জেলা গঠন / শহর গঠনের প্রথম অবস্থা ও বাস্তচ্যুত
১৮৭৫-৭৬ সালের দিকে বিভিন্ন দিক দিয়ে সুন্দরবনের গুরুত্ব ও ভূমিকা সরকারের কাছে অনুভূত হতে থাকে এবং বাংলার গভর্ণর রিচার্ড টেম্পল সুন্দরবনের অবস্থা সরজমিনে তদন্ত করে অনুভব করেন, সুদূর যশোর বা চব্বিশ পরগণা থেকে সুন্দরবন অঞ্চলের শাসন কার্য পরিচালনা খুবই দুরূহ ব্যাপার। পূর্বেও এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের রাজস্ব ও শাসন ব্যবস্থা নিয়ে সুন্দরবন বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র জেলা গঠনের চিন্তা ভাবনা চলছিল। অপর দিকে, দক্ষিণ বঙ্গের ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াতের দ্রুততার জন্যে রেলপথ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এসব কারণে সুন্দরবন এলাকার শাসন কার্যের সুবিধার্থে ১৮৮২ সালের ২৫ শে এপ্রিল যশোর জেলার খুলনা ও বাগেরহাট মহকুমা এবং ২৪ পরগণা জেলা থেকে সাতক্ষীরা মহকুমাকে পৃথক করে খুলনাকে স্বতন্ত্র জেলায় পরিণত ও মহকুমা সদরে জেলার সদর স্থাপন করা হয়।
ঐ বছরের ১লা জুন মহকুমা সদরে জেলা সদরের কাজ শুরু হয়। প্রথমে জেলার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট হয়ে আসেন মিঃ ডব্লিউ, এম, ক্লে। মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেটের বাসভবনে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের বাসস্থান নির্ধারিত হয়। প্রথম অবস্থায় উন্নীত জেলায় কোন জেলা জজ নিযুক্ত হয়নি। একজন সাবজজ স্থায়ী দেওয়ানী বিচার কাজের জন্যে নিযুক্ত হন এবং মাঝে মাঝে যশোর থেকে জেলা জজ এসে বিচার করতেন। জেলা জজ ও অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তাগণ খুলনায় সার্কিট করতে এসে, যে বাড়ীতে অবস্থান করতেন, সে বাড়ীর নাম হয় “সার্কিট হাউজ”। জেলায় প্রথম সাব জজ নিযুক্ত হন শ্রী ভগবান চন্দ্র চক্রবর্তী রায় বাহাদুর। এই শতকের গোড়ার দিকে বর্তমান আদালত ভবন নির্মিত হলে ১৯০৮ সালে স্থায়ী জেলা ও দায়রা জজ হয়ে খুলনায় আনেন শ্রীশশিভূষণ চৌধুরী।
মহকুমা সদরে জেলা সদর গঠিত হওয়ায় প্রকৃত পক্ষে খুলনা শহরে রূপ নিতে থাকে। যে ক্ষুদ্র পরিসরে মহকুমা সদ্য গঠিত হয়েছিল সে স্থান সহ পার্শ্ববর্তী স্থান সমূহে গ্রাম্য পরিবেশ ভিন্ন শহর পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। জেলা সদর গঠিত হওয়ায় নতুন করে রাস্তা, অফিস, আদালত, সরকারী কর্মচারীদের বাসস্থান ইত্যাদির প্রয়োজনে মহকুমা সদরের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে নদীর পাড় দিয়ে পরিকল্পিত সরকারী এলাকা ও শহর নির্মাণের খসড়া তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু হয়। শহর ও জেলার রাস্তা নির্মাণের কারে জন্যে ১৮৭১ সালের রোড সেস বোর্ড আইনে এই বছরই জেলা রোড সেস বোর্ড গঠিত হয় এবং পদাধিকারবলে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ ডব্লিউ, এম, ক্লে বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত ন। ১৮৮৫ সালে রোড সেস বোর্ড বিলুপ্ত করে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে জেলা বোর্ড গঠিত হয়। জেলা বোর্ডে ও পদাধিকারবলে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট কর্তৃক পরিচালিত হওয়ার বিধান থাকে যতদূর জানা যায় রোড সেস বোর্ড প্রথমে খুলনা শহরের রাস্তা ঘাটের সংস্কার ও নির্মাণ কাজ শুরু করেছিল। জেলা ঘোষণার পর প্রথম অবস্থায় সরকারী কার্যালয়গুলি কাঁচা ও আধ পাকা ঘরে কাজ শুরু করে এবং উনিশ শতকের শেষের দিকে পাকা ভবনাদি নির্মাণ শুরু হয়ে তা বিশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত চলে।
রেজিস্ট্রী অফিস, স্কুল, খেলার মাঠ, কালেক্টরী, আদালত ভবন ও সরকারী কর্মকর্তাদের বাসস্থান ইত্যাদি নির্দিষ্ট সীমার সম্পত্তি সরকারী প্রয়োজনে অধিগ্রহণ কর। হয়। জেলখানা, হাসপাতাল ও পোষ্ট অফিস পূর্বে নির্মিত হওয়ায় এ সময়ে জেলার উপযোগী সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ করা হয়। উল্লেখ্য, সরকারী ব্যবহার্য এলাকা বাদে বাকী জারগা জনসাধারণের থেকে যায়, যা পরবর্তী সময়ে আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে। বলাবাহুল্য আধুনিক সরকার ও সরকারী সংস্থা কর্তৃক শহর বা শহর সংলগ্ন উন্নত ও পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা তৎকালে গঠিত হয়নি। নির্দিষ্ট শহর সীমারেখায় কিছু রাস্তা ও পয়ঃপ্রণালী সাধারণের জন্য নির্মিত হয়। বাকী নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পরবর্তীতে পৌর-সভার উপর অর্পিত হয়।
পরিকল্পিত জেলা সদর নির্মাণে মহকুমা সদরের পশ্চিম দিকের জেলা প্রশাসনিক ভবন ও জেল। বোর্ড এলাকা থেকে তার পশ্চিম দিকে কোতোয়ালি থানা পর্যন্ত বাইতি এবং পরমানিকদের ও আদালত ভবন এলাকা থেকে গঙ্গাচরণ সেনের বাস্তু সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে বাস্তুচ্যুত করা হয়। বাকী মির্জাপুর মাঠের যে অংশ পরিকল্পনাধীন নেয়া হয় যেখানে দু’একটি বুনো পরিবারের বসতি ছাড়া অন্য কোন বসতি ছিলনা। ফলে সামান্য সংখ্যক লোককে বাস্তুচ্যুত করে জেলা সদর ও শহর নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়েছিল। বাস্তুচ্যুত বাইতি ও পরামানিকেরা তাদের পূর্ব বসতির কিছু দক্ষিণ-পশ্চিমে বরদাকান্ত রায়ের জমিতে সেলামী মূলে বন্দোবস্ত নিয়ে পুনঃবসতি গড়ে তোলে। তাদের এ বসতি আজও বাইতি ও পরামানিক পাড়া নামে পরিচিত। সেন পরিবার কোতোয়ালি থানার দক্ষিণ দিকে নতুন করে বসতি গড়েছিলেন এবং বুনোদের যে পরিবারগুলো উচ্ছেদ হয়েছিল তারাও নিকটের স্বগোত্রীয়দের সাথে নিজেদের স্থান করে নিয়েছিল। তবে একটা জেলা সদর ও শহর নির্মাণে যে পরিমাণ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছিল তার তুলনায় একটা রেল লাইন ও ষ্টেশন নির্মাণ করতে গিয়ে যে কতগুণ পরিবারকে উচ্ছেদ হতে হয়েছিল তার সঠিক হিসাব হয়ত আর কোনদিনই দেয়া সম্ভব হবেনা।
জেলা শহর সরকারী এলাকা সহ পুবে রূপসা, উত্তরে ভৈরব, পশ্চিমে রেল এলাকা, দক্ষিণে ফেরিঘাট রোডের অভ্যন্তর ভাগ নিয়ে পরিকল্পনা গৃহীত হয়। প্রকৃতপক্ষে এই এলাকাতেই গড়ে ওঠে জেলা শহর। মূলতঃ শহরটি ১৮৮৪ সালে ঘোষিত খুব না পৌরসভার উত্তর পূর্ব কোণে অবস্থিত ছিল।
