আদি পর্ব
গঠন পর্ব

পৌরসভা / জনসংখ্যা

পৌরসভা / জনসংখ্যা

১৮৮৩ সালের শেষের দিকে খুলনা নগর পঞ্চায়েত ও কয়ালাঘাট, হেলাতলা সহ খুলনা, টুটপাড়া, বেনেখামার গোবরচাকা, শেখপাড়া, নূরনগর, চারাবাটী, শিববাড়ী এবং বারইপাড়া সহ ছোট বয়রার অধিবাসীর পক্ষে অত্র এলাকা নিয়ে পৌরসভা গঠনের জন্যে বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়। বাংলার লেঃ গভর্ণর উক্ত প্রস্তাবে খুলনাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর পৌরসভা অনুমোদন ক্রমে ১৮ই মে, ১৮৮৪ সালে এক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেন। ২৮শে মে, এই ঘোষণা কলকাতা গেজেটে প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের এক মাসের মধ্যে আপত্তি প্রকাশের সময় দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে সংগত আপত্তি উত্থাপিত না হলে ১লা জুলাই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে বলে বলা হয়।

পরবর্তীতে গোবরচাকা, শেখপাড়া ও নূরনগর সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপিত হওয়ায় এই গ্রাম সমূহকে বাদ দিয়ে বাকী এলাকা নিয়ে ওই সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর খুলনা পৌরসভা গঠনের চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়া হয় এবং পৌরসভা সীমানা নির্দিষ্ট হয় :— উত্তরে ভৈরব নদী, পুবে রূপসা ও ভৈরব নদী, দক্ষিণে মতিয়াখালি খাল, লবণচরা খাল, নাওদাড়া খাল এবং গোবরচাকা ও শেখপাড়া বাদে ময়ুর নদীর উত্তর পশ্চিমে বড় বয়রার দক্ষিণপূর্ব, নুরনগর বাদে গোয়ালপাড়া ও মুজগুন্নি এলাকার মধ্যে ৪.৬৪ বর্গমাইল জায়গা নিয়ে “খুলনা মিউনিসিপ্যালিটি” নামে জেলার তৃতীয় পৌরসভা গঠিত হয়। প্রথম পৌরসভা ১৮৬৯ সালে ১লা এপ্রিল সাতক্ষীরায় ও ১৮৭৬ সালে দেবহাটায় গঠিত হয় দ্বিতীয় পৌরসভা। ১৭ই সেপ্টেম্বর এই ঘোষণা গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য মুসলিম প্রাধান্যপূর্ণ বাদ পড়া এই গ্রাম তিনটি ঘোষিত এলাকার মধ্যে অবস্থিত।

পৌরসভা পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিষদ গঠনের বিধান হয়, যার মধ্যে ১০ জন নগর পঞ্চায়েত কর্তৃক নির্বাচিত হবেন, চার জন পদাধিকার বলে ও একজন মনোনীত হবেন। আয়ের উৎস হিসাবে বাড়ী ঘরের উপর ১২ শতাংশ ও করদাতাদের আয়ের উপর এক শতাংশ কর ধার্য হয়।

নগর পঞ্চায়েত কর্তৃক নির্বাচিত প্রথম পরিষদে কমিশনার নিযুক্ত হন বাবু হরকালী মুখোপাধ্যায়, খড়গেশ্বর বসু, হরিদাস পাল, দেবেন্দ্রনাথ সেন, কালীকুমার সরকার, বরদাকান্ত রায়, উমেশচন্দ্র ঘোষ, অম্বিকাচরণ সেন এবং মহেন্দ্ৰনাথ হাজরা।

১৩ই ডিসেম্বর কমিশনারদের সভায় বাবু হরকালী মুখোপাধ্যায়ের প্রস্তাবে ও খড়গেশ্বর বসুর সমর্থনে আট ভোট পেয়ে বাবু গগন চন্দ্ৰ দত্ত পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং বাবু কৈলাশ চন্দ্র কাঞ্জিলাল ছয় ভোট পেয়ে প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৮৮৮ সালে ৮ই জানুয়ারী সিভিল সার্জন বাবু কৃষ্ণধন ঘোষ দ্বিতীয় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু তিনি (জানুঃ ১৮৯৩) এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ও খুলনা শহরেই তার মৃত্যু হয়। নবগঠিত জেলায় আধুনিক শহর গঠনের পরিকল্পনা ও রূপদানে চেয়ারম্যানদ্বয়ের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধার্থে কয়লাঘাটায় গগন বাবুর বাড়ীর সম্মুখস্থ রাস্তাটি গগন বাবু রোড ও পৌরসভার সামনের রাস্তাটি কে, ডি, ঘোষ রোড নামকরণ করা হয়েছে।

পৌরসভা ভবনের পিছনে বাবু কৈলাশচন্দ্র কাঞ্জিলালের “সত্য চরণ হাউস” নামে তিন কামরার একটা বাড়ীতে সাময়িকভাবে পৌরসভার কার্যালয় করা হয়। ১৮১১ সালের দিকে বর্তমান পৌরসভা গৃহের অংশ বিশেষ নির্মিত হয় এবং পরবর্তী ত্রিশ বছর এই দুই গৃহ মিলে পৌরসভার কার্যালয় চলে। ১৯২৭ সালে পূর্ব গৃহটি অধিগ্রহণ করে পৌরসভাভুক্ত করা হয়। ১৯৩০ সালে বাবু মহেন্দ্রকুমার ঘোষ পৌরসভা ভবনের সংলগ্ন বাবু যতিন্দ্র নাথ রাহা ও অন্যান্য- দের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে নয় কাঠা জমি হরিদ করেন। ১৯৩১ সালে মূল ভবনের ডান ও বাম পাশের কক্ষ দুটি নির্মাণ করে পৌরসভা গৃহ বর্ধিত করা হয় এবং ১৯৪৪ সালে ভবনের দ্বিতলে পৌর মিলনায়তন নির্মিত হয়। সত্য- চরণ হাউসটি দীর্ঘ একশত বছর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হওয়ার পর শতবর্ষপূর্তিতে ভেঙ্গে তদস্থলে আধুনিক দ্বিতল ভবন নির্মিত হয়েছে।

উল্লেখ্য পৌর মিলনায়তন নির্মাণের সময় মিলনায়তনের সামনের দেয়ালে তৎকালীন চেয়ারম্যান মহেন্দ্র বাবু “খুলনা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন” লিখে দেন। পরে ১৯৫৫ সালের শেষের দিকে পৌরসভার এ্যাডমিনিসট্রেটর জনাব হাবিব উদ্দিন লেখাটি মুছে তদস্থলে মোজাইক প্লেটে খুলনা মিউনিসিপ্যালিটি লেখেন। স্বাধীনতা উত্তর সেখানে খুলনা পৌরসভা নামে একটা বোর্ড দেওয়া হয়। ’৪৪ সালের অভিলাসী লেখাটি চল্লিশ বছর পরে বাস্তবে রূপ নিয়ে খুলনা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন হয়েছে। এই স্বপ্নদ্রষ্টা দীর্ঘস্থায়ী চেয়ারম্যান ও শহর আধুনিকীকরণে সর্বজনস্বীকৃত স্থপতির স্মরণে অন্যূন একটা সড়কের নাম করণ হওয়া স্বাভাবিক ছিল।

পৌরসভা এলাকা গঠনকালে জন সংখ্যা কত ছিল তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। ১৮৮১ সালের প্রথম পরিসংখ্যানে শহরের (মহকুমা) জনসংখ্যা দেখান হয়েছে ৭,৫৬৩ জন, এখানে শহর বলতে কোন এলাকা বোঝান হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। তবে পাশ্ববর্তী গ্রাম সমূহের জনসংখ্যা ভিন্ন ছোট একটা মহকুম শহরে তৎকালে এসংখ্য। স্বাভাবিক নয়। ১৮৯১ সালের গণনায় শহরে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৮,৪৯৬ জন। এই পরিসংখ্যান জেলা সদরের নয় বছর পর ও পৌরসভার সাত বছর বয়সের। তাই সম্ভবতঃ শহর বলতে পৌর এলাকাকে বোঝান হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *