৮
ভেবেছিল সোমনাথদের থেকে দূরে থাকবে। সেই ওদের হোটেলের দিকেই দৌড়াতে হল ঋজুকে। সোমনাথ হোটেলের বাইরের রাস্তায় উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করছে। তাকে দেখে ছুটে এসে বলল, ‘কী করা যায় বল তো? ওর মধ্যে যে কিছু সমস্যা চলছে তা আমি বুঝেছি, কিন্তু এভাবে এখানে এসে যদি হারিয়ে যায়, তাহলে তো…’
ঋজু ভেবেই এসেছিল তার সঙ্গে দেখা হবার কথাটা বলবে। নইলে সোমনাথ পরে জানতে পারলে অন্য কিছু মনে করতে পারে।
তার কথা শুনে সোমনাথ বলল, ‘তাহলে ওই ঘাটের দিকটাই দেখি চল।’
ঋজু বলল, ‘চল।’
সোমনাথের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল ঋজু। সোমনাথ কিছুটা অশান্ত হয়ে পড়েছে। বলল, ‘শ্বশুর-শাশুড়ি আছে, বুঝতেই পারছিস কী বাজে ব্যাপার হবে। ওর মধ্যে তো সুইসাইডাল টেন্ডেন্সিও আছে। সেরকম হলে… ওরে বাবা…’
ঋজু সোমনাথের কাঁধে হাত রাখল, ‘ধুস, অতিরিক্ত কিছু ভেবে ফেলেছিস। তুই শাড়ির দোকানগুলো দ্যাখ। ওখানেও ঢুকে থাকতে পারে।’
সোমনাথ উদাসীনভাবে মাথা নাড়ল, ‘না না, ওসব করবে না। ওর ওসব নেই। শাশুড়ি যা শাড়ি কিনে দেয়, সেগুলোই পরে। ও বই-টই কেনে টাকা জমিয়ে। একটু অন্য ধরনের।’
ঋজু বলল, ‘খেতে ভালোবাসে? অনেক দোকান আছে, সেখানে যেতে পারে। মন্দির আছে এত…’
সোমনাথ বলল, ‘না না। ও ধার্মিক টাইপ না, ওর হল ওই একা একা ঘুরবে, এখানে এত লোক আছে, কী থেকে কী হয়ে যায়, দুপুর বারোটা বাজতে চলল, উফ।’
সোমনাথ রীতিমতো বিলাপ করা শুরু করল। ঋজুর খারাপ লাগছিল সোমনাথের জন্য। সোমনাথ সত্যিই ওর বউকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছে। অম্বালিকা যেটা বলছিল, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সেরকম কিছুই ঘটেনি। অম্বালিকার কথা সে বিশ্বাস করেছিল তখন।
দশাশ্বমেধ ঘাটে পৌঁছল তারা। সোমনাথ বলল, ‘আমি মণিকর্ণিকার দিকটা যাচ্ছি, তুই উলটো দিকে যা। পেলেই ফোন করবি।’
‘ঠিক আছে।’
হাঁটতে শুরু করল ঋজু। গায়ে গায়ে লেগে আছে একটার পর একটা ঘাট। এক এক ঘাটে এক এক ধরনের মানুষ। প্রত্যেক ঘাটেই নৌকো, সব ঘাটেই যে প্রচুর ভিড়, এমন নয়। নৌকো নিয়ে দেখলে বেশি সুবিধা হতো কি?
এক নৌকোচালককে কত টাকা নেবে জিগ্যেস করায় বলল পাঁচশো। ঋজু তাতে উঠে পড়ল। যতটা সম্ভব হয় ঘাটের কাছ থেকেই নৌকো চালানোর নির্দেশ দিল। নাহ। অম্বালিকাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
মাঝি জিগ্যেস করল, ‘আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?’
ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ, একজন হারিয়ে গেছে।’
মাঝি বলল, ‘এরকম তো এখানে হয়। নতুন কিছু না, মহিলা না পুরুষ?’
ঋজু বলল, ‘মহিলা। এরকম হয় মানে?’
মাঝি বলল, ‘কত বড় জায়গা বাবু, মানুষ হারাবে না? মেয়েদের হারানোর অনেক জায়গা আছে। এত জায়গা আছে যে বলে শেষ করা যাবে না।’
সোমনাথকে ফোন করে সে কথা জানাতে সোমনাথ হতাশ গলায় বলল, ‘না রে, আমি কোথাও পেলাম না। কয়েকজন লোককে ছবি দেখিয়েও জিগ্যেস করলাম। আমার মনে হয় এবার থানায় যাওয়া উচিত, কী বলিস? সাত ঘণ্টা হতে চলল।’
ঋজু বলল, ‘তাই কর। আমি আসছি, তুই কোথায়?’
সোমনাথ বলল, ‘মণিকর্ণিকায় আছি। আয়।’
সোমনাথ আবার নৌকো চালককে মণিকর্ণিকার দিকে যাবার নির্দেশ দিতে গিয়ে কী মনে হল, বলল, ‘অসসি ঘাটে একটু দাঁড় করাও তো।’
মাঝি তা-ই করল। নৌকো থেকে নেমে একটু হেঁটে ঘাটের মন্দিরের কাছে যেতেই দেখা গেল অম্বালিকা সিঁড়িতে বসে আছে। তাকে দেখে হাসল। ঋজু বলল, ‘আপনাকে পাচ্ছে না বলে আরেকটু হলে সোমনাথ থানায় চলে যাচ্ছিল। আর আপনি এখানে বসে আছেন?’
অম্বালিকা বলল, ‘দাম বাড়াচ্ছিলাম আর কী। সব সময় হাতের কাছে থাকলে দাম পড়ে যায়। আপনার বন্ধু কোথায়?’
অম্বালিকা কোনো কথা না বলে তার পিছন পিছন হেঁটে নৌকোয় উঠল। নৌকো চলতে শুরু করতেই ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘তাহলে ঋজুবাবু, নৌকোয় শেষমেশ আমার সঙ্গে চড়তেই হল, কী বলেন?’
