হৃদয়ের পদ্মবনে – ৫

৫

ঋজু কোনোকালেই ধার্মিক নয়। আঁখি ধার্মিক। প্রায়ই উপোস করত। শনিবার নিরামিষ খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল তাদের। ঋজু সেইসব দিনে বাইরে খেয়ে নিত। সে দেখেছে বেশিক্ষণ নিরামিষ খাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তার ধারণা নিরামিষ খেলে বরং তার পেট খারাপ হয়।

সোমনাথের ছেলে-মেয়েগুলো বেশ দুরন্ত। ছেলেটা ফোরে পড়ে, মেয়েটা ওয়ানে। দু’জনে মিলে দৌড়াচ্ছে, সোমনাথ বকা ঝকা করছে। সোমনাথের শ্বশুর তাকে দেখে বললেন, ‘তুমি সোমনাথের সঙ্গে এক স্কুলে পড়তে?’

ঋজু বলল, ‘হ্যাঁ।’

‘বাঃ। তারপরে আর দেখা হয়নি! এ-ই হয়। আমারও কত বন্ধু আজ আর নেই। যারা আছে, তাদের কারও সঙ্গেই প্রায় যোগাযোগ নেই। কী আর করা যাবে।’

শ্বাস ছাড়লেন বৃদ্ধ।

ঋজু কথা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে গেল। সোমনাথ ছেলে-মেয়ের হাত ধরে ছুটতে ছুটতে তার কাছে এসে বলল, ‘দ্যাখ কী অবস্থা। এদের সামলাতেই আমার হাল খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’

ঋজু বলল, ‘ভালো তো। ক’দিন পর বড় হয়ে যাবে। তখন আর এসব করবে না। এই বয়সটাই ভালো।’

সোমনাথ বলল, ‘ভালো না ছাই। হোমওয়ার্ক করতে হলে বুঝতিস। চল আর দেরি করা যাবে না। এখান থেকে সারনাথ অনেক দূর। বিকেলে সারনাথের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে হয়ে গেল।’

সোমনাথের বউ অন্যমনস্কভাবে হয়ে হাঁটছিল। তাদের কাছে এসে সরাসরি ঋজুকে জিগ্যেস করল, ‘আপনার বন্ধু পড়াশুনোয় কেমন ছিল?’

আচমকা প্রশ্নটা শুনে ঋজু হকচকিয়ে গেলেও সামলে নিল তাড়াতাড়ি, ‘ভালো ছিল। কেন বলুন তো?’

সোমনাথ বলল, ‘কেন-র কিছু নেই। ওর মনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৌতূহল আসে। ওসব নিয়ে ভাবিস না। চল চল।’

সোমনাথের শাশুড়ি খানিকটা পিছিয়ে পড়েছিলেন। সোমনাথ তাকে নিয়ে এসে টোটোতে তুলে দিল। টোটো রওনা হতে সোমনাথ বলল, ‘কিছু মনে করিস না। আমার বউ এরকমই। ওর হঠাৎ হঠাৎ প্রশ্নের উদয় হয়। সব জানে কিন্তু। আমার রেজাল্টও দেখেছে। তারপরেও… কী বলি।’

ঋজু বলল, ‘ঠিক আছে। এতে সমস্যার কিছু নেই।’

সোমনাথ বলল, ‘সমস্যার কিছু নেই না। এত ভালো প্রশ্ন মাঝে মাঝে অপ্রস্তুত করে দিতে পারে। তোকে আগে থেকে বলে রাখলাম ভাই।’

ঋজু বলল, ‘সে ঠিক আছে। কিন্তু সমস্যাটা কোথায়?’

সোমনাথ হাত ওলটাল, ‘আমি জানি না। আমাকে এক কাউন্সেলর বলেছে সিভিয়ার ডিপ্রেশন আছে। তার জন্য কয়েকটা সেশন করতে হবে। ফিরে গিয়ে সেশন শুরু হবে। একেকটা সেশনের ভালোই টাকা বুঝলি? মনের রোগই তো এখন মহামারী। ঘরে ঘরে মনের রোগ।

‘আমার হয়েছে জ্বালা। বাচ্চা দ্যাখো রে, সবাইকে সামলাও রে। আর এই যে ডিপ্রেশন, তা আবার আমার মা’র সঙ্গে ঝগড়ার সময় কোথায় যেন চলে যায়। সে কী ঝগড়া হয় রে বাপ! আমার তখন ছেড়ে দে বউ কেঁদে বাঁচি অবস্থা হয়।’

ঋজু ফিকফিক করে হাসতে শুরু করল। রাস্তায় একদল সাধু হাঁটছে। সোমনাথ তাদের উদ্দেশে প্রণাম ঠুকে বলল, ‘ইন্সপিরেশন দাও বাবারা। আমিও তোমাদের একজন হতে চাই।’

ঋজু বলল, ‘বাচ্চা মানুষ না করে সাধু হয়ে গেলে যে তুই ফাঁকিবাজ হয়ে যাবি, সে খেয়াল আছে?’

সোমনাথ বলল, ‘হ্যাঁ আছে। সে জন্যই তো হতে পারছি না। বাচ্চাগুলোর টান খুব বেশি। পরে দেখা যাবে ওরাই বড় হয়ে আমায় লাথ মেরে দিল।’

ঋজু বলল, ‘কেন লাথ মারবে? যেগুলো দেখিস, সে খবরগুলো ব্যতিক্রম।’

সোমনাথ বলল, ‘কোথায় ব্যতিক্রম দেখলি? এসব খবরই তো বেশি। দ্যাখ না, আমার বোনটা সারাদিন মা’র কানে বিষ ঢেলে ঢেলে মা’কে এরকম করে দিল। আমি ইচ্ছে করেই মা’কে আনাটা অ্যাভয়েড করেছি। এখানে এলেই ক্যাচাল শুরু করে দিত শাশুড়ি-বউমায়। এসেছি বেড়াতে। ঝগড়া ভালো লাগে? ধুর ধুর। জীবনটা আমকাঠ হয়ে গেল।’

ঋজুর সোমনাথের জন্য এবার খারাপ লাগল। তাদের এই বয়সে তারা আর কোনো সিনেমার হিরো না। তাদের যৌবন পেরোতে চলেছে। এখন শুধু কোনোভাবে দিন যাপন করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবার পালা।

ফোন বাজছে। ঋজু দেখল পৌষালি মিসড কল মারছে। মেসেজের উত্তর না পেয়ে রেগে গেছে কি? সে ফোন ধরল, ‘হ্যাঁ।’

‘কী হল, মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছ না কেন?’

‘এই পুরোনো বন্ধু সোমনাথের সঙ্গে দেখা হল। ওর সঙ্গেই ঘুরছি এখন। আমি পরে ফিরে গিয়ে ফোন করব।’

ফোন কেটে গেল। ঋজু এখান থেকেই পৌষালির থমথমে মুখটা দেখতে পেল। পৌষালির সঙ্গে ফেসবুকে কথা শুরু হয়েছিল। এখন হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় শুধু। পৌষালির সঙ্গে দেখাও হয়নি। অথচ হোয়াটসঅ্যাপ সম্পর্কটাও কেমন পজেসিভ হয়ে উঠছে দিন দিন। কথা বলা বন্ধ করলেই মিসড কল মারতে শুরু করে। ওদিকে সংসারী মেয়ে। স্বামী-সন্তান নিয়ে মন দিয়ে সংসার করছে। তার সঙ্গে কথা না বললেই নাকি ওর অস্বস্তি হয়। এই সম্পর্ককে কী নাম দেওয়া যায় ঋজু এখনও বুঝে উঠতে পারেনি।

সোমনাথ মনে হয় মহিলা কণ্ঠ শুনেছিল, জিগ্যেস করল, ‘কে রে? বিশেষ কেউ নাকি?’

‘আরে না। সেসব কিছু না।’

‘অ।’ সোমনাথের গলায় হতাশার সুর, ‘আজকাল মনে হয় একটা এক্সট্রা-ম্যারিটাল করলে ভালো হতো। তারপর পাড়ার বিশুকে দেখি। একটা বউতেই পাগল হয়ে গেছিল, এখন বউ সেটা জেনে গেছে, পুলিশ কেস টেস খেয়ে একবারে স্যুটকেস হয়ে গেছে।’

ঋজু হাসতে হাসতে বলল, ‘ওহ, মানে স্যুটকেস না হলে তুই একটা ট্রাই নিতিস?’

সোমনাথ বলল, ‘নিলেই বা কী? আমাকে কে পাত্তা দেবে ভাই? টাকা-ফাকা থাকলে পাত্তা পায় লোকে। আমার আর টাকা কোথায়?’

টোটো একটা লেভেল ক্রসিংয়ে এসে দাঁড়াল। ট্রেন যাবে।

সোমনাথ বলল, ‘ওই দ্যাখো। এখানে লেভেল ক্রসিংয়ের উপর দিয়ে কোনো ফ্লাইওভার নেই?’

টোটোওয়ালা জানাল নেই। তাদের পাশেই আরেকটা টোটো এসে দাঁড়িয়েছে। ঋজু দেখল সোমনাথের বউ তাকে তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করছে। ঋজুর অস্বস্তি হল। কী দেখছে? সোমনাথ গলা নামিয়ে বলল, ‘দ্যাখো কাণ্ড, যার থেকে দূরে যাবার জন্য তোর সঙ্গে এলাম, সেই পাশেই এসে দাঁড়াল।’

সোমনাথের ছেলে ওদের টোটো থেকে এই টোটোয় চলে এল। ঋজুকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে শুরু করল। ঋজু মন দিয়ে উত্তর দিয়ে গেল।

প্রায় আধ ঘণ্টা পর গেট উঠল।

সারনাথ পৌঁছানোর পর পার্কিং থেকে খানিকটা হেঁটে সারনাথে ঢুকতে হয়। সোমনাথ টিকেট কাউন্টারে লাইন দিল, তখনই ঘোষালবউদি পাকড়াও করল তাকে, ‘আরে ঋজু, তুমি এখানে? একা একা চলে এসেছ নাকি?’

ঋজু দাঁত বের করল, ‘ওই আর কী। ঘোষালদা কোথায়?’

‘ঘোষালদা আর কোথায় থাকবে? বাথরুমের খোঁজে দৌড়ে বেড়াচ্ছে! তুমি চেনো না তোমার ঘোষালদাকে? এই লোকের সঙ্গে কোথাও কি যাবার উপায় আছে? যেখানেই যাব, ঠিক বাথরুমে চলে যাবে। কোনারকে তো ভয়াবহ কাণ্ড হয়েছিল। আমরা কন্ডাক্টেড ট্যুরে গেছি, আর তোমার ঘোষালদা কোথায় গিয়ে ঢুকে গেছে, বাস আমাদের ছাড়াই চলে গেছিল।’

রাস্তার মধ্যেই হাত-পা নাড়িয়ে ঘোষালবউদি ঘোষালদার কীর্তিকলাপ বলতে শুরু করে দিলেন। ঋজু বলল, ‘ঠিক আছে বউদি, পরে কথা বলব।’

‘পরে আবার কী? দাঁড়াও না, একাই তো এসেছ…’

‘না, আসলে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে এখানে দেখা হয়েছে, ওদের সঙ্গেই ঘুরছি।’

‘অ, তা কী করে তোমার বন্ধু?’

‘চাকরি করে, আসি এখন?’

‘এসো। তুমি কি আর বিয়ে করবে না ভাই? কী আছে একবার ডিভোর্স হয়ে গেছে বলে? জীবনে বার বার চেষ্টা করে যেতে হয়। রবার্ট ব্রুসের গল্প পড়েছিলে না? জীবন তো সেরকমই। একবার বিয়ে করে হেরে গেলে আবার বিয়ে করতে হয়, আবার হেরে গেলে আবার। এভাবেই একটার পর একটা লড়াইয়ের পর ঠিক একদিন সাফল্য পেয়ে যাবে।’

ঋজু বলল, ‘এই মরেছে, ঘোষালদা কি জানে এভাবে যে সাফল্য পাওয়া যায়?’

‘সাফল্য পেলে মুখে নুড়ো গুঁজে দেব না? সাফল্য আমি পেতে দিলে তো! যাক গে, আমার বোন তো আমার সঙ্গেই এসেছে, এই দিশারি, এই দ্যাখ, এই তো ঋজু।’

ঋজু পালাতে গিয়েও পারল না। ঘোষালবউদি তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন। আর ঠিক এই সময়েই সোমনাথ এসে তাকে ডাকল, ‘কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? চল চল।’

ঋজু বলল, ‘এই যে ঘোষালবউদি, ওই আমার বন্ধু, ওর সঙ্গে এসেছি, এখন যাই?’

মুহূর্তের মধ্যে ঘোষালবউদির হাত আলগা হতেই ঋজু পালাল। পিছন থেকে ঘোষালবউদি ডাকতে শুরু করলেও সে শুনল না।

তার সঙ্গে পা চালিয়ে যেতে যেতে সোমনাথ বলল, ‘কী রে, কী কেস?’

‘আর বলিস না। গলায় ঝুলে গেছে। মহা সমস্যা।’

‘তুই “না” বলতে পারিস না? ঝেড়ে খিস্তি মেরে দিতে পারিস তো!’

‘পারি না বলেই তো সমস্যা।’ অসহায়ভাবে বলল ঋজু। ভালো করে ঘুরতে পারছিল না সে। মাঝে-মাঝেই পিছন ফিরে ঘোষালদাদের দেখার চেষ্টা করছিল।

সোমনাথ বলল, ‘বলে দিবি। না বললে সমস্যা বাড়বে। আজেবাজে লোকের পাল্লায় পড়িস না।’

সোমনাথের বউ একা একা হাঁটছে। খানিকটা অন্যমনস্ক।

ঋজু বলল, ‘তুই বরং বউদির কাছে যা। একা একা হাঁটছে তো!’

সোমনাথ বলল, ‘হাঁটুক, বেশি ঘাঁটাব না, কখন কী নিয়ে ঝগড়া লাগিয়ে দেবে, মুড বিগড়ে যাবে আবার।’

সোমনাথের ছেলে দৌড়ে লনের দিকে চলে যাচ্ছে। সোমনাথ ‘দাঁড়া আসছি’ বলে সেদিকে দৌড়ল।

সোমনাথের বউ দাঁড়িয়ে পড়ল। ঋজুকে জিগ্যেস করল, ‘আপনি আমাকে দেখছিলেন কেন?’

ঋজু বলল, ‘আমি কোথায় দেখলাম? আপনার কোনো ভুল ধারণা হয়েছে।’

সোমনাথের বউ চুপ করে গেল।

ঋজুর হঠাৎই মনে হল এদের সঙ্গে ঘোরা অসম্ভব। এরপরে সমস্যা বাড়বে। সে আলাদা হয়ে হাঁটতে শুরু করল। বিরক্তও হচ্ছিল কিছুটা। ঠিক করল আর কারও সঙ্গে জুড়বে না। বেনারসের বাকিটা একা-একাই ঘুরবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *