বাংলায় বলবনী শাসন

বাংলায় বলবনী শাসন

২২) হিসামউদ্দীন উকিলদার বারবক : (অন্তর্বর্তীকালীন শাসক)

 ৬৭৯ হিঃ (১২৮০ খ্রীঃ)—৬৮১হিঃ (১২৮২ খ্রীঃ)

 সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন ৬৬৪ হিঃ (১২৬৬ খ্রীঃ)—৬৮৬ হিঃ

 (১২৮৭ খ্রীঃ)

দিল্লীর সুলতান বলবন লক্ষ্মৌতী অধিকার পূর্বক যুদ্ধকালীন অবস্থায় শাসক-শূন্য লক্ষ্মৌতীতে ঐতিহাসিক বারণীর মাতামহ সিপাহসলার হিসামউদ্দীনকে শাহানা বা শাসক নিযুক্ত করে তুগরলকে বিধ্বস্ত করবার জন্য তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করেন। তুগরল তখন পূর্ববঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করে সুযোগের অপেক্ষাতে আছেন।

২৩) বুগরা খান (সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ) :  ৬৮১হিঃ (১২৮২ খ্রীঃ)-৬৯০ হিঃ (১২৯১ খ্রীঃ)

(গিয়াসউদ্দীন বলবনের কনিষ্ঠ পুত্র প্রথমে শাসক পরে সুলতান)

সমকালীন দিল্লীর সুলতান—

• সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন-১২৬৬ খ্রীঃ (৬৬৪ হিঃ)—১২৮৭ খ্রীঃ (৬৮৬ হিঃ)

 (বুগরা খানের পিতা)

• সুলতান মঈজুদ্দীন কয়কাবাদ-(বুগরাখানের পুত্র এবং বলবনের পৌত্র)

 ১২৮৭ খ্রীঃ (৬৮৬ হিঃ)—১২৯০ খ্রীঃ (৬৮৯ হিঃ)।

 শয্যাশায়ী অবস্থায় শাহাদাত বরণ

• সুলতান শ্যামসুদ্দীন কাইয়ুমার্স-১২৯০ খ্রীঃ (৬৮৯ হিঃ)

 (কয়কাবাদের শয্যাশায়ী হবার কারণে তাঁর তিনমাসের শিশুপুত্র কাইয়ুমার্সকে শ্যামসুদ্দীন উপাধি প্রদান করে সিংহাসনে বরণ। কিন্তু সুলতান আরিজ-ই-মালিক জালালুদ্দীন ফিরোজ খিলজী কর্তৃক নিহত হন। কাইয়ুমার্স ভারতে শেষ তুর্কি সুলতান এবং তাঁর মৃত্যুতে দাস বা মাসলুক বংশের অবসান হয়।)

• সুলতান জালালুদ্দীন ফিরোজশাহ খিলজী -১২৯০ খ্রীঃ (৬৮৯ হিঃ)—১২৯৬ খ্রীঃ (৬৯৫ হিঃ)

 (কয়বাদের নিযুক্ত আরিজ-ই-মালিক এবং ভারতে খিলজী বংশের প্রতিষ্ঠাতা)

প্রায় তিন বৎসর ধরে তল্লাশী অভিযানে আত্মগোপন কালে স্বাধীনচেতা লক্ষ্মৌতীর সুলতান মঈজুদ্দীন তুগরল খান দিল্লী বাহিনীর হস্তে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিলেন (১২৮২ খ্রীঃ)।

তারপর তুগরল বিজয়ী বলবন বিজয়ী বেশে উন্মুক্ত তরবারি হস্তে লক্ষ্মৌতী প্রবেশ করে হত্যা-যজ্ঞ শুরু করে এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করেন। দিল্লীর সুলতান কিছুদিন লক্ষ্মৌতী নগরে অবস্থান করে কনিষ্ঠ পুত্র বুগরা খানকে লক্ষ্মৌতীর প্রশাসক নিযুক্ত করে দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেন। এই সঙ্গে বঙ্গে বলবনী রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হল এবং লক্ষ্মৌতী দিল্লীর অধীন প্রদেশে পুনরায় পরিণত হল। ইতঃপূর্বে বুগরা খান সমানা ও সমনের শাসনকর্তা ছিলেন। তৎকালে বিখ্যাত ফার্সি কবি আমীর খসরু তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন।

বুগরা খান ১২৮২ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১২৮৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত গভর্ণর হিসাবে লক্ষ্মৌতী শাসন করেন। ১২৮৭ খ্রীষ্টাব্দে (৬৮৬ হিঃ) দিল্লীর সুলতান বলবনের মৃত্যুর পর লক্ষ্মৌতীতে শাসক বুগরা খানের পুত্র কইকাবাদ দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। এবং লক্ষ্মৌতীর বুগরা খান ‘নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ’ রাজকীয় উপাধি ধারণপূর্বক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। লক্ষ্মৌতী টাঁকশাল থেকে ৬৮৭ হিজরী (১২৮৮-৮৯ খ্রীঃ) তে সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ নিজ নামে মুদ্রা প্রবর্তন করেন। মুদ্রায় তিনি তাঁর পিতা দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের মত ৩৭-তম খলিফা, মুস্তাসিস বিল্লাহ-এর নাম অঙ্কন করেন। লক্ষ্মৌতীতে পিতা এবং দিল্লীতে পুত্র একই সঙ্গে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হন। বুগরা খানের লক্ষ্মৌতী টাঁকশাল থেকে মূদ্রিত মুদ্রা আবিষ্কারের পূর্বে তাঁর (বুগরা খান) স্বাধীনতা ঘোষণার কথা আমরা এতদিন জানতাম তাঁর পুত্র ও লক্ষ্মৌতীর পরবর্তী সুলতান রুকনুদ্দীন কাই-কাউসের মুদ্রা ও শিলালিপির সাক্ষ্য থেকে। মুদ্রা ও শিলালিপিতে কাইকাউস তাঁর পিতাকে সুলতান রূপে ঘোষণা করেন।

লক্ষ্মৌতীর সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ (বুগরা খান) দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত পুত্র কয়কাবাদ ও পৌত্র কাইয়ুমার্স মৃত্যু এবং খিলজী বংশের প্রতিষ্ঠার সংবাদে মর্মাহত হয়ে তাঁর অপর পুত্র কাইকাউসের অনুকূলে ৬৯০ হিজরী (১২৯১ খ্রীঃ) সনে লক্ষ্মৌতীর সিংহাসন ত্যাগ করেন।

২৪) সুলতান রুকনুদ্দীন কাইকাউস শাহ : ৬৯০ হি (১২৯১খীঃ)—৭০০ হিঃ (১৩০০-১খ্রীঃ)। দিল্লীর সুলতান বলবনের পৌত্র এবং লক্ষ্মৌতীর সুলতান বুগরা খানের কনিষ্ঠপুত্র।

সমকালীন দিল্লীর সুতলান—

• সুলতান জামালুদ্দীন ফিরোজ শাহ খিলজী—৬৮৯ হিঃ (১২৯০খ্রীঃ)-১৭ই রমজান ৬৯৫ হিঃ জুলাই, ১২৯৬ খ্রীঃ ভ্রাতুষ্পুত্র কর্তৃক নিহত। (সম্রাট কয়কাবাদের নিযুক্ত অরিজ-ই-মালিক)

• সুলতান রুকনুদ্দীন ইব্রাহিম শাহ খিলজী—৬৯৫ হিঃ (১২৯৬ খ্রীঃ) (ফিরোজ শাহর পুত্র)

• সুলতান আলাউদ্দীন মুহাম্মদ শাহ খিলজী—৬৯৫ হিঃ (১২৯৬ খ্রীঃ)—৭১৬ হিঃ (১৩১৬ খ্রীঃ)

 (ফিরোজ শাহর ভ্রাতুষ্পুত্র—পিতৃব্য ফিরোজ শাহকে হত্যা করার কয়েক মাস পরে ৬৯৫ হিজরীর শেষ দিকে সিংহাসনে আরোহণ)

বলবন বংশীয় বাংলার সুলতান বুগরা খান (নাসিরুদ্দীন মাহমুদ) এর পুত্র কাউকাউস পিতৃদত্ত রাজসিংহাসনে আরোহণ করে সার্বভৌম রাজা হিসাবে রাজ উপাধি গ্রহণ পূর্বক রাজ্য শাসন করেন।

অদ্যাবধি কাইকাউসের রাজত্বকালে উৎকীর্ণ মোট পাঁচখানি শিলালিপি এবং অনেকগুলি মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। মুদ্রায় তিনি আব্বাসীয় খলিফা মুস্তাসিম বিল্লাহ (মৃত্যু ১২৫৮ খ্রীঃ)-র নাম অঙ্কন করেন। মুদ্রাগুলি লক্ষ্মৌতী টাঁকশাল থেকে ৬৯০-৯১ হিঃ এবং ৬৯৩-৬৯৮ হিঃ সনে উৎকীর্ণ। মুদ্রায় তিনি ‘আল-সুলতান আল আজম রুকন-আল-দুনিয়া ওয়াল-দীন আবুল মুজফফর কাইকাউস সুলতান বিন সুলতান’ উপাধি গ্রহণ করেন। মুদ্রা ও শিলালিপি সাক্ষ্যে জানা যায় যে সুলতান রুকনুউদ্দীন কাইকাউস সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের পৌত্র এবং সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ (বুগরা খান)-এর পুত্র ছিলেন।

শিলালিপির প্রাপ্তিস্থান দ্বারা প্রমাণ হয় যে কাইকাউসের রাজ্যসীমা বিহার ও বাংলার মধ্যে বিস্তৃত ছিল। তিনি স্বীয় রাজ্যকে বিহার ও লক্ষ্মৌতী প্রদেশে ভাগ করে দুই প্রদেশে দুই জন দক্ষ ও অভিজ্ঞ গভর্ণর নিযুক্ত করেন। বিহারের গভর্ণর ছিলেন ইখতিয়ার-উদ-দীন-ফিরোজ ইতগীন এবং লক্ষ্মৌতী প্রদেশের গভর্ণর ছিলেন শাহাব-উদ-দীন জাফর খান বাহরাম ইতগীন।

লক্ষ্মৌতীতে সুলতান রুকনুদ্দীন কাইকাউসের রাজত্বকালে দিল্লীতে বলবনী রাজবংশের পশ্চাতে খিলজী রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্ভবত লক্ষ্মৌতীতে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার টানাপড়েনের মধ্যে তিনি পড়েন, কারণ ৬৯ (৯) হিজরী সনে উৎকীর্ণ শামস-উদ-দীন দৌলত শাহর মুদ্রা লক্ষ্য করা যায়। কাইকাউসের রাজত্বকালে উৎকীর্ণ মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত শেষ শিলালিপির তারিখ ৭০০ হিজরী। অনুমান তিনি অপুত্রক অবস্থায় ৭০০ হিজরী সনে মৃত্যু বরণ করেন।

বাংলায় বলবনী শাসন
আলাউদ্দিনের সাম্রাজ্য

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *