বসতি বিস্তার ও পাড়া গঠন
জেলা গঠিত হবার পর মির্জাপুর মাঠে বসতি স্থাপনে সংকুলান না হলে অন্যান্য আগত বসতিরা আশ-পাশের পতিত ও বসতি ভিটা জমি খরিদ করে নিজেদের বসতি গড়ে তোলে। এসময়ে সম্প্রদায় ও পদবী ভিত্তিক বসতি গড়ে তোলার একটা প্রবণতা দেখা যায়। হিন্দু সম্প্রদায়ের সরকার ও করেরা শহর সংলগ্ন টুটপাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায়, রায় পদবী যুক্ত ব্রাহ্মণেরা পূর্ব বেনেখামারে, এদের পশ্চিমে সংঘবদ্ধভাবে রক্ষিতেরা এবং বেনেখামারের পশ্চিমে পৈ-রা, দক্ষিণে তাদের পাশেই বসু উপাধি যুক্ত কায়স্থরা বসতি ভিত্তিক সীমানা গড়ে তোলেন। রেল লাইন বসানোর ফলে উচ্ছেদকৃত কুণ্ডু ও কর্মকার সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার বর্তমান দোলখোলা মোড়ের দক্ষিণ পূব কোণে কুণ্ডরা, উত্তর পুব কোণে কর্মকাররা নতুন বসতি করে। কর্মকারদের বসতির পূর্ব দিকে অনেক আগে থেকেই কয়েকটি বেনে পরিবারের বাস ছিল। এই বেনে পরিবাররা বেনেখামারের প্রাচীন বেনেদের সরাসরি উত্তর পুরুষ না হলেও তারা যে বেনে সম্প্রদায়ের তা বলার অবকাশ রাখে না। চার্লিগঞ্জের বাজারে এরা অনেকে ব্যবসা করতেন এবং জেলা শহর গঠিত হবার পর উক্ত বাজার সম্প্রসারিত হলেও এরা ব্যবসায়ে ঠিকে ছিলেন ও বেনেতী (মসলা ও ঔষধী দ্রব্য) মালের ব্যবসায়ে একচেটিয়া প্রাধান্য ছিল। পরে বিভিন্ন জায়গা থেকে এই সম্প্রদায়ের অনেকে এসে সম ব্যবসায় যোগ দেন। এদের ব্যবসা কেন্দ্রটি আজও বাজারে বেনেপট্টি নামে পরিচিত থাকলেও তাদের একচেটিয়া প্রভাব আজ আর নেই। বেনেতী মালের ব্যবসায়ী বণিক সম্প্রদায়ের লোকদেরকে সাধারণতঃ গন্ধ বণিক বলে। এছাড়া বাজারের মধ্যে কংস বণিক ও শঙ্খ বণিকদের আলাদা ব্যবসা কেন্দ্র ছিল। এদের অনেকেই বেনেখামারের উক্ত এলাকায় ও তার কাছাকাছি থাকতেন। যাই হোক বেনেদের নতুন বসতির ধারা দেখে মনে হয় বেনেখামারের উত্তরাংশে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর একটা সরল রেখায় এরা বসতি সাজিয়ে নিয়েছিলেন। বর্তমান ইকবাল নগরের অধিকাংশ এলাকা নিয়ে মাঝি পাড়ার সিংহ ভাগ মুসলিম বসতিদের কাছ থেকে বর্তমান শতকের দ্বিতীয় দশকের প্রথম দিকে ডুমুরিয়ার ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণেরা খরিদ করে তৈরী করেন বৃহৎ বাগান বাড়ী। তথাপিও যে সব দরিদ্র মুসলমানরা অভাবের মুখে বাপ-দাদার ভিটে বাড়ী হস্তান্তর করতে চায়নি তাদের বিক্ষিপ্ত বসতি আজও রয়ে গেছে।
এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বেনেখামারের উত্তর-পুবে অর্থাৎ তারের পুকুর পঞ্চবীথি, বি, কে, স্কুল ও ফরাজী পাড়ার পূর্বদিকের বসতি মুসলমানরা অভাবজনিত কারণে জমি বিক্রি করে বেনেখামারের মধ্যে সরে যান। ফরাজী পাড়ার প্রিয়নাথ দাশ তৎকালীন ঘরামী পাড়া, (বর্তমান আগাখান কলোনী, জেলা খাদ্য পরিদপ্তর অফিস, কমিউনিটি সেন্টার ও তার পুব ও দক্ষিণাংশের বাড়ী সমুহ) খরিদ করেন নাজির ঘরামী, কেদার ফকির, এজেল ফকির, মজলিশ শেখ, কেনাই শেষ, হায়দার আলী প্রমুখের বিস্তীর্ণ বসতি এলাকা। এর পূর্বপাশে ছিল বছির উদ্দিন শেখ, মুড়িপট্টির দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল এজার উদ্দিন শেখ, ভোলাই শেখের বাড়ী। পুলিশ ক্লাবের (ডাঃ সতিশ দাসের বাড়ী) জায়গায় ছিল তারা গাজীর বাড়ী এবং বি, কে, স্কুলের জায়গায় ছিল মহিবুল্লা শেখ প্রমুখের বাড়ী।
বর্তমান ঘন বসতিপূর্ণ সল্প পরিসরের বাড়ীর মত নতুন জেলাশহরের বসতি গড়ে ওঠেনি। একদিকে মূল্যের স্বল্পতা—অন্যদিকে তখনকার বসতির রীতি ও সুবিধার কারণে পুকুর-বাগান ও খোলা জায়গা নিয়ে এক একটা পরিবারের বসতি তৈরী হয়েছিল। এভাবে আগত নবীন বসতির পদবী, সম্প্রদায় ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে এলাকা ভিত্তিক নামকরণে পরিচিত হয়। এরই ফলশ্রুতি রায় পাড়া, বসু পাড়া, প্রভাবের গুণে বড় বড় বাড়ীগুলো যেমন টুটপাড়ার, উত্তরে ফকির বাড়ী, বকশি পাড়া, রক্ষিত পাড়া, পৈ পাড়া প্রভৃতি। পরিবারের পদবীর পরিচয়ে পরিচিত হয়। বেনেখামারের কুণ্ডু বাড়ী বা কর্মকার বাড়ী ইত্যাদি। আলোচিত নতুন বসতির পাড়া সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে পুরাতন বসতির এলাকা গুলোও তাদের সম্প্রদায় বা পদবীর ভিত্তিতে নামকরণ করা হয়। টুটপাড়ার নমশূদ্র পাড়া, বেনেখামারের মুসলমান পাড়া, বেনেপাড়া প্রভৃতি। শহর গঠিত হবার সময় থেকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পদবীর লোকেরা যেসব এলাকায় বসতি বিস্তার করে, সে সব এলাকার পূর্ব বসতি অ্যত্র সরে গেলেও গ্রামগুলির মধ্যে সবখানে এ অবস্থা হয়নি। আলোচিত হয়েছে যে ট টপাড়া ও বেনে খামারের উত্তর অংশ, জেলা শহরের দক্ষিণ দিয়ে এ বসতির বিস্তার ঘটেছিল সৰ্বাধিক। কিন্তু গ্রাম দুটির মধ্যে একেবারে যে কোন ব্যতিক্রম হয়নি তা নয়, তবে এ ব্যতিক্রম এতই নগণ্য যা আলোচনার প্রয়োজনে আসেনা। বেনে খামারের উত্তরাংশের মুসলমান অধিবাসীরা একটু দক্ষিণে সরে যে অংশে বসতি সংঘবদ্ধ হয়েছে সে অংশই মুসলমান পাড়া ও টুটপাড়ার পশ্চিমাংশে বেশ কিছু মুসলমানের একত্র বসতি এবং অন্য স্থান থেকে কিছু মুসলমান এখানে এসে বসতি করায় এ অংশের স্থানীয় নাম হয় মিয়াপাড়া। গ্রাম দুটির মধ্যে সব যায়গাতেই মুসলমানদের বসতি পূর্ব থেকে ছড়ান ছিল যার জন্যে অন্য কোন জায়গার অনুরূপ লৌকিক নাম সৃষ্টি হওয়ার অবকাশ পায়নি। স্থান পরিচিতির লৌকিক পদ্ধতি ভিন্ন কিছু ব্যতিক্রম ধর্মী নাম সৃষ্টি হয়। বেনেখামারের উত্তর-পুর্ব কোণের স্থানীয় মুসলমান অধিবাসীদের সাথে নবাগত কিছু বর্দ্ধিষ্ণু পরিবার বসতি স্থাপন করে একযোগে এই এলাকার নাম করণ করেন মৌলবীপাড়া। অধিবাসীদের নির্বাচিত নাম দ্রুত প্রসার লাভ করে এলাক। মৌলবীপাড়া নামে পরিচিত হয়।
অনুরূপ ভাবে জেলা সদরের (সরকারী এলাকা) ঠিক পুব-দক্ষিণ কোণের আবাসিক এলাকায় চাকুরীজীবী ও অন্য পেশার মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য নবগঠিত জনবসতির লোকেরা নিজ উদ্যোগে নাম রাখেন মুন্সীপাড়া। স্থান পরিচিতিতে এনামেই পরিচিত হয়ে গেছে। এখানে অধিক মৌলবী ও মুন্সীদের একত্র বসবাসের জন্য মৌলবীপাড়া বা মুন্সীপাড়া নামকরণ হয়নি। তবে অন্যান্য পাড়া গঠনের সময় কালের তুলনায় মৌলবীপাড়া ও মুন্সীপাড়া কিছুটা বয়ঃকনিষ্ঠ। এ ছাড়াও শহর ও বেনেখামার গ্রাম মধ্যে পেশা ও অবস্থান ভিত্তিক পাড়ারও পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন,—বেনেখামারের মিস্ত্রি পাড়া, মাঝি পাড়া, শহর মধ্যে বাইতি পাড়া, পরামানিক পাড়া ও মধ্য পাড়া। শহরের মূল পরিকল্পনা কালে আবাসিক এলাকার মধ্যাংশ মধ্যপাড়া বলে পরিচিত হয়। সাউথ সেন্ট্রাল রোড ও দীনবন্ধু ঘোষ রোড (হাজী মহসীন রোড) এর সংযোগ স্থানের পার্শ্ববর্তী এলাকা মধ্যপাড়া। অন্যান্য অংশ তখন বিভিন্ন নামে পরিচিত থাকায় সেখানে পূব পাড়া বা দক্ষিণ পাড়া নাম হওয়ার অবকাশ পায়নি।
খুলনা শহর ও শহরতলির সমস্ত পাড়ার নাম একত্র করলে দাড়ায় টুটপাড়া, মিয়াপাড়া, কর পাড়া, সরকার পাড়া, নমশূদ্র পাড়া, বাইতি পাড়া, পরামানিক পাড়া, রায় পাড়া, বেনে পাড়া, বসু পাড়া, বকসী পাড়া, রক্ষিত পাড়া, পৈ পাড়া, মিস্ত্রী পাড়া, মাঝি পাড়া, (অধুনালুপ্ত) শেখ পাড়া, ফারাজী পাড়া, মৌলবী পাড়া, হুন্সী পাড়া, মধ্য পাড়া, মির্জাপুর পাড়া, কালিবাড়ী পাড়া, মুচি পাড়া, ইত্যাদি। এই পাড়ার শহর খুলনায় এত বেশী পাড়া নামে পরিচিত হওয়ার অনুপ্রেরণা প্রাচীন গ্রাম টুটপাড়া, পূর্বের পদবী সমৃদ্ধ বসতি পরিচয় শেখ পাড়া, ফারাজী পাড়া থেকেই সম্প্রসারিত ও সংক্রামিত হয়েছে বলে অনুমিত হয়।
ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে বা তার আগে অন্যান্য শহরগুলিতে পেশা ও কর্মের ভিত্তিতে কিছু কিছু বসতি এলাকার পরিচয় থাকলেও আধুনিক শহর খুলনার মত এত পদবী ও পেশা ভিত্তিক পাড়ার পরিচয় পাওয়া কঠিন। লক্ষণীয় যে বিস্তীর্ণ মির্জাপুর মাঠ, টুটপাড়া ও বেনেখামার গ্রাম মধ্যেই এই সব পাড়ার বিকাশ ঘটেছিল। পার্শ্ববর্তী অন্য যে সব গ্রাম ছিল তার মধ্যে একমাত্র শেখ পাড়ায় কিছু রজক (ধোপা) সম্প্রদায়ের একটা ক্ষুদ্র বসতি এলাকা ছাড়া (যেখানে বর্তমান শেখ পাড়া বাজার) এই পাড়ার প্রবেশ বা নবাগতদের সংঘবদ্ধ বসতি ঘটেনি। ১৯৪৭ সালের বিভাগ কাল পর্য্যন্ত আলোচিত এলাকা তিনটি ভিন্ন প্রায় সর্বত্র তার পূর্ব বসতি অবস্থিত ছিল।
