আদি পর্ব
গঠন পর্ব

নদীরঘাট / ব্যবসা কেন্দ্র ও বাজার / মজুর-মুটে

নদীরঘাট / ব্যবসা কেন্দ্র ও বাজার / মজুর-মুটে

অনুরূপ লক্ষণীয় শহরের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভৈরব নদীর শহর পার্শ্বস্থ তীর বহু ঘাট নামে পরিচিত। প্রত্যেকটি ঘাট যে কাজে ব্যবহৃত হোত সেই নামেই পরিচিত হয়, কিন্তু এই ঘাটের ব্যবহার ও পরিচিতি এক সময়ে হয়নি। বিভিন্ন সময়ের ব্যবহারের প্রয়োজনে ব্যবহারিক নাম সৃষ্টি হয়েছে। এই ব্যবহার মোটামুটি দ্বিবিধ ছিল। নদী পারাপার ও নদী পথে যাত্রী চলাচলের ঘাট এবং ব্যবসায়ীক মালের ব্যাপারী নৌকায় ওঠা নামার প্রয়োজনের ঘাট। পূর্বে মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট নদী পথে যাতায়াতের কোন ঘাট ব্যবহার করতেন তা অবশ্য সঠিকভাবে জানা যায় না। কারও মতে মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেটের বাসভবনের সংলগ্ন নদীতে ঘাট ছিল। অ মতে এ ঘাট আরও পশ্চিম দিকে সরে ছিল। ঘাট যেখানেই থাক মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট ছাড়া সাধারণের এ ঘাট ব্যবহারের সুযোগ ছিলনা—সে কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

এ সময়ে এপার থেকে ওপারে সাধারণের পারাপারের জন্যে বর্তমান রেল ষ্টেশন এলাকায় আভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল কর্তৃপক্ষের ঘাট বরাবর পাটনী ঘাট (সরকারী রেকর্ডে ফেরীঘাট উল্লেখিত) ছিল। রেল কর্তৃপক্ষ দখলিকৃত হওয়ায় এবং রেল চালু হলে স্টিমার ঘাট এখানে স্থানান্তর করলে পারাপারের খেওয়া চার্লিগঞ্জের হাটের পূর্ব দিকে ষ্টিমার ঘাটের পাশে (ডেলটা ঘাট) অপসারিত হয়। মহকুমা সদর থাক। কালে চার্লিগঞ্জের হাটবারের দিন বিভিন্ন মালামাল বোঝাই ব্যাপারী নৌকা হাটের পাশ দিয়ে নদীর তীরে ভিড়ত। মাল ওঠানামা ও বেচাকেনার পর হাট শেষে পরের দিন চলে যেত। এ হাটে নৈমিত্তিক ব্যবহারের পশরা যাতায়াতের বিশেষ কোন প্রয়োজন ছিলনা। ফলে যাত্রী বহনে ভাড়ার জন্যে সামান্য কয়েকটি পান্সী নৌকা বাজারের যে ঘাটে বাঁধা থাকতো সেই ঘাট পানসি ঘাট নাম ছাড়া অন্য কোন ব্যবহারিক ঘাটের নাম হওয়ার সুযোগ হয়নি। জেলা শহর হওয়ার কিছু আগে ১৮৮০ সালে খুলনায় স্টিমার সার্ভিস চালু হয়। চার্লিগঞ্জের হাটের পুবদিকে বর্তমান ক্লে রোডের উত্তর প্রান্তে ডেলটা ঘাট নামে (বর্তমান আভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সংস্থার ষ্টিমারে পরিবহনের মালের ঘাট) ষ্টিমার কোম্পানীর প্রথম ঘাট নির্মিত হয় এবং এ ঘাট থেকেই ষ্টিমারে যাত্রী ও মাল পরিবহন করা হতো। ঘাটের উপরে যে টিনের ঘরখানা আছে সেখানে প্রথম ষ্টিমার কোম্পানির অফিস, পাশে একটা ঘরে গুদাম ও নদীর পাড়ের টিনের ছোট ঘরখান। যাত্রী ছাউনী হিসাবে নির্মিত হয়। ঘাট নির্মাণকালীন ষ্টিমার সার্ভিসের ইংরেজ কর্মকর্তা মিঃ ডেলটার নামানুসারে ডেলটা ঘাট নামে পরিচিত হয়। কয়েক বছর পরে রেল চালু হলে, যাত্রী ও মাল পরিবহনের সুবিধার্থে রেল ষ্টেশনের কাছে বর্তমান ১নং ঘাটের সামনের পাকা দেয়াল চিনের ছাউনী যুক্ত ঘরে স্টিমার কোম্পানীর অফিস স্থানান্তরিত হয় এবং তখন থেকে ডেলটা ঘাট ব্যবসায়িক ঘাটে রূপান্তরিত হয়। উল্লেখ্য সমসময়ের কিছু পরে ৪নং ঘাটের উপরে ষ্টিমারের সাধারণ মেরামতের জন্যে একটা কারখানা (work shop) নির্মিত হয়েছিল।

জেলা সদর হওয়ায় নদীর পাড়ের ব্যবহার অনেকগুণে বেড়ে যায়। নদীপথে যাতায়াতে সরকারী প্রয়োজনে নতুন ঘাট ছাড়াও যাত্রী পরিবহনে ও ব্যবসায়ীক মালামালের উঠানামার জন্যে নতুন নতুন ঘাটের সৃষ্টি হয়। আদালত ভবন ও কালেক্টরেট ভবনের মাঝের রাস্তার মাথায় নদী পারাপারের একটা ঘাট মহকুমা গঠনের বহু পূর্ব থেকে চালু ছিল। এই ঘাটের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে জেলখানা নির্মিত হলে ঘাটের নাম হয় জেলখানা ঘাট। পরে রূপসা-বাগেরহাট রেল লাইন চালু হলে (১৯১৮ সাল) ষ্টেশনের পাশের ষ্টিমার ঘাট থেকে রূপসা ষ্টেশন ঘাট পর্যন্ত একখানা ফেরী ষ্টিমার (ডাক ফেরী) চলাচল করত এবং মধ্যবর্তী জেলখানা ঘাটে থামত। ষ্টিমার কোম্পানীর একজন ষ্টেশন মাষ্টার ঘাটের পাশে নদীর পাড়ে একখানা গোলপাতার ঘরের একাংশে টিকিট বিক্রয় ও অফিস, অপর অংশে স্ব-পরিবারে বসবাস করতেন।

ইংরেজ সরকার ১৮৩৩ সালে সুন্দরবন অধিগ্রহণ করেন এবং ১৮৬৬ সালে বন বিভাগের মাধ্যমে পৃথকভাবে সুন্দরবনের রাজস্ব সংগ্রহ করেন। বন বিভাগের বিভাগীয় দফতর হয় খুলনা সার্কিট হাউজের পার্শ্বে। এই বিভাগের কর্মকর্তাগণ নদী পথে যাতায়াতের জন্যে অফিসের পাশের রাস্তার উত্তর প্রান্তে নদী পাড়ে একটা ঘাট নির্মাণ করেন ও ঘাটের নাম হয় ফরেষ্ট খাট। এখানে বন বিভাগীয় লঞ্চ ষ্টিমার বাধা থাকতো এবং এই নামে আজও পরিচিত।

জেলার কর্মকর্তাগণ ও সরকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নদীপথে যাতায়াতের জন্যে ল্যাণ্ডিং ঘাট নামে একটা ঘাট নির্মিত হয় জেলা বোর্ড ভবন ও কালেক্টরেট ভবনের মাঝের রাস্তার প্রান্তে। এই ঘাট সমসাময়িক সব ঘাটের মধ্যে আধুনিক ও সুন্দর ব্যবস্থা সম্বলিত ঘাট হিসেবে বিবেচিত ছিল। রাস্তা থেকে পাড় পর্যন্ত কেয়ারী করা লাল সুরকির রাস্তা ও পরে খানিকদূর একটা পুল তৈরী করে দু’ধাপ সিড়ি দিয়ে নিচে একটা প্রশস্ত কাঠের জেটির পাশে রেলিং ঘেরা দিয়ে দু’পাশে বসার ব্যবস্থা এবং জেটির মাঝামাঝি পুনরায় দু’ধাপ সিঁড়ি অপর একটা ছোট খোল। জেটিতে নৌযানে ওঠা নামার ব্যবস্থা ছিল। এই ঘাটে শহরের অনেক মুক্ত বায়ুসেবী সকাল সন্ধ্যা নদী দৃশ্য অবলোকন করতেন।

ল্যাংডিং ঘাটের পশ্চিমে ও হাসপাতালের পশ্চিম পাশের রাস্তার প্রান্তে নদীতে কাঠের চওড়া সিড়ি দিয়ে নদী পথের যাত্রীদের ওঠানামার জন্যে নির্মিত হয়েছিল হাসপাতাল ঘাট। এই ঘাট ডাক্তারখানা ঘাট নামে অধিক পরিচিত ছিল। বর্তমানে এখানে কাঠের বদলে থাকা সিড়ি করা হয়েছে।

জেলখানা খেয়া ঘাটের পশ্চিম দিক দিয়ে জেলখানার প্রয়োজনের জন্যে নদীর পাড়ে নারকেল ছোবড়া ও গরুর বিচালী রাখা হতো – বাকী ল্যাংডিং ঘাট পর্যন্ত নদীর পাড় নানারকম ফুল ও পাতা বাহার গাছে সজ্জিত এবং জেলখানা ঘাট থেকে ফরেষ্ট ঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগায়ে নদী দৃশ্যের জন্যে সংরক্ষিত ছিল।

এছাড়াও নদীপথে চলাচলের বিভিন্ন ধরনের যাত্রী ও ব্যবসায়ীক নৌকা যেখানে ভিড়তো নদীর ঘাটও সেই নামে পরিচিত হোত। ডাক্তার খানা ঘাটের পশ্চিম পাশ দিয়ে যাত্রীবাহী ছোট টাবুরে বাধা হোত এবং তার সাথে কিছু পান স নৌকাও বাধা থাকতো। টাবুরে নৌকা বেশী হওয়ার জন্যে এ ঘাটের নাম হয় টাবুরে ঘাট। তার পাশে ঢাকার মুন্সিগঞ্জ এলাকা থেকে আগত যাত্রী ও পণ্যবাহী গহনা নৌকা নামে এক প্রকার বড় নৌকা বাঁধা থাকতো বলে এ অংশের নাম হয় গহন। ঘাট। গহনা নৌকা গোন-বেগন (জোয়ার-ভাটা) না দেখে নির্ধারিত সময়ে যাতায়াত করতো।

গহনা ঘাট ও কালীবাড়ীর পাশে পৌরসভা নদীতে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে শহরবাসীর নদীস্নান ও পানি নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন এবং এঘাট কালিবাড়ীর প্রাশে হওয়ায় কালিবাড়ী ঘাট নামে পরিচিত হয়। স্মরণীয় কালিবাড়ী থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত নদীর ভাঙ্গনে ভৈরব স্ট্র্যাণ্ড রোড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হলে ১৯৩০ সালে পৌরসভা এখানে পাকা বাঁধ নির্মাণ করেন। কালিবাড়ীর ঠিক পশ্চিম পাশে ছিল নতুন শহরের নির্মাণ কাজের জন্যে বালি-চুন ও ইটের নৌকা পাশাপাশি ভিড়তো, ফলে নদীর পাশেই যেখানে বালির নৌকা থাকতো তার নাম বালি ঘাট। তার পাশে চুনের নৌকা বাধার জন্যে চুনাঘাট ও তার পাশে ইটের নৌকার জন্যে নাম হোল ইট ঘাট। এ সময় মালা- মালি বিক্রয়ের কোন আড়ৎ বা ভাঙ্গায় নামায়ে সুবিধামত বিক্রয়ের কোন ব্যবস্থা ছিলনা। খরিদার প্রয়োজন মত নৌকা থেকে সরাসরি খরিদ করতেন। ইটঘাটে বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের একটা সুরকী ভাঙ্গার কল বসান হয়। যতদূর জানা যায় এই কলই ছিল শহরে প্রথম ইঞ্জিন চালিত কল।

ডেলটা ঘাটের পশ্চিমে ও বাজারের তুলাপট্রির রাস্তার শেষে নদীর ঘাটে তরিতরকারী ও আমের নৌকা বাধা থাকতো বলে এ ঘাটের নাম হয় আম ঘাট। এরপর থেকে নড়াইল কাছারির ঘাট পর্য্যন্ত দীর্ঘ নদীর পাড় বাজারের দোকান ও বসবাসের বাড়ীর জন্যে একমাত্র জগন্নাথ মন্দিরের ঘাট ছাড়া কোন ঘাট ছিলনা।

নড়াইল জমিদারীর এতদাঞ্চলীয় তহশীলের নদীর পাড়ের কাছারী বাড়ীয় দীর্ঘ ঘাট কাছারী ঘাট নামে পরিচিত ছিল এবং ঘাটের পশ্চিম দিয়ে রেল এলাকার মধ্য পর্য্যন্ত ডাব নারকেল ও ডুমুরিয়া অঞ্চলে উৎপাদিত মৌসুমী তরকারী ট্রেনে কলিকাতা চালান দেওয়ার জন্যে আনিত নৌকাগুলো এখানে ভিড়তে। বলে এ ঘাটের নাম হয় ডাব ঘাট। সম্ভবতঃ বছরের সব সময় ডাবনারকেল আনিত হত বলে ডাব ঘাট নাম হয়েছে। উল্লেখ্য ডুমুরিয়া অঞ্চলে উৎপাদিত ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালন শাক, লাল শাক, তাল বেগুন ও লম্বা মরিচ কলিকাতার খুব সুনাম ও প্রচুর চাহিদা ছিল।

ষ্টিমার কোম্পানী অফিসের সামনে থেকে পর পর সাতটা ঘাট নির্মাণ করে। ঘাটগুলির ক্রমিক সংখ্যানুযায়ী নামকরণ করা হয় এবং ঘাটগুলি একত্রে ক্রিড ঘাটও বলা হয়। এক থেকে তিন নম্বর পর্যন্ত ভাসমান জেটী দিয়ে যাত্রী চলাচলের ঘাট এবং পাঁচ থেকে সাত নম্বর ঘাট রেল সংযোগের সাথে মালামাল উঠানামার জন্যে নির্মিত হয়। এবং শেষোক্ত ঘাটগুলি দিয়ে সর্বাধিক পাট রপ্তানী হোত। চার নম্বর ঘাট মূলত: চলাচলের জাহাজ গুলিতে জ্বালানী কয়লা নেয়ার জন্যে ব্যবহৃত হোত। এই ঘাটের উপরে রেল বাহিত ষ্টিমার কোম্পানীর বিরাট কয়লার ডিপো ও জাহাজের সাধারণ মেরামতের জন্যে একটা কারখানা (work shop) ছিল।

আজকের উন্নয়নের মৌলিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই সব ঘাটের কার্যকারিতা বহুলাংশে হারিয়ে গেছে। তার সাথে হারিয়ে গেছে অনেক নাম। নদী পথের স্বল্প দৈর্ঘ্যে এত ঘাটের সন্নিবেশ দেখে মনে হয় শহর ছিল যেমন পাড়ার শহর তেমনি পাশের নদীও ছিল ঘাটের নদী।

প্রসংগত বলা বাঞ্ছনীয় রেল সংযোগ সম্পন্ন হওয়ার পর ১৮৮৫ সালে প্রথম যেখানে রেল ষ্টেশন নির্মিত হয় সে ষ্টেশন বর্তমান রেল ষ্টেশন থেকে দক্ষিণ পুবে বেশ দূরে বর্তমান রেল হাসপাতাল থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে এবং এই ষ্টেশন ঘরটি আজও আছে। এই ষ্টেশনে যাতায়াতের মূল রাস্তা ছিল পুরাতন যশোর সড়ক থেকে ষ্টেশন পর্য্যন্ত একটা সংযোগ রাস্তা ও পাওয়ার হাউজের সামনে থেকে রেল এলাকায় ঢুকে রেলওয়ে পাওয়ার হাউজের পাশ দিয়ে যে খোয়ার রাস্তা গেছে এই রাস্তাটি পুরাতন রেল ষ্টেশনে গিয়ে শেষ হয়। পুরাতন ষ্টেশন থেকে নদীঘাট ঘুরে হওয়ায় ষ্টিমার গামী রেলযাত্রী ও মাল পরিবহনের সুবিধার জন্যে এই শতকের প্রথম দিকে (১৯১২ সালে) নদীর কাছে বর্তমান স্থানে সরায়ে নেয়া হয়।

নদী পথে ষ্টিমার সার্ভিস ও বন্দর নগরী কলিকাতার সাথে সরাসরি রেল সংযোগ হওয়ায় খুলনা ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং নতুন নতুন ব্যবসায়ীর আগমনে স্বল্প পরিসরের চার্লিগঞ্জের হাট স্ফীত হয়ে ওঠে। নবাগতদের মধ্যে কলিকাতা ও অন্যান্য স্থান থেকে মাড়োয়ারী ব্যবসায়ী আসেন বেশী। অল্প দিনের মধ্যে এদের উদ্যোগে বাজার মধ্যে বড় বড় আবাসিক বাড়ীর সাথে দোকান, গুদাম ইত্যাদি নির্মিত হয়ে ব্যবসা কেন্দ্রে রূপ নেয়। এ সময়ে পুরাতন হাটকে ব্যবসাকেন্দ্র ও জেলা শহরের উপযোগী করে সরকারীভাবে প্রণীত পরিকল্পিত নক্সানুযায়ী রাস্তা ঘাট ও কয়েকটি চাদনী তৈরী করে সাপ্তাহিক হাটকে দৈনিক বাজারে পরিণত করা হয়। কারো কারো মতে মহকুমা শহর থাকাকালে হাটের মূল বটগাছের চার পাশে প্রাত্যহিক বাজার বসতো। পরিকল্পিত বাজার নির্মাণে পুরাতন বাজার সড়কের পাশ দিয়ে পুব-পশ্চিমে লম্বা একটা বৃহৎ চাদনী (খেল। টিনের ঘর) ও এই চাদনী পুব-পশ্চিম দিকে উত্তর-দক্ষিণ লম্বা করে দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট চাদনী নির্মিত হয়। চাদনী মধ্যে যে ধরনের মাল বিক্রি হোত চাদনীও সেই নামে পরিচিত হোত। যেমন: বৃহৎ চাদনীতে তরিতরকারীর দোকান বেশী বসতো বলে নাম হয় ভরকারী চাদনী। পশ্চিম দিকের চাদনীতে মাছ বিক্রি হোত বলে মেছো চাদনী, পুবদিকের চাদনীতে এক অংশে পান ও অন্য অংশে আলু বিক্রি হোত বলে কেউ বলতো আলু চাদনী কেউ পান চাদনী। একমাত্র মাছের চাদনী ছাড়া অন্য দুটিতে ভিন্ন ধরনের দোকানও ছিল। বড় চাদনীর মধ্যাংশে অস্থায়ী ঘেরা দিয়ে দক্ষিণ দিকে বেনেত ও উত্তর দিকে ফলের দোকান হয় এবং পশ্চিমাংশের দক্ষিণ দিকে চাল ও উত্তর দিকে তরিতরকারির দোকান বসতো। পুব পাশের পশ্চিম দিকে তামাকের দোকান ও উত্তরাংশে চিড়ে-গুড় এবং মিছরি-বাতাসার দোকান ছিল। পান বা আলু চাদনীতে পান ও আলু ছাড়া পুব পাশের রাস্তার দিকে গামছা ও মশারীর দোকান বসতো। একই মালের সারিবদ্ধ দোকানগুলিকে বলা হোত পট্টি এবং এভাবেই নাম হয় গামছা পট্টি, বেনে পট্টি, আলু পট্টি, তামাক পট্টি, চাল পট্টি, কাপড় পট্টি, লোহা পার্ট, ইত্যাদি

চাঁদনীর বাইরেও একই মালের পাশাপাশি অনেকগুলো দোকান একত্রে গড়ে ওঠে। আমঘাট থেকে নদীর পাড় ও বিপরীত দিকে কাপড়ের দোকান সহ নদীর পাড় ধরে কাপড়ের দোকানের পশ্চিম দিয়ে টিনের থালা-বাসন ও লৌহজাত দ্রব্যের (হার্ড ওয়ার) দোকান এবং তার পাশ দিয়ে চট্টগ্রামের লোকের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত কয়েকটি কারখানাসহ রুটী বিস্কুটের দোকান বাজার মধ্যস্থ প্রধান সড়কের দু’পাশ দিয়ে তেল লবণ-ডাল সহ অন্যান্য পাইকারী মালের দোকান ছাড়াও পান পট্টির পুবদিকের রাস্তার অপর পাশে পাইকারী খুচরা সুতোর দোকান এবং চাদনী মধ্যের খুচরা চালের দোকানের দক্ষিণ পাশে পাইকারী চালের ব্যবসা কেন্দ্র জমে ওঠে।

পূর্বে আলোচিত হয়েছে স্বল্প পরিসরে চার্লিগঞ্জের হাট উত্তর-দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে (নদী ও রেল এলাকা) সম্প্রসারণের কোন সুযোগ না থাকায় স্বাভাবিক- ভাবে পুবদিকে সরে আসতে থাকে। আমঘাট থেকে পুরাতন বাজার সড়কের ডেলটা ঘাট পর্যন্ত রাস্তার উত্তর পাশে কাসা বাসনের দোকান ও দক্ষিণ পাশে তুলাপট্টির মধ্যে পাঞ্জাবী জুতো ব্যবসায়ীরা কয়েকটা জুতোর দোকান করেন। এদের মধ্যে একজন তুলো পট্টির রাস্তার কোণে দোকানের পিছনে একটা জুতো তৈরীর কারখানাও করেন। এই কারখানা ছিল শহরে জুতো তৈরীর প্রথম কারখানা। এছাড়া তুলোপটির পূর্বাংশে বিহার অঞ্চলের কয়েকজন ব্যবসায়ী তুলো ও লেপ তোষক তৈরীর দোকান করেন ফলে এ অংশের নাম হয় তুলোপট্টি। ক্লে রোডে কবিরাজী, এ্যালোপ্যাথি ওষুধের দোকান। পরে এর সাথে যোগ দেয় মুদী, সাইকেল পার্টস বিক্রয় ও মেরামতের দোকান সহ গ্রামফোন, হ্যাসাক-ডে-লাইট ও বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী বিপণী।

সোনার গহনা নির্মাতা ও ব্যবসায়ীগণ বর্ণিত এলাকার পাশে ক্লে রোডের পূবে হেলাতলায় একটু নিরিবিলিতে ব্যবসা শুরু করেন। প্রথম অবস্থায় সোনার কারিগরেরা (স্বর্ণ শিল্পী) সেনের বাজার থেকে উঠে এসে গহনা তৈরী ও বিক্রয়ের দোকান করেন। পরে যশোর ও অন্য অঞ্চল থেকে বড় বড় ব্যবসায়ী অনেকগুলি কারিগর রেখে গহনা তৈরী ও বিক্রয়ের দোকান করেন। জানা যায় সেনের বাজার থেকে উঠে এসে কারিগরেরা মহকুমা সদর থাকাকালে এখানে প্রথম দোকান করেন এবং এদের দেখা দেখি অন্যেরাও এখানে এসে দোকান করেন। চার্লিগঞ্জের হাটে কোন স্বর্ণকার ছিল বলে জানা যায়নি। উল্লেখ্য বড় বড় দোকানের সাথে গহনা বন্ধকীর সুদের কারবার বেশ জমজমাট ছিল।

অপর একটা পাইকারী ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে ওঠে রেল এলাকার ষ্টেশন রোডের দু’পাশ দিয়ে রেলের জমি বন্দোবস্ত নিয়ে বড় বড় পাইকারী ব্যবসায়ীর সমাবেশ হয়। ক্লে রোড দিয়ে ষ্টেশন রোডে ঢোকার ডানপাশে বার্মাসেল এবং তার পাশে এসো (Esso) অয়েল কোম্পানীর জ্বালানী তেলের ডিপো নির্মিত হয়। এই ডিপোতে তেল সরবরাহে রেলের অয়েল ট্যাঙ্কার ডিপোর পাশে নিয়ে আসা এবং অন্য পণ্যবাহী ওয়াগন গুলোকে আনতে ষ্টেশন থেকে ক্লে রোড পর্যন্ত বেশ কয়েক সারি রেল লাইন বসান হয়।

গড়ে ওঠা শহরের এক কোণে বাজার অবস্থিত হওয়ায় পূর্বাংশের অধিবাসীদের দৈনন্দিন বাজারের যাতায়াতে দূরত্বের অসুবিধা বিবেচনা করে পৌরসভা শহরের পুব দিকে রূপসার চরে ১৯২৭ সালে নতুন বাজার নামে একটা বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৯ সালে পৌরসভার পূর্বতন চেয়ারম্যান কুঞ্জবিহারীর স্মরণে এই বাজারের নামকরণ করা হয় কুঞ্জবিহারী মার্কেট। কিন্তু রাখা এই নামটি কোনদিন প্রচলিত হয়নি। নিত্য প্রয়োজনীয় কাঁচা মালের বাজার, বিস্তীর্ণ রূপসার চরে জ্বালানী কাঠ, গৃহ নির্মাণ সামগ্রী, গোলপাতা, বাঁশ ও সিলেট অঞ্চলীয় লোকের মুলি বাঁশের বুননী ঘরের বেড়ার ব্যবসা ভিন্ন অন্য কোন ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। শহর থেকে বেশ দূরে বয়রার হাট ছাড়া কাছাকাছি আর কোন হাট বাজার ছিলনা। খুলনা বাজারে সব ধরনের মালামালের একাধিক দোকান থাকায় লোকমুখে এ বাজার ক্রমে বড় বাজার নামে পরিচিত হয়।

এ প্রসঙ্গে বলা বাঞ্ছনীয় যে, ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে ওঠার সাথে মাথায় করে মাল ওঠানামা করায় ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দেয় কিন্তু সমসময়ে স্থানীয় মজুরেরা মাথায় করে মাল বহনে অভ্যস্ত ছিলনা—পক্ষান্তরে এ কাজকে তারা ভাল চোখে দেখতো না। ফলে এ কাজে অভ্যস্ত উড়ে কুলির (উড়িষ্যা নিবাসী পরিবহন শ্রমিকদের এই নামে অভিহিত করা হতো) আমদানী হতে থাকে। স্থানীয় মজুরের অনুপস্থিতির জন্যে এই কাজে তাদের একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে। মুটের কাজ ছাড়াও বিভিন্ন কাজের জে শহরে এদের ভীড় বাড়তে থাকে এবং যে কাজে যোগ দেয় সে কাজে একক প্রাধান্য পায়। উড়ে রাধুনী ঠাকুরেরা প্রথম থেকে পাচকের কাজে সুনাম অর্জন করে। ধনী ও সৌখিন পরিবারগুলোতে পাচকের কাজে এরা অগ্রাধিকার পেত। হোটেল ব্যবসায়ে পরিবেশক ও পাচকের কাঙ্গে এদের প্রধান্য ছিল। এ ছাড়াও শহরে সকাল সন্ধ্যা ভিত্তি ও বাঁকে করে পানি দেওয়ার মালীর কাজটিও এদের একক ছিল।

উড়েদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল – এরা প্রায় প্রত্যেকে নানা ধরনের মসলা দিয়ে পান খেতে ভালবাসত এবং তাম্বুল সেবী প্রত্যেকের কোমরে একটা ছোট থলেতে পান-সুপারি মসলা ও সুপারি কাটার কারুকার্য খচিত সুন্দর ছোট একখানা জাঁতী থাকতো। এদের অনেকেই পানের মসলা সুপারি-মিষ্টি মসলা জর্দ। কিমাম-দোক্তা ইত্যাদি তৈরী ও বিক্রয় শুরু করে। শহরে তাম্বুলরাগীদের মধ্যে এই মসলা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরাই প্রথমে শহরে খিলি পানের দোকান ও সাথে পানের মসলার ব্যবসা শুরু করে। এখনও বাজারের মোড়ে এদের একটা পান মসলার দোকান আছে। দেশ বিভাগের পর ক্রমে এরা শহর ছেড়ে চলে যায়। নদীধারে একমাত্র পাচক ঠাকুর ভাস্করের একটা হোটেল ছাড়া পানি দেওয়ার শেষ উড়ে মালি কুঞ্জ বৃদ্ধ বয়সে পোষ্টাল সুপারের অফিসের ওখানে ছিয়াত্তর সালে মারা যায়।

অনুরূপভাবে রেল ইঞ্জিন ও ষ্টিমারের জ্বালানী-কয়লা রেলবাহিত ওয়াগন থেকে ডিপোতে উঠান-নামানোর শ্রমিক সংকটের জন্যে রেলকর্তৃপক্ষ নিজ ব্যবস্থা- ধীনে কলিকাতা, ঝরিয়া, রানিগঞ্জ এলাকা থেকে কয়লা বহন শ্রমিক নিয়ে আসেন ও রেল এলাকায় এদের থাকার ব্যবস্থা করেন। কাজের সাথে সাথে এদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে এবং পরে একাংশ হেলাতলায় বসবাস শুরু করে। অবাঙ্গালী এই শ্রমিকেরা প্রথম থেকেই খোট্টা নামে পরিচিত হয়। খোট্টাদের অনেকেই ছাতু খেয়ে থাকতো বলে রসিকতা করে এদের বলা হোত ছাতু খোর এই শ্রমিকেরা খুবই পরিশ্রমী ও স্বল্প ব্যয়ে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিল এবং সপরিবারে বসবাস করতো। শোনা যায়, এদের মধ্যে কিছু কামিন (মেয়ে কুলি) ছিল। তবে খোট্টা মেয়েরা রেল ইঞ্জিনের পরিত্যক্ত ছাই এর মধ্য থেকে কয়লার টুকরা সংগ্রহ করে হেলাতলার মোড়ে ও শহরে বাসায় বাসায় জ্বালানী কয়লা (কোক) বিক্রি করতো। এছাড়া কয়লার গুড়ার সাথে মাটি ও গোধর মিশিয়ে ‘গুল’ নামে কয়লার পরিবর্তে এক প্রকার জ্বালানীর এরাই প্ৰথম প্ৰচলন করে। মেয়েদের অনেকে ছাতু তৈরী, গুল বিক্রি করে শহরে ছাতুর পরিচয় করে এবং পুরুষদের মধ্যে কেউ কেউ ডালের গুড়া (ব্যসন) দিয়ে নানা রকম মুখরোচক তেলে ভাজা তৈরী ও বিক্রি করতো যাহা স্থানীয়দের কাছে পূর্ব পরিচিত ছিলনা। পূর্ব পেশা বজায় রেখে এদের অনেকে এখনও হেলাতলা এলাকায় বসবাস করে এবং বাজার মধ্যে এই সম্প্রদায়ের একমাত্র ছাতুর দোকান সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছে।

লক্ষণীয়, চার্লিগঞ্জের হাটে মহকুমা সদর গঠন পর্যায়ে যে সব ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতেন পরবর্তীতে জেলা সদর ও বৃহৎ ব্যবসা কেন্দ্র সৃষ্টি হবার পর তাদের আর কোন সন্ধান পাওয়া যায় না। সম্ভবতঃ স্বল্প পুঁজি ও ব্যবসায়ীক অনভিজ্ঞতার ফলে নতুন ব্যবসায়ীদের কাছে নিজেদের ব্যবসা স্থান হস্তান্তর করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *