আইনজীবী / বসতির-বিবর্তন / পেশা পরিবর্তন
জেলা সদরে রাজস্ব পরিশোধ, অনাদায় খাজনার নালিশ, মামলা মোকদ্দমার প্রয়োজনে আইন পেশায়, শহরের বিভিন্ন এলাকায় নতুন আইনজীবীর আগমন হতে থাকে। মহকুমা সদরে মুন্সেফী আদালতের মহকুমা আইনজীবী সমিতি ও নতুন জেলা আদালতে যোগদানকারী আইনজীবীদের সমন্বয়ে ১৮৮৩ সালের ১৫ই এপ্রিল জেলা আইনজীবী সমিতি গঠিত হয়। আইনজীবী সমিতির প্রথম সদস্য সংখ্যা কত ছিল তা সঠিক ভাবে জানা যায় না, তবে এসময়ে ত্রিশজন বা তার অধিক ছিল বলে বর্তমান সমিতি অনুমান করেছেন। মহকুমা আদালতে চার/পাঁচ জনের নাম ছাড়া কতজন আইনজীবি ছিলেন তারও কোন সন্ধান পাওয়া যায়না। ওই শতকের শেষে সমিতিতে অনুমেয় ৪৫ জন সদস্য ছিলেন। ১৮৮৫ সালে নিম্ন আদালতের আইনজীবীদের সমন্বয়ে খুলনা মোক্তার বার এসোসিয়েশন গঠিত হয়; তবে ওই সময়ে মোক্তার সমিতিতে কতজন সদস্য ছিলেন বা কে কে ছিলেন তার কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও সমসাময়িক বা তার কিছু পরে রাজবিহারী, বিমল কুমার, অনিল কুমার, অম্বিকা চরণ, উজির আলী, আতাউল হক সহ বেশ কয়েকজন মোক্তারের নাম শোনা যায়। দ্বিতীয় দশকে যোগদানকারী মুসলিম উকিল মোক্তারদের অনেকের বংশধরেরা আজও এই শহরে বসবাস করছেন।
রাজস্ব সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ জেলা কালেক্টরীর আওতাধীন থাকায় এবং সুদূর যশোর বা চব্বিশ পরগণার সদর কাছারীর (কালেক্টরীর) সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের অভাবে সম্ভব হতোনা। সে কাজ নতুন জেলা কালেক্টরীর সুবাদে সম্ভব হয়ে উঠে এবং সহজ যোগাযোগের ফলে ছোট ছোট অনেক জমিদার ও নব্য ভূস্বামীর নয়া পত্তন হয়। যে সব জমিদার গাতিদারের ছেলেরা আইনজীবী ছিলেন, তারাও এ সুযোগ হাতছাড়া করেনি। কেননা খাজনার দায়ে কার জমিদারী লাঠে উঠবে, কোন গাতিদারের গাতি খাস হবে, কোন জমিদার তার অংশ বিক্রি করবে এসবের নিয়ন্ত্রণ জেলা কালেক্টরীর মাধ্যমে জ্ঞাত হওয়া সহজ ছিল।
এ সময়ে দেখা দেয় আবাসিক সংকট। আইনজীবীরা চাইলেন আদালতের কাছাকাছি কোথাও আবাস বাড়ী গড়ে তুলতে। তাছাড়া খুলনা জেলা শহর হবার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য-চিকিৎসায় পসার জমাতে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন শহরে। ফলে দেখতে দেখতে জেলা সদরের পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর মাঠের ফাঁকা জমি বসতিতে পূর্ণ হয়ে গেল। ক্রমে এখানে সংকুলান না হওয়ায় ধীরে ধীরে এলাকার বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। ওই সময় মির্জাপুর এলাকার ফাঁকা ভূমিতে বসবাস করতো বুনো ও অন্য সম্প্রদায়। এখানে তেমন কোন চাষাবাদ হোতনা এবং বসতি ছাড়া অন্য অংশ ছিল আগাছায় পূর্ণ। সদরে নবাগত বসতিরা জমিদার সেরেস্তা এবং বুনোদের কাছ থেকে সেলামী বা নামমাত্র মূল্যে প্রয়োজন মত জমি খরিদ অথবা বন্দোবস্ত করে নেন। মহকুমা সদর গঠিত হবার পর অত্রাঞ্চলের জমি ক্রয় বিক্রয়ের ব্যাপারে ক্রেতার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকার জমির মূল্য বাড়তে শুরু করে ও জমির দরিদ্র মালিকরাও এ ব্যাপারে কিছুটা সচেতন হয়ে ওঠে।
জেলা শহর গঠন প্রক্রিয়া শুরু হলে গরীব চাষীরা অধিক মূল্য পেয়ে জমি বিক্রি করতে আরম্ভ করে। এভাবে ক্রয় বিক্রয়ের মাঝে বর্তমান শতকের চল্লিশের দশক পর্যন্ত জেলা শহরের ষাট বছর বয়সের মধ্যেই অনেক পরিবার একাধিকবার বসতি পরিবর্তন করে অনেক দূরে সরে গেছে। জেলা শহরে মির্জাপুর ছাড়াও বেনেখামার এলাকায় বেশী সংখ্যায় নবাগতের আগমন ঘটেছিল। তখনকার দিনে বিশেষ করে টুটপাড়া ও বেনেখামার এলাকার দরিদ্র কৃষকেরা এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতো। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জমির নাব্যতা হেতু লবণাক্ত পানির চাপ সহ্য করেও এখানকার কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে খাল পাড়ে বেড়ী-বাঁধ দিয়ে চাষ করলেও বর্ষাকালে প্রবল স্রোতে কখনও কখনও বাঁধ ভেঙ্গে ফসল তলিয়ে যেত। ফলে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার জন্যে এক অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হোত। দারিদ্র এদের নিত্য দিনের সংগী ছিল বলেই বেঁচে থাকার তাগিদে জমি বিক্রয়ের বিকল্প ছিলনা।
এছাড়া বাগদি (বুনো) বা ঋষি (মুচি)রা সরাসরি কৃষি কাজের সাথে যুক্ত ছিলনা। বাগদিরা দিন মজুরী ও কেউ কেউ কাছিম ধরে, মুচিরা বেতের ধামাকুলো তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করতো। সবকিছু ছাড়িয়ে এ অঞ্চলের কেউ তেমন অভাবের উপরে নিজেকে তুলতে পারেনি। সুতরাং “জমি বিক্রী করলে দু’পয়সা হাতে আসবে”-এ সুযোগটা আর হাত ছাড়া করতে চায়নি।
যখন কোথাও কোন শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠে, সেখানে আগমন ঘটে ধনিক ও সঙ্গতিপন্ন বহিরাগতের। এদের নিষ্পেষণে ও শঠতার শিকার হয়ে সরলমনা দরিদ্র বসতির যে কত আহাজারী শহরের ইট পাথরের সাথে গ্রথিত হয় তার উল্লেখ ইতিহাসের পাতায় না থাকলেও এ অঞ্চলের দরিদ্র বাগদি, ঋষি ও চাষী পরিবারগুলোর জীবনের পাতায় জড়িয়ে ছিল যা কোন শরতের শিশিরে ঝাপসা হয় নি। আজও সরল বুনোদের ফাঁকি দিয়ে তাদের ভিটে-মাটি থেকে বিবেকহীন উচ্ছেদের অনেক করুণ কাহিনী কিংবদন্তি হয়ে আছে।
একাধিকবার পরিবর্তিত বসতির চাষী পরিবারের অধঃস্তনদের অনেকে আজও দিনমজুর বা অতি সাধারণ কাজ করে কোনমতে জীবন সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এদের চোখের সামনে বাপ-দাদার ভিটের উপর গড়ে ওঠা নবাগতদের বিলাসবহুল অট্টালিকা দেখে হয়ত কারো মনে প্রশ্ন জাগে, “আরা কি পেলাম’; সেদিনের সেই জেলা শহর আজকের শিল্প ও বন্দর সমৃদ্ধ আলোঝলমল বিভাগীয় সদর নগরীতেও ভাগ্য পরিবর্তনের কোন ব্যবস্থা হোলনা। এই হোল পুরান বসতির উপর নতুন করে গড়ে ওঠা নগরীর পরিহাস।
জেলা শহর গড়ে ওঠার আগেই বাজারের জন্যে নড়াইল-কাছারী থেকে ক্লে রোড পর্যন্ত (হুকুম দখল হওয়ার সময় এ রাস্তার কোন নাম ছিলনা) নদীর পাড় ঘেষা এক ফালি জমি অবশিষ্ট রেখে রেল কর্তৃপক্ষ রেল এলাকার জন্যে চালি সাহেবের বাড়ী সহ অধিকাংশ চার্লিগঞ্জ হুকুম দখল করে নেয়।
নির্দিষ্ট বাজায় এলাকায় পূর্ববৎ শনি ও বুধবার হাট বসতো। জেলা ঘোষিত হবার পর চার্লিগঞ্জের বটতলার হাটকে পুনর্বিন্যাস করে শহরের সাপ্তাহিক হাট ও প্রাত্যহিক বাজারে পরিণত করা হয়। উল্লেখ্য দারিদ্রহেতু বেনেখামারের অনেক চাষী পরিবারের লোক এখানে তরিতরকারী আলু ফল, ইত্যাদি কাঁচামালের ব্যবসা শুরু করে। বর্তমান শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ ব্যবসায় তাদের একচেটিয়া প্রাধান্য থাকলেও আধুনিক শিল্প ও বন্দর নগরী গড়ে ওঠার কাল থেকে ধীরে ধীরে বহিরাগত সমব্যবসায়ীদের কাছে হস্তান্তর হয়ে যায়।
অপরদিকে জেলা সদরের জন্য অফিস আদালত সহ বাড়ী-ঘর নির্মাণ শুরু হলে টুটপাড়া ও বেনেখামারের কিছু দরিদ্র লোক সংখ্যাধিক্যে মুসলমানরা বেশী ছিল) রাজ মিস্ত্রীর জোগালে ও বাগমারা-বানরগাতীর কিছু লোক সুতার মিস্ত্রির সাহায্যকারী হিসাবে দিনমুজুরিতে যোগ দেয়। উল্লেখ্য, ওই সময় এতদাঞ্চলে দক্ষ রাজ ও সুতোর মিস্ত্রীর অভাবে ঠিকাদাররা কলিকাতা-কুঞ্চনগর-শান্তিপুর থেকে মিস্ত্রী এনে কাজ করাত। তাদের সাথে কাজ জানা কিছু জোগালেও আসতো। বাকী কাজের জন্য স্থানীয় লোকদের নিয়োগ করা হতো। ক্রমে এরা হাতে কলমে দক্ষতা অর্জন করে অনেকেই রাজমিস্ত্রীর পেশা বেছে নেয় এবং অল্প বিস্তর পূর্ব অভিজ্ঞতাথাকার কারণে বাগমারা-বানরগাতীর নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের দরিদ্র লোকেরা পেশা হিসাবে সুতোর (কাঠ মিস্ত্রী) কাজকে বেছে নেয়। আগে এদের অনেকেই নৌকা তৈরী ও মেরামতের কাজ করতো। এর ফলে কারিগরি দক্ষতার ক্ষেত্রে মুসলমানরা রাজ মিস্ত্রী এবং নমঃশূদ্ররা সুতোর মিস্ত্রী এই দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমান শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত এবং এদের প্রাধান্য ছিল।
নির্মাণ কাজের উপকরণ ইট-চুন-সুরকি-বালি কোনটিই স্থানীয়ভাবে পাওয়া যেত না। রেল ও নদীপথে এসব বাইরে থেকে এনে ষ্টেশনে বা নদীর ঘাটে তোলা হোত। অল্প কিছু ইট সরকারী নির্মাণ কাজে স্থানীয় ভাবে ইটখোলা করে তৈরী করা হয় (সরকারী ইট খালার বর্তমান রিজার্ভ ট্যাংকের জায়গা) কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় ষ্টেশন এবং ঘাট থেকে দূরে নির্মাণ স্থানে বয়ে নেয়ার ব্যাপারে। যেহেতু তৎকালে গরুর গাড়ীই ছিল আভ্যন্তরীণ স্থল পরিবহনের মাধ্যম, সেহেতু প্রথম অবস্থায় ঠিকাদাররা গাড়ী ও গরু সংগ্রহ করে নিজস্ব মজুর দিয়ে এই পরিবহনের কাজ চালাত। যাত্রাপুর, ফুলতলা ও যশোরের নওয়াপাড়ায় গরুর গাড়ীর চাকা তৈরী হোত। ওই সময় মালামাল পরিবহনে গরুর গাড়ীর প্রচুর চাহিদা থাকায় সদর উপকণ্ঠের চাষী পরিবারের অনেকেই গাভীর চাকা সংগ্রহ করে গাড়ী তৈরী পূর্বক চাষের অবসর সময়ে পরিবহনের ব্যবসার মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সংস্থান করে নেয়। এদের সাফল্যে অন্যান্য অনেকেই অনিশ্চিত চাষের কাজ পরিত্যাগ করে সরাসরি পরিবহন পেশায় ঢুকে পড়ে এবং একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে। বর্তমান শতকের মাঝামাঝি সময়ের পরেও পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে প্রতিদিন সকালে হেলাতলার মোড়ে ভাড়ার জন্যে বহু গাড়ী অপেক্ষা করতো। পরে মটর লরীর আমদানী ও মনুষ্যবাহিত ঠেলাগাড়ীর প্রচলন শুরু হলে এবং ধীরে ধীরে শহরে যানবাহন ও জনসমাগম বেড়ে উঠলে ধীরগতি সম্পন্ন পরুর গাড়ী তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। বর্তমান শতকের ষাটের দশকের গোড়ার দিকে পৌরসভা গরুর গাড়ী চলাচল নিষিদ্ধ করলে গাড়োয়ানদের বেকার করে গরুর গাড়ী বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে কাজ যাই হোক, ব্যতিক্রম ছাড়া এদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন আসেনি। কোন শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠার সময় বন্যার স্রোতের মতো ধনিক ও বণিকের আগমনে হঠাৎ করে যে ধন কৌলিন্যের এক আর্থ সামাজিক আভিজাত্যের সৃষ্টি হয় যার রূপ পরিগ্রহ করে অন্যকে অবজ্ঞা ও কটাক্ষ করার মানসিকতায়। এ ক্ষেত্রেও কর্মজীবী পরিবারগুলোর বেলায় তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি।
