মহকুমা গঠনের কারণ

সতের শতকের গোড়ার দিকে এ ধারা অব্যাহত ছিল। অর্থাৎ এসময়েও নদীর এপথে যাতায়াতকারী সব নৌকা ও জাহাজ এখানে অপেক্ষা করত। ইংরেজ আমলের প্রথম থেকে খুলনা ইংরেজদের ব্যবসা বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি বা বন্দর ছিল। পূর্ববঙ্গ, আসাম, কলিকাতা ইংরেজ বাণিজ্য কেন্দ্রের চলাচলের সহজ পথ ছিল খুলনা হয়ে। ফলে খুলনা আগে থেকেই ছোট খাট একটি বন্দর ছিল। এ ছাড়া যশোরের দেওয়ানী লাভের সাথে সাথে তাদের লবণ বিভাগের সদর দফতর রায় মঙ্গল লবণ এজেন্সী স্থানান্তর হয় খুলনার কয়লাঘাটায়। ফলে ইংরেজদের নৌ বাণিজ্যে এ জায়গার গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পায়। ওই বছর অর্থাৎ ১৭৮১ সালে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাজের জন্যে খুলনায় প্রথম থানা স্থাপিত হয়। প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি ও নানা কারণে মিঃ টিলম্যান হেঙ্কেল প্রতিষ্ঠিত থানা ১৮৮২ সালে সরকার বন্ধ করে দেন। এ সময়ে মির্জানগর-ভূষণা-ধর্মপুর ও নয়াবাদে চারটি থানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আঠার শতকের শেষের দিকে রূপসা খালের পূর্বদিকে খুলনায় ইংরেজদের লবণ চৌকির থানা স্থাপনকালে রূপসা খাল (পূর্ব নাম জানা যায় না) ভৈরব থেকে মাথাভাঙ্গার ওখানে কাজিবাছা ও ময়ুর নদীর মিলিত স্থান পর্যন্ত একটি মরা খাল ছিল। পশুর নদী উত্তরে সরে এসে কাজীবাছা নাম নিয়ে পূর্বোক্ত জায়গা থেকে সরাসরি ডাইনে ঘুরে গেছে। নদীর এই ঘোরান বাঁককে মাথাভাঙ্গা বলে। নদী পথে ভৈরব আসতে গেলে আরো অনেক ঘুরে যাত্রাপুর হয়ে ভৈরব দিয়ে এখানে আসতে হতো এবং এর জন্যে প্রায় দেড় দিন সময় লেগে যেত। রূপসার এই মরা খালের জন্যে নদী পথের দূরত্ব সংক্ষিপ্ত ও লবণ বোঝাই নৌ-বহর সহজ পথে চলাচল করার জন্যে নড়াইলের জনৈক লবণ ব্যবসায়ী রূপলাল সাহা ভৈরব থেকে মাথাভাঙ্গা পর্যন্ত এই মরা খালের মাঝে একটা সরু খাল কেটে দেন। এ খাল রূপলাল সাহার খাল বলে কথিত হোত এবং কালক্রমে প্রবল স্রোতে প্রশস্ত হয়ে রূপসা নামে পরিচিত হয়। রূপসার কাটাখাল প্রথম দিকে খুব সরু থাকায় লোক বাঁশের সাকো দিয়ে পারাপার হোত ভৈরব ও আঠারবাকীর মিলিত স্রোত এই খাল দিয়ে পশুর নদীতে প্রবাহিত হবার সহজ পথ পেয়ে ক্রমে স্ফীত ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ভূ-কৈলাশের রাজা কালীশঙ্কর ঘোষালের কাছ থেকে বরিশালের গুরুধামের কাছারীর ম্যানেজার কামরুন সাহেবের স্ত্রী মার্গারেট হোগলা পরগনার (খুলনার অত্র এলাকা) চার আনা অংশ কবলামূলে প্রাপ্ত হন। মার্গারেটের একমাত্র কন্যা ও উত্তরাধিকারী বারবারাকে বিবাহ সূত্রে গত শতকের ত্রিশের দশকের গোড়ার দিকে বৃটিশ সেনাবাহিনীর ভাগ্যন্বেষী সেনা উইলিয়াম হেনরী সেনিড রেণী উক্ত সম্পত্তির ট্রাষ্টী নিযুক্ত হয়ে বর্তমান খুলনা শহরের উত্তর-পুবদিকে রূপসা খালের পুবদিকে তালিমপুর গ্রামের উত্তরাংশে ভৈরব নদীর তীরে কুঠি স্থাপন করে বসবাস শুরু করেন। রেণী সাহেব সরকারের কাছ থেকে রূপসার চর ও লখপুরের জমিদারের কাছ থেকে খুলনা, এলাইপুর গ্রাম বন্দোবস্ত নিয়ে নীল ও চিনির ব্যবসা শুরু করেন। অল্পদিনের মধ্যে অনেকগুলো নীল ও চিনির কুঠি স্থাপন ও নীলকর সাহেবদের চারিত্রিক অভ্যাসগত প্রজাদের জোর পূর্বক দাদন দেওয়া, নীলচাষে বাধ্য করা, বেগার খাটান ইত্যাদির দ্বারা সাধারণ অধিবাসীদের অতিষ্ঠ করে তোলেন। রেণী সাহেরে অত্যাচারের অনেক প্রবাদ কাহিনী এখনও এ অঞ্চলের লোকমুখে শোনা যায়। তার অত্যাচারে কুঠির পাশের রাস্তা দিয়ে কোন লোক চলতে ইচ্ছুক হোতনা। উল্লেখ্য সমৃদ্ধ জনপদগুলি তখন এ অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।

পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হলে, পার্শ্ববর্তী শ্রীরামপুরের প্রভাবশালী তালুকদার ও নীল ব্যবসায়ী শিবনাথ ঘোষ নিকটবর্তী তালুকদার ও প্রভাবশালী লোকদের সাথে পরামর্শ করে রেণী সাহেবের প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন। অপর দিকে খুলনার অপর পারের দিননাথ সিং রেণী সাহেবের পক্ষে যোগ দেন। ফলে প্রায় দু’দলের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ মাঝে মাঝে তীব্র হয়ে ছোট খাট যুদ্ধে রূপ নিতে শুরু করে। এসব ঘটনা নিবৃত্ত কল্পে ইংরেজ সরকার ১৮৩৬ খ্রীষ্টাব্দে পুরাতন খুলনা থানা পুনঃ সংগঠিত করে উভয়ের বাড়ীর মাঝামাঝি কিসমত খুলনা মৌজায় খুলনা গ্রাম সংলগ্ন নয়াবাদ গ্রামে খুলনা নামে নতুন থানা স্থাপন করেন। (কেউ কেউ বলেন,  থানা স্থাপন কালে এ জায়গার জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদ করা হয় বলে এখানের নাম হয় নয়াবাদ। প্রকৃতপক্ষে এখানে ঐ নামে বহু পূর্ব থেকে একটা গ্রাম ছিল। নয়াবাদ শব্দকে অর্থবোধক কারণে এ ধারণার সৃষ্টি বলে অনুমিত হয়।) রেণী সাহেব ও শিবনাথ ঘোষের ক্রমাগত সংঘর্ষ প্রচণ্ডতর হলে এ থানা অকার্যকর হয়ে পড়ে। যশোর সদর থেকে এতো দূরত্বে এদের সংঘর্ষ দমন সহজ নয় বিবেচনা করে ইংরেজ সরকার যশোর সদর অধীন একজন ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়োগ ও সাবডিভিশন গঠনের উদ্যোগ নেন। ইংরেজ সরকার ১৮৪২ খ্রীঃ এখানে একটা মহকুমা (Subdivision) গঠন করে মিঃ এম, এ, জি. শো-কে মহকুমা প্রশাসক (S. D. O) নিযুক্ত করেন। মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট নয়াবাদ থানার পশ্চিম পাশে রেণী সাহেবের কুঠিরের কাছেই তাবুতে প্রথম মহকুমার কাজ শুরু করেন এবং নয়াবাদে অবস্থিত খুলনা থানার নামেই নবগঠিত মহকুমার নামকরণ হয় খুলনা মহকুমা। খুলনা বাংলায় ইংরেজ শাসনের প্রথম মহকুমা। ১৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দে এ থানা মহকুমা সদরের পাশে বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়।

কুঠিরের দোর গোড়ায় মহকুমা প্রশাসকের কাছারির জন্য রেণী সাহেব একদিকে তার স্বেচ্ছাচার মূলক কাজে লেঠেলের অবস্থান, দাদনী ও নীল চাষে বৈরী প্রজা কয়েদ ইত্যাদির গোপনীয়তা রক্ষায় সংশয়াপন্ন ও বিব্রত হয়ে ওঠেন, অপর দিকে শিবনাথ ঘোষ স্বজাতি মহকুমা প্রশাসকের অবস্থান ও কাছারী স্থাপনে স্বাভাবিক পক্ষপাতিত্বের আশংকায় কাছারী অন্যত্র কোথাও সরিয়ে দেয়ার জন্যে সচেষ্ট হন। উভয়ের ভিন্ন ভিন্ন চেষ্টায় ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হবার ভয়ে কয়েক মাস পরে বর্ষারম্ভের পূর্বে মহকুমা কাহারী রূপসা খালের পশ্চিমে ভৈরব ও রূপসার মিলিত স্থানের দক্ষিণ-পুরে ও মির্জাপুর মাঠের উত্তর পুব কোণে নদীর পাড়ে উঁচু জায়গায় খড়ের ঘরে পূর্বোক্ত মহকুমা কাছারী ও প্রশাসকের বাসস্থান স্থানান্তরিত হয়ে মহকুমা সদরের ভিত্তি স্থাপিত হয়। নদীর পাড়ের এ জায়গা কাছারী নির্মাণকালে উঁচু ও উলুখড়ের বন ছিল বলে জানা যায়। কারো মতে মির্জাপুর মাঠের উক্ত জায়গা টুটপাড়া গ্রামের একাংশ। টুটপাড়া গ্রাম এখান থেকে বেশ দূরে এবং শুধু এ জায়গা নয়, এরও পার্শ্বস্থিত অনেক দূর পর্যন্ত মির্জাপুরের মাঠ বিস্তৃত ও কাছারির নিকটের জনবসতি মির্জাপুর বলে পরিচিত ছিল। সুতরাং উক্ত ধারণায় কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। যা হোক, রেণী সাহেব ও শিবনাথ ঘোষ ষড়যন্ত্র করে মহকুমা প্রশাসককে নিম্নাঞ্চল, অস্বাস্থ্যকর ও ম্যালেরিয়া ভীতি দিয়ে যে স্থানে সরিয়ে নিয়ে ছিলেন, সে জায়গা পূর্বের জায়গা থেকে কোন দিক দিয়েই স্বাস্থ্যকর বা ম্যালেরিয়া মুক্ত ছিল না। রেণী ও শিবনাথ ঘোষের আজ শুধু স্মৃতির চারণ ক্ষেত্র নয়, অধিকন্তু তাদের এই লড়াই ও ষড়যন্ত্রের ফসল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প ও বন্দর বৃহত্তম শিল্প ও বন্দর নগরী রূপে বিশ্বে পরিচিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *