পালযুগ (৭৫০-১১৬৫ খ্রী.)
আনুমানিক ৭৫০ খ্রীস্টাব্দে মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে শ্রীগোপালদেবের গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণের মধ্য দিয়ে বঙ্গে পালযুগের সূচনা হয়৷ দীর্ঘদিন এই রাজবংশ নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে রাজক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত থাকার পরে সেন বংশের অভ্যুদয়ে পালরাজবংশের মদনপালদেব গৌড় থেকে নির্বাসিত হয়ে মগধে আশ্রয় গ্রহণ করেন৷
তৎকালে মদনপালদেবের সাম্রাজ্য মগধ ও উত্তরবঙ্গের কিছু অংশে সীমাবদ্ধ ক্ষুদ্ররাজ্যে পরিণত হয় এবং পরবর্তীকালে মগধের পূর্বাংশ মাত্র গৌড়েশ্বরের অধীনে ছিল৷ মদনপালদেবের পরে তাঁর কোন বংশধর পালসাম্রাজ্যের কোন অংশের অধিকার প্রাপ্ত হয়েছিলেন কিনা তা নির্ণয়ের কোন ঐতিহাসিক উপাদান অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয়নি৷ সেই কারণে মদনপালদেবকে পালরাজবংশের শেষ রাজা মনে করা যেতে পারে৷
অনেকের মতে পালবংশীয়দের আদিবাসভূমি (জনকভূঃ) ছিল উত্তরবঙ্গে (পুণ্ড্রবর্ধন/বরেন্দ্র), কিন্তু মূলরাজ্য ছিল পূর্ববঙ্গ (বাঙ্গাল/বঙ্গ)৷ পরবর্তীকালে তাঁদের রাজ্যসীমা বিভিন্নপ্রান্তে বিস্তৃত হয়৷ সুদীর্ঘকাল প্রতিষ্ঠিত পালবংশের অধীনে গৌড়ের রাষ্ট্রক্ষমতা বার বার সংকুচিত ও প্রসারিত হয়েছে৷ পালরাজাগণ বৌদ্ধ হলেও হিন্দু ব্রাহ্মণমন্ত্রী তাঁদের রাজকার্য করেছেন৷ তাঁরা হিন্দু ও বৌদ্ধ কোন ভেদাভেদ করতেন না৷
পালরাজবংশের নৃপতিগণের কালানুপঞ্জী নির্ণয় করা অত্যন্ত দুরূহ৷ এই কার্যে প্রধান অন্তরায় পালেদের উৎকীর্ণ শিলালেখ-তাম্রশাসনাদিতে ব্যবহৃত রাজ্যসংবৎসর, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচিত কোন অব্দের উল্লেখ নেই৷ অবশ্য ব্যতিক্রমী লেখমালা আছে, যথা—প্রথম মহীপালের সারনাথ (বারাণসী জেলা) শিলালেখ-বিক্রম সংবৎ, ১১ই পৌষ, ১০৮৩ (১০২৬ খ্রীঃ), মদনপালদেবের নোনগড় (মুঙ্গের জেলা) মূর্তিলেখ-বিক্রম সংবৎ ১২০১ (১১৪৪ খ্রীঃ) এবং বালগুদর (মুঙ্গের জেলা, ১৮তম রাজ্যবর্ষের ) মূর্তিলেখ-১০৮৩ শকাব্দ (১১৬১ খ্রীঃ)৷
এই ব্যতিক্রমী লেখমালা ও পাল নৃপতিগণের সমসাময়িক রাজাদের সময়কাল পালবংশের রাজাগণের কালানুপঞ্জী নির্ণয়ে সহায়ক৷ এই সব ঐতিহাসিক উপাদানের ভিত্তিতে গণনার মাধ্যমে পালনৃপতিগণের রাজত্বকাল ও এই গণনা অনুসারে পালবংশের ইতিহাসের সূত্রপাত ও গোপালদেবের সিংহাসনে আরোহণকাল আনুমানিক ৭৫০ খ্রীষ্টাব্দ স্থিরীকৃত হয়েছে৷
১৷ প্রথম গোপালদেব
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে গোপালদেব পাল বংশের সূচনা করেন৷ সর্ববিদ্যাবিশুদ্ধ দয়িতবিষ্ণু গোপালদেবের পিতামহ এবং রণকুশল বপ্যট ছিলেন তাঁর পিতা৷ জন্মসূত্রে তিনি পিতামহের কাছ থেকে শাস্ত্র এবং পিতার কাছ থেকে শস্ত্রজ্ঞান লাভ করেছিলেন৷ প্রকৃতিপুঞ্জ তাঁকে রাজলক্ষ্মীর কর গ্রহণ করিয়েছিলেন৷ তিনি গৌড়মণ্ডলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে মগধ জয় করেন এবং সমগ্র গৌড়বঙ্গ ও মগধের অধিপতি হন৷ তাঁর মহিষীর নাম দেদ্দাদেবী৷ দেদ্দাদেবীর গর্ভে ধর্মপালের জন্ম হয়৷
গোপালদেব কর্তৃক পালরাজবংশের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পুনর্গঠনের জন্য ধর্মপালদেবের খালিমপুর তাম্রশাসন, দেবপালদেবের মুঙ্গের তাম্রশাসন, ‘আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্প’ (বৌদ্ধগ্রন্থ), লামা তারানাথের বিবরণী প্রভৃতি ঐতিহাসিক উপাদানের সাহায্য গ্রহণ করা হয়৷
২৷ ধর্মপালদেব
গোপালদেবের স্বর্গারোহণের পরে তাঁর পুত্র ধর্মপাল সিংহাসনে আরোহণ করেন৷ তিনি ‘বিক্রমশীল’ উপাধি গ্রহণ করেন৷ পরমসৌগতো মহারাজাধিরাজ শ্রীগোপালদেবপদানুধ্যাতঃ পরমেশ্বরঃ পরমভট্টারকো মহারাজাধিরাজঃ শ্রীমান ধর্মপালদেব সুশাসন, অসাধারণ শৌর্যবীর্য এবং প্রবল ধর্মানুরাগের জন্য সাধারণের অতিপ্রিয় ছিলেন৷ কিন্তু পরম সৌগত ধর্মপাল পরধর্মদ্বেষ্টা ছিলেন না৷ তিনি মহাসামন্তাধিপতি শ্রীনারায়ণ বর্মার প্রার্থনাক্রমে ব্রাহ্মণ্যদেবতা নারায়ণের উদ্দেশে ভূমি দান করেন৷ তাছাড়া ব্রাহ্মণ গর্গ ছিলেন ধর্মপালের মন্ত্রী৷ তিনি স্বর্ণরেখ নামক জনৈক ব্রাহ্মণকে বরেন্দ্র ভূমির করঞ্জ নামক একখানি গ্রাম শাসন স্বরূপ প্রদান করেন৷ সৌমিত্রী তুল্য ভ্রাতা বাকপাল ছিলেন ধর্মপালের সেনাধ্যক্ষ৷ তিনি পিতৃপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র পালরাজ্যকে সাম্রাজ্যের মর্যাদায় উন্নীত করেন৷ তিনি গঙ্গানদীর অববাহিকা অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পূর্বক কান্যকুব্জ বিজয় করে ইন্দ্রায়ুধকে রাজ্যচ্যুত করেন ও তাঁর মনোনীত চক্রায়ুধকে তদীয় সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করেন৷ চক্রায়ুধের সিংহাসনে আরোহণের সময় শুধুমাত্র পাঞ্চাল বৃদ্ধরা অভিষেকবারি সিঞ্চন করেননি৷ ভেজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তি, গান্ধার ও কীর রাজ্যের প্রণতিপরায়ণ রাজারা কনৌজের দরবারে এসে ধর্মপালের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন৷
‘ভোজৈর্ন্মৎস্যৈঃ সমদ্রৈঃ কুরুযদুযবনাবন্তিগান্ধারকীরৈ-
ভুপৈব্যালোলমৌলিপ্রণতপরিণতঃ সাধুসংঙ্গীর্য্যমানঃ৷
হৃষ্যৎপাঞ্চালবৃদ্ধোদ্ধতকনকময়স্বাভিষেকোদকুম্ভো
দত্তঃ শ্রীকান্যকুব্জঃ সললিতচলিতভ্রূলতা লক্ষ্মযেন৷৷’
—খালিমপুর তাম্রশাসন রাজ্য সংবত ৩২
ধর্মপাল প্রায় সমগ্র উত্তর ভারতে তাঁর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও আজীবন তা রক্ষা করতে পারেন নি৷ তাঁর সমসাময়িক নৃপতি ছিলেন প্রতিহার বংশীয় রাজা বৎসরাজ ও দ্বিতীয় নাগভট্ট, রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব ও তৃতীয় গোবিন্দ৷ তিনি অন্যূন ৩৭ বৎসর রাজত্ব করেন৷
ধর্মপালদেবের রাজ্যত্ব কালে প্রদত্ত লেখমালা—বোধগয়াতে তাঁর ২৬ রাজ্য সংবতে প্রদত্ত শিলালেখ, খালিমপুরে ৩২ রাজ্যবর্ষের তাম্রশাসন, নালন্দাতে তারিখহীন তাম্রশাসন, নালন্দাতে তারিখহীন শিলালেখ, বালগুদরে (মুঙ্গেরে) তারিখহীন মূর্তিলেখ এবং পাহাড়পুরে (রাজশাহী জেলা) লাঞ্ছন-মুদ্রা বা শীলমোহর লেখাবলী আবিষ্কৃত হয়েছে৷
৩৷ দেবপাল
ধর্মপালের পরে তাঁর পুত্র দেবপাল ‘পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ’ উপাধি ধারণপূর্বক পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করেন৷ রাষ্ট্রকূট বংশীয় রাজা পরবলের কন্যা রন্নাদেবী ছিলেন দেবপালের মাতা৷
গৌড়েশ্বর দেবপাল শৌর্যবীর্যশালী ও উচ্চাভিলাষী ছিলেন৷ রাজা হয়ে তিনি রাজ্যজয়ে প্রবৃত্ত হন৷ তাঁর উৎকীর্ণ মূর্তিলেখ ও তাম্রশাসন এবং পরবর্তী নৃপতি নারায়ণ পালের বাদাল স্তম্ভলেখ থেকে তাঁর রাজ্য জয়ের কথা জানা যায়৷ দর্ভপাণির মন্ত্রণা ও কৌশলে, কেদার মিশ্রের বুদ্ধিবলে এবং খুল্লতাত ভ্রাতা জয়পালের নেতৃত্বে সুসংহত সামরিক বলের সাহায্যে তিনি দিগ্বিজয়ের মহান কৃতিত্ব অর্জন করেন৷ বাংলার দুই প্রতিবেশী রাজ্য উৎকল (উড়িষ্যা) ও প্রাগজ্যোতিষপুর (কামরূপ) জয় করেন, হূণদের গর্ব খর্ব করেন এবং দ্রাবিড় ও গুর্জরদের দর্প নাশ করেন৷ তিনি বিন্ধ্যপর্বত থেকে আরম্ভ করে মহেশললাটশোভিত ইন্দু কিরণে উদ্ভাসিত হিমাচল এবং পূর্ব সমুদ্র ও পশ্চিম সমুদ্র মধ্যবর্তী ভূভাগ করদ করতে সমর্থ হন৷ এতদব্যতীত বহিঃরাষ্ট্র জাভা, সুমাত্রা ও মালয় উপদ্বীপের রাজা বালপুত্রদেবের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক স্থাপন করেন৷
দেবপালের রাজত্বকাল নালন্দা মহাবিহারের আরব্ধ ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গৌরবোজ্জল যুগ৷ তাঁর রাজত্বকালে রাজ্যের সার্বিক গৌরব চরম শিখরে উন্নীত হয়েছিল৷ নালন্দাতে তাঁর রাজত্বকালে ৩৫ অথবা ৩৯ রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ তাম্রশাসন আবিস্কৃত হয়েছে৷ তিনি অন্যূন ৩৫ বা ৩৯ বৎসর রাজত্ব করেন৷ তাঁর রাজত্বকালে প্রদত্ত লেখমালা আবিস্কৃত হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলে৷ যথা—নালন্দাতে ৩ রাজ্যবর্ষের মূর্তিলেখ, কুর্কিহারে (গয়া, বিহার) ৯ রাজ্যবর্ষের লেখ, হিলসাতে (পাটনা) ২৫ রাজ্যবর্ষের মূর্তিলেখ, মুঙ্গেরে ৩৩ রাজ্যবর্ষের তাম্রশাসন, নালন্দাতে ৩৫ অথবা ৩৯ রাজ্যবর্ষের তাম্রশাসন, ঘোষরাবাতে (পাটনা) তারিখহীন শিলালেখ, নালন্দাতে তারিখ বিহীন অভিলেখ ও মূর্তিলেখ৷ তাছাড়া কলকাতা আশুতোষ সংগ্রহশালাতে তাঁর তারিখহীন শিলালেখ রক্ষিত আছে৷
৪৷ মহেন্দ্রপালদেব
দেবপালের মৃত্যুর পর মহেন্দ্রপালদেব পালবংশের রাজা হন (জগজ্জীবনপুর তাম্রশাসন)৷ মালদহ জেলার অন্তঃপাতী জগজ্জীবনপুর মৌজাতে ১৩-ই মার্চ ১৯৮৭ তারিখে জগদীশচন্দ্র গাইনের কোদালে মাটি থেকে উঠে আসে মহেন্দ্রপাল দেবের তাম্রশাসন৷ এই প্রসঙ্গে মালদহ নিবাসী গোপাল লাহার ‘জগজ্জীবনপুর তাম্রশাসন ও চতুর্থ পালরাজা মহেন্দ্রপালদেব’ গ্রন্থখানি দ্রষ্টব্য৷ পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্গত কুন্দালখাত বিষয়ের নন্দদীর্ঘিকোন্দ্রঙ্গে নির্মিত মহাবিহারের ব্যয় নির্বাহের জন্য ভূমিদান সম্পর্কিত তাম্রশাসনে পালযুগের নানা অজানা তথ্য উন্মোচিত হয়েছে৷ জগজ্জীবনপুর তাম্রশাসন আবিষ্কারের পূর্বে পালরাজা হিসাবে দেবপালতনয় মহেন্দ্রপালদেবের কোনরূপ প্রমাণসিদ্ধ অস্তিত্ব ছিল না৷ ফলে ঐতিহাসিকগণ মহেন্দ্রপালের পূর্বপ্রকাশিত ঐতিহাসিক উপাদানগুলি গুর্জর প্রতীহাররাজ মহেন্দ্রপালের বলে মনে করেছেন৷ তদনুযায়ী মনে করেছেন দেবপালের মৃত্যুর পর পালবংশের সাময়িক দুর্বলতার সুযোগে প্রতীহাররাজ প্রথম মহেন্দ্রপাল উত্তরবঙ্গ এবং বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল অধিকার করেছেন৷ বর্তমানে এই তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়েছে৷ দেবপালের পর তাঁর পুত্র মহেন্দ্রপালদেব পালসাম্রাজ্যের বুনিয়াদ অটুট রাখেন৷
জগজ্জীবনপুর তাম্রশাসনে জানা যায় শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজার পরিচয় ‘‘পরমসৌগতঃ পরমেশ্বরঃ পরমভট্টারকো মহারাজাধিরাজঃ শ্রীদেবপালদেব-পাদানুধ্যাত পরমসৌগতঃ পরমেশ্বরঃ পরমভট্টারকো মহারাজাধিরাজঃ শ্রীমান মহেন্দ্রপালদেবঃ কুশলী’ (২৯-৩০ পংক্তি)৷ সৌমিত্রিতুল্য ভ্রাতা শূরপাল ছিলেন উক্ত তাম্রশাসনের দূতক (সৌমিত্রিরিব রামেণ শূরপালোত্রদূতকঃ-৫৪ পংক্তি)৷
মহেন্দ্রপালদেবের মাতা ছিলেন দুর্লভরাজ তনয়া মাহটাদেবী (১৭ পংক্তি)৷ এই তাম্রশাসনের ঘোষক মহাসেনাপতি বজ্রদেব (৬৬পংক্তি), এবং খোদাইকারীর নাম সামন্ত শ্রীমাহট (৭৩ পংক্তি)৷ মহেন্দ্রপালদেব তাঁর রাজত্বের ৭ম রাজ্যাঙ্কে ২রা বৈশাখ এই তাম্রশাসন সম্পাদন করেন (৫০ পংক্তি)৷ তাম্রশাসনটি মালদহ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে৷
মহেন্দ্রপালদেবের লেখ ২৩ রাজ্যবর্ষ (ব্রিটিশ মিউজিয়াম), ৪র্থ রাজ্যবর্ষ (নালন্দা), ৫ম রাজ্যবর্ষ (রাজশাহী), ৬ষ্ঠ রাজ্যবর্ষ (ব্রিটিশ মিউজিয়াম), ৭ম রাজ্যবর্ষ (জগজ্জীবনপুর), ৮ম রাজ্যবর্ষ (রামগয়া), ৯ম রাজ্যবর্ষ (গুনারিয়া), ৯ অথবা ১৯ রাজ্যবর্ষ (নালন্দা) এবং ১৫ রাজ্যবর্ষ (মহীসন্তোষ) আবিষ্কৃত হয়েছে৷
লেখমালার নিরিখে বলা যায় তিনি অন্যূন ১৯ বৎসর না হলেও ১৫ বৎসর রাজত্ব করেন৷
৫৷ প্রথম শূরপালদেব
দেবপালের ঔরসে মাহটাদেবীর গর্ভজাত প্রথম শূরপাল অগ্রজ মহেন্দ্রপালদেবের পরে পাল বংশের রাজা হন৷ তাঁর রাজত্বের তৃতীয়বর্ষে উৎকীর্ণ তাম্রশাসনে (উত্তরপ্রদেশের মীর্জাপুরে প্রাপ্ত) তিনি নিজেকে দেবপাল পাদানুধ্যাত হিসাবে প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর উৎকীর্ণ তাম্রশাসনে পিতা দেবপাল, পিতামহ ধর্মপাল এবং প্রপিতামহ প্রথম গোপালদেবের নাম স্মরণ করেছেন, কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী নরপতি অগ্রজ মহেন্দ্রপালদেবের নাম বিস্মৃত হয়েছেন৷ সেই কারণে পালযুগের কালানুপঞ্জী গঠনে প্রমাদ ঘটেছে৷ জগজ্জীবনপুর তাম্রশাসন আবিষ্কারে সেই প্রমাদ দূরীভূত হয়৷ প্রথম শূরপাল এবং প্রথম বিগ্রহপাল একই ব্যক্তি বলে একদা প্রচলিত মত বর্তমানে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে৷ তাঁরা স্বতন্ত্র নরপতি৷ প্রথমজন দেবপালের পুত্র দ্বিতীয় জন জয়পালের পুত্র৷
প্রথম শূরপাল বৌদ্ধভক্ত হয়েও পরধর্মবিদ্বেষী ছিলেন না৷ তাঁর প্রাগুক্ত তাম্রশাসনে জানা যায় যে তিনি শিবভক্তা মাতা মাহটাদেবীর ইচ্ছাপূরণের জন্য বারাণসীতে ‘মাহটেশ্বর’ শিবলিঙ্গ স্থাপন ও মন্দিরের জন্য ভূমিদান করেন৷ মীর্জাপুর তাম্রশাসন ছাড়া তৃতীয়রাজ্য বর্ষে মূর্তিলেখ (ওদন্দপুর), পঞ্চম রাজ্যবর্ষে মূর্তিলেখ (রাজৌনা), নালন্দা ও সারনাথে তারিখবিহীন মূর্তিলেখ প্রাপ্ত হওয়া গেছে৷ সম্প্রতি তাঁর দ্বাদশ রাজ্যবর্ষের একটি মূর্তিলেখ আবিষ্কার হয়েছে৷ বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস’ গ্রন্থে ‘প্রাচীন বরেন্দ্র ভূমির পরিচয়’ প্রসঙ্গে সাইমুদ্দীন চৌধুরী দেবপালপুত্র শূরপালের দ্বাদশ রাজ্যবর্ষের একটি মূর্তিলেখ আবিস্কারের উল্লেখ করেছেন৷ প্রথম শূরপালদেব অন্ততপক্ষে ১২ বৎসর রাজত্ব করেন৷
৬৷ প্রথম বিগ্রহপালদেব
প্রথম শূরপালের পরে তাঁর পিতৃব্য জয়পালের পুত্র বিগ্রহপাল পাল বংশের রাজা হন৷ পালবংশ তালিকায় তিনি প্রথম বিগ্রহপালদেব৷ তাঁর পুত্র নারায়ণ পাল দেবের ১৭তম রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ তাম্রশাসন (ভাগলপুরে প্রাপ্ত) এবং মদনপালদেবের ৮ম রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ তাম্রশাসন (মানহলিতে প্রাপ্ত) উভয় লেখে উল্লেখ আছে—
‘‘শ্রীমদ্বিগ্রহপালস্তৎসুনুরজাত শত্রুরিবজাতঃ৷
শত্রুবনিতা-প্রসাধন-বিলোপী বিমলাসিজলধারঃ৷৷’’
প্রথম বিগ্রহপালদেব ছিলেন অজাতশত্রু—কাউকে বৈরীজ্ঞান করতেন না৷ তাঁর পিতৃব্য দেবপালের সময় থেকে গৌড়ের রাষ্ট্রীয় জীবনে মন্ত্রীবর্গের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়৷ প্রথম বিগ্রহপালদেবও মন্ত্রিগণের প্রতি শ্রদ্ধাবনত ছিলেন৷ তাঁর মহামন্ত্রী সোমেশ্বর যখন বৈদিকাচারে যজ্ঞ করতেন তখন সেই বৌদ্ধ নৃপতি প্রথম বিগ্রহপাল যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধাবনত শিরে শান্তিবারি গ্রহণ করতেন৷ তিনি মন্ত্রীর উপর রাজ্য চালানোর দায়িত্ব অর্পণ করে মহিষী লজ্জাদেবী সহ বিলাস-ব্যসনে কালাতিপাত করতেন৷
প্রথম বিগ্রহপালের ঔরসে লজ্জাদেবীর গর্ভে নারায়ণ পালের জন্ম হয়৷ প্রথম বিগ্রহপালদেব চার বৎসর রাজত্ব করেন৷
৭৷ নারায়ণপালদেব
প্রথম বিগ্রহপালদেবের পরে তাঁর পুত্র নারায়ণপাল পিতৃ সিংহাসনে আরোহণ করেন৷ মুদগিরি (মুঙ্গের) তে জয়স্কন্ধাবার স্থাপিত থাকার সময় তাঁর ১৭তম রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ তাম্রশাসনে (ভাগলপুরে প্রাপ্ত) উল্লেখ আছে ‘শ্রীমুদ্গিরি সমাবাসিতশ্রীমজ্জয়স্কন্ধাবারাৎ পরমসৌগতো মহারাজাধিরাজ শ্রীবিগ্রহপালদেবপাদানুধ্যাতঃ পরমেশ্বর পরমভট্টারকো মহারাজাধিরাজঃ শ্রীমন্নারায়ণ পালদেবঃ কুশলী’’৷ নারায়ণপালের উক্ত তাম্রশাসনে তাঁর পিতার সম্বন্ধে উল্লেখ আছে—
‘‘তপো মমাস্ত রাজ্যন্তে দ্বাভ্যামুক্তমিদংদ্বয়োঃ৷
যস্মিন্ বিগ্রহপালেন সগরেণ ভগীরথে৷’’
উল্লেখিত শ্লোক পাঠে পণ্ডিতগণ মনে করেন নারায়ণপাল পিতা বিগ্রহপালের জীবদ্দশায় সিংহাসনারোহণ করেন৷ বিগ্রহপালদেব শেষ বয়সে তপস্যাচরণে প্রবৃত্ত হন৷
নারায়ণপালদেব বৌদ্ধভক্ত হলেও পশুপত আচার্যকে দেবমন্দির প্রতিষ্ঠাপূর্বক শিব পূজার জন্য ভূমিদান করেন (ভগবন্তং শিবভট্টারকমুদিশ্য শাসনীকৃত প্রদত্তঃ)৷ ধর্ম সম্বন্ধে তিনি পরম উদার ছিলেন৷
তাঁর ৭ম রাজ্যবর্ষে মন্দিলেখ (গয়া), ৯ম রাজ্যবর্ষে শিলালেখ (কলকাতা মিউজিয়াম), ১৭শ রাজ্যবর্ষে তাম্রশাসন (ভাগলপুর), ৫৪তম রাজ্যবর্ষে মূর্তিলেখ ৯বিহার শরীফ) এবং স্তম্ভলেখ (বাদাল) আবিস্কৃত হয়েছে৷ তিমি কমপক্ষে ৫৪ বৎসর রাজত্ব করেন৷
৮৷ দ্বিতীয় রাজ্যপালদেব
নারায়ণ পালের পরে তাঁর পুত্র রাজ্যপাল পালরাজ্যের রাজা হন৷ তিনি প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় রাজ্যপাল৷ দেবপালের মুঙ্গের তাম্রশাসনে দেবপালের পুত্র যুবরাজ রাজ্যপালের কথা জানা যায়৷ তবে দেবপালতনয় রাজ্যপাল রাজা হননি৷ প্রথম মহীপাল ও মদনপালের তাম্রশাসনে দ্বিতীয় রাজ্যপালকে ‘মধ্যমলোকপাল’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে৷
‘‘তোয়াশয়ৈর্জলধিমূলগভীরগর্ভৈর্দেবালয়ৈশ্চ কুলভূধরতুল্যকক্ষৈঃ৷
বিখ্যাতকীর্ত্তিরভবৎ তনয়শ্চ তস্য শ্রীরাজ্যপাল ইতি মধ্যমলোকপালঃ৷৷’’
তিনি সমুদ্রের ন্যায় গভীর জলাশয় ও পর্বতপ্রমাণ উচ্চ দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷ তাঁর ১৩তম রাজ্যবর্ষের শিলালেখ (মুঙ্গের), ২৪তম রাজ্যবর্ষে স্তম্ভলেখ (নালন্দা), ২৮তম রাজ্যবর্ষে মূর্তিলেখ(কূরকীহার), ৩১তম বা ৩২তম রাজ্যবর্ষে মূর্তিলেখ (কূরকীহার), ৩৭তম রাজ্যবর্ষে মূর্তিলেখ (কূরকীহার) এবং শিলালেখ (ভাতুরিয়া) আবিষ্কার হয়েছে৷ তিনি অন্যূন ৩৭ বৎসর রাজত্ব করেন৷
৯৷ দ্বিতীয় গোপালদেব
দ্বিতীয় রাজ্যপালের ঔরসে ভাগ্যদেবীর গর্ভে গোপালদেবের জন্ম (মহীপাল ও মদনপালের তাম্রশাসন)৷ ইনি পালবংশের দ্বিতীয় গোপাল, প্রথম গোপাল পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন৷ দ্বিতীয় রাজ্যপালের স্বর্গারোহণের পরে দ্বিতীয় গোপাল গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন৷
মালদহজেলার জাজিলপাড়াতে তাঁর রাজত্বের ষষ্ঠবর্ষে বটপর্বতিকাস্থিত জয়স্কন্ধাবার থেকে প্রদত্ত তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে৷ এই তাম্রশাসনে সামবেদী ব্রাহ্মণ শ্রীধরশর্মাকে পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির কুন্দালখাত বিষয়ভুক্ত আনন্দপুর অগ্রহারের দুটি গ্রাম দানের কথা উল্লেখ আছে৷ তাছাড়া তাঁর ১ম রাজ্যবর্ষে দুটি মুর্তিলেখ (নালন্দা এবং মনধূক) এবং তারিখবিহীন একটি মূর্তিলেখ (বোধগয়া) আবিষ্কৃত হয়েছে৷ দ্বিতীয় গোপালদেব আনুমানিক পনের বৎসর রাজত্ব করেন৷
১০৷ দ্বিতীয় বিগ্রহপালদেব
দ্বিতীয় গোপালদেবের পরে তাঁর পুত্র বিগ্রহপালদেব পালবংশের রাজা হন৷ ইনি পালরাজবংশ তালিকায় দ্বিতীয় বিগ্রহপাল৷ প্রথম বিগ্রহপাল জয়পালের পুত্র ও বাকপালের পৌত্র, পালবংশের ৬তম রাজা ছিলেন৷ পরবর্তী পালরাজা মহীপাল ও মদনপালের তাম্রশাসনে দ্বিতীয় বিগ্রহপালদেবের উল্লেখ আছে৷ যথা—
‘তস্ম্যদ্বভুব সবিতুর্বসুকোটিবর্ষী কালেন চন্দ্র ইব বিগ্রহপালদেবঃ৷
নেত্রপ্রিয়েণ বিমলেন কলাময়েন যেনোদিতেন দলিতো ভুবনস্য তাপঃ৷৷’
সূর্য হতে যেমন কিরণকোটিবর্ষী চন্দ্র উৎপন্ন, তেমন রত্নকোটিবর্ষী বিগ্রহ পালদেবের জন্ম৷ নয়নানন্দদায়ক সুবিমল কলাময় রাজকুমারের জন্মে পৃথিবীর তাপ দূর হয়েছিল৷
দ্বিতীয় বিগ্রহপালদেব চার বা পাঁচ বৎসরের অধিক রাজত্ব করতে পারেন নি৷ সম্ভবত তাঁর রাজত্বকালে চন্দেল্লবংশীয় যশোবর্মা গৌড়দেশ আক্রমণ করেন (খাজুরাহোতে আবিষ্কৃত যশোবর্মার ১০১১ বিক্রমাব্দে (৯৫৪ খ্রীঃ) উৎকীর্ণ শিলালিপি)৷ অপরপক্ষে তিব্বতীয় কম্বোজ জাতির গৌড়দেশ আক্রমণ গুরুতর ও স্থায়ী ফলপ্রসূ হয়েছিল৷ কম্বোজবংশীয়রা গৌড়দেশের অধিকাংশ অধিকার করেন, ফলে গৌড়েশ্বর দ্বিতীয় বিগ্রহপালদেব গৌড়ভূমি থেকে বিতাড়িত হন৷ তিনি হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারেন নি৷
১১৷ প্রথম মহীপালদেব
পরম সৌগত মহারাজাধিরাজ শ্রীবিগ্রহপালদেবপাদানুধ্যাতঃ পরমেশ্বরঃ পরমভট্টারকো মহারাজাধিরাজঃ শ্রীমান্মহীপালদেব পরবর্তী পাল রাজা হন৷ পাল রাজবংশে তিনি প্রথম মহীপালদেব৷ তাঁর উৎকীর্ণ বাণগড়ে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে—
‘‘হতসকলবিপক্ষঃ সঙ্গরে বাহুদর্পাদনধিকৃতবিলুপ্তং রাজ্যমাসাদ্য পিত্র্যং৷
নিহিতচরণপদ্মো ভূভৃতাং মুধ্নি তস্মাদভবদনিপালঃ শ্রীমহীপালদেবঃ’’৷৷
শ্রীমহীপালদেব রণক্ষেত্রে বাহুদর্পপ্রকাশে সকল বিপক্ষ-পক্ষ নিহত করে পিতার ‘অনধিকৃত বিলুপ্ত’ রাজ্যগুলি উদ্ধার করে রাজগণের মস্তকে চরণপদ্ম সংস্থাপন করে অবনীপাল হয়েছিলেন৷ এই অর্থে প্রথম মহীপালদেব দ্বিতীয় পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা৷ সিংহাসনে আরোহণের সময় মহীপাল একটি ক্ষুদ্র রাজ্য লাভ করেন৷ তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ বপ্যট, ধর্মপাল ও দেবপালের মত রণনিপুণ যোদ্ধা ছিলেন৷ রাজা হয়ে তিনি রাজ্যবিস্তারে মনোনিবেশ করেন৷ খুব সম্ভব কম্বোজদের অধিকার থেকে তিনি তাঁর পিতৃভূমি (জনক-ভূঃ) বরেন্দ্র উদ্ধার করে পাল ইতিহাসে স্বীয় কীর্তি স্থাপন করেন৷ মহীপালের অধিকার কেবল বরেন্দ্রীতে নয়, উত্তর রাঢ়েও স্বীকৃত ছিল৷ রাজেন্দ্রচোলের ‘তিরুমালাই লেখ’এ মহীপালকে উত্তর রাঢ়ের শাসক বলা হয়েছে৷ অতএব প্রকৃত অর্থে তাঁকে ‘গৌড়েশ্বর’ বলা যায়৷ অঙ্গ-মগধে তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রমাণ তাঁর প্রদত্ত লেখাবলীর প্রাপ্তিস্থানগুলি থেকে পাওয়া যায়৷
প্রথম মহীপালের দীর্ঘ শাসনকাল মধ্যে তাঁর রাজ্যাধিকার তিনবার বহিঃশত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হয়৷
দক্ষিণ ভারতের চোল রাজা প্রথম রাজেন্দ্রচোল পবিত্র গঙ্গা জলের জন্য যুদ্ধাভিযান করে দণ্ডভূক্তি, দক্ষিণ রাঢ়, বাঙ্গাল দেশ এবং উত্তর রাঢ় অতিক্রম করে গঙ্গাতীর পর্যন্ত আগমন করেন৷ পৌরাণিক রাজা ভগীরথ গঙ্গার পবিত্র স্রোতধারা উত্তর ভারত থেকে পূর্বভারতে আনয়ন করেছিলেন, চোল রাজা রাজেন্দ্র সেই পুণ্য স্রোতধারা থেকে পবিত্র জলরাশি মাথায় করে দক্ষিণ ভারতে নিয়ে গিয়ে ‘গাঙ্গ-গোণ্ডা’ (গঙ্গা বিজয়ী) নামে পরিচিত হন৷ পবিত্র গঙ্গাজলে তাঞ্জোরের শিবগঙ্গা সরোবর পূর্ণ হয় এবং এই পবিত্র জলে কাবেরী নদী ও চোলগঙ্গা সরোবর পবিত্র হয়৷ এই গঙ্গাজলের যুদ্ধে রাজেন্দ্রচোল মহীপালের বাহুবলে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে স্বরাজ্যে প্রত্যাগমন করেন৷
প্রথম মহীপালের রাজত্বকালে কোন সময় কর্ণাটদেশীয় কোন রাজা গৌড়রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন৷ আর্য ক্ষেমীশ্বর কৃত ‘চণ্ড-কৌশিক’ নাটকে বলা হয়েছে, মহীপাল কর্ণাটদের পরাজিত করেন৷ গোহারওয়া তাম্রশাসনে কালচুরিরাজ গাঙ্গেয় দেব দাবি করেছেন যে, তিনি অঙ্গের অধিপতিকে পরাজিত করেছিলেন৷ তৎকালে অঙ্গ মহীপালের রাজ্যাধিকারের মধ্যে ছিল৷ মহীপালদেবের ৪৮তম রাজ্যবর্ষে (আনুমানিক ১০২৫ খ্রীঃ) ইমাদপুরে (মজফফরপুর, বিহার) আবিষ্কৃত প্রতিষ্ঠিত দুটি মূর্তির প্রেক্ষিতে অনুমান করা যায় মহীপাল স্বল্পকাল মধ্যে উত্তর বিহার ও বিহারের অন্যান্য অঞ্চল পুনরধিকার করেন৷ লিপি সাক্ষ্যে জানা যায় মহীপালের রাজ্যাধিকার বারাণসী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল৷ মহীপালের রাজত্বকালের অবসানে বারাণসী পালদের হস্তচ্যূত হয়৷
মহীপালদেবের রাজত্বকালে আব্বাসীয় খালিফা আল-কাদির বিল্লাহর সমর্থন পুষ্ট গজনী-রাজ গাজী (ধর্মযোদ্ধা) সুলতান মামুদের পুনঃ পুনঃ ভারত লুন্ঠন সংগঠিত হয়েছিল৷ এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য উত্তর-ভারতীয় হিন্দু রাজাগণ পাঞ্জাবের শাহী-রাজবংশের সঙ্গে সম্মিলিত হয়েছিলেন৷ মহীপাল এই সম্মেলনে বিরত ছিলেন৷ তারপর স্থানীশ্বর, মথুরা, কান্যকুব্জ, কালীঞ্জর প্রভৃতি নগর এবং দুর্গ ও পবিত্র তীর্থ ধ্বংসকালে মহীপাল উত্তরাপথের রাজন্যবর্গকে সাহায্য করতে বিরত ছিলেন৷ এ জন্য মহীপাল সমালোচিত হন৷ কিন্তু ভাঙনের মুখে পাল সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য তাঁর যুগপৎ উত্তরাপথের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি৷
মহীপাল তাঁর পূর্বপুরুষদের মত বৌদ্ধধর্মাবলম্বী (পরম সৌগত) ছিলেন৷ তিনি কেবল ধ্বংসপ্রাপ্ত পাল-সাম্রাজ্যরই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেননি, তিনি বৌদ্ধধর্মের হৃত মর্যাদাও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন৷ তিনি বৌদ্ধভক্ত হলেও পরধর্মদ্বেষী ছিলেন না৷
প্রথম মহীপালের রাজত্বকালে প্রদত্ত লেখ মালা—
১৷ বাঘাউরা (কুমিল্লা, বাংলাদেশ) মূর্তিলেখ-রাজ্যবর্ষ-৩,
২৷ নারায়ণপুর (কুমিল্লা, বাংলাদেশ) মূর্তিলেখ-রাজ্যবর্ষ-৪,
৩৷ বেলোয়া (দিনাজপুর, বাংলাদেশ) তাম্রশাসন-রাজ্যবর্ষ-৫,
৪৷ বাণগড় (দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ) তাম্রশাসন-রাজ্যবর্ষ-৯,
৫৷ নালন্দা (বিহার) শিলালেখ …………………..-রাজ্যবর্ষ-১১,
৬৷ বোধগয়া (বিহার) ………….মূর্তিলেখ—রাজ্যবর্ষ-১১,
৭৷ রাজভিটা শিলালিপি আনুমানিক ১০১০ খ্রীঃ (বাংলাদেশ, ঠাকুরগাঁয়ে প্রাপ্ত, বরেন্দ্রযাদুঘরে রক্ষিত (নং এ ৮৬৪১)৷ এতে ভূমিদান বিষয়ে তথ্য লিপিবদ্ধ আছে, এবং শিলালিপিতে উট, ঘোড়া ও শূকরের ছবি অঙ্কিত আছে৷)
৮৷ কূরকীহার (বিহার) ………………. মূর্তিলেখ—রাজ্যবর্ষ-২১ বা ৩১,
৯৷ সারনাথ (বারাণসী, উত্তরপ্রদেশ) শিলালেখ বিক্রম সংবৎ ১০৮৩ (১০২৬ খ্রীঃ)
১০৷ ইমাদপুর (বিহার) ……………..মূর্তিলেখদ্বয়—রাজ্যবর্ষ-৪৮,
১১৷ তেত্রাবন (বিহার) ……………মূর্তিলেখ—তারিখবিহীন,
প্রথম মহীপালদেব অন্তত পক্ষে ৪৮ বৎসর রাজত্ব করেন৷
১২৷ নয়পালদেব
প্রথম মহীপালের মৃত্যুর পর তৎপুত্র নয়পালদেব গৌড়-মগধ-বঙ্গের সিংহাসনে আরোহণ করেন৷ তিনি জিতেন্দ্রিয় পুরুষ ছিলেন৷ প্রকৃতিপুঞ্জ তাঁর অনুগত ছিল (মদনপালের তাম্রশাসন)৷ ‘পঞ্চরক্ষা’ গ্রন্থে ( কেমম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রহশালা) তিনি ‘পরমসৌগত মহারাজাধিরাজপরমেশ্বর শ্রীন্নয়পালদেব’ রূপে বর্ণিত হয়েছেন৷ তিনি বৌদ্ধভক্ত হলেও বীরভূমের সিয়ানে প্রাপ্ত শিলালেখ থেকে জানা যায় নয়পালদেব বহু মন্দির নির্মাণ, বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা ও মন্দিরশীর্ষে স্বর্ণকমল স্থাপন প্রভৃতি পুণ্যানুষ্ঠান করেন৷ বাণগড়ে আবিষ্কৃত তাঁর উৎকীর্ণ তারিখহীন শিলালেখ মূর্তিশিবের প্রশস্তিতে জানা যায় যে তিনি শৈবাচার্য সর্বশিবের শিষ্য ছিলেন(১২ নং শ্লোক)৷ এই প্রশস্তিতে উত্তরবঙ্গে সুবিশাল দ্বাদশভৌম (বারতলা) হিমগিরির ন্যায় শুভ্র মন্দিরের কথা এবং মন্দিরে সহস্র দেবদাসীর কথা জানা যায় (২৭ নং শ্লোক)৷ তাঁর রাজত্বের ১৩তম রাজ্যবর্ষে মূর্তিলেখ (রজৌমা), ১৫তম রাজ্যবর্ষে কৃষ্ণদ্বারিকা মন্দিরলেখ (গয়া) ও নরসিংহ মন্দিরলেখ (গয়া) আবিষ্কৃত হয়েছে৷ তিনি অন্যূন পনের বৎসর রাজত্ব করেন৷
১৩৷ তৃতীয় বিগ্রহপালদেব
নয়পালদেবের পর বিগ্রহপালদেব পালবংশের রাজা হন৷ ইনি পালবংশের তৃতীয় বিগ্রহপালদেব৷ প্রথম বিগ্রহপাল জয়পালের পুত্র এবং দ্বিতীয় বিগ্রহপাল দ্বিতীয় গোপালের পুত্র ছিলেন৷ তৃতীয় বিগ্রহপাল নয়পালের পুত্র৷ তিনি শৈব ছিলেন৷ তিনি চাতুর্বর্ণ্য সমাশ্রয় ছিলেন (মদনপালের মানহলি লিপি)৷
তাঁর অধিকাংশ লেখ বিহারে আবিষ্কৃত৷ দিনাজপুর জেলার বেলোয়াতে তাঁর ১১তম রাজ্যবর্ষের তাম্রশাসন এবং আমগাছিতে ১২তম রাজ্যবর্ষের তাম্রশাসন আবিস্কৃত হয়েছে৷ তাঁর পিতা নয়পালদেবের উৎকীর্ণ অন্যতম একটি শিলালেখ বাণগড়ে আবিস্কৃত হয়েছে৷ তাঁর পিতামহ প্রথম মহীপাল যে ‘অনধিকৃত বিলুপ্ত’ পিতৃরাজ্য বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন সে বরেন্দ্রতে তাঁর (মহীপাল) উত্তরাধিকারিগণ তাঁদের অধিকার বজায় রেখেছিলেন৷
বিহারের নৌলাগড়ে প্রাপ্ত মূর্তিলেখ তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বের ২৪তম রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ৷ অতএব তিনি অন্যূন ২৪ বৎসর বা তার অধিক কাল রাজত্ব করেন৷ তৃতীয় বিগ্রহপালের তিনপুত্র যথা—মহীপাল, শূরপাল ও রামপাল৷
১৪৷ দ্বিতীয় মহীপালদেব
তৃতীয় বিগ্রহপালদেবের পরে তাঁর পুত্র মহীপালদেব রাজা হন৷ ইনি পালরাজবংশে দ্বিতীয় মহীপালদেব৷ প্রথম মহীপালদেব দ্বিতীয় বিগ্রহপালদেবের পুত্র ছিলেন৷ দ্বিতীয় মহীপালদেব সন্বন্ধে পরবর্তী পাল নৃপতি মদনপালের তাম্রশাসনে উল্লেখ আছ৷—
‘তন্নন্দনশ্চন্দন-বারিহারি-কীর্ত্তি-প্রজানন্দিত-বিশ্বগীতঃ৷
শ্রীমান মহীপাল ইতি দ্বিতীয়ো দ্বিজেশমৌলিঃ শিববদ্বভূব৷৷’
বিগ্রহপালের পুত্র চন্দ্রশেখর শিবের ন্যায় শ্রীমান মহীপাল৷ তিনি মলয়জশীতল শুভ্র যশোরাশি দ্বারা জগৎকে আনন্দিত করে বিখ্যাত হয়েছিলেন৷ কিন্তু সমকালের সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত ‘রামচরিতম’ গ্রন্থে তিনি নৃপতিকুলকলঙ্ক রূপে বর্ণিত হয়েছেন৷
দ্বিতীয় মহীপাল সিংহাসনে আরোহণপূর্বক অনৈতিক আচরণে প্রবৃত্ত হন৷ তিনি ভ্রাতৃবিরোধের আশঙ্কায় ভ্রাতা শূরপাল ও রামপালকে কারারুদ্ধ করেন৷ তাঁর রাজত্বকালে উত্তরবঙ্গে দিবেবাকের নেতৃত্বে ‘কৈবর্তবিদ্রোহ’ দেখা দেয়৷ দ্বিতীয় মহীপাল বিদ্রোহদমনে ব্যর্থ এবং নিহত হন৷ বরেন্দ্র বিদ্রোহীদের করতলগত হয়৷
তাঁর পূর্বপুরুষ প্রথম মহীপালদেব অনধিকৃত বিলুপ্ত পিতৃরাজ্য গৌড়ভূমি উজাড় করে পালবংশে খ্যাত হয়েছিলেন, দ্বিতীয় মহীপালদেব প্রপিতামহর সেই খ্যাতি বজায় রাখতে চরমভাবে ব্যর্থ৷ দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্ব স্বল্পকাল স্থায়ী ছিল৷
১৫৷ দ্বিতীয় শূরপালদেব
দ্বিতীয় মহীপালদেবের মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতা শূরপালদেব পাল সাম্রাজ্যের অবশিষ্টাংশের অধীশ্বররূপে ঘোষিত হন৷ তিনি পালবংশের দ্বিতীয় শূরপালদেব৷ তাঁর পিতার নাম তৃতীয় বিগ্রহপালদেব৷ প্রথম শূরপাল দেবপালের পুত্র এবং মহেন্দ্রপালের ভ্রাতা ছিলেন৷ পরবর্তী পালনৃপতি মদনপালের মানহলি তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে—
‘তস্যাভূদনুজো মহেন্দ্রমহিমাকন্দঃ প্রতাপশ্রিয়া
নেকঃ সাহসসারথির্গুণময়ঃ শ্রীশূরপালনৃপ’
মহেন্দ্রতুল্য মহিমান্বিত, স্কন্দতুল্য প্রতাপশ্রীসমন্বিত, সাহসসারথি, নীতিগুণসম্পন্ন শ্রীশূরপাল নামক নৃপতি তাঁর (দ্বিতীয় মহীপালের) অনুজ ছিলেন৷ উক্ত তাম্রশাসনে দ্বিতীয় শূরপালদেব নৃপ ঘোষিত হলেও সমকালীন গ্রন্থকার সন্ধ্যাকর নন্দী এ বিষয়ে নীরব৷
তৎকালে কৈবর্তনেতা দিবেবাক মৃত্যুমুখে পতিত হন এবং তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র (রুদ্রকের পুত্র) ভীম বরেন্দ্রর আধিপত্য গ্রহণ করেন৷ কিন্তু ভীম দীর্ঘদিন দেশ শাসন করতে পারেননি৷ কারণ দ্বিতীয় শূরপালের পর তাঁর ভ্রাতা রামপাল কৈবর্তদের হাত থেকে জনকভূমি বরেন্দ্র উদ্ধারে ব্রতী হন৷
দ্বিতীয় শূরপালদেবের দ্বিতীয় রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ বৌদ্ধমূর্তিলেখ (ওদন্তপুরী) যা ভারতীয় যাদুঘরে রক্ষিত আছে বলে এশিয়টিক সোসাইটি কর্তৃক মুদ্রিত ‘রামচরিতম’ গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ আছে৷ এই বৌদ্ধমূর্তি লেখের নিরিখে বলা যায় তিনি অন্যূন দুই বৎসর রাজত্ব করেন৷
১৬৷ রামপালদেব
দ্বিতীয় শূরপালদেবের পরে তাঁর ভ্রাতা রামপালদেব পালবংশের রাজা হন৷ পরবর্তী পালরাজা মদনপালের মানহলি তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে—
‘‘তস্যাপি সহোদরো নরপতিদিক প্রজা নির্ভর-
ক্ষোভাহৃত বিব্রত বাসব ধৃতিঃ শ্রীরামপালোহভবৎ৷’’
রামপাল যখন পালবংশের রাজা হন, তখন কৈবর্তনেতা দিবেবাকের ভ্রাতা রুদ্রকের পুত্র ভীম গৌড়-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত৷ রামপাল হৃত-বরেন্দ্র উদ্ধারের জন্য পুত্র রাজ্যপাল ও অমাত্যবর্গের সঙ্গে পরামর্শ করে সাম্রাজ্যের প্রধান সামন্তগণের সাক্ষাতের জন্য আটবিক বা বনময়প্রদেশ সমূহে পর্যটন করে সামন্তগণের সমর্থন পান৷ এ জন্য তাঁকে নদীতীরবর্তী বহু ভূমি ও বিপুল অর্থ দান করতে হয় (‘দেবেন-ভুবো বিপুলদ্রবিনস্য চ দানতঃ সুখাচক্রে৷/অমুনা হরিনাগ পদাতিলব্ধবহলত্রভাবহসৌ৷৷’ রামচরিতম)৷ প্রধান সামন্তগণ হলেন (১) কোটাটবীর রাজ বীরগুণ, (২) দণ্ডভুক্তির রাজা জয়সিংহ, (৩) বালবলভীর রাজা বিক্রম, (৪) অপর-মন্দারপতি লক্ষ্মীশূর, (৫) কুজবটির রাজা শূরপাল, (৬) তৈলকম্পরাজ রুদ্রশিখর, (৭) উচ্ছালরাজ ময়গল সিংহ, (৮) ঢেক্করিয়ের রাজা প্রতাপ সিংহ, (৯) কজঙ্গলের রাজা নরসিংহার্জুন, (১০) সঙ্কটগ্রামের রাজা চণ্ডার্জুন, (১১) নিদ্রাবলীর রাজা বিজয়রাজ, (১২) কৌশাম্বীর রাজা দ্বোরপবর্ধন, (১৩) পদুবম্বার রাজা সোম এবং (১৪) মগধের পীঠির রাজা ভীমযশ৷
তদনন্তর রামপাল পদাতিক, অশ্বারোহী ও গজারোহী ত্রিবিধ সৈন্য সংগ্রহ করেন৷ তাঁর প্রধান সহায়ক ছিলেন তাঁর মাতুল রাষ্ট্রকূট তিলক মহন (মথন)৷ রাজা মহন, তাঁর দুই পুত্র মহামাঙ্গলিক কাহ্নরদেব ও সুবর্ণদেব এবং ভ্রাতুষ্পুত্র মহাপ্রতিহার শিবরাজ সকলে নিজ নিজ সৈন্যবাহিনী সহ রামপালের পাশে উপস্থিত হন৷ রামপাল সম্মিলিত শক্তি নিয়ে নৈকামেলক নৌ-সেতু দ্বারা মহাতটিনী গঙ্গা পার হয়ে বরেন্দ্র আক্রমণ করেন৷ দুই পক্ষের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে ভীম ও তাঁর অভিন্নহৃদয় সুহৃদ হরি যুদ্ধে ধৃত ও নিহত হন৷ রামপাল জনকভূমি বরেন্দ্র উদ্ধার করেন৷ রামচন্দ্র যেমন অর্ণব লঙ্ঘন করে রাবণবধান্তে জনকনন্দিনী লাভ করেছিলেন, রামপালও সে রূপে যুদ্ধার্ণব সমুত্তীর্ণ হয়ে ভীম নামক ক্ষৌণীনায়কের বধসাধন করে জনকভূমি বরেন্দ্রী লাভে ত্রিজগতে আত্মযশঃ বিস্তৃত করেছিলেন৷ সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতমে এই যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায়৷
বরেন্দ্র বিদ্রোহদমনান্তে রামপাল গঙ্গা ও করতোয়ার মধ্য স্থানে রামাবতী নামে একটি নতুন নগরী নির্মাণ করে সেখানে রাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করে গৌড় রাজশক্তির নষ্ট-গৌরব পুনরুদ্ধারে ব্রতী হন৷ তিনি বরেন্দ্র অধিকার করে ভীমের সেনাগণকে স্বীয় সেনাদলে নিযুক্ত করেন৷ তিনি বরেন্দ্র অঞ্চলের শান্তি শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে যত্নবান হন এবং প্রজাদের করভার লাঘব করে কৃষির উন্নতি সাধন করেন৷
রামপাল পিতৃভূমি বরেন্দ্র উদ্ধার করে নিকটবর্তী রাজ্যসমূহে প্রভাব বিস্তার করেন৷ কামরূপ ও উৎকল জয় এবং মধ্যদেশের গাহড়বাল ও চালুক্যদের আক্রমণ প্রতিরোধ রামপালের অন্যতম কৃতিত্ব৷ তবে পালরাজ্যের রাঢ়বাংলাতে কর্ণাটক্ষত্রিয় সেন বংশ এবং মিথিলাতে কর্ণাটবংশোদ্ভূত নান্যদেব রামপালের শিরঃপীড়ার কারণ হয়৷ এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে রামপালের দীর্ঘ প্রতিযোগিতা চলে৷ রামচরিতম কাব্যে বলা হয়েছে রামপাল কর্ণাটদের লোলুপ দৃষ্টি (কর্ণাটেক্ষণ লীলা) থেকে বরেন্দ্রীকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিলেন৷ কিন্তু উত্তর বিহারে তাঁর ক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়েছিল বলে মনে হয়, কারণ কর্ণাটবংশীয় নান্যদেব আনুমানিক ১০৯৭ খ্রীষ্টাব্দে ক্ষমতাতে প্রতিষ্ঠিত হন৷
রামপালের রাজত্বের ৩য় বর্ষের মূর্তিলেখ (তেত্রাবন, বিহার), ২৬তম রাজ্যবর্ষের মূর্তিলেখ (আরম, বিহার), ৩৭তম রাজ্য রাজ্যবর্ষের শিলালেখ (মুঙ্গের, বিহার), ৪২তম রাজ্যবর্ষের মূর্তিলেখ (চণ্ডীমাউ, বিহার) এবং বিহার থেকে প্রাপ্ত দুইখানি তারিখবিহীন মূর্তিলেখ আবিষ্কৃত হয়েছে৷ তিনি অন্যূন ৪২ বৎসর রাজত্ব করেন৷
‘রামচরিতম’ কাব্যগ্রন্থে জানা যায় তিনি মাতুল মহন (মথন) এর মৃত্যু সংবাদে শোকাবিষ্ট হয়ে পুত্রের হাতে সিংহাসন অর্পণ করে মুদগিরি (মুঙ্গের) তে গঙ্গা-সলিলে প্রাণ বিসর্জন দেন৷ তার মৃত্যুতে তাঁর শত্রুপক্ষীয়গণ (Hostitle Kings) উৎফুল্ল হয়েছিলেন কিন্তু তাঁর পুত্র কুমার পাল রাজা হয়ে তাঁদেরকে দমন করেছিলেন৷
১৭৷ কুমারপালদেব
রামপালদেবের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কুমারপালদেব গৌড়সিংহাসনে আরোহণ করেন৷ মদন পালের তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে—
‘‘তস্মাদজায়ত নিজায়ত বাহুবীর্য-
নিষ্পীতপীবরবিরোধিযশঃপয়োধিঃ৷
নেদিষ্ঠকীর্তিশ্চনরেন্দ্রবধূকপোল-
কর্পূরপত্রমকরীষু কুমারপালঃ ৷৷’’
কুমারপালদেব নিজ আয়ত বাহুবীর্যের দ্বারা পীবর (বলিষ্ঠ) শত্রুগণের যশঃ-সাগর পান করেছিলেন৷ তিনি নরেন্দ্রবধূর কপোলে কর্পূরের পত্র ও মকরীর চিত্রণ বিষয়ে বিপুল কীর্তিলাভ করেন৷
রাজ্যভিষেকের অব্যবহিত পরে চতুর্দিক থেকে বিপজ্জালবেষ্টিত হয়েও নবীন গৌড়েশ্বর বিচলিত হননি৷ তাঁর রাজ্যশাসন ব্যাপারে তদীয় ‘চিত্তানুরূপ’ মন্ত্রী বৈদ্যদেব প্রধান সহায় ছিলেন৷ উৎকলরাজ অনন্তবর্মা চোড়গঙ্গ গৌড়রাজ্য আক্রমণ করলে বৈদ্যদেব দক্ষিণবঙ্গে একটি নৌ-অভিযান করেন এবং জয়লাভ করেন৷ বোধহয় তৎকালে অনন্তবর্মা চোড়গঙ্গের সাহায্যে কর্ণাটবংশীয় বিজয়সেন উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ়ে অধিকার স্থাপনের উদ্যোগ করেছিলেন৷
কামরূপের সামন্তরাজা তিঙ্গ্যদেব বিদ্রোহ ঘোষণা করলে বৈদ্যদেব আপন তেজস্বী প্রভুর আজ্ঞাকে মাল্যদানের ন্যায় মস্তকে ধারণ করে কতিপয় দিবসের দ্রুত রণযাত্রার অবসানে নিজভূম বিমর্দনে তিঙ্গ্যদেবকে পরাভূত করেন এবং তিনি গৌড়েশ্বর কর্তৃক তথাকার নরেন্দ্রপদে নিযুক্ত হন৷ অবশ্য পরবর্তীকালে বৈদ্যদেব রাজউপাধি গ্রহণ পূর্বক কামরূপে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন৷ কুমারপালদেব স্বল্পকাল রাজত্ব করেছিলেন বলে মনে হয়৷
১৮৷ তৃতীয় গোপালদেব
কুমারপালদেবের পরে তাঁর পুত্র গোপালদেব রাজা হন৷ তিনি পালরাজবংশে তৃতীয় গোপালদেব৷ প্রথম গোপালদেব বপ্যটের পুত্র ও পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং দ্বিতীয় গোপালদেব রাজ্যপালের পুত্র ছিলেন৷ মদনপালের তাম্রশাসনে তৃতীয় গোপালদেব সম্বন্ধে উল্লেখ আছে—
‘‘প্রত্যর্থিপ্রমদাকদম্বকশিরঃ সিন্দুরলোপক্রম
ক্রীড়াপাটলপাণিরেষ সুষুবে গোপালমুর্ধ্বীভুজঃ৷
ধাত্রী-পালন জ্ন্তমানমহিমাকর্পূর পাংশূৎকরে-
র্দ্দেবঃ কীর্তিময়ৈর্নিজৈর্বিতনুতে যঃ শৈশবে ক্রীড়িতঃ৷৷’’
গোপালদেব শৈশবেই কীর্তিলাভ করেছিলেন৷ তিনি শত্রু-প্রমদাগণের সিন্দুরবিন্দু লোপ করে পাটলপাণি হয়েছিলেন৷ পালবংশে তৃতীয় গোপালদেবের রাজত্ব সীমিতকাল স্থায়ী এই রূপ ধারণা পূর্বে ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের অন্তঃপাতী দিনাজপুরের রাজীবপুরে প্রাপ্ত তাঁর ১৪তম রাজ্যবর্ষে উৎকীর্ণ মূর্তিলেখ আবিষ্কারের পর সেই ধারণা বর্তমানে পরিবর্তিত হয়েছে৷ সম্ভবতঃ তিনি ১৫ বৎসর রাজত্ব করেন৷ তাঁর রাজত্ব ১১৪৩ খ্রীষ্টাব্দে শেষ হয়৷
তৃতীয় গোপালদেবের সময় পাল সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য হয়ে উঠে, কারণ তৎকালে উৎকলরাজ অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ তাঁর রাজ্যে সেনা অভিযান করেন (কেন্দুপাতনা তাম্রশাসন), তৎকালে বর্মণবংশীয় ভোজবর্মা পূর্ববঙ্গে সম্ভবতঃ সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন (বেলাব তাম্রশাসন), তৎকালে কল্যাণীর চালুক্যবংশীয় রাজা তৃতীয় সোমেশ্বর মগধ জয়ের দাবী করেন, লার তাম্রশাসন থেকে জানা যায় গাহড়বলরাজ গোবিন্দচন্দ্র মুঙ্গের পর্যন্ত তাঁর অধিকার বিস্তৃত করেন এবং সেন বংশীয়গণ রাঢ় অঞ্চলে স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ করেন৷ তৎকালে সেনবংশীয়গণ প্রবল ও পরাক্রমী ছিলেন৷
সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতম’ গ্রন্থে চতুর্থ পরিচ্ছেদে ১২ নং শ্লোকে গোপালদেবের শত্রুঘ্নোপায় হেতু স্বর্গ গমনের উল্লেখ আছে (‘অপি শত্রুঘ্নোপায়াদগোপালঃ স্বর্জগ্রাম তৎসূনুঃ৷’)৷ রাজশাহী জেলার মন্দাগ্রামে আবিষ্কৃত তৃতীয় গোপালদেবের শিলালেখ থেকেও জানা যায় যে, তিনি আক্রমণকারী শত্রু সেনার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেও অপার (দুর্ভাগ্য) বশতঃ স্বর্গগমন করেন৷
১৯৷ মদনপালদেব (১১৪৩-১১৬৫ খ্রী.)
তৃতীয় গোপালদেবের পরে তাঁর পিতৃব্য মদনপালদেব পালবংশের রাজা হন (১১৪৩ খ্রীঃ)৷ পরমসৌগত মহারাজাধিরাজঃ শ্রীরামপালদেব পাদানুধ্যাতঃ পরমেশ্বর পরমভট্টারকো মহারাজাধিরাজঃ শ্রীমদনপালদেব জ্যোৎস্নাধবল কীর্তিপুর দ্বারা জগৎ পূর্ণ করে সপ্তসাগরমেখলা পৃথিবীকে পালন করেছিলেন (মানহলি তাম্রশাসন)৷
মদনপাল পতনোন্মুখ পাল সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার শেষ চেষ্টা করেছিলেন৷ তাঁর সাম্রাজ্যে গাহড়বালরাজ গোবিন্দচন্দ্রর মুঙ্গের পর্যন্ত বিস্তৃত অধিকার (লার তাম্রশাসন) প্রতিহত করে মগধে গাহড়বালদের উৎখাত করে পালকর্তৃত্ব পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করেন৷ তাঁর রাজত্বকালে উৎকীর্ণ কয়েকটি লিপি বিহারে আবিষ্কৃত হয়েছে, যথা—নোনগড়ে ১২০১ বিক্রমাব্দের (১১৪৪ খ্রীঃ) মূর্তিলেখ, বিহার শরীফে তৃতীয় রাজ্যবর্ষের মূর্তিলেখ, জয়নগরে ১৪তম রাজ্যবর্ষের মূর্তিলেখ, আরমাতে ১৪তম রাজ্যবর্ষের স্তম্ভলেখ, বালগুদরে ১৮তম রাজ্যবর্ষের (১০৮৩ শক) মূর্তিলেখ৷ বিহারে আবিষ্কৃত মদনপালদেবের এই লেখমালা প্রমাণ করে আবিস্কারের স্থানগুলি তৎকালে তাঁর অধিকারে ছিল৷ তা ছাড়া বারাণসীর রাজঘাটে তাঁর মহাসন্ধিবিগ্রহিক ভীমদেবের শিলালেখ আবিষ্কৃত হয়েছে৷
কিন্তু মদনপালদেবের রাজত্বকালেই পালবংশের প্রতাপ ক্রমশঃ মন্দীভূত হতে থাকে৷ পূর্ববর্তী নৃপতি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মহারাজাধিরাজ তৃতীয় গোপালদেবের মৃত্যুর পর কামরূপে নিযুক্ত সামন্তরাজা বৈদ্যদেব রাজউপাধি গ্রহণপূর্বক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, পূর্ববঙ্গের বর্মণ রাজাগণ স্বাতন্ত্র্য দাবী করেন এবং সর্বোপরি তৎকালে সেনবংশীয় নরপতি বিজয়সেনের উত্তরবঙ্গে অধিকার বিস্তার সংগঠিত হয়৷
শ্রীরামাবতীনগর পরিসর সমাবাসিত শ্রীমজ্জয়স্কন্ধাবার থেকে প্রদত্ত মদনপাল দেবের ৮ম রাজ্যাঙ্কের উৎকীর্ণ তাম্রশাসন বাংলাদেশ অন্তঃপাতী দিনাজপুরের মানহলিতে আবিষ্কৃত হয়েছে৷ অনেকে মনে করেন গৌড়েশ্বর মদনপালদেবের মানহলি তাম্রশাসন উত্তরবঙ্গে প্রাপ্ত একমাত্র লিপি এবং বিজয়সেন মদনপালদেবের ৮ম রাজ্যাঙ্কের (১১৫১-৫২ খ্রীঃ) পরবর্তী সময়ে বরেন্দ্রভূমি অধিকার করেন৷ কিন্তু ১৯৯০ খ্রীষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর থানার অন্তর্গত রাজীবপুর মৌজায় মদনপালদেবের ২য় রাজ্যবর্ষ এবং ২২তম রাজ্যবর্ষে প্রদত্ত দুইখানি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে৷ এই তাম্রশাসন দুটির পাঠ নির্ভুল হলে মানতে হবে ১১৬৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের এই স্থানটিতে পালবংশের অধিকার অক্ষুণ্ণ ছিল এবং সমগ্র বাংলা তৎকালে মদনপালের হস্তচ্যুত হয় নি৷
রাজশাহী জেলার দেবপাড়াতে প্রাপ্ত তারিখবিহীন প্রশস্তিতে উল্লেখ আছে বিজয় সেন গৌড়েন্দ্রকে সবলে আক্রমণ করেছিলেন (২০নং শ্লোক)৷ সম্ভবতঃ এই আক্রমণের ফলেই গৌড়েন্দ্র বরেন্দ্র ত্যাগ করে তাঁর সংকুচিত রাজ্য মগধে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হন৷ মদনপালদেব গৌড়বঙ্গে পাল রাজবংশের শেষ পাল নৃপতি৷ মদনপালদেবের পরে মগধে যে সমস্ত পাল উপাধি যুক্ত রাজাগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তাঁরা গোপালদেব প্রতিষ্ঠিত পাল রাজবংশ সম্ভূত ছিলেন কি না তা প্রমাণিত হয় নি৷ যাই হোক না কেন সেন বংশের অভ্যুদয়ে গৌড়বঙ্গে পাল রাজত্ব শেষ হয় এবং মগধে তুর্কি আক্রমণে তথায় মুসলিম রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়৷
উপসংহার
বপ্যট-তনয় গোপালদেব প্রতিষ্ঠিত পালসাম্রাজ্যকে ধর্মপাল ও দেবপাল সুবিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত করেন, প্রথম মহীপালদেব যে সাম্রাজ্যকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন, রামপালদেব যে সাম্রাজ্যকে শেষবারের জন্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সেই সাম্রাজ্য যেন মদনপালদেবের সময়কালেই একেবারে শেষ হয়ে গেল৷ তবুও বলা যায় প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে পালরাজবংশ দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশ৷ এই রাজবংশে গোপালদেব থেকে মদনপালদেব পর্যন্ত ১৯ জন পালরাজা নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে প্রায় চারশত বৎসর আঃ-৭৫০-১১৬৫ খ্রীঃ) রাজত্ব করেন৷
পালরাজবংশের মদনপালদেব পর্যন্ত সর্বমোট ১৯ জন পালরাজা যে পালরাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালদেব ও তাঁর বংশসম্ভূত ছিলেন তা ঐতিহাসিক উপকরণের দ্বারা প্রমাণিত৷ ১৯ জন পাল রাজাই স্বতন্ত্র পালরাজা৷ কেউ কারোর সঙ্গে অভিন্ন নন৷ এতদ্ব্যতিরিকে মগধে আবিষ্কৃত শিলালিপিতে উৎকীর্ণ নৃপতি মহেন্দ্রপাল, গয়াতে আবিষ্কৃত শিলালিপিতে ও প্রাচীন পুঁথিতে উল্লেখিত নৃপতি গোবিন্দপাল (১১৬১-১১৯৩), কাবায়া জয়নগরে (মুঙ্গের) আবিষ্কৃত ৩৫ রাজ্যবর্ষে প্রদত্ত মূর্তিলেখে নরপতি পলপাল (১১৬৫-১২০০), মহদীপুর হাইস্কুল (মালদা) সংগ্রহশালায় রক্ষিত গৌড় থেকে প্রাপ্ত চারটি প্রস্তরখণ্ডে উৎকীর্ণ (তারিখ বিহীন) যক্ষপাল ও গয়াতে আবিষ্কৃত শিলালিপিতে উৎকীর্ণ নরপতি যক্ষপাল এবং হুগলি জেলার হরিপাল, ভাগীরথীর পশ্চিমপ্রদেশের দেশপাল, ঢাকা জেলার কাপাশিয়ায় শিশুপাল, ঢাকা জেলার তালিপাবাদ পরগনার যশপাল প্রমুখ পাল উপাধি যুক্ত নৃপতিগণ গোপালদেবের রাজবংশ সম্ভূত ছিলেন কি না তা নির্ণয়ের জন্য প্রমাণসিদ্ধ ঐতিহাসিক উপাদান আবিষ্কার অবধি অপেক্ষা করতে হবে৷ আগামীতে পালযুগের আরও ঐতিহাসিক উপাদান আবিষ্কার বা উদ্ধার হলে পালরাজবংশের বংশপঞ্জী ও কালানুপঞ্জী আরও নিখুঁত হবে৷

পাল রাজবংশ ও তার পুনর্গঠনের সপক্ষে উল্লেখযোগ্য
ঐতিহাসিক উপাদান এবং আনুমানিক রাজত্বকাল



