আদি পর্ব
গঠন পর্ব

চিকিৎসা ব্যবস্থা

চিকিৎসা ব্যবস্থা

জেলা ও জেলা শহর গঠন পর্বের উষালগ্নে চিকিৎসার ক্ষেত্র হিসাবে সরকারী হাসপাতাল ও ডাক্তারখানা ছাড়া আরো দু’একজন চিকিৎসক ভিন্ন ডিগ্রীপ্রাপ্ত ডাক্তার এখানে এসেছিলেন কিনা জানা যায়না, তবে এ শতকের গোড়ার দিকে কয়েকজন ডিগ্রীপ্রাপ্ত ডাক্তার চিকিৎসা পেশার এসে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। ওই সময়ে হোমিওপ্যাথির তেমন প্রচলন না থাকায় হোমিও চিকিৎসকগণ এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসকদের সম সময়ে চিকিৎসা ব্যবসা শুরু করেন। এবং স্বল্পমূল্য হেতু হোমিও চিকিৎসা দ্রুত প্রসার লাভ করে। তবে দেশের প্রাচীন আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা উল্লেখিত সময়ে যথেষ্ট আলোচিত ছিল। প্রাচীনকালে ভৈরবতীরে মূলঘর, রাংদিয়া, (রূপসা-বাগেরহাট লাইনে) সেনহাটিতে বৈদ্য-কায়স্থের বাস ছিল এবং তাদের মধ্যে অনেকেই কবিরাজি বিদ্যায় প্রশংসিত ছিলেন। নতুন শহর গড়ে ওঠার প্রাক্কালে এরা শহরে এসে কবিরাজি চিকিৎসাকে আরো ফলপ্রসু করে তোলেন। বর্তমান শতকের প্রথম পাদেও আয়ুর্বেদীয়, হোমিও ও এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার এই ত্রিধারা গতি অব্যাহত ছিল।

মহকুমা হাসপাতাল ও ডাক্তারখানাকে ১৮৮২ সালে জেলাপযোগী করে “সদর হাসপাতাল” নামে উন্নীত করা হলে এখানে প্রথম সিভিল সার্জন হয়ে আসেন এককালের উপমহাদেশের প্রখ্যাত বিপ্লবী বারীন ঘোষ ও ঋষি অরবিন্দ ঘোষের জনক ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষ। সাউথ সেন্ট্রাল সড়কে টোলের উত্তর-পশ্চিম দিকের একটা বাড়ীতে ডাঃ ঘোষ স্ব-পরিবারে থাকতেন। পরে জেলা প্রশাসকের বাস ভবনের কাছে টাউন জামে মসজিদের দক্ষিণ পাশে বর্তমান শতকের গোড়ার দিকে সিভিল সার্জনের সরকারী বাস ভবন নির্মিত হয়। ডাঃ কে ডি ঘোষের নানাবিধ অবদানের জন্যে তিনি খুলনাবাসীর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে আছেন।

উন্নীত সদর হাসপাতালে সাধারণ ওয়ার্ড ছাড়াও সংক্রামক ব্যাধি, দক্ষিণ পূব কোণে রাস্তার পাশে পোষ্ট মর্টেম (শব-ব্যবচ্ছেদ), তার উত্তর পাশে কলেরা ও টি. বি ওয়ার্ড সহ উত্তর দিকে নদীর পাশে জরুরী বিভাগ সন্নিবেশিত ছিল। যদিও টি, বি, ওয়ার্ড কোন সালে খোলা হয়েছিল তার দিনক্ষণ পরিষ্কার নয়, তবে ১৯২৭ সালে সিলভার জুবিলি টি, বি ওয়ার্ড নামে একটি দ্বিতল ভবন নির্মিত হয় এবং চল্লিশের দশকের শেষের দিকে টি, বি ওয়ার্ড পৃথকীকরণ করে অন্যত্র হাসপাতাল নির্মিত হর। তাছাড়া সদর হাসপাতালের চিকিৎসা আরো বিস্তৃত করতে এগিয়ে আসেন জমিদার শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ। তিনি পিতার স্মরণে “মন-মোহন মেটারনিটি সেন্টার” নামে দ্বিতল একটি বাড়ী নির্মাণ করে দেন। প্রেসিডেন্সী বিভাগের কমিশনার সি, ডব্লিউ, গোরনার ১৯৩৩ সালের ৭ই জুন এই বাড়ীর ভিত্তি শিলায়ন করেন ও ৩৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর বেঙ্গল গভর্ণমেন্টের মন্ত্রী স্যার বিজয় প্রসাদ সিংহ রায় মেটারনিটি ওয়ার্ডের উদ্বোধন করেন। একই দিনে এক্স-রে ওয়ার্ডের ভিত্তি শিলায়ন হয়। ১৯৩৬ সালের ৮ই জানুয়ারী বেঙ্গল গভর্নমেন্টের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল সদস্য স্যার ব্রজেন্দ্র লাল মিত্র কর্তৃক উদ্বোধিত “বিনোদ বিহারী এক্স-রে ইনসটিটিউট’ এর ভবন সহ এক্স-রে বিভাগের যন্ত্রপাতি সরবরাহের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেন কপিল- মুনির তৈল ব্যবসায়ী বিনোদ বিহারী সাধু খাঁ। এক্স-রে ওয়ার্ডের উত্তর পাশে কুষ্ঠ ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ পাশের একতলা ভবনটি কোন ওয়ার্ড ও কার দানে নির্মিত ছিল তা শীলা লেখনীতে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় বোঝা না গেলেও অনুমিত হয় সম্ভবত এখানে প্রথমে মহিলা ও পরে শিশু ওয়ার্ড ছিল। এ ছাড়া মনমোহন মাতৃ সদনের দোতলার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নির্মিত শ্বেত পাথরের ঘরটিতে ঘোষ পরিবার ও শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ছিল বলে মনে হয়।

১৯০৯ সালে বাংলার লে: গভর্নর মি: উডবার্ন খুলনা সফরে এলে হাসপাতাল পরিদর্শন করে এর উন্নয়নে সরকারী সাহায্যের প্রচেষ্টা ও ব্যক্তিগত অনুদানের কথা ঘোষণা করলে তাকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে হাসপাতালের নাম রাখা হয় “উভবার্ন হাসপাতাল’। পরে হাসপাতালের সাধারণ ওয়াডের উত্তর-দক্ষিণ লম্বা বৃহৎ একতলা ভবনটির নির্মাণকল্পে শহর ও জেলার অনেক ধনী ব্যক্তিরা এগিয়ে আসেন। দাতাদের স্মরণে একখানা পাথরের ফলকে নাম ও দানের পরিমাণ খোদাই ছিল বটে কিন্তু পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে ভবনটির সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ কালে ফলকটি বিনষ্ট হয়ে যাওয়ায় মুছে গেছে দাতাদের নাম ও দানের স্মৃতি। উল্লেখ্য পৌরসভা গঠিত হওয়ার পর থেকে হাসপাতালের (১৮৬৪ সালে নির্মিত) ব্যয়ের বৃহদাংশ পৌরসভা বহন করতো।

**

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *