বাংলার নবাবী আমল ও সমকালীন দিল্লীর সম্রাট
(সিরাজউদ্দৌল্লা পর্যন্ত)
১২৪) নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ (মোতামেন-উল-মুলুক আল-উদ-দৌল্লা জাফর খাঁ বাহাদুর নাসিরী নাসির জঙ্গ মুর্শিদকুলি খাঁ) : ১৭১৭-১৭২৭ খ্রীঃ (১১২৯-১১৩৯ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—
• ফারুক শিয়ার-১৭১৩-১৭১৯ খ্রীঃ (১১২৫-১১৩১ হিঃ)। ফেব্রুয়ারী ১৭১৯ খ্রীস্টাব্দে সিংহাসন চ্যুত ও নিহত।
• রফি-উদ-দারাজাত-১৭১৯ খ্রীঃ (১১৩১ হিঃ)-পিতা—রফি-উস-সান।
• রফি-উদ-দৌল্লা-১৭১৯ খ্রীঃ (১১৩১ হিঃ)-পিতা—রফি-উস-সান।
• নেকুশিয়ার-১৭১৯ খ্রীঃ (১১৩১ হিঃ)-পিতা—তৃতীয় আকবর।
• মহম্মদ ইব্রাহিম-১৭১৯ খ্রীঃ (১১৩১ হিঃ)-পিতা—রফি-উস-সান।
• রোশন আখতার (মহম্মদ শাহ)-১৭১৯-১৭৪৮ খ্রীঃ (১১৩১-১১৬১ হিঃ)। পিতা—জাহানশাহ।
সম্রাট ফারুকশিয়ার মীর জুমলার পরে ১৭১৭ খ্রীস্টাব্দে১ (১১২৯ হিঃ) নায়েব নাজিম মুর্শিদকুলি খাঁকে বাংলার নাজিম বা সুবাদার নিযুক্ত করেন। মুর্শিদকুলি খাঁ আমৃত্যু বাংলা সুবার নাজিম ও দেওয়ান পদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি বাংলার নিজামত বা নবাবির প্রতিষ্ঠাতা। মুঘল শাসন ব্যবস্থায় ব্যতিক্রমী হিসাবে একমাত্র মুর্শিদকুলি খাঁ সুবাদার ও দেওয়ান দুটি পদের অধিকারী হতে পেরেছিলেন।
মুর্শিদকুলি জন্মসূত্রে দক্ষিণভারতীয় ব্রহ্মণ। শৈশবে তাঁকে ক্রয় করেন পারস্যবাসী হাজি শফি ইস্পাহানি। তখন তাঁর নাম হয় মহম্মদ হাদি। পারস্যে হাজি শফির পুত্রদের সঙ্গে তাঁর শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য হয়। হাজি শফির মৃত্যুর পর তিনি ভারতে এসে স্বীয় প্রতিভাবলে রাজকার্যে যোগদান করেন। ১৭০০ খ্রীস্টাব্দে (১১১২ হিঃ) সম্রাট ঔরঙ্গজেব বিশ্বস্ত ও কর্মনিষ্ঠ মহম্মদ হাদিকে করতলব খাঁ উপাধি প্রদান পূর্বক বাংলার দেওয়ান এবং মুকসুদাবাদের ফৌজদার পদে নিযুক্ত করেন। ১৭০১ খ্রীঃ (১১১৩ হিঃ) তাঁকে মেদিনীপুর ও বর্ধমানের ফৌজদার এবং উড়িষ্যার দেওয়ান পদ প্রদান করা হয়। ১৭০২ খ্রীস্টাব্দের ২৩ শে ডিসেম্বর (১১১৪ হিঃ) সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁকে ‘মুর্শিদকুলি খাঁ’ উপাধি প্রদান করেন। ১৭০৩ খ্রীস্টাব্দে তিনি উড়িষ্যার নাজিম বা সুবাদার নিযুক্ত হন। ১৭০৪ সনের ১৮-ই জানুয়ারী (১১১৫ হিঃ) তিনি বিহারের দেওয়ান নিযুক্ত হন। ঔরঙ্গজেবের পৌত্র বাংলার নাজিম আজিম-উস-সানের সঙ্গে বনিবনা না হবার জন্য ঔরঙ্গজেবের সমর্থনে মুর্শিদকুলি তাঁর দেওয়ানী দপ্তর মুকসুদাবাদে স্থাপন করেন (১৭০৪)। মুর্শিদকুলির সঙ্গে জগৎ শেঠ পরিবারের মানিক চাঁদ শাহু ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেন। ১৭০৭ সনের ১৫-ই জুলাই (১১১৯ হিঃ) মুর্শিদকুলি সম্রাট কর্তৃক বাংলার নায়েব নাজিম বা ডেপুটি-সুবাদার পদ প্রাপ্ত হন। মুর্শিদকুলির নামানুসারে মুকসুদাবাদের নাম হয় মুর্শিদাবাদ।
১৭০৭ খ্রীস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বাংলার সুবাদার আজিম-উস-সানের পিতা প্রথম বাহাদুর শাহ দিল্লীর সম্রাট হলে মুর্শিদকুলি পরপর বাংলা ও উড়িষ্যার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ১৭০৮ সনে দাক্ষিণাত্যে দেওয়ান নিযুক্ত হন, কিন্তু দুই বৎসর পরেই ২০ শে ফেব্রুয়ারী ১৭১০ (১১২১ হিঃ) তাঁকে বাংলার দেওয়ান পদে পুনর্বহাল করা হয়। ১৭১১ সনে তিনি মেদিনীপুর ও হুগলী বন্দরের ফৌজদার হন। আজিম-উস-সান ভ্রাতা জাহান্দার শাহ কর্তৃক ৮-ই মার্চ ১৭১২ (১১২৪ হিঃ) নিহত হন।
১৭১৩ খ্রীস্টাব্দে ফারুকশিয়ার দিল্লীর সম্রাট হবার পর মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার নায়েব নাজিম বা ডেপুটি সুবাদার হন এবং ১৭১৪ সনে ৬-ই মে (১১২৬ হিঃ) তাঁকে ‘জাফর খাঁ’ উপাধি প্রদান পূর্বক উড়িষ্যার সুবাদার নিযুক্ত করা হয়। ১৭১৭ খ্রীস্টাব্দে সম্রাট ফারুকশিয়ার মুর্শিদকুলি খাঁকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। ১৭১৯ খ্রীস্টাব্দে ফারুকশিয়ার নিহত হবার পর মোগল রাজবংশে বিশৃঙ্খলার সুযোগ গ্রহণ করে মুর্শিদকুলি বিহারকে সুবা বাংলার অন্তর্গত করে সনদ আদায় করেন। অতঃপর মুর্শিদকুলি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হন। তিনি দিল্লীর সম্রাটের সঙ্গে সু-সম্পর্ক বজায় রেখে নিয়মিত বাংলা সুবার রাজস্ব প্রেরণ করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন। ১৭২৭ খ্রীস্টাব্দের ৩০ শে জুন (১১৩৯ হিঃ) তারিখে পরিণত বয়সে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীন নবার মুর্শিদকুলি খাঁ পরলোক গমন করেন। তাঁকে তাঁর ইচ্ছামতো তাঁর তৈরী মুর্শিদাবাদের কাটরা মসজিদের আম-জনতার প্রবেশ পথের সিঁড়ির নীচে সমাধিস্থ করা হয়।
১২৫) সুজা-উদ-দীন মহম্মদ খাঁ (সুলতান-উল-মুলুক সুজাউদ্দৌল্লা আসাদ জঙ্গ) : ১৭২৭-১৭৩৯ খ্রীঃ (১১৩৯-১১৫১ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—
• রোশন আখতার (মহম্মদ শাহ)-১৭১৯-১৭৪৮ খ্রীঃ (১০৩১-১১৬১ হিঃ)
মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা সুজাউদ্দীন বাংলা সুবার নবাব হন। মুর্শিদকুলি তাঁর কন্যা জিন্নৎউন্নিসার সঙ্গে সুজাউদ্দীন নামে তুর্ক বংশীয় এক সম্ভ্রান্ত যুবকের বিবাহ দেন এবং বাংলার সুবাদার হবার পর জামাতা সুজাউদ্দীনকে উড়িষ্যার নায়েব-নাজিম পদে নিযুক্ত করেন। জামাতার অনেক গুণ থাকলেও তিনি ছিলেন ভোগবিলাসী ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ। মুর্শিদকুলির কন্যা স্বামীর উচ্ছৃঙ্খল জীবন ও নারী সম্ভোগে চরম আসক্তি দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পুত্র আসদউল্লাকে (সরফরাজ) সঙ্গে করে পিতার কাছে থাকতেন। মুর্শিদকুলির ইচ্ছা ছিল তাঁর মৃত্যুর পর দৌহিত্র সরফরাজকে বাংলার নবাব করার। মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর উদ্ভুত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মাতা ও মাতামহীর অনুরোধে সরফরাজ সংঘর্ষ পরিহার করেন এবং দিল্লীর সনদ মূলে সুজাউদ্দীন বাংলার নবাব হন। তিনি দিল্লীর সম্রাট মহম্মদ শাহ কর্তৃক ‘সুলতান-উল-মুলক সুজাদৌল্লা আসাদ জঙ্গ’ উপাধি প্রাপ্ত হন।
ব্রাহ্মণ কুলজাত ধর্মান্তরিত মুর্শিদকুলি খাঁ বহু হিন্দুর জাতি নাশ করেছেন বলে অভিযোগ আছে। কিন্তু তাঁর ইন্দ্রিয়পরায়ণ জামাতার বহু নারীর সতীত্ব নাশের অভিযোগ পর্বত প্রমাণ। নবাব সুজাউদ্দীন অধিকাংশ সময় হারেমে কাটিয়ে রাজ্য চালনার দায়িত্ব হাজি আহমেদ, রায়-ই-রায়ান, আলম চাঁদ, ব্যাঙ্কার ফতেচাঁদ, জগৎ শেঠ প্রমুখ অমাত্যদিগের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। নবাব সুজাউদ্দীন ১৭৩৯ খ্রীস্টাব্দের ১৩-ই মার্চ (জেল হজ্জ, ১১৫১ হিজরী) তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ডাহাপাড়ার নবাবী উদ্যানে সমাহিত করা হয়।
১২৬) সরফরাজ খাঁ (আলা-উদ-দৌল্লা হাইদার জঙ্গ) : ১৭৩৯-১৭৪০ খ্রীঃ (১১৫১-১১৫৩ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—
• রোশন আকতার (মহম্মদ শাহ)-১৭১৯-১৭৪৮ খ্রীঃ (১১৩১-১১৬১ হিঃ)
মুর্শিদকুলি খাঁর জামাতা সুজাউদ্দীনের মৃত্যুর পর মুর্শিদকুলির দৌহিত্র সরফরাজ খাঁ বাংলার নবাব হন। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের লেখায় জানা যায় তিনিও পিতার মত ইন্দ্রিয়পরায়ণ ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে রাজক্ষমতা কার্যত ক্ষমতাবান অমাত্য ত্রয়ীর (আলম চাঁদ, হাজি আহমেদ, জগৎ শেঠ) হাতে চলে যায়। ফতেচাঁদ জগৎ শেঠের পুত্রবধূ অলোকসামান্য-রূপলাবণ্যবতী ছিলেন। পুত্রবধূর উপর নবাবের কুদৃষ্টিপাতে ফতেচাঁদ জগৎ শেঠ নিজেকে অপমানিত বোধ করে বিহারের নায়েব নাজিম আলিবর্দি খাঁকে বাংলার নবাব করার ষড়যন্ত্র করেন। যদিও ইউসুফ আলি সরফরাজকে ধর্মপ্রাণ নবাব হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন (AHWAL-I-MAHABAT JANG)। তিনি গিরিয়ার যুদ্ধে আলিবর্দি কর্তৃক ২৩ শে মহরম ১১৫৩ হিজরী বুধবার (৯ই এপ্রিল ১৭৪০) নিহত হন। ‘মুজফ্ফর নামা’ গ্রন্থে করম আলী তাঁর মৃত্যু দিবস বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নবাব সরফরাজের শবদেহ মুর্শিদাবাদে নীত ও সমাহিত হয়।
১২৭) আলিবর্দি খাঁ (সুজা-উল-মুলুক, হুসাম-উদ-দৌল্লা আলিবর্দি খাঁ মহব্বত জঙ্গ) : ১৭৪০-১৭৫৬ খ্রীঃ (১১৫৩-১১৬৯ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—
• রোশন আখতার (মহম্মদ শাহ)-১৭১৯-১৭৪৮ খ্রীঃ (১১৩১-১১৬১ হিঃ)
• আহমদ শাহ বাহাদুর (মহম্মদ শাহর পুত্র)-১৭৪৮-১৭৫৪ খ্রীঃ (১১৬১-১১৬৭ হিঃ)
• আজিজউদ্দীন (দ্বিতীয় আলমগীর) জাহান্দার শাহর পুত্র-১৭৫৪-১৭৫৯ খ্রীঃ (১১৬৭-১১৭৩ হিঃ)
১৭৪০ খ্রীস্টাব্দের ৩০ শে এপ্রিল বুধবার (সফর, ১১৫৩ হিজরী) আলিবর্দি খাঁ বাংলার নবাবী মসনদে আরোহণ করেন। আলিবর্দি খাঁর প্রকৃত নাম মির্জা মহম্মদ, তাঁর অগ্রজভ্রাতার নাম হাজী আহম্মদ খাঁ। ভ্রাতৃদ্বয়ের পিতা শাহ কুলি খাঁ সম্রাট ঔরঙ্গজেবের পুত্র আজম শাহর প্রাসাদভৃত্য ছিলেন। মোগল রাজপরিবারের ভ্রাতৃযুদ্ধে আজম শাহ নিহত (১৭০৭ খ্রীঃ) হবার পর উভয় ভ্রাতা পিতার সঙ্গে উড়িষ্যাতে তদানীন্তন নায়েব নাজিম সুজাউদ্দীনের আশ্রয় গ্রহণ করেন।
১৭২৭ খ্রীস্টাব্দে সুজাউদ্দীন বাংলার নবাব হবার পর হাজী আহম্মেদ নবাবের গুরুত্বপূর্ণ রাজকার্যে নিযুক্ত থাকেন, তাঁর ভ্রাতা মির্জা মহম্মদ ১৭২৮ খ্রীস্টাব্দে (১১৪০ হিঃ) রাজমহলের (আকবর নগর) ফৌজদার নিযুক্ত হন এবং দিল্লীর সম্রাট মহম্মদ শাহ কর্তৃক ‘আলিবর্দি খাঁ’ উপাধি প্রাপ্ত হন। আলিবর্দি খাঁ ১৭৩৩ খ্রীস্টাব্দে (১১৪৫ হিঃ) বিহারের নায়েব নাজিম নিযুক্ত হন এবং কর্মদক্ষতার পুরস্কার স্বরূপ ‘মহব্বত জঙ্গ’ উপাধি প্রাপ্ত হন। তারপরে তাঁর দৃষ্টি ছিল বাংলার মসনদের উপর। বাংলার ষড়যন্ত্রকারীগণ ছিলেন তাঁর সহায়। যথাসময়ে তিনি বিদ্রোহী জমিদারদের শাস্তিদানের অছিলায় বিশাল সেনাবাহিনী সহ বাংলার দিকে অগ্রসব হতে থাকেন। এই সংবাদ নবাব সরফরাজের নিকট পৌঁছালে তিনি সেনা অভিযান করেন। আলিবর্দি খাঁ ১৭৪০ খ্রীস্টাব্দে নবাবকে পরাজিত ও নিহত করে নবাবী আমলের সঞ্চিত অগাধ ঐশ্বর্য্যের অধীশ্বর হন এবং দিল্লী সম্রাট মহম্মদ শাহকে (রোশন আখতার) মূল্যবান উপঢৌকন সহ এক কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকা রাজস্ব প্রেরণ করেন (প্রথম ও শেষ বার)।
নবাব আলিবর্দি খাঁ ঘরে-বাইরে ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে রাজত্ব করেন। তাঁর আমলে বঙ্গে চরম বর্গি হামলা, আফগান বিদ্রোহ, প্রিয়জনের অকাল মৃত্যু, আপনজনের ষড়যন্ত্র—এমনকি প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র সিরাজের বিদ্রোহ ঘোষণা ইত্যাদি কারণে তিনি নির্বিবাদে ও শান্তিতে রাজত্বকাল অতিবাহিত করতে পারেন নি। মারাঠা (বর্গী)দের সঙ্গে যুদ্ধ চলার পরে ১৭৫১ খ্রীস্টাব্দে স্বাক্ষরিত সন্ধির স্বত্ব-অনুসারে উড়িষ্যায় রঘুজী ভোঁশলের প্রভুত্ব স্বীকৃত হয় এবং বাংলা থেকে বাৎসরিক বারো লক্ষ টাকা চৌথ প্রদানের বিনিময়ে বাংলায় বর্গীহামলার আশঙ্কা দূরীভূত হয়। ফলস্বরূপ আলিবর্দি খাঁ শুধুমাত্র বাংলা ও বিহারের নবাব সিহাবে রাজত্ব করেন।
১৬ বৎসর বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাবী মসনদে আসীন থেকে সাহসী ও কুশলী যোদ্ধা ও সমরনায়ক আলিবর্দি খাঁ ৯-ই এপ্রিল ১৭৫৬ খ্রীস্টাব্দে (৯-ই রজব ১১৬৯ হিঃ) শুক্রবার জোহরের নমাজে কলমা-ই-তাওহিদের সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১২৮) সিরাজউদ্দৌল্লা (মনসুর-উল-মুলুক) : ১৭৫৬-১৭৫৭ খ্রীঃ (১১৬৯-১১৭০ হিঃ)
সমকালীন দিল্লীর সম্রাট—
• আজিজউদ্দীন (দ্বিতীয় আলমগীর, জাহান্দার শাহর পুত্র-১৭৫৪-১৭৫৯ খ্রীঃ (১১৬৭-১১৭৩ হিঃ)
প্রয়াত নবাব আলিবর্দি খাঁর কোন পুত্রসন্তান ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌল্লা বাংলার নবাব হন (১০-ই এপ্রিল ১৭৫৬ খ্রীঃ) ১১৬৯ হিঃ। এক্ষণে সিরাজ দিল্লী সম্রাটের কাছ থেকে পূর্ব প্রথানুসারে সুবাদারী সনদ প্রাপ্তি বা নজরানা প্রেরণের আবশ্যকতা অনুভব করেন নি, কিন্তু পরবর্তী কালে তিন কোটি টাকা পেশকাশের বিনিময়ে দিল্লীশ্বরের কাছ থেকে সুবাদরী সনদ লাভ করেন।
সিরাজউদ্দৌল্লার পিতা ছিলেন হাজী আহমেদের পুত্র পাটনার নায়েব নাজিম জৈনুদ্দীন আহমেদ এবং মাতা ছিলেন আলিবর্দির কন্যা আমিনা বেগম। দৌহিত্র সিরাজের জন্ম (১১৪০ হিঃ) আলিবর্দি খাঁর রাজনৈতিক জীবনে সৌভাগ্য বহন করেছিল, তাই আলিবর্দি সিরাজকে অধিক স্নেহ করতেন এবং নবাবী মসনদে নিজের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেছিলেন।
প্রাণপ্রিয় দৌহিত্রের বসবাসের জন্য নবাব আলিবর্দি পরিত্যক্ত গৌড় নগরী থেকে উৎকৃষ্ট উপকরণ সংগ্রহ করে ভাগীরথীর পশ্চিম পারে হীরাঝিল প্রাসাদ নির্মাণ করান। সেই সুরম্য প্রাসাদে প্রবল ষড়রিপু তাড়িত রাজকীয় জয়োদ্ধত উল্লাস, সীমাহীন রাজদম্ভের ঔদ্ধত্য আর খেয়ালিপনা তৎসঙ্গে সুরার মত্ততা লালসার রিরংসা নূপুরের নিক্কন সুধাকন্ঠের সুর-মূর্চ্ছনায় যুগপৎ গরিমা ও কালিমার রূপবৈচিত্র্যকে কন্ঠহার করেন আলিবর্দির আদরের দৌহিত্র। এই হীরাঝিল প্রাসাদ ছিল সিরাজের প্রমোদের লীলা-কুঞ্জ ও চক্রান্তের পীঠ ভূমি। তাঁর ঔদ্ধত্য ও অত্যাচারে মর্মপীড়িত মাহাতাব রায় জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, মীরজাফর, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, উমিচাঁদ প্রমুখ প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ সিরাজের বিরুদ্ধে মন্ত্রণা করেন।
নবাব হয়ে সিরাজউদ্দৌল্লা নবাবী মসনদের অন্যতম দাবিদার সওকাত জঙ্গের বিরুদ্ধে পূর্ণিয়ায় সেনা অভিযান করে তাঁকে হত্যা করেন (২২শে মহরম-১১৭০, ১৭-ই অক্টোবর ১৭৫৬)। মতিঝিল আক্রমণ করে অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী ঘেসেটি (মেহেরউন্নিসা) কে বন্দী করেন ও তাঁর ধনসম্পদ লুন্ঠন করেন। ঘেসেটিপক্ষীয় ঢাকার দেওয়ানপুত্র কৃষ্ণবল্লভ সিরাজের কোপদৃষ্টি এড়াবার জন্য ধন-সম্পদ সহ সপরিবারে ইংরেজের আশ্রয় গ্রহণ করেন। তৎকালে ইংরেজ বণিকগণ সম্রাট ফারুকশিয়ারের ফরমান মূলে বাংলাতে সুবিধাজনক অবস্থায় ব্যবসা বাণিজ্য করছিলেন। সিরাজ নবাব হলে ইংরেজগণ অন্যান্য বিদেশী বণিকদের মত কোন নজরানা প্রেরণ করেন নি। তাঁরা নবাবের বিনা অনুমতিতে দুর্গের সংস্কার করেন, দস্তকের বে-আইনী ও যথেচ্ছ অপব্যবহার করে নবাবের নায্য প্রাপ্য রাজস্ব ফাঁকি দেন এবং নবাবের অপরাধী প্রজাদের আশ্রয় দান করেন। এই সব কারণে নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের সম্পর্কের অবনতি হয় এবং যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
ইংরেজদের সঙ্গে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার ষড়যন্ত্রকারীগণ যোগসাজশ করেন এবং পলাশীর প্রান্তরে লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা পরাজিত হন। সেই সঙ্গে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয় (২৩ শে জুন ১৭৫৭, ৫-ই শাওয়াল ১১৭০ হিঃ)। পরাজিত ও বিপর্যস্ত নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজমহলের উদ্দেশে পলায়নের সময় মালদহে ধৃত হন এবং তাঁকে হত্যা করা হয়। তরপরের ইতিহাস ইংরেজ বণিকদের উত্থানের ইতিহাস।
.
(১) আব্দুল করিমের মতে মুর্শিদকুলি খাঁর বাংলার সুবাদারপদে নিযুক্তির তারিখ ১৭১৬ খ্রীঃ)
