হাবসী যুগ
৫৪) শাহজাদা বারবাক : (সুলতান গিয়াসউদ্দীন আবুল মুজাফফর বারবাকশাহ) বঙ্গে হাবসীযুগের প্রতিষ্ঠাতা ৮৯৩ হিজরী (১৪৮৭-৮৮ খ্রীঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান বাহলুল লোদী-১৪৫১—১৪৮৯ খ্রীঃ (৮৫৫-৮৯৪ হিঃ)
প্রভুহন্তা শাহজাদা বারবাক সুলতান ফতেহ শাহকে হত্যা করে গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। বঙ্গে হাবসী যুগের সূচনা করেন। রিয়াজ প্রণেতা গোলাম হোসেন, ফিরিস্তা ও ফজলের মতে বারবাক ছিলেন খোজা অর্থাৎ হারেমে নিযুক্ত প্রহরী। অদ্যাবধি তাঁর কোন শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়নি। তবে ৮৯৩ হিজরী সনে দারুনূর, খাজানা, ফতেহবাদ থেকে রৌপ্য এবং স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেন। শাহাজাদা বারবাকের পূর্ণ রাজকীয় নাম—‘গিয়াসউদ্দীন মুজফফর বারবাক শাহ আস সুলতান খল্লাদাল্লাহ মূলকাহু।’
গৌড়নগরের আভিজাত্যাভিমানী হাবসী, ওমরাহ ও অমাত্যগণ নপুংসক বারবাকের সুলতান রূপে সিংহাসনে আসীন হওয়া মেনে নিতে পারেন নি, তাই তাঁরা তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করার পরিকল্পনা করে থাকবেন। তারই ফল স্বরূপ স্বল্পকাল মধ্যেই প্রয়াত সুলতান ফতেহ শাহর অপর এক হাবসী রাজকর্মী মালিক আন্দিল (ফিরোজ) কর্তৃক বারবাক শাহ প্রাসাদ মধ্যে নিহত হন।
গিয়াসউদ্দীন বারবাক শাহ ৮৯৩ হিজরী সনে গৌড়ের সুলতান হন। পূর্ববর্তী সুলতান প্রদত্ত শেষ লিপি (ব্রিটিশ মিউজিয়াম) হিজরী সন ৮৯৩। বারবাক শাহ ৮৯২ হিজরী সনে প্রচলিত বিশেষ করে খাজনাহ থেকে মুদ্রিত অস্পষ্ট এক মুদ্রার প্রচারকাল গবেষকগণের গবেষণার মধ্যে আছে। যদি বারবাক শাহর ৮৯২ হিজরী মুদ্রাপাঠ সঠিক হয় তবে সে ক্ষেত্রে শাহজাদা বারবাক অন্য হাবসীদের মত বিদ্রোহী হয়ে ফতে শাহর রাজ্যে কোন অংশ অধিকার করে মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। সে ক্ষেত্রে এযাবৎ তাঁর ক্ষমতাগ্রহণের বিবরণ কল্পকাহিনী হয়ে যাবে। একথা ঠিক আবিষ্কৃত ঐতিহাসিক উপাদান পূর্ববর্তী গ্রন্থের আলোচিত সুলতানদের পরিচয়, শাসনকাল নতুন ভাবে বিন্যাস করতে পারে।
(৫৫) মালিক আন্দিল (সুলতান সাইফুদ্দীন আবুল মুজাফফার ফিরোজ শাহ) :
৮৯৩-৮৯৬ হিঃ (১৪৮৭-৮৮—১৪৯০-৯১ খ্রীঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান বাহলুল লোদী-৮৫৫-৮৯৪ হিঃ (১৪৫১—১৪৮৯ খ্রীঃ)
(১৪৮৯ খ্রীষ্টাব্দে গোয়ালিয়র বিজয়ের পর দিল্লী প্রত্যাবর্তনের পথে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ)।
• সুলতান নিজাম খান সিকান্দার—৮৯৪-৯২৩ হিঃ (১৪৮৯-১৫১৭ খ্রীঃ) বাহলুল লোদীর পুত্র।
মালিক আন্দিল নামক এক হাবসী ফতে শাহর হত্যাকারী বারবাক শাহকে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য হত্যা করে গৌড়ের রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন (৮৯৩ হিঃ)। ইতঃপূর্বে তিনি সুলতান ফতে শাহর রাজত্বকালে বিদ্রোহী হয়ে রাজকীয় উপাধি গ্রহণ পূর্বক মুদ্রা ও লিপি প্রকাশ করেন। তাঁর পূর্ণ রাজকীয় নাম ‘সৈফ-উদ-দুনিয়া ওয়াদ-দীন আবুল মুজাফফর ফিরোজ শাহ আস সুলতান খল্লাদাল্লাহু মুলকাহুওয়া সুলতানাহু।’ তাঁর প্রচলিত মুদ্রা (রৌপ্য ও স্বর্ণ) ৮৯২, ৮৯৩, ৮৯৪, ৮৯৫ এবং ৮৯৬ হিজরীতে প্রকাশিত হয়। মুদ্রাগুলি ফতেহবাদ, মাহমুদাবাদ, দারুনূর, ফিরোজাবাদ, বারবাকাবাদ, মুয়াজ্জমাবাদ এবং খাজানা থেকে মুদ্রিত হয়।
ফিরোজ শাহর এ যাবৎ সাতটি শিলালেখ আবিষ্কৃত হয়েছে যথা—
১। বিরল, দিনাজপুর লিপি ১২ই জামাদিউল সানি, ৮৮৯ হিঃ (জুলাই ১৪৮৪)।
২। কাটরা, পুরাতন মালদহ লিপি।
৩। গড়-জরিপা, শেরপুর-ময়মনসিংহ লিপি—৪ঠা মহরম ৮৯৩ হিঃ (২০ ডিসেম্বর ১৪৮৭) আয়তন ৪ ফুট x ২ ফুট।
৪। আকালিয়াহ, সিলেট লিপি ৮৯৩ হিঃ (১৪৮৭-৮৮ খ্রীঃ)।
৫। গোয়ামালতী, কাঞ্চানটাঁড়, গৌড় লিপি ১৫ই সফর-৮৯৪ হিঃ (জানুয়ারী, ১৪৮৯)।
৬। চুনাখালি, মুর্শিদাবাদ লিপি-২রা মহরম ৮৯৬ হিঃ (১৫ই নভেম্বর ১৪৯০ খ্রীঃ)।
৭। উপরিউক্ত ছয়টি শিলালিপি ছাড়া গোয়ামালতীতে প্রাপ্ত ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংগৃহীত খণ্ডিত লিপিতে শুধুমাত্র সৈফ-উদ-দুনিয়া-ওয়াদ-দীন উৎকীর্ণ আছে।
পূর্ববর্তী সুলতান রুকনুদ্দীন বারবাক শাহ তাঁর রাজত্বকালে তাঁর নিজের এবং পুত্র-পৌত্রদিগের রাজসিংহাসন নিষ্কন্টক করার জন্য তাঁর রাজকার্যে ও সেনা বাহিনীতে আট হাজার হাবসী নিয়োগ করেছিলেন। কালান্তরে হাবসীগণ প্রবল-পরাক্রান্ত হয়ে ওঠেন। সুলতান ফতেহ শাহ হাবসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বেশ কিছু হাবসী অসন্তুষ্ট হন। হাবসী মালিক আন্দিল বিদ্রোহী হয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলে একটি ক্ষুদ্র অংশের নৃপতি হন এবং ক্রমে তিনি পূর্ববঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করেন এবং স্বাধীন রাজার ন্যায় মুদ্রা ও শিলালিপি মুদ্রণ করেন। ৮৯২ হিজরীতে পিতা ও পুত্রের উৎকীর্ণ মুদ্রাতে তিনি তাঁর পুত্র মাহমুদ শাহকে রাজ্যশাসনে অংশীদার করেছিলেন। অনুরূপ ভাবে সিদিবদর (মুজাফফার শাহ) নামে ফতে শাহর এক রাজকর্মী বিদ্রোহী হয়ে রাজ্যের কোন অংশে স্বঘোষিত সুলতান রূপে অধিষ্ঠিত হয়ে ৮৯২, ৮৯৩ হিজরীতে মুদ্রা প্রচলন করেন।
সম্ভবত মালিক আন্দিল (ফিরোজ শাহ) বারবাক শাহকে হত্যা করার পরিকল্পনা গ্রহণের সময় সিদিবদরের সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন, কেননা সিদিবদরের ৮৯৩ হিজরীর পরে এবং ৮৯৬ হিজরীর পূর্বে (অর্থাৎ ফিরোজ শাহর রাজত্বকালে) কোন মুদ্রা বা লিপি দেখা যায় না। ফিরোজ শাহও গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করে অনুগত সিসিবদর দিওয়ানাকে রক্ষীদের প্রধান হিসাবে নিয়োগ করেন। সুলতান সাইফুদ্দীন প্রাপ্ত ও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত সাইফউদদুনিয়া-ওয়াদদীন ফিরোজ শাহর খণ্ডিত শিলালিপিটি আবিষ্কারে একটি নতুন অনাবিষ্কৃত তথ্যের উন্মোচন হয়েছে। এই লিপিমূলে আমরা হাবসী সুলতানগণের মধ্যে কেবলমাত্র সুলতান ফিরোজ শাহকেই ‘খলীফৎ আল্লাহো-বিল-হুজ্জতে ওয়াল বুরহান’ অর্থাৎ দলিল ও সাক্ষ্য মতে আল্লাহ্র খলিফা এই উপাধি গ্রহণ করতে দেখলাম। ইতঃপূর্বে পরবর্তী ইলিয়াসশাহী বা মামুদশাহী বংশের সুলতানগণ এই উপাধি গ্রহণ করেছেন। তৎপূর্বে ধর্মান্তরিত জালালুদ্দীন মহম্মদ শাহ (গণেশ পুত্র যদু) নিজেকে উলেমাবর্গ, সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নী সম্প্রদায় ও মুসলিম জাহানের সমর্থনের জন্য ‘খলীফৎ আল্লাহ্’ উপাধি ব্যবহার করেছিলেন, অনুরূপ ভাবে কৃষ্ণবর্ণ হাবসী হওয়ার কারণে ফিরোজ তাঁর গ্রহণযোগ্যতাকে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করার জন্য ‘দলিল সাক্ষ্য মতে আল্লাহ্র খলিফা’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়।
হাবসী সুলতান সাইফুদ্দীন ফিরোজশাহ কর্তৃক প্রচলিত প্রাপ্ত মুদ্রা ও লিপি সাক্ষ্যে তাঁর বিদ্রোহীকালীন সময় বাদ দিয়ে ৮৯৩-৮৯৬ হিজরী পর্যন্ত গৌড়ের রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ৮৯৬ হিজরী (১৪৯০ খ্রীঃ) তে মৃত্যুবরণ করেন অথবা রাজনৈতিক যড়যন্ত্রে পাইকগণের হাতে নিহত হন। সম্ভবতঃ সিদিবদর আনুগত্যের পুরস্কার স্বরূপ সুলতান ফিরোজ শাহ কর্তৃক ‘উজীর’ পদ না পেয়ে ‘রক্ষীদের প্রধান, পদে সন্তুষ্ট ছিলেন না। মনে মনে রুষ্ট সিদিবদর রক্ষীদের প্রধান হিসাবে সুলতান ফিরোজের হত্যাকাণ্ডের গুপ্ত মন্ত্রণায় সংশ্লিষ্ট হন।
৫৬) সুলতান কুতুবউদ্দীন মাহমুদ শাহ : ৮৯৬ হিজরী (১৪৯০-৯১ খ্রীঃ)।
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান নিজাম খান সিকেন্দার-১৪৮৯-১৫১৭ খ্রীঃ (৮৯৪-৯২৩ হিঃ)।
সুলতান ফিরোজ শাহ হাবসী হলেও নপুংসক ছিলেন না। ফিরোজ শাহর মৃত্যুর পর তাঁর অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান মাহমুদ শাহকে গৌড়ের ওমরাহ ও উজীরগণ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন এবং হাবস খান নামক এক হাবসী উজীরকে সুলতানের রাজপ্রতিনিধি (Regent) নিযুক্ত করেন। ক্রমে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক উভয় ক্ষেত্রেই হাবসী হাবস খানের ক্ষমতা ব্যাপক হয়ে উঠে। বস্তুত মাহমুদ শাহ সুলতান উপাধি ছাড়া ক্ষমতাহীন ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে উজীর হাবস খান ও অপর এক হাবসী উজীর সিদিবদর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। সিদিবদর হাবস খানকে হত্যা করে নিজে রাজক্ষমতা গ্রাস করেন এবং পাইকদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুলতান মাহমুদকে হত্যা করে রাজ সিংহাসন অধিকার করেন।
সুলতান মাহমুদ শাহর রাজত্ব এক বছরের কম সময় স্থায়ী ছিল। তাঁর পূর্ববর্তী সুলতান ফতেহ শাহর রাজত্বকালে তাঁর নামে উৎকীর্ণ ৮৯২ হিজরীর মুদ্রা ছাড়া গৌড়েশ্বর হবার পর ৮৯৬ হিজরীর মুদ্রা আবিষ্কার হয়েছে। মুদ্রায় তাঁর পূর্ণ রাজকীয় নাম ও পিতৃপরিচয় ‘কুতুব-উদ-দুনিয়া ওয়াদ-দীন আবুল মুজাহিদ শাহ আস সুলতান ইবন ফিরোজ শাহ আস সুলতান’ উৎকীর্ণ আছে। এ যাবৎ তাঁর উৎকীর্ণ কোন শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়নি।
৫৭) সিদিবদর দিওয়ানা : (সুলতান শামসুদ্দীন মুজফফর শাহ)-৮৯৬ হিঃ (১৪৯১ খ্রীঃ)—৮৯৯ হিঃ (১৪৯৩-৯৪ খ্রীঃ)
সমকালীন দিল্লীর সুলতান—
• সুলতান নিজাম খান সিকেন্দার ৮৯৪-৯২৩ হিঃ (১৪৮৯-১৫১৭ খ্রীঃ)
৮৯৬ হিজরী সনে সিদিবদর দিওয়ান সামসুদ্দীন মুজফফর শাহ নাম ধারণপূর্বক গৌড়ে রাজ সিংহাসনে আরোহণ করে উক্ত বর্ষে রাজ্যাভিষেক স্মরণে স্বর্ণমুদ্রা প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী সুলতান ফতেহ শাহ (৮৮৬-৮৯৩ হিঃ) র শাসন কালে শাসন অমান্য করে ৮৯২,৮৯৩ হিজরীতে মুদ্রা জারি করেন এবং গৌড়েশ্বর হয়ে ৮৯৬-৮৯৮ হিজরী পর্যন্ত মুদ্রা প্রচলন ও শিলালিপি উৎকীর্ণ করেন।
হাবসী সুলতান মুজফফর শাহর রাজত্বকালে উৎকীর্ণ বেশ কিছু শিলালিপি বিভিন্নস্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে। যথা—গঙ্গারামপুর-৮৯৬ হিঃ, ভাগলপুর-৮৯৭ হিঃ, কালনা ৮৯৭ হিঃ পাণ্ডুয়া-হিজরী বিহীন, মহদীপুর ২০ শাবান-৮৯৭ হিঃ* , মালদহ ম্যজিস্ট্রেট কুঠি-১০ রবিউল আওয়াল ৮৯৮ হিঃ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ-৮৯৮ হিঃ এবং পাণ্ডুয়ার ছোট দরগাহ ১৭ই রমজান ৮৯৮ হিঃ (২রা জুলাই ১৪৯৩ খ্রীঃ)।
সুলতান মুজফফর শাহর প্রচলিত মুদ্রা এবং উৎকীর্ণ লিপি মূলে তাঁর রাজকীয় উপাধিসহ নাম ‘সামসুদ্দীন আবুল নসর মুজফফার শাহ’ জানা যায়। কিন্তু তাঁর বিদ্রোহকালীন ৮৯২ হিজরীর মুদ্রা তাঁর রাজকীয় উপাধি (লাকাব) সৈফ-উদ-দীন লক্ষ্য করা গেছে। **
সুলতান মুজফ্ফর শাহর ৮৯৮ হিজরীতে প্রকাশিত ‘কামতা মর্দন’ মুদ্রার মূখ্য পিঠে মুজফ্ফর শাহ আস সুলতান খাল্লাদা আল্লাহ্ মুলকাহু ওয়া সুলতানাহু কামতা মর্দন, সানাতা-৮৯৮ (হিঃ)’ উৎকীর্ণ আছে। সম্ভবতঃ হোসেন শাহ সুলতানের কামতা অভিযানে বিশেষ অবদান রাখেন, তাই হোসেন শাহ সুলতানের উজির পদে উন্নীত হন। অনুমিত হয় মুজফফর শাহর কামতা বিজয় ১৭ ই রমজান ৮৯৮ (পাণ্ডুয়া লিপি) এর পরে সংগঠিত হয়েছিল। কারণ উক্ত তারিখের পূর্বে কামতা বিজয় ঘটে থাকলে তাঁর শিলালিপি প্রশংসা ব্যঞ্জক লিপিগৎ-এ ‘কামতা-বিজয়ী’ এই উপাধি উল্লেখ থাকত। তাই দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় ১৭ রমজান (হিজরী সনের নবম মাস) ৮৯৮-এর পরে এই সমর অভিযান সংগঠিত হয়েছিল এবং যুদ্ধ শেষে বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আলোচ্য স্মারক মুদ্রা প্রচলিত হয়।
সম্ভবতঃ এই অভিযান শওয়াল মাসে সংগঠিত হয়েছিল,কারণ কোরাণ মতে সম্মানিত চারিমাস (জেলকদ, জেলহজ্জ, মহরম ও রজব) যুদ্ধ করা ভীষণ পাপ ও রক্তপাতকে হারাম রূপে উল্লেখ করা হয়। তাই শরীয়তের আইনে উক্ত বর্ষে রমজান মাসের পরে শওয়াল মাসেই ‘কামতা বিজয়’ সম্ভব।
কামতা বিজয়ের পরে সুলতান মুজফফর শাহ নিজ রাজ্যে বিদ্রোহের সম্মুখীন হন। প্রাসাদ মধ্যে দীর্ঘ চারমাস কাল ব্যাপী অবরুদ্ধ থাকার পরে উজীর হোসেন শাহ বিরোধী পক্ষ অবলম্বন করে পাইকগণের সহায়তায় সুলতান মুজফফার শাহকে হত্যা করেন। এই হত্যা-কাণ্ড ৮৯৯ হিজরী সনের প্রথমার্দ্ধে সংগঠিত হয়েছিল বলে মনে হয়। সুলতান মুজফফর শাহর মৃত্যুর সঙ্গে বঙ্গে হাবসীযুগের অবসান হয়।
.
* Commemorative inscription of a Mosque in Gour (897 A.H. /1492 A.D.) Collected and preserved at Gour Social Welfare Mission Museum, Mahadipur, Malda, WB.
Material-Black basalt, Size-20”10″, Language of the Inscription–Arabic.
** সামসুদ্দীন মুজফফার শাহর বিদ্রোহীকালীন ৮৯২ হিজরীতে খাজানা থেকে প্রচলিত (গোরেন ও গোয়েঙ্কার ক্যাটালগে মুদ্রিত) মুদ্রাতে তাঁর রাজকীয় উপাধি (লাকাব) ‘সৈফ-উদ-দীন’ উৎকীর্ণ হয়েছে। ইতঃপূর্বে আমরা আলাউদ্দীন আলী মর্দান খিলজীর (৬০৬-৬১০হিঃ) একটি স্বর্ণ ও তিনটি রৌপ্য মুদ্রাতে (সৈয়দ এজাজ হোসেনের গ্রন্থ) তাঁর লাকাব ‘রুকন-উদ-দীন’ উৎকীর্ণর কথা জেনেছি। আবার তুঘরল খানের (৬৭৮-৬৮১হিঃ) রাজকীয় উপাধি (লাকাব) বিষয়ে বারণী (তারিখ-ই-ফিরোজশাহী) তে ‘মুগীসউদ্দীন’ এবং ইয়াহিয়া (তারিখ-ই-মুবারকশাহী) তে ‘মঈজুদ্দীন’ উল্লেখ করেছেন। বারণী সমসাময়িক হবার জন্য তুঘরলের রাজকীয় উপাধি ‘মুগীসউদ্দীন’ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে মুদ্রা সাক্ষ্যে তাঁর রাজকীয় উপাধি ‘মঈজুদ্দীন’ মান্যতা পেয়েছে। কিন্তু আলীমর্দান (৬০৬-৬১০ হিঃ) এবং মুজফফর শাহর (৮৯৬-৮৯৯ হিঃ) রাজকীয় উপাধির ভ্রান্তি কি লিপিকারের অনবধান বশত ভুল, না সুলতানের ইচ্ছায় হয়েছিল, এই রহস্য উদ্ঘাটন করা দুরূহ।
