আদি পর্ব
গঠন পর্ব

হোটেল-চা

হোটেল-চা

রেল চালু হবার বেশ কিছুদিন পর ১৮৯৬ সালে মতান্তরে ১৯১২ সালে ষ্টেশন স্থানান্তরিত হবার আগ পর্যন্ত শহরে থাকা-খাওয়ার কোন হোটেল ছিল বলে জানা যায়না। তবে নতুন ষ্টেশনের লাগোয়া যাত্রী ছানীর দক্ষিণ-পুব কোণে রেল জমিতে জনৈক পাঞ্জাবী হিন্দু একখানা দোতলা টিনের ঘর তুলে প্রথম ‘শালীগ্রাম আর্য্য’ হোটেল নামে একটা খাওয়া-থাকার হোটেল করেন। এ হোটেল ঠিক আবাসিক ধরনের ছিলনা। খাওয়ার বিনিময়ে বিনা ভাড়ায় থাকা বা বিশ্রাম করা যেত। বহুদিন যাবত এই হোটেল সুনামের সাথে পরিচালিত হয়। কয়েক বছর আগে রেল কর্তৃপক্ষ উন্মুক্ত জায়গার প্রয়োজনে হোটেল ঘরটি অপসারণ করলে হোটেলটির অবলুপ্তি ঘটে। শালিগ্রাম হোটেল চালু হবার কয়েক বছরের মধ্যে রেল এলাকার বাইরে ষ্টীমার ঘাটের পুবদিকে দুটি হোটেল নির্মিত হয়। এ সময়ে বরিশাল নিবাসী জনৈক তমিজউদ্দিন ষ্টীমার ষ্টেশন ডেলটা ঘাটের কাছে একটা মুসলিম হোটেল করেন এবং এটাই ছিল শহরের প্রথম মুসলিম হোটেল। কেউ কেউ হোটেলটি গহনা ঘাটের কাছেই ছিল বলে উল্লেখ করেন। প্রকৃত পক্ষে ষ্টীমার ঘাট সরে গেলে হোটেলটি গহনা ঘাটে সরে আসে। এই হোটেলকে কেন্দ্র করে খদ্দের আকর্ষণের অনেক রসাত্মক কথা শোনা গেলেও বর্তমানে নতুন জনসমাগমে এসব কথা তলিয়ে গেছে। বর্তমান শতকের চল্লিশের দশকের প্রথম পাদে হোটেলটি বন্ধ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে শহরের বিভিন্ন স্থানে আরো কয়েকটি মুসলিম হোটেল গড়ে ওঠে। উল্লেখ্য এ সময়ে অধিকাংশ হোটেলে খাওয়ার বিনিময়ে বিনা খরচায় রাত্রে থাকা বা বিশ্রামের ব্যবস্থা ছিল।

রেল চালু হবার পূর্বে চা তৈরী করে বিক্রি করার প্রচলন এ শহরে ছিল না। কলিকাতার একটা ইংরেজ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হুইলার্স কোম্পানী রেল চালু হলে রেলওয়ের প্রত্যেকটি বড় বড় ষ্টেশনে রেল যাত্রীদের জন্যে চা-বিস্কুট-কেক এবং দৈনিক ও মাসিক পত্র-পত্রিকা বিক্রয়ের ভিন্ন দুটি ষ্টল করেন। এই কোম্পানী ষ্টেশনের পুব দিকের যাত্রী ছাওনির মধ্যে প্রথম তৈরী চা-বিস্কুট-কেক পাওরুটী বিক্রির প্রচলন করেন। শহরের সৌখিন চা সেবীরা সকাল-বিকাল পায়ে হেটে ষ্টেশনের এই ষ্টল থেকে চা খেয়ে আসতেন। খুলনা শহরে কলি- কাতায় প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা সরবরাহের প্রথম এজেন্ট নিযুক্ত ছিলেন এই হুইলার্স কোম্পানী। পরে দৈনিক পত্রিকার স্থানীয় এজেন্ট নিযুক্ত হওয়ায় পত্রিকা সরবরাহ ব্যবসা খর্ব হলেও পাওরুটীর ব্যবসা বিভাগকাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল। স্মরণীয় এ সময়ে ইংরেজী শাসন বিরোধী দৈনিক পত্রিকা গুলো রাজনৈতিক কারণে অধিক প্রচারের লক্ষে রাজনৈতিক কর্মীরা প্রচার ও সরবরাহ করতেন।

শহরে চা সেবীর সংখ্যা ও চায়ের প্রসার লাভ করায় ডাক বাংলার মোড়, ক্লে রোড ও কে, ডি, ঘোষ রোডে ধীরে ধীরে চা-বিস্কুট ও চা-মিষ্টির দোকান গড়ে উঠতে থাকে। যতদূর জানা যায় ক্লে রোড ও কে, ডি, ঘোষ রোডের মোড়ের (রেল গেট) বাদিকে “স্বদেশ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার” এবং এর দু’তিন বছর পরে কে, ডি, ঘোষ রোডে “মিষ্টি মুখ” নামে আর একটি চা-মিষ্টির দোকান হয়। সমসময়ে ডাক বাংলার মোড়ে ফুটপাতের উপরে টুটপাড়ার ধীরেন কর প্রথম পান- বিড়ির সাথে চা-বিস্কুটের দোকান করেন।

বাজার মধ্যে ওয়েষ্ট মেকট রোডে কাকুয়া ও ওল্ড বাজার রোডে নদীর পাড়ে মিছরি লাল নামে দু’জন অবাঙ্গালী (মাড়োয়ারী) পূর্বতন ছাতুর ব্যবসায়ের সাথে দু’টি মিষ্টির দোকান করে। এরও দু’বছর পর ক্লে রোডে একজন বাঙ্গালী ও এক জন মাড়োয়ারী দু’টো চা-মিষ্টির দোকান ও বাজারের পশ্চিম পাশে নড়াইল কাছারীর সামনে আরো দুটো মিষ্টির দোকান হয়। উল্লেখ্য নড়াইল কাছারীর পুব পাশে পুরাতন চার্লিগঞ্জের হাটের বটতলায় বহু পূর্ব থেকেই একটা মিষ্টির দোকান ছিল। অনেকে মনে করেন এই দোকানটি চার্লিগঞ্জের হাট থাকাকালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এটাই শহরের প্রাচীনতম দোকান। স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত দোকানটির অস্তিত্ব ছিল। যদিও অনেক খোঁজা-খুঁজি করেও প্রতিষ্ঠাতার নাম গাওয়া যায়নি।

ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকেই শহর মধ্যে পৌর উদ্যানের দক্ষিণ পাশে বি, দে, রোড ও ডাক-বাংলার পাশে কয়েকটি ঢা-মিষ্টির দোকান গড়ে ওঠে। এর মধ্যে বি, দে, রোডে টুটপাড়ার ছাতু কর মহাশয়ের “ক্ষুধাশান্তি” স্থানীয় খরিদার ও তরুণদের দ্বারা বেশ জমে উঠতো। এ ছাড়া মিষ্টি মুখের পাশে “তৃপ্তি নিলয়” ও বিপরীত দিকে “জেন্টস কেবিন” নামে অপর দুটি ও হেলাতলার মোড়ে একটা দোকান হয়।

আলোচিত চা মিষ্টির দোকানগুলোর মধ্যে ক্লে রোড ও বাজার মধ্যের দোকানগুলি ছাড়া অন্য দোকানগুলিতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও খেলোয়াড়দের ভিড় ও আড্ডা হোত বেশী। স্বদেশ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, মিষ্টি মুখ ও জেন্টস, কেবিন কংগ্রেসী নেতা ও কর্মী এবং ডাক-বাংলার পাশের দোকানটিতে ফরওয়ার্ড ব্লক ও কমুনিষ্ট পার্টির কর্মীদের সাথে কিছু স্কুল শিক্ষকও যোগ দিতেন। এই আডডায় মুসলিমলীগ দলভুক্ত জেলা বোর্ড সদস্য ও জনাব আব্দুস সবুর খানও মাঝে মাঝে যোগ দিতেন। এই দোকানটি চল্লিশের দশকের গোড়ার দিক থেকে বরিশালের জনৈক গোপাল দাস কর্তৃক পরিচালিত হোত। পার্কের পাশের দোকান ও ক্ষুধা- শান্তি খেলোয়াড় ও স্থানীয় তরুণদের দ্বারা মুখরিত ছিল।

‘৪৭ এর বিভাগোত্তর কালে মিষ্টি মুখ বন্ধ হয়ে গেলে তার পার্শ্বে তৃপ্তি নিলয়ে জনাব আব্দুল জব্বার ও বাবু বীরেন নাগকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যা আসর শুরু হয় এবং ‘৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর মুসলিমলীগ বিরোধী কর্মীদের কেন্দ্র করে জমে ওঠে।

উল্লেখ্য আলোচিত চা-বিস্কুট ও মিষ্টির দোকানগুলির মধ্যে হেলাতলা মোড়ের দোকানটি অধঃস্তন দ্বারা “সন্ধ্যা রেস্টুরেন্ট” নামে কোন রকমে টিকে থাকা ছাড়া বাকীগুলি অবলুপ্ত হয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও একটা বিষয় স্মরণীয় যে, নির্মাণ কাজের অন্যতম উপকরণ কাঠের ব্যবহারের মধ্যে দেশীয় কাঁঠাল, জাম, সুন্দরী বা পশুরের তেমন প্রচলন ছিলনা। কাঠ চেরাই করার যান্ত্রিক ব্যবস্থাও ছিলনা। এ সময়ে গৃহনির্মাণ ও আসবাব পত্রে শাল, সেগুন কাঠের ব্যবহার ছিল অধিক এবং এই কাঠ বাইরে থেকে রেলপথে আমদানী করে ষ্টেশনের কাছে রেল এলাকায় করাতী দিয়ে চেরাই ও বিক্রি হত। ডাক-বাংলার উত্তর পশ্চিমে যশোর রোডের পাশে রেলের জমিতে এই ধরনের বেশ কয়েকটা কাঠের আড়ৎ বা গোলা ছিল। পরবর্তীতে শাল, সেগুন কাঠ আমদানী বন্দ হওয়ায় আড়ৎগুলি বন্দ হয়ে যায়। পরিবর্তে দেশীয় কাঠের ব্যবহারে নদীর পাড় দিয়ে নতুন করে ব্যবসা জমে উঠে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *