্গ শাসক মহম্মদ খাঁ শূর দিল্লীর অচলাবস্থার সুযোগে নিজে ‘শামসুদ্দীন মহম্মদ শাহ গাজী’ নাম ধারণ পূর্বক নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন (১৫৫২ খ্রীঃ, ৯৬০ হিঃ) এবং দিল্লীর সিংহাসন হস্তগত করার উদ্দেশ্যে দিল্লী অভিযান কালে সম্রাট আদিল শাহর সেনাপতি হিমু কর্তৃক নিহত হন (১৫৫৫ খ্রীঃ)। তাঁর একখানি শিলালিপি এবং ৯৬২ হিজরীতে উৎকীর্ণ মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।

ছাপরা-মৌয়ের যুদ্ধে মহম্মদ শাহ গাজী পরাজিত ও নিহত হবার পর তাঁর আমীর ও অমাত্যগণ প্রয়াগের অপরপারে ঝুসী নামক স্থানে প্রত্যাবর্তন করে নিহত সুলতানের পুত্র খিজর খাঁকে ‘গিয়াস-উদ-দীন-বাহাদুর শাহ’ রাজউপাধি প্রদান পূর্বক বাংলার সুলতান ঘোষণা করেন এবং গৌড় অভিমুখে যাত্রা করেন (১৫৫৫ খ্রীঃ)।

(৭১) শাহবাজ খাঁ : ১৫৫৫ খ্রীঃ (৯৬২ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান মাহমুদ শাহ আদিল-১৫৫৪-১৫৫৭ খ্রীঃ (৯৬১—৯৬৪ হিঃ)

 গৌড়ের পথে সুরজগড়ে বঙ্গ-সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ খিজর খাঁ কর্তৃক নিহত (১৫৫৭ খ্রীঃ)। দিল্লীর সিংহাসনে আদিল শাহ শেষ আফগান সুলতান।

• সুলতান ইব্রাহিম শাহ শূর (জবর দখল কারী)-মহম্মদ শাহ আদিলের খুল্লতাত-পুত্র ও শ্যালক-১৫৫৪-১৫৫৫ খ্রীঃ (৯৬২হিঃ)

• সুলতান সিকেন্দর শাহ শূর (জবর দখল কারী)-মহম্মদ শাহ আদিলের পিতৃব্য ১৫৫৪-১৫৫৫ খ্রীঃ (৯৬২ হিঃ)-২রা শাবাণ ৯৬২ হিঃ (২২.৬.১৫৫৫ খ্রীঃ) তারিখে সরহিদের যুদ্ধে হুমায়ুন কর্তৃক পরাজিত।

দিল্লীর সুলতান ইতি অবসরে মহম্মদ শাহ আদিল তাঁর সেনাপতি শাহবাজ খাঁকে গৌড়ের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। বাংলার প্রয়াত সুলতান মহম্মদ খাঁ শূরের পুত্র সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ (খিজর খাঁ) ঝুসী থেকে গৌড়ে প্রত্যাবর্তন করে শাহবাজ খাঁকে পরাজিত ও নিহত করেন এবং পিতৃ সিংহাসন পুনর্দখল করেন।

৭২) খিজর খাঁ : (সুলতান গিয়াস-উদ-দীন বাহাদুর শাহ-প্রথম)-১৫৫৫-১৫৬০ খ্রীঃ (৯৬২—৯৬৮ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন (পুনর্বার)-১৫৫৫-১৫৫৬ খ্রীঃ (৯৬২—৯৬৩ হিঃ)

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর (হুমায়ুনের পুত্র)-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ গৌড়ের সিংহাসনের ভিত সুদৃঢ় করে পিতার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য মহম্মদ শাহ আদিল ও তাঁর সেনাপতি হিমুর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন, তখন দিল্লী ও আগ্রা আকবরের হস্তগত এবং হিমু পরাজিত ও নিহত। ১৫৫৭ খ্রীস্টাব্দে সুরজগড়ের যুদ্ধে গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ আদিল শাহকে পরাজিত ও নিহত করেন। এই যুদ্ধে সোলেমান খান কররাণী বাহাদুর শাহকে সাহায্য করেছিলেন।

গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ প্রায় ছয় বৎসর রাজত্ব করেন। গৌড় নগরে ১৫৬০ খ্রীস্টাব্দে তাঁর পরলোক প্রাপ্তি হয়। তাঁর রাজত্ব কালে উৎকীর্ণ শিলালিপি ও মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। তৎকালে ত্রিপুরা থেকে জৌনপুর পর্যন্ত তাঁর রাজ্য বিস্তৃত ছিল। শোননদী ছিল দিল্লী সম্রাট আকবরের রাজ্যের পূর্বসীমা।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করি ইতঃপূর্বে ৭২২-৭২৪ হিজরী (১৩২২-১৩২৪ খ্রীঃ) তে বাংলার রাজসিংহাসনে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ নামক এক সুলতান আসীন ছিলেন, তিনি ছিলেন সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহর (১৩০০-১৩২২ খ্রীঃ) পুত্র।

৭৩) সুলতান গিয়াস-উদ-দীন শাহ জালাল : (দ্বিতীয় গিয়াসুদ্দীন)-১৫৬০-১৫৬৩ খ্রীঃ (৯৬৮—৯৭১ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর (হুমায়ুনের পুত্র)-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহর মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতা গিয়াসউদ্দীন জালাল শাহ গৌড়ের রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর উৎকীর্ণ ৯৬৯ এবং ৯৭০ হিজরীর মুদ্রা পাওয়া গেছে। তিনি ৯৭১ হিজরী (১৫৬৩ খ্রীঃ) তে গৌড়ে মৃত্যুবরণ করেন।

৭৪) সুলতান গিয়াসউদ্দীন শাহ জালালের পুত্র : (নাম অজ্ঞাত)-১৫৬৩ খ্রীঃ (৯৭১ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

 সুলতান গিয়াসউদ্দীন শাহ জালালের মৃত্যুর পর এক পুত্র পিতৃ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি কেবল মাত্র কিঞ্চিদধিক সাত মাস রাজত্ব করার পর গিয়াসউদ্দীন নামক এক জবরদখলকারী কর্তৃক নিহত হন।

৭৫) গিয়াসউদ্দীন : (তৃতীয় গিয়াসুদ্দীন)-জবরদখলকারী-১৫৬৩-১৫৬৪ খ্রীঃ (৯৭১—৯৭২ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

 গিয়াসউদ্দীন রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হয়ে এক বছর এগার দিন রাজত্ব করার পর তাজ খাঁ কররাণী কর্তৃক নিহত হন। তাজ খাঁ কররাণী বঙ্গে কররাণী বংশের প্রতিষ্ঠা করেন।

৭৬) তাজ খাঁ কররাণী : (মসনদ-ই-আলা)-১৫৬৪-১৫৬৫ খ্রীঃ (৯৭২ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

 তাজ খাঁ কররাণী একদা দিল্লী সম্রাট ইসলাম শাহ সূর (সেলিম) এর অমাত্য ও সম্বলপুরের শাসক ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বঙ্গ সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহর অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেন। এই সময়ে উৎকীর্ণ একটি শিলালিপি সাক্ষ্যে জানা যায় ৯৬৭ হিজরীতে জালাল খাঁ কররাণীর পুত্র মসনদ আলী তাজ খাঁ একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

গিয়াসুদ্দীনকে হত্যা করে গৌড় সিংহাসন প্রাপ্ত হয়ে তাজ খাঁ বেশী দিন রাজত্ব করতে পারেন নি। তিনি মাস কয়েক রাজত্ব করার পর ১৫৬৫ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

৭৭) হজরত-ই-আলা মিঞা সোলায়মান খান কররাণী : ১৫৬৫ খ্রীঃ (৯৭২ হিঃ)—১৫৭২ খ্রীঃ (৯৮০ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

সোলায়মান খান কররাণী বিহারের শাসনকর্তা ছিলেন এবং বঙ্গেশ্বর গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ এবং তাঁর পুত্র গিয়াসউদ্দীন শাহ জালালের অনুগত ছিলেন। শাহ জালালের পুত্র—গিয়াসউদ্দীন নামক এক জবরদখলকারী কর্তৃক নিহত হলে সোলায়মান খান কররাণী জবরদখলকারীর আনুগত্য ত্যাগ করে ভ্রাতা তাজ খাঁকে গৌড়ে প্রেরণপূর্বক গৌড় অধিকার করেন। ভ্রাতা তাজ খাঁর মৃত্যুর পর তিনি বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। অতঃপর তিনি বিহার ও বাংলার সার্বভৌম নরপতি হন, কিন্তু তিনি সুলতান উপাধি গ্রহণ করেন নি। তিনি দিল্লীর সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন।

তাঁর কোন মুদ্রা অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয় নি। তাঁর রাজত্বকাল মধ্যে ১৫৬৯-১৫৭২ খ্রীঃ (৯৭৬-৯৮০ হিঃ) সময়কালে উৎকীর্ণ পাঁচখানি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। শিলালিপিতে তিনি ‘‘হজরৎ-ই-আলা’’ উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি শাসনকার্যের সুবিধার জন্য গৌড়নগর থেকে রাজধানী গঙ্গার অপর পারে টাঁড়া (TANDA) তে স্থাপন করেন। কালাপাহাড় ছিলেন তাঁর সেনাপতি। সোলায়মান খান কররাণী ১৫৭২ খ্রীস্টাব্দের ১১ অক্টোবর (৯৮০ হিঃ) তারিখে মৃত্যুবরণ করেন।

৭৮) বায়োজিদ খান কররাণী : ১৫৭২-১৫৭৩ খ্রীঃ (৯৮০-৯৮১ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

সোলায়মান খান কররাণীর মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বায়োজিদ টাঁড়ার রাজ সিংহাসনে আরোহণ করেন। স্বল্পকাল পরে বায়োজিদ তাঁর আফগান আমীর হাঁসু কর্তৃক নিহত হন। অতঃপর হাঁসু রাজ সিংহাসন অধিকার করতে উদ্যোগী হলে সোলায়মান খান কররাণীর অপর এক পুত্র দাউদ খান কররাণীর নেতৃত্বে বায়োজিদ হত্যার সার্ধ দুই দিবস পরেই হাঁসু নিহত হন, এবং দাউদ খান কররাণী সিংহাসনে আরোহণ করেন।

৭৯) সুলতান দাউদ খান কররাণী : ১৫৭৩ খ্রীঃ (৯৮১হিঃ)—১৫৭৫ খ্রীঃ (৯৮৩ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

দাউদ খান কররাণী টাঁড়ার রাজসিংহাসনে আরোহণ করে দিল্লীর সম্রাট আকবরের অধীনতা অস্বীকার করে স্বাধীনভাবে নিজ নামে মুদ্রাঙ্কন আরম্ভ করেন, এর ফলে সম্রাট আকবর বিশাল সেনাবাহিনী সহ খান-ই-খানান মুনিম খাঁকে বাংলায় প্রেরণ করেন (১৫৭৪ খ্রীঃ)। দাউদ খান টাঁড়া (TANDA) থেকে পলায়ন করেন। সুবর্ণরেখা নদীর নিকটে তুকারাই বা মোগলমারী যুদ্ধে দাউদ খান কররাণী পরাজিত হন (৩রা মার্চ ১৫৭৫/২০ জেলকাদ ৯৮২ হিঃ)। দাউদ খান কটক দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং মুনিম খানের নিকট সন্ধির প্রস্তাব দেন। পরাজিত দাউদ খান এবং যুদ্ধক্লান্ত মুনিম খানের মধ্যে কটকে ১লা মহরম ৯৮৩ হিজরী (১২ ই এপ্রিল ১৫৭৫) তে সন্ধি সাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুসারে আফগান দাউদ খান কররাণী মোগল সম্রাট আকবরের অধীনতা স্বীকার করেন এবং উড়িষ্যার জায়গীর প্রাপ্ত হয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। বাংলা ও বিহার সম্রাট আকবরের সাম্রাজ্যাধীন প্রদেশে পরিণত হয়। যদিও অন্যান্য আফগানগণ ‘কটক চুক্তি’ মান্য না করে বিক্ষিপ্তভাবে মোগলদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকেন। উক্ত বর্ষে (৯৩৮ হিঃ) সফর মাসের দশম দিবসে মুনিম খান টাঁড়া প্রত্যাবর্তন করেন। রাজা তোডর মল্ল এই অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন।

৮০) খান-ই-খানান মুনিম খান : ১৫৭৫ খ্রীঃ (৯৮৩ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

সম্রাট আকবরের সেনাপতি মুনিম খান টাঁড়া প্রত্যাবর্তন করলে গৌড় আক্রমণকারী পাঠানেরা গৌড় ত্যাগ করেন। টাঁড়া থেকে গঙ্গার অপর পারে গৌড় নগরের অবস্থান। মুনিম খান গৌড় নগরের অবস্থান ও প্রাসাদশ্রেণী দর্শনে মোহিত হয়ে টাঁড়ার পরিবর্তে গৌড় নগরে রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নেন। তখনও টাঁড়া ও গৌড়নগরের মধ্য দিয়ে গঙ্গার মূল স্রোত প্রবাহিত ছিল। মুনিম খান স্বল্পসময়ে গৌড় নগরের সংস্কার করে তথায় রাজ্যের রাজধানী করেন। কিন্তু মহামারীতে গৌড় নগর শ্মশানে পরিণত হয়। মুনিম খান এই অবস্থায় টাঁড়া ফিরে এলেও মাত্র দশ দিন পরে মৃত্যু মুখে পতিত হন (২৩ শে অক্টোবর ১৫৭৫/রজব মাস ৯৮৩ হিঃ)।

৮১) পুনরায়-দাউদ খান কররাণী : ১৫৭৫-১৫৭৬ খ্রীঃ (৯৮৩-৯৮৪ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

সম্রাট আকবরের সেনাপতি মুনিম খানের মৃত্যু সংবাদে আফগানেরা দ্বিগুণ উৎসাহে ঐক্যবদ্ধভাবে মোগলদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। দাউদ খান কররাণী কটক চুক্তি ভঙ্গ করে পুনরায় বঙ্গ, বিহার অধিকারের জন্য মোগলদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে ভদ্রকের মোগল সেনাপতি নজর বাহাদুরকে হত্যা করেন। এই সংবাদে জলেশ্বরের মোগল সেনাপতি মুরাদ খান টাঁড়ায় পলায়ন করেন। আবার টাঁড়ার মোগল বাহিনী গৌড়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

আফগান সৈন্য তেলিয়াগড় গিরিপথ অবরোধ করে মোগলদের বঙ্গে প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেন। অপরদিকে দাউদের বঙ্গ অভিযানের কথা শুনে ঈশা খান পূর্ববঙ্গে মোগল নৌ-অধ্যক্ষ শাহ বরদীকে যুদ্ধে পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। শাহ বরদী গৌড়ে মূল মোগল বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হন। তখন মোগল বাহিনীর বিপজ্জনক অবস্থা। তাঁরা উভয়দিকে আফগান কর্তৃক অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে ত্রিহূতের পথে পশ্চিমে প্রাণ নিয়ে পলায়ন করেন।

এদিকে সম্রাট আকবর মুনিমখানের মৃত্যু সংবাদ জ্ঞাত হয়ে খান-ই-জাহান হোসেন কুলী খানকে বাংলাতে প্রেরণ করেন এবং রাজা তোডর মল্লকে খান-ই-জাহানের সহযোগী করেন (নভেম্বর ১৫৭৫)। খান-ই-জাহান গৌড় থেকে পলায়নপর সৈন্যদের অভিযানে সামিল করে। তেলিয়াগড় মোগল অধিকারে আসে এবং রাজমহলে মোগল সৈন্য আফগান সৈন্যের সম্মুখীন হন।

১৫৭৫ এর ডিসেম্বর মাস থেকে ১৫৭৬ খ্রীস্টাব্দের জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘদিন উভয় বাহিনী সামনাসামনি অবস্থানের পর ১৫৭৬ সনের ১২ জুলাই তারিখে রাজমহলে যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধে দাউদ খান কররাণী পরাজিত ও বন্দী হন। মোগল সৈন্য তাঁকে হত্যা করে তাঁর ছিন্ন মুণ্ড সম্রাট আকবরের নিকট প্রেরণ করেন। এই যুদ্ধে দাউদের দু-জন সেনাপতি কতলু খান ও শ্রীহরি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। দাউদ খানের পতনের সঙ্গে স্বাধীন আফগান-সুলতানী সূর্য অস্তমিত হয় এবং বাংলাতে মোগল যুগের সূচনা হয়।

রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ খান কররাণীর পতন হলেও বাংলার পাঠানেরা বহুদিন মোগল সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করে নি। সেই কারণে সারা বাংলা মোগলদের কাছে অধরা থাকে। মোগল শক্তি শুধু পশ্চিম-উত্তর বাংলার কিছু অংশে সীমিত থাকে। মোগল কর্তৃত্বের বাইরে সারা বাংলার অনেক ভূঁঞা বা জমিদার তাঁদের ক্ষমতাকে বিস্তৃত করেন। মোগলদের বিরুদ্ধে ভূঁঞাদের প্রতিরোধ কাহিনী আকবরের সময় পার হয়ে জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে অন্ততঃ ১৬১২ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

.

* করিম সাহেব উল্লেখ করেছেন যে বারবাক শাহর মুদ্রা পাঠে শুধু হুমায়ুন শাহ সম্পর্কে সন্দেহ আছে, কারণ এই নামটি খুব পরিষ্কার নয়, কিন্তু সুলতানের নাম ও তারিখ ৯৪৯ হিজরীতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *