পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বংশ
৪৯) নাসির শাহ : (সুলতান নাসিরুদ্দীন আবুল মুজফফর মাহমুদ শাহ)-৮৩৯ হিজরী (১৪৩৫-৩৬ খ্রীঃ)—৮৬৪ হিঃ (১৪৫৯ খ্রীঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান মুহাম্মদ শাহ-১৩৩৫-১৩৪৬ খ্রীঃ (৮৩৮-৮৪৯ হিঃ)
• সুলতান আলাউদ্দীন আলম শাহ (পিতা মুহাম্মদ) সৈয়দ রাজবংশের শেষ সুলতান ১৪৪৬-১৪৫১ খ্রীঃ (৮৪৯-৮৫৫ হিঃ)
• সুলতান বাহলুল লোদী-(ভারতবর্ষে লোদী বংশের প্রতিষ্ঠাতা) ১৪৫১-১৪৮৯ খ্রীঃ (৮৫৫-৮৯৪ হিঃ)
শাসকশূন্য রাজসিংহাসনের অচলাবস্থা অবসানের জন্য অমাত্য ও আমীরগণ বহু অন্বেষণ পূর্বক ইলিয়াস শাহী রাজবংশের এক বংশধর নাসির শাহকে পাণ্ডুয়ার রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। রাজ্য পুনরুদ্ধারের আশা পরিত্যাগ করে তিনি এক নিভৃতগ্রামে কৃষিবৃত্তি গ্রহণ করে দীনবেশে দিনাতিপাত করছিলেন।
সুলতান হয়ে নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ তাঁর রাজ্যের রাজধানী গৌড় নগরীতে স্থানান্তরিত করেন এবং দুর্গপ্রাসাদ, দুর্গতোরণ এবং অন্যান্য নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণের মাধ্যমে গৌড় নগরীকে সমৃদ্ধ করেন। তাঁর প্রথম মুদ্রা ৮৪১ হিজরীতে মুদ্রিত হয়। মুদ্রায় তিনি ‘খলীফৎ আল্লাহ্ বি’ল-হজ্জত ওয়া’ল-বুরহান (সাক্ষ্য ও প্রমাণসিদ্ধ আল্লাহ্র খলিফা) উপাধি গ্রহণ করেন। তাঁর উৎকীর্ণ পনের খানি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। ৮৬৪ হিজরী (১৪৫৯) পর্যন্ত তিনি মুদ্রাও লিপি উৎকীর্ণ করেন। উক্ত বৎসরে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
৫০) সুলতান রুকন-উদ-দীন বারবাক শাহ : (মাহমুদ শাহের পুত্র)-১৪৫৯ খ্রীঃ (৮৬৪ হিঃ)—১৪৭৪ খ্রীঃ (৮৭৯ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান বাহলুল লোদী-১৪৫১—১৪৮৯ খ্রীঃ (৮৫৫-৮৯৪ হিঃ)
পিতার মৃত্যুর পর মাহমুদ শাহর সুযোগ্য পুত্র বারবাক শাহ ৮৬৪ হিজরী সনে পিতৃ-সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুলতান বারবাক শাহ ইতঃপূর্বে পিতা মাহমুদ শাহর রাজকার্যে সহায়ক হিসাবে মালিক উপাধি প্রাপ্ত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের শাসনকর্তা নিযুক্ত ছিলেন (শিলালিপি সপ্তগ্রাম ৮৬০ হিঃ) তিনি পিতার জীবদ্দশাতে পূর্ণরাজকীয় উপাধি (লাকাব) প্রাপ্ত হন (মুদ্রা-৮৬১ হিঃ ও ৮৬২ হিঃ)।
গৌড়ের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তিনি পিতার মত ‘খলীফৎ আল্লাহ্ বি’ল হজ্জত ওয়া’ল বুরহান’ উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি নিজের রাজত্ব এবং পরবর্তীকালে সন্তানের রাজত্ব লাভ সুনিশ্চিত করতে রাজকার্যে ও রাজ্য রক্ষায় আট হাজার দক্ষ হাবসী নিয়োগ করে রাজ্য শাসনে দক্ষতার পরিচয় দেন। প্রজাপালক বারবক শাহ প্রজাদের সুখ ও সমৃদ্ধিতে রেখে, নিজেও আজীবন সুখে কালাতিপাত করে ৮৭৯ হিজরী সনে মানব লীলা সম্বরণ করেন।
তাঁর নির্মিত নিম দরওয়াজার লিপিটি (৮৭১ হিঃ) বর্তমানে মহদীপুর ইন্দারাওয়ালা মসজিদে রক্ষিত আছে।
৫১) সুলতান শামস-উদ-দীন আবুল মুজাফফর ইউসুফ শাহ : (রুকনুদ্দীন বারবাক শাহর পুত্র)-১৪৭৪-১৪৮০ খ্রীঃ (৮৭৯-৮৮৫ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান বাহলুল লোদী-১৪৫১-১৪৮৯ খ্রীঃ (৮৫৫-৮৯৪ হিঃ)
পিতার মৃত্যুর পরে ইউসুফ শাহ গৌড়েশ্বর হন। বাদশাহী তখতে আরোহণ করে তিনি ৮৭৯ হিজরী থেকে ৮৮৫ হিজরী পর্যন্ত শিলালিপি এবং ৮৮০ হিজরী হতে ৮৮৪ হিজরী পর্যন্ত মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন। হুগলী জেলার পাণ্ডুয়াতে প্রাপ্ত ৮৮২ হিজরী (১৪৭৭ খ্রীঃ) তে উৎকীর্ণ শিলালিপিতে তিনি ‘খলীফৎ আল্লাহ্ বি’ল-হজ্জত ওয়াল-বুরহান’ (দলিল ও সাক্ষ্য মতে আল্লাহ্র খলিফা) এবং তাঁর রাজত্বের শেষ প্রান্তে উৎকীর্ণ ঢাকাতে প্রাপ্ত শিলালিপি তে ‘সুলতান আল-সালাতীন’ (রাজাধিরাজ), ‘জিল্লু আল্লাহ্-ফিল আলামীন’ (পৃথিবীতে ঈশ্বরের খলিফা) উপাধি গ্রহণ করেন। তাঁর রাজত্বকালে নির্মিত একটি মসজিদের ১৮ই রমজান ৮৮৫ হিজরী (১৪৮০ খ্রীঃ) উৎকীর্ণ শিলালিপি বর্তমানে কদমরসুল ভবন প্রাঙ্গণের প্রাচীরে সংযুক্ত আছে। উক্ত তারিখের কিছু পরে রহস্যজনক ভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। কথিত হয় যে ফজলবাঈ, লোট্টনবাঈ প্রমুখ নৃত্যাঙ্গনাগণ তাঁর সময়কালে রাজনর্তকী ছিলেন।
৫২) সুলতান নূর-উদ-দীন সিকেন্দার শাহ : (মাহমুদ শাহর পুত্র)—১৪৮০-১৪৮১ খ্রীঃ (৮৮৫-৮৮৬ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান বাহলুল লোদী-১৪৫১-১৪৮৯ খ্রীঃ (৮৫৫-৮৯৪ হিঃ)
সুলতান ইউসুফ শাহর মৃত্যুর পর গৌড়েশ্বর হন তাঁর পিতৃব্য সিকেন্দার শাহ। তাঁর ৮৮৫ এবং ৮৮৬ হিজরীতে উৎকীর্ণ মুদ্রা সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে। মুদ্রা সাক্ষ্যে জানা যায় তিনি ‘নূর-উদ-দুনিয়া ওয়াদ-দীন’ রাজকীয় উপাধি গ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সুলতান মাহমুদ শাহ। তাঁর মুদ্রিত মুদ্রা প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর পিতৃ-পরিচয়, রাজকীয় উপাধি, কুল-শীল, রাজাসনের স্থায়িত্ব ও যোগ্যতা সম্বন্ধে পূর্বের ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়।
সুলতান সিকেন্দার শাহ ১৮ই রমজান ৮৮৫ হিজরীর পরে কোন সময় সুলতান হন এবং ১লা জেলকদ ৮৮৬ হিজরীর পূর্বে কোন এক সময় রাজপরিবারের চক্রান্তের শিকার হয়ে স্বীয় ভ্রাতা ফতেহ শাহ কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হন।
৫৩) সুলতান জালাল-উদ-দীন ফতেহ শাহ : (মাহমুদ শাহর পুত্র)-১৪৮১ খ্রীঃ (৮৮৬ হিঃ)—১৪৮৭ খ্রীঃ (৮৯৩ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান বাহলুল লোদী-১৪৫১—১৪৮৯ খ্রীঃ (৮৫৫-৮৯৪ হিঃ)
ভ্রাতা সিকেন্দার শাহকে সিংহাসনচ্যুত করে ফতেহ শাহ রাজসিংহাসনে আরোহণ করে রাজঅধিকার প্রাপ্তির অপূর্ণ বাসনা পূর্ণ করেন। ইতঃপূর্বে ভ্রাতুষ্পুত্র ইউসুফ শাহর রাজত্বকালে তিনি বিদ্রোহী হয়ে ৮৮২ হিজরীতে মুদ্রা প্রচলন করেন।
সুলতান হবার পর তাঁর উৎকীর্ণ ১লা জেলকদ ৮৮৬ হিজরী (ঢাকার বন্দর), ১০ই জামাদী-উল-আউয়ল ৮৮৭ হিঃ (ঢাকার ধামরাই), রজব ৮৮৮ হিঃ (বিক্রমপুর), মহরম ৮৮৯ হিঃ (সুবর্ণগ্রাম), ৮৮৯ হিঃ (ক্যানিংহাম বর্ণিত-মহদীপুর), রমজান ৮৯১ হিঃ (বড় মসজিদ-মহদীপুর)*, ৪ঠা মহরম ৮৯২ হিঃ (সপ্তগ্রাম), ৮৯৩ হিঃ (ব্রিটিশ মিউজিয়াম) ইত্যাদি লিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। তাঁর বিদ্রোহ কালীন ৮৮২ হিজরীর মুদ্রা ছাড়া তাঁর ৮৮৬, ৮৯০ হিজরীর মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। তিনি তাঁর পিতার মত ‘খলীফত আল্লাহ্ বি’ল-হজ্জত ওয়াল বুরহান’ উপাধি গ্রহণ করেন। সম্প্রতি আবিষ্কৃত একটি মুদ্রায় তিনি দিল্লীর সম্রাট আলাউদ্দীন খলজী এবং বাংলার সুলতান ইলিয়াস শাহর মত ‘সিকেন্দার-আস-সানি’ উপাধি গ্রহণ করেন। তাঁর মুদ্রায় ‘মাজাদাল্লাহুর ফাতহা’ [আল্লাহ্ তাঁকে (ফতেহ) রক্ষা করুন] ‘হোসেন শাহী’, ‘সাইয়েদ শাহী’ শব্দগুলি তাঁর সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা এবং দল গঠন ও ক্ষমতা দখলের ইঙ্গিত প্রদান করে। তাঁর রাজত্বকালে গৌড়ে অভ্যন্তরীণ সামাজিক জীবন চরম ভাবে বিপর্যস্ত ও নিয়মশূন্য হয়ে পড়ে। তাঁর রাজত্বকালের শেষের দিকে কয়েকজন হাবসী বিদ্রোহী হয়ে মুদ্রা মুদ্রণ করেন। রুকনুদ্দীন বারবাক শাহর ছত্রছায়ায় আবদ্ধ ক্ষমতার স্বাদ ক্রমেই হাবসীদের স্বেচ্ছাচারী ও দুর্বিনীত করে তুলেছিল। তাঁর রাজত্বকালে রাজকর্মীদের নির্যাতন ও কাজীদের ধর্মোন্মত্ততা এবং আঞ্চলিক শাসনকর্তাদের সাম্প্রদায়িক নীতিতে ভিন্ন-ধর্মাবলম্বীদের অসন্তোষ বিদ্বেষে পরিণত হয়েছিল।
ফতেহ শাহর রাজত্বকালে ১৪৮৫ খ্রীষ্টাব্দে (৮৯০ হিঃ), ১৪০৭ শকাব্দে, ৮৯১ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনী পূর্ণিমাতে শ্রীকৃষ্ণের দোল যাত্রার দিনে চন্দ্রস্পর্শ-কালীন সময়ে যুগাবতার শ্রীচৈতন্য জন্মগ্রহণ করেন। সুলতান ফতেশাহর রাজত্বকালে তাঁর রাজ্যের মধ্যেই বিদ্রোহী হাবসীদের রাজপদবি গ্রহণ পূর্বক প্রকাশিত মুদ্রা ও লিপি মূলে মনে হয় তাঁর রাজ্য গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছিল এবং রাজদ্রোহীদের পক্ষে স্থানীয় সামন্ত, জমিদার ও ভূস্বামীদের সমর্থন ছিল, কারণ মুদ্রার মুদ্রণস্থল ও লিপির প্রাপ্তিস্থানের এলাকাসমূহে বিদ্রোহীদের আধিপত্য রাখতে গেলে সেই স্থানে তাঁদের সমর্থন প্রয়োজন।
হাবসী বিদ্রোহে বিচলিত ফতেহ শাহ বোধকরি ৮৯০ হিজরী (১৪৮৫ খ্রীঃ) তে সুফী দরবেশ শায়খ জালালুদ্দীন তাব্রেজী ও শাহ জালাল গুজরাতী এবং পবিত্র কদম রসুলের প্রতি নিবেদিত রৌপ্য ও স্বর্ণ মুদ্রা প্রচলন করেন। ইতঃপূর্বে বা অতঃপর বাংলার সুলতানদের মধ্যে এ ধরনের নিবেদনের উদ্ধৃতি কোন মুদ্রায় দেখা যায় নি।
এতদিন পর্যন্ত পণ্ডিতগণ ফতে শাহর সপ্তগ্রামে প্রাপ্ত লিপি ৮৯২ হিঃ মূলে ফতেহ শাহর রাজত্বকালে ৮৯২ হিঃ (১৪৮৬ খ্রীঃ) পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত একখানি ৮৯৩ হিজরীর (১৪৮৭ খ্রীঃ) শিলালিপি প্রকাশিত হওয়ায় বলা যায় তাঁর রাজত্বকাল ৮৮৬ হিজরী থেকে ৮৯৩ হিজরী পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ছিল।
সুলতান ফতেহ শাহ ৮৯৩ হিজরী সনে তাঁর প্রাসাদ মধ্যে নপুংসক দাস পাইকদের সর্বাধিনায়ক শাহজাদা বারবাক কর্তৃক নিহত হয়েছিলেন বলে বলা হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে পরবর্তী ইলিয়াস শাহী রাজবংশের অধ্যায় সমাপ্ত হয়। অযথা হাবসী প্রীতি এই রাজবংশের ধ্বংসের একমাত্র কারণ। ইলিয়াস শাহী সুলতানগণ রাজা গণেশ কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হলেও গণেশের বংশের পতনের পরে আমীর ও অমাত্যগণ জনপ্রিয় ইলিয়াসশাহী রাজবংশকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী ইলিয়াসশাহী সুলতানগণও পূর্ববর্তী সুলতানগণের মত উদারতার, দক্ষ শাসনের, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এবং স্থাপত্যশিল্পের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
.
* ফতেহ শাহর রাজত্বকালে সৈয়দ রাহাতের পুত্র সৈয়দ দস্তুর কর্তৃক ৮৯১ হিজরীর রমজান মাসে নির্মিত একটি মসজিদের শিলালিপি মহদীপুর বড় মসজিদে রক্ষিত আছে। ২০১২ খ্রীষ্টাব্দে জুলাই মাসে আধুনিক কালের নির্মিত এই মসজিদ সংস্কারের সময় লিপিটি দেওয়ালে সংযুক্ত অবস্থা থেকে মুক্ত করা হয়। দেওয়াল থেকে মুক্ত অবস্থায় শিলালিপিটির পরিমাপ দৈর্ঘ্য ৫২ ইঞ্চি প্রস্থ ১০ ইঞ্চি এবং পুরু ৪ ইঞ্চি (চিত্র নং ৪৫)।—লেখক
