গৌড়বঙ্গে বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠিত রাজধানী
(শশাঙ্ক—সিরাজউদ্দৌল্লা)
১। কর্ণসুবর্ণ :
কর্ণসুবর্ণের অবস্থান মুর্শিদাবাদ জেলা অন্তঃপাতী বহরমপুরের ছয় মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে রাঙ্গামাটিতে। খ্রীস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দশকে শশাঙ্ক স্বাধীনতা ঘোষণা করে গৌড়ের সার্বভৌম অধীশ্বর হন। তিনি গৌড়-রাজ্যের রাজধানী কর্ণসুবর্ণে স্থাপন করেন। গৌড়াধিপ শশাঙ্কের মৃত্যুর (৬৩৭ খ্রীঃ) অব্যবহিত পরে চৈনিক পরিব্রাজক হিউ-এন-সাং (Yuan Chwang) ভারত ভ্রমণকালে কর্ণসুবর্ণে পদার্পণ করেন। তিনি তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে (সি-য়ু-কি) কর্ণসুবর্ণকে কী-লো-না-সু-ফা-লা-না বলেছেন। তথায় তিনি রক্তভিত্তি সঙ্ঘারাম (রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার) দর্শন করেছিলেন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে কর্ণসুবর্ণ নগরের দৈর্ঘ্য ২০ লি (৩.৩৩ মাইল), এবং নগরটির অবস্থান ভাগীরথী নদীর পশ্চিমে জানা যায়।
মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি নামক স্থানে কর্ণসুবর্ণের ধ্বংসাবশেষ দৃষ্ট হয়। রাঙ্গামাটির অধিকাংশ ভাগীরথীর গর্ভে বিলীন হয়েছে। রাজবাড়ী-ডাঙ্গা, রাক্ষসী-ডাঙ্গা, বেলতলা-ডাঙ্গা, সন্ন্যাসী-ডাঙ্গা, ঠাকুরবাড়ী-ডাঙ্গা প্রভৃতি স্থান কর্ণসুবর্ণের অতীত সমৃদ্ধির সাক্ষ্যদান করে।
সম্প্রতি রাজবাড়ী-ডাঙ্গাতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে প্রাপ্ত হিউ-এন-সাঙ বর্ণিত রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। কর্ণসুবর্ণের অবস্থান নিয়ে পণ্ডিতগণের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের পরে কর্ণসুবর্ণের অবস্থান সুনিশ্চিত হয়েছে—খ্রীস্টীয় সপ্তম শতকের প্রারম্ভে গৌড় রাষ্ট্রের মূল-কেন্দ্র অবস্থিত ছিল ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে, বর্ধমানের উত্তরে। হিউ-এন-সাং শশাঙ্ককে কর্ণসুবর্ণের রাজা বলেছেন। (কর্ণসুবর্ণে প্রত্ন খননের চিত্র—চিত্র নং-২৯)
২। রামাবতী :
রামাবতীর অবস্থান ছিল বরেন্দ্রভূমিতে গঙ্গা ও করতোয়ার মধ্যবর্তী স্থানে। পালবংশীয় নৃপতি রামপাল রাজা হয়ে দিবেবাকের ভ্রাতুষ্পুত্র ভীমকে পরাস্ত করে হৃত বরেন্দ্র উদ্ধার করে রামাবতী নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রীহেতুর চণ্ডেশ্বর ও ক্ষেমেশ্বর এই নতুন নগরীর জন্য উপযুক্ত স্থান নির্দেশ করেছিলেন এবং স্বল্পকাল মধ্যে যক্ষরাজ কুবেরের অলকার ন্যায় নির্মিত রামাবতী বরেন্দ্রভূমির শোভাবর্ধন করে। রামপালদেব এই নগরে জগদ্দলমহাবিহার নামে একটি বিহার নির্মাণ করেছিলেন।
রামাবতী রামপাল পরবর্তী পালনৃপতিগণের রাজ্যের রাজধানী ছিল। শেষ পালরাজা মদনপাল (১১৪৩-১১৬৫ খ্রীঃ) এর ৮ম রাজ্যবর্ষে প্রদত্ত দিনাজপুরের মানহলিতে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে—‘শ্রীরামাবতীনগরপরিসরসমাবাসিত শ্রীমজয়াস্বন্ধাবারাৎ’।
খ্রীস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতেও রামাবতীর উল্লেখ পাই সম্রাট আকবরের অমাত্য আবুল ফজল প্রণীত ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে। ফার্সী ভাষায় লিখিত এই গ্রন্থে রামাবতীকে রামৌতি বলা হয়েছে। প্রাচীন ধর্মমঙ্গল কাব্যে রামাবতী ‘রমতী’ নামে উক্ত হয়েছে। রামাবতী গৌড় নগরের নিকটবর্তী ছিল।

৩। গৌড় নগর (লক্ষ্মণাবতী) :
মালদহ জেলার ইংরেজবাজার সদর শহরের দক্ষিণে গৌড় নগর অবস্থিত। গৌড় নগরের অবস্থান ২৪ ডিগ্রি ৫৩ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ, ৮৮ ডিগ্রি ১৪ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। গৌড় নগর গৌড় রাজ্যের প্রাচীন নগর এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যিক রাজধানী (Imperial Capital)।
সেনরাজা বল্লাল সেন বরেন্দ্রতে সেন-অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে পূর্বদিকে গঙ্গা এবং পশ্চিমদিকে ভাগীরথীর মধ্যবর্তী নদীবেষ্টিত ও জলপথ সমৃদ্ধ গৌড় নগরে স্বীয় রাজ্যের আর এক রাজধানী স্থাপন করেন এবং মৃত্তিকাগড় (প্রাকার) ও পরিখা দ্বারা গৌড়নগরকে গর্ভস্থ করে নগরদুর্গের রূপ দেন। তাছাড়া নগরে পূর্ব-পশ্চিমে তিনটি মৃত্তিকাগড় নির্মিত হওয়াতে গৌড়নগর চারটি বলয়ে বিভক্ত হয়। উত্তরের গড়বলয়ে ছিল সেনদের রাজপ্রাসাদ। তার দক্ষিণে ফুলবাড়ি ও লোহাগড়ের মধ্যবর্তীস্থানে সম্ভবত ছিল সেনদের ধনাগার, এবং তার দক্ষিণে লোহাগড় ও কোতোয়ালী গড়ের মধ্যবর্তীস্থানে পৃথকভাবে মৃত্তিকাগড় বেষ্টনীর মধ্যে ছিল সেনদের সেনানিবাস। কোতোয়ালী গড়ের দক্ষিণে ছিল মৃত্তিকাগড় বেষ্টিত উপনগর। উপনগর নগরের ন্যায় শোভাসম্পন্ন ছিল। মৃত্তিকাগড়গুলি নগরের জনপ্লাবন রোধ ও প্রতিরক্ষা সুনিশ্চিত করত। বল্লাল পুত্র লক্ষ্মণ সেনের সময় গৌড়নগরের নাম হয় লক্ষ্মণাবতী। তাঁর রাজত্বকালে বখতিয়ার খিলজী নদীয়াহ ও লক্ষ্মৌতী (গৌড়নগর) জয় করে বঙ্গে মুসলিম যুগের সূচনা করেন। বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম যুগেও গৌড় নগরের নগর-রক্ষাকারী মৃত্তিকাগড়ের সংস্কার ও প্রয়োজনে নতুন মৃত্তিকাগড় নির্মিত হয়।
সুলতানী যুগের কোন সময় কৌশিকী-নদীর প্রভাবে গঙ্গার স্রোত অমৃতির নিকট নদীখাত পরিবর্তন করে ভাগীরথীর খাতে প্রবাহিত হয়ে ক্রমশঃ গৌড় নগরের পশ্চিমাংশে নগর রক্ষাকারী মৃত্তিকাগড়, রাজপথ ইত্যাদি গ্রাস করে সুলতানী যুগের দুর্গপ্রাসাদের প্রাচীরের পাশ দিয়ে প্রবহমান হয়। (প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যে বাইশগজী প্রাচীরের বুরুজের (site-3) তলদেশের মাটি Section করার সময় প্লাবনের পলি-বালির স্তর দৃষ্ট হয়।) তখন বাদশাহ হোসেন শাহর রাজত্বকাল। তিনি আগ্রাসী গঙ্গার গ্রাসে রাজপ্রাসাদ বিপন্ন বুঝে বিকল্প প্রাসাদ হিসাবে ‘গৌড়ের নিকটবর্তী একডালা দুর্গে অবস্থিতি করতে লাগলেন’ (গোলাম হোসেন)। কিন্তু গঙ্গা প্রাসাদ-প্রাকারের পার্শ্ব দিয়ে স্থিতিশীল গতিতে প্রবহমান হলে হোসেন শাহ গৌড় দুর্গ প্রাসাদেই স্থিতি করেন।
হোসেন শাহী আমলে গৌড়দুর্গপ্রাসাদের দরবার মহলের পশ্চিম দিকে গড়ে ওঠে জাহাজঘাটা (প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রমাণিত, site-2)। অনেকে বলেন গৌড় নগরের পশ্চিম দিক খোলা ছিল। গঙ্গা শত্রুর আক্রমণ থেকে নগরের পশ্চিম দিক রক্ষা করত। কিন্তু একথা সর্বৈব সত্য নয়। এক সময়ে কেবলমাত্র দুর্গপ্রাসাদের (বাইশগজী)ই পশ্চিমদিক খোলা ছিল। বাইশগজী প্রাকার দুর্গপ্রাসাদকে রক্ষা করত, কিন্তু তৎকালে নগর রক্ষার জন্য বাইশগজী দুর্গপ্রাসাদের উত্তর দিকে গঙ্গার ধার বরাবর প্রাসাদ চত্বর থেকে রামকেলি, ফুলবাড়ি হয়ে লোহাগড় পর্যন্ত মৃত্তিকাগড় নির্মিত হয়। অনুরূপভাবে বাইশগজী দুর্গপ্রাসাদের দক্ষিণে দেওয়ানী পুকুর ও গুণমন্ত মসজিদের পশ্চিমদিক দিয়ে কোতোয়ালী দরজার গড়ের (সুলতান গড়) সঙ্গে সংযুক্ত করে মৃ,ত্তিকাগড় নির্মিত হয়। ক্রমশঃ অবলুপ্তির পথে হলেও পরবর্তী কালের নির্মিত এই গড়ের অনেকাংশ এখনো দৃশ্যমান। সম্প্রতি রাস্তা নির্মাণের প্রয়োজনে স্থানে স্থানে গড়ের মাটি অপসারিত হলে অসংখ্য কবর দৃষ্ট হয়। অতএব এই গড় সুলতানী যুগেই প্রয়োজন বোধে নির্মিত; সেন যুগের নয়। সেন যুগের নির্মিত মৃত্তিকাগড়ের তলায় কবর থাকার কথা নয়।
সেন ও সুলতানী যুগে গৌড় নগর বহুসংখ্যক অট্টালিকা ও প্রাসাদ শোভিত ছিল। সেই যুগে ফেরিয়া-ই-সুজা নামক পর্তুগীজের বিবরণে গৌড় নগরে বারো লক্ষ লোকের বাস ছিল বলে জানা যায়। পথগুলি প্রশস্ত ও সরল ছিল, উভয় পার্শ্বস্থ বৃহৎ বৃক্ষ সমূহ পথিকদিগকে উত্তাপ থেকে রক্ষা করত। গৌড় নগরে বাইশটি বাজার ছিল।
সেন রাজা বল্লাল সেনের সময়কাল (১১৫৯-১১৭৯) থেকে শাহ সুজা-র সময়কাল (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রীঃ) পর্যন্ত প্রায় পাঁচশত বৎসরের মধ্যে প্রায় দুই শত আশি বৎসরের অধিককাল গৌড়নগর রাজ্যের সাম্রাজ্যিক রাজধানী (Imperial Capital) রূপে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সুলতানী যুগে সময়ে সময়ে রাজ্যের রাজধানী গৌড়নগর থেকে অন্যত্র অপসারিত হলেও গৌড়নগরে নগরজীবন অব্যাহত ছিল।
হোসেন শাহী বংশের সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহর রাজত্বকালে ৬-ই জেলকাদ ৯৪৪ হিজরী (এপ্রিল ১৫৩৮) সনে শেরশাহ সূরের গৌড়নগর অধিকার ও লুন্ঠনের মধ্য দিয়ে গৌড় নগরের পতনের দিন শুরু হয়। ১৫৬৫ খ্রীস্টাব্দে সোলায়মান খান কররাণী গৌড়নগর থেকে গঙ্গার অপর পারে তাঁড়া (TANDA) তে তাঁর রাজ্যের রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। ১৫৭৫ খ্রীস্টাব্দে (৯৮২ হিঃ) মুনিম খান গৌড় নগরের প্রাসাদশ্রেণী দেখে মোহিত হয়ে টাঁড়ার পরিবর্তে গৌড়নগরে রাজধানী করেন, কিন্তু ভয়ানক প্লেগে গৌড়নগর শ্মশানে পরিণত হয়। মুনিম খানেরও মৃত্যু হয়। সর্বশেষে শাহ সুজার সময়কালে (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রীঃ) গৌড় নগরকে তার পূর্ব সমৃদ্ধিতে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ শুরু হয়, কিন্তু ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব হেতু তাঁর আরাকানে পলায়ন ও মৃত্যুর পর গৌড়নগরে পুনরুজ্জীবনের আর কোন চেষ্টা হয় নি। গৌড়নগর ক্রমশ বিজনে পরিণত হয়।
গৌড়নগরের বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক নিদর্শন।
মাতৃপিণ্ডদান স্থলী—গৌড়েশ্বরীতলা :
একদা মাতৃপিণ্ড গ্রহণকারিণী দেবীর মন্দির ভগীরথের রথচক্রখাতে প্রবাহিতা সগর নৃপাকুল পাবনী ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত ছিল। কথিত হয় যে, ত্রেতা যুগে সীতাদেবী শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে ভাগীরথীর কূলে তাঁর মাতৃকুলের উদ্দেশে পিণ্ডদান করেন। শ্রীরামচন্দ্রের আগমন হেতু স্থানটির নাম হয় রামকেলি। পরবর্তী কালে ভাগীরথীর প্রখর তরঙ্গে দেবীমন্দির বিলুপ্ত হলে দেবীর স্থান পরিবর্তিত হয়। বর্তমানে মাতৃপিণ্ড গ্রহণকারিণী গৌড়েশ্বরীতলা গৌড়নগরের রাজপ্রাসাদ চত্বরে স্থাপিত আছে। দেবীর অর্চনা অদ্যাপি হয়ে থাকে। গৌড়নগরের গৌড়েশ্বরীতলা বা গয়েশ্বরীতলা পূর্ব ভারতের একমাত্র মাতৃপিণ্ডদান স্থলী। (দেবীমূর্তি-চিত্র নং-৩৫)
• সেন যুগের চণ্ডী বেদী :
গৌড় নগরের উত্তর গড়বলয়ে সেন যুগের প্রাসাদ-দুর্গের চারিদিকে দুর্গরক্ষাকারিণী দেবী দুর্গার (চণ্ডী) বেদী প্রতিষ্ঠিত আছে, যথা—পূর্বদ্বারে জোহরাচণ্ডী, উত্তর দ্বারে মাধাই চণ্ডী, পশ্চিম দ্বারে দ্বারবাসিনী রণচণ্ডী, এবং দক্ষিণে লোহাগড়ে পাটল চণ্ডী বা পাতাল চণ্ডী। তাছাড়াও গৌড় নগরীতে সেন যুগে আরও চণ্ডীবেদী প্রতিষ্ঠিত ছিল।
• সাগর দিঘি (ছোট ও বড়), পিয়াসবারি দিঘি :
গৌড় নগরে খনিত পুষ্করিণীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বড় সাগর দিঘি (১৬০০ X ৮০০ গজ) ও ছোট সাগর দিঘি (১০০০ X ৪০০ গজ) ও পিয়াস বারি দিঘি। এইসব বৃহৎ আয়তনের পুষ্করিণী একদা গঙ্গা প্রবাহের গভীরতম নদীখাতকে উত্তীর্ণ করে সেন যুগে সৃষ্ট। এই পুষ্করিণীগুলি উত্তর-দক্ষিণে অধিক প্রশস্ত এবং হিন্দুরীতিতে খনিত।
• জাহানিয়া মসজিদ (ঝনঝনিয়া মসজিদ) :
গৌড় নগরের বড় সাগর দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে ৯৪১ হিজরী (১৫৩৪-৩৫ খ্রীঃ) সনে সুলতান হোসেন শাহর পুত্র সুলতান মাহমুদ শাহর রাজত্বকালে মালতী নাম্নী রাজ পরিবারের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা কর্তৃক এই ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ নির্মিত।
• আখি সিরাজের সমাধি :
বড় সাগর দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে জাহানিয়াঁ মসজিদের নিকট আখি-সিরাজের সমাধি অবস্থিত। প্রতি বছর ঈদ-উল-ফিতর ও বকর ঈদে এখানে ভক্ত সমাগমে মেলা বসে।
• সদুল্লাহপুর শ্মশান ঘাট :
বড় সাগর দিঘির নিকটবর্তী ভাগীরথী তীরে বহু প্রাচীন শ্মশান-ক্ষেত্র আছে। এখানে স্নানের ঘাটকে ‘শঙ্খধ্বনি’ ঘাট বলা হয়ে থাকে। এখানে পৌষ-সংক্রান্তি ও মাঘী পূর্ণিমাতে গঙ্গা স্নানের মেলা বসে।
• গুয়ামালতী নীলকুঠি :
ইংরেজযুগে এই কুঠি স্থাপিত হয়। হেনরী ক্রেটন নামে এক কুঠিয়াল এই কুঠির দায়িত্বে ছিলেন (১৭৮৭-১৮০৭ খ্রীঃ)। একাধারে তিনি ছিলেন গ্রন্থকার, প্রত্নপ্রেমী ও শিক্ষানুরাগী। তিনি এখানে দরিদ্র পড়ুয়াদের জন্য দেশীয় ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮০৭ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সমাধিতে উৎকীর্ণ ছিল।
”HENRY CREIGHTON of GOAMALTY
Date of Death-2nd October 1807
Age-44 Years
FIRST INSTITUTOR OF NATIVE
SCHOOLS FOR INSTRUCTING POOR
CHILDREN IN THEIR OWN LANGUAGE”
• জোড়া স্তম্ভ :
ইংলিশবাজার থেকে সাত মাইল দূরে গৌড়ের পথের পূর্ব দিকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা প্রস্তর স্তম্ভ দেখা যায়।
• বৈষ্ণবতীর্থ রামকেলি :
গৌড়ের পথে পিয়াসবারি দিঘিকে পূর্বদিকে রেখে পশ্চিম দিকের পথে রামকেলির অবস্থান। এখানে যুগাবতার শ্রীচৈতন্যদেব সুলতান হোসেন শাহর রাজত্বকালে ১৫১৫ খ্রীস্টাব্দে সুলতানের দুই মন্ত্রী শ্রীসনাতন ও শ্রীরূপ গোস্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আগমন করেন। তাঁর আগমন উপলক্ষে দিন কয়েকের জন্য বৈষ্ণবমেলা অনুষ্ঠিত হয়। (শ্রীমদ্রাধামদনমোহন-চিত্র নং-৩৮ এবং শ্রীচৈতন্য চিত্র নং-৩৯)
• বড় সোনা মসজিদ বা বারদুয়ারী মসজিদ :
রামকেলিতে প্রস্তরের আবরণে আবৃত ইষ্টক নির্মিত আয়তাকার জামে-মসজিদ দেখা যায়। এটি গৌড়নগরের মধ্যে সর্ববৃহৎ স্মৃতি সৌধ। এর শিরোদেশ প্রতি সারিতে ১১ টি করে মোট ৪৪ টি গম্বুজে আবৃত ছিল। বর্তমানে এটির বারান্দার ১১টি গম্বুজ অবশিষ্ট আছে। একদা গম্বুজগুলি স্বর্ণময় প্রলেপে আবৃত থাকার জন্য এবং আকারগত কারণে একে বড় সোনা মসজিদ বলে। গৌড়ের পিরোজপুরে অপেক্ষাকৃত ছোট সোনা মসজিদ আছে। এই মসজিদকে ‘বারদুয়ারী’ (বহুদ্বার যুক্ত হল ঘর) বলা হয়ে থাকে। মসজিদ গাত্রের লিপি মূলে ফ্রাংকলিন মসজিদের নির্মাতা সুলতান নশরত শাহ এবং নির্মাণকাল ৯৩২ হিঃ (১৫২৬ খ্রীঃ) উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে লিপিটি মসজিদ গাত্রে অনুপস্থিত। (চিত্র নং-৬ এবং ৪৬)
• ফিরোজ মিনার :
গৌড়-দুর্গপ্রাসাদের মৃত্তিকাগড় বেষ্টনীর (প্রাকার) বহির্দেশে এবং পরিখার পার্শ্বে ৬২ ফুট পরিধি যুক্ত ভিত্তিমূলের উপর ২৫.৬০ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট ইস্টক-প্রস্তরে নির্মিত মিনারে আরোহণার্থে শঙ্খগর্ভাকারে ৭৩ টি ধাপযুক্ত সর্পিল সোপানবলী ঊর্ধ্বে উত্থিত। এটির তলদেশ অপেক্ষা ঊর্র্ধ্বদেশ ক্রমশঃ কিছু সূক্ষ্ম। মিনারটির প্রথম তিনটি থাক বারোকোণ বিশিষ্ট এবং উপরের দুইটি থাক গোলাকার।
মিনারটির নাম ‘ফিরোজ মিনার’। মিনারের গাত্রদেশ নীল (ফিরোজা) বর্ণের প্রলেপে (Plaster) আচ্ছাদিত থাকার কারণে মিনারটির নাম ‘ফিরোজ মিনার’ বা নীলকান্তমণি মিনার (Blue tower বা Turquoise Minor) বলা হয়। মিনারগাত্রে কোন লিপি না থাকার কারণে নির্মাতা বিষয়ে বিতর্ক আছে। সম্ভবতঃ আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এর নির্মাতা। (চিত্র নং-৫)
• দাখিল দরওয়াজা :
সুলতানি যুগের গৌড়দুর্গপ্রাসাদ রক্ষাকারী সুবৃহৎ মৃত্তিকাগড়বলয়ের উত্তরদিকের সম্ভ্রমসৃষ্টিকারী বৃহৎ আকারের প্রবেশপথের নাম দাখিল দরওয়াজা বা সেলামী দরওয়াজা। ইস্টক-প্রস্তরে নির্মিত তোরণটির শীর্ষদেশ তিনটি ধনুরাকৃতি (Vault) ছাদে আবৃত। তোরণটির চারকোণে চারটি দ্বাদশ কোণ বিশিষ্ট, ছয় থাকে বিভক্ত এবং শীর্ষদেশ গম্বুজাবৃত বুরুজে শোভিত ছিল। বর্তমানে বুরুজগুলির ঊর্ধ্বদেশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবার কারণে এই তোরণের উচ্চতার সঠিক পরিমাপ দেওয়া সম্ভবপর নহে। এই তোরণের কাঠামোটি ১১১’-৩” X ৭২’-৮” দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট (বুরুজবাদে)।
দাখিল দরওয়াজাতে আগমন-নির্গমনের জন্য এটির দুই প্রান্তে 20′-6” উচ্চতা এবং ১২’-৩” প্রশস্ত খিলান পথের মধ্য দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় চলাচল পথ আছে। তোরণের মধ্যে এই পথের প্রতিপার্শ্বে প্রহরী কক্ষ আছে। অতি জাঁকজমকপূর্ণ এই প্রবেশ পথটি নাসিরুদ্দীন মহম্মদ শাহ নির্মাণ করেন এবং পরবর্তী সুলতানগণ এটির সংস্কার সাধন করেছেন। সুলতানী যুগে এটি ছিল রাজপ্রাসাদে (বাইশগজী) প্রবেশের প্রধান পথ।
• বাইশ গজী (রাজপ্রাসাদ) :
সেনদের সেনানিবাস স্থলে সুলতানী যুগের রাজপ্রাসাদ বর্তমানে অবলুপ্ত। কেবলমাত্র প্রাসাদের ইস্টকনির্মিত বিশালাকার প্রাকার (বাইশগজী) অতীত সমৃদ্ধির সাক্ষ্য প্রদান করে। অতীতে ইস্টক প্রাকারে দরবার মহল, খাসমহল ও হারেম মহলে বিভক্ত ছিল রাজপ্রাসাদ। সম্প্রতি প্রত্নখননে প্রাসাদ মধ্যে টাঁকশাল, জাহাজঘাটি, বুরুজ ও প্রাসাদ চত্বরে রাজগৃহের সন্ধান মিলেছে। সুলতানী যুগে দাখিল দরওয়াজা, নিম দরওয়াজা, চাঁদ দরওয়াজার মধ্য দিয়ে রাজকীয় রাজপথে রাজারা রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করতেন। (বাইশগজী প্রত্নখনন—চিত্র নং-২৭)
• চিকা বা চামকান ভবন :
মৃত্তিকাগড় বেষ্টিত গৌড়দুর্গাভ্যন্তরে দক্ষিণ-পূর্ব দিক তৎকালে প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় কার্যের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এখানে ইংরেজী T আকারের ভূমিনক্সার উপর চিকা ভবন গঠিত ছিল। ভবনটির পশ্চিমাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবার পরে অবশিষ্টাংশ বর্গক্ষেত্রাকার ভবনটির সঙ্গে পাণ্ডুয়ার একলাখী ভবনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অবশিষ্ট ভবনটি ফুট বর্গাকার এবং এর অভ্যন্তর ভাগ ৪২ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট। ভবনটির চারিদিকে চারিটি প্রবেশ পথ আছে। ভবনটির পশ্চিম দেওয়ালের দরজা ও লিন্টেলের পাথরের মধ্যে বিলুপ্ত অবস্থায় হিন্দু মূর্তি এবং দেওয়াল গাত্রে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি উল্টানো অবস্থায় দেখা যায়। সুলতানী যুগে রাজকার্য পরিচালনার জন্য এটি অন্যতম একটি ভবন ছিল। সুলতান হোসেন শাহর মন্ত্রী শ্রীসনাতন দাবিরখাস একদা এই ভবনে তাঁর নিজ দপ্তরে অন্তরীণ অবস্থায় ছিলেন। এর নির্মাতা ও নির্মাণকালের কোন লিপি সংযুক্ত নেই।
• গুমটি দরওয়াজা :
চিকা ভবনের পূর্বদিকে মৃত্তিকাগড় মধ্যে ইস্টক নির্মিত, মিনাকারীতে উজ্জ্বল, একগম্বুজ বিশিষ্ট একটি সুলতানী যুগের ভবন দেখা যায়। ভবনটির নাম ‘গুমটি দরওয়াজা’। ‘গুমটি’ অর্থাৎ গুল্মবাটিকা বা প্রহরীকুটীর এবং দরওয়াজা অর্থাৎ গমনাগমনের পথ। এক কথায় এটি প্রহরীর প্রহরাযুক্ত প্রবেশ পথ।
তৎকালে এই ভবনটিকে প্রশাসনিক ও বিচারবিভাগীয় কার্যে আগমন হেতু আমজনতার ব্যবহার্য ফটক রূপে ব্যবহার করা হত এবং এখানে সর্বদা সেনা মোতায়েন থাকতো। জানা যায় এই ভবনের লিপি পিরোজপুরে নিয়ামতউল্লাহর দরগাহতে রক্ষিত আছে। ১৯৩০ সাল থেকে এই ভবন গৌড়-মিউজিয়াম রূপে ব্যবহৃত হয়।
• দোচালা গৃহ-ফতে খানের সমাধি :
গৌড়দুর্গের মৃতপ্রাচীর বেষ্টনীর পূর্বদিকে কদম-রসুল ভবনের ইস্টক-প্রাচীর বেষ্টিত অঙ্গন মধ্যে দোচালা আকৃতির একটি ইস্টক-প্রস্তর নির্মিত গৃহ দেখা যায়। এই গৃহটি সম্ভবতঃ রাজা গণেশের আমলের এবং মন্দির হিসাবে ব্যবহৃত হত। গৃহাভ্যন্তরে ছাদের মধ্যভাগে লৌহ বঁড়শির সাহায্যে শিকল ও ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা ছিল। গণেশ পরবর্তী মুসলিম যুগে দেবমূর্তি নিক্ষিপ্ত হলেও গৃহটি অক্ষত থাকে। মোগল যুগে এই গৃহে দিলির খানের পুত্র ফতে খানকে সমাধিস্থ করা হয়।
• কদম রসুল :
কদম রসুল ভবনটি ৬১’.৮”X৪৭’.৮” দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট। এই ভবনে একটি গম্বুজ আছে। এটির তিন দিকে বারান্দা আছে। ভবনটির চার কোণে চারটি বুরুজের উপর কৃষ্ণশিলা নির্মিত অষ্টকোণী চারটি শোভাবর্ধক স্তম্ভ ছিল, বর্তমানে একটির অনেকাংশ অনুপস্থিত। ভবনটির সম্মুখভাগের (Facade) সঙ্গে রাঢ় বঙ্গের অনেক মন্দিরের মিল আছে। ভবনটির মধ্যে ১৯’ X১৯’ মাপের গর্ভগৃহে, গম্বুজের নীচে রসুল হজরত মহম্মদের ভক্তমানস-কল্পিত চরণচিহ্ন রক্ষিত আছে। তাই এই ভবনের নাম ‘কদম রসুল’। এই ভবনে সংযুক্ত লিপিমূলে জানা যায় ভবনটি ৯৩৭ হিজরী (১৫৩১ খ্রীঃ) সনে সুলতান হোসেন শাহর পুত্র সুলতান নশরত শাহ নির্মাণ করেন। কদম রসুল ভবনের প্রাচীরগাত্রে ইউসুফ শাহর রাজত্বকালে মিরশাদ খান কর্তৃক নির্মিত ১৮ রমজান ৮৮৫হিঃ (১৪৮০ খ্রীঃ) তে মসজিদ নির্মাণলিপি সংযুক্ত আছে () চিত্র নং ৪৩।
• লুকোচুরি দরওয়াজা (শাহী দরওয়াজা) :
কদমরসুল ও গুমটি দরওয়াজার মধ্যবর্তী স্থানে, গৌড়দুর্গের পূর্বদিকের মৃতপ্রাচীর মধ্যে মাথাতে গৌড়িয়া ইটের মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে দুর্গে প্রবেশের অন্যতম একটি শাহী দরওয়াজা। মোগল রীতিতে নির্মিত এই ফটকটির দৈর্ঘ্য ৬৫’ এবং প্রস্থ ৪২’-৪” এবং এর প্রবেশ পথটি ১০’ চওড়া। এই শাহী দরওয়াজার নির্মাতা ছিলেন শাহ-সুজা। (চিত্র নং-২৬)
• চামকাট্টি মসজিদ :
লুকোচুরী দরওয়াজার পূর্বদিকে বর্তমান নবাবগঞ্জ রোডের (ইংরেজবাজার-মহদীপুর) পশ্চিমে ৫০’-৪”X৩৪’-৮” দৈর্ঘ্যপ্রস্থ ভূমির উপর একগম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ দেখা যায়। এই মসজিদের নাম চামকাট্টি মসজিদ। এর মূল কক্ষ ২৩’১০”X২৪’৪” দৈর্ঘ্যপ্রস্থ বিশিষ্ট। সামনে ৯’-১১” র বারান্দা। বারান্দার ছাদে একটা বিশেষ ধরনের খিলান করার পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়। মসজিদটির চার কোণে চারটি বুরুজ আছে। মসজিদটি পাথরের শক্তভিতের উপর গৌড়িয়া ইট দ্বারা সম্ভবতঃ সুলতান ইউসুফ শাহর রাজত্বকালে ৮৮০ হিঃ (১৪৭৫ খ্রীঃ) সনে নির্মিত।
• তাঁতিপাড়া মসজিদ :
চামকাট্টি মসজিদ থেকে দক্ষিণে সামান্যদূরে নবাবগঞ্জ রোডের পশ্চিমে টেরাকোটার অলঙ্করণে সমৃদ্ধ ইস্টক নির্মিত আয়তাকার জুম্বা মসজিদ দেখা যায়। এটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত লিপি মোতাবেক সুলতান শাহর রাজত্বকালে ১৪ই মহরম ৮৮৫ হিঃ (১৪৮০ খ্রীঃ) সনে নির্মিত। এই মসজিদটিকে ‘উমরকাজীর মসজিদ’ও বলা হয়। মসজিদের সম্মুখে প্রাঙ্গণ মধ্যে উমরকাজী, ও জুলকরয়নের সমাধি দেখা যায়। এই মসজিদের ১০টি গম্বুজ, জেনানা মঞ্চ ও দেওয়ালের কিছু অংশ ১৮৮৫ খ্রীস্টাব্দের ভূমিকম্পে ভূপাতিত হয়।
• লোট্টন মসজিদ :
তাঁতিপাড়া মসজিদের দক্ষিণে সামান্য দূরে সড়কের পূর্বদিকে ৭৪’X ৫৪.৫’ দৈর্ঘ্যপ্রস্থ বিশিষ্ট (বুরুজবাদে) অপূর্ব বর্ণোজ্জ্বল মসজিদটি কিংবদন্তী অনুসারে রাজনর্তকী লোট্টন বাঈ (মীরা) কর্তৃক নির্মিত। সেই কারণে এটি লোট্টন মসজিদ নামে খ্যাত। মসজিদটির গাত্রদেশ সবুজ, নীল, হলুদ ও শুভ্র বর্ণের মীনা করা গৌড়িয়া ইটের আচ্ছাদনে ও অলংকরণে সমৃদ্ধ। সম্ভবতঃ সুলতান ইউসুফ শাহর রাজত্বকালে ৮৮০ হিঃ (১৪৭৫) সনে এই মসজিদ নির্মিত।
• গুণমন্ত মসজিদ :
লোট্টন মসজিদের পশ্চিম দিকে মহদীপুরের পথে চৌকাপাড়া মৌজায় গৌড় নগরের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম একটি ভগ্নদশাপ্রাপ্ত আয়তাকার জামে মসজিদ অবস্থিত। নিকটবর্তী স্থানে প্রাপ্ত লিপিমূলে মসজিদটি সুলতান ফতে শাহর রাজত্বকালে ওয়াজির-ই-লস্কর খান দৌলত খান কর্তৃক ৮৮৯ হিঃ (১৪৮৪ খ্রীঃ) তে নির্মিত বলে মনে করা হয়।
এই মসজিদের ছাদ কেন্দ্রীয় কক্ষে পিপা আকৃতি (voult) এবং প্রতিপার্শ্বে ১২ টি করে ২৪ টি গম্বুজে আবৃত ছিল। বর্তমানে মসজিদটির উত্তর দিকের ৯ খানা গম্বুজ ভূপাতিত। এই মসজিদের ছাদের পরিকল্পনার সঙ্গে আদিনা মসজিদ, দরশবাড়ী মসজিদ এবং রাজমহলের জুম্বা মসজিদ (হাডাফ) এর মিল আছে। ইস্টক-প্রস্তর নির্মিত এই মসজিদের দেওয়াল গাত্র বড় ও ছোট সোনা মসজিদের মত পাথরের মুখপাতে আবৃত ছিল। মসজিদটির উত্তর-পশ্চিম কোণে জেনানামঞ্চ ছিল। বর্তমানে জেনানামঞ্চ অবলুপ্ত এবং দেওয়াল গাত্র থেকে পাথরের মুখপাত সম্পূর্ণরূপে অপসারিত অবস্থায় দেখা যায়।
• কোতোয়ালী দরওয়াজা :
গৌড় নগরের দক্ষিণ দিকে মৃত্তিকাগড় মধ্যে চল্লিশ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের নাম কোতোয়ালী দরওয়াজা। সুলতানী যুগে এই প্রবেশ পথের ৩০’ উচ্চ ও ১৬’-৯” বিস্তৃত জমকালো খিলানপথের মধ্য দিয়ে উপনগর থেকে নগরে গমনাগমন হত। হেনরী ক্রেটন গুয়ামালতীতে থাকার সময় (১৭৮৬-১৮০৭) এই তোরণের চিত্র অঙ্কন করেছিলেন। পরবর্তীকালে ভূমিকম্পে এই তোরণ ভূপাতিত হয়। সেনযুগে প্রতিষ্ঠিত এই তোরণটি সুলতান নাসিরুদ্দীন মামুদ শাহ (৮৩৯-৮৬৪ হিঃ) কর্তৃক নবরূপে (Renovated) প্রতিষ্ঠিত ও অলংকৃত (Ornamented) হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
কোতোয়ালী দরওয়াজা থেকে দক্ষিণে পুখুরিয়া পর্যন্ত গৌড়ের উপনগরের নাম ফিরোজপুর বা পিরোজপুর। বর্তমানে উপনগরের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি বাংলাদেশ সীমানাভুক্ত।
• রাজবিবি মসজিদ (চামচিকা মসজিদ) :
কোতোয়ালী দরওয়াজার দক্ষিণ পূর্বদিকে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলান্তঃপাতী শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়ানের অন্তর্গত চাপর মৌজায় খঞ্জন দিঘি (খনিয়া) র দক্ষিণ-পশ্চিম ধারে ৬২’X৪২’ ভূমির উপর রাজবিবি মসজিদ অবস্থিত। মসজিদের ২৯’ বর্গাকার মূলকক্ষটি একটি বিশাল গম্বুজ এবং বারান্দা তিনটি অপেক্ষাকৃত ছোট গম্বুজে আবৃত। একদা ভূমিকম্পে মসজিদটির বারান্দা ভূপাতিত হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ব্রিটিশ সরকার সংস্কার করে এটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে এবং ২০০৪-২০০৫ সনে বাংলাদেশ সরকার সর্বাঙ্গীণ সংস্কার করে মসজিদটির অতীতের সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনে। স্থাপত্যরীতি বিচারে এটি পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বংশের বংশধর সুলতান ইউসুফ শাহর রাজত্বকালে (৮৭৫-৮৮৫ হিঃ) নির্মিত হতে পারে। মসজিদগাত্রে কোন লিপি নেই।
• ধুনীচক মসজিদ :
রাজবিবি মসজিদের দক্ষিণে এবং বালুয়াদিঘির পূর্বে কাঞ্চনপুর মৌজায় জোকাহা পুকুরের পশ্চিমে সর্বমোট ৬৩’ X ৪৭.৫’ দৈর্ঘ্যপ্রস্থ বিশিষ্ট আয়তাকার ‘ধুনীচক মসজিদ’ অবস্থিত। মসজিদটির গৃহাভ্যন্তর ভাগ ৪৪.৫’ X ২৯’ দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট। গৃহমধ্যে ২টি প্রস্তর স্তম্ভ, ছাদে ছয়টি গম্বুজ, কিবলাওয়ালে তিনটি মেহরাব, মসজিদ গৃহের চারকোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতি বুরুজ এবং সাতটি খিলান পথ আছে।
একদা ভূমিকম্পে মসজিদটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিংশ শতাব্দীর আরম্ভে ব্রিটিশ সরকার এটির সামান্য সংস্কার করে। ২০০৪-২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার মসজিদটির ভিত্তিমূল অনুসারে সর্বাঙ্গীণ সংস্কারের মাধ্যমে অতীত সৌন্দর্য্য ফিরিয়ে আনে। মসজিদে কোন লিপি নেই।
• দরশবাড়ী মসজিদ :
কোতোয়ালী দরওয়াজার অর্দ্ধমাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে মহদীপুর ও পিরোজপুরের মধ্যস্থলে উমরপুরে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সীমান্তবর্তী এলাকাতে সর্বমোট ১১১.৫’ X ৬৭.৫’ দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট প্রস্তর স্তম্ভ যুক্ত ইস্টক নির্মিত জামে মসজিদ অবস্থিত। মসজিদটিতে গৌড়ের বড়সোনা মসজিদের মত মূল কক্ষের সঙ্গে পূর্বদিকে বারান্দা আছে। আয়তাকার এই মসজিদটি উত্তর দক্ষিণে ৫১’X ২৫.৫’ আয়তন কেন্দ্রীয় কক্ষ দ্বারা বিভক্ত। পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত কেন্দ্রীয় কক্ষটি হয়তো গৌড়ের গুণমন্ত মসজিদের মত টানা পিপাআকৃতি (Voult) অথবা পিরোজপুরের (উপনগর) ছোট সোনা মসজিদের মত চৌচালা আকৃতির চারটি গম্বুজে আবৃত ছিল। কেন্দ্রীয় কক্ষের প্রতিপার্শ্বের ছাদ ১২ টি করে ২৪ টি অর্দ্ধগোলাকার গম্বুজে আবৃত ছিল।
এই মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে জেনানা মঞ্চ ছিল। মসজিদটিতে পূর্বদিকে ৭ টি, দক্ষিণদিকে ৪টি, উত্তরদিকে ৩টি এবং জেনানা মঞ্চের জন্য ২টি মোট ১৬টি খিলান পথ (দরজা জানালার জন্য) দেখা যায়। এটির পশ্চিম দেওয়ালে (Qibla Wall) ভূমিস্তরে ৯টি এবং জেনানা মঞ্চে ২টি মোট ১১টি মেহরাব আছে। মসজিদটির চারকোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতি বুরুজ ছিল।
১৮৭৬ সনে মুন্সী এলাহী বক্স একটি লিপি ১১’-৩” X ২’-০১”) মসজিদের নিকটে প্রাপ্ত হন। বর্তমানে লিপিটি কলকাতা যাদুঘরে রক্ষিত আছে (নং-৩২৩৯)। লিপি মোতাবেক মসজিদটি ৮৮৪ হিঃ (১৪৭৯ খ্রীঃ) সনে সুলতান ইউসুফ শাহ কর্তৃক নির্মিত। ২০০৪-২০০৫ সনে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক উপনগরের প্রত্নবস্তু সংস্কারের সময় দরশবাড়ী মসজিদের সংস্কার হয় নি।
• দরশবাড়ী মাদ্রাসা :
দরশবাড়ী মসজিদের ১৫০ মিটার পূর্বদিকে দরশবাড়ী মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ প্রত্নখননে আবিষ্কৃত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ৫১.৬০ মিটার বর্গাকৃতি পরিকল্পনায় নির্মিত। এই স্থাপনার মাঝে ৩৭.৫ মিটার বর্গাকৃতি অঙ্গনে পশ্চিমবাহু ব্যতিরেকে অপর তিন বাহুতে এক সারি করে কক্ষ আছে এবং এই তিন বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে একটি করে প্রবেশ পথ দেখা যায়। পশ্চিমবাহুর মধ্যবর্তী স্থানে পাশাপাশি তিনটি নমাজ পাঠের জন্য মেহরাব যুক্ত কক্ষ আছে। মাদ্রাসাটির দেওয়াল শোভাবর্ধক পোড়া মাটির ফলক ও নক্সা করা ইট দ্বারা অলংকৃত। অঙ্গণ মধ্যে কয়েকটি কক্ষ কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।
গৌড়-রাজধানী পরিত্যক্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবার পর নগর ও উপনগর বিজনে পরিণত হয়। কিন্তু লোকমুখে কিংবদন্তীর ন্যায় ‘দরশবাড়ী’ নামটি জীবিত থাকে। দরশবাড়ী ‘দরশ’ (বিদ্যাপীঠ) শব্দ হতে উদ্ভূত, যা একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র (মাদ্রাসা) কে নির্দেশ করে। কিন্তু অজানা ছিল দরশবাড়ীর প্রকৃত অর্থ। দরশবাড়ীর অর্থ-ই যে বিদ্যাপীঠ বা মাদ্রাসা সেটি প্রমাণিত হয় গত শতাব্দীর সত্তর দশকে (১৯৭৪-৭৫) প্রত্নখননে মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হবার পর।
ইতঃপূর্বে আবিষ্কৃত এবং ইংলিশবাজার নিকটে একটি আধুনিক কালের মসজিদে রক্ষিত একটি প্রস্তর লিপিতে সুলতান হোসেন শাহ কর্তৃক ৯০৭ হিজরীর ১লা রমজান (১০-ই মার্চ ১৫০২) তারিখে শিক্ষা দেওয়ার জন্য একটি মাদ্রাসা নির্মাণের উল্লেখ আছে। ক্যানিংহাম (১৮৭৯-৮০) এই লিপিটি গৌড়ের বেলবাড়ীতে চাঁদ সওদাগরের ভিটাকে মাদ্রাসা মনে করে বেলবাড়ী মাদ্রাসার লিপি মনে করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক দরশবাড়ী মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হবার পর দরশবাড়ী মাদ্রাসার সঙ্গে বেলবাড়ীর অবস্থানগত বিভ্রান্তি দূরীভূত হয় এবং ইংলিশবাজারে রক্ষিত ৯০৭ হিজরীতে নির্মিত মাদ্রাসা সংক্রান্ত লিপিটি দরশবাড়ী মাদ্রাসার লিপি বলে প্রমাণিত হয়। (চিত্র নং-২৮)
• তহখানা ভবন :
কোতোয়ালী দরওয়াজা থেকে নবাবগঞ্জ রোড ধরে শিবগঞ্জ যাবার পথে সড়কের পশ্চিম দিকে পিরোজপুরে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত তালাবে দাফেউল বালার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ১১৬’ X ৩৮’ দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত ইস্টক নির্মিত মোগল রীতি সমৃদ্ধ দ্বিতল (অতীতে ত্রিতল ছিল) ভবন দেখা যায়। এই ভবনের নাম তহ খানা।
তহখানার অর্থ ভূগর্ভস্থ গৃহ (Subterranean room) ভবনটির নীচের তলা মাটির নীচে পার্শ্ববর্তী তালাবে দাফেউল বালার জলস্তরের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত অবস্থায় নির্মিত, সম্ভবত সেই কারণে ভবনটির নাম তহখানা হয়ে থাকবে। গ্রীষ্মকালে বা গরমে উষ্ণ আবহাওয়ার সময় এই ঠাণ্ডাভবনে বাস অত্যন্ত সুখকর। তাছাড়া এই ভবনের স্নানাগারে গরম জলের জন্য বিশাল উনান এবং পানীয় জলের জন্য ইন্দারার ব্যবস্থা আছে।
মোগল যুগে শাহ সুজা তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু শাহ নিয়ামতউল্লাহ-র সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অস্থায়ী বাসস্থান হিসাবে এই ভবন নির্মাণ করেন (১৬৩৯-১৬৬০)। ২০০৪-৫ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক এখানে সংস্কারের কাজ সংগঠিত হয়।
• শাহ নিয়ামতউল্লাহর মসজিদ :
তহখানার উত্তর-পশ্চিমে এবং তালাবে দাফেউল বালার পশ্চিমে তিনগম্বুজ বিশিষ্ট একটি আয়তাকার (৬৩.৫’X২৪.৫’) মোগল শৈলীতে নির্মিত একটি মসজিদ আছে। এর চারকোণে অষ্টভুজাকৃতি বুরুজ ছাদের উপর গোলাকার হয়ে ঊর্ধ্বে উত্থিত এবং কলস শীর্ষচূড়ায় সুশোভিত। কথিত হয় যে শাহ নিয়ামতউল্লাহ এই মসজিদ নির্মাণ করেন। ২০০৪-৫ সনে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক এর সংস্কার হয়।
• শাহ নিয়ামতউল্লাহর মাজার :
শাহ নিয়ামতউল্লাহর মসজিদের উত্তর দিকে এবং তালাবে দাফেউল বালার উত্তর-পশ্চিমে শাহ নিয়ামতউল্লাহ ৪৯’ বর্গাকার মাজার অবস্থিত। এক গন্বুজ বিশিষ্ট মাজারের মূল কক্ষ ২১’ বর্গাকার মূল কক্ষের চারদিকে বারান্দা আছে। খিলান যুক্ত এবং বারান্দার প্রতিদিকে তিনটি করে মোট বারোটি প্রবেশ পথ আছে। এই স্থাপনার চারকোণে চারটি মিনার ছাদ থেকে ঊর্ধ্বে উত্থিত এবং পদ্মপাপড়ির মাঝে ছোট গম্বুজে শোভিত। তোহাখানা চত্বরে প্রতিটি স্থাপনার মত এই স্থাপনাটির গাত্রদেশ চুন ও পোড়ামাটির প্রলেপে আবৃত।
এই ভবনের মূল কক্ষে শাহ সুজার আধ্যাত্মিক গুরু শাহ নিয়ামতউল্লাহ সমাধিস্থ আছেন। তিনি ১০৭৫ হিজরী (১৬৬৪ খ্রীঃ) মতান্তরে ১৮৮০ হিঃ (১৬৬৯ খ্রীঃ) তে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ শুক্রবার শাহ সাহেবের ‘ইসালে-সওয়াব’ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং এই উপলক্ষে মেলা বসে।
২০০৪-৫ সালে বাংলাদেশ সরকার এই মাজারের সংস্কার করে। (এই স্থানটির সংলগ্ন গৃহে কিছু লিপি সংরক্ষিত আছে। চিত্র নং-৪৪)
• ছোট সোনা মসজিদ :
কোতোয়ালী দরওয়াজা থেকে কিঞ্চিদধিক একমাইল দূরত্বে, নবাবগঞ্জ সড়কের পূর্বদিকে পিরোজপুরের সিঙ্গারহাট মৌজায় ছোট সোনা মসজিদ অবস্থিত। গৌড় নগরের বড় সোনা মসজিদের মত ইস্টক নির্মিত এই মসজিদটিরও গাত্রদেশ কৃষ্ণপ্রস্তরের মুখপাতে আচ্ছাদিত। মসজিদটির বহির্ভাগ ৮২’ X ৫২.৫’ এবং গৃহাভ্যন্তর ৭২’-৪” X ৪০’-৯” । অভ্যন্তরভাগে ৮টি প্রস্তর স্তম্ভের উপর বারোটি অর্ধগোলাকার এবং তিনটি পিরামিড আকৃতি মোট পনেরটি গম্বুজে এর শিরোদেশ আচ্ছাদিত। একদা গম্বুজগুলি সোনালী প্রলেপে আবৃত ছিল। এর উত্তর পশ্চিম কোণে মহিলা গ্যালারী আছে। মসজিদটিতে সর্বমোট ১২ টি খিলানপথ (Arched opening) দৃষ্ট হয়। নমাজপাঠের জন্য মোট ৬টি মিহরাব আছে। স্থাপনাটির চারকোণে চারটি বুরুজ আছে। সম্মুখভাগের দেওয়ালে মসজিদ নির্মাণের সংযুক্ত লিপি থেকে জানা যায় এটি সুলতান হোসেন শার রাজত্বকালে (৮৯৯-৯৩১ হিঃ/১৪৯৩-১৫২৫ খ্রীঃ) আলির পুত্র ওয়ালী মহম্মদ কর্তৃক রজবমাসের ১৪ তারিখে (সন ভেঙ্গে গেছে) নির্মিত।
২০০৪-২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সর্বশেষ সংস্কার কার্য সংগঠিত হয়। (চিত্র নং-২০ এবং ৪৮)

৪। পাণ্ডুয়া :
মালদহ জেলার ইংরেজবাজার শহর থেকে ১১ মাইল উত্তর-পশ্চিমে পাণ্ডুয়ার অবস্থান। হুগলী জেলাতে আর একটি পাণ্ডুয়া আছে। উভয় পাণ্ডুয়ার মধ্যে গোলমাল এড়ানোর জন্য জেনারেল কামিংহামের প্রস্তাবে মালদহের পাণ্ডুয়াকে হজরত শাহ জালালুদ্দিন তাব্রেজীর নামানুসারে ‘হজরত পাণ্ডুয়া’ বলা হয়। রাজা লক্ষ্মণ সেনের সময় তিনি (তাব্রেজী) ইসলাম ধর্ম প্রচারার্থে পাণ্ডুয়াতে আস্তানা স্থাপন করেন।
অতীতে পাণ্ডুয়া ছিল একটি হিন্দুনগরী। একদা এই নগরে শতশত দেবালয়, স্তূপ, চৈত্য ও বিহার বিরাজ করত। বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া ও গৌড় নগরী বিজয়ের পরে বিজেতারা সমস্তই ভেঙ্গে ফেলেন। গৌড়-পাণ্ডুয়ার মুসলিম যুগের স্থাপনার সঙ্গে অতীত যুগের চিহ্নমালা নীরবে সেই যুগের কীর্তি ঘোষণা করে।
বঙ্গ সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ তাঁর রাজ্যের রাজধানী লক্ষ্মৌতী (গৌড়নগর) থেকে পাণ্ডুয়া তে স্থাপন করেন (৭০০ হিঃ/১৩০০ খ্রীঃ)। পাণ্ডুয়া ‘ফিরোজাবাদ’ নামে পরিচিত লাভ করে। সর্বমোট শতবর্ষাধিক কাল পাণ্ডুয়া বা ফিরোজাবাদ রাজ্যের রাজধানী ছিল।
পাণ্ডুয়ার বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক নিদর্শন :
• বড় দরগাহ বা শাহজালালের দরগাহ :
এখানে হজরত শাহ জালালুদ্দীন তাব্রেজীর চিল্লাখানা, জামে মসজিদ, তন্দুরখানা, ভাণ্ডারখানা প্রভৃতি তাব্রেজীর স্মৃতির প্রতি উৎসর্গীকৃত স্থাপনা আছে। পাণ্ডুয়ার মূল দরগাহটি লক্ষ্মৌতী শাসন বিভাগের শাসক সুলতান আলাউদ্দীন আলী শাহ ৭৪৩ হিঃ (১৩৪২ খ্রীঃ) সনে নির্মাণ করেন। তাছাড়া এখানে ছোট দিঘির পাশে রয়েছে লক্ষ্মণসেনী দালান।
কথিত হয় যে মখদুম জাহানিয়া জাহান গাস্ত নামে একজন আওলিয়া কর্তৃক আরব দেশ থেকে আনীত নবীর চরণ চিহ্নটি তাব্রেজীর চিল্লাখানাতে রক্ষিত ছিল। সুলতান হোসেন শাহ কর্তৃক এই পবিত্র চরণ চিহ্নটি গৌড়ে নীত হয়।
• ছোট দরগাহ :
শাহ জালালুদ্দীন তাব্রেজীর চিল্লাখানার (বড় দরগাহ) প্রায় অর্দ্ধমাইল দূরত্বে ছোট দরগাহর অবস্থান। এখানে দরবেশ নূর কুতবুল আলমের ও তাঁর পিতা আতাউলের সমাধি আছে। নূর কুতবুল আলম রাজা গণেশের সমসাময়িক দরবেশ। এখানে দরবেশের চিল্লাখানা আছে।
• কুতুবশাহী মসজিদ (সোনা মসজিদ) :
নূর কুতবুল আলমের দরগাহ এবং একলাখী ভবনের মধ্যবর্তী স্থানে কুতুবশাহী মসজিদ অবস্থিত। আয়তাকার (৮২’-৬”X৩৭’-৮”) এই মসজিদটির অভ্যন্তরে চারটি প্রস্তর স্তম্ভ আছে, কিন্তু শিরোদেশ আবৃত করার দশটি অর্দ্ধগোলাকার গন্বুজ ভূপাতিত হয়েছে। ইস্টক নির্মিত এই স্থাপনার গাত্রদেশ প্রস্তরের মুখপাতে আচ্ছাদিত। পশ্চিম দেওয়ালে মেহরাবের সঙ্গে আদিনা মসজিদের মত সুদৃশ্য একটি মিমবার আছে। বহির্দেশে চারকোণে চারটি বুরুজ স্থাপনাটিকে সুদৃঢ় করেছে। একদা এই মসজিদটিও পিরোজপুরের ছোট সোনা মসজিদ ও গৌড়-রামকেলির বড় সোনা মসজিদের মত স্বর্ণালী প্রলেপে আবৃত ছিল। সেই কারণে এটিকেও সোনা মসজিদ বলা হয়।
মসজিদটির সম্মুখভাগে পাঁচটি খিলানপথের মধ্যবর্তী খিলানের উপরে দেওয়াল গাত্রে সংযুক্ত লিপি অনুসারে জানা যায় যে দরবেশ নূর কুতবুল আলমের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসাবে তৎবংশোৎপন্ন মহম্মদ আল খালেদির পুত্র মখদুম সেখ ৯৯০ হিজরী (১৫৮২ খ্রীঃ) সনে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তখন মোগল যুগ হলেও এই মসজিদ প্রাক-মোগল শিল্পরীতিতে নির্মিত।
• একলাখী ভবন :
কুতবশাহী মসজিদের পূর্বদিকে সামান্য দূরে এক গম্বুজ বিশিষ্ট ইস্টক নির্মিত এবং টেরাকোটার অলংকরণে সমৃদ্ধ একলাখী ভবন অবস্থিত। ভবনটি প্রাক মোগল শৈলীতে নির্মিত। এর চারকোণে চারটি বুরুজ আছে। স্থাপনাটির আয়তন ৭৮.৫ফুট X ৭৪.৫ ফুট, এবং অষ্টভুজাকৃতি গৃহাভ্যন্তর ভাগ ৪৮.৫ ফুট ব্যাস যুক্ত। এর প্রতিদিকে একটি করে চারটি দরজা এবং প্রতিকোণে একটি করে চারটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ আছে। ভবনটির দেওয়াল ১৩ ফুট চওড়া। এই ভবনের সঙ্গে গৌড় নগরের ধ্বংসাবশিষ্ট বর্গাকার চিকা ভবনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
একলাখী ভবনে রাজা গণেশের পুত্র জালালুদ্দীন, জালালুদ্দীনের স্ত্রী ও পুত্র সামসুদ্দীন আহমদ শাহ সমাধিস্থ আছেন।
ভবনটির গাত্রে নির্মাণ বিষয়ক কোন লিপি নেই। সম্ভবতঃ রাজা গণেশ এর নির্মাতা এবং এটির নির্মাণের ব্যয় একলক্ষ টাকা হওয়ার জন্য ভবনটি একলাখী ভবন নামে খ্যাত। (চিত্র নং-৭)
• আদিনা মসজিদ :
একলাখী ভবন থেকে প্রায় দুই মাইল দূরত্বে আদিনাতে বর্তমান N.H.34 সড়কের পশ্চিমে সুলতান সিকান্দার শাহ কর্তৃক নির্মিত বিস্তৃত আদিনা মসজিদ একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যকলার বৃহত্তম নিদর্শন। কোন বৌদ্ধস্তূপের ধ্বংসাবশেষের উপর হিন্দু মন্দিরের উপকরণে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছে। এই প্রকাণ্ড চতুষ্কোণ মসজিদের দৈর্ঘ্য ৫০৭.৫ ফুট এবং প্রস্থ ২৮৫.৫ ফুট। এই জামে মসজিদে একটি বৃহৎ উন্মুক্ত প্রার্থনাস্থলের চতুর্দিকে খিলান সমৃদ্ধ গম্বুজাকৃতি প্রদক্ষিণ পথ, প্রার্থনার জন্য সুন্দর খোদাই করা মেহরাব, কালো ব্যাসাল্ট পাথরের অপূর্ব মিমবার এবং বাদশাহ-কা-তখত নামে একটি প্রশস্ত উচ্চ-রাজাসন আছে (চিত্র নং-৮)। এই মসজিদের পশ্চিম দেওয়ালের বহির্ভাগে সংলগ্ন কক্ষে সুলতান সিকান্দার শাহ সমাধিস্থ আছেন। এই জামে মসজিদের নির্মাণ বিষয়ক একটি লিপি মসজিদের পশ্চিম দেওয়ালের বহির্দেশে সংযুক্ত আছে, সেই লিপিমূলে জানা যায় যে সুলতান ইলিয়াস শাহর পুত্র সুলতান সিকেন্দার শাহ ৬-ই রজব ৭৭০ হিজরী (১৪/২/১৩৬৯) তারিখে এই জামে মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন।
• রাজ প্রাসাদ :
আদিনা মসজিদ থেকে প্রায় এক মাইল দক্ষিণ-পূর্বে আলঘেরা স্থানে ছিল রাজপ্রাসাদ এলাকা। কথিত হয় যে এটি ছিল সুলতান সেকেন্দার শাহর রাজপ্রাসাদ। ধানুস দীঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে মিনারটি প্রাসাদের পশ্চিম ফটকের দুটি মিনারের একটি হতে পারে। বর্তমানে সাতাশঘরায় স্নানাগারের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। প্রাসাদ সংলগ্ন কিছু পুষ্করিণী অতীত যুগের সাক্ষ্য প্রদান করে।
প্রাসাদ এলাকার কিছু অংশে আদিনা ডিয়ার পার্ক এবং পিকনিক স্পট তৈরী হয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীগণ আনন্দ উপভোগ করেন।
৫। তাণ্ডা (TANDA) (বাংলার স্বল্পকালীন রাজধানী) :
গৌড় নগরীর পশ্চিম-দিকে ভাগীরথী নদীর পশ্চিমপাড়ে স্বল্পকালীন বাংলার রাজধানী টাঁড়া (TANDA)র অবস্থান। টাঁড়া গঙ্গার নিকটবর্তী (১ লিগ দূরে) ছিল। সেন পরবর্তী যুগে ভাগীরথীর খাতে গঙ্গা প্রবাহিত হয়। পরবর্ত্তী কালে গঙ্গা তার গতিপথ বারবার পরিবর্তন করেছে।
রেনেলের (Rennel) মানচিত্রে মদ্দপুরের (অর্থাৎ মহদীপুর) ১ মাইল উত্তর-পশ্চিমে এবং ভাগীরথীর বিপরীত কূলস্থিত গৌড়-দুর্গ থেকে উক্ত দূরত্বের কিছু বেশী দক্ষিণ-পশ্চিমে ‘তররাহ’ (Tarrah) অবস্থান চিহ্নিত আছে। রেনেল ‘তাণ্ডা’কে ‘তররাহ’ বলেছেন। বুকানস হ্যামিল্টন ‘তাণ্ডা’কে ‘তাংগ্রা’(Tangra) বলেছেন। অতীতের পরিত্যক্ত রাজধানী তান্ডা বা টাঁড়া বর্তমানে জালুয়াবাধাল নামে পরিচিত। অযোধ্যার ফয়জাবাদ জেলায় ‘তাণ্ডা’ নামক তহশীল আছে। উভয়ের পার্থক্য বিধানের জন্য মালদহের তান্ডাকে ‘খাওয়াসপুর তান্ডা’ বলা হয়। গৌড় নগরীর মত সমৃদ্ধশালী না হয়েও টাণ্ডা তৎকালীন মোগল সুবাদারদের প্রিয়বাসভূমি ছিল। সিহাতপুরে (সৈয়দপুর) ছিল স্বাস্থ্য নিবাস।
হজরত আলা মিঞা সোলায়মান খান কররাণী ৯৭২ হিঃ (১৫৬৫ খ্রীঃ) সনে বিহারের সঙ্গে বাংলার শাসক হয়ে শাসন কার্যের সুবিধার জন্য স্বীয় রাজ্যের রাজধানী গৌড় থেকে গঙ্গার অপর পাড়ে টাঁড়াতে স্থাপন করেন। তখন দিল্লীর সম্রাট ছিলেন জালালুদ্দীন আকবর। পরবর্তীকালে সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলার গভর্ণর নিযুক্ত হয়ে রাজা মান সিংহ রাজ্যের রাজধানী রাজমহলে স্থাপন করেন (১৫৯৫ খ্রীঃ)। প্রায় ৩০ বৎসর টাঁড়া বাংলার রাজধানী ছিল। তাছাড়া পরবর্তীকালে ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি মীরজুমলা দ্বারা বিতাড়িত বিদ্রোহী শাহ সুজা রাজমহল থেকে টাঁড়া ও গৌড়ে আসেন। তখন টাঁড়া ও গৌড়ের সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু ১৬৬০ খ্রীস্টাব্দে মীরজুমলা কর্তৃক পর্যুদস্ত হয়ে শাহ সুজা প্রথমে ঢাকা ও পরে আরাকানে চলে যান। অতঃপর টাঁড়া ও গৌড় বিজনে পরিণত হয়।
টাঁড়ায় (তাণ্ডা)র (উচ্চভূখণ্ডে) দাঁড়িয়ে মনে হয়, অতীতযুগের রাজধানী টাঁড়া গঙ্গাগ্রাসে বিধ্বস্ত হয়নি, বন্যা তাকে বিধ্বস্ত করেছে। বস্তুতঃ ১৯২৬ খ্রীস্টাব্দের ভয়ানক বন্যার কবলে টাঁড়া বিনষ্ট হয়। টাঁড়ার (জালুয়াবাধাল) উচ্চ ভূখণ্ড থেকে এর পার্শ্ব দিয়ে একদা প্রবাহিত গঙ্গানদীর পরিত্যক্ত নদীখাতগুলি পরিষ্কার বুঝা যায়। পরিত্যক্ত নদীখাতগুলি বিল ও জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।
৬। রাজমহল :
মালদহের অপর পাড়ে ঝাড়খণ্ড সীমার মধ্যে রাজমহল অবস্থিত। রাজমহল পাহাড় একটি স্বতন্ত্র পাহাড়। এই পাহাড় বিন্ধ্যগিরির অংশবিশেষ নয়। এটি পাহাড়িয়া নামধেয় আদিম জনজাতির বাসভূমি। উত্তরকালে সাঁওতালগণও এখানে বসতি করে। মোগল যুগে রাজমহলে বাংলার রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালে বাংলার বিস্তৃতি বর্তমান অপেক্ষা বেশি ছিল।
রাজমহলের পূর্বনাম আকমহল বা আগমহল। কথিত হয় যে—একদা বাংলার শাসকেরা বিহার যাবার পথে আগমহলে (অর্থাৎ সম্মুখবর্তী স্থানে) বিশ্রাম নিতেন। তাই এ স্থান আগমহল। আবার তুর্কী শব্দ ‘আকমহল’ অর্থে সাদা দালান। শেরশাহর সময় থেকে স্থানটির গুরুত্ব বৃদ্ধি হয়।
মোগলযুগে অম্বরপতি ভগবান দাসের মৃত্যুর পর মান সিংহ সম্রাট আকবর কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধি প্রাপ্ত হন, এবং পরবর্তীকালে বাংলার গভর্ণর হন। তৎকালে তাণ্ডা ছিল বাংলার রাজধানী। রাজা মান সিংহ রাজ্যের রাজধানী তাণ্ডা থেকে আগমহলে স্থানান্তরিত করেন (৭-ই নভেম্বর ১৫৯৫)। তদবধি ‘রাজা’ উপাধি দৃষ্টে ‘আগমহল’ ‘রাজমহল’ নামে খ্যাত হয়। রাজা মান সিং রাজমহলের নাম ‘আকবরনগর’ রাখেন।
রাজমহলের বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক নিদর্শন :
• সিংহী দালান :
রাজমহলের রাজপ্রাসাদের অংশবিশেষ ‘সিংহী দালান’ নামক প্রাচীন স্থাপনাটি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত একটি আয়তাকার রাজগৃহ। সিংহীদালানের উত্তর দিকে পূর্ব-পশ্চিমে প্রবাহিত গঙ্গা নদী। নদীমধ্যে ভূতনী-চর দেখা যায়।
সিংহী দালানের মোট পাঁটটি কক্ষ আছে। মধ্যবর্তী কক্ষের প্রবেশ পথের কষ্টিপাথরের খিলান ও স্তম্ভের কারুকার্য এই স্থাপনাটির মূল আকর্ষণ। স্থাপনাটির ছাদ মোগল-রীতি সম্পন্ন। এর প্রান্তিক কক্ষ দুটিতে কড়ি-বরগা ব্যবহৃত হয়েছে। (চিত্র নং-৯)
• আকবরশাহী মসজিদ :
সিংহী দালানের পশ্চিমদিকে তিনগম্বুজ বিশিষ্ট একটি আয়তাকার মসজিদ আছে। এর সম্মুখে একটি বারান্দা আছে। মূল কক্ষের সম্মুখে তিনটি প্রবেশপথ এবং পশ্চিম দেওয়ালে তিনটি মেহরাব আছে। মসজিদটির সম্মুখে প্রাচীর বেষ্টিত প্রাঙ্গণ আছে। সম্প্রতি মসজিদটির আমূল সংস্কার হয়।
• জামে মসজিদ :
রাজমহলের হাডাফ নামক উচ্চ ভূখণ্ডে ইস্টক-প্রস্তরে নির্মিত এক বৃহৎ জামে মসজিদ অবস্থিত। এটি সম্রাট আকবরের নিযুক্ত বাংলার গভর্ণর রাজা মান সিংহের শাসনকালে নির্মিত।
মসজিদটির কেন্দ্রীয় কক্ষে গৌড়ের গুণমন্ত মসজিদের মত টানা ভল্ট এবং প্রতিপার্শ্বে ৬টি করে ১২টি অর্দ্ধগোলাকার গম্বুজে শিরোদেশ আবৃত ছিল।
মসজিদটির সম্মুখভাগে ৯টি প্রবেশ পথ আছে, যার মধ্যে ৫টি বড় খিলান পথ এবং প্রতিপার্শ্বে একটি করে ছোট খিলান পথ ও একটি করে চৌকো দরজা আছে। প্রান্তিক চৌকো দরজা দুটি দিয়ে সোপান সমৃদ্ধ পথে ছাদে ওঠার ব্যবস্থা আছে।
মসজিদটিতে প্রার্থনার জন্য ১৭টি মেহরাব আছে। এর চারকোণে চারটি অষ্টকোণী বুরুজ স্থাপনাটির ঊর্ধ্বে উত্থিত এবং গম্বুজাকারে শোভিত।
মসজিদটির প্রশস্ত প্রাঙ্গণ-প্রাচীরে পূর্ব-উত্তর-দক্ষিণে একটি করে প্রবেশপথ আছে। প্রাঙ্গণ-প্রাচীরের অন্দর ভাগে কুলঙ্গি এবং সম্মুখস্থ পূর্ব দিকের প্রাচীরের বহির্ভাগে বারান্দা আছে। একদা মসজিদটি ভগ্নদশাপ্রাপ্ত হয়, বর্তমানে সংস্কারের কাজ চলছে। (চিত্র নং-১০)
• বারোদুয়ারী (নাগেশ্বর বাগ) :
রাজমহলের জামে মসজিদের নিকটে গঙ্গার ধারে বারোদুয়ারীর অবস্থান। এই স্থাপনাটির নির্মাতা বিষয়ে মতভেদ আছে। কোন কোন বিশেষজ্ঞ বলেন এটি ফতেজং খান নির্মাণ করেন, অপর পক্ষের মতে এটি বাংলার নবাব মীরকাশিমের নির্মাণ। এখানে রংমহল নামে একটি গ্যালারী ছিল বলা হয়, যদিও বর্তমানে তার চিহ্ন দেখা যায় না। ধ্বংসপ্রাপ্ত এই স্থাপনাটির সংস্কারের কাজ চলছে। (চিত্র নং-১১)
• কানাইর নাটশালা :
রাজমহলের জামে মসজিদ থেকে বেশ কিছু দূরে গঙ্গার তীরে কানাইর নাটশালা অবস্থিত। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ তথা হিন্দুবর্গের কাছে কানাইর নাটশালা অতি পবিত্র স্থান।
শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের মধ্য লীলায় ষোড়শ পরিচ্ছেদে যুগাবতার শ্রীচৈতন্যদেবের কানাইর নাটশালাতে পদার্পণের উল্লেখ আছে। তখন বাংলাতে আলাউদ্দীন হোসেন শাহর রাজত্বকাল। বর্তমানে এই পুণ্যস্থানে ইসকনের ভক্তবৃন্দ কর্তৃক পূজাপাঠাদি সংঘঠিত হয়ে থাকে।
৭। দেবকোট :
দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর থানায় পুনর্ভবা নদীর তীরে দেবকোট অবস্থিত। প্রাচীনকালে দেবকোট অঞ্চলটি বাণগড়, কোটিবর্ষ, উমাবন, ঊষাবন, শোণিতপুর ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিল। গুপ্তযুগে দেবকোটের নাম ছিল কোটিবর্ষ। কোটিবর্ষ গৌড়-রাজ্যের পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির একটি বিষয়। প্রাচীনকাল থেকে বঙ্গে মুসলিম অধিকারের প্রথম দিক পর্যন্ত এদেশের অন্যতম প্রধান নগর হিসাবে দেবকোট প্রতিষ্ঠিত ছিল। দেবকোট মহাবিহারে বাঙ্গালী বৌদ্ধ পণ্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর বিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন।
মহাভারতের যুগে দৈত্যরাজ বালির পুত্র বাণের রাজধানী ছিল বাণগড়। বাণরাজার কন্যা ঊষারানী এবং শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র অনিরুদ্ধের প্রেমের কাহিনী ও কিংবদন্তী ছড়িয়ে আছে বাণগড়ে। তাদের স্মৃতি বিজরিত স্থানগুলি দর্শন যোগ্য। বাণগড়ে চারিটি প্রস্তর স্তম্ভ যুক্ত ‘ছাওয়া মণ্ডপ আছে। কথিত হয় এটি ঊষা ও অনিরুদ্ধর বিবাহের জন্য নির্মিত হয়েছিল। বাণকন্যা ঊষা রাজপ্রাসাদ থেকে রাজকীয় ভাবে স্নানের জন্য সুড়ঙ্গ পথে ধলদীঘিতে যেতেন। সেই ধলদীঘি এখনো আছে, সেই সুড়ঙ্গপথের বন্ধ করা মুখটি এখনো দেখা যায়।
উত্তরবঙ্গে স্বল্পকাল স্থায়ী কম্বোজ বংশীয় দশম শতাব্দীর গৌড়পতি কুঞ্জরঘাটা বর্ষের শিলাস্তম্ভ বাণগড়ে আবিস্কৃত হয়। পাল বংশের ১১তম রাজা প্রথম মহীপালের নবম রাজ্যবর্ষে প্রদত্ত পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্ত্যন্তঃপাতী কোটিবর্ষ বিষয়ে গোকলিকা মণ্ডলে কুরুটপল্লীকা গ্রাম দান বিষয়ক তাম্রশাসনটি বাণগড়ে প্রাপ্ত হওয়া গেছে। বাণগড়ের শিববাটীতে ১২তম পালরাজা নয়পাল দেবের রাজত্বকালে প্রদত্ত তাম্রশাসন পাওয়া গেছে। তাম্রশাসনটি মূর্তিশিবের প্রশস্তি। ১৯তম পালরাজা মদনপালের ৮ ম রাজ্যবর্ষে প্রদত্ত মানহলিতে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্ত্যন্তঃপাতী কোটিবর্ষ বিষয়ে হলাবর্ত মণ্ডলে কোষ্টগিরি গ্রাম দানের উল্লেখ আছে। দেবকোটের রাজীবপুরে মদনপাল দেবের ২য় রাজ্যবর্ষ (১১৪৫ খ্রীঃ) এবং ২২তম রাজ্যবর্ষের (১১৬৫ খ্রীঃ) তাম্রশাসন পাওয়া গেছে। এই তাম্রশাসনে পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির অন্তর্গত কোটিবর্ষ বিষয়ের হলাবর্তমণ্ডলে ঋগ্বেদের আশ্বলায়নশাখ্যাধ্যায়ী ব্রাহ্মণকে ভূমি দানের উল্লেখ আছে। তাছাড়া অত্র অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে নানা প্রত্নবস্তু, এগুলি বাণগড়ের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে। বাণগড়ে প্রত্নতাত্বিক খননস্থলে ১৯৩৪ সাল থেকে খনন কার্য চলছে। এই প্রত্নস্থলে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন ও ইসলামকাল পর্যন্ত পাঁচটি অধিবসতির স্তর শনাক্ত করা হয়েছে। উদ্ঘাটিত নিদর্শনাদির মধ্যে পালযুগের স্তম্ভবিশিষ্ট চন্দ্রাতপ দ্বারা আচ্ছাদিত একটি অপরিসর পদ্মাকৃতি কুণ্ড বিশেষ আকর্ষণীয়। গৃহসারির মধ্যে একটি শষ্যাগারও দর্শনযোগ্য।
সেন রাজা বিজয় সেন গৌড়েন্দ্র (মদনপাল)কে বরেন্দ্র থেকে মগধে নির্বাসনে (দেওপাড়া প্রশস্তি, ২০নং শ্লোক) পাঠালেও ১১৬৫ সালের পরে বাণগড় বিজয়পুত্র বল্লাল সেনের অধিকারে আসে। বল্লালপুত্র লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বকালে বখতিয়ার খিলজী নওদিয়াহ ও পরে লক্ষ্মৌতী বিজয় করে বঙ্গে মুসলিম যুগের সূচনা করেন। তিনি প্রথমে লক্ষ্মৌতী ও পরে দেবকোটে স্বীয় রাজ্যের রাজধানী করেন। দেবকোটে দমদমার চিহ্ন আজও বর্তমান। দমদমা অর্থে দুর্গ বা সেনা নিবাস। কথিত হয় এটি বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। এখান থেকে বখতিয়ার তিব্বত অভিযানে চরম ব্যর্থ ও পর্যুদস্ত হয়ে দেবকোটে প্রত্যাবর্তনের পরে আলিমর্দান কর্তৃক নিহত হন (১২০৬)। পীরপলে তিনি সমাধিস্থ আছেন। পরবর্তী কালের শাসক গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খিলজী তাঁর দ্বিতীয়বারের শাসন কালে (৬১০-৬২৪ হিঃ/১২১৩-১২২৭ খ্রীঃ) তাঁর রাজ্যের রাজধানী দেবকোট থেকে গৌড়ে স্থানান্তরিত করেন। দেবকোটে স্বল্পকাল মুসলিম শাসকদের রাজধানী ছিল। দেবকোট থেকে রাজধানী অপসারিত হলেও দেবকোটের গুরুত্ব তখনও ছিল।
মুসলিমযুগের রাজধানী গৌড়-পাণ্ডুয়াকে রক্ষা করার জন্য দেবকোটে ছিল অগ্রবর্তী সৈন্যদলের সেনা ছাউনি। এই সব সেনা ছাউনি থেকে সন্নিহিত লোকালয়ের শান্তি-শৃংখলা রক্ষিত হত। কথিত হয় যে দেবকোটে সুলতান হোসেন শাহর শক্তিশালী সেনা নিবাস ছিল।
গৌড়-পাণ্ডুয়াতে রাজধানী থাকাকালীন দেবকোটেও নির্মাণকার্য সম্পাদিত হয়েছিল। (১) সুলতান কায়কাউসের রাজত্বকালে ১লা মহরম ৬৯৭ হিঃ (১৯শে অক্টোবর ১২৯৭) এ উৎকীর্ণ একটি মসজিদ নির্মাণের লিপি। (২) সুলতান সিকান্দার শাহর রাজত্বকালে ৭৬৫ হিঃ (১৩৬৩ খ্রীঃ) সনে মৌলানা আতার দরগাহে একটি মসজিদ নির্মাণের লিপি এবং (৩) শামসুদ্দীন মুজফফর শাহর রাজত্বকালে ৮৯৬ হিঃ (১৪৯০-৯১) সনে একটি মসজিদ সংস্কারের লিপি গঙ্গারামপুরে আবিষ্কৃত হয়েছে।
৮। সুবর্ণগ্রাম (সোনার গাঁ) :
ঢাকা শহরের (জাহাঙ্গীর নগর) ২৫ কি. মি. দক্ষিণপূর্বে সুবর্ণগ্রাম অবস্থিত। সুবর্ণগ্রাম নদীবেষ্টিত ত্রিকোণ দ্বীপের মত। এর উত্তর-পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র-শীতলাক্ষ্যা, পূর্বদিকে মেঘনা, আর দক্ষিণে ধলেশ্বরী এবং শীতলাক্ষ্যার মিলিত স্রোত। শীতলাক্ষ্যা এবং মেঘনার মধ্যে সংযোগরক্ষাকারী খাল সুবর্ণগ্রামের দক্ষিণাংশে প্রবাহিত। সুবর্ণগ্রামের বর্তমান পরিচয় একটি থানা হিসাবে। এটি নদী তীরবর্তী একটি বিপণন কেন্দ্র। সুবর্ণগ্রাম বা সোনার গাঁ নাম মুসলমান প্রদত্ত নয়। ভারতবর্ষে মুসলমানদের প্রবেশের পূর্বে-ই সুবর্ণগ্রাম স্বনামে সর্বত্র পরিচিত ছিল।
সুবর্ণগ্রামের পত্তন হিন্দু আমলে হলেও এখানে অতীতের চিহ্ন বর্তমানে প্রায় নেই। তবে মুসলমান যুগের স্থাপনায় হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের চিহ্নমালা নীরবে অতীত-কীর্তি ঘোষণা করে। অতীতে সুবর্ণগ্রামকে কেন্দ্র করে চন্দ্রবংশ ও বর্ম বংশ রাজত্ব করেন।
খ্রীস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বকালে ইখতিয়ারউদ্দীন বখতিয়ার খিলজী নদীয়া ও লক্ষ্মণাবতী বিজয় করে বঙ্গে মুসলিম যুগের সূচনা করলেও লক্ষ্মণ সেন ও তাঁর বংশধরগণ বিক্রমপুরকে কেন্দ্র করে শাসন ক্ষমতাতে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। সেন বংশের পরে বিক্রমপুরে দেববংশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিল। মুসলমান ইতিহাসে বিক্রমপুরের অরিরাজ দনুজ-মাধব-দশরথদেব সুবর্ণগ্রামের রাজা দনুজরায় নামে অভিহিত হয়েছেন। আদাবাড়ীতে তাঁর, পাকামোড়াতে তাঁর মহিষী কন্দর্পদেবীর এবং মেহার, শোভারামপুর ও চট্টগ্রামে তাঁর পিতা অরিরাজচাণুরমাধব দামোদর দেবের প্রদত্ত তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে। তাঁর রাজত্বকালে তাঁর রাজ্যের রাজধানী বিক্রমপুর থেকে সুবর্ণগ্রামে স্থানান্তরিত হয়। প্রাক মোগল যুগে পূর্ববাংলার রাজধানী ছিল সুবর্ণগ্রাম।
লক্ষ্মৌতীর গভর্ণর আমীন খানের সহকারী রূপে দিল্লীর সুলতান প্রেরিত তুঘরল খান আমীন খাঁকে বহিষ্কার করে ৬৭৮ হিঃ (১২৭৯ খ্রীঃ) সনে লক্ষ্মৌতী টাঁকশাল থেকে মুদ্রিত মুদ্রায় রাজউপাধি ধারণপূর্বক স্বধীনতা ঘোষণা করলে ১২৮০ খ্রীঃ নাগাদ দিল্লীর সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন তুঘরলকে দমন করার জন্য সুবর্ণগ্রামের হিন্দুরাজা দনুজরায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও সন্ধি করে তুঘরলকে কয়েদ করেন (১২৮২)।
দনুজরায়ের পরেও তাঁর উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় বল্লাল (পোড়ারাজা) সুবর্ণগ্রামের স্বাধীন রাজা ছিলেন। দ্বিতীয় বল্লালই সুবর্ণগ্রামের শেষ হিন্দুরাজা। পাল যুগের গোপালদেবের মত তিনিও শত্রুসেনার বিরুদ্ধে জয়লাভ করে দুর্ভাগ্য বশতঃ মৃত্যুবরণ করেন।
সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজশাহ (৭০০-৭২২ হিঃ/১৩০০-১৩২২খ্রীঃ) কর্তৃক লক্ষ্মৌতী টাঁকশালের সঙ্গে সোনার গাঁ টাঁকশাল থেকে মুদ্রা প্রচারের পর সুবর্ণগ্রাম ইতিহাসের আলোকে আসে। দিল্লীতে তোগলক বংশের অভ্যুদয়ে বাংলা তিনটি (লক্ষ্মৌতী, সপ্তগ্রাম ও সুবর্ণগ্রাম) শাসন বিভাগে বিভক্ত হয় (৭২৪ হিঃ/১৩২৪ খ্রীঃ)। সুবর্ণগ্রাম শাসন বিভাগে বাহরম খাঁ (গভর্ণর), গিয়াসুদ্দীন বাহাদুর শাহ (যুগ্মগভর্ণর ও সুলতান), ফকরুদ্দীন আলী মহম্মদ (সুলতান) এবং ইখতিয়ারউদ্দীন গাজী শাহ (সুলতান) রাজত্ব করেন। ৭৫৩ হিজরী (১৩৫২খ্রীঃ) সনে সুলতান শ্যামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ লক্ষ্মৌতী ও সপ্তগ্রামের পর সুবর্ণগ্রাম অধিকার করে শাহ-ই-বাংলা বা Rules of Bengal হন। ইলিয়াস শাহ পাণ্ডুয়া রাজধানী থেকে রাজ্য পরিচালনা করেন। পরবর্তীকালে সুলতান ইলিয়াস শাহর পৌত্র গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ তাঁর পিতা সুলতান সিকান্দার শাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সুবর্ণগ্রামে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ৭৯০ হিজরী সনে মুদ্রা প্রকাশ করেন। গোয়ালপাড়ার প্রান্তরে পিতা-পুত্রের যুদ্ধে সিকান্দার শাহ শহীদ হলে আজম শাহ পাণ্ডুয়ার রাজসিংহাসনে আসীন হন (৭৯২ হিঃ/১৩৮৯খ্রীঃ)। সুলতান আজম শাহ সুবর্ণগ্রামে সমাধিস্থ আছেন। মোগল যুগে ঈশা খাঁ এবং মুশা খাঁর রাজধানী শহর ছিল সুবর্ণগ্রাম। (আকবরের সমসাময়িক কাল)।।
রাজমহলের যুদ্ধে (১২ জুলাই ১৫৭৬/৯৮৪ হিঃ) আফগান নেতা দাউদ খান কররাণীর মৃত্যু হলেও সম্পূর্ণ বাংলা মোগলদের কাছে অধরা থাকে। মোগল শক্তি শুধুমাত্র পশ্চিম-উত্তর বাংলার কিছু অংশে সীমিত থাকে। মোগলদের বিরুদ্ধে বাংলার ভূঁইঞাদের প্রতিরোধ কাহিনী আকবরের সময় পার হয়ে জাহাঙ্গীরের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের গভর্ণর ইসলাম খাঁ চিস্তির শাসনকালে (১৬০৭-১৬১৩ খ্রীঃ) রাজমহল থেকে ঢাকা (জাহাঙ্গীর নগর) রাজধানী স্থানান্তরিত হবার পর ধীরে ধীরে সুবর্ণগ্রামের সুবর্ণযুগের অবসান হতে থাকে। অবশ্য নদীর গতি পরিবর্তন এর অন্যতম একটি কারণ। বাংলার মুসলিম যুগে সুবর্ণগ্রামে টাঁকশাল ছিল। ব্রিটিশ যুগে সুবর্ণগ্রাম বন্যজন্তুর বাসস্থান হয়। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে বসতি স্থাপিত হয় এবং উপনিবেশিক সভ্যতার আলোকে গড়ে উঠে পানামনগরী।
সুবর্ণগ্রামের কতিপয় লিপি ও নির্মাণকার্য :
• মোয়াজ্জামাবাদের লিপি :
এই লিপিটি শাহ লঙ্গরের দরগাহে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের গায়ে খণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া যায়। মসজিদ নির্মাতা ফিরোজ খান। নির্মাণের তারিখ নেই। রাজার নাম আহমদ শাহ, কিন্তু রাজার রাজউপাধি নেই। যে হেতু বাংলার সুলতানগণের মধ্যে আহমদ শাহ নামে অন্য কোন সুলতান নেই , সে হেতু এটি গণেশের পৌত্র এবং যদুর পুত্র শামসুদ্দীন আহমদ শাহর রাজত্বকালের (১৪৩৩—১৪৩৫/৩৬ খ্রীঃ) মধ্যে উৎকীর্ণ হয়ে থাকবে। সুলতানী আমলে মোয়াজ্জমাবাদে টাঁকশাল ছিল।
• বাবা সালেহর মসজিদ :
কদম রসুলের এক মাইল দক্ষিণে শীতলাক্ষ্যা নদীর বামতীরে সুলতানী ও মোগল যুগের বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে প্রসিদ্ধ বন্দর নামক স্থানে একটি মসজিদে জালালুদ্দীন ফতে সাহর রাজত্বকালের একটি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। তদনুসারে ১লা জেলকদ ৮৮৬ হিজরী (২রা জানুয়ারী ১৪৮২) বাবা সালেহ কর্তৃক মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।
এই মসজিদের অর্দ্ধমাইল দক্ষিণে বাবা সালেহ ১৫০৪ খ্রীঃ (৯১০ হিঃ) তে আর একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদ জীর্ণদশাপ্রাপ্ত হলে নতুন মসজিদ নির্মিত হয়েছে। এর কাছে বাবা সালেহর মাজার আছে।
• খন্দকার সাহেবের মসজিদ :
সোনারগাঁর অন্তর্গত মোগরাপাড়া বাজারের নিকটে পীর খন্দকার মহম্মদ ইউসুফের দরগার নিকটে খন্দকার সাহেবের জীবনকালে তাঁর নির্মিত একটি মসজিদ গাত্রে ১১১২ হিঃ (১৭০০ খ্রীঃ) লিখিত আছে বাংলার সুবাদার আজিম-উস-সান। বাংলার রাজধানী ঢাকা, ইসলাম খাঁ কর্তৃক রাজমহল থেকে ঢাকাতে রাজধানী স্থাপনের প্রায় শতবর্ষ পরেও সুবর্ণগ্রাম কৌলীন্য হারালেও মনুষ্যশূন্য হয় নি।
• ফতে শাহর মসজিদ লিপি :
পীর খন্দকার সাহেবের মসজিদের প্রবেশ পথে বামপার্শ্বের দেওয়ালে প্রস্তর লিপি অনুসারে সুলতান জালালুদ্দীন ফতে শাহর রাজত্বকালে ৮৮৯ হিজরীর মহরম মাসে (১৪৮৪ খ্রীঃ) সুলতানের পরিচ্ছদ রক্ষক মুয়জ্জমবাদ বা মহমুদাবাদের উজীর সরলস্কর এবং লাউর বা শ্রীহট্ট থানার সরলস্কর মোকরবউদ্দৌল্লা কর্তৃক নির্মিত।
• হোসেন শাহর লিপি :
মোগরাপাড়োর রাস্তার সন্নিকটে একখণ্ড প্রস্তরলিপি পরিলক্ষিত হয়। সেই অনুসারে ১৫০২ খ্রীস্টাব্দের ৭-ই জুন (৯০৭ হিঃ) তারিখে সুলতান আলাউদ্দীন আবুল মোজাফফার হোসেন শাহর রাজত্বকালে ত্রিপুরা ও মোয়াজ্জমাবাদের শাসনকর্তা খোয়াস খাঁ কর্তৃক নির্মিত একটি নির্মাণের কথা জানা যায়।
সুবর্ণগ্রামে আবিষ্কৃত আর একখানি শিলালিপি অনুসারে ৯২৫ হিজরী সনের শাবান মাসের পঞ্চদশ দিবসে (১২-ই আগষ্ট, ১৫১৯ খ্রীস্টাব্দ) মোল্লা হিজাবর আকবর খাঁ কর্তৃক একখানি মসজিদ নির্মাণের কথা জানা যায়।
• নশরত শাহর সোনারগাঁ লিপি :
সুবর্ণগ্রামে, সাদীপুরে আবিষ্কৃত একখানি শিলালিপি অনুসারে সুলতান নশরত শাহর পিতা হোসেন শাহর সঙ্গে যৌথ শাসনকালে ৯২৯ হিজরী (১৫২৩ খ্রীঃ) সনে মুখতার-উল-মজলিস উপাধিধারী আইনুদ্দীনের পুত্র সরওয়ারের পৌত্র প্রধান ব্যবহারজীবী, হাদীগণের শিক্ষক, মালিক-উল-উমরা-ওয়াল-উজরা তকীউদ্দীন বার মালিক-উল-মজলিস কর্তৃক একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।
• গোয়ালদির মসজিদ :
পানামের নিকট সোনার গাঁ থানার গোয়ালদি নামক স্থানে ‘গোয়ালদি মসজিদ’ অবস্থিত। এই মসজিদের ইস্টকগুলি অতিশয় রক্তবর্ণের। এটির বহির্ভাগ কারুকার্য মণ্ডিত ছিল। বর্তমানে তৎসমুদায়ই প্রায় বিলুপ্ত। মসজিদটির তিনটি গম্বুজের মধ্যে মধ্যেরটি আরব সভ্যতার অনুকরণে নীল মর্মর প্রস্তরে নির্মিত। দ্বারদেশের স্তম্ভ কোন হিন্দুমন্দির থেকে সংগৃহীত মনে হয়।
এই মসজিদটি সুলতান হোসেন শাহর রাজত্বকালে ৯২৫ হিজরীর শাবন মাসের পঞ্চদশ দিবসে (১২-ই আগষ্ট ১৫১৯ খ্রীঃ) মোল্লা হিজাবর আকবর খাঁ কর্তৃক নির্মিত।
• বন্দর শাহী মসজিদের লিপি :
বন্দরের শীতলাক্ষ্যা ফেরীঘাটের ১ কি.মি. দূরে বন্দর পূব-এলাকায় অবস্থিত শাহী মসজিদে জালালুদ্দীন ফতে শাহর রজত্বকালে ৮৮৬ হিজরীর জিলকাদা মাসের প্রথম দিবসে (২-রা জানুযারী ১৪৮২ খ্রীঃ) উৎকীর্ণ শিলালিপি অনুসারে বাবা সালেহ কর্তৃক এই মসজিদ নির্মাণের উল্লেখ আছে। মোগল যুগেও বন্দর একটি প্রধান নাবিস্থান ছিল। মগদিগের অত্যাচারের কবল থেকে দেশবাসীকে রক্ষার জন্য বাংলার গভর্ণর সায়েস্তা খা রাজা ইন্দ্রসনের অধীনে শতাধিক রণপোত এই স্থানে সর্বদা প্রস্তুত রাখতেন।
• লাঙ্গলবন্ধ ও পঞ্চমীঘাট :
সুবর্ণগ্রামের পানামের নিকটে লাঙ্গলবন্ধ এবং পঞ্চমীঘাট হিন্দুদের পরম পবিত্র তীর্থস্থান ও হিন্দুতীর্থ। ব্রহ্মপুত্র নদের যে শাখাটি সুবর্ণগ্রামের পশ্চিমপ্রান্ত দিয়ে দক্ষিণাভিমুখে প্রবাহিত হয়ে লাক্ষ্যানদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেই লৌহিত্য শাখার পশ্চিমতটে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত প্রায় এক মাইল ব্যাপী দেব-দেবীর দেবালয় আছে। কথিত আছে শ্রীবিষ্ণুর অবতার ভগবান জামদগ্ন্য (পরশুরাম) মাতৃবধজনিত পাপবিমোচনার্থে পিতা জমদগ্নির উপদেশে ব্রহ্মপুত্র নদে অবগাহন করে পাপ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করেছিলেন।
কথিত হয় যে যাদব-বংশের শ্রীবলরাম তীর্থপর্যটনকালে পুণ্যতোয়া ব্রহ্মপুত্র নদে অবগাহন করেন। তিনি ব্রহ্মপুত্রকে লোকচক্ষুর গোচরীভূত করতে স্বীয় লাঙ্গল দ্বারা এই পর্যন্ত আনয়ন করেন। লাঙ্গলে আবদ্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য স্থানটি ‘লাঙ্গলবন্ধ’ আখ্যা পায়।
লাঙ্গলবন্ধের ন্যায় পঞ্চমীঘাটও তীর্থস্থান। কথিত আছে মহাভারতের পঞ্চ-পান্ডব বনবাস কালে লৌহিত্য-তীর্থ সন্দর্শনার্থে এখানে আগমন করেন, এবং স্নান, তর্পণাদি করেন। পঞ্চপাণ্ডবদের স্নান তর্পণাদির ঘাটটি তাঁদের পুণ্য আগমনের স্মৃতি স্বরূপ ‘পঞ্চমীঘাট’ নামে খ্যাত হয়।
একদা মালদহের রামকেলি, রাজশাহীর খেতুরীর মত লাঙ্গলবন্ধের যে সব মেলা হত তাতে নির্দিষ্ট স্থানে বোষ্টম-বোষ্টমীদের প্রেমতলা চিহ্নিত থাকত। সেখানে ফৌজদারকে পাঁচসিকা দক্ষিণা দিলেই কন্ঠিবদলের মাধ্যমে বৈরাগী-বোষ্টমের একজন বোষ্টমী লাভ হত।
লাঙ্গলবন্ধের পঞ্চমীঘাটের দক্ষিণে একটি বৃহৎ বটবৃক্ষ আছে। এই বটতলাই লাঙ্গলবন্ধের প্রেমতলা।
• বল্লালের প্রস্তরময় রথ :
সুবর্ণগ্রাম অন্তঃপাতী মোগড়াপাড়ার অনতিদূরে ব্রহ্মপুত্র-পুলিনে দ্বিতীয় বল্লাল সেন (পোড়ারাজা) কর্তৃক নির্মিত প্রস্তরময় রথের ভগ্নাবশেষ পরিলক্ষিত হয়। এই রথ নানা রূপ কারুকার্য ও হিন্দু ভাস্কর্যের নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। মহারাজা দ্বিতীয় বল্লাল সেন বহু অর্থ ব্যয়ে এই রথ প্রস্তুত করেন। প্রবাদ আছে যে রথদ্বিতীয়ার দিন এক শত ব্রাহ্মণ এই রথ টানতেন, কিন্তু অন্য কোন দিন শতাধিক বলশালী পুরুষের সমবেত প্রচেষ্টাতে এটির সামান্য পরিমাণে স্থানচ্যুত করা সম্ভব হত না। কালান্তরে কালু নামক কোন হিন্দু ফকির ইসলামে দীক্ষিত হয়ে এই রথের চূড়া ও কারুকার্যময় প্রস্তর মূর্তিগুলির বিনাশ সাধন করেন।
• বাবা লোকনাথের আশ্রম :
নারায়ণগঞ্জ মহকুমার অধীন বারদী গ্রামে স্বয়ং-সিদ্ধ মহাযাগী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম বিদ্যমান আছে। বাংলা ১২৩৭ সনে ২৪ পরগণার অন্তর্গত চাকলা গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতার নাম রামনারায়ণ ঘোষাল, মাতার নাম কমলা দেবী। তাঁর দীক্ষা গুরু ভগবানচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বহুতীর্থ, দেশ-বিদেশ ও হিমালয় ভ্রমণ করে বারদী গ্রামে বাস করেন। অতঃপর বাবা লোকনাথ ‘বারদীর ব্রহ্মচারী’ বলে অভিহিত হন। ১২৯৭ বঙ্গাব্দে ১৬০ বৎসর বয়সে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী যোগস্থ অবস্থায় দেহত্যাগ করেন।
• কদম রসুল :
নারায়ণ বন্দরের অপর তীরে লাক্ষ্যা নদীর পূর্বতটে ‘কদম রসুল দুর্গ’ অবস্থিত। এই স্থানের পবিত্র চরণ-চিহ্নটি (কদম-রসুল) এক সওদাগর কর্তৃক আরব দেশ থেকে আনীত। ঈশা খাঁর সেনাপতি মাসুম খাঁ কাবুলি এই পবিত্র চরণ চিহ্ন অঙ্কিত প্রস্তরখণ্ডটি ক্রয় করে এই স্থানে স্থাপন করেন।
• সোনাকান্দা দুর্গ :
বাবা সালেহর মসজিদ ও মাজারের দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা নদীর বামতীরে সোনাকান্দা দুর্গ অবস্থিত। সম্ভবতঃ মোগল আমলে মগ আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশে এই দুর্গ নির্মিত। দীর্ঘকাল স্থানটি পরিত্যক্ত ও জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটির সংস্কার করেছে।
দুর্গটিকে ‘সোনাকন্দা’ বলা হয়। কথিত আছে খিজিরপুরের ঈশা খানের (মসনদ-ই-আলা) সঙ্গে বিক্রমপুরের ক্ষমতাবান ও ঐশ্বর্যশালী ভূঁঞা-জমিদার চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের সঙ্গে বিরোধ ছিল। একবার ঈশা খান বিক্রমপুর আক্রমণ করে চাঁদ রায়ের একমাত্র কন্যা সোনাই (সোনাময়ী) কে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে আসেন এবং বিবাহ করেন। ঈশা খাঁ সোনাইকে এই দুর্গে রাখেন। এখানে সোনাই কাঁদতেন বলে এই দুর্গের নাম ‘সোনাকান্দা’ হয়।
• সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের সমাধি :
পানামোর নিকটে মগরাপাড়া গ্রামে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত মগদীঘির তীরে গৌড়েশ্বর গিয়াসউদ্দীনের সমাধি আছে। সমাধিটি কারুকার্যখচিত ব্রহ্মশিলা তে (কষ্টিপাথর) নির্মিত। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ রাজসভার অমাত্য রাজা গণেশের চক্রান্তে নিহত হন (৮১৩ হিঃ)। তাঁর পুত্র সইফুদ্দীন হামজা শাহ সুলতান হবার পর পিতার সমাধির উপর মাজার নির্মাণ করেন।
মোগরাপাড়া বাস স্টপেজ থেকে পাঁচ কি.মি. দূরে অবস্থিত সমাধিক্ষেত্র যাবার রাস্তা আছে। সমাধিক্ষেত্রটি বর্তমানে সংরক্ষিত এলাকা। (চিত্র নং-১৩)

৯। বিক্রমপুর :
পূর্ব-বঙ্গে সুবর্ণগ্রামের দক্ষিণে বিক্রমপুর অবস্থিত। নদীমাতৃক পূর্ব-বঙ্গে মেঘনা, ইছামতী, ধলেশ্বরী ও কীর্তিনাশা (পদ্মা) বিক্রমপুরকে সমৃদ্ধ করেছে। পালযুগের প্রথমার্দ্ধে বিক্রমপুর পালরাজাদের শাসনাধীন ছিল, আবার দ্বিতীয়ার্দ্ধে পালরাজাদের দুর্বলতার সুযোগে চন্দ্রবংশ, বর্মবংশ ও সেনবংশ স্বতন্ত্র শাসন কায়েম করে।
দশম শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কাল পর্যন্ত পূর্ব-বঙ্গে চন্দ্রবংশ স্বাধীনভাবে রাজত্ব করে। ইতঃপূর্বে এই বংশের পূর্ণচন্দ্র এবং তাঁর পুত্র সুবর্ণচন্দ্র পালরাজাদের অধীনে সামন্ত রাজা ছিলেন। সুবর্ণচন্দ্রর পুত্র ত্রৈলোক্য চন্দ্র (৯০০-৯২৫ খ্রীঃ) চন্দ্রবংশের প্রথম সার্বভৌম নরপতি। ত্রৈলোক্যচন্দ্রর পুত্র শ্রীচন্দ্র (৯২৫-৯৭৫ খ্রীঃ) তাঁর রাজ্যের রাজধানী বিক্রমপুরে স্থাপন করেন এবং বিক্রমপুরের জয়স্কন্ধাবার থেকে তাঁর তাম্রশাসনগুলি প্রদান করেন। শ্রীচন্দ্রর পুত্র কল্যাণচন্দ্রর (৯৭৫-১০০০খ্রীঃ) একখানি তাম্রশাসন, কল্যাণচন্দ্রর পুত্র লডহচন্দ্রর (১০০০-১০২০ খ্রীঃ) তিনখানা তাম্রশাসন এবং লডহচন্দ্রর পুত্র গোবিন্দচন্দ্রর (১০২০-১০৫৫ খ্রীঃ) একখানা তাম্রশাসন ও দুইটি মূর্তিলেখ এযাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে।
গোবিন্দচন্দ্রের রাজত্বকালে বৈদেশিক আক্রমণের ফলে এই বংশের পতন ঘটে। তাঁর সময়ে চন্দ্রসাম্রাজ্যের উপর রাজেন্দ্র চোল ও কলচুরিরাজ কর্ণের আক্রমণ সংগঠিত হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাতে চন্দ্রবংশের ১৫০ বৎসর রাজত্বকালের মধ্যে বিক্রমপুরকে কেন্দ্র করে তাঁরা প্রায় ১৩০ বৎসর শাসনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
একাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গে বর্ম উপাধিধারী এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়। সম্ভবতঃ কলচুরি রাজা কর্ণের বঙ্গ-বিজয়াভিযানের সময় বর্মরাজারা বঙ্গে আসেন এবং পরবর্তীকালে সুযোগ বুঝে রাজক্ষমতাতে প্রতিষ্ঠিত হন। বিক্রমপুর থেকে প্রদত্ত ভোজবর্মার বেলাব তাম্রশাসনের বর্ণনা থেকে মনে হয় ব্রজবর্মার পুত্র জ্যোতি (জাত) বর্মর সময়েই পূর্ববঙ্গে বর্মদের রাজনৈতিক প্রাধান্য সূচিত হয়। জ্যোতি বর্মর পুত্র হরিবর্ম এবং তা শ্যামল বর্মর প্রদত্ত তাম্রশাসন বিক্রমপুর থেকে প্রকাশিত। শ্যামল বর্মর পুত্র ভোজবর্ম এই বংশের শেষ নরপতি। দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রাঢ়বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত সেনবংশীয় বিজয় সেন বর্ম শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিক্রমপুরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গে সেন শাসনের সূচনা করেন। ফলে বর্মদের রাজধানী বিক্রমপুর বিজয় সেনের অধিকারে আসে।
সেনযুগে লক্ষ্মণ সেনের তাম্রশাসন বিক্রমপুর-সমাবাসিত শ্রীমজ্জয়স্কন্ধাবার থেকে প্রদত্ত হয়েছে। সেনগণ বঙ্গে প্রতিষ্ঠা লাভের পরে গৌড় অধিকার করেন। বল্লাল সেন গৌড় নগরে তাঁদের আর একটি রাজধানী করেছিলেন। লক্ষ্মণ সেনের সময় গৌড় নগর লক্ষ্মণাবতী নামে পরিচিত হয়। তাঁর রাজত্বকালে বখতিয়ার খিলজী ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে নদীয়া ও পরে লক্ষ্মৌতী (লক্ষ্মণাবতী) জয় করার পরেও সেন বংশ বিক্রমপুরকে কেন্দ্র করে সেনরাজত্ব অটুট রাখেন। লক্ষ্ণণ সেনের পরে তাঁর বংশধরগণ ‘যবনান্বয়-প্রলয়-কাল-রুদ্র’ বলে তাঁদের প্রদত্ত তাম্রশাসনে অভিহিত হয়েছেন। তাঁদের এই উপাধি থেকে মনে হয় তাঁরা মুসলিম আক্রমণ প্রতিহত করে পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গে স্বীয় অধিকার বজায় রেখেছিলেন। সেনবংশের উত্তরাধিকারিগণ ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রায় মধ্যবর্তী সময়কাল পর্যন্ত বিক্রমপুরে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে দেববংশের দামোদর দেবের পুত্র দশরথ দেব সেন-শাসনের অবসান করে বিক্রমপুরে তাঁর রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করেন। বিক্রমপুর থেকে প্রদত্ত আদাবাড়ীতে প্রাপ্ত তাঁর একটি তাম্রশাসনে তিনি পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহাজাধিরাজ অরিরাজদনুজ-মাধব দশরথ দেবরূপে আখ্যায়িত হয়েছেন। এই তাম্রশাসনে উক্ত হয়েছে তিনি ভগবান নারায়ণের কৃপায় গৌড়রাজ্য লাভ করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম ইতিহাসে জানা যায় গৌড় এসময়ে তুর্কি শাসনাধীন ছিল। অসম্ভব নয়, বঙ্গে মুলসিম নায়কদের মধ্যে গৃহবিবাদের সুযোগে দনুজমাধব মুসলিম অধিকৃত গৌড়রাজ্যের কিয়দংশ অধিকারে সমর্থ হন। তাছাড়া তৎকালে সমগ্রবঙ্গ মুসলিমদের কাছে অধরা ছিল। ১২৮১ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার বিদ্রোহী নায়ক তুঘরিল খাঁ (মঈজুদ্দীন) কে দমন করার উদ্দেশ্যে দিল্লীর দাশবংশীয় গিয়াসুদ্দীন বলবন দনুজরায় অর্থাৎ অরিরাজ দনুজ-মাধব-দশরথ দেবের সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পূর্বে সুবর্ণগ্রাম প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি বিক্রমপুরে এই দনুজরায় মুসলিম ইতিহাসে সুবর্ণগ্রামের রাজা বলে অভিহিত হয়েছেন।
মোগল যুগে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে রাজমহলের যুদ্ধে (১২।৭।১৫৭৬/৯৮৫ হিঃ) দাউদ খান কররানীর পতন হলেও সমগ্র বাংলা মোগলদের কাছে অধরা থাকে। মোগল শক্তি কেবলমাত্র পশ্চিম-উত্তর বাংলাতে প্রতিষ্ঠিত থাকে। মোগলদের বিরুদ্ধে বাংলার ভূঁঞাদের প্রতিরোধ কাহিনী আকবরের সময় পার হয়ে জাহাঙ্গীরের সময়কালেও বিস্তৃত ছিল। বিক্রমপুরের চাঁদ রায়, কেদার রায় তাঁদের সময়ে অত্যন্ত ক্ষমতাবান ও ঐশ্বর্যশালী ভূঁঞা জমিদার ছিলেন।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিযুক্ত সুবাদার ইসলাম খাঁ চিস্তি কর্তৃক বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে পুনরায় ঢাকাতে প্রতিষ্ঠার পর তাঁর সুযোগ্য শাসনে প্রায় সমগ্র বাংলা আক্ষরিক অর্থে মোগল শাসনাধীনে আসে।
১০। ঢাকা :
ঢাকা বুড়ীগঙ্গার তীরে অবস্থিত। গঙ্গার যে অংশ পদ্মা নামে অভিহিত, সেখান থেকে এই নগর তিন ক্রোশ দূরে। ঢাকেশ্বরী দেবীর নাম থেকে ‘ঢাকা’ নামের উৎপত্তি। পূর্বে ঢাকা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের অধিকারে ছিল। পরবর্ত্তী কালে সেনদের সঙ্গে এই নগর ঘনিষ্ঠভাবে সংবদ্ধ হয়।
লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকালে ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে ইখতিয়ারউদ্দীন মহম্মদ বখতিয়ার খিলজী নদীয়া ও লক্ষ্মণাবতী বিজয়ের মাধ্যমে বঙ্গে মুসলিম যুগের সূচনা করলেও পূর্ববঙ্গ (ভাটি) দীর্ঘদিন মুসলিম অধিকারের বাইরে ছিল। বঙ্গে তুগরল খান (১২৭৯-১২৮২ খ্রীঃ) এবং দিল্লীতে গিয়াসউদ্দীন বলবনের রাজত্বকালে ভাটিতে দনুজরায় নামক স্বাধীন হিন্দু নরপতি প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। পরবর্তীকালে দিল্লীতে তোগলক বংশের অভ্যুদয়ে বঙ্গে তিনটি শাসন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
খ্রীস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকে ঢাকার শ্রীবৃদ্ধির সূত্রপাত হয়। জাহাঙ্গীরের নিযুক্ত বাংলার সুবাদার ইসলাম খাঁ রাজমহল থেকে রাজ্যের রাজধানী ভূঁঞা জমিদার এ বিরোধী শক্তির কেন্দ্রস্থল ঢাকাতে স্থাপন করে ঢাকার নাম দেন জাহাঙ্গীর নগর। তৎকালে অহম, মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুগণের অত্যাচারে পূর্ববঙ্গ প্রপীড়িত ছিল। কেবলমাত্র শাহসুজার সুবাদারীর সময়কালে প্রায় বিশবছর রাজমহলে রাজধানীর সময়কাল ব্যতীত সমগ্র সপ্তদশ শতাব্দী ঢাকা রাজধানী রূপে গণ্য ছিল। পরবর্তী শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। ১৭৫৭ খ্রীস্টাব্দে ইংরেজ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৮৪৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্য্যন্ত সহকারী শাসনকর্তা ঢাকায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। ঢাকা প্রথম থেকে বঙ্গদেশ ভুক্ত ছিল। ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গবিভাগ সংগঠিত হলে, ঢাকা পূর্ববঙ্গের ছোটলাটের শাসনাধীন হয়। ১৯১২-র ১লা এপ্রিল পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ পুনর্যুক্ত হলে ঢাকা যুক্তবঙ্গের গভর্ণরের অধীনে পুনরানীত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।
১১। সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও (আদিসপ্তগ্রাম) :
দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গে হুগলীর নিকটে সপ্তগ্রাম। সপ্তগ্রাম নাম থেকে বুঝা যায় যে ‘সপ্তগ্রাম’ কোন একক গ্রাম নয়। সাতটি গ্রামের সমষ্টি সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও। কথিত হয় যে কান্যকুব্জের রাজা প্রিয়বন্তের সাতপুত্র প্রত্যেকে এক একজন ঋষি ছিলেন। তাঁদের বাসস্থান ছিল সপ্তগ্রামের সাতটি গ্রামে। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম বলেছেন—
‘‘তীর্থমধ্যে পুণ্যতীর্থ ক্ষিতি অনুপাম
সপ্তঋষির শাসনে বলয় সপ্তগ্রাম।’
আদিকাল থেকে বর্তমান কাল অবধি সপ্তগ্রামের উত্থান পতনের ইতিহাস মূলতঃ সাতটি গ্রাম জুড়ে ছিল। গ্রামগুলি হল—শিবপুর, বাসুদেবপুর, কৃষ্ণপুর, বলদঘাটি, সাম্বাচোরা, বাঁশবেড়িয়া ও নিত্যানন্দপুর। বিভিন্ন সময়ে সপ্তগ্রামের গ্রামের নামের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গে সরস্বতী নদী তীরে সপ্তগ্রাম। একদা গঙ্গানদী ত্রিবেণীর কাছে তিনটি ধারায় ভাগ হয়ে প্রবাহিত ছিল। যমুনা-ধারা দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত, ভাগীরথীর-ধারা দক্ষিণে হুগলী ও আদিগঙ্গার প্রবাহপথে প্রবাহিত এবং সরস্বতীর ধারা দক্ষিণ-পশ্চিমে সপ্তগ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ছিল। তখন ভাগীরথীর মূল প্রবাহ সরস্বতী খাতে প্রবাহিত হত। নদীপথে যাওয়া যেত তাম্রলিপ্ত বন্দর। তখন তাম্রলিপ্ত বন্দর সমুদ্রের উপকূলে অবস্থিত ছিল। পরবর্তীকালে সমুদ্রের অবস্থান পরিবর্তিত হয়। তাম্রলিপ্তর পরে তখন সপ্তগ্রামের সমৃদ্ধির যুগ। স্রোতস্বিনী সরস্বতীর তীরে সমৃদ্ধশালী বন্দরনগরী সপ্তগ্রাম। পূর্বে সপ্তগ্রাম বহুজনপূর্ণ বৃহৎ নগরী ছিল। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায় সর্ববৃহৎ বন্দর তখন সপ্তগ্রাম। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের কাব্যে উল্লেখ আছে—
‘‘এ সব সফরে যত সদাগর বৈসে
যত ডিঙা লৈয়া তারা বাণিজ্যতে আসে,
সপ্তগ্রামের বণিক কোথাও না যায়
ঘরে বসে সুখ মোক্ষ নানা ধন পায়।’’
পূর্বে সপ্তগ্রাম হিন্দুনগরী ছিল। বঙ্গ-সুলতান রুকনুদ্দীন কাইকাউসের রাজত্বকালে ৬৯৮ হিঃ (১২৯৮ খ্রীঃ) সনে বহরাম ঈতগীন জাফর খাঁ সপ্তগ্রাম বিজয় করেন। হুগলীর ত্রিবেণীতে প্রাপ্ত ৬৯৮ হিজরীতে মসজিদ নির্মাণের লিপিতে সুলতান কাইকাউস ও গভর্ণর জাফর খাঁর নাম জানা যায়। ত্রিবেণীতে শিবপুরে জাফর খাঁর—দরগা আছে। পাষাণ নির্মিত দেবমন্দির দরগাতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই দরগার নিকটে বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে নির্মিত একটি বৃহৎ মসজিদ আছে। ভগ্নাদশা প্রাপ্ত এই মসজিদের খিলান মসজিদ অপেক্ষা প্রাচীন। এই খিলানটি সপ্তগ্রাম বিজেতা জাফর খাঁ নির্মিত একটি মসজিদের মিহরাব। মিহরাবে খোদিত নির্মাণ তারিখ ৬৯৮ হিঃ। অনুমান সপ্তগ্রাম বিজয় করে জাফর খাঁ উক্ত সনে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। (চিত্র নং-১২)
জাফর খাঁর দরগাতে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় বঙ্গ-সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহর রাজত্বকালে ৭১৩ হিজরী (১৩১৩ খ্রীঃ) তে জাফর খাঁর আদেশে ‘দার-উল-খয়রাত’ নামে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেছিলেন।
সুলতানী যুগে তুঘলক বংশের অভ্যুদয়ে বাংলা তিনটি শাসন বিভাগে বিভক্ত হয়। যথা—লক্ষ্মৌতী শাসন বিভাগ, সুবর্ণগ্রাম (সোনার গাঁও) শাসন বিভাগ এবং সপ্তগ্রাম (সাত গাঁ) শাসন বিভাগ। দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গ শাসন বিভাগের রাজধানী তখন সপ্তগ্রাম। মহম্মদ বিন তুঘলকের সময়ে সাতগাঁ এ সর্বপ্রথম টাঁকশাল স্থাপিত হয়। সাতগাঁও টাঁকশাল থেকে তাঁর মুদ্রিত মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।
পরবর্তীকালে বঙ্গের স্বঘোষিত সুলতান হাজী ইলিয়াস শাহ ৭৪৭ হিঃ (১৩৪৬ খ্রীঃ) সনে সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও অধিকার করে উক্তবর্ষে সাতগাঁও টাঁকশাল থেকে নিজ নামে মুদ্রা প্রচলন করেন। সাতগাঁও টাঁকশাল থেকে ইলিয়াস শাহর পুত্র সুলতান সিকান্দার শাহর নামে ৭৮০-৮৪ এবং ৭৮৮ হিজরীতে মুদ্রিত রজত মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। সিকান্দার শাহর পুত্র গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ বিদ্রোহী কালীন অবস্থায় সাতগাঁও টাঁকশাল থেকে ৭৯০ হিজরীতে এবং সুলতান হয়ে ৭৯৫, ৭৯৬, ৭৯৮ হিজরীতে রজতমুদ্রা প্রকাশ করেন। বাংলায় গণেশ শাহী যুগে গণেশপুত্র যদু বা জালালুদ্দীনের এই টাঁকশাল থেকে ৮২১ হিঃ (১৪১৮ খ্রীঃ) তে মুদ্রিত মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।
পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান মাহমুদ শাহর রাজত্বকালে ৮৬১ হিঃ (১৪৫৭ খ্রীঃ) তে উৎকীর্ণ সপ্তগ্রামের ত্রিশ বিঘা (বলদঘাটি) গ্রামে সেখ জালালুদ্দীনের সমাধি পার্শ্বে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায় তরবিয়ৎ খাঁ সপ্তগ্রামে একটি গৃহ নির্মাণ করেছিলেন।
মাহমুদ শাহর জীবদ্দশায় তাঁর পুত্র বারবাক শাহ দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের, সম্ভবতঃ সপ্তগ্রামের শাসক ছিলেন। ত্রিবেণীতে প্রাপ্ত ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীর বর্ধমানের পাষাণ-প্রতিমার পশ্চাদ্দেশে পরবর্তীকালে ৮৬০ হিজরীতে উৎকীর্ণ মসজিদ নির্মাণের এক লিপিতে বারবাক শাহ ‘মালিক’রূপে আখ্যায়িত হয়েছেন। কিন্তু ৮৬১ হিজরীতে উৎকীর্ণ মুদ্রায় তিনি পূর্ণ রাজকীয় উপাধি (লাকাব) ধারণের অনুমতি প্রাপ্ত হন। বারবাক শাহ ৮৬৪ হিঃ (১৪৫৯-৬০ খ্রীঃ) সনে পিতার মৃত্যুর পর পিতৃ-সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর রাজত্বকালে দক্ষিণ বঙ্গের বনময় প্রদেশে হিন্দুরাজগণের স্বাধীনতা লুপ্ত হয়েছিল। তদীয় ভ্রাতা ফতে শাহর রাজত্বকালে ৪ মহরম ৮৯২ হিঃ (৩১.১২.১৪৮৬ খ্রীঃ) তারিখে উৎকীর্ণ মসজিদ নির্মাণের লিপিমাত্র পূর্বোক্ত জালালুদ্দীনের সমাধি পার্শ্বে আবিষ্কৃত হয়েছে।
হাবসী বিজয়ী হোসেন শাহ বাদশা হয়ে হোসেনাবাদ টাঁকশাল থেকে নিজ নামে রৌপ্য মুদ্রা মুদ্রণ করেন। সম্ভবতঃ তৎকালে ‘সাতগাঁও টাঁকশাল’ ‘হোসেনাবাদ টাঁকশাল’ নামে পরিচিত হয়। ত্রিবেণীর শিবপুরে পূর্বোক্ত জাফর খাঁর মসজিদের সংলগ্ন এক শিলালিপি অনুসারে তাঁর রাজ্যকালে ৯১১ হিজরীতে এক সেতু নির্মাণের উল্লেখ আছে। হোসেন শাহ পুত্র সুলতান নশরত শাহ কর্তৃক একটি মসজিদ ও একটি জামে মসজিদ নির্মাণের লিপি ত্রিশ বিঘা (বলদঘাটি) তে আবিষ্কৃত হয়েছে। সুলতান নশরত শাহর রাজ্যকালে তাঁর পুত্র বিব্বন শাহ ও ফিরোজ শাহর ৯৩৮ হিজরীতে উৎকীর্ণ পূর্ণ রাজকীয় উপাধি (লাকাব) যুক্ত রজত মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। নশরত পুত্র বিব্বন শাহ হোসেনাবাদ টাঁকশাল থেকে প্রাপ্ত মুদ্রা সাক্ষ্যে ইতিহাসের আলোকে আসেন ( চিত্র নং-৪)। হোসেনাবাদ টাঁকশাল থেকে হোসেন শাহর পুত্র মাহমুদ শাহর প্রকাশিত মুদ্রা লক্ষ্য করা গেছে। দিল্লীর সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত ইসলাম শাহ সূর (জামাল খাঁ)র নামাঙ্কিত সপ্তগ্রামে মুদ্রিত মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।
এভাবে সুলতানী যুগে মুদ্রা ও লিপির আলোকে সপ্তগ্রামের সমৃদ্ধির কথা জানা যায়। সুলতানী যুগে হোসেন শাহ বাদশার রাজত্বকালে সপ্তগ্রামের পত্তনিদার গোবর্দ্ধন দাসের পুত্র তথা হিরণ্যদাসের ভ্রাতুষ্পুত্র রঘুনাথ দাসের জন্ম। রঘুনাথ দাস বৈষ্ণব সমাজে ছয় গোস্বামীর অন্যতম একজন। ধনী পরিবারের পুত্র ১৯ বছর বয়সে অদ্বৈতের আলয়ে শ্রীচৈতন্য দর্শনে তদীয় ধর্মে আকৃষ্ট হন এবং গৃহ ত্যাগ করেন। ১৬ বৎসর নীলাচলে প্রভুসঙ্গ করে প্রভু নির্দেশে বৃন্দাবনে গমন করেন। বর্তমানে কৃষ্ণপুরে একটি মঠে তাঁদের পারিবারিক কুলদেবতা রাধাকৃষ্ণ এবং তাঁর মদনমোহন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত আছে। মূল মন্দিরটি একদা সরস্বতী গর্ভে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষ্ণপুরে রঘুনাথ দাসের আখড়ার মত ভাদোতে রয়েছে ঝড়ু ঠাকুরের আখড়া। এই সপ্তগ্রামে সুবর্ণবণিক দিবাকর দত্তর জন্ম। তিনি প্রভু নিত্যানন্দর মন্ত্রশিষ্য। নাম হয় উদ্ধারণ দত্ত। সপ্তগ্রামে নিত্যানন্দ স্মৃতি বিজড়িত মাধ্বীকুঞ্জ, নূপুর কুণ্ড আছে। এগুলি বৈষ্ণবদিগের নিকট অতি পুণ্যস্থান। তাছাড়া সপ্তগ্রামে বহু প্রাচীন মন্দির আছে। তার মধ্যে বাঁশবেড়িয়ার অনন্ত-বাসুদেব মন্দির, আনন্দময়ী কালী মন্দির, খামারপাড়ার জোড়াশিব মন্দির, পদ্মমণির পথ মন্দির, ত্রিবেণীর বেণীমাধব মন্দির ইত্যাদি অন্যতম। এই মন্দিরগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত দেবানন্দপুরের নাম সাহিত্যজগতে অপরিসীম।
সম্রাট আকবরের সময়কাল পর্যন্ত সপ্তগ্রাম বন্দরের কার্যকরিতা কোন রকমে টিকে ছিল। আকবরের সেনাপতি মনিম খানের সেনা অভিযান কালে আফগান নেতা দাউদ খান কররাণী সপ্রগ্রাম বন্দরে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্ত্তীকালে সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে সপ্তগ্রামের অবনতি দ্রুততর হয়।
ষোড়শ শতকে পর্তুগীজগণ সপ্তগ্রামে আসেন। সপ্তগ্রাম বন্দরের ক্রমান্বয়ে হতমান পরিস্থিতির জন্য তাঁরা হুগলীকে কেন্দ্র করেন। পর্তুগীজগণ সপ্তগ্রামকে পোর্টো পেকেনো (Potro Pequeno) বা ছোট বন্দর রূপে উল্লেখ করতেন। পর্তুগীজ বণিকদের এদেশের মানুষ ‘ফিরিঙ্গিবণিক’ এবং পর্তুগীজ জলদস্যুদের ‘বোম্বেটে’ বলতেন। তৎকালে ক্রমান্বয়ে হতমান সরস্বতী নদী তাদের স্বর্গরাজ্য ছিল। বোম্বেটেদের অত্যাচার এড়ানোর জন্যও বাংলার বণিকেরা ভাগীরথীর পথে বাণিজ্য যাত্রা করতেন।
সপ্তগ্রামে ষোড়শ শতকে বেশি কয়েকজন বিদেশী পর্যটক এসেছিলেন। এঁরা হলেন সিজার ফ্রেডরিক, র্যালফ ফীচ, জাও, ডি.ব্যারস।
সপ্তগ্রামের প্রাণভ্রমরা স্রোতস্বিনী সরস্বতী। তার জন্যই সপ্তগ্রাম বন্দর, তার জন্যই সপ্তগ্রাম নগরী, তার জন্যই সপ্তগ্রাম বাংলার একটি শাসন বিভাগের রাজধানী। সরস্বতীর স্রোতোধারার মত সপ্তগ্রামের সমৃদ্ধির স্রোতোধারা অব্যাহত ছিল। কালের প্রবাহে সরস্বতী স্রোতহীন হলে বন্দরনগরী সপ্তগ্রামের সমৃদ্ধির প্রবাহ ক্রমশঃ অস্তমিত হয়। একদা সপ্তগ্রামে সরস্বতীতীরে নদীবন্দরে যাত্রীগণকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য যে নহবতখানা ঐকতানে মুখরিত থাকত, আজ সেই নহবতখানাতে বসে না নহবতের আসর। নহবতখানা আজ বিলয়ের পথে অতীতদিনের সাক্ষ্য প্রদান করে মাত্র।

১২। মুর্শিদাবাদ :
তখন বাংলার রাজধানী ছিল ঢাকা, এবং বাংলার সুবাদার (নাজিম) ছিলেন দিল্লী সম্রাট ঔরঙ্গজেবের পৌত্র আজিমুদ্দীন (আজিম-উস-সান)। আজিম-উস-সান রাজকার্য ও রাজস্ব আদায় অপেক্ষা বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত ধন-সম্পদ আহরণে (সওদা-ই-খাস) অধিক আগ্রহী ছিলেন। সম্রাট ঔরঙ্গদেব নাছোড়বান্দা পৌত্রের না পসন্দ অর্থগৃধ্নুতার জন্য আজিমকে নাজিম পদে রেখে রাজস্ব-বিভাগ পরিচালনার জন্য ঘাইরাত খাঁর পরিবর্তে তাঁর বিশ্বস্ত ও দক্ষ হাদিখানকে ‘করতলব খাঁ’ উপাধি প্রদান পূর্বক বাংলার দেওয়ান ও মুকসুদাবাদের ফৌজদার পদে নিয়োগ করেন (১৭ নভেম্বর ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দ)। ১৭০২ খ্রীষ্টাব্দের ২৩ শে ডিসেম্বর হাদি খাঁ (করতলব খাঁ) সম্রাট কর্তৃক ‘মুর্শিদকুলি খাঁ’ উপাধি প্রাপ্ত হন। বাংলার নাজিম আজিম-উস-সানের সঙ্গে করতলব খাঁর (মুর্শিদকুলি খাঁ) বনিবনা না হবার জন্য সম্রাটের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে মুর্শিদকুলি খাঁ মুকসুদাবাদে তাঁর সম্পূর্ণ রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করেন এবং মুকসুদাবাদের নাম পরিবর্তন করে মুর্শিদাবাদ রাখেন । মুকসুদাবাদ নামের সুলুক সন্ধানে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পাই। যথা—রিয়াজ প্রণেতা গোলাম হোসেনের মতে মুখসুস খাঁ নামে জনৈক বণিক, ‘আইন-ই-আকবরি’র মতে মুখসুস নামে জনৈক মোগল অমাত্য এবং স্থানীয় প্রবাদ অনুসারে ঐতিহাসিক নিখিলনাথ রায়ের মতে গৌড়েশ্বর হোসেন শাহর সময়কালে মুখসূদন দাস নামে জনৈক নানকপন্থী সন্ন্যাসীর নামানুসারে ‘মুখসুদাবাদ’ নামটি এসেছে। প্রতিরক্ষা দিক থেকেও এর অবস্থান ছিল সুবিধাজনক। উত্তরে পদ্মা, পশ্চিম ও দক্ষিণে ভাগীরথী এবং পূর্বে জলঙ্গী নদী। তাছাড়া মুর্শিদাবাদ এই রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত থাকার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে রাজস্ব সংগ্রহ সহজসাধ্য হয়। মুর্শিদকুলির সঙ্গে জগৎশেঠ পরিবার ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে চলে আসেন।
সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু (২৮ জেলকদ শুক্রবার ১১১৯ হিঃ/২১শে ফেব্রুয়ারী ১৭০৭ খ্রীঃ) পর্যন্ত সম্রাটের আশীর্বাদধন্য মুর্শিদকুলি খাঁ ছিলেন বাংলার সর্বেসের্বা। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুর্শিদকুলির রাজনৈতিক জীবন নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে ১৭১৪ খ্রীস্টাব্দের ৬ই মে দিল্লী সম্রাট ফারুকশিয়ার কর্তৃক ‘জাফর খাঁ’ উপাধি প্রাপ্ত হয়ে উড়িষ্যার সুবাদার হন। ১৭১৭ খ্রীষ্টাব্দে মুর্শিদকুলি (জাফর খাঁ) সম্রাট ফারুকশিয়ারকে এক লক্ষ টাকা নজরানা প্রদান করে সম্রাট কর্তৃক ‘মেতোমেন-ইল-মূলুক-আলা-উদ-দৌল্লা জাফর খান বাহাদুর, নাসিরি, নাসির জঙ্গ’ উপাধি প্রাপ্ত হয়ে বাংলার সুবাদার (নবাব) হন। ১৭১৯ খ্রীস্টাব্দে দিল্লীর সম্রাট ফারুকশিয়ার নিহত হবার পর দিল্লীর দরবারে অস্থিরতার সুযোগে মুর্শিদকুলি বিহারকে বাংলা সুবার অন্তর্গত করতে সমর্থ হন। উক্তবর্ষে দিল্লীর সম্রাট রোশন আখতার (মহম্মদ শাহ) বিহারকে বাংলা সুবার অন্তর্গত করার স্বীকৃতি প্রদান করে সনদ প্রেরণ করেন। অতঃপর মুর্শিদকুলি খাঁ হলেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব এবং মুর্শিদাবাদ হল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী।
মুর্শিদকুলি খাঁ আমৃত্যু কাল (১৭২৭ খ্রীঃ) এই পদে স্বীয় কার্য নির্বাহ করেন। পরবর্তীকালে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করে সুজাদ্দৌল্লা (১৭২৭-১৭৩৯ খ্রীঃ), সরফরাজ খাঁ (১৭৩৯-১৭৪০ খ্রীঃ), আলিবর্দি খাঁ (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রীঃ), সিরাজদ্দৌল্লা (১৭৫৬-১৭৫৭ খ্রীঃ) প্রমুখ নবাবগণ নিজেদের শাসন কায়েম রাখেন। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে ক্লাইভের সঙ্গে যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌল্লা পরাজিত, ধৃত ও নিহত হবার সঙ্গে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। তারপরের ইতিহাস ইংরেজ বণিকদের উত্থানের ইতিহাস।
সিরাজদ্দৌল্লার পর মীরজাফর নবাব হলেও ইংরেজদের হাতের পুতুল মাত্র ছিলেন। ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দে মীরকাশিম নবাব হয়ে মুঙ্গেরে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দে মীরজাফর দ্বিতীয়বার মুর্শিদাবাদে রাজধানী রাখেন, কিন্তু ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে দেওয়ানী চলে যায় ইংরেজ কোম্পানীর হাতে। ১৭৭২ সালে ওয়ারেণ হেস্টিংস মুর্শিদাবাদ থেকে দেওয়ানী ও খালসার (সরকারী রাজস্ব বিভাগের দপ্তর) সব বিভাগ কলকাতাতে স্থানান্তর করেন এবং উক্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট সমস্ত কর্মী কলকাতাতে যেতে বাধ্য হন। ফলে রাজধানী মুর্শিদাবাদের গুরুত্ব কমে যায়। ১৭৭৩ সালে কলকাতাতে ইংরেজ গভর্ণর জেনারেলের সদর দপ্তর স্থাপিত হয়। ১৭৯৯ সালে মুর্শিদাবাদ টাঁকশাল বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে রাজধানী মুর্শিদাবাদ শুধুমাত্র একটি জেলাশহরে পরিণত হয়।
মুর্শিদাবাদের বিশেষ বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান :
• ত্রিপোলিয়া গেট :
এই প্রবেশদ্বার নবাব সুজাউদ্দীনের রাজত্বকালে নির্মিত। নবাবী আমলে এখানে নহবত বসতো এবং দূর থেকে নহবতের মিষ্টি সুর শোনা যেত।
• হাজারদুয়ারী প্যালেস ও মিউজিয়াম :
যদিও হাজারদুয়ারী প্যালেস বাংলার স্বাধীন নবাবী আমলে নির্মিত নয়, এটি পলাশী যুদ্ধের ৭২ বৎসর পরে নবাব হুমায়ুনজার আমলে ১৮২৯ খ্রীস্টাব্দের ২৯শে আগস্ট এই ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়, এবং ১৮৩৭ খ্রীস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে নির্মাণ কার্য সমাধা হয়। ত্রিতল বিশিষ্ট এই বিশাল ভবনে ১০০ টি নকল দরজা সহ মোট ১০০০ টি দরজা আছে। এই প্যালেস ইতালীর স্থপতি কার্যের অনুকরণে মুর্শিদাবাদে ভাগীরথীর পূর্বপারে নির্মিত। বর্তমানে এটি ভারত সরকারের আর্কিওলজিকাল সার্ভে মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে সংগ্রহশালা রূপে হাজার হাজার দর্শকের দর্শনীয় স্থান। (চিত্র নং-১৭)
• সিরাজউদ্দৌল্লার মদিনা :
এই স্থাপনাটি হাজার দুয়ারীর সামনে অবস্থিত। এটি সিরাজউদ্দৌল্লার সময়ের স্থাপত্য শিল্পের একমাত্র নিদর্শন রূপে টিকে আছে। কথিত হয় সিরাজউদ্দৌল্লা নিজে এই মদিনার জন্য কারবালা থেকে পবিত্র মাটি মাথায় করে বয়ে এনেছিলেন। (চিত্র নং-৪৯)
• বাচ্চাওয়ালী তোপ :
হাজারদুয়ারীর সম্মুখে বিশাল আকারের কামান দৃষ্ট হয়। ১৬৪৭ খ্রীস্টাব্দে জনার্দন কর্মকার এটি নির্মাণ করেন। এটি দৈর্ঘ্যে ১৮ ফুট, ওজন ১৬,৮৮০ পাউণ্ড। এটিতে কামান দাগার জন্য প্রতিবারে ১৮ সের বারুদের প্রয়োজন হত। (চিত্র নং-১৭)
• ইমামবারা :
হাজারদুয়ারীর বিপরীত দিকে ইমামবারা অবস্থিত। বর্তমান ইমামবারাটি স্বাধীন নবাবী আমলের পরবর্তীকালে নির্মিত। পূর্বে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা ইমামবারা নির্মাণ করেছিলেন। ১৮৪২ সালে সিরাজদ্দৌল্লার সাধের ইমামবারা অগ্নিকাণ্ডে একেবারে বিনষ্ট হয়।
১৮৪৮ সালে তখনকার নিজামতের দেওয়ান সৈয়দ সাদিক আলি খানের তত্ত্বাবধানে নবকলেবরে বর্তমান ইমামবারাটি নির্মিত হয়। ব্যয় হয়েছিল ছয় লক্ষ টাকার বেশি। সময় লেগেছিল এগারো মাস। দিবারাত্র নির্মাণ-কর্মীদের পরিশ্রম করার জন্য পারিশ্রমিক ছাড়াও প্রতিদিনের খাবার ও নির্মাণশেষে শাল, দোশাল প্রভৃতি পুরস্কার হিসাবে দেয়া হয়েছিল।
• চক মসজিদ :
মুর্শিদাবাদের চকবাজারের পশ্চিমদিকে চক মসজিদ অবস্থিত। পূর্বে এখানে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর দরবারগৃহ ছিল। ১৭২৭ খ্রীস্টাব্দে মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা নবাব সুজাউদ্দীন মুর্শিদাবাদ দরবারকে নবকলেবরে সজ্জিত করে চেহেল সেতুন (Palace of forty pillars), খিলওয়াত খানা (Private office), জুলুস খানা (Reception hall ), খালিসা কাছারি (Court of exchequer), দেওয়ান খানা (Revenue court) ও অস্ত্রাগার (Armoury) নির্মাণ করেন।
বাংলার স্বাধীন নবাবী আমলের পরবর্তীকালে ১৭৬৭ খ্রীস্টাব্দে নবাব মীরজাফরের বিধবা পত্নী স্বনামধন্যা মুন্নিবেগম নবাব সুজাউদ্দীনের প্রাসাদ চেহেল সেতুনের ধ্বংসাবশেষের উপর চক মসজিদ নির্মাণ করেন।
• কাটরা মসজিদ :
কাটরা (বাজার) সংলগ্ন কাটরা মসজিদটি নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ কর্তৃক নির্মিত। ১৭২৩-২৪ খ্রীস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ নিজের সমাধিস্থল গড়ার মানসে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। নবাব মুর্শিদকুলির বিনম্র ইচ্ছানুসারে মৃত্যুর পর তাঁকে কাটরা মসজিদের প্রবেশ পথের সিঁড়ির নীচে সমাধিস্থ করা হয। বর্তমানে কাটরা মসজিদ প্রত্নতত্ত্ব-বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত।
• জাহানকোষা কামান :
কাটরা মসজিদের নিকটে তোপখানা অবস্থিত। নবাব মুর্শিদকুলি ও পরবর্তী নবাবগণ এটিকে অস্ত্রাগার রূপে ব্যবহার করেন। এখানে বিখ্যাত জাহানকোষা (বিশ্বধ্বংসী) কামানটি অবস্থিত আছে। কথিত আছে যে মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপনের সময় ঢাকা (জাহাঙ্গীর নগর) থেকে কামানটি নিয়ে আসেন। ঢাকার বিখ্যাত শিল্পী জনার্দন কর্মকার এটি নির্মাণ করেন। (চিত্র নং-১৯)
• ফুটি মসজিদ :
কাটরা মসজিদের পশ্চিমদিকে অসম্পূর্ণ অবস্থায় একটি মসজিদ বিদ্যমান। নবাব মুর্শিদকুলির দৌহিত্র নবাব সরফরাজ খাঁ (১৭৩৯-১৭৪০ খ্রীঃ) এটির নির্মাণকার্য শুরু করেন, কিন্তু মসজিদটির নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয় নি। এটিকে ফুটি বা ফৌতি মসজিদ বলে।
• হীরাঝিল :
বর্তমান জাফরাগঞ্জের বিপরীত দিকে ভাগীরথীর পশ্চিমপারে সিরাজউদ্দৌল্লার ব্যবহারের জন্য রাজপ্রাসাদ হীরাঝিল নির্মিত হয়েছিল। এর সমুদয় উপকরণ গৌড়নগরী থেকে নীত হয়। বস্তুতপক্ষে মুর্শিদাবাদে যখন রাজধানী ছিল, তখন গৌড়ের দালান, কোঠা ভাঙ্গার জন্য ব্যয় নির্ধারিত ছিল, এসব নিজামত দপ্তরের কাগজপত্রে জানা গেছে।
হীরাঝিল রাজপ্রাসাদ বর্তমানে নেই। একদা ভাগীরথীর প্রখর তরঙ্গে সিরাজের সাধের রাজপ্রাসাদ বিলুপ্ত হয়, কেবলমাত্র ভগ্ন চত্বরের কয়েকটি অংশ অতীতযুগের সাক্ষ্য প্রামাণ করে। ‘হীরাঝিল’ এখন ইতিহাস।
উপরিউক্ত দ্রষ্টব্য স্থানগুলি ব্যাতীত মুর্শিদাবাদে ওয়াসেফ মঞ্জিল, জাফরাগঞ্জ প্রাসাদ, নশীপুর রাজবাড়ি , কাঠগোলা বাগান, মতিঝিল এবং নবাবী আমলের সমাধিস্থল হিসাবে খোসবাগ, আজিমুন্নেসার সমাধি, জাফরাগঞ্জ মোকবারা, সরফরাজ খাঁর সমাধি, রোশনাইবাগ ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান আছে।
