আদি পর্ব
গঠন পর্ব

বেনেখামার

টুটপাড়া গ্রামের পশ্চিমে এবং মির্জাপুর মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিমে বেনেখামার বিস্তৃত গ্রাম। নামের শব্দার্থে গ্রামের নামকরণ পরিস্ফুট। এখানে বেনেদের খামার কোন, সময়ে এবং বিস্তৃত গ্রামের কোন অংশে খামার হয়েছিল তার সঠিক সময় ও স্থান নির্দেশ পাওয়া যায়না। তবে বেনেদের খামারের জন্যে বসতির নাম বেনেখামার হয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। বেনেখামার খুব প্রাচীন গ্রাম। কয়েকটি প্রাচীন জলাশয় ও গাছ এর প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য দেয়। কোন এলাকায় একসময় জনবসতি গড়ে উঠে, আবার কিছু কাল পরে নানা কারণে সে বসতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরিত্যক্ত বসতি চিহ্ন অল্প দিনের মধ্যে প্রাকৃতিক, আর্দ্রতা ও লবণাক্ততার জন্যে ধ্বংস প্রাপ্ত হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ জলাশয় ও বসতির পাশের প্রাচীন গাছ প্রকৃতিকে অগ্রাহ্য করে শতশত বছর পরেও জনবসতির সাক্ষ্য হিসেবে অবস্থান করে। বেনেখামার গ্রাম মধ্যে এ রকম কয়েকটি প্রাচীন জলাশয় ও তেঁতুল গাছ গ্রামের প্রাচীনত্বের প্রতি অনুসন্ধিৎসুদের আকৃষ্ট করে। অনেকে মনে করেন বেনেখামার অপেক্ষাকৃত আধুনিক গ্রাম। পূর্বে এখানে ভিন্ন নামে কোন মুসলিম সমৃদ্ধপূর্ণ গ্রাম ছিল। মির্জাপুর নামে বসতি গড়ে ওঠার পুর্বে এই জনপদ বসতিশূন্য হয়ে পড়ে। তারপরে বেনেরা এখানে গাতি ও খামার করে এবং খামার মধ্যে বসতি স্থাপন করে বেনেখামার নামে পরিচিত হয়। জলাশয়গুলির ও গ্রামের কয়েকটি জায়গায় পরিচয় ও বসতি পর্যালোচনা করলে এই মতের পরিপুরক যুক্তি পাওয়া যায়। সহজেই অনুমেয় পূর্বের বেনেখামার ও আজকের বেনেখামার এক সীমানার আওতাভূক্ত নয়। দীর্ঘ দিন ধরেক্রমশঃ বিস্তার লাভ করে পূর্বে ও পশ্চিমে যতদূর সম্প্রসারিত হয়েছে সে অংশ বেনেখামারের আওতাভূক্ত হয়েছে। এই সম্প্রসারণের মধ্যস্থ ভিন্ন নামে ক্ষুদ্র জনপদগুলিকেও উদরসাৎ করেছে।

বেনেখামার গ্রাম অনেক আগে থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম দু’ভাগে বিভক্ত। পূর্ব এবং পশ্চিম ভাগের মধ্যে একটা প্রশস্ত খাল বর্তমান ময়লাপোতা মোড়ের দক্ষিণ- পশ্চিম দিয়ে শেরেবাংলা রোড বরাবর দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত ছিল। এই খালই পুব ও পশ্চিম ভাগের বিভক্তির কারণ। প্রশস্ত এই খালটি ময়ুর নদী থেকে উঠে এসে উত্তর ও সামান্য উত্তর পুবে বেঁকে পরে সোজা বর্তমান ময়লাপোতার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং অপর একটি খাল ময়ূর নদীর শাখা চর। নদী থেকে এ কে বেঁকে বাগমারা গ্রামের মধ্য দিয়ে মাঝি পাড়ার পাশে পূর্বোক্ত খালের সাথে যুক্ত হয়। আর একটা সরু খাল দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে এঁকে বেঁকে এসে ওই একই স্থানে মিলিত হয়ে একটা ত্রিমোহনীর সৃষ্টি করে তিন খালের স্রোতের চাপে এখানে একটা গোলা (ঘূর্ণিস্রোত) হয়। এই ত্রিমোহনী থেকে একটা সরু খাল উত্তর পশ্চিম মুখী হয়ে রেল ষ্টশনের অদূরে পাঁচ নম্বর ঘাটের কাছে ভৈরব নদীতে পড়ে। ময়ূর থেকে অপর একটি শাখা খাল উত্তর দিকে এসে প্রথমোক্ত খালের সাথে ঘাটকূলের অদুরে (বর্তমান গল্লামারী নতুন সড়কের পাশে আলকাতরা ফ্যাক্টরীর কাছে) মিলিত হয়ে আরও একটা ত্রিমোহনীর সৃষ্টি করে। এই ত্রিমোহনীর পাশের একটা জায়গা লোকে ঘাটকুল বলে। এ ছাড়াও ময়ূর নদীর উত্তর দিকে আরো কয়েকটা খাল প্রবাহিত ছিল। ময়ূর নদীর বিবর্তনের ফলে আলোচিত খাল তিনটি দোটানায় (দ্বি-মুখী স্রোত। পড়ে ক্রমাগত ভরাট হয়ে যায়। খুলনা পৌরসভা হবার পর মৃত খালের ডিমোহনীর (বর্তমান ময়লা-পোতা এলাকা) নীচু থাত শহরের ময়লা ফেলার স্থানরূপে নির্দিষ্ট হয় বাগমারার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত অপর খালটির নীচু স্থান ‘কান্দর’ নামে পরিচিত। এখনও বাগমারার মধ্যে কান্দরের কিছু কিছু অবশেষ রয়েছে। ডিমোহনী থেকে ভৈরব মুখী সরু খালটিও সমসময়ে একই পরিণতি ঘটে। রেল লাইন বসানর সময় ও শহর সম্প্রসারণে খালের নীচু খাত ভরাট হয়ে সম্পূর্ণ অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। বেনেখামারের মধ্যের খাল পারের বিশেষ বিশেষ স্থানের নাম আজও লোক মুখে প্রচারিত আছে। স্থানীয় প্রবীণ লোকেরা খাল পারের আধুনিক নামকরণ হওয়া স্বত্ত্বেও স্থান পরিচিতির জন্য পুরাতন নামগুলি অর্থাৎ নাজিরঘাট, মাঝি পাড়া, ঘাটকূল ইত্যাদি নাম ব্যবহার করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *