গৌড়-বঙ্গ পূর্ব কথা
গৌড়ের সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রীস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীর শ্লোকে (অরিষ্ট গৌড় পূর্বে চ)। কিন্তু প্রাচীন কালে কোন স্থান থেকে পূর্বদেশ ধরা হত তা বিবেচ্য। বঙ্গ দেশের গৌড় এবং পাণিনির গৌড় অভিন্ন কি না সেই বিষয়ে মতভেদ আছে।
পদ্মপুরাণে গৌড়দেশের উল্লেখ আছে, রাজা ছিলেন নরসিংহ। বাৎস্যায়নের কামসূত্রে গৌড়কন্যাদের বর্ণনা প্রসঙ্গে গৌড়ের উল্লেখ আছে (মৃদুভাষিণ্যোনুরাগবত্যো মৃদঙ্গশ্চ গৌড়ং)। মুরারি মিশ্রকৃত ‘অনর্ঘরাঘব’ নামক সংস্কৃত নাটকে চম্পাকে গৌড়ের রাজধানী বলা হয়েছে। কৃষ্ণমিশ্রের ‘প্রবোধ চন্দ্রোদয়’-এ গৌড়ের উল্লেখ আছে। ষষ্ঠ শতাব্দীর বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতায় পুণ্ড্র, তাম্রলিপ্ত, সমতট, বর্ধমান, বঙ্গ প্রভৃতি জনপদের সঙ্গে গৌড়জনপদ (গৌড়ক) উল্লেখিত হয়েছে। বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ এবং হিউ-এন-সাঙের (Yuan chawng) বিবরণে শশাঙ্ককে গৌড়াধিপ বলা হয়েছে। কবিবর কহ্লন প্রণীত রাজতরঙ্গিনীতে জানা যায় কাশ্মীররাজ ললিতাদিত্যের পৌত্র রাজা জয়াপীড় দিগ্বিজয়ে বিরত হয়ে কনৌজ থেকে ছদ্মবেশে পৌণ্ড্রবর্ধনে প্রবেশ করেন। এই নগর গৌড় রাজ্যের অন্তর্গত। এই সময়ে জয়ন্ত ছিলেন এর রক্ষাকর্তা। রাজতরঙ্গিনীতে উল্লেখ আছে—‘‘ গৌড়রাজ্য শ্রয়ং গুপ্তংজয়ন্তাখ্যেন তূভুজা
প্রতিবেশ ক্রমোনাথ নগরং পৌণ্ড্রবর্ধনম্।। ’’
প্রাচীন লেখমালাতেও গৌড়, গৌড়জন ও গৌড়জনপদের উল্লেখ আছে। যথা—ঈশান বর্মার হরাহা লিপি, গুর্গীলিপি, ভাস্কর বর্মণের নিধনপুর তাম্রশাসন, আফসাদ প্রস্তর লেখ, পাল-সেন যুগের লিপি ইত্যাদি লেখমালাতে।
খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে বৈদিক যুগের শেষের দিকে ভারতবর্ষে ষোলটি আঞ্চলিক রাজ্যের উদ্ভব হয়, যা ষোড়শ মহজনপদ১ নামে পরিচিত। এই ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম ছিল মগধ (দক্ষিণ বিহার)। খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে সমগ্র ভারতে নগরায়ণের সূত্রপাত হয়ে চতুর্থ শতাব্দীতে পরিণতি লাভ করে। তৎকালে গৌড় নগরের আবির্ভাব হয়েছিল ক্রমশঃ বিকাশশীল মগধ সাম্রাজ্যের মধ্য থেকে।
খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে গুড় উৎপাদনের কেন্দ্র হিসাবে গৌড়ের উল্লেখ আছে। ‘গৌড়’ শব্দটি ‘গুড়’ থেকে এসেছে। গুড় উৎপন্ন হয় ইক্ষু থেকে। আবার ‘পুণ্ড্র’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ইক্ষু যা থেকে গুড় প্রস্তুত হয়ে থাকে। এই গৌড়পুর ও পৌণ্ড্রনগরের নামের উৎসের মধ্যে নৈকট্য লক্ষ্যণীয়। পুণ্ড্রদেশ ইক্ষু বিশেষের উৎপত্তির জন্য বিখ্যাত ছিল। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা প্রাচীন গ্রন্থ ঋগ্বেদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণে শুনঃশেফের কাহিনীতে বিশ্বামিত্র অভিশপ্ত পুত্রদের সন্তানেরা যে সমস্ত নামে পরিচিত হয়েছিলেন পুণ্ড্র তাঁদের অন্যতম। সংস্কৃতি অভিমানী বৈদিক আর্যদের দৃষ্টিতে তাঁরা ছিলেন দস্যুজাতীয়।
আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতাব্দীর বোধায়নের ধর্মসূত্রের বিধান মতে পুণ্ড্রও বঙ্গদেশ ভ্রমণ করলে প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ পুণ্যস্তোম-যজ্ঞ করার কথা বলা আছে। মহাভারত ও মনুসংহিতাতে পুণ্ড্রের উল্লেখ আছে। শ্রীমদ্ভাগবতের নবম স্কন্ধে ভরত রাজার পুণ্ড্রদেশ জয়ের উল্লেখ আছে।
মহাস্থানগড়ে মৌর্য যুগের প্রস্তরখণ্ডে উৎকীর্ণ ব্রাহ্মী লিপি ও বাণগড়ে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্বিক উপাদানের ভিত্তিতে বলা যায় পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের বসতি প্রাক-মৌর্য যুগের। খ্রীস্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দীতে পুণ্ড্রদেশ গুপ্ত রাষ্ট্রের একটি প্রধান ভুক্তিতে পরিণত হয়। বাণভট্টের হর্ষচরিতে পৌণ্ড্রাবাস (পুণ্ড্রদেশের রেশমী বস্ত্র) এর উল্লেখ আছে। চীনা পরিব্রাজক হিউ-এন-সাঙ (Yuan chang) সপ্তম শতাব্দীর প্রথমভাগে (৬২৯-৬৪৫ খ্রীঃ) ভারতের নানা দেশে পর্যটন কালে গৌড়াধিপ শশাঙ্কের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে এই বাংলাতে আগমন করেন। তৎকালে গৌড়-বঙ্গদেশ, মুঙ্গের, চম্পা, কজঙ্গল, পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট, তাম্রলিপ্ত ও কর্ণসুবর্ণ এই কয়েকটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল। চৈনিক পরিব্রাজক পুণ্ড্রবর্ধনের নাম পু-ণ্ন-ফ-ত-ন্ন লিখেছেন। তাঁর বর্ণনানুসারে গঙ্গা ও করতোয়ার মধ্যবর্তী ভূভাগ ছিল পুণ্ড্রবর্ধন।
পুণ্ড্র একটি প্রাচীন জাতিমূলক নাম। পুণ্ড্ররা উত্তরবঙ্গে বাস করত তাই এই অঞ্চল পুণ্ড্রদেশ বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে খ্যাত হয়। যে খণ্ডরাজ্য একসময় পৌণ্ড্র নামে চর্চিত ছিল, তা অন্যসময় গৌড় নামে কীর্তিত হয়। পৌরাণিক যুগে অঙ্গ, বঙ্গ, প্রবঙ্গ, উপবঙ্গ, ভার্গব, অন্তর্গিরি, বহির্গিরি, তঙ্গন, বরেন্দ্র, রাঢ়, সুহ্ম, প্রসুহ্ম, প্রবিজয়, কৌশিকীকচ্ছ, ব্রহ্মোত্তর, কর্ব্বট, গৌড়ক, জ্যোতিষ, কান্তার প্রভৃতি বহুরাজ্যে আধুনিক বঙ্গদেশ বিভক্ত ছিল। পাল রাজাদের সময় সম্পূর্ণ রাজ্য গৌড়ের অধীন হয়।
অনেকে মনে করেন প্রাচীন কাল থেকেই উত্তর-পশ্চিমবঙ্গ গৌড় বলে পরিগণিত হত। খ্রীস্টীয় সপ্তম শতাব্দী ও তৎপরবর্তী কালে গৌড় বলতে সমগ্র বঙ্গ এবং গৌড়জন বলতে সমগ্র বঙ্গবাসীকে বোঝাত। কবি শ্রীমধুসূদন দত্ত লিখেছেন-‘গৌড়জন যাহে আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি’’ (মেঘনাদবধ কাব্য)। এখানে কবিবর গৌড়জন বলতে বাঙালী মাত্রকেই বুঝিয়েছেন।
প্রাচীনকালে বাংলা নামে নির্দিষ্ট কোন স্থান ছিল না, এক এক অংশ ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত হত। ঐতরেয় আরণ্যকে প্রথম ‘বঙ্গ’ নাম পাওয়া গেছে যেখানে বঙ্গজনেরা আর্যদের নিকট দুর্বোধ্য ভাষার পক্ষী (বায়স) জাতীয় বলে বিবেচিত হতেন (‘বয়াংসি বঙ্গাবগধাশ্চের পাদাঃ’)। একদা ব্রহ্মাবর্তের মহর্ষিকুল অঙ্গ-বঙ্গবাসী আর্যেতর নরগোষ্ঠীর প্রতি অতিশয় ঘৃণ্য ধারণা পোষণ করতেন।
‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ রচনার কালে উত্তরাপথের পশ্চিমাংশ আর্যগণ কর্তৃক বিজিত এবং মিথিলায় উপনিবেশ স্থাপনার বহুকাল পরেও বঙ্গ ও মগধ আর্য অধিকারের বাইরে ছিল। তৎকালে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সৌরাষ্ট্র ও মগধ তীর্থযাত্রা বিনা অন্য কারণে গমন পাতিত্যদোষে দুষ্ট হেতু পুনঃসংস্কারের আবশ্যক হত।
‘অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গেষু সৌরাষ্ট্র মগধেষু চ।
তীর্থযাত্রাং বিনা গচ্ছন পুনঃসংস্কারমর্হতি।।’
পুণ্ড্রদের মত বঙ্গজনেরাও আর্যদের দৃষ্টিতে অ-সংস্কৃত ছিল।
রামায়ণেও বঙ্গের নাম উল্লেখিত আছে। পুরাণানুসারে রামায়ণের রচনাকাল খ্রীঃ পূর্ব ২০০০ বৎসর। রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ড থেকে জানা যায় বঙ্গজন অযোধ্যাপতির প্রভুত্ব মেনে নিয়েছিলেন। তৎকালে অঙ্গ, বঙ্গ, কাশী, কোশল, প্রভৃতির রাজারা অযোধ্যাপতির অধীনে ছিলেন। মহাভারতের আদিপর্বে মৎস্যপুরাণে ও বায়ুপুরাণের পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে ঊর্ধ্বরেতা অপুত্রক রাজা বলির অনুরোধে দীর্ঘতমা নামে এক অন্ধ আর্যঋষি কর্তৃক রাজমহিষীর গর্ভে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুহ্মক ও পুণ্ড্রক নামে পাঁচ পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। যথাসময়ে রাজা বলি পাঁচ ক্ষেত্রজ পুত্রর মধ্যে স্বীয়রাজ্য ভাগ করে বানপ্রস্থ অবলম্বন করলে পাঁচ পুত্রর পাঁচটি রাজ্য তাঁদের নামানুসারে অভিহিত হয়।
খ্রীস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর পাণিনীয় ভাষ্য রচনাকালে খ্রীঃপূর্ব দ্বিতীয় বা প্রথম শতাব্দীর মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি রাজা বাচক অস প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন ‘আঙ্গ’, ‘বাঙ্গ’, দুটি শব্দের উদাহরণ দিয়েছেন আঙ্গ অর্থাৎ অঙ্গরাজ এবং বাঙ্গ অর্থাৎ বঙ্গরাজ।
বঙ্গের ইতিহাসের আদিপর্বের সূচনাতে আলেকজাণ্ডারের ভারত অভিযানের বিবরণে গ্রীক ও ল্যাটিন লেখকগণ খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে পূর্বভারতে দুটি জনপদ-গঙ্গারিদি (Gangaridai) ও প্রাসিয়য় (Prasioi) এর উল্লেখ করেছেন। প্রাসিয়য় সংস্কৃত ‘প্রাচ্যাঃ’ থেকে উদ্ভূত বলে মনে হয়। প্রাসিয়য় অর্থে পূর্বদিকের অধিবাসীদের এবং গঙ্গারিদি অর্থে গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীদের বোঝানো হয়েছে। ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে—গঙ্গানদী দ্বারা ঋদ্ধ বা সমৃদ্ধ যে দেশ, সেই দেশ গঙ্গারিদি। প্রাসিয়য়ের রাজধানী ছিল প্যালিবোথরা (পাটলিপুত্র)। সেই ক্লডিয়স টলেমিয়স (টলেমি)-র ভূগোল (Geographike) থেকে জানতে পারি যে, যে রাজ্যের রাজধানী ছিল পরিবোখরা, তার বিস্তৃতি ছিল সমুদ্রোপকূলে তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত এবং তাম্রলিপ্তের পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল গঙ্গারিদি। গ্রীক ও ল্যাতিন লেখকদের বিবরণ থেকে মনে হয় গঙ্গারিদি জাতি ও জনপদের অবস্থান বাংলায় এবং প্রাসিয়য় জাতি ও জনপদের অবস্থান প্রাচীন মগধে।
খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে গ্রীস অন্তঃপাতী ম্যাসিডনের বিখ্যাত রাজা আলেকজাণ্ডার ভারত বিজয়ে অগ্রসর হয়ে রাজা পুরুর সঙ্গে যুদ্ধের পর মগধ রাজ্য আক্রমণের অভিলাষী হয়ে বিপাশা নদীর তীরে এসে সংবাদ পান গঙ্গারিদি ও প্রাসিয়য় নামে দুইটি পৃথক জাতি পৃথক জাতিসত্তা বিসর্জন দিয়ে নন্দ রাজ্যের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আলেকজাণ্ডারের জন্য অপেক্ষা করছেন। অনন্তর আলেকজাণ্ডার যুদ্ধে বিরত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সমকালীন গ্রীক ও ল্যাতিন লেখনীর সাক্ষ্যে গঙ্গারিদি নামে এক পরাক্রান্ত জাতির উল্লেখ পাই।
আলেকজাণ্ডারের প্রত্যাবর্তনের পরে নন্দবংশীয় ধনানন্দকে পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য চাণক্যের সহযোগিতায় উত্তর ভারতে এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মৌর্য-বংশের প্রতিষ্ঠা করেন (৩২৪ খ্রীঃপূর্বাব্দ)। অনুমান ১৮৫ খ্রীঃপূর্বাব্দে শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মৌর্য শাসনের অবসান ঘটান।
মনে হয় নন্দ-মৌর্য-শুঙ্গ যুগের রাজঅধিকার মগধের পূর্বসীমা অতিক্রম করে বঙ্গদেশে কখনও কখনও অংশত বিস্তার লাভ করেছিল। পরবর্তীকালে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে কুষাণ জাতি প্রভুত্ব স্থাপন করে। তাঁদের অধিকার পূর্বে মগধ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকলেও যুগপৎ উত্তরাপথের রাজনৈতিক ইতিহাস বাংলাদেশকেও স্পর্শ করেছিল মনে হয়। কুষাণযুগের পর থেকে গুপ্ত যুগের সূচনা পর্যন্ত তৎকালীন বাংলার ইতিহাস অদ্যাবধি অন্ধকারাচ্ছন্ন। গুপ্তযুগের সূচনা হয় খ্রীস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে।
গুপ্তযুগে গৌড়-বঙ্গ আর্যাবর্তের অন্তর্গত ছিল। হূণ আক্রমণে বিপর্যস্ত গুপ্তরাজাদের ক্ষমতা ক্ষুণ্ণ হলে থানেশ্বরে-পুষ্যভূতি, কোশল বা অযোধ্যাতে-মৌখরী এবং মগধ ও মালবে-পরবর্তী গুপ্ত রাজবংশ প্রবল হয়। মৌখরীগণ পরবর্তীকালে তাঁদের অধিকার বিস্তার করেন। আবিষ্কৃত তাম্রশাসন মূলে দেখা যায় তৎকালে পূর্ববঙ্গে গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাবার দেব নামে রাজাগণ রাজত্ব করতেন। বঙ্গে গুপ্ত শাসনের অবসান হয় খ্রীস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর গোড়ায়, কিন্তু গৌড় গুপ্ত সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ রূপে গুপ্ত শাসনাধীন ছিল ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত। তারপরে ঐ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত গৌড় মৌখরী সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। খ্রীস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর সূচনায় শশাঙ্কের হাত ধরে গৌড় স্বাধীন হয়। শশাঙ্ক নরেন্দ্র গুপ্ত স্বাধীনতা ঘোষণা করে গৌড়াধীপ হন।
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে খ্রীস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে বাংলায় ‘গৌড়’ ও ‘বঙ্গ’ দুটি বিভাগ সৃষ্টি হয়েছিল। গৌড়াধিপ শশাঙ্কের আমলেও গৌড় ও বঙ্গ দুটি প্রধান বিভাগ ছিল। পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গ নিয়ে ‘গৌড়’ এবং পূর্ব ও দক্ষিণবঙ্গ নিয়ে ‘বঙ্গ’।
খ্রীস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত পাল-সেন লিপিমালায় গৌড় ও বঙ্গের একটি সম্পর্ক পাওয়া যায়। পাল যুগে ধর্মপালের সময় থেকে পালরাজারা ‘গৌড়েশ্বর’ উপাধি ধারণ করতেন। মিহির সেনের গোয়ালিয়র প্রশস্তিতে ধর্মপালকে ‘বঙ্গপতি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই শাসক যখন ‘বঙ্গপতি’ ও ‘গৌড়েশ্বর’ রূপে স্বীকৃত হন, তখন গৌড় ও বঙ্গ রাজনৈতিক দিক থেকে সমার্থক হয়ে পড়ে।
পালবংশের পশ্চাতে বাংলাতে সেন যুগ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাঢ়ে প্রতিষ্ঠিত সেন বংশ বঙ্গে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কর্ণাটাগত হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন বর্মা শক্তিকে অপসারিত করে বঙ্গ অধিকার করে নেন। বিজয় সেন যুদ্ধে গৌড়েন্দ্র মদনপালকে গৌড় থেকে উৎখাত করেন, তৎপুত্র বল্লাল সেন গৌড়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে গৌড়বঙ্গে সেন অধিকার দৃঢ় করেন। তৎকালে সমুদ্র থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদ বঙ্গ এবং বঙ্গ থেকে শুরু করে ভুবনেশ্বর পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদ গৌড় বলে বর্ণিত হলেও ভবিষ্যৎকালে গৌড়ের আয়তন সঙ্কুচিত হয়েছে আবার পাঠান আমলে ত্রিপুরা আরাকান ও কামরূপের কিছু অংশ যোগ করে বঙ্গের পুষ্টি সাধিত হয়েছে।
মুসলিম যুগে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (৭৪৩ হিঃ/১৩৪২ খ্রীঃ—৭৫৮ হিঃ/১৩৫৭ খ্রীঃ) লক্ষ্মৌতী, সুবর্ণগ্রাম ও সপ্তগ্রাম এই তিনটি শাসন বিভাগ অধিকার পূর্বক সমগ্র বঙ্গের অধীশ্বর (Ruler of whole Bengal) রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাঁর সময় থেকে ‘বাঙ্গালা’ নাম রাজনৈতিক ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে। দিল্লীর ঐতিহাসিক শামস-ই-সিরাজ আফীফ কৃত ‘তারিখ-ই-ফিরূজশাহী’ গ্রন্থে তিনি ‘শাহ-ই-বাঙ্গালা’ ‘শাহ-ই-বাঙ্গাসীয়ান’ এবং সুলতান-ই-বাঙ্গালা রূপে খ্যাত হন। তখন থেকে লক্ষ্মৌতীর সুলতান ‘বাংলার সুলতান’ এবং লক্ষ্মৌতীর মুসলিম রাজ্য বাংলার মুসলিম রাজ্যে পরিণত হয়।
মোগল যুগে এই মুসলিম রাজ্য ‘সুবে বাংলা’ হিসাবে গণ্য হয়। পরবর্তী পর্বে ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে বাঙ্গালার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। বাংলার দক্ষিণের সাগরটি (পূর্ব সাগর) বঙ্গোপসাগর বা Bay of Bengal নামে পরিচিত হয়।
পূর্বে উল্লেখ করেছি সপ্তম শতাব্দীর সূচনায় গৌড়ে স্বাধীন স্বতন্ত্র অস্তিত্বের সূত্রপাত হয়। বাংলার ইতিহাসে গৌড়াধিপ শশাঙ্ক তাঁর স্বাধীন সার্বভৌম রাজত্বের সূচনা করেন। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে সপ্তম শতাব্দীর সূচনাপর্ব থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ্বের সূচনাতে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত বাংলার রাজা, শাসক, সুলতান, সুবাদার ও নবাবদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এই গ্রন্থে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। গৌড়াধিপ শশাঙ্ককে দিয়ে বাংলার রাজবংশ-পরিক্রমা শুরু হল।
.
১ ষোড়শ মহাজনপদ—(১) কাশী, (২) কোশল, (৩) কুরু, (৪) কম্বোজ, (৫) গান্ধার, (৬) অবন্তী, (৭) অঙ্গ, (৮) অস্মক, (৯) মগধ, (১০) মালব, (১১) মৎস্য, (১২) বৃজি, (১৩) বৎস (১৪) চেদী, (১৫) শূরসেন, (১৬) পাঞ্চাল।

