বাংলায় মোগল আমল ও সমকালীন দিল্লীর সম্রাট

বাংলায় মোগল আমল ও সমকালীন দিল্লীর সম্রাট

ভারতবর্ষে মোগল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাবর। তিনি মাতার দিক থেকে চেঙ্গিশ খাঁ এবং পিতার দিক থেকে তৈমুর লঙ্গের বংশধর।

বাবর ১৫২৬ খ্রীস্টাব্দে প্রথম পাণিপথের যুদ্ধে লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পরাস্ত ও নিহত করে ভারতবর্ষে মোগল যুগের সূচনা করেন।

জাহিরুদ্দীন বাবরের পুত্র নাসিরুদ্দীন হুমায়ুন তাঁর প্রথম দফার (১৫৩০-১৫৪০ খ্রীঃ) রাজত্বকালে ৯৪৫ হিজরী (১৫৩৮-৩৯ খ্রীঃ) সনে বাংলার হোসেন শাহী বংশের গৌড়েশ্বর মাহমুদের প্রবর্তনায় শের-শাহ সূরের বিরুদ্ধে গৌড় আক্রমণ কালে পথিমধ্যে গৌড়েশ্বরের মৃত্যু হলে গৌড় নগর অধিকার করে স্বয়ং বাংলার প্রভু হয়েছিলেন। তিনি স্বল্পদিন গৌড়নগরে সুখে কালাতিপাত করে জাহাঙ্গীর কুলী বেগকে বাংলার শাসক নিযুক্ত করে গৌড় পরিত্যাগ করেন।

সম্রাট হুমায়ুনের পুত্র জালালুদ্দীন আকবরের রাজত্বকালে বাংলার শেষ আফগান সুলতান দাউদ খান কররাণীকে সুবর্ণরেখা নদীর নিকটে তুকারাই এর প্রাঙ্গণে যুদ্ধে পরাস্ত করেন সম্রাট প্রেরিত সেনাপতি খান-ই-খানান মুনিম খান (৩রা মার্চ ১৫৭৫/২০ জেলকিদ ৯৮২ হিঃ)। কিন্তু মুনিম খান ২৩ অক্টোবর ১৫৭৫ খ্রীস্টাব্দে (রজব ৯৮৩ হিঃ) মৃত্যুবরণ করলে বাংলায় মোগল শাসনের ছন্দপতন হয়। তৎকালে দাউদ খান কররাণী যুদ্ধ-চুক্তি ভঙ্গ করে এবং সম্রাট আকবরের অধীনতা অস্বীকার করে স্বাধীন সুলতান হন (১৫৭৫-১৫৭৬/৯৮৩-৯৮৪ হিঃ)। সম্রাট আকবর মুনিম খানের স্থলে হোসেন কুলী খান (খান-ই-জাহান) কে নিযুক্ত করেন। প্রকৃতপক্ষে হোসেন কুলী খানের নিযুক্তি থেকেই বাংলায় ধারাবাহিকভাবে মোগল শাসন শুরু হয়।

৮২) হোসেন কুলী খান : (খান-ই-জাহান)-১৫৭৫-১৫৭৮ খ্রীঃ (৯৮৩-৯৮৬ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

খান-ই-জাহানের প্রকৃত নাম হোসেন। তিনি সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের অষ্টমবর্ষে ‘কুলী বেগ খান’ এবং অষ্টাদশ বর্ষে ‘খান-ই-জাহান’ উপাধি প্রাপ্ত হন। হোসেন কুলী বেগ সম্রাট আকবরের প্রথম জীবনের অভিভাবক বৈরাম খানের ভাগ্নে ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ওলি বেগ জুলকদর।

১২ই জুলাই ১৫৭৬ তারিখে রাজমহল যুদ্ধের পর খান-ই-জাহান মরহুম দাউদ খানের যাবতীয় সম্পত্তি ও হস্তীযুথ হস্তগত করে সম্রাট আকবরের নিকট প্রেরণ পূর্বক বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যায় সম্রাটের প্রভুত্ব বদ্ধমূল করে টাঁড়া (TANDA) তে আগমন করেন। রাজমহলের যুদ্ধ ও দাউদের হত্যাকাণ্ড মোগল ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। বাংলা বিজয় এখনও সুদূরপরাহত হলেও এই বিজয়ের ফলে রাজধানী টাঁড়াকে কেন্দ্র করে বাংলায় এলাকাভিত্তিক মোগল অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর রাজত্বকালের অধিকাংশ সময় যুদ্ধকার্যে ব্যয়িত হলেও তাঁর আমলে বাংলাতে মোগল শাসন সূচিত হয়। তাঁর শাসন কালকে Military Administration বলা যেতে পারে।

এই সময়ে মরহুম দাউদ খান কররাণীর মাতা নওলাখা বিস্তর ধন-সম্পদ সহ সপ্তগ্রাম বন্দরে আশ্রয় নেন। তখনও সপ্তগ্রাম নদী-বন্দরের অস্তিত্ব বজায় ছিল। তা ছাড়া সপ্তগ্রাম একটি প্রশাসনিক কেন্দ্ররূপেও সুলতানী আমলে গুরুত্ব বহন করত। খান-ই-জাহান সপ্তগ্রাম গমন করেন। মুর্শিদাবাদের গোয়াসে দাউদের মাতা আত্মসমর্পণ করেন।

অতঃপর খানজাহান ১৫৭৮ খ্রীস্টাব্দের বর্ষাকালে নদ-নদীবেষ্টিত পূর্ববঙ্গের ভূঁঞাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের শেষ যুদ্ধাভিযান। তিনি ভাওয়ালে পৌঁছালে নিকটবর্তী সুবর্ণগ্রাম এবং মহেশ্বরী পরগনার জমিদার ইব্রাহিম নারাল এবং কমিমদাদ মুসাজাই আত্মসমর্পণ করেন। ভূঁঞা জমিদারের হাত থেকে বেরিয়ে মোগল নৌ-বাহিনীর অধ্যক্ষ শাহ বরদী পুনরায় খান-ই-জাহানের অনুগত হন। কিন্তু প্রতিপক্ষ ঈশা খাঁ আত্মসমর্পণ করেন নি। খান-ই-জাহান শাহ বরদী ও মুহাম্মদ কুলীকে ঈশা খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণ করেন । ঈশা খান পরাজিত হয়ে পলায়ন করলেও মজলিস দিলাওয়ার এবং মজলিস কুতুব মোগলদের আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করেন। তালিপাবাদের জমিদার টিলা গাজী মোগলদের পশ্চাদপসরণে সাহায্য না করলে মোগল বাহিনী হয়ত ধ্বংস হয়ে যেত। খান-ই-জাহান টাঁড়া ফিরে এসে সিহাতপুর (সম্ভবত সৈয়দপুর) এর স্বাস্থ্য নিবাসে রোগ ভোগে মৃত্যু বরণ করেন (১৯শে ডিসেম্বর ১৫৭৮/শওয়াল ৯৮৬ হিঃ)।

৮৩) ইসরাইল কুলী খান : (Officiated)-১৫৭৮-১৫৭৯ খ্রীঃ (৯৮৬-৯৮৭ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

হোসেন কুলী খানের মৃত্যুর পর এবং পরবর্তী শাসক নিযুক্ত হওয়া পর্যন্ত মধ্যবর্তী চারমাস সময় বাংলার রাজকার্য নির্বাহ করার জন্য মরহুম হোসেন কুলী খানের ভ্রাতা ইসমাইল কুলী খান নিযুক্ত হন (ডিসেম্বর ১৫৭৮—এপ্রিল১৫৭৯ খ্রীঃ/শওয়াল ৯৮৬—সফর ৯৮৭ হিঃ)। তিনি হয়ত বাংলার সুবাদারী পদ প্রাপ্তির আশা করেছিলেন, কিন্তু দিল্লী সম্রাট আকবর মুজফফর খাঁ তরবতীকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন এবং ইসমাইল কুলী খানকে রাজ ক্ষমতা হস্তান্তরের আদেশ দেন।

৮৪) মজফফর খাঁ : (খাজা মহম্মদ তরবতি)-১৫৭৯-১৫৮০ খ্রীঃ (৯৮৭-৯৮৮ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

ভারতসম্রাট আকবর রোটাস বিজয়ী মজঃফফর খাঁকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। তিনি ১৫৭৯ খ্রীস্টাব্দের এপ্রিল মাসে বাংলার কার্যভার গ্রহণ করেন। ইতোপূর্বে তিনি পাটনায় হেকিম পদে নিযুক্ত ছিলেন। আকবরের ভ্রাতা মির্জা হাকিম কাবুলের শাসন কর্তা ছিলেন। মির্জা হাকিম একদল ষড়যন্ত্রকারীর প্ররোচনায় দিল্লীর সিংহাসন অধিকারে সচেষ্ট ছিলেন।

তখন পূর্বভারতে মজঃফ্ফর খাঁর শাসন এলাকায় বিদ্রোহীগণ প্রবল হয়ে ওঠেন। বিদ্রোহীগণের সাথে যুক্ত হয় বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকা আফগান সৈন্যগণ। মজফফর খাঁ বিদ্রোহ দমন অভিযানে রাজমহলে বিদ্রোহীগণের সম্মুখীন হন। উভয়পক্ষের ঊনিশ দিন নিরবছিন্ন সংগ্রামের পর মজঃফফর খাঁ পশ্চাৎধাবন করতে করতে টাঁড়া (TANDA) দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি ১৫৮০ খ্রীস্টাব্দের ১৯শে এপ্রিল টাঁড়া দুর্গমধ্যে আক্রান্ত হন এবং নিহত হন।

৮৫) রাজদ্রোহী রাজকর্মচারী কর্তৃক জবর দখল-১৫৮০-১৫৮২ খ্রীঃ (৯৮৮-৯৯০ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

মজফ্ফর খাঁর মৃত্যুর পর বিদ্রোহীগণ সম্রাট আকবরের অধীনতাপাশ ছিন্ন করে আকবরের ভ্রাতা মির্জা হাকিমকে নতুন সম্রাট বলে ঘোষণা করেন এবং মির্জা হাকিমের নামে খুতবা পাঠ শুরু করেন। মির্জা হাকিম তখন কাবুলে। তাঁর প্রতিনিধি স্বরূপ বাংলায় নবনিযুক্ত রাজদ্রোহী রাজকর্মচারী কর্তৃক প্রায় দুই বৎসর (১৫৮০-১৫৮২ খ্রীঃ) বাংলা জবর দখল অবস্থায় থাকে। এই অবস্থায় বাংলা সম্রাট আকবরের সাম্রাজ্য থেকে সাময়িক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়।

সম্রাট আকবরের নিকট পূর্ব-ভারতের ভয়াবহ পরিস্থিতির সংবাদ পৌঁছলে তিনি শক্তিশালী বাহিনী সহ রাজা তোডরমল্লকে পূর্ব ভারতে এবং পূর্ব ভারতের বিদ্রোহের প্রেরণার প্রাণ কেন্দ্র তদীয় ভ্রাতা মির্জা হাকিমের বিরুদ্ধে রাজা মান সিংহকে কাবুলে প্রেরণ করেন। রাজা মান সিংহ কাবুল থেকে মির্জা হাকিমকে বিতাড়িত করেন (১৫৮১)। রাজা তোডরমল্ল দক্ষতার সঙ্গে মুঙ্গের অধিকার করেন। রাজা তোডরমল্ল হিন্দু জমিদারগণকে সম্রাটের পক্ষে আনয়ন করেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে মোগল সেনাপতিগণের মনোমালিন্য ঘটলে সম্রাট আকবর তাঁকে রাজধানীতে আহ্বান করে রাজস্ব বিভাগের দায়িত্ব প্রদান করেন।

১৫৮২ খ্রীস্টাব্দে বাংলাতে বিখ্যাত ঘটনা—খেতুরীর মহোৎসব। নরোত্তমের পিতৃব্য পুত্র রাজা সন্তোষ দত্ত খেতুরীতে বিগ্রহ স্থাপনোপলক্ষে সপ্ত দিবস ব্যাপী মহোৎসব সম্পন্ন করেন। এই উৎসবে প্রভূত বৈষ্ণব সমাগম হয়। নরোত্তম পরিবেশিত লীলা কীর্তন ‘গরেণহাটি ধারা’ নামে প্রবর্তিত হয়। নিত্যানন্দের পত্নী জাহ্নবা দেবীর বৈষ্ণব সমাজের উপর প্রচুর আধিপত্য ছিল, ইনি ১৫৮২ খ্রীস্টাব্দে খেতুরীর মহোৎসবে উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় বৈষ্ণব দর্শন, বৈষ্ণব ধর্ম ও বৈষ্ণব ধর্মের আচার প্রণালী সম্বন্ধে শ্রীচৈতন্যদেব স্বয়ং কোন শাস্ত্র রচনা করে যাননি। কিন্তু রূপ, সনাতন ও শ্রীজীব গোস্বামী মহাপ্রভু নির্দেশিত বিবরণ তাঁদের গ্রন্থমালায় লিপিবদ্ধ করেন। খেতুরীর ষড়বিগ্রহ প্রতিষ্ঠাকালে রূপ, সনাতন ও শ্রীজীব গোস্বামীকৃত শাস্ত্রগ্রন্থাদির বিধান অনুযায়ী সমস্ত ক্রিয়া নির্বাহ হয়।

৮৬) মির্জা আজিজ খাঁ কোকা :-(খান-ই-আজম)-১৫৮২-১৫৮৩ খ্রীঃ (৯৮৮-৯৯০ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

বাংলার সুবাদার মজফফর খাঁর মৃত্যুর পর বাংলার অরাজকতা অবসানের জন্য সম্রাট আকবর তাঁর ধাত্রীপুত্র মির্জা আজিজ খাঁ কোকা (খান-ই-আজম) কে বাংলার গভর্ণর নিযুক্ত করেন (৬ই এপ্রিল ১৫৮২ খ্রীঃ)। মির্জা আজিজ অতি রণকুশলী সেনাপতি ছিলেন, তিনি বিদ্রোহীদের মধ্যে পরস্পর বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তাঁদেরকে পরাজিত করে রাজধানী তাণ্ডা অধিকার করেন। এই কার্যে সেখ ইব্রাহিম তাঁর সাহায্যকারী ছিলেন। সেখ ইব্রাহিম ১৫৮২ সন থেকে ১৫৮৪ সন পর্যন্ত বাংলাতে অধিষ্ঠান করেন।

সেই সময় তাণ্ডার প্রাকৃতিক পরিবেশে দূষণ চরম আকার ধারণ করে। গৌড় নগর প্রায় উজাড় হয়ে পড়ে। মির্জা আজিজ খাঁ কোকা বাংলার আবহাওয়া জনিত কারণে সম্রাটের নিকট বাংলার পদ থেকে পদত্যাগের প্রার্থনা জানালে সম্রাট তাঁকে বিহারে তাঁর জাইগীরে (Fief) যাবার আদেশ দেন। মির্জা আজিজ খাঁ কোকা বাংলার পরবর্তী সুবাদারী দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই ১৮ ই মে ১৫৮৩ নিজ জাইগীরে জাইগীরদারীর উদ্দেশে হাজিপুরে গমন করেন। পরবর্তীকালে ৯৯৮ হিঃ (১৫৯০)সনে গুজরাটের সুবাদার নিযুক্ত হন। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পরে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনকালে উচ্চপদে থেকে ১০৩৩ হিজরী (১৬২৩-২৪ খ্রীঃ) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়।

৮৭) ওয়াজির খাঁ হেরেবি (Officiated)-১৫৮৩ খ্রীঃ (৯৯১ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলার সুবাদারের পদ থেকে মির্জা আজিজের বদলি এবং পরবর্তী সুবাদারের উপস্থিত হবার মধ্যবর্তী প্রায় পাঁচ মাস সময় কাল বাংলা পূর্ববর্তী সুবাদারের অধস্তন রাজকর্মী ওয়াজির খাঁর দায়িত্বে থাকে।

তৎকালে সেনাপতিবিহীন মোগল সৈন্যদের উপর পাঠান আক্রমন বৃদ্ধি পায়। একদিকে পাঠান সমরনায়ক কতুল খাঁ এবং অপরদিকে তাঁর সঙ্গে সংগতি রেখে ভাটি অঞ্চলের মাসুম খাঁ কাবুলির আক্রমনে মোগল সৈন্যশিবির ব্যতিব্যস্ত থাকে।

৮৮) শাহবাজ খাঁ কুম্বু :-১৫৮৩-১৫৮৬ খ্রীঃ (৯৯১-৯৯৫ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

সম্রাট আকবর মির্জা আজিজ খাঁ কোকার শূন্য পদে ১৮ই মে ১৫৮৩ তারিখে শাহবাজ খাঁ কুম্বুকে সুবাদার পদে নিয়োগ করেন। তিনি উক্ত বর্ষের অক্টোবর মাসের শেষ দিকে বাংলাতে নিজের কার্যভার গ্রহণ করেন। তাছাড়া সম্রাট আকবর ওয়াজির খাঁকে ১৫৮৫ খ্রীঃ (৯৯৪ হিঃ) তে বাংলায় সম্মেলিতভাবে সুবাদার (Jointly Subadar) নিযুক্ত করেন।

তখন এই দেশে বিশৃঙ্খল অবস্থা। সমগ্র বাংলা যেন এক বিচ্ছিন্ন রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে। উত্তর ফ্রন্টে যখন মোগল সৈন্যের সঙ্গে আফগানদের যুদ্ধ চলছে, তখন দক্ষিণ ফ্রন্টে ওয়াজির খাঁর নেতৃত্বে মোগল সৈন্য আগ্রাসী আফগান সেনা নায়ক কতলু খাঁকে তুকারাই পর্যন্ত পশ্চাৎধাবনে বাধ্য করেন। পর্যুদস্ত কতলু খাঁর প্রস্তাবিত সন্ধির শর্তে বাংলার সর্বাধিনায়ক শাহবাজ খাঁ উড়িষ্যার সার্বভৌমত্ব বিজিত কতলু খাঁকে ছেড়ে দেওয়া সম্রাট আকবরের নিকট যথাযোগ্য বিবেচিত না হওয়ার কারণে শাহবাজ খাঁ পদচ্যুত হন।

৮৯) ওয়াজির খাঁ হেরেবি :-১৫৮৬-১৫৮৭ খ্রীঃ (৯৯৫-৯৯৬ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

শাহবাজ খাঁ কুম্বুর পদচ্যুতির পর সম্রাট আকবর পাঠানদের সঙ্গে যুদ্ধের নায়ক ওয়াজির খাঁকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। পাঠান নায়ক কতলু খাঁর সঙ্গে তাঁকে যুদ্ধরত থাকতে হয়। এই কার্যে তাঁকে সাহায্য করেন ইব্রাহিম খাঁ। ইতঃপূর্বে ওয়াজির খাঁ Jointly Subadar হিসাবে বাংলাতে নিজ দায়িত্ব নির্বাহ করেন।

সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ২৪শে নভেম্বর ১৫৮৬ খ্রীস্টাব্দের এক শাহী আদেশ নামা (a royal decree) মোতাবেক ১৫৮৭ খ্রাস্টাব্দ থেকে বাংলাতে নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। এই ব্যবস্থা অনুসারে ওয়াজির খাঁ প্রথম গভর্ণর (সিপাহ সলার) নিযুক্ত হন, মুহিব আলী খান সহকারী সুবাদার, পূর্ববর্তী সুবাদার শাহবাজ খান কুম্বুকে বখশী এবং করম-উল্লাহকে দিওয়ান নিযুক্ত করা হয় (আকবর নামা)।

বাংলার Subadar হিসাবে অল্পদিন বাংলার শাসন কার্য করে তিনি ১৫৮৭ সনের ১লা আগস্ট (৯৯৬ হিঃ রমজানমাস) বিসূচিকা (cholera) রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানী তাণ্ডাতে মৃত্যু বরণ করেন।

৯০) সৈয়দ খাঁ চাটঘা : ১৫৮৭খ্রীঃ (৯৯৬ হিঃ)—১৫৯৪ খ্রীঃ (১০০৩ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)

ওয়াজির খাঁ হেবেবির মৃত্যুর পর সম্রাট আকবর বিহারের (Jointly Subadar) সৈয়দ খাঁকে ২৬ শে আগস্ট ১৫৮৭ তারিখে সুবাদার পদে বাংলার দায়িত্ব প্রদান করেন এবং ৯৯৮ হিঃ (১৫৮৯ খ্রীঃ) সনে রাজা মান সিংহকে পাঞ্জাব থেকে বিহারে সুবাদার পদে নিয়োগ করে আফগান দমনে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করেন। সৈয়দ খাঁ বাংলার সুবাদার পদে ১৫৯৪ খ্রীস্টাব্দের মে মাস পর্যন্ত অধিষ্ঠিত থাকেন।

বাংলার সুবাদার সৈয়দ খাঁর সুদীর্ঘ শাসনকালে বাংলা দেশে আবার পাঠানগণ ও স্থানীয় জমিদারগণ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। সম্রাট আকবর মোগল বিরোধী শক্তিকে চূর্ণ করবার জন্য রাজা মান সিংহকে বাংলার সুবাদার করেন এবং বাংলার সুবাদার সৈয়দ খাঁকে বিহারে বদলি করেন।

৯১) রাজা মান সিংহ :-১৫৯৪-১৬০৬ খ্রীঃ (১০০৩-১০১৫ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জালালুদ্দীন মহম্মদ আকবর-১৫৫৬-১৬০৫ খ্রীঃ (৯৬৩—১০১৪ হিঃ)।

 ১৫ অক্টোবর ১৬০৫ খ্রীঃ আকবরের মৃত্যু ।

• নূরুউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর (সেলিম) আকবরের পুত্র-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪—১০৩৭ হিঃ)

 ২৪ শে অক্টোবর ১৬০৫ খ্রীঃ জাহাঙ্গীরের সিংহাসনে আরাহণ

সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হয়ে রাজা মান সিংহ ১৫৯৪ খ্রীস্টাব্দের ৪ঠা মে বাংলাতে আগমন করেন। তিনি তাণ্ডা থেকে রাজ্যের রাজধানী রাজমহলে স্থানান্তরিত করেন (৭.১১.১৫৯৫)। ‘রাজমহলের’ পূর্ব নাম ‘আকমহল’। মান সিংহ রাজ্যের নব প্রতিষ্ঠিত রাজধানীর নাম দেন ‘আকবর নগর’। তিনি ১৬০৬ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার সুবাদার ছিলেন।

বাংলার সুবাদার মান সিংহ আজমীরে থাকাকালীন তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র জগৎ সিংহ বাংলাতে মান সিংহের প্রতিনিধি (Deputy Governor) নিযুক্ত হন, কিন্তু তিনি কার্যভার গ্রহণের পূর্বেই ৬-ই অক্টোবর ১৫৯৮ তারিখে মৃত্যু হলে তাঁর বালক পুত্র মহা সিংহ পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। জ্যেষ্ঠতাত প্রতাপ সিংহ ছিলেন মহা সিংহের অভিভাবক। তৎকালে আফগানগণ প্রবল হয়ে উঠেন। মান সিংহ বাংলাতে ফিরে আসেন (১৬০০ খ্রীঃ)।

সম্রাট আকবর তাঁর রাজত্বের শেষ বৎসরে গুরুতর পীড়ায় আক্রান্ত হন। তাঁর অন্তিম মুহূর্তে উপস্থিত থাকার জন্য রাজধানী থেকে আহ্বান আসে। আহ্বান লিপি পেয়ে মান সিংহ রাজধানীতে গমন করেন (১৬০৪ খ্রীঃ)। ১৬০৫ খ্রীস্টাব্দের ১৫ ই অক্টোবর সম্রাট আকবর মৃত্যুবরণ করেন। আকবর পুত্র জাহাঙ্গীর (সেলিম) সম্রাট হয়ে মান সিংহকে বাংলার সুবাদার পদে বহাল রাখেন। মান সিংহ ১৬০৬ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজ দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু সম্রাট জাহাঙ্গীর দক্ষ সুবাদার মান সিংহকে বাংলা থেকে বদলী করেন।

৯২) কুতুবউদ্দীন কোকতলাশ : ১৬০৬-১৬০৭খ্রীঃ (১০১৫—১০১৬ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

সম্রাট জাহাঙ্গীর (সেলিম) রাজা মান সিংহকে বাংলা হতে অপসারিত করে তাঁর বিশ্বস্ত কোকতলাশ বা ধাত্রীপুত্র কুতুবউদ্দীনকে বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে বাংলার সুবাদার করেন (১২.৯.১৬০৬)। জাহাঙ্গীর বর্ধমানের জায়গীরদার শের আফগানের অলোক সামান্য রূপলাবণ্যবতী ইরাণী পত্নী মেহেরউন্নিসার রূপে মোহিত ছিলেন। রাজরিরংসা চরিতার্থের উদ্দেশে জাহাঙ্গীরের নির্দেশে মেহেরউন্নিসাকে হরণের জন্য কুতুবউদ্দীন শের আফগানের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং উভয়েই নিহত হন (১৬০৭ খ্রীঃ, ৩০শে মে)। নিহত রাজকর্মীর বিধবা পত্নী মেহেরউন্নিসা সম্রাট জাহাঙ্গীরের হস্তগত হয়। পরবর্তীকালে সম্রাট তাঁকে বিবাহ করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের হৃদয়সম্রাজ্ঞী প্রথমে নূরমহল পরে নূরজাহান নামে খ্যাত হন।

৯৩) জাহাঙ্গীর কুলি বেগ : (লালা বেগ)-১৬০৭-১৬০৮খ্রীঃ (১৬১৬-১৬১৭ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

কুতবউদ্দীন কোকতলাশের মৃত্যুর পর সম্রাট জাহাঙ্গীর বিহারের সুবাদার জাহাঙ্গীর কুলি বেগকে বাংলার সুবাদার করেন এবং বিহারের শূন্য পদে সেখ আলাউদ্দীন ইসলাম খাঁ চিস্তিকে নিয়োগ করেন। জাহাঙ্গীর কুলি বেগ হলেন সম্রাট হুমায়ুনের গ্রন্থাগারিক নিজামের পুত্র। লালা বেগ নামে তিনি পরিচিত। শাহজাদা সেলিম (জাহাঙ্গীর) এর অনুচর হিসাবে সম্রাট আকবর জাহাঙ্গীর কুলি বেগকে নিযুক্ত করেন। জাহাঙ্গীর কুলি অর্থ জাহাঙ্গীরের ভৃত্য। বাস্তবিক তিনি ছিলেন সম্রাটের ভৃত্য, কিন্তু স্বীয় বুদ্ধিমত্তা, সাহস এবং চারিত্রিক গুণাবলীর দ্বারা আমীরের মর্যাদা লাভ করেন। বাংলাতে তাঁর কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না। তিনি বৃদ্ধ বয়সে বাংলায় এসে আবহাওয়া জনিত কারণে রোগ ভোগে মৃত্যু বরণ করেন। ১৬০৮ খ্রীস্টাব্দের ৬ ই মে (২০ শে মহরম ১০১৭ হিঃ) তারিখে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রাপ্ত হন।

৯৪) সেখ আলাউদ্দীন ইসলাম খাঁ চিশতী : ১৬০৮-১৬১৩ খ্রীঃ (১০১৭-১০২২ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

বাংলার সুবাদার জাহাঙ্গীর কুলী বেগের মৃত্যুর পর বিহারের সুবাদার ইসলাম খাঁ চিস্তিকে বাংলার সুবাদার করা হয়। ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী’তে উল্লেখ আছে—কাবুল থেকে লাহোরে ফিরে যে তারিখে সম্রাট জাহাঙ্গীর কুলী বেগের মৃত্যু সংবাদ অবগত হন, সেই তারিখে ইসলাম খাঁকে বাংলার সুবাদার পদে নিয়োগ করেন। অতএব ইসলাম খাঁ ২০ শে মহরম ১০১৭ হিজরী (৬ই মে ১৬০৮) তে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। এবং বিহারের শূন্য পদে সুবাদার হন আফজল খাঁ। ইসলাম খাঁ উক্ত বর্ষে জুন মাসের প্রথম দিকে বাংলার রাজধানী রাজমহলে আগমন করেন এবং রাজমহলে পৌঁছেই বাংলায় মোগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ও সুচিন্তিত পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন। ইসলাম খাঁর বাংলার সুবাদার পদে নিযুক্তির দিনেই তাঁর মনসব বৃদ্ধি করে ৪০০০/৩০০০ ধার্য হয়। পরবর্তী কালে তাঁর মনসব আরও বৃদ্ধি পায়। মাঝে মাঝে ইসলাম খাঁ রাজদণ্ড সম্মান সুচক পরিচ্ছদ (খেলাত) ও সম্মান সূচক তরবারী প্রাপ্ত হয়ে সম্মানিত হতেন। ইসলাম খাঁর প্রতি সম্রাট জাহাঙ্গীরের পূর্ণ আস্থা ছিল, ইসলাম খাঁও বাংলা বিজয়ের জন্য তাঁর প্রচেষ্টা নিষ্ঠার সঙ্গে আমৃত্যু পালন করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ইসলাম খাঁকে বাংলার সুবাদার করার পর বাংলার দেওয়ানী পদে ওয়াজির খাঁর স্থলে আবুল হাসান মাসহাদীকে নিয়োগ করেন। তিনি ‘মুতাকাদ খান’ উপাধি প্রাপ্ত হন। সম্রাট মীরবহর (নৌ-সৈন্যাধ্যক্ষ) পদে ইতিমান খান কে নিয়োগ করেন। ইতিমান খানের সঙ্গে বঙ্গে আসেন তাঁর যোদ্ধা পুত্র অন্যতম সেনাপতি মির্জা নাথান, যিনি ‘বাহরীস্থান-ই-গায়বী’র প্রণেতা।

ইসলাম খাঁ ছিলেন সেলিম চিশতীর পৌত্র ও সম্রাট আকবরের পালিত পুত্র ও জাহাঙ্গীরের বাল্য বন্ধু। ইসলাম খাঁর প্রকৃত নাম শায়খ আলা-উদ-দীন চিশতী।

পূর্বে উল্লেখ করেছি সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলার শেষ আফগান সুলতান দাউদ খান কররাণীর পরাজয় ও নিধনের পরে বাংলায় মোগল অধিকারের সূচনা হয়। কিন্তু আফগান রাজশক্তির পতন হলেও আফগান সেনা নায়ক এবং বাংলার ভূঁঞা জমিদার ও সামন্ত প্রধানগণ মোগল শক্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বাংলার সুবাদার রাজা মান সিংহ রাজ্যের রাজধানী টাঁড়ার চেয়ে অধিক নিরাপদ রাজমহলে স্থাপন করেন। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলার সুবাদারগণ টাঁড়া বা রাজমহল থেকে মোগল বিরোধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। তাঁরা পরাজিত ভূঁঞা জমিদারদের আনুগত্যের অঙ্গীকার নিয়ে রাজধানী ফিরে গেলেই পরাজিত ভূঁঞা জমিদারগণ সুযোগ পেলেই শক্তি সঞ্চয় করে পুনরায় মোগলদের বিরুদ্ধাচরণ করতেন।

সুবাদার আলাউদ্দীন ইসলাম খাঁ চিশতী বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকাতে স্থানান্তর করে ভূঁঞা জমিদার ও বিরোধী শক্তির কেন্দ্রস্থলে অবস্থান নেন এবং মোগল বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তিনি ঢাকাতে রাজধানী স্থাপন করে নূতন রাজধানীর নামকরণ করেন ‘জাহাঙ্গীর নগর।’ ঢাকাতে রাজধানী স্থাপন ইসলাম খাঁর সময়োপযোগী, সঠিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত।

ইসলাম খাঁ বাংলাতে মোগল আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাজা মান সিংহের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে বাংলাতে মোগল আধিপত্য বিস্তারে মনোযোগী হন। তিনি নৌ-সৈন্যাধ্যক্ষ (admiral) ইতিমান খানের অধীনে শক্তিশালী নৌ-বাহিনী পুনর্গঠন করেন।

বাংলার সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতী বঙ্গে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৭-ই ডিসেম্বর ১৬০৯ খ্রীস্টাব্দে (আবুল লতিফের ডায়েরী) ভাটির উদ্দেশে রাজমহল ত্যাগ করে গৌড়ের নিকট এসে শয়খ কামালের সেনাপতিত্বে বঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিমের বীরভূমের বীর হাম্বির,(১) পাচেটের শামস খান এবং হিজলীর জমিদার সলীম খানের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান করে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতি তাঁদের বশ্যতা আদায় করেন। পরবর্তীকালে গিয়াস খানের সেনাপতিত্বে রাজা প্রতাপাদিত্যের যশোর, ইফতিয়ার খানের সেনাপতিত্বে রাজা শত্রুজিতের ভূষণা, শয়খ হবিবউল্লাহ-র সেনাপতিত্বে মজলিশ কুতুবের ফতেহবাদ, শয়খ আব্দুল ওয়াহিদের সেনাপতিত্বে অনন্তমাণিক্যের ভলুয়া, সৈয়দ হাকিমের সেনাপতিত্বে রামচন্দ্রের বাকলা, স্বয়ং সুবাদার ইসলাম খাঁর নিজের সেনাপতিত্বে বার ভূঁঞার ভাটি, সুজাত খানের সেনাপতিত্বে দ্বিতীয় পর্যায়ে দৌলম্বপুরের যুদ্ধে দুর্ধর্ষ আফগান নেতা উসমানের শাসন এলাকা এবং শয়খ কামালের সেনাপতিত্বে আফগান নেতা বায়োজীদ কররাণীর সিলেট বিজয়ের পরে প্রায় সমগ্র বঙ্গ মোগল শাসনাধীনে আসে। কেবল মাত্র চট্টগ্রাম অধরা থাকে। চট্টগ্রাম অর্দ্ধশতাব্দী পরে শায়েস্তা খাঁর শাসন কালে মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।

এভাবে ইসলাম খাঁ বাংলার স্বাধীনচেতা ভূঁঞা ও জমিদারদের মোগল শাসনের প্রতি অনুগত হতে বাধ্য করেন এবং অবশেষে বাংলায় আফগান শাসন সমাপ্ত করেন। আফগানবীর খাজা উসমান প্রাণ দিয়ে এবং বায়োজীদ কররাণী বন্দী হয়ে স্বাধীনতার মূল্য দেন। আকবরের আমলে রাজমহলের প্রান্তরে দাউদখানের পরাজয় ও হত্যার সঙ্গে আফগান-স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলেও তার শেষ রশ্মিটুকু জাহাঙ্গীরের আমলে বিলীন হয়ে যায়।

এছাড়াও তাঁর শাসনকালে সীমান্তের তিনটি রাজ্য কামতা, কামরূপ ও কাছাড় মোগল শাসনাধীনে আসে। কামতার রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ প্রথমেই মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হন। কামরূপের রাজা পরীক্ষিত আত্মসমর্পণ করেন ও বন্দী হন, কাছারের রাজা প্রতাপ নারায়ণ আত্মসমর্পণ করেন ও সন্ধি সূত্রে আবদ্ধ হন।

ইসলাম খাঁর এই রূপ সাফল্যের প্রধান কারণ নদীবেষ্টিত বঙ্গে শক্তিশালী নৌ-শক্তির পুনর্গঠন, বিরোধী শক্তির কেন্দ্রস্থান ঢাকাতে রাজধানী স্থাপন, তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা, যুদ্ধের নিখুঁত পরিকল্পনা গ্রহণ, পরাজিত ভূঁঞা, জমিদার ও আফগানদের পুনঃশক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ না দেওয়া এবং তাঁর প্রতি সম্রাটের আস্থা ও অকুন্ঠ সাহায্য প্রদান। ইসলাম খানের এই বিরাট সাফল্যে সম্রাট জাহাঙ্গীরও তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরীতে ভূয়সী প্রশংসা করেন।

ইসলাম খাঁ বঙ্গে ১৬১৩ খ্রীঃ (১০২২ হিজরী) মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর মনসবদারী ছিল ৬০০০/৬০০০।

(১) বীর হাম্বীর কোন নাম নয়, এটি বিষ্ণুপুর রাজার উপাধি।

৯৫) সেখ হুসাঙ্গ—(Officiates) : ১৬১৩-১৬১৪ খ্রীঃ (১০২২-১০২৩ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

বাংলার সুবাদার ইসলাম খাঁর মৃত্যুর পর এবং বাংলাতে পরবর্তী সুবাদারের কার্যভার গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ে সুবাদারের প্রতিনিধিত্ব করেন মারহুম ইসলাম খাঁর পুত্র সেখ হুসাঙ্গ।

শাহী আইনের হিসাব মোতাবেক বাংলার সুবাদারের মৃত্যু হলে মুঙ্গেরে অবস্থিত উচ্চতম শাহী কর্মচারী বাংলার সুবাদার হবেন। মুঙ্গেরে ঐ পদমর্যাদার কোন রাজকর্মচারী না থাকলে বিহারের সুবাদারকে বাংলার সুবাদারী পদ নিতে হবে। এই কারণে মুঙ্গেরে অবস্থানরত ইসলাম খাঁর ভ্রাতা শাহী ফরমান ছাড়া বাংলাতে আসবার সাহস করেন নি। অপরদিকে ইসলাম খাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রাপ্ত হওয়া মাত্র বিহারে সুবাদার জাফর খাঁ কুকড়া হীরক খনি অধিকারের জন্য কুকড়া রাজার অত্যাসন্ন পতন সত্ত্বেও যুদ্ধ বন্ধ রেখে বাংলার সুবাদার হবার জন্য শাহী ফরমান ছাড়াই জাহাঙ্গীর নগরে (ঢাকা) আগমন করেন। শাহী ফরমানের অজুহাতে শেখ হুসাঙ্গ জাফর খাঁকে কার্যভার গ্রহণ করতে দেন নি।

সম্রাট জাহাঙ্গীর জাফর খাঁকে বাংলা ছেড়ে বিহার প্রত্যাবর্তন পূর্বক কুকড়া অধিকারের নির্দেশ দেন এবং ইসলাম খাঁর ভ্রাতা কাশিম খাঁকে তাঁর মনসব চার হাজার অশ্বসহ পাঁচ হাজারে উন্নীত করে বাংলার সুবাদার করেন। বাংলার সুবাদারী পদে এই নিয়োগ মারহুম ইসলাম খাঁর পুত্র হুসাঙ্গের পছন্দ হয় নি। তিনি নব নিযুক্ত সুবাদারের অনুমতি ব্যতিরেকে বাংলা ছেড়ে দিল্লীর দরবারে চলে যাবার জন্য বাংলার প্রশাসনিক কার্যভার যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ পূর্বক দেওয়ান ও বকশিদের বুঝিয়ে দেন। কাশিম খাঁ আকবর নগরে পৌঁছে পুত্রকে হুসাঙ্গের নিকট প্রেরণ করেন। তাঁর প্রেরিত পুত্র ফরিদ হুসাঙ্গের এই সিদ্ধান্ত বদলে ব্যর্থ হন, এমন কি হুসাঙ্গ সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে দিল্লীর দরবারে পৌঁছে যান। সম্রাট সেখ সেলিম চিস্তির পরিবারের মর্যাদার কথা বিবেচনা করে হুসাঙ্গের অন্যায় কাজের জন্য বিরক্ত না হয়ে হুসাঙ্গকে সাক্ষাতের অনুমতি দেন।

পরবর্তীকালে ১৬১৫ খ্রীস্টাব্দে হুসাঙ্গ ফতেপুরে ফৌজদার হন।

৯৬) কাশিম খাঁ-চিশতি : ১৬১৪-১৬১৭ খ্রীঃ (১০২৩-১০২৬ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

বাংলার সুবাদার ইসলাম খাঁর ২১ শে আগস্ট ১৬১৩ তারিখে মৃত্যু সংবাদ অবগত হয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬১৩ খ্রীস্টাব্দের সেপ্টেম্বর (শাবান-১০২২ হিঃ) কাশিম খাঁকে বাংলার সুবাদার নিয়োগের নির্দেশ দেন। বাংলার নব নিযুক্ত সুবাদার কাশিম খাঁ দীর্ঘ প্রায় আট মাস পর এক শুভ মুহূর্তে ৬ ই মে ১৬১৪ (২৭ রবিউল আওয়াল-১০২৩ হিঃ) তারিখে রাত্রি শেষ হবার পাঁচ ঘড়ি পূর্বে জাহাঙ্গীর নগরে (ঢাকা) পদার্পণ করেন।

কাশিম খাঁ রাজকার্যে তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতা ইসলাম খাঁর ন্যায় সুযোগ্য ছিলেন না। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিকট তিনি অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় ১৬১৭ খ্রীস্টাব্দের এপ্রিল মাসে (১০২৬ হিঃ) তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত হন। তাঁর পদে নিযুক্ত হন সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রিয়তমা নূরজাহানের ভ্রাতা ইব্রাহিম খাঁ।

চিস্তি পরিবারের কাশিম খাঁ বাংলার সুবাদারী পদে ইব্রাহিমের নিযুক্তি মেনে নিতে পারেন নি। ফল-স্বরূপ যাত্রাপুরে উভয়ের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ বাধে। পরিশেষে কাশিম খাঁ তাঁর পরিবার এবং সম্পদ ধ্বংস করে অপমানিত হয়ে শাহী দরবারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং ইব্রাহিম খাঁ ফতেজঙ্গ জাহাঙ্গীর নগর (ঢাকা) যাত্রা করেন।

কাশিম খাঁ পরবর্তীকালে পাঞ্জাবের সুবাদার (১০৩১ হিঃ) এবং আগ্রার সুবাদার (১০৩৩ হিঃ) পদ প্রাপ্ত হন।

৯৭) ইব্রাহিম খাঁ (ফতে জঙ্গ) : ১৬১৭-১৬২৪ খ্রীঃ (১০২৬-১০৩৩ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলার সুবাদার পদে কাশিম খাঁর স্থলে ১৬১৭ খ্রীস্টাব্দের এপ্রিল মাসে (১০২৬ হিঃ) ইব্রাহিম খাঁকে নিযুক্তির নির্দেশ দেন। নবনিযুক্ত বাংলার সুবাদার ইব্রাহিম খাঁ প্রায় সাত মাস পরে উক্তবর্ষের নভেম্বর মাসে জাহাঙ্গীর নগরে (ঢাকা) নিজ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইতঃপূর্বে ইব্রাহিম খাঁ ১০২৪ হিজরী সনে বিহারের সুবাদার জাফর খাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে কুকড়ার রাজা বৈরিশালকে যুদ্ধে পরাজিত করে তথাকার মূল্যবান হীরক খনি অধিকার করার জন্য সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক মনসব বৃদ্ধি ও ‘ফতেজঙ্গ’ উপাধি প্রাপ্ত হন। তিনি তেহেরান থেকে আগত মির্জা গিয়াসের পুত্র এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের মহিষী নূরজাহানের কনিষ্ঠ ভ্রাতা।

বাংলার সুবাদার হয়ে ইব্রাহিম খাঁ ফতে জঙ্গ হৃত রাজ্যসীমা পুনরুদ্ধার করেন এবং পূর্ববর্তী সুবাদার কাশিম তাঁর অদূরদর্শিতা হেতু উৎপন্ন গণবিদ্রোহ সামরিক বল প্রয়োগ অপেক্ষা রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলা করে বাংলায় শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বিদ্রোহরত যুবরাজ খুররম (শাহজাহান) এর সঙ্গে রাজমহলের যুদ্ধে ১০৩৩ হিজরীতে ইব্রাহিম খাঁ ফতে জঙ্গ নিহত হন এবং শাহজাহানের সিপাহসালার আবদুল্লা খাঁ ফিরোজ জঙ্গ চূড়ান্তভাবে জয়লাভ করেন (১০/৪/১৬২৪ খ্রীঃ)। ইব্রাহিম খাঁর সময় কালে ১০৩২ হিজরীতে আব্দুল হাসান আসফ খাঁ যুগপৎ মোগল রীতি অনুসারে সুবাদার পদমর্যাদা প্রাপ্ত রাজকর্মী হিসাবে বাংলাতে নিযুক্ত ছিলেন। সম্রাট ১০৩৩ হিজরী সনে আসফ খাঁকে পাঞ্জাবের সুবাদার নিযুক্ত করেন।

বাংলায় যুবরাজের রাজত্ব—এপ্রিল ১৬২৪ – মার্চ ১৬২৫

(১০৩৪ হিঃ)

৯৮) যুবরাজ খুররম (শাহজাহান) এবং দরাব খাঁ

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

উড়িষ্যা বিজয়ী যুবরাজ খুররম ইব্রাহিম খাঁকে পরাজিত ও নিহত করে রাজমহলের ভার রাজা ভীমের উপর ন্যস্ত করে জাহাঙ্গীর নগর (ঢাকা) অভিযান করে বিজিত বাংলার শাসন ভার স্বহস্তে গ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীর নগরে এক সপ্তাহ কাল অবস্থান করার পর আব্দুর রহিম খান-ই-খানানের পুত্র দরাব খাঁকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করে রাজকোষের রক্ষিত চল্লিশ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ও প্রভূত পরিমাণ সমরোপকরণ হস্তগত করে দ্বিগুণ বিক্রমে পিতা সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য পশ্চিমে অভিযান কালে সম্রাটের সৈন্যের সম্মুখীন হন। সম্রাট পক্ষের সৈন্যর নেতৃত্ব দেন জাহাঙ্গীরের অপর এক পুত্র তথা শাহজাহানের ভ্রাতা পারভেজ এবং রাজকর্মী মহব্বত খাঁ। যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে শাহজাহান দাক্ষিণাত্যে চলে যান এবং বাংলা বিদ্রোহীপুত্র শাহজাহানের হস্তচ্যুত হয়।

বাংলায় সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত—

১৬২৫-১৬২৭ খ্রীঃ

৯৯) জমানা বেগ মাহবত খাঁ : ১৬২৫-২৬ খ্রীঃ (১০৩৫ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলাতে নিজের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে পুত্র পারভেজের যুদ্ধের সহযোগী মাহবত খাঁকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন (১০৩৫ হিঃ)। ইতঃপূর্বে তিনি ১০৩৩ হিজরীতে কাবুলের সুবাদার নিযুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলা সুবার দায়িত্ব ১৬২৫ খ্রীস্টাব্দের মার্চ মাসে গ্রহণ করেন। মাহবত খাঁর সাহায্যকারী রূপে ছিলেন তাঁর পুত্র খানাজাদ খাঁ। মাহবত খাঁ ১৬২৬ খ্রীস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত বাংলার সুবাদারী পদে বহাল ছিলেন। পরবর্তী কালে তিনি জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে উকিল এবং শাহজাহানের রাজত্বকালে আজমীরের ফৌজদার ও পরে সুবাদার, দিল্লীর সুবাদার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন।

১০০) আমানুল্লাহ খানাজাদ খাঁ : ১৬২৬ খ্রীঃ (১০৩৫ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলার সুবাদারী পদে মাহবত খাঁর পরে মাহবত খাঁর পুত্র খানাজাদ খাঁকে নিযুক্ত করেন। খানাজাদের প্রকৃত নাম আমানুল্লাহ খাঁ। ১০৩২ হিজরীতে তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর কর্তৃক ‘খানাজাদ খাঁ’ উপাধি প্রাপ্ত হন। আমানুল্লাহ খানাজাদ খাঁ অল্প কাল বাংলার সুবাদারী পদে থাকার পর সম্রাট তাঁকে পদচ্যুত করে দরবারে আহ্বান করেন। পরবর্তী শাহজাহানের রাজত্বকালে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন।

১০১) সেখ মুকরাম খাঁ চিস্তি : ১৬২৬ খ্রীঃ (১০৩৫ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

খানাজাদখাঁকে দিল্লীর দরবারে আহ্বান করার পর সম্রাট জাহাঙ্গীর মুকরাম খাঁকে বাংলার সুবাদার পদে নিয়োগের নির্দেশ দেন। মুকরাম খাঁ ইতঃপূর্বে দিল্লী, উড়িষ্যার সুবাদার নিযুক্ত ছিলেন। বাংলায় সুবাদার পদে নিযুক্তির নির্দেশের স্বল্পকাল পরেই তিনি আকস্মিক ভাবে জলমগ্ন (accidental drowning) হয়ে মৃত্যু বরণ করেন।

১০২) হিদায়েতুল্লাহ ফিদাই খাঁ : ১৬২৬-১৬২৮ খ্রীঃ (১০৩৬-১০৩৭ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• নূরউদ্দীন মহম্মদ জাহাঙ্গীর (সেলিম)-১৬০৫-১৬২৭ খ্রীঃ (১০১৪-১০৩৭ হিঃ)

• আবু মুজফফর দাওয়ার বক্স বাদশা (জাহাঙ্গীরের পৌত্র, খসরুর পুত্র) নভেম্বর ১৬২৭-জানুয়ারী ১৬২৮ খ্রীঃ (১০৩৭হিঃ)-সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালের মধ্যবর্তী তিন মাস রাজত্বকাল। তাঁর নামে উৎকীর্ণ লাহোর থেকে প্রকাশিত রৌপ্য মুদ্রা লক্ষ্য করা যায়।

• শিহাবউদ্দীন শাহজাহান (জাহাঙ্গীরের পুত্র)-১৬২৮-১৬৫৮ খ্রীঃ (১০৩৭-১০৬৮ হিঃ)-রাজ্যাভিষেক-৪ঠা ফেব্রুয়ারী ১৬২৮ (১০৩৭ হিঃ)

মুকরাম খাঁ চিস্তির আকস্মিক মৃত্যুর পরে সম্রাট জাহাঙ্গীর হেদায়েতুল্লা ফিদাই খাঁকে বাংলার গভর্ণর নিযুক্ত করেন। ফিদাই খাঁ সম্রাট জাহাঙ্গীর নিযুক্ত বাংলার শেষ গভর্ণর। তৎকালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের তৃতীয় পুত্র খুররম (শাহজাহান) দাক্ষিণাত্যে বিদ্রোহীভাবে অবস্থান করছিলেন।

১৬২৭ খ্রীস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুতে পিতৃ-সিংহাসনের জন্য পুত্রগণের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। একদিকে নূরজাহানের ভ্রাতা আসফ খাঁ (ইতিকাদ খাঁ)র কন্যা আরজুমন্দ বানু (মমতাজ)র স্বামী শাহজাহান (খুরম), অন্যদিকে নূরজাহানের প্রথম বিবাহজাত কন্যা লডিলীর স্বামী শাহবিয়ার। সম্রাট জাহাঙ্গীরের জীবিত অবস্থায় নূরজাহান শাহবিয়ারকে সিংহাসনে স্থাপন করার ষড়যন্ত্রের জন্য-ই শাহজাহান বিদ্রোহী হন (১৬২২ খ্রীঃ)। যদিও ১৬২৫ খ্রীস্টাব্দে পিতা-পুত্রর সদ্ভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়, তবুও নূরজাহান জামাতাকে সিংহাসনে বসানোর চেষ্টা ত্যাগ করেন নি। সম্রাট জাহাঙ্গীরের জীবন কালে আসফ খাঁ ভগিনীর মনস্তুষ্টি বিধানের জন্য এই ষড়যন্ত্রে সামিল ছিলেন, কিন্তু সম্রাটের মৃত্যুর পর তিনি (আসফ খাঁ) ভগিনীর পক্ষ ত্যাগ করে নিজের জামাতা শাহজাহানের পক্ষ অবলম্বন করেন। অপরদিকে নূরজাহানের সাহায্যে তাঁর জামাতা শাহবিয়ার লাহোরে নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। আসফ খাঁ শাহবিয়ারের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান করে তাঁকে বন্দী করে চক্ষু উৎপাটন করেন।

ইতোমধ্যে আসফ খাঁ শাহজাহানের নিকট দূত প্রেরণ করে দিল্লীর শূন্য সিংহাসনে মৃত খশরুর পুত্র দাওয়ার বক্সকে সাময়িকভাবে স্থাপন করেন। দাওয়ার বক্স (জাহাঙ্গীরের পৌত্র) দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে নভেম্বর ১৬২৭—জানুয়ারী-১৬২৮ এই তিন মাস (জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের রাজত্বকালের মধ্যবর্তী সময়) রাজত্ব করেন। লাহোর থেকে প্রকাশিত তাঁর রৌপ্য মুদ্রা লক্ষ্য করা যায়। মুদ্রার এক দিকে কলিমা এবং অন্যদিকে তাঁর নাম ‘আবু মুজফ্ফর দাওয়ার বক্স বাদশা’ উৎকীর্ণ আছে। তিনি তাঁর পিতামহর রাজত্বকালে গুজরাটে গভর্ণর সহ অন্যান্য রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন।

শাহজাহান ২৮ শে জানুয়ারী ১৬২৮ তারিখে আগ্রাতে প্রত্যাবর্তনের পরে ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ১৬২৮ (১০৩৭ হিঃ) তারিখে তাঁর রাজ্যাভিষেকের পরে দিল্লীর রাজসিংহাসনে সম্ভাব্য দাবিদারদের হত্যার আদেশ দেন। তখন দাওয়ার বক্স প্রাণ নিয়ে পারস্যে পলায়ন করেন।

সম্রাট শাহজাহান বাংলার গভর্ণর পদ থেকে তাঁর পিতার নিযুক্ত হিদায়েতুল্লা ফিদাই খাঁকে পদচ্যুত করে ১৬২৮ খ্রীঃ (১০৩৭ হিঃ) তে কাশিম খাঁ জুবেনীকে বাংলার গভর্ণর করেন। ফিদাই খাঁ তৎপরবর্তী কালেও সম্রাট শাহাজাহানের রাজত্বকালে রাজকার্যের রাজকর্মী থাকা অবস্থায় ১০৫৬ হিজরী (১৬৪৬-৪৭খ্রীঃ) তে মৃত্যুবরণ করেন।

কাশেম খাঁ জুবেনী আসফ খাঁর ভগিনী মণিজাবেগমের স্বামী। তাছাড়া কাশেম খাঁ প্রথমে শাহজাহানকে ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা দিতেন। এই কারণগুলি ছিল কাশেম খাঁর সর্বপ্রকার উন্নতির মূল।

১০৩) কাশিম খাঁ জুবেনী : ১৬২৮—১৬৩২ খ্রীঃ (১০৩৭—১০৪২ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• শিহাবউদ্দীন শাহজাহান-১৬২৮-১৬৫৮ খ্রীঃ (১০৩৭-১০৬৮ হিঃ)

ভারতসম্রাট শাহজাহান কাশিম খাঁ জুবেনীকে বাংলার সুবাদারী পদে প্রতিষ্ঠিত করে হুগলী অধিকারের আদেশ দেন। এক শতাব্দী পূর্বে সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ আফগান আক্রমণের জন্য সামরিক সাহায্যের আশাতে পর্তুগীজদের হুগলী ও চট্টগ্রামের অধিকার প্রদান করেছিলেন। সুলতানের কাছে পাওয়া সেই সনদের বলে এতদিন তাঁরা হুগলীতে বাণিজ্য করেন, বন্দর ও উপনিবেশ গড়ে তুলেন ও ধর্ম প্রচার করেন। পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় পর্তুগীজগণ শাহজাহানের প্রতি মৌখিক আনুগত্য দেখালেও কোন সামরিক সাহায্য দেন নি এমন কি শাহজাহানের রাজ্যাভিষেকের সময় দূত বা উপঢৌকন প্রেরিত হয় নি। এই বেয়াদবির শাস্তি বিধানের জন্য কাশিম খাঁ জুবেনী হুগলী অধিকার করেন। হুগলী অধিকারের কিছুদিন পরে শাহজাহান কাসিম খাঁ জুবেনীর মৃত্যু হলে তাঁর স্থলে আজম খাঁকে বাংলার সুবাদার করেন।

১০৪) মীর মহম্মদ বাকার ইরাদত খান (আজম খান) : ১৬৩২-১৬৩৫ খ্রীঃ (১০৪২-১০৪৫ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• শিবাহউদ্দীন শাহজাহান-১৬২৭-১৬৫৮ খ্রীঃ (১০৩৭-১০৬৮ হিঃ)

কাশিম খাঁ জুবেনীর পর সম্রাট কর্তৃক আজম খাঁ বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর মহম্মদ বাকার ইরাদত খাঁ। ১০৩৯ হিজরী (১৬২৯-৩০খ্রীঃ) তে তিনি সম্রাট কর্তৃক ‘আজম খাঁ’ উপাধি প্রাপ্ত হন। বাংলার সুবাদার হবার পূর্বে তিনি সম্রাটের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেন।

বাংলার সুবাদার হয়ে আজম খাঁ ঢাকা পৌঁছে দেখেন আসামের সঙ্গে মোগলের সীমান্ত সংঘর্ষ পূর্ণাঙ্গ সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। এই সংগ্রামে মোগল বাহিনী ক্রমাগত পরাজিত হচ্ছে শুনে সম্রাট শাহজাহান সুবাদার আজম খাঁকে ১২-ই মার্চ ১৬৩৫ তারিখে বাংলা থেকে অপসারিত করে আহমদাবাদের সুবাদার করেন এবং ইসলাম খাঁ মাসহাদিকে বাংলার সুবাদার করেন। পরবর্তীকালে আজম খাঁ সম্রাট প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজকার্য-নির্বাহ করেন এবং ১০৫৯ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

১০৫) মীর আব্দুস সালাম মাসহাদি ইখতিয়ার খাঁ (ইসলাম খাঁ) : ১৬৩৫-১৬৩৯ খ্রীঃ (১০৪৫-১০৪৮ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• শিবাহউদ্দীন শাহজাহান-১৬২৭-১৬৫৮ খ্রীঃ (১০৩৭-১০৬৮ হিঃ)

১৬৩৫ খ্রীস্টাব্দের ১১-ই এপ্রিল ইসলাম খাঁ মাসহাদি বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। তিনি ১০৩৭ হিজরী (১৬২৭-২৮) তে সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক ‘ইসলাম খাঁ’ উপাধি প্রাপ্ত হন। তাঁর শাসন কালে আসাম ও আরাকানের সঙ্গে মোগল শক্তির আরব্ধ সংগ্রামে জয়লাভ না করতে পারলেও উভয় শক্তিকে তিনি নির্বীয করেছেন শুনে সম্রাট শাহজাহান তাঁর পদোন্নতি করে রাজধানীতে আহ্বান করেন এবং তিনি দেওয়ান-ই-কুল নিযুক্ত হন (১৬৩৯)। ইসলাম খাঁ ১০৫৭ হিজরী (১৬৪৭-৪৮) তে মৃত্যুবরণ করেন।

১০৬) সইফ খাঁ : ১৬৩৯ খ্রীঃ (১০৪৮ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• শিবাহউদ্দীন শাহজাহান-১৬২৮-১৬৫৮ খ্রীঃ (১০৩৭-১০৬৮ হিঃ)

ইসলাম খাঁ মাসহাদির পরে সম্রাট শাহজাহান বাংলার সুবাদার পদে সুবাদার পদমর্যাদা প্রদান পূর্বক সইফ খাঁকে প্রেরণ করেন। ইতঃপূর্বে তিনি সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালের শুরু থেকে সম্রাট প্রদত্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ রাজকার্য নির্বাহ করেন। স্বল্প দিন তিনি বাংলা শাসন করেন। পরবর্তীকালে বাংলার সুবাদার হন যুবরাজ শাহ সুজা (১৬৩৯ খ্রীঃ)। সইফ খাঁ ১০৫০ হিজরী (১৬৪০-৪১) তে মৃত্যুবরণ করেন।

১০৭) মহম্মদ শাহ সুজা বাহাদুর (শাহজাদা) :  সম্রাট শাহজাহানের পুত্র-১০৪৮হিঃ (১৬৩৯ খ্রীঃ)—১০৫৬ হিঃ (১৭৪৬-৪৭ খ্রীঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• শিবাহউদ্দীন শাহজাহান-১৬২৭-১৬৫৮ খ্রীঃ (১০৩৭-১০৬৮ হিঃ)

বাংলার সুবাদারী পদ থেকে সইফ খাঁকে অপসারিত করে সম্রাট শাহজাহান তাঁর রাজত্বের দ্বাদশ বর্ষে ফেব্রুয়ারী ১৬৩৯ (শাওয়াল ১০৪৮) তারিখে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র শাহ সুজার মনসব ১৫০০০ x ৯০০০ এ উন্নীত করে বাংলা সুবার সুবাদার নিযুক্ত করেন। শাহ সুজা বাংলায় আগমন পূর্বক বাংলার আবহাওয়া জনিত কারণে সম্রাটের পরামর্শক্রমে বাংলা সুবার রাজধানী ঢাকা (জাহাঙ্গীর নগর) থেকে বিহার লাগোয়া রাজমহলে (আকবর নগর) স্থানান্তরিত করেন।

একদা রাজা মান সিংহ রাজ্যের রাজধানী রাজমহলে স্থাপন করেছিলেন। ইসলাম খাঁ ঢাকাতে রাজধানী স্থাপন করাতে রাজমহল পরিত্যক্ত হয়েছিল। শাহজাদা শাহ সুজার আগমনে পরিত্যক্ত রাজধানী রাজমহলে প্রাণের সঞ্চার হয়, এবং রাজমহল পূর্ণ রাজকীয় পরিবেশে সমৃদ্ধ হয়। শাহ সুজা রাজমহলের রাজসিংহাসনে আরোহণ করে সাফল্যের সঙ্গে রাজ্য শাসন করতে থাকেন। তৎকালে জাহাঙ্গীর নগরের (ঢাকা) দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন মহম্মদ হায়াত (Incharge of Jahangir Nagar)।

সম্রাট শাহজাহান শাহজাদা শাহসুজার জনপ্রিয়তায় খুশি হয়ে তাঁর বাংলা সুবাদারীর তিন বছর পরে ১০৫১ হিঃ (১৬৪১-৪২ খ্রীঃ) তে উড়িষ্যার সুবাদার শাহ নওয়াজ খানকে পদচ্যুত করে শাহজাদা শাহসুজাকে অতিরিক্তভাবে উড়িষ্যার সুবাদারী অর্পণ করেন। তৎকালে মহম্মদ জামান তেহেরানী শাহ সুজার ডেপুটি হিসাবে উড়িষ্যাতে নিযুক্ত ছিলেন।

শাহ সুজার বাংলার সুবাদারীর অষ্টম বর্ষপরে সম্রাট শাহজাহান তাঁর রাজত্বের বিংশ বর্ষে শাহ সুজাকে স্বীয় দরবারে আহ্বান করেন। বাংলার শূন্য সিংহাসনে সুবাদার নিযুক্ত করেন মীর্জা ইতিকাদ খাঁকে। তৎকালে সম্রাট শাহজাহান স্বীয় পুত্র শাহ সুজা ও ঔরঙ্গজেবকে আফগানিস্তানে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। ভ্রাতৃদ্বয় বহিঃশত্রু বিতাড়িত করে নিজ নিজ সুবায় প্রত্যাগমনের পথে অন্তরঙ্গ হন (অবশ্যই রাজনৈতিক কারণে)। ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে ভ্রাতৃস্নেহ অক্ষুণ্ণ আছে তার প্রমাণ দেবার জন্য ঔরঙ্গজেব তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মহম্মদ সুলতানের সঙ্গে সুজার জ্যেষ্ঠা কন্যা গুলরুখের বিবাহ-সম্বন্ধ পাকা করে নিজ নিজ সুবায় প্রত্যাবর্তন করেন।

১০৮) মীর্জা সাহাপুর ইতিকাদ খাঁ : ১০৫৬ হিঃ (১৬৪৬-৪৭ খ্রীঃ)—১০৫৭ হিঃ (১৬৪৭-৪৮ খ্রীঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• শিবাহউদ্দীন শাহজাহান-১০৩৭ হিঃ (১৬২৮ খ্রীঃ)—১০৬৮ হিঃ (১৬৫৮ খ্রীঃ)

সম্রাট শাহজাহান পুত্র শাহ সুজাকে স্বীয় দরবারে আহ্বান করার পরে বাংলার সুবাদারী পদে ইতিকাদ খাঁকে নিযুক্ত করেন। তৎকালে ইতিকাদ খাঁর মনসব ছিল ৫০০০ x ৫০০০। তিনি ইতোপূর্বে কাশ্মীর, দিল্লী ও বিহারের সুবাদারী এবং জৈনপুরের ফৌজদার ও বিহারের নাজিম পদে নিযুক্ত ছিলেন। আফগানিস্তানের সমস্যা সমাধান করে শাহ সুজা সম্রাট কর্তৃক পুনরায় বাংলার সুবাদার হবার পরে তিনি অযোধ্যার সুবাদার থাকেন এবং রাজকার্যে নিযুক্ত অবস্থায় ১০৬০ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন।

১০৯) পুনরায় মহম্মদ শাহ সুজা বাহাদুর (শাহজাদা) : ১০৫৭ হিঃ (১৬৪৭-৪৮ খ্রীঃ)—১০৭১ হিঃ (১০৬০ খ্রীঃ)

 সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• শিবাহউদ্দীন শাহজাহান-১৬২৮-১৬৫৮ খ্রীঃ (১০৩৭-১০৬৮ হিঃ)-১৬৫৮ খ্রীস্টাব্দে বন্দী এবং মৃত্যু-১৬৬৬ খ্রীঃ।

• ঔরঙ্গজেব আলমগীর (শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র)-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)। সিংহাসনে আরোহণ—জুলাই ১৬৫৮ খ্রীঃ (১০৬৮ হিঃ), রাজ্যাভিষেক—জুন ১৬৫৯ খ্রীঃ (১০৬৯ হিঃ)।

সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক শাহজাদা শাহ সুজা দ্বিতীয়বার বাংলার সুবাদারী প্রাপ্ত হয়ে রাজমহলের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন (১০৫৭ হিঃ)। তৎকালে মহম্মদ হায়াত তাঁর ডেপুটি হয়ে জাহাঙ্গীর নগরে (ঢাকা) অবস্থান করেন (Incharge of Jahangir Nagar)।

সম্রাট শাহজাহান শাহ সুজাকে দরবারে আহ্বানের সময়কালে উড়িষ্যার শূন্য সিংহাসনে সুবাদার নিযুক্ত হন মহম্মদ জামাম তেহরানী (১০৫৫ হিঃ)। উক্ত বর্ষে মহম্মদ জামান তেহরানী স্থলে উড়িষ্যার সুবাদার হন মীর্জা মাকি মুতাকাদ খাঁ (১০৫৫-১০৫৮ হিঃ)। ১০৫৮ হিজরী সনে সম্রাট শাহজাহান বাংলার সুবাদারীর সঙ্গে সুজাকে পুনরায় উড়িষ্যার সুবাদারী অর্পণ করেন (১০৫৮ হিঃ/জুলাই ১৬৪৮ খ্রীঃ)। শাহ সুজা প্রথমবারের মত এই বারেও রাজমহল থেকে উড়িষ্যাতে ডেপুটি নিয়োগ করে উড়িষ্যা শাসন করেন।

৬-ই সেপ্টেম্বর ১৬৫৭ খ্রীঃ (১০৬৮ হিঃ) তারিখে সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার সংবাদ প্রচারিত হওয়া মাত্র রাজসিংহাসন প্রাপ্তির লক্ষ্যে সম্রাটের চার পুত্রর মধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়। তৎকালে সম্রাটের জ্যেষ্ঠপুত্র দারাশিকো রাজধানীতে পিতার মৃত্যুশয্যার নিকট উপস্থিত ছিলেন। সম্রাট শাহজাহান অমাত্যগণের সম্মুখে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র দারাশিকোকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন, কিন্তু সিংহাসন প্রাপ্তির জন্য তাঁর অপরাপর পুত্রগণ যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। তৎকালে সম্রাট শাহজাহানের চতুর্থপুত্র মুরাদ গুজরাটে এবং বাংলাতে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র সুজা রাজউপাধি ধারণপূর্বক নিজেদের ভারত সম্রাট ঘোষণা করেন এবং রাজধানী অভিমুখে সেনা অভিযান করেন। শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র ঔরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের সুবাদার ছিলেন। তিনিও রাজধানী অভিমুখে অগ্রসর হন। রাজসিংহাসনের লক্ষ্যে শাহজাহানের পুত্রগণের মধ্যে ভ্রাতৃ-দ্বন্দ্ব ভ্রাতৃযুদ্ধে পরিণত হয়। তৎকালে সম্রাট শাহজাহানের পুত্রগণের মধ্যে ঔরঙ্গজেব প্রবল ও পরাক্রমী হয়ে উঠেন। তিনি ভ্রাতা দারা ও মুরাদকে বন্দী করে পরে হত্যা করেন। পিতা সম্রাট শাহজাহানকে ১৬৫৮ খ্রীস্টাব্দে আগ্রাদুর্গে বন্দী করে দিল্লীর রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন। পরবর্তী বছর ১৬৫৯ খ্রীস্টাব্দে স্বীয় রাজ্যাভিষেক ক্রিয়া সুসম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারত সম্রাট হন। পিতার মনোনীত উত্তরাধিকারী দারাশিকো ঔরঙ্গজেবের হাত থেকে নিস্তার পান নি। তিনি দারশিকোকে বন্দী করে কিছুকাল কারাবাসের পরে ধর্মদ্রোহিতার অপরাধে ভ্রাতৃহত্যা করে ইসলামের সেবা করেন।

এবারে বাকি থাকলেন শাহ সুজা। রাজধানী অভিমুখে অভিযানকালে প্রথমে বাহাদুরপুর ও পরে খানোয়ার যুদ্ধে পরাজিত শাহ সুজা পশ্চাৎপদ হয়ে তাণ্ডাতে গমন পূর্বক তথাকার দুর্গ সুদৃঢ় করে আত্মরক্ষার জন্য যত্নবান হন। তিনি তাণ্ডার নিকটবর্তী পরিত্যক্ত গৌড়নগরীর সৌন্দর্য্যে মোহিত হন। তখনও গৌড়নগরী মনুষ্যশূন্য হয় নি। দরবেশ নিয়ামতউল্লাহর তিনি ভক্ত ছিলেন। দরবেশ নিয়ামতউল্লাহর সান্নিধ্য পাবার জন্য গৌড় রাজধানীর উপনগরের পিরোজপুরের তহখানাতে গমনাগমনের সুবিধার জন্য প্রাসাদ-দুর্গের পূর্বদিকে তিনি শাহী-দরওয়াজা (লুকোচুরি) নির্মাণ করেন। গৌড়নগরীকে পূর্বসমৃদ্ধিতে ফিরিয়ে আনার আন্তরিক বাসনা ও প্রচেষ্টা তাঁর ছিল। কিন্তু কার্যত ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব হেতু ৬-ই মে ১৬৬০ (১লা মহরম ১০৭১ হিঃ) তারিখে আরাকানে পলায়ন ও মৃত্যুবরণের পরে গৌড়নগরীর আর পুনরুজ্জীবনের কোন চেষ্টা হয় নি। তাণ্ডা গঙ্গার প্লাবনে বিনষ্ট হয়। রাজমহলের অধিকাংশ গঙ্গাগর্ভে মগ্ন হয়। গৌড় পাণ্ডুয়া ক্রমে বিজন অরণ্যে পরিণত হয়।

১১০) মীর জুমলা (মুয়াজ্জুম খাঁ) : ১৬৬০-১৬৬৩ খ্রীঃ (১০৭১-১০৭৩ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহীউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)

বাংলার সুবাদার শাহ সুজা আরাকানে পলায়নের পর সম্রাট ঔরঙ্গজেব সেনাপতি মীর জুমলাকে সাতহাজারী মনসব প্রদান পূর্বক বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন (জুন-১৬৬০ খ্রীঃ)। মীর জুমলা রাজ্যের রাজধানী রাজমহল থেকে পুনরায় ঢাকাতে স্থাপন করেন। তিনি কুচবিহার ও আসামে মোগল শক্তির বিজয় পতাকা উড্ডীন করার জন্য সম্রাট কর্তৃক ‘মুয়াজ্জম খাঁ’ উপাধি প্রাপ্ত হন। কিন্তু সঠিক সময়ে অহম-সৈন্যগণ মোগলসৈন্যের উপর প্রতি-আক্রমণ করলে মোগল সৈন্য পর্যুদস্ত হয়। মীর জুমলা ঢাকা প্রত্যাগমনের পথে খিজিরপুরে মৃত্যুবরণ করেন (৩১ শে মার্চ ১৬৬৩ খ্রীঃ)—১০৭৩ হিঃ। এই যুদ্ধে মীরজুমলার সহচর ছিলেন ঐতিহাসিক সিহাবুদ্দীন তালিকা।

১১১) দিলির খাঁ (অস্থায়ী) : ১৬৬৩ খ্রীঃ—(১০৭৩-৭৪ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)

যুবরাজ শাহ সুজার জীবিতকালে শাহ সুজা ও দরবেশ নিয়ামতুল্লাহ চক্রান্ত করছেন এই সন্দেহে ঔরঙ্গজেব কর্তৃক আদেশ প্রাপ্ত হয়ে দিলির খাঁ দুই পুত্র সহ গৌড় নগরে পদার্পণ করা মাত্র এক পুত্র ফতে ইয়ারের রক্ত বমনে মৃত্যু হয়। ফতে ইয়ার গৌড় দুর্গের মধ্যে বাংলা ঘরে সমাধিস্থ আছেন। বাস্তবিক পক্ষে দরবেশ চক্রান্তে যুক্ত ছিলেন না এবং দিলির খাঁ দরবেশকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

মীর জুমলার মৃত্যুর পর তাঁর সহকারী দিলির খাঁ বাংলার অস্থায়ী সুবাদার হন, কিন্তু তিনি আসাম বা কুচবিহারে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে অক্ষম হন, অধিকন্তু অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় বিফল হন। সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁকে দাক্ষিণাত্যের দায়িত্ব প্রদান করে বাংলা থেকে অপসারিত করে অভিজ্ঞ শায়েস্তা খাঁকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। দিলির খাঁ ৩১ শে মার্চ ১৬৬৩ (১০৭৩ হিঃ) থেকে ২৭ শে সেপ্টেম্বর ১৬৬৩ (১০৭৪ হিঃ) বাংলার দায়িত্ব নির্বাহ করেন।

১১২) দাউদ খাঁ (অস্থায়ী) : ১৬৬৩-১৬৬৪ খ্রীঃ (১০৭৪ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)

দিলির খাঁর অপসারণ এবং শায়েস্তা খাঁর বাংলাতে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ে (Interregnum) বিহারের সুবাদার দাউদ খাঁ অস্থায়ী ভাবে বাংলার সুবাদারী কার্য করেন। তিনি ২৭ শে সেপ্টেম্বর ১৬৬৩ থেকে ৮-ই মার্চ ১৬৬৪ পর্যন্ত বাংলাতে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর শায়েস্তা খাঁ বাংলার সুবাদার হন এবং দুই দফাতে সর্বমোট প্রায় ত্রয়োবিংশতি বৎসর বাংলার সুবাদার হিসাবে নিযুক্ত থাকেন।

১১৩) শায়েস্তা খাঁ : ১৬৬৪-১৬৭৮ খ্রীঃ (১০৭৪-১০৮৯ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)

শায়েস্তা খাঁ হলেন নূরজাহানের ভ্রাতা আসফ খাঁর পুত্র এবং সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মাতুল। ৬৩ বৎসর বয়স কালে তিনি বাংলার সুবাদারী পদে ১৬৬৩ খ্রীস্টাব্দের মে মাসে নিযুক্ত হবার নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে ৮-ই মার্চ ১৬৬৪ তারিখে রাজমহলে পৌঁছে যান এবং ঢাকা আসেন ডিসেম্বরে। তিনি সুবাদারীর সঙ্গে অর্থ-উপার্জনের জন্য ব্যবসা করতেন। তাঁর অর্থগৃধ্নুতার জন্য তিনি প্রভূত অর্থের অধিকারী হন, প্রয়োজনে সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে বৃহৎ পরিমাণ অর্থ ঋণ দিতে সক্ষম ছিলেন।

শায়েস্তা খাঁ বাংলার সঙ্গে অতিরিক্ত ভাবে উড়িষ্যার সুবাদারী প্রাপ্ত হন (মার্চ-১৬৭৬—ডিসেম্বর-১৬৭৭)। তিনি বাংলার সুবাদারী পদে প্রথম দফাতে-১৬৬৪—১৬৭৮ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। তিনি উক্ত বর্ষের মে মাসে সম্রাটের আহ্বানে দরবারে ফিরে যান (১০৮৯ হিঃ)।

১১৪) ফিদাই খাঁ (আজম খাঁ কোকা, মজফফর হোসেন) : ১৬৭৮ খ্রীঃ

ও

১১৫) যুবরাজ মহম্মদ আজম : ১৬৭৮-১৬৭৯ খ্রীঃ (১০৮৯-১০৯০ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর—১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)

শায়েস্তা খাঁকে দরবারে আহ্বান করার পর বাংলার সুবাদার পদে নিযুক্ত ফিদাই খাঁর মৃত্যু (২৪শে মে ১৬৭৮) হলে সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁর পুত্র যুবরাজ মহম্মদ আজমকে ১৬৭৮ খ্রীস্টাব্দের জুন মাসে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। যুবরাজ আজম ২৯ শে জুলাই ১৬৭৮ তারিখে রাজধানী ঢাকা পৌঁছান। সম্রাট পুত্রকে বাংলার সঙ্গে উড়িষ্যার সুবাদারী প্রদান করেন।

কিঞ্চিৎ অধিকবর্ষ কাল পরে সম্রাট ঔরঙ্গজেব পুত্র মহম্মদ আজমকে দরবারে আহ্বান করেন। মহম্মদ আজম ১২-ই অক্টোবর ১৬৭৯ তারিখে ঢাকা ত্যাগ করেন।

১১৬) শায়েস্তা খাঁ (পুনর্বার) : ১৬৭৯-১৬৮৮ খ্রীঃ (১০৯০-১০৯৯ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)

সম্রাট ঔরঙ্গজেব শায়েস্তা খাঁকে স্বল্প দিনের ব্যবধানে ৯-ই সেপ্টেম্বর ১৬৭৯ খ্রীস্টাব্দে পুনর্বার বাংলার সুবাদারী পদে নিয়োগ করেন। সম্রাট তাঁকে বাংলার সঙ্গে অতিরিক্তভাবে উড়িষ্যার সুবাদারী প্রদান করেন (জানুয়ারী ১৬৮০-জানুয়ারী ১৬৮৮ খ্রীঃ)। শায়েস্তা খাঁ তাঁর পুত্রদিগকে ডেপুটি নিযুক্ত করে উড়িষ্যা শাসন করেন। ১৬৬৪ খ্রীস্টাব্দে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হয়ে শায়েস্তা খাঁ আত্মীয় পরিজন ও তাঁর চার সুযোগ্য পুত্র সঙ্গে করে বঙ্গে আগমন করেন। আত্মীয় পরিজন যথাযোগ্য রাজকার্যে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর পুত্র বুজুর্গ উমেদ খাঁ ২৭ জানুয়ারী ১৬৬৬ চট্টগ্রাম অধিকার করে চট্টগ্রামকে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর অপর এক পুত্র জাফর খাঁ অধিকৃত চট্টগ্রামের থানাদার নিযুক্ত হন। বুজুর্গ খাঁ পিতা শায়েস্তা খাঁর সামরিক বিভাগ পরিচালিত করার পর ১৬৮২ খ্রীস্টাব্দে বিহারের সুবাদার নিযুক্ত হন। শায়েস্তা খাঁর এক পুত্র আবু নাশের ১৪-ই জানুয়ারী ১৬৮৩ থেকে উড়িষ্যার সুবাদারী পদে ডেপুটি নিযুক্ত হলেও অল্পদিন পরে উড়িষ্যার স্থায়ী সুবাদার হন। শায়েস্তা খাঁর আর এক পুত্র ইরাদত খাঁ অধিকৃত কোচবিহারের ফৌজদার নিযুক্ত হন (১৬৮৫)। বৃদ্ধ বয়সে শায়েস্তা খাঁ ঢাকার লালবাগ দুর্গে রাজকীয় ও স্বচ্ছন্দ জীবন যাপন করে পুত্র ও আত্মীয় দ্বারা বাংলা ও উড়িষ্যা শাসন করেন এবং শান্তি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। শায়েস্তা খাঁ ১৬৮৮ খ্রীস্টাব্দের জুন মাস (১০৯৯ হিজরী) পর্যন্ত বাংলার সুবাদার পদে বহাল ছিলেন।

১১৭) খান-ই-জাহান বাহাদুর : ১৬৮৮-১৬৮৯ খ্রীঃ (১০৯৯-১১০০ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)

শায়েস্তা খাঁর পরে বাংলার সুবাদারী পদে নিযুক্ত হন সম্রাট ঔরঙ্গজেবের ধাত্রীপুত্র খান-ই-জাহান বাহাদুর। তিনি ফিদাই খাঁ (আজম খাঁ কোকা, মজফ্ফর হোসেন)র ভ্রাতা। বাংলার সুবাদারী পদে অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় তিনি পদচ্যুত হন। খান-ই-জাহান বাহাদুর জুলাই ১৬৮৮ থেকে মে ১৬৮৯ পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন।

১১৮) ইব্রাহিম খাঁ : ১৬৮৯-১৬৯৭ খ্রীঃ (১১০০-১১০৮ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)

১৬৬৮ খ্রীস্টাব্দে ইব্রাহিম খাঁ বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হয়ে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আদেশে ইংরেজ বণিকদের পুনরায় বাংলায় ব্যবসা করার সুযোগ দেন। সেই মূলে জব চার্ণক ১৬৯০ খ্রীস্টাব্দের ২৪ শে আগস্ট আর একবার সুতানুটিতে অবতরণ করেন। এই ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যে আর্থিক লাভের ধারা বজায় থাকে।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রাজত্বে সম্রাটের ধর্মান্ধতার কারণে চারিদিকে বিদ্রোহীগণ প্রবল হয়ে উঠেন। আসামে জয়ধ্বজ সিংহ, মহারাষ্ট্রে শিবাজীর অনুপ্রেরণায় দেশব্যাপী হিন্দু জাগরণের ঢেউ বাংলাকেও স্পর্শ করল। উড়িষ্যা সুবার অন্তর্গত মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল, চন্দ্রকোণা মহকুমার ছোট বর্গার নগণ্য এক জমিদার শোভা সিংহ বাংলায় বিদ্রোহের সূত্রপাত করেন (১৬৯৫)। বর্ধমানের উপকন্ঠে উপনীত হলে তথাকার মোগল শাসনকর্তা রাজা কৃষ্ণরাম সসৈন্যে শোভা সিংহের অগ্রগতি রুদ্ধ করতে গিয়ে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। বিজিতের স্ত্রী ও কন্যা বিজয়ীর হাতে বন্দী হয় (জানুয়ারী ১৬৯৬)। শোভা সিংহকে সহযোগিতা করতে আসেন উড়িষ্যার আফগান সর্দার রহিম খাঁ। একদা শোভা সিংহ রিরংসার তাড়নায় প্রয়াত কৃষ্ণরামের রূপলাবণ্যবতী কন্যার হাতে ছুরিকাঘাতে নিহত হলে বিদ্রোহীদের পছন্দের নেতা হন রহিম খাঁ।

রহিম খাঁ মুর্শিদাবাদ অধিকার করার পর মালদহ অধিকার করেন (মার্চ-১৬৯৭)। এই ভাবে বঙ্গে তাঁর বিজয় বৈজয়ন্তী উড়তে থাকে। বাংলাতে মোগল সৈন্যের উপর্যুপরি পরাজয়ের সংবাদে সম্রাট ঔরঙ্গজেব ইব্রাহিম খাঁকে পদচ্যুত করে নিজ পৌত্র আজিম-উস-সানকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন (জুন-১৬৯৭)।

১১৯) জবর দোস্ত খাঁ (অস্থায়ী) : ১৬৯৭ খ্রীঃ (১১০৮-৯ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ)

বাংলার সুবাদার ইব্রাহিম খাঁর পদচ্যুতি (জুন-১৬৯৭) ও পরবর্তী সুবাদার আজিম-উস-সানের সুবাদারী পদে দায়িত্ব গ্রহণের (নভেম্বর-১৬৯৭) মধ্যবর্তী সময়ে (Interregnum) ইব্রাহিম খার পুত্র জবরদোস্ত খাঁ সম্রাট কর্তৃক অস্থায়ী সুবাদার নিযুক্ত হয়ে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অতিসত্বর ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ পান। তিনি মকসুদাবাদে বলিষ্ঠ সৈন্যাভিযান করে বিদ্রোহী নেতা রহিম খাঁ এবং প্রয়াত শোভা সিংহের পুত্র হিম্মৎ সিংহকে চন্দ্রকোণায় পশ্চাৎধাবনে বাধ্য করেন।

১৬৯৭ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বর (১১০৯ হিঃ) মাসে বাংলার নব নিযুক্ত সুবাদার আজিম-উস-সান বর্ধমানে আগমন করে গৌরবময় বিজয়ের অধিকারী জবরদোস্তর যোগ্যতার কোন মূল্য না দিয়ে তাঁকে ও তাঁর পিতাকে বাংলা ছাড়ার আদেশ দেন। দুর্ভাগ্য জবরদোস্ত খাঁর। ক্ষুব্ধ জবরদোস্ত পিতাকে সঙ্গে করে বাংলা ত্যাগ করেন (জানুয়ারী-১৬৯৮)।

১২০) আজিম-উদ-দীন (আজিম-উস-সান) : ১৬৯৭-১৭১২ খ্রীঃ (১১০৯-১১২৪ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• মহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর-১৬৫৮-১৭০৭ খ্রীঃ (১০৬৮-১১১৯ হিঃ) ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু—১৭০৭ খ্রীঃ।

• প্রথম বাহাদুর শাহ-১৭০৭-১৭১২ খ্রীঃ (১১১৯-১১২৪ হিঃ)—ঔরঙ্গজেবের পুত্র।

আজিম-উস-সানের বাংলায় সুবাদারী সময়কালে জবরদোস্ত খাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে বিদ্রোহীগণ উড়িষ্যা সুবার চন্দ্রকোণা থেকে প্রত্যাগমন পূর্বক হুগলী, নদীয়া এমনকি বর্ধমানে আক্রমন করেন। মোগল সৈন্যাভিযান করে বিদ্রোহী নেতা রহিম খাঁকে পরাজিত ও নিহত করেন (১৬৯৮ খ্রীঃ)।

আজিম-উস-সান শায়েস্তা খাঁর মত অর্থগৃধ্নু ছিলেন। তিনি রাজস্ব আদায় অপেক্ষা বাণিজ্যে এবং ব্যক্তিগত ধন সম্পত্তি আহরণে অধিক আগ্রহী ছিলেন। তাঁর এই ‘সওদা-ই-খাস’ সম্রাট ঔরঙ্গজেবের পছন্দ ছিল না। সেই কারণে সম্রাট আজিমকে শাসনকর্তা (নাজিম) রেখে বাংলার রাজস্ব বিভাগ পরিচালনার জন্য বিশ্বস্ত ও দক্ষ করতলব খাঁ (মুর্শিদকুলি) কে ১৭০০ খ্রীস্টাব্দের ১৭-ই নভেম্বর বাংলার দেওয়ান ও মকসুদাবাদের ফৌজদার নিযুক্ত করেন। মুর্শিদকুলি খাঁর সঙ্গে আজিমের বনিবনা না হবার জন্য ১৭০৩ সম্রাটপৌত্র আজিমকে অতিরিক্তভাবে বিহারের সুবাদারী প্রদান পূর্বক তাঁকে বাংলা ছেড়ে পাটনা যাবার নির্দেশ দেন। আজিম পুত্র ফারুকশিয়ার বাংলাতে পিতার ডেপুটির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং দেওয়ান মুর্শিদকুলির পরামর্শ অনুসারে চলার নির্দেশ প্রাপ্ত হন।

আজিম-উস-সান পাটনার নাম নিজ নাম অনুসারে রাখেন ‘আজিমাবাদ’। ১৭০৭ খ্রীস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হবার পর দিল্লীর সম্রাট হন তাঁর পিতা প্রথম শাহ আলম বাহাদুর শাহ। তিনি আজম-উস-সানকে বাংলার সুবাদার পদে বহাল রাখেন। তৎকালে মুর্শিদকুলি বাংলার নায়েব নাজিম নিযুক্ত ছিলেন। আজিম মুর্শিদকুলির উপর বদলা নিয়ে তাঁকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করে দাক্ষিণাত্যের দেওয়ান করেন (১৭০৮)। দুই বৎসর পরে আজিম-উস-সান মুর্শিদকুলিকে বাংলার দেওয়ান হিসাবে ফিরিয়ে আনেন (১৭১০)।

আজিম-উস-সান মোগল সিংহাসনের জন্য গৃহযুদ্ধে ভ্রাতা জাহান্দার শাহ কর্তৃক নিহত হন (৮-ই মার্চ ১৭১২)।

১২১) খান-ই-আলম : ১৭১২-১৩ খ্রীঃ (১১২৪ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• জাহান্দার শাহ (প্রথম বাহাদুর শাহর পুত্র)-১৭১২ খ্রীঃ (১১২৪ হিঃ)—১৭১৩ খ্রীঃ (১১২৫ হিঃ)

প্রয়াত ঔরঙ্গজেবের পৌত্র জাহান্দার শাহ তাঁর তিন ভ্রাতা আজিম-উস-সান, জাহান শাহ ও রফি-উল-খানকে হত্যা করে ১৭১২ খ্রীস্টাব্দে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করে বাংলার সুবাদারী পদে খান-ই-আলমকে প্রতিষ্ঠিত করেন কিন্তু আজিম-উস-সানের পুত্র ফারুকশিয়ার পিতৃহন্তা পিতৃব্যকে হত্যা করে দিল্লীর সম্রাট হলে বাংলার সুবাদারী পদ থেকে খান-ই-আলমকে পদচ্যুত করেন। খান-ই-আলম স্বল্পকাল বাংলার সুবাদার ছিলেন।

১২২) ফারকুণ্ডা শিয়ার : ১৭১৩ খ্রীঃ (১১২৫ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• ফারুকশিয়ার (প্রথম বাহাদুর শাহর পৌত্র এবং আজিম-উস-সানের পুত্র) ১৭১৩-১৭১৯ খ্রীঃ (১১২৫-১১৩১ হিঃ)

সম্রাট ফারুকশিয়ার দিল্লীর সম্রাট হয়ে তাঁর শিশুপুত্র ফারকুণ্ডা শিয়ারকে বাংলার সুবাদারী পদে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং মুর্শিদকুলি খাঁকে ফারকুণ্ডা শিয়ারের ডেপুটি বা নায়েব নাজিম হিসাবে নিযুক্ত করেন। প্রায় চার মাস স্বপদে প্রতিষ্ঠিত থেকে ফারকুণ্ডা ২ রা মে ১৭১৩ খ্রীস্টাব্দে (১১২৫ হিঃ) মৃত্যুবরণ করেন।

১২৩) মীর জুমলা (উবাইদুল্লাহ্ মজফ্ফর জং, খান-ই-খানান, মাউতামিদ-উল-মূলক) : ১৭১৩-১৭১৬ খ্রীঃ (১১২৫-১১২৮ হিঃ)

সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—

• ফারুকশিয়ার-১৭১৩-১৭১৯ খ্রীঃ (১১২৫-১১৩১ হিঃ)

পুত্র ফারকুণ্ডা শিয়ারের মৃত্যুর পর সম্রাট ফারুকশিয়ার তাঁর অনুগ্রহভাজন মীর জুমলাকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। মিরজুমলা দিল্লীর দরবারে থাকেন, ৪ঠা ডিসেম্বর ১৭১৪ খ্রীস্টাব্দে তিনি নিজদায়িত্ব বুঝে নেবার জন্য আদেশ প্রাপ্ত হয়ে ১৮-ই জুন ১৭১৫ পাটনাতে আগমন করেন। কিন্তু তিনি বাংলাতে আগমন না করে ১০-ই জানুয়ারী ১৭১৬ তারিখে দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেন। তৎকালে মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার ডেপুটি সুবাদার বা নায়েব নাজিমপদে নিযুক্ত ছিলেন। বিহার তখনও পর্যন্ত বাংলা সুবার অন্তর্গত হয়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *